Accessibility Tools

ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

তৃতীয় অধ্যায়—রেলপথগামী

দার্জিলিংয়ে যখন প্রথমবার বড়ো বড়ো টি এস্টেট গড়ে উঠল, প্রায় তখনই কলকাতা থেকে নিয়মিত তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত নির্দেশ আর চিঠি-চাপাটি পাঠানোর প্রয়োজন বোধ করলেন ইংরাজ বাহাদুর। বছর বিশেক হল দার্জিলিং মেল নামে এক ট্রেন সেইসব চিঠিচাপাটি আর বেশ কিছু সওয়ারি নিয়ে রোজ শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি যায়। যেদিনের কথা হচ্ছিল, সেদিন শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বিকেলে ট্রেন ছাড়তে মিনিট পনেরো দেরি হল। আসলে ছোটোলাট গ্রীষ্মাবকাশে সপরিবার দার্জিলিং যাচ্ছেন। তাঁরা তখনও এসে পৌঁছোননি। সুসজ্জিত সেলুনকার অপেক্ষা করছে তাঁদের জন্য। সস্ত্রীক যুবক বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে সেকেন্ড ক্লাসের এক কামরায় নিচের এক বেঞ্চি আর উপরের বাঙ্কে বিছানা পেতে গুছিয়ে বসল। গাড়ি ছাড়ার আগেই টিকিটচেকার এসে তাঁদের টিকিট চেক করে গেলেন।

“শ্রীযুক্ত তারিণীচরণ রায় আর শ্রীমতী মাখনলতা রায়? ঠিক কি না?”

“আজ্ঞে”, বললে যুবক।

“তা স্ত্রীর জন্য আলাদা জেনানা কামরার ব্যবস্থা করতে পারতে। এখন তো সবার সঙ্গে যেতে হবে। করে দেব? চার সিকে পয়সা বেশি লাগবে।”

আগে হলে সে কী বলত জানে না, কিন্তু স্টেশনে কিছু পূর্বে যে নাটক অভিনীত হল, তা মনে করে তারিণী আর স্ত্রীকে চোখের আড়াল করতে সাহস করল না।

“আজ্ঞে না। উনি আমার সঙ্গেই যাবেন।”

টিটিবাবুও আর কিছু না বলে বাকিদের টিকিট চেক করতে লাগলেন।

ঢং-ঢং-ঢং। হি-স, হিস শব্দে ট্রেনের বাঁশি বাজল অবশেষে। গোটা স্টেশন যেন একসঙ্গে জেগে উঠে হুড়োহুড়ি, দৌড়াদৌড়ি, চেঁচামেচি শুরু করল। সব লোহার দরজা ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। চোঙামুখে ঘোষক সবাইকে লাইন থেকে সরে দাঁড়াতে বারবার অনুরোধ, উপরোধ, আদেশ করতে লাগলেন। প্লেগের ভয়ে গাড়ির সব ক্লাস লোকে পরিপূর্ণ। থার্ড ক্লাসে তিলধারণের সামান্য জায়গা থাকলেও লোকধারণের সত্যিই স্থানাভাব। কেউ চড়ে উঠতে গেলেই ভিতর থেকে আওয়াজ উঠছে”আর জায়গা নাই”। ভিতরে”আরে কোতায় বসচ?”

“আমার বুচি? আমার বুচিকে দাও”, রবে মহা শোরগোল বেধেছে। এরই মধ্যে গাড়ি চলতে শুরু করতেই দুইজন ফিরিওলা সেকেন্ড ক্লাসের একদিকের দরজা খোলা পেয়েই লাফিয়ে উঠে ধপাস করে দরজা আটকে”হরকরা চাই মশাই! হরকরা সার, হরকরা”, “ডেলিনুস সার! ডেলিনুস” বলে পত্রিকা বেচতে শুরু করলে। অন্যজন নেচে নেচে গান গেয়ে ভিক্ষা করতে লাগল। গানের গলাটি ভারি মিষ্টি।

হৃদয়মাঝে কল আছে
নিচে কলের যোগ রয়েছে
চার দিকি চার ডাল গেছে মানুষ
নাশায় নাশায় পবন বইতেছে

কামরায় সব মিলিয়ে চারজন। উপরের বাঙ্কে এক কাবুলি উঠেই পিছন ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিচে সোনার রিমওয়ালা চশমা, সরু ছাঁটা গোঁফ আর সাহেবি পোশাক পরা এক যুবক জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বার্ডস-আই সিগারেট ফুঁকছিল। খানিক গান শুনেই ‘ডিসগাস্টিং’ বলে এমন হাতঝাড়া দিলে, বেচারি কোনওমতে পালিয়ে বাঁচল। তারিণী একখানা সম্বাদ কৌমুদী কিনল আর সেই যুবক একটা স্টেটসম্যান মুখের সামনে ঝুলিয়ে বসল। শুধু পত্রিকার ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যেই সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছিল।

এদিকে গড় গড়, খড় খড়, ঝর ঝর, ঢং ঢং রবে ট্রেন ব্যারাকপুর, নৈহাটি জংশন, কাঁচরাপাড়া, রানাঘাট জংশন, দর্শনা, চুয়াডাঙা, পোড়াদহ জংশন পেরোতে লাগল। প্রতি স্টেশনেই হাঁকডাক, হাঁসফাঁস, হন হন, হট হট। তারিণীর বউটির জীবনে এই প্রথম রেলযাত্রা। সে অবাক বিস্ময়ে জানলা দিয়ে গাড়ির ডানে বামে কত মাঠ ঘাট, বন জঙ্গল, নদী নালা, গ্রাম শহর, মন্দির মসজিদ, কুটির ইমারত দুচোখ ভরে দেখতে লাগল। তারিণী বুঝল যে শোকের বাষ্প তার স্ত্রীর হৃদয়ে জমা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে।

দামুকদরিয়া ঘাটে পৌঁছোবার ঠিক আগে সামনের যুবক, যেন তারিণীর পিছনের জানলাকেই প্রশ্ন করছে, এমনভাবে জিজ্ঞেস করলে”গোয়িং ফার?” আর তারপরেই যেন নিজের ভুল বুঝে বললে, “বলি যাচ্ছেন কোথায়?”

তারিণী একটু হেসে জবাব দিলে, “দার্জিলিং।”

“প্রথমবার?”

“আজ্ঞে।’

“সেটাই মনে হচ্ছিল। তা বায়ু পরিবর্তন? প্লেগের ভয়? নাকি হানিমুন?” বলেই ফিচ করে যে হাসিটি দিল তাতে যে একটা অসভ্য নির্লজ্জ ভাব ছিল, তা বুঝতে তারিণীর বেগ পেতে হল না।

“ওই একরকম।” তারিণীর বিরক্তি বাড়ছিল।

“গিয়ে কোথায় থাকা হবে? এলগিন হোটেলে?”

তারিণী কথার শেষটুকু ধরতে পারল। কোচবিহারের মহারাজার এই বিলাসবহুল প্রাসাদটি বছর কয়েক আগে ইংরেজ বাহাদুর লিজ নিয়েছেন তাঁদের বড়ো বড়ো অভিজাত আর উঁচুতলার অফিসারদের জন্য। নেটিভদের এই হোটেলে থাকা দূরস্থান, ঢোকাই নিষিদ্ধ। তারিণী তবু গায়ে না মেখে বলল, “আজ্ঞে না। বন্ধুর বন্ধুর বাড়ি আছে ওখানে। সেখানেই ঠাঁই নেব।”

“সমস্যা হলে আমায় বলতে পারেন। মাথা গোঁজার বন্দোবস্ত করে দিতে পারি। আমি গ্লেনডেল টি এস্টেটের জুনিয়র ম্যানেজার, বুঝলেন কিনা। জর্জ উইলিয়ামসন সাহেবের চা-বাগান। নাম শুনেছেন তো?”

তারিণী পাশাপাশি মাথা নাড়ল। শোনেনি।

এক অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল যুবকের মুখে।”মশাইয়ের কী করা হয়?”

“আজ্ঞে তেমন কিছু না।”

“আরে কিছু তো করেন। বিয়ে যখন করেছেন, নিশ্চয়ই সংসার চালাবেন ভেবেই করেছেন।”

“বাঁধা কোনও কাজ নেই। যখন যেমন যা কাজ আসে, করি।

“মশাইয়ের লেখাপড়া?”

“আজ্ঞে ইন্টার পাশ করেছি।”

যুবকটি ঝড়াক করে চামড়ার হাতব্যাগ খুলে একটা কার্ড বার করে বলল, “এটা রাখতে পারো। আমাদের চা বাগানের কুলি কামিনদের খাটানোর জন্য ওভারসিয়ার লাগে মাঝে মাঝেই। যদি অ্যাপ্লাই করো, আমি সায়েবকে বলে কয়ে তোমার একটা ব্যবস্থা করতে পারি।”

আপনি থেকে তুমিতে নামতে যুবকের এক মুহূর্ত লাগল না। হাবেভাবে মনে হয় সে যেন এখনই তারিণীর বড়োসাহেব হয়ে বসেছে।

“আমার নাম কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য। ওখানে সবাই ভট্টবাবু বললেই একডাকে চিনবে। ভেবে দেখো, হাতে সময় আছে। চাই কি, দার্জিলিং থেকে আর কলকাতায় ফিরলেই না। আমার চা বাগানে এসে কাজে জুতে গেলে।”

এই গোটা আলোচনা কতক্ষণ এভাবে চলত জানা নেই। কিন্তু দামুদরিয়া স্টেশনে এসে গাড়ি থামতেই যুবক, “এই রে! ঘাটে পৌঁছে গেছি!” বলে সাততাড়াতাড়ি জিনিসপত্র গুছিয়ে তড়াক করে ট্রেন থেকে নেমে গেল। তারিণীকে প্রিয়নাথ আগেই রাস্তার কথা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এই দামুদরিয়া ঘাটেই দার্জিলিং মেলের ব্রডগেজ যাত্রা শেষ। এবার পদ্মা নদী পেরিয়ে ওপারে সাঁড়াঘাট। ওপারেও এক দার্জিলিং মেল অপেক্ষা করছে। তবে সে ট্রেন মিটারগেজের। পদ্মার দু-পারে দরমার বেড়ার হোটেল। ভেসে আসছে ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ। এখানে সারা বছর ইলিশ মেলে। অন্যদিকে রান্না হচ্ছে দেশি মুরগির গরগরে লাল ঝোল। তারিণী সব মালপত্র লাগেজবাবুর কাছে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে খেতে ঢুকল এক হোটেলে। গরম সাদা ভাতের সঙ্গে কালোজিরে ভাসতে থাকা ইলিশ মাছের ঝোল। সঙ্গে ফিনফিনে করে কাটা দু-এক টুকরো আলু। পাশে মিষ্টি কুমড়োর সরু খণ্ড আর কাঁঠালের বীজ ভাজা। খেতে খেতেই আড়চোখে ভট্টবাবুকে ঘাটের এক কোণে দেখতে পেল তারিণী। ঘাটের একধারে দুটো মশাল গোঁজা। তার পাশে দাঁড়িয়ে বেশ উত্তেজিতভাবে একজনের সঙ্গে কথা বলছে। এই দ্বিতীয় লোকটি চেহারায় বাঙালি নয়। এর খাঁদা নাক আর বাঁকা চোখ দেখে সহজেই গোর্খা বা নেপালি বলে অনুমান করা যায়। ঘাটের ধারে হাত ধুতে গিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথাও কানে এল তারিণীর। এ ভাষা সে আগে কোনও দিন শোনেনি। দুজনেই সেই অবোধ্য ভাষায় তর্ক চালাচ্ছে। ভট্টবাবুর গলা চড়ছে। গোর্খা লোকটি বারবার বোঝানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে। আচমকা হোটেল মালিক হেঁকে উঠল, “স্টিমারে হুইচেল দিছে কত্তা। হক্কলে ছুটেন।” কেউ সদ্য খেতে বসেছে। কেউ আধখাওয়া। কিছু লোক সেই শুনেই সাততাড়াতাড়ি পয়সা মিটিয়ে ছুটল স্টিমারপানে। মাখন খাওয়া থামিয়ে সভয়ে তারিণীর দিকে তাকিয়ে দেখল, সে এসবে ভ্রূক্ষেপ না করে মহানন্দে ইলিশের কাঁটা চিবুতে চিবুতে আরও একবার ভাত ঘুরিয়ে দিয়ে যেতে বলল। পাতে যতক্ষণ মাছ আছে, ভাত ফ্রি।

মাখনের দিকে চেয়ে তার উদ্‌বেগের কারণ বুঝল তারিণী। একগাল হেসে বলল, “কি গো? ভয় করছে যে স্টিমার আমাদের রেখেই ছেড়ে দেবে? ও কিছু না। সব মিছে কথা। ওই দ্যাখো ও টেবিলে জনা পাঁচেক নিশ্চিন্তে বসে খাচ্ছে। ওরা সব আমাদের ট্রেনেই এয়েছেন। আনাড়ি যাত্রীরা পাছে বেশি খেয়ে ফেলে, তাই তাদের ঠকাতে মালিক এমন বলছে। তুমি নিশ্চিন্তে খাও।”

.

স্টিমার ভোঁ দিতে দিতে আরও আধাঘণ্টা। ওঠার সময় মহা হাঙ্গামা। ছোটো স্টিমারে জিনিসপত্র, লোকজন, এমনকী হাঁস মুরগি, ছাগল ইত্যাদি নিয়েও উঠে গেছে অনেকে। ফলে স্থান সংকুলান হওয়া ভার। চারিদিকে শুধু ডাকাডাকি আর হাঁকাহাঁকি। রাত্রি দশটা। নদী পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোটো এক রেলগাড়ির সেকেন্ড ক্লাসে উঠল তারিণীরা। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ মিটারগেজ ট্রেন ছাড়ল। গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগে প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে কামরায় ঢুকেই ভট্টবাবু সোজা বাঙ্কে উঠে শুয়ে পড়লেন। তারিণীদের দিকে দৃকপাতও করলেন না। তারিণীরাও শোবার উদ্যোগ করলে। মাখনলতাকে বাঙ্কে তুলে দিয়ে তারিণী নিচের বেঞ্চে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবতে লাগল। নিশির ডাকের মতো, প্রেমিকার অমোঘ ডাকের মতো, পরপারে ফেরার ডাকের মতো ঘুম এসে জড়িয়ে ধরল এই নবদম্পতিকে। তাদের অজান্তেই একে একে পেরিয়ে গেল নাটোর, সান্তাহার, হিলি, পার্বতীপুর, নীলফামারি, হলদিবাড়ি, জলপাইগুড়ি। সকালে ঘুম ভাঙতেই তারিণী দেখল গাড়ি শিলিগুড়ি স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে আবার গাড়ি বদলাতে হবে।

এখান থেকে দার্জিলিং যে রেলগাড়ি যায়, সেগুলো ছোটো ছোটো ট্রামকারের মতো। ভালো করে বসবার সুবিধে নেই। বাক্সপ্যাঁটরা থাকলে আরও মুশকিল। জানলায় কাঠের পাল্লাও নেই। নেহাত বৃষ্টিবাদলা হলে তা থেকে রক্ষা পাবার জন্য একটা পর্দা কোনওমতে টাঙানো। কিছু দূরেই একটা কাঠের আসনে ভট্টবাবু বসে। দুই ভুরু কুঞ্চিত। মুখ রাগে থমথম করছে। তারিণীর সঙ্গে দুই একবার চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলেন।

এদিকে সুখনা স্টেশন অবধি সমভূমিতে যাবার পর ট্রেন যেন স্বর্গের উদ্দেশে রওনা হল। ইংরেজ বাহাদুরের ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কী অবাক করা কৌশল, মনে মনে ভাবল তারিণী। ছোটো একখানা ইঞ্জিন বীরদর্পে গাড়িগুলোকে নিয়ে এঁকে-বেঁকে উপরের দিকে উঠছে। যেন পিঁপড়ের সারি। হোল্ডঅল খুলে শ্রী হরিমোহন সান্যালের ‘দারজিলিঙ্গের ইতিহাস’ বইখানি খুলে পড়তে শুরু করল তারিণী। বইটি তার প্রয়াত বন্ধু শৈলচরণের কোনও এক আত্মীয়ের লেখা। তারিণীর কাছেই ছিল। এতদিন পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। পড়তে পড়তেই সে দেখল সমতল ক্রমে ছোটো হয়ে আসছে। নিচের সবুজ খেত ফেলে দুইদিকে পাহাড়ি ঝোরা, ফার্নের বন, উঁচু উঁচু নাম না জানা গাছ, বিচিত্র লতাপাতা, বাড়ি, পথ, বাগান পেরিয়ে পাহাড়ের বুকের উপর লোহার পথ বেয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। আচমকা স্ত্রীর মুখে “ওই দেখুন দেখুন” শুনে বাইরে তাকিয়ে দেখল একপাল বাঁদর গাছে গাছে ট্রেনটিকে প্রায় ধাওয়া করে চলেছে। মাখনলতা আগে কোনও দিন জঙ্গলের বাইরে বানর দেখেনি। তাই এই সাময়িক উত্তেজনা।

তারিণী নিজেও যেন সব ভুলে এই প্রকৃতির মধ্যে ডুবে গেল। গাড়ি এক-একবার বাঁক নিচ্ছে, আর প্রতি বাঁকে নতুন নতুন দৃশ্যপট উন্মুক্ত হচ্ছে।”এই দ্যাখো এই পথ নিয়ে সান্যালবাবু কী বলছেন”, বলে তারিণী বই থেকে জোরে জোরে পাঠ করতে শুরু করল, “আমরা বিস্ময়পূর্ণ নেত্রে খমণ্ডলচারী বেলুন-বিহারীর ন্যায় নিম্ন প্রদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিতেছি, বৃহৎ বৃক্ষের অগ্রভাগ এবং ক্ষুদ্র চা গাছের ডগা, অথবা ক্ষুদ্রতম তৃণ গুল্ম, সমস্ত সমোচ্চ বলিয়া বোধ হইতেছে। যেন পৃথিবী ছাড়াইয়া স্বর্গের তোরণদ্বারে প্রকৃতির রঙ্গভূমিতে সুকৌশলচিত্রিত নব নব দৃশ্যপট উন্মুক্ত দেখিতেছি…” বধূটি কী বুঝল কে জানে, কিন্তু তার স্বামী সব কাজ ফেলে তাকে কিছু একটা পড়ে শোনাচ্ছে, এই ভাবই তার মনকে বিহ্বল করে তুলল। সে অপলকে স্বামীর মুখপানে চেয়ে রইল।

তিনদরিয়ায় দার্জিলিং রেলওয়ের কারখানার পর গাড়ি এসে দাঁড়াল কার্শিয়াং স্টেশনে। এই স্টেশন বেশ জাঁকালো। পাহাড়ে নানা আকারের সাহেবি বাড়ি, প্ল্যাটফর্মের ধারেই নানা কিসিমের জিনিস ঠাসা দোকান। দোকানে পুতুলের মতো দেখতে গোর্খা মেয়েরা হাসিমুখে বসে ট্রেনযাত্রীদের”কাম স্যার! কাম বাবু” বলে ডাকছে। ট্রেন এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না বলে তারিণীরা আর নামল না, যদিও বধূটির ইচ্ছে ছিল ষোলো আনা। ঠান্ডা বাড়ছে। মাখনলতা বেতের ঝুড়ি খুলে তারিণীকে একটা পশমের সোয়েটার আর খসখসে বাঁদুরে টুপি দিয়ে নিজে একটা আলোয়ান জড়িয়ে বসল। বাঁদুরে টুপি পরার ইচ্ছে তারিণীর বিশেষ ছিল না।”এটা বরং থাক”, বলতেই মাখন এমন এক ভ্রূভঙ্গি করল, তাতে তারিণী আর কথা না বাড়িয়ে টুপি পরে গম্ভীর মুখে বইতে মন দিল।

এর আধা মাইল পরেই ক্ল্যারেন্ডন হোটেল। এখানে কোনও স্টেশন নেই বটে, তবে সব ট্রেন থামে। সাহেবরা এখানে নেমে বেশ আহারাদি করেন। কিন্তু প্রায় প্রতিটা খাবারই বেশ সন্দেহজনক চেহারার। কোনটা নিষিদ্ধ আর কোনটা নয়, সেই দোনোমনায় শেষ পর্যও তারিণী শক্ত পুরি আর আলুভাজা কিনে নিয়ে এল। এবার গাড়ি ছাড়ার পর জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ল। কে বলবে চব্বিশ ঘণ্টা আগেও গরমে প্রাণ যায় যায়। চারিদিক যেন আপনা থেকেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোনও সাড়া নেই। শুধু ইঞ্জিনখানা গর্জন করে চলেছে, আর তার কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ায় ঢেকে আছে চারদিক। আকাশে মেঘ জমেছে। দূরে ধূসর পর্বতশ্রেণি আর নেমে আসা মেঘের দল। সামনের রাস্তা ধীরে ধীরে কুয়াশায় ঢাকছে। আর এরই মধ্যে দুপুর আড়াইটে নাগাদ গাড়ি ঘুম স্টেশনে পৌঁছাল

ঘুমে গাড়ি থামতেই যে ঘটনাটা ঘটল, তার জন্য তারিণী কেন, কেউই প্রস্তুত ছিল না। গাড়ির দরজা খোলা মাত্র চার-পাঁচজন গোর্খা হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে ভট্টবাবুকে প্রায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে গাড়ির বাইরে বার করে আনল। ভট্টবাবু বিজাতীয় ভাষায় কী সব যেন বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। গোর্খারা আকারে ছোটো হলেও বলবান। তারা ভট্টবাবুকে ঘুম স্টেশনের মাটিতে ফেলে কিল চড় ঘুসি লাথি মেরে প্রায় হতচেতন করে ফেলল। সবার মতো তারিণীও জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পেল, ভট্টবাবুকে একটা ঘোড়ায় টানা ব্রুহ্যামে চাপানো হচ্ছে। আরও কিছু দেখার আগেই সিটি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।

গাড়ির ভিতরে সবাই চুপ। যারা কথা বলছে, তারাও ফিসফিসিয়ে। এই অদ্ভুত প্রাকৃতিক পরিবেশ মাখনলতার মনে অনেকদিন বাদে যে আনন্দের সঞ্চার করছিল, তা সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে সে আবার আগের মতো সংকুচিত হয়ে গাড়ির এক কোণে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। তারিণী নিজেও হতবাক। আর এই ভয়াবহ ঘটনার অভিঘাত কাটতে না কাটতে ট্রেন নিচে নেমে অবশেষে দার্জিলিং স্টেশনে এসে থামল। সবাই নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নেমে যে যার মতো গন্তব্যে পাড়ি দিতে শুরু করল।

স্ত্রীকে স্টেশনে নামিয়ে নিজে কামরা থেকে লটবহর সমেত নামার ঠিক আগে অদূরে সিটের তলায় কী একটা পড়ে থাকতে দেখে তারিণী কুড়িয়ে নিল সেটা। ভট্টবাবুর চামড়ার হাতব্যাগ। উপরে পিতলের তবকে তার নামের আদ্যক্ষর খোদাই করা। এখান থেকেই কার্ডটা বার করে সে তারিণীর হাতে দিয়েছিল।