পঞ্চম অধ্যায়—আত্মহত্যা? না খুন??
নলিনীকান্তের বাড়ি থেকে ‘ক্যামেলিয়া’ খুব বেশি দূর না। গাড়োয়ানের দুইদিকে দুটো মশাল জ্বলছে পথ দেখানোর জন্য। তবু পাহাড়ি পথের অন্ধকারে ঘোড়া জোরে ছোটানো মুশকিল। মিনিট পনেরো বাদে ক্যামেলিয়ায় যখন তাঁরা পৌঁছোলেন, ততক্ষণে পাহাড়ে অন্ধকার নেমে এসেছে পুরোদমে। বনানীর মাঝে ক্ষীণ তারার মতো কিছু আলোর বিন্দু। দূরের কোনও বাড়িতে আলো জ্বলছে হয়তো। গেটের একেবারে সামনে চার-পাঁচজন গোর্খা নারী-পুরুষ জটলা করে কী যেন আলোচনা করছিল। পুলিশের গাড়ি দেখে শশব্যস্ত হয়ে সরে দাঁড়াল। এক নেপালি চাকর এসে নলিনীবাবুকে ফিসফিস করে কিছু বলতেই তারিণী দেখল তিনি বিরক্তিতে মাথা নাড়ছেন। শেষে বেশ ধমকের সুরেই বললেন, “আমি ওসব শুনতে চাই না। যার বউ মরে গেল, সে প্ল্যান্টার্স ক্লাবে বসে মদ খাবে, এ আমি হতে দেব না। তুমি লোক পাঠিয়ে তাকে আনার ব্যবস্থা করো।”
বাইরে ঠান্ডা বাড়ছে। মার্চ মাসের দার্জিলিং ডিসেম্বরের কলকাতা অপেক্ষা অনেক বেশি শীতল, তা তারিণী আন্দাজ করেছিল, কিন্তু এতটা ঠান্ডা হবে সে ভেবে উঠতে পারেনি। তার পরনের কোট আর সোয়েটার ভেদ করে এই হাওয়া যেন হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নলিনীবাবুর পিছন পিছন ঘরে ঢুকে একটু যেন আরাম হল। গড়পড়তা ইউরোপীয়দের ঘরের মতোই এই বাড়িটিও সাজানো। ঢুকতেই বিরাট ড্রয়িংরুম, একদিকে আলমারি ভর্তি লাল চামড়ায় মোড়া বই সাজানো। দেখেই বোঝা যায় এতে কারও হাত পড়ে না। অন্য কাচের আলমারিতে বিলিতি পোর্সেলিনের সাহেব, মেম আর পরির পুতুল। অন্য সময় হলে তারিণী হয়তো এসব আরও খুঁটিয়ে দেখত, কিন্তু নলিনীবাবু তাকে প্রায় তাড়িয়ে নিয়ে চললেন দোতলায়, যেখানে মেমসাহেবের দেহ পাওয়া গেছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চাকরকে শুধু একটাই প্রশ্ন করলেন, “ডাক্তার হান্টারকে খবর দিয়েছ?”
“উনি তো অনেক আগেই এসেছেন। উপরে আছেন।”
নিচ থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। উঠতেই একটা ঘরের দরজা প্রায় হাট করে খোলা। ভিতর থেকে আসা সামান্য আলোতে কিছু বোঝা দায়। তবু না বলে দিলেও বোঝা যায়, এই ঘরেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এক নজরে তারিণী ঘরের ভিতর তাকিয়ে শুধু ধবধবে সাদা একটা গাউন দেখতে পেল। দরজার ঠিক পাশেই ডাক্তার হান্টার এক নেপালি মেয়ের নাড়ি ধরে পরীক্ষা করছিলেন। মেয়েটি দৃশ্যতই ঠকঠক করে কাঁপছে। ডাক্তার হান্টার বয়সে প্রায় বৃদ্ধ, চুলদাড়িতে কাঁচা অপেক্ষা পাকার পরিমাণই অধিক। মুখে অদ্ভুত এক শাস্ত ভাব। নেপালিতে দু স্বরে মেয়েটিকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছিলেন। নলিনীবাবুদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।
“এসে গেছেন তবে? আপনাদেরই অপেক্ষা করছিলাম। আসুন, ভিতরে যাওয়া যাক। তবে যতদূর যা বুঝছি, এই কেসের তেমন মেরিট নেই। ওপেন অ্যান্ড শার্ট কেস।”
“কেন?”
“ভিতরে চলুন। নিজেই বুঝবেন।’
“ওর কী হয়েছে?” নেপালি মেয়েটিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন নলিনীবাবু
“ডেডবডি প্রথম ও-ই ডিসকভার করেছিল। বুঝতেই পারছেন ভয়ানক আপসেট। একটা ট্রমা মতো হয়েছে। আমি ওকে কয়েকদিনের রেস্ট আর একটা মাইল্ড ট্র্যাঙ্কুইলাইজার সাজেস্ট করলাম।” বলতে বলতেই ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে হান্টার থমকে দাঁড়ালেন। তারিণীর দিকে চেয়ে বললেন, “উনি? ওকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।”
মৃদু হেসে নলিনী দারোগা তারিণীর পিঠে হাত রেখে বললেন, “ওহো! আমারই দোষ। এর নাম তারিণীচরণ রায়। কলকাতায় বাড়ি। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। বড়ো বড়ো মামলা সলভ করেছেন। আমার এখানে আজই এসেছেন সস্ত্রীক বেড়াতে। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস দেখুন, আজই এমন ঘটনা। তাই ওঁকেও নিয়ে এলাম।”
“প্রাইভেট ডিটেকটিভ!!” ডাক্তার হান্টারের ভুরু দুটো আপনা থেকেই উপরে উঠে গেল, “তা বেশ। তা বেশ”, বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন তারিণীর দিকে, “গ্ল্যাড টু মিট ইউ।”
ঘরের ভিতরে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা যেন বাসা বেঁধে রয়েছে। তারিণী দরজা ঠেলে পুরো খুলে দেবার চেষ্টা করল। পারল না। দরজার ঠিক বাঁ পাশেই একটা ভারী সোফা দরজা পুরো খুলতে দিচ্ছে না। ঘরে ঢুকলেই যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল বিরাট এক গ্র্যান্ড পিয়ানো। পিয়ানোর সামনে দুটো চেয়ার পাতা। ডানদিকে ফায়ারপ্লেসে কাঠ সাজানো। কিন্তু জ্বালানো হয়নি। ঘরে চিনচিনে একটা ঠান্ডা। দরজার ঠিক উলটো দিকে পাশাপাশি দুটো বো-উইন্ডো। দিনের বেলা নিশ্চয়ই এখান থেকে দার্জিলিং পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু এখন সে দুটো পর্দায় ঢাকা। জানলার ঠিক সামনেই একটা খাট। সিঙ্গল বেড। উপরের আংটা থেকে নেমে আসা মশারি এখন গুটিয়ে রাখা হয়েছে। খাটের মাথার কাছে হাত ধোবার বেসিন, পায়ের কাছে কাঠের আলমারি; সম্ভবত জামাকাপড় রাখার জন্য। একপাশে ড্রেসিং টেবিল আর একখানি চেয়ার। তারিণী মনে মনে ঘরের একটা নকশা এঁকে নিল।
তবে যাকে দেখতে এই বাড়িতে তারা এসেছে, সে পড়ে আছে ঘরের ঠিক মাঝখানটাতে। পিঠের নিচ থেকে সারা দেহ রক্তে ভিজে গেছে। সেই রক্ত জমে এখন কালো বর্ণ ধারণ করেছে। চোখ বন্ধ। ডাক্তার একটা ঢাকা লণ্ঠন নিয়ে মৃতদেহের ঠিক উপরে ধরতেই তারিণী বুঝতে পারল, কেন ডাক্তার একে ওপেন অ্যান্ড শাট কেস বললেন। মেমসাহেবের ডান হাতের কবজির কাছে একটা গভীর ক্ষত থেকে দীর্ঘ ধারায় রক্ত বেরিয়ে এসে এখন শুকনো হয়ে গেছে। বাম হাত খোলা। আর সেই খোলা হাতের করতলে রক্তে মাখামাখি হাতির দাঁতের হাতলের ধারালো ছুরিটাকে কেতাবি ভাষায় বলে স্লাইজার। চামড়া মাংস চিরে ফেলতে এই ছুরির জুড়ি নেই।
নলিনীবাবুর কপালে ভ্রূকুটি, “মেমসাহেব তবে আত্মহত্যা করলেন? অস্বাভাবিক নয়। সেই কার্মির অভিশাপ। একজন রোগে, একজন দুর্ঘটনায়, আর একজন আত্মহত্যা। এ তো হবার ছিলই। কিন্তু…” বলেই খুব ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন—
“A violet in the youth of primy nature,
Forward, not permanent, sweet, not lasting,
The perfume and suppliance of a minute; no more”
“আজ্ঞে কী বললেন?” তারিণী বুঝতে পারে না।
“মেমসাহেবের নাম ওফেলিয়া। শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটকের নায়িকা। তার মৃত্যুও এমনই এক পরম শান্তিতে। নিজের ইচ্ছেয়। তবে সে মারা গেছিল
জলে ডুবে আর এই মেয়ে নিজের রক্তের সাগরে। শান্ত, যেন ঘুমিয়ে আছে। এখনই জেগে উঠবে…
“আজ্ঞে সেটাই তো সমস্যা।” তারিণী অনেকক্ষণ ধরে বলব বলব করে বলেই ফেলল।
কথার মাঝে বাধা পড়ায় ঈষৎ বিরক্ত হয়ে নলিনীবাবু বললেন, “তার মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?”
হাত জোড় করে তারিণী বললে, “আজ্ঞে আমি মুখ্যু মানুষ। কাদের সব কাব্যি আওড়ালেন, তাঁদের নাম পর্যন্ত শুনিনি, পড়া তো দূরস্থান। তবে একটা কথা বলি দারোগাবাবু, এতদিনে বেশ কিছু আত্মহত্যার কেস দেখার সুযোগ পেয়েছি। মানুষ আসলে বাঁচতে চায়। তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই পথে পা বাড়ালেও একেবারে শেষ মুহূর্তে মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না। ছটফট করে। এ কথা তো আপনি আমার চেয়ে ভালো জানেন।”
“সে তো বটেই। কিন্তু তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ বলো তো?”
“ধরুন, কেউ একজন হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করতে চাইল। তবে মারা যাবার আগে মৃত্যুযন্ত্রণায় সে তো ছটফট করবে, হয়তো শেষবারের মতো বাঁচতেও চাইবে। কিন্তু মেমসাহেবের গোটা দেহ একেবারে স্থির। নিথর। যেন তিনি বুঝতেই পারেননি তিনি মরতে চলেছেন। আর এটা তখনই সম্ভব যখন… আরেহ, এটা কী?”
নলিনীর হাত থেকে লণ্ঠনটা প্রায় ছিনিয়েই নিল তারিণী। “এই দেখুন। আমি আগেই বলেছিলাম।”
দারোগাবাবু আর ডাক্তার হান্টার একসঙ্গে ঝুঁকে দেখলেন, ওফেলিয়ার মাথায় ডান চোখের ঠিক ওপরে নীলচে বেগুনি একটা কালশিটের দাগ। তারিণী খুব সত্তর্পণে গোটা দেহ পরীক্ষা করতে লাগল। ডান হাতের কনুইয়ের কাছে এসে আবার থেমে গেল সে। ছোটো ছোটো একাধিক সমান্তরাল দাগ। তবে নতুন না। পুরোনো। ডাক্তার হান্টার সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “আমি এগুলোর কথা জানি। এর আগে বেশ কয়েকবার ওফেলিয়া শিরা কেটে মরতে চেয়েছিল। পারেনি। কিন্তু এবার…” আবেগে ডাক্তারের গলা বুজে এল।
তারিণীর বারবার মনে হচ্ছিল কোথাও একটা গলদ আছে। দেহ ছেড়ে এবার সে গোটা ঘরে ঘুরতে লাগল। চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি শিকারি বেড়ালের মতো। সে বুঝতে পারছে কোথাও একটা বিরাট ভুল হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই সেটা ধরা দিচ্ছে না। বো-জানলাগুলো পর্দায় ঢাকা। পর্দা সরিয়ে দেখল প্রতিটা জানলা ভিতর থেকে স্ক্রু দিয়ে আটকানো। ফলে ঢোকার বা বেরোবার রাস্তা একটাই। এই দরজা। ঘোড়ার গাড়ি চেপে আসার পথে সে শুনেছে, দরজা ভেঙে নাকি নেপালি চাকররা ঘরে ঢুকে মালকিনকে এই অবস্থায় দেখতে পায়। তাদেরই কথামতো ঘরে এর মধ্যে আর কেউ ঢোকেনি। আশেপাশের সব প্রমাণ একদিকেই নির্দেশ করছে। ওফেলিয়া উইলিয়ামসন ঘরের দরজা বন্ধ করে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি আগেও এই চেষ্টা করেছিলেন। সফল হননি। এবার হলেন। এর চেয়ে সংগত কারণ আর কীই বা থাকতে পারে! কিন্তু তারিণীকে কিছুতেই স্বস্তি দিচ্ছে না মাথার ওই কালশিটে, মারা যাবার ঠিক আগে মেমসাহেবের অতি নিষ্ক্রিয়তা। নিজেকে সন্তুষ্ট করতে আরও কিছু প্রমাণ দরকার। এটুকুতে কিচ্ছু বলা যায় না। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তারিণী ড্রসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। খানিক তাকিয়ে রইল আয়নার দিকে। তারপরেই তার চোখ পড়ল টেবিলে রাখা অতি অকিঞ্চিৎকর এক বস্তুর দিকে।
মৃতদেহকে কীভাবে সৎকার করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন বাকি দুইজন। তারিণীর “দারোগাবাবু-উ-উ” চিৎকারে চমকে উঠলেন তাঁরা। তাকিয়ে দেখলেন, জ্বোরো রোগীর মতো কাঁপছে তারিণী। তার দুই চোখ চকচক করছে। “দারোগাবাবু, যা খুঁজছিলাম পেয়ে গেছি। এখন আমি নিশ্চিত্ত, মেমসাহেব আত্মহত্যা করেননি। এ খুন। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুন। এই দেখুন প্রমাণ”, বলে তারিণী তার দুই হাতে দুটো ছোট্ট জিনিস তুলে ধরল। নলিনীকান্ত অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, তারিণীর এক হাতে একটা দেশলাই বাক্স, অন্য হাতে একটা দেশলাই কাঠি, যার ডগার বারুদ এখনও অক্ষত আছে।
