আত্মজীবনীর অংশ-৫
এটা সম্ভবত সত্যিই হবে, বাইরে যতই নিজেকে আত্মনিষ্ঠুর দেখিয়ে থাকি না কেন, বা রাফ অ্যান্ড টাফ সাহিত্যকর্মী ইতিহাসকর্মী, প্রকৃত পরিস্থিতি হচ্ছে আমার ভিতরে গোপনে বাসা বেঁধে আছে রোমান্টিসিজম। আমি যখন একটা উপন্যাস লিখি, তখন আমার জীবনেই সংঘটিত হতে থাকে আর-একটি উপন্যাস। সামাজিক ঘটনা নিয়ে যখন ক্ষুব্ধ হই, প্রতিবাদ আমাকে নিয়ে আসে প্রিয়তম ‘রক্তকরবী’র কাছে, প্রবল উত্তেজনায় একটুকরো চিত্রনাট্য লিখে ফেলি কোথাও। নিজের মতোন একরকম ভেবে, তার পেছনে ছুটে চলাই আমার রীতি। তখন মনে হতে থাকে যত দূর ছুটব, তারপরে জুটে যাবে নিশ্চিত আকাঙিক্ষত। কিন্তু কখনওই অনুমান সত্যি হয় না। তখন ভেঙে পড়ার পালা। হতাশ হবার পালা। একটা জিনিস ভুলে যাই, জীবন তার মতো করে প্রকাশিত হয়; আমরা কী আশা করছি, অনুমান করছি, তার সঙ্গে পূর্ণ, বিস্তৃত, অসীম জীবনের যোগ কোথায়? আমরা কণিকামাত্র জানি। ফলত, আমাদের দর্শনগুলি অনুমান হিসাবেও আংশিক। সামাজিক ব্যাখ্যাগুলিও একটি বিশেষ কোণ থেকে উদ্ভূত। কবিতাতে মিলন সম্ভব, কিন্তু জীবনের ভূমিতে তা ধোপে টিকবে না। কারণ বিরুদ্ধ মত উঠে আসবে একাধিক। মানুষ মস্তিষ্কপ্রধান বলে তার সংকট হয়েছে অন্যরকম। সে প্রতি মুহূর্তে নিজের পক্ষে বিশ্লেষণ করে চলেছে, বেঁচে থাকবার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাই মানুষকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকে। কারণ মৃত্যুর হাত থেকে কোনও ক্রমে নিস্তার নেই, মৃত্যুজ্ঞান মানুষকে অস্থির করেছে প্রথমাবধি, প্রাণের নিয়মে সে প্রকাশিত হতে, ঝরে যেতে চায়নি, সে সিস্টেমটাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। আর, এ যাবৎ সফল হয়নি বলেই তার বিক্রম আছড়িয়ে পড়ছে নিজের বিরুদ্ধেই, এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে প্রত্যেক দলেরই সম্পদ এক-একটি মতবাদ।
যা হোক, রোমান্টিসিজমের কথা বলছিলাম এই কারণেই যে, সংঘর্ষে জড়িয়ে যেতে আমার ভাল লাগে, কিন্তু লড়াইয়ে আমি পটু নই, কারণ বাস্তবজ্ঞানের অভাব, ফলত পলায়ন এবং বিবেক দংশনই আমার কাছে মধুর। বাবার দলকে আমি না-বুঝেই ভালবাসতাম, পরবর্তীতে তত্ত্ব পড়ে সাম্যবাদের গন্তব্যকেই স্বপ্নসুন্দর মনে হয়েছে, আরও কিছু পরে বাবার দল শাসক হলে প্রত্যাশাভঙ্গের বেদনায় তার বিচ্যুতিগুলোকেই বড় করে দেখেছি, আক্রমণ করেছি, বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্বে বাড়ি থেকে পালিয়েছি; এক্ষেত্রে সমাধান আমার অজানা এবং সম্মুখসমরে আমি ভীত। আরতির ব্যাপারটাও তাই। আরতির জীবন আমাকে বিস্মিত করেছে, আমি তার মুক্তি চেয়েছি, তার জীবনে অল্পবিস্তর নাকও গলিয়েছি, কিন্তু সঠিক ভূমিকা কি নিতে পেরেছি যাতে আরতির জীবনবদল ঘটে? এক্ষেত্রে তা-হলে আমি কী? নিরাপদ দূরত্বে থেকে বন্ধুদের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ছল করেছি হয়তো-বা। তাতে আমার ইগো পুষ্ট হয়েছে, আরতির তেমন উপকার হয়নি। এইসব দৃষ্টান্ত থেকে বুঝতে পারছি, আমিও এক ভীরু মধ্যবিত্ত, যতই শব্দবন্ধটি গালাগালির মতন হয়ে যাক!
বাংলার যে-গ্রামটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুকাল যাবৎ অরাজক পরিস্থিতি চলছে, সেখানে ভয়ানক কাণ্ড হয়েছে। অদ্ভুত এক সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। শ্রমিক-কৃষক যে-দলটির প্রধান অবলম্বন, তারা শ্রমিক-কৃষকদের দাবির বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, কিছুতেই ক্ষমতায় না আসতে পারা বিরোধী দলগুলো প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের মদত দিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। প্রশাসন এবং বিক্ষুব্ধদের গত কয়েক মাসের পারস্পরিক হুমকি প্রদান চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। ব্যাপক গোলাগুলিতে মানুষ রক্তাক্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা কম নয়। আহত প্রচুর। দুই দিক থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীরা বলছে, “নিরীহ নারী ও শিশুর উপর পুলিশ গুলি চালাল কেন?” সরকার বলছে, “এই গ্রামে বেশ কিছুকাল আইনের শাসন ছিল না। এটা মেনে নেওয়া যায়? পুলিশকে গ্রামে ঢুকতে বাধা দিতে যে-মিছিল বার হল, তার সামনের ভাগে নারী ও শিশু রাখার সিদ্ধান্ত নিল কোন্ চক্রান্তকারী? তারাই মূল অপরাধী।” কাজিয়া চলছে। ওই দিকে টিভির প্রতিটি চ্যানেলে পরিবেশিত হচ্ছে রক্তাক্ত দরিদ্র কৃষক, উন্মত্ত পুলিশ, মরিয়া গ্রামবাসী, লাঞ্ছিত কৃষক-বধূর কান্না। দুই পক্ষের বুদ্ধিজীবীরাই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করছেন এবং প্রশ্ন তুলছেন, কে এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য দায়ী! কেউ বলছেন, সরকারি মদতে পুষ্ট পুলিশ। কেউ বলছেন, বিরোধীদের ক্ষমতালিপ্সা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে টিভির দোকানগুলি একাধিক টিভিতে ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেল দেখাচ্ছে। ভিড় ফেটে পড়ছে। যেন বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল দেখানো হচ্ছে। ছবি দেখে মানুষ স্বাভাবিক কারণেই উত্তেজিত। এইসব দেখে আমার মনেও কী এক হতাশা চেপে বসেছিল। বাবার দলের সমালোচক আমি, কিন্তু তা ছিল আমার আর বাবার ভেতরকার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, কিন্তু রাস্তায়-রাস্তায় আপামর জনসাধারণের মুখে সরকারের বিরুদ্ধে খিস্তি, কোথাও, মনের ভিতর, একটি কষ্টের জন্মদান করছিল। রাজনৈতিক দিক থেকে ভাল প্যাঁচে পড়েছে দীর্ঘদিনের শাসক দল—এমনতরো উল্লাসে সরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালাচ্ছে বিরোধী দলগুলি, এটাও অসহ্য লাগল। প্রকৃতির নিয়মে সন্ধ্যা নামল, রাত্রি এল, বিক্ষিপ্ত মনোভাব নিয়ে ঘুরছিলাম, অকস্মাৎ রাত্রি দশটা নাগাদ অজয়ের সঙ্গে দেখা। “দাদা! দাদা!” বলে সে আমাকে থামাল। তারপর বলল, “হাসপাতালে চলুন তাড়াতাড়ি। আপনাকে খুঁজতে যাচ্ছিলাম। দেখা হয়ে গেল।”
প্রবল হতাশায় ডুবে ছিলাম। জীবনকে নিষ্ফলই মনে হচ্ছে। কোথাও কোনও কূল পাচ্ছি না। নানা মতবাদ, নানা দর্শনের হিজিবিজিতে জগতের কোনও মঙ্গল হচ্ছে না, এরকম একটি কথা আমাকে অহরহ দংশন করছে তখন। বুঝতে পারছি, বাস্তবের ধাক্কা সামলাতে পারছি না। বুঝতে পারছি, প্রকৃত প্রস্তাবে অভিমান কাউকে বাঁচাতে পারে না। কোনও ক্রমে বললাম, “কেন খুঁজছ অজয়? টাকার দরকার?”
অজয় বলল, “টাকার আর দরকার নেই।”
আনমনা হয়ে বললাম, “মানে?”
অজয় বলল, “জ্যাঠামশাই মারা গেছেন।”
প্রায় অর্ধচেতন পরিস্থিতিতে কথাটা শুনলাম। সামান্য সময়ের তফাতে শব্দটি মাথায় শব্দার্থ পৌঁছে দিল। সম্বিৎ ফিরল আমার। আওয়াজ করলাম, “অ্যাঁ?”
আর প্রবল আলোড়ন উঠল মনে। ইতিহাসের যে-প্রবাহ বাবা ধারণ করেছিল এত কাল, যে-ইতিহাসের অনুসরণ করাটাই আমার জীবনের অন্যতম কাজ, সেই ইতিহাসের অধ্যায়টি সমাপ্ত হল। এমনই সমাপতন, বাবা চলে গেল বাবার দলের চূড়ান্ত লজ্জাকর একটি দিনে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চললাম। হাসপাতালের কাছে একটি চায়ের দোকানে বসে মনে পড়ল, ১৯৯০ সাল নাগাদ আমি বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর বাবা বেশিদিন পার্টি করেনি। বিড়িশ্রমিকদের নেতা থেকে তাকে সরিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ইউনিয়নে এনেছিল পার্টি অফিস। এটা একপ্রকার প্রোমোশন। কিন্তু কেন যে তার সঙ্গে ঝামেলা বাধল জেলার নেতাদের, কেন বাবা ’৯৩ সাল নাগাদ সাসপেন্ড হল, আমার ঠিক জানা নেই। বাবার অফিসের দুই-একজনের গায়ে-পড়ে-কথাবার্তা থেকে শুনেছি, পূর্ত দপ্তরে কাজ করত বাবা, সে অফিসের সদর দপ্তরে এক বড় কর্মচারীকে ‘চোর’ বলেছিল বাবা, যে ছিল কর্মচারী ইউনিয়নের আরও বড় নেতা, ফলত বাবাকে পার্টি-বিরোধী কাজের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, দুঃখপ্রকাশ না করার জন্য পরে বহিষ্কার করা হয়। আমার ওইসব শুনে কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি। বাবার জীবন বাবা বুঝবে। আমার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব পার্টি করা-না করা নিয়ে নয়। বাবার পাল্টে যাওয়াটাই আমার প্রশ্ন। সহজ, সরল, আনন্দিত জীবনটি কীসের লোভে বিসর্জন দিয়েছিল? নেতা বা শাসক হওয়ার কারণেই তো! অথচ তত্ত্ব-অনুযায়ী, সাম্যবাদী দলে আঙুল-উঁচিয়ে কথা বলা কোনও নেতা থাকবার কথা নয়। বাবা কোনও দিনই গৃহত্যাগী আমাকে খোঁজ করেনি। আমিও বাড়ি ফিরে যাইনি। কিন্তু নির্বাসনের পর বাবার রূপান্তর হয়েছিল অন্যরকম। শ্মশানে গিয়ে তন্ত্রসাধনা শুরু হয়েছিল। গাঁজা সেবন, মদ্যপান এ সবই তার অভ্যাস হয়েছিল। ভাইয়ের সঙ্গে হাতাহাতি, মায়ের সঙ্গে কুৎসিত কলহ চলত জেনেছি। আমি সুড়ঙ্গের ভিতর লুকিয়ে থাকতাম। কোনও দিন সমাধানের জন্য আগ্রহী হইনি। তাহলে কী কী রূপ দেখলাম বাবার? দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হিসাবে আগমন, কিশোর বয়সে বিড়িশ্রমিকের জীবনযাপন, বাম পার্টির কর্মী হয়ে যাওয়া অতঃপর, দীর্ঘ সংগ্রামের পর বামদল ভোটে জিতলে ভাল জীবন পাবার আনন্দ, মাইনে বাড়লে এবং বেড়া-টালির পার্টি অফিস পাকা-বাড়িতে পরিণত হলে বাবাদের উদ্ধত হয়ে যাওয়া, গরিব মানুষের স্বার্থের বদলে পার্টি সংগঠনের ভোটমুখী স্বার্থকেই বড় করে দেখা, পুরনো নিঃস্বার্থ কর্মীদের অবদানকে মুহূর্তে ভুলে যাওয়া, পরিশেষে বহিষ্কৃত হওয়া এবং ব্রাত্য, হতাশ জীবনযাপন করতে করতে মৃত্যুবরণ করা। বাবার দলের উত্থান এবং পতনের দীর্ঘ ইতিহাসের মিল পাচ্ছি যেন হুবহু। শহরের শিক্ষিত, কৌশলী নেতৃবৃন্দ ইস্তাহার রচনা করে থাকে। তাদের জীবনে চোখ ফেললে সর্বহারার সমাজজীবন খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাম আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস লক্ষ করতে হলে বাবাদের মতো তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের জীবনের দিকেই তাকাতে হবে। জীবনের কোন অসহায়তা থেকে তারা এল, কখন হয়ে উঠল দর্পিত সমাজপতি, কখন-বা পেল নির্বাসন-দণ্ড।
বাবার মৃত্যুসংবাদ যেন একটি খোলস ফেলে যাওয়া। যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আমার স্বপ্নের ভিতর যা-ই আসুক, দীর্ঘ একটি খোলস কোথাও না কোথাও পড়ে থাকবেই, যা বারংবার চিন্তার উদ্রেক ঘটাবে। অজয়ের সঙ্গে বড় বিল্ডিংয়ের সম্মুখে গেলাম। তখন মনে হল, আমি এখানে কী করব? প্রশ্ন করলাম, “অজয়, এখন কী হবে?”
অজয় বলল, “আপনার ভাইকে খবর পাঠিয়েছি। সে আসছে।”
বললাম, “মৃতদেহ দেখতে পারব না, ভাই। আমি পালিয়ে থাকি!”
অজয় হাসল, “কী যে বলেন! আপনাকেই তো সব দায়িত্ব নিতে হবে।”
বিষম চিন্তায় পড়লাম। উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করলাম। অজয় ছুটে আসল, “দাদা, তাহলে আপনি বাড়িতে মায়ের কাছে যান। জেঠিমাকে এখনও খবর পাঠানো হয়নি।”
বাড়ির কথায় বাড়ির ছবি মনে আসল। এতদিন মাথার ভিতর প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলাম। আজ সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে গেল। দুই চোখ ভিজে যেতে লাগল আবেগে। অজয় নিশ্চিত ভাবছে, বাবার মৃত্যুতে আমি শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। সে কী করে জানবে, আমাকে কাঁদাচ্ছে সেই এক বাড়ি! যার সামনে দুটো নারকেল গাছ, পিছনে ডোবা, ডোবার পাশে কয়েকটি কদমগাছ, বর্ষায় গন্ধে ম-ম করত আমার শৈশব-কৈশোর, ইতস্তত কয়েকটি ডাহুক সন্তর্পণে ঘুরে বেড়াতে থাকে আর মানুষের পায়ের শব্দ পেলেই পালিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর আবেগ প্রশমিত হলে বুঝলাম, বাবার মৃতদেহ দেখা যেমন আমার পক্ষে অসম্ভব, তেমনই বাড়িতে মায়ের কাছে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। রুদ্ধকণ্ঠে বললাম, “অজয়, আমাকে ক্ষমা করো, আমি বাড়ি যেতে পারব না।”
অজয় কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল একটি, যা আমার পছন্দ হল। আমি কিঞ্চিৎ অবকাশ পেলাম। অজয় আমাকে জানাল, “তাহলে রাত হয়েছে। জ্যাঠামশাই হাসপাতালেই থাকুন। আমরা সকালে ওঁকে নিয়ে যাব। আপনার ভাইয়ের সঙ্গে সেই কথাই বলি। হাসপাতালেও তাই জানিয়ে আসি।”
অজয় চলে গেলে হাসপাতালের পেছনে চলে এলাম। সেই এক আমগাছের নীচে, যেখানে অন্ধকার গাঢ়তর। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলাম। মনে প্রশ্ন আসল, আমি তাহলে কে? বুঝলাম, আমি স্বপ্নহীন, আদর্শহীন, ভীরু এক সময়ের সন্তান। আয় করবার তেমন কোনও উদ্যম নেই। নগ্ন লেখালেখির সৎ সাহস নেই। রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই নির্দিষ্ট, সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে সমর্থন করতে পারি না, বাম দলকে বিশ্বাসঘাতক মনে করে থাকি, কংগ্রেস বা অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর প্রতি রয়েছে রক্তসূত্রে ঘৃণা। তাহলে কী আমার ভারতবর্ষ? কেবল দেশটিতে বাস করব, খাব, নানারকম সুবিধা চাইব, আর এইসবের বিনিময়ে দেশকে কিছুই দেব না? যে-স্থানে নিজেকে সৎ মনে করতাম, সেই জায়গাতেই নতুনতর বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে আমি অসৎ। এইবার বেঁচে থাকার জন্য আমার অজুহাত প্রয়োজন, কোনও সান্ত্বনা প্রয়োজন।
ধীরে উঠে একটা বুথের কাছে গেলাম। চূড়ান্ত হতাশার মধ্যেই ফোন করলাম আরতিকে। আরতির একটি মোবাইল আছে। আমি ওই যন্ত্র ব্যবহার করি না। কিন্তু এখনও ঘরে ফিরেছে তো আরতি? ফিরে আসারই কথা। অবশ্য তার জীবিকায় নির্দিষ্ট সময়ে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। ফোন ধরল আরতি। বললাম, “তুমি বাসায় ফিরেছ, আরতি?”
খুব ক্লান্ত স্বরে উত্তর আসল, “হ্যাঁ।”
উদ্ভ্রান্তের মতো বললাম, “আরতি…আরতি…বাবা মারা গেছে।”
নিস্পৃহ শোনাল আরতির গলা, “কখন?”
জানালাম, “একটু আগে।”
“কী করবে এখন?”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“ন্যাকামি কোরো না। সব তোমাকেই করতে হবে।”
“অজয় আছে।”
“অজয় কে? ভাই?”
“ভাইয়ের থেকেও বড়। খুব ভাল ছেলে। ওই-ই তো একমাস ধরে…”
“বুঝেছি। কিন্তু ছেলে হিসাবে তোমার তো অনেক কাজ আছে।”
“টাকা-পয়সা?”
“টাকা-পয়সা ছাড়াও।”
“মানে?”
“আরে শ্মশানে অনেক কাজ থাকে বড় ছেলের। মুখাগ্নি, চিতায় জল ঢালা, ধড়া পরা। শ্রাদ্ধ পর্যন্ত কাজ থাকে।”
“আরতি, আমি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি।”
“মাস্টার! লাফড়া কোরো না।”
ফোন ধরে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম। আমি ভাবিইনি, ওইসব বাস্তব সমস্যা সম্মুখে রয়েছে। টাকা-পয়সা কোথা থেকে জোগাড় করব, সেই দুশ্চিন্তাই শুধু মনে রয়েছিল। ভেবেছিলাম, বাকি সব অজয়ের দায়িত্ব। কোনও মতে আরতিকে ফোনে অতঃপর জানিয়েছিলাম, কাল স্থানীয় শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে বাবাকে, আজ রাত্রিতে নয়। আরতি, বিস্ময়কর আরতি, আমাকে আবেগহীন গলায় জানিয়েছিল, সে সকালের ট্রেন ধরে শ্মশানে চলে আসবে। আমি যেন বেশি চিন্তা না করি। অজয় আর আরতিই আমাকে বাঁচাল। অজয়ের কথায় ভাই সম্মত হল, আমার পরিবর্তে মুখাগ্নি-সহ যাবতীয় পারলৌকিক দায়িত্ব পালন করবে সে। আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
শ্মশানে হাজির হয়ে বসে ছিলাম আমি। মৃতদেহ বাড়িতে গেছে। শেষ-মিছিলে আমি অংশগ্রহণ করিনি। ন’টা বাজতে না বাজতেই আরতি মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে শ্মশানে এসে আমার পাশে হাজির। পুরসভার ছোট্ট অফিসঘরের পাশে বসবার জায়গায় দু’জনে পাশাপাশি অপেক্ষা করছি বাবার মৃতদেহের জন্য। যখন পাড়ার ছেলেরা অজয়ের নেতৃত্বে মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানে ঢুকল, কবি সত্যরঞ্জন মৈত্রের শেষকৃত্যের কথা মনে পড়ল। সেদিন বাবা শেষযাত্রায় অংশগ্রহণ করেনি বলে তর্ক করেছিলাম। আজ বাবারও তদ্রূপ পরিস্থিতি৷ পার্টির কোনও প্রতিনিধি আসেনি। বাবার বন্ধুরা, যারা নিয়মিত আমাদের বাড়িতে আসত একসময়, তারাও নয়। একদিন বাবাই বলেছিল ‘পার্টিম্যান’ শব্দটি, মনে পড়ল, টের পেলাম ‘পার্টিম্যান’রা মানবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে বিরাজ করে।
অজয় এসে বলল, “কাঠ আনতে যাচ্ছি দাদা।”
পাঁচশো টাকা জোগাড় করেছি চেনা মানুষের কাছে ধার করে।
কাঠ আনতে যাচ্ছে শুনে অর্থপ্রসঙ্গ মনে এল। প্রবল ভাবনার ভিতরেই উঠে দাঁড়িয়েছি, আরতি ডাকল, “শোনো।”
পেছন ফিরে তাকালাম। আরতি একটা খাম ধরিয়ে দিল হাতে। বলল, “এই দু’ হাজার টাকা রাখো। আমি শেষ অবধি আছি। লাগলে চেয়ে নিয়ো কিন্তু।”
রুদ্ধকণ্ঠে বললাম, “আরতি!”
আরতি চাপা ধমক দিয়ে বলল, “নিজের কাজে মন দাও গে। নাটক কোরো না।!”
কাঠের দোকানে বড় পাল্লায় কাঠ তুলছিল একজন, অজয় সেখানে, আমি তার হাতে আড়াই হাজার টাকা গুঁজে দিলাম। বললাম, “এতে হবে না?”
অজয় অল্প হাসল, “আজকে হয়ে যাবে। যা-যা কিনতে হবে, বরুণ একটা লিস্ট করেছে, আনতে পাঠিয়ে দিই?”
আলতো স্বরে বললাম, “দাও।”
বুঝতে পারছি এক ঘোর নেমেছে আমার ভিতর। স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন থেকে বেরোতেই হল। বড় ছেলের দায়িত্ব পালন করতেই হল। নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত কবে ধুয়ে-মুছে গেল! তা হলে বাবা সাসপেন্ড হবার পর, রিটায়ার্ড হবার পর, নেশাগ্রস্ত তান্ত্রিক হবার পর, ধসে যাওয়া সংসারে ফিরে গেলাম না কেন? স্পষ্ট হচ্ছে এমন উপলব্ধি, বাবার অধঃপতনের মূলেও কাজ করেছে দুই অভিমান। এক, আমার প্রতি অভিমান। দুই, পার্টির প্রতি অভিমান। সর্বত্যাগী কমিউনিস্ট তো ছিল না বাবা। দেশভাগের কারণে দুর্ভাগ্যপীড়িত এক পরিবারের সদস্য ছিল, ভালভাবে বাঁচবার আকাঙক্ষা থেকেই তার রাজনীতিতে আসা। যা-ই সেজে থাকুক, সৈনিকসুলভ দৃঢ়তা তাঁর ছিল না। বাবাও ছিল ইমোশনাল। তাকে আদর্শের দোহাই দিয়ে ত্যাগ না করলেই হত, পাশে থাকলে এত দুমড়ে-মুচড়ে যেত না শেষ পর্বে।
দূর থেকে দেখছি বাবাকে নগ্ন করে কীসব মাখানো হচ্ছে। সহ্য করতে পারলাম না। ভাই সব কাজ করবার জন্য চিতার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। অতএব, উঠে পড়লাম।
আরতি জানতে চাইল, “কোথায় যাচ্ছ?”
বললাম, “তুমিও চলো। চা খাব।”
পাশেই চায়ের দোকান। পাড়ার অল্প কিছু ছেলে এসেছে। তারা বিভিন্ন কাজে ছোটাছুটি করছে। ওদেরও ডাকলাম চা পান করার জন্য। অজয়কে এই দেখছি, এই উধাও হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য পরোপকারী ছেলে বটে। অজয়ের চরিত্রের সৌন্দর্য আমাকে জীবনের আর একটা দিকের প্রতি উৎসাহিত করেছে। অন্যের জন্য বেঁচে থাকতে হবে। এই সিদ্ধান্তে নিজের উপর থেকে ভার কমে যায়। আত্মমুগ্ধতা সংকীর্ণ জীবনের পরিচায়ক। ওটি সুড়ঙ্গে বন্দি করে রাখে জীবন।
দুই-একজন যারা চা পান করতে এসেছে, তারা স্বাভাবিক কারণেই আরতির প্রতি কৌতূহলী হচ্ছে। সে কে? কী সম্পর্কে এখানে এসেছে? আমারই-বা সে কে হয়? ওদের চোখের ভাষা পড়তে পড়তে প্রশ্নগুলি কুড়াচ্ছিলাম। চকিতে বিদ্যুৎচমক হল মনে। আরতিকে আমার ভরসা বলে মনে হল কেন? তাকে ফোন করে বাবার মৃত্যুসংবাদ জানালাম কেন? আরতি ছুটে এসেছে। ধান্দায় বের হয়নি। তার টাকা পেয়ে আমার স্বার্থ পরিপুষ্ট হয়েছে বলে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছি। এখন পারিপার্শ্ব হাজির। তাদের প্রভাবে প্রশ্নগুলি আমার মনেও সঞ্চারিত হল। আমি পরম স্বার্থপর বলে পূর্বে ভাবতে পারিনি। এইবার প্রশ্নগুলি আমার দিক থেকেও! আরতি আমার কে? তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? সে শ্মশানকার্যে আমাকে সহযোগিতা করতে ছুটে এসেছে কেন? ভীরু উত্তর পায় বিলম্বে। আমার তাই-ই হবে। উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি বোকার মতো আরতির হাত ধরে অস্ফুটে ডাকলাম, “আরতি!”
আরতি ফিরে তাকাল। বললাম, “আমাদের সম্পর্কের কী নাম?”
হালকা হাসল আরতি। আঙুল তুলে দেখাল, “ওই যে চিতা ধরল।”
দেখলাম। অল্প আগুন কাঠের চারপাশে ফণা তুলছে। ওই আগুনে ক্রমশ হারিয়ে যাবে পিতৃশরীর। মুখাগ্নি করে ভাই জবুথুবু দাঁড়িয়ে আছে চিতার অনতিদূরে। তাকে ঘিরে আছে তার বন্ধুরা। মুখাগ্নি প্রথাটিকে মর্মান্তিক মনে হয় আমার। সহ্য করতে পারি না। কিন্তু ঘটমান ইতিহাসের মধ্যে ডুব দিয়ে বসে আছি কত কাল, সমস্ত কিছুতেই ইতিহাস খুঁজে পাওয়া আমার মানসিক অভ্যাস। ফলত টের পেলাম—হিন্দু জাতির এই মুখাগ্নি প্রথাটি এই দেশের ইতিহাসের জরুরি উপাদান। জীবনের নিয়মে একজনকে চলে যেতেই হয়, তার উত্তরপুরুষ তার চিতায় অগ্নিসংযোগ করে একটি অবসানকে চিহ্নিত করছে, আর স্বয়ং উদিত হচ্ছে, এইভাবেই নির্মিত হয়েছে দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের পরম্পরা।
পরমুহূর্তে আরও একটি সত্য টের পেয়ে শরীর শিহরিত হল। বাবারই বংশের সেই পরম্পরা-বহনকারী উত্তরপুরুষ আমি নই, ভাই-ই তো অগ্নিদান করল। আমাদের পরিবারের ধ্বজাধারী উত্তরপুরুষের মর্যাদা তারই প্রাপ্য। তা হলে আমি? জ্যেষ্ঠপুত্র থেকে জ্যেষ্ঠপুত্র, যে দীর্ঘ ঐতিহ্য আমাদের বংশধারায় চলে আসছে কতকাল ধরে, সেই ইতিহাসের পাতা থেকে আমার নাম বাদ পড়ল। উপলব্ধি করে আরও খাদে পড়লাম। আরতিকে হাত ধরে একটু কাছে টানলাম। আরতি ভ্রূ-কুঞ্চিত করল। আমার তাতে কী? আমি ভয়ার্ত। দৈবকণ্ঠে যেন বললাম, “যাবে? যাবে আরতি?”
আরতি যেন আকাশ থেকে পড়ল, “কোথায়?”
