একটি চিত্রনাট্যের খসড়া
সময় : সূর্যাস্তের আগের মুহূর্ত।
দৃশ্য : লং শটে ক্যামেরা এঁকেবেঁকে গ্রামের ভেতর চলে যাওয়া রাস্তাকে ধরছে। রাস্তার বাঁ-পাশে ধানখেত সবুজ হয়ে আছে। ডান দিকে কংক্রিটের ঘরবাড়ি। কোয়ার্টার, বাংলো, মস্ত কারখানার শেড।
দৃশ্য : লং শটে দেখা যায় ধানখেতের আল-বরাবর হাজার মানুষ ছুটে আসছে। সমবেত গান ভেসে আসছে, “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে চলে, আয় আয় আয়…”
দৃশ্য : মিড লং শট। কারখানার উঁচু পাঁচিলের উপর ঝুঁকে পড়ে কালিঝুলিমাখা কিছু মুখ। গুলির শব্দ। মুখগুলি অদৃশ্য।
দৃশ্য : কারখানার গেটের সামনে দিয়ে পুলিশবাহিনী মার্চ করে চলে গেল অন্য দিকে।
দৃশ্য : কারখানার গেটের সামনে ছুটে এল ফাগুলাল, চন্দ্রা, আরও কয়েক জন। তারা যেন কাকে খুঁজছে। দৌড়ে মিলিয়ে গেল।
দৃশ্য : কারখানার বন্ধ গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ধানিরঙের কাপড় পরা নন্দিনী। (মিড লং শট) ক্লোজ শট। নন্দিনীর প্রেমময়ী মুখ। কপালে কুমকুম। কানে রক্তকরবীর দুল।
ক্লোজ আপ। দু’চোখ পশ্চিম আকাশে রেখেছে নন্দিনী।
নন্দিনীর সংলাপ : দেখতে দেখতে সিঁদুরে মেঘে আজকের গোধূলি রাঙা হয়ে উঠল। ঐ কি আমাদের মিলনের রঙ। আমার সিঁথের সিঁদুর যেন সমস্ত আকাশে ছড়িয়ে গেছে।
[নন্দিনী এবার একটু পিছিয়ে এসে কারখানার উঁচু পাঁচিলের ওপাশে তার কণ্ঠস্বর পাঠায়। ক্যামেরা ক্লোজ-মিড শট নেওয়ার দূরত্বে।]
নন্দিনীর সংলাপ: শোনো শোনো, শোনো। দিনরাত এখানে পড়ে থাকব, যতক্ষণ না শোনো।
দৃশ্য : গোঁসাই ওরফে পার্টির লোকাল নেতা নন্দিনীকে দেখে চমৎকৃত। ছুটে আসছে।
সংলাপ : নন্দিনী!
দৃশ্য: নন্দিনী ফিরে তাকায়। হেসে গোঁসাইয়ের কাছে আসে। বলে, “রাজাকে দরকার।”
গোঁসাই—এসো আমার আশ্রমে, তোমাকে নাম শোনাব।
নন্দিনী—শুধু নাম নিয়ে করব কী?
গোঁসাই—মনে শান্তি পাবে! মনের ঝড় শান্ত হবে।
নন্দিনী—শান্তি যদি পাই তবে ধিক্ ধিক্ আমাকে। আমি এই দরজায় অপেক্ষা করে বসে থাকব।
গোঁসাই—থাকো! কিন্তু জনগণের মঙ্গলের জন্য যে-সিদ্ধান্ত তা বদলাবে না। রাজা বদলে গেলেও না।
নন্দিনী—তোমাদের ঐ ধ্বজদণ্ডের দেবতা, সে কোনও দিনই নরম হবে না। কিন্তু জালের আড়ালের মানুষ চিরদিনই কি জালে বাঁধা থাকবে? যাও, যাও, যাও। মানুষের প্রাণ ছিঁড়ে নিয়ে তাকে নাম দিয়ে ভোলাবার ব্যবসা তোমার।
দৃশ্য : [গোঁসাই রহস্যময় হাসি দিয়ে তার কোয়ার্টারের দিকে চলে যায়।]
দৃশ্য : [নন্দিনী পশ্চিম আকাশে তাকায়।]
দৃশ্য : [ছুটতে ছুটতে আসে ফাগুলাল ও চন্দ্রা। কারখানার বন্ধ উঁচু তোরণের সামনে তারা তিনজন কথা বলছে।]
ফাগুলাল—বিশু কোথায়? তোমার সঙ্গে ঘুরছিল। সে কোথায়? সত্যি কথা বলো!
নন্দিনী—তাকে বন্দি করে নিয়ে গেছে। (চোখে জল) [ক্লোজ-আপ শট]
চন্দ্রা—রাক্ষসি! তুই তাকে ধরিয়ে দিইছিস! তুই ওদের চর।
নন্দিনী—কোন্ মুখে এমন কথা বলতে পারলে। [ক্লোজ-আপ]
চন্দ্রা—নইলে তোর এখানে কী কাজ? কেবল সবার মন ভুলিয়ে বেড়াস!
ফাগুলাল—এখানে সবাই সবাইকে সন্দেহ করে। তবু তোমাকে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু বিশু কোথায় গেল? কেমন যেন ঠেকছে আমার!
নন্দিনী—হবে, তা হবে। আমার সঙ্গে এসেই বিপদে পড়েছে। তোমাদের কাছে নিরাপদে থাকত, সে কথা নিজেই বললে। [ক্লোজ-আপ]
চন্দ্রা—তা-ও ওকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে এলি কেন? সর্বনাশী!
নন্দিনী—ও-যে বললে, ও মুক্তি চায়। [ক্লোজ-আপ]
চন্দ্রা—জন্মের মতো মুক্তি দিলি তাই!
নন্দিনী—আমি তো ওর সব কথা বুঝতে পারি নে, চন্দ্রা। ও কেন আমাকে বললে, বিপদের তলায় তলিয়ে গিয়ে তবে মুক্তি। ফাগুলাল, নিরাপদের মার থেকে মুক্তি চায় যে-মানুষ, আমি তাকে বাঁচাব কী করে? [ক্লোজ-আপ। বিগ ক্লোজ-আপ।]
চন্দ্রা—ওসব কথা আমরা বুঝি না। ওকে যদি ফিরিয়ে আনতে না পারিস, মরবি, মরবি! তোর সুন্দর মুখে আমি ভুলি না!
ফাগুলাল—চন্দ্রা, ঝগড়া করে লাভ কী? চলো, কারিগরপাড়া থেকে দলবল নিয়ে আসি। ওই বন্দিশালা ভেঙে ফেলতে হবে!
নন্দিনী—আমি যাব তোমাদের সঙ্গে। (ক্লোজ-আপ)
ফাগুলাল—মানে?
নন্দিনী—ভাঙতে যাব।
(শুধুমাত্র দু’চোখের ক্লোজ-আপ। প্রেম থেকে অগ্নিঝরা দৃষ্টি।)
ছুটে আসে আর-একজন শ্রমিক গোকুল। বলে, “এই যে চরটা! এই ডাইনিটাকে সবার আগে পুড়িয়ে মারা দরকার!” (সকলকে এক ফ্রেমে রেখে মিড লং শট। ক্যামেরা ফ্রেমটাকে ধীরে আরও ক্লোজ-এ ধরে)
ফাগুলাল—খবরদার! ওর গায়ে হাত দেবে না, গোকুল!
গোকুল—তোমার এখনও চোখ খোলেনি, ফাগুলাল!
চন্দ্রা মাথা নেড়ে গোকুলের কথায় সম্মতি জানায়।
ফাগুলাল—চলো গোকুল, এবার জোর দেখাবার সময় হয়েছে। তবে এখানে নয়, দলবল জুটিয়ে ভাঙতে হবে এই শয়তানের শহর। চলো! (ফাগুলাল, চন্দ্রা, গোকুল চলে যায়)
পরের দৃশ্য : নন্দিনী একা। তার লাবণ্যে শ্রান্তির ছাপ পড়েছে। সে পশ্চিম আকাশে তাকায়। (মিড লং শট। ক্লোজ-আপ।)
দৃশ্য : পশ্চিম আকাশে রঙিন মেঘের দল। (লং শট)
দৃশ্য : কারখানার পাশ থেকে সশস্ত্র মিছিল পার্টিকর্মীদের। সবার হাতে উৎকট-দর্শন আগ্নেয়াস্ত্র। (মিড লং শট)
দৃশ্য : নন্দিনী কৌতূহলী, ভয়ার্ত। (ক্লোজ-আপ)
দৃশ্য : নন্দিনী মিছিলের পাশে দৌড়তে থাকে। (মিড লং শট)
নন্দিনীর সংলাপ—ওগো, কোথায় চলেছ তোমরা?
একজন—পার্টির নির্দেশ। রাজার মহান গণতন্ত্র বাঁচাতে হবে তো!
নন্দিনী—রঞ্জনকে দেখেছ?
অন্য আর একজন—পাঁচদিন আগে বলতে পারতাম। এখন বিবৃতি নিষেধ। চেনা দেওয়া নিষেধ। ওদের জিজ্ঞাসা করতে পারো।
দৃশ্য : লাল টুপি পরা একদলের মিছিল চলেছে। (লং শট। মিড লং শট।)
ক্যামেরা আবার নন্দিনীকে ধরে।
নন্দিনীর সংলাপ—ওরা কারা?
দৃশ্য : অস্ত্র-মিছিল। (লং শট)
সংলাপ ভেসে আসে—ওরা সর্দারের ভোজে মদ সার্ভ করবে।
দৃশ্য : লালটুপিদের মিছিল পর্দা জুড়ে।
নন্দিনী ছুটে আসে। মুখে উৎকণ্ঠা। (ক্লোজ-আপ)
মিছিলের পাশে নন্দিনী ছুটছে। (মিড লং শট)
নন্দিনীর সংলাপ—ওগো লালটুপিরা, রঞ্জনকে তোমরা দেখেছ?
দৃশ্য : মিছিলের একজন বলছে—মহিলাদের মিছিল আসছে পেছনে। ওদের জিজ্ঞেস কোরো।
দৃশ্য : মহিলাদের মিছিল ছুটছে পর্দা জুড়ে।
নন্দিনী ছুটে আসে। সে হাঁফাচ্ছে। ঘর্মাক্ত মুখ। (ক্লোজ-আপ)
মিছিলের পাশে নন্দিনী ছুটছে। (মিড লং শট)
নন্দিনীর সংলাপ—ওগো, রঞ্জনকে এরা কোথায় রেখেছে তোমরা কি জানো?
দৃশ্য : মিছিলের এক মরিয়া মহিলা বলে—চুপ চুপ। পরের মিছিলকে জিজ্ঞেস করো।
দৃশ্য : প্রচুর পতাকা উড়িয়ে যুবকদের মিছিল পর্দা জুড়ে।
নন্দিনী ছুটে আসে। তার মুখে আকুতি। (ক্লোজ-আপ)
নন্দিনীর সংলাপ—ওগো, একটু থামো, বলে যাও রঞ্জন কোথায়?
দৃশ্য : মিছিলের একটি তেরিয়া যুবক বলে—রাজা বেরোবে। ওকে জিজ্ঞেস করো। আমরা শুরুটা জানি, শেষটা জানি না।
দৃশ্য : একা নন্দিনী। (মিড লং শট)
আকাশের দিকে তাকায়। চোখ দুটো ধরে ক্লোজ-আপ।
কারখানার পাঁচিলের ওপাশে সুরম্য প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে নন্দিনী বলে—সময় হয়েছে, দরজা খোলো।
পাঁচিলের ওপাশ থেকে জনতার গর্জনের শব্দ ভেসে আসে।
গুলির আওয়াজ।
দৃশ্য : নন্দিনীর মুখে ভয়ের ছাপ। (ক্লোজ-আপ)
দৃশ্য : সুরম্য বাংলোর দোতলার বারান্দায় সাদা পাঞ্জাবি-ধুতি পরিহিত রাজা এসে দাঁড়ায়। নন্দিনীর উদ্দেশে তার সংলাপ—রঞ্জনকে চাও বুঝি? একটা গণ্ডগোল চলছে। এস. পি. ডিউটিতে রয়েছে। তাকে ফোন করে বলেছি রঞ্জনের কথা। এস. পি. খোঁজ করছে। এখনই আমার কাছে নিয়ে আসবে। এখন বেরোব আমি। তুমি যাও। নয়তো বিপদে পড়বে। (মিড লং শট)
নন্দিনী—আমার ভয় ঘুচে গেছে। অমন করে তাড়াতে পারবে না। (মিড লং শট)
রাজা—আমার প্রশাসন জনগণের জন্য সভা ডেকেছে। আমি বেরোচ্ছি। আমাকে দুর্বল কোরো না। নিরাপত্তা-রক্ষীরা তোমাকে মারলে আমি ঠেকাতে পারব না।
নন্দিনী—বুকের উপর দিয়ে চাকা চলে যাক, নড়ব না।
রাজা—নন্দিনী, তোমার সারল্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার কাছ থেকে তাই তুমি প্রশ্রয় পেয়েছ। আজ এই শিল্পতালুক ভাঙবার জন্য বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে। আজ তোমাকে ভয় করতেই হবে।
নন্দিনী—আমি চাই, সবাইকে যেমন ভয় দেখিয়ে বেড়াও, আমাকেও তেমনি ভয় দেখাবে। তোমার প্রশ্রয়কে ঘৃণা করি।
রাজা—ঘৃণা করো? স্পর্ধা চূর্ণ করব। আমার প্রকৃত পরিচয় এবার তুমি পাবে। শাসকের কঠিন রূপ! ভালবাসা, স্নেহ যেখানে নিতান্তই তুচ্ছ!
নন্দিনী—পরিচয়ের অপেক্ষাতেই আছি, খোলো দ্বার।
দৃশ্য : ক্রুদ্ধ রাজা বারান্দা থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়। (মিড লং শট)
দৃশ্য : পাঁচিলের ভেতরের আকাশে ভয়ার্ত পায়রার ওড়াউড়ি।
জনতার গর্জন।
গুলি-বোমার শব্দ।
দৃশ্য : কারখানার প্রকাণ্ড গেট খুলে যায় পলকের জন্য। অনেক লাশ পড়ে আছে।
ছুটে আসে রাজার দামি গাড়ি।
নন্দিনীর রুখে-দাঁড়ানো মূর্তি।
হঠাৎ তার চোখে পড়ে পুলিশের গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছে কয়েকটি লাশ। রাজা গাড়ি থামিয়ে এস. পি-র সঙ্গে কথা বলছে।
দৃশ্য : নন্দিনী গেটের ভেতরে ছুটে যায়।
রাজা গাড়ি থেকে নেমে তাকে থামায়।
রাজা—কোথায় যাচ্ছ পাগলের মতো? যুদ্ধ চলছে এখানে। মরবে তো!
নন্দিনী—ও কী! ঐ কে পড়ে? রঞ্জনের মতো দেখছি যেন!
রাজা—কী বললে? রঞ্জন? কোথায় রঞ্জন? ও তো বিদ্রোহীদের লাশ।
দৃশ্য : নন্দিনী একটা লাশের কাছে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ে। (মিড লং শট। ক্রমশ ক্লোজ-এ ধরে।)
নন্দিনীর সংলাপ—হ্যাঁ গো, এই তো আমার রঞ্জন।
দৃশ্য : রাজা হন্তদন্ত এগিয়ে আসে। সঙ্গে সিকিউরিটি-গার্ডরাও।
রাজা—ঠকিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে এরা। এস. পি-কে বলেছিলাম আমি। ও কি বলেনি, ওর নাম রঞ্জন!
দৃশ্য : রক্তকরবী ফুলের সাজে সজ্জিত নন্দিনীর কান। হাত।
ধানিরঙের শাড়ি।
কপালে কুঙ্কুম।
সেই শরীরে রঞ্জনের গুলিবিদ্ধ দেহের রক্ত লেগে আছে।
সে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে আগুন। (ক্লোজ-আপ)
নন্দিনী—রাজা, এইবার সময় হল।
রাজা—কীসের সময়?
নন্দিনী—আমার সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার লড়াই।
দৃশ্য : অজস্র সাধারণ মানুষ ছুটছে। (লং শট)
দৃশ্য : এস. পি-র নেতৃত্বে পুলিশবাহিনী সশস্ত্র, প্রস্তুত। (লং শট)
দৃশ্য : টেবিলে রক্তকরবী। লেখার কাগজ। চিত্র পরিচালক চিন্তিত বসে।
(স্বগত সংলাপ) রাজা বিদ্রোহীদের দলে। বর্তমান ব্যাখ্যায় এটা কী করা যায়? মানুষ মেরে রাজা যদি দুঃখিত হয়, রাজবিদ্রোহীদের বলে, আমি তোমাদের দলে, চলো একসঙ্গে সিস্টেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি, মানুষ তাকে বিশ্বাস করে দলে নেবে? নাটকটার বাইরে থেকে একটা নিজস্ব চরিত্র আনা দরকার, যে পরিচালককেই আক্রমণ করবে।
দৃশ্য : চিত্র পরিচালক সিগারেট ধরায়।
দৃশ্য : চিত্র পরিচালক চিত্রনাট্য কাটাকুটি করছে।
দৃশ্য : একজন মার-খাওয়া, জীর্ণ শীর্ণ লোক ঘরে ঢুকে পড়ে। কাশতে থাকে। তার মুখের ক্লোজ-আপ ক্যামেরা ধীরে ধরে।
দৃশ্য : পরিচালক অবাক হয়।
সংলাপ—কে?
লোকটা—আজ্ঞে, চিনতে পারছেন না?
পরিচালক—না, মানে…
লোকটা—আপনি সিনেমা বানান না?
পরিচালক—আপনি জানেন?
লোকটা—শুনেছি। এটাও শুনেছি, আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মশাইয়ের ‘রক্তকরবী’ সিনেমা করছেন।
দৃশ্য : পরিচালক বিস্মিত। উঠে দাঁড়ায়। লোকটাকে হাত ধরে এনে চেয়ারে বসায়।
সংলাপ—
পরিচালক—আপনি…মানে…বেশ খবর রাখেন তো…আপনি গ্রামের মানুষ সম্ভবত?
লোকটা—আজ্ঞে, হ্যাঁ। রক্তকরবী-র রঞ্জন, আমি তার গ্রামের বন্ধু হই, স্যার। খবর তো রাখবই!
দৃশ্য : পরিচালকের বিস্মিত মুখের ক্লোজ-আপ।
দৃশ্য : পরিচালক বলছে—আচ্ছা!
লোকটা—আমি গাঁয়ের লোক, স্যার। নবান্ন বলে একটা নাটক হত না?
পরিচালক—বিজন ভট্টাচার্যের?
লোকটা—আমি ওই নাটকে ডাস্টবিনে কুকুরের সঙ্গে মারামারি করে খেতাম! (কাঁদে)
দৃশ্য :লোকটার ক্রন্দনরত মুখের ক্লোজ-আপ।
দৃশ্য : বিস্মিত পরিচালক বলে—আপনি! (আবার সিগারেট ধরায় উত্তেজনায়)
লোকটা—শরৎচন্দ্রের একটা গল্প আছে, স্যার? মহেশ? পড়েছেন?
পরিচালক—হুঁ।
লোকটা—(ভেজা গলায়) মহেশ আমার মরে গেল…আমি শেষ রাতে মেয়ে আমিনার হাত ধরে ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে চলে গেলাম…
দৃশ্য : পরিচালকের বিস্মিত চোখে শ্রদ্ধার ভাব এসে মেশে।
দৃশ্য : লোকটা উঠে দাঁড়ায়। (ক্লোজ-আপ, মিড ক্লোজ-আপ…)
সংলাপ—আবার ওরা মারল। গ্রাম থেকে তাড়াল। আপনি ভাল থাকবেন, বাবু। (চলে যাচ্ছে)
দৃশ্য : পরিচালক ছুটে যায়। চোখে আবিষ্কারের আনন্দ। লোকটির মুখোমুখি হয়।
পরিচালক—ইন্টারেস্টিং! আপনি ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার!
লোকটা—অ্যাঁ?
পরিচালক—জানেন তো, রক্তকরবী অবলম্বনে আমি শ্রমিক-কৃষক বিদ্রোহের একটা গল্প ধরতে চাইছি। আপনি একটা ক্যারেকটারের সন্ধান দিলেন। প্লিজ, আপনি নিজেই ওই চরিত্রে অভিনয় করুন। আপনি অ্যাড্রেসটা দিন। কোথায় থাকেন এখন? কী করেন বর্তমানে?
লোকটা—শ্যালদার ফুটপাথে থাকি। বমি করি, কফ-থুতু ফেলি৷ ভিক্ষে করে হেরোইন টানি। চলবে?
দৃশ্য : পরিচালকের চোখে করুণা। ধীরে সেই ভাব কেটে গিয়ে লোভ, ভাল ছবি করে পুরস্কৃত হওয়ার লোভ।
দৃশ্য : মানুষ ছুটছে বন্দিশালা ভাঙতে।
ফাগুলাল—বন্দিশালার দরজা ভাঙব, মরি তবু ফিরব না।
দৃশ্য : ফাগুলালের পাশে একটু আগের লোকটাকে দেখা যায়। দু’জনেই দৌড়চ্ছে।
দৃশ্য : নন্দিনী (ক্লোজ-আপ)
সংলাপ—জয় রঞ্জনের জয়!
দৃশ্য : ফাগুলাল, সেই লোকটা, আরও সবাই—জয় রঞ্জনের জয়!
