Accessibility Tools

বাইশে শ্রাবণ – বিভাস রায়চৌধুরী

নিশিডাক

প্রথমে দীপ আর অর্ক হুইস্কিতে চুমুক দিচ্ছিল আয়েস করে। বিদিশা নিয়েছিল ফলের রস। নাইট ক্লাবের ঝিমোনো আলো আর গমগমে বাজনায় ষড়যন্ত্র থাকে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নিয়ে বাবার লেখা বিদিশার কোনও প্রিয় বিষয় নয়, কিন্তু নিজেকে লুকিয়ে ফেলা তার দুঃখী বাবা যে একজন কবি, আর এই একটু জড়িয়ে-যাওয়া হাতের লেখাটা যে তাঁরই, ভাবতে ভাবতে সম্মোহনে পড়ে যায় বিদিশা। যেটুকু সে নিয়ে এসেছে, অনেক রাতে বারবার সে ওটাই পড়ে। পড়ে আর কাঁদে। রবীন্দ্রনাথের জন্য নয়। বাবার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, এই সত্য যেন আর এক সত্যকেও আঙুল তুলে দেখায়, তার বাবাও ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছেন। বেদনানীল বিদিশা রাতে হিংসা-আত্মধ্বংস-কলহ থেকে বহু দূরে এক জগতে থাকে প্রায়ই, যেখানে কেউ নেই, দলা-দলা কুয়াশা আর সে। দিন কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। মা’কে দেখামাত্র সে জ্বলে ওঠে মনে মনে। দ্রুত পালটে যায় সব কিছু। বাতাস থেকে অদৃশ্য একটা ছুরি কুড়িয়ে নেয় বিদিশা। তার ওপর বিরক্ত জয়শ্রী তখন হয়তো নিজের ঘরে ঢুকে গিয়েছে। মনে মনে সেই ঘরে ঢোকে বিদিশা। দরজা আটকে দেয়। ছুরিটা শক্ত হাতে ধরে এগোয়। জয়শ্রী হয়তো জানালা দিয়ে আটতলা নীচের শহর দেখছে, পেছন থেকে ঝম করে গিয়ে তার গলায় ধারালো ছুরি চেপে ধরে বিদিশা। জয়শ্রী চেঁচিয়ে ওঠে। বিদিশা বলে, “চুপ! একটা কথা বললে টেনে দেব।”

জয়শ্রী হয়তো হতাশায় ভেঙে পড়ে। বলে, “মার। মেরে ফেলে দে আমাকে। তুই তো পাগল হয়ে গেছিস।”

হিসহিসিয়ে বিদিশা তখন বলে, “পাগলামির কী দেখেছ! আমার পুরো প্ল্যানটা যদি কাজ করে, তখন দেখবে আমি কী হতে পারি, আমি কতটা পর্যন্ত পারি।”

জয়শ্রী কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, “এই তো পাওনা। এত কষ্ট করে বড় করলাম। তোর ভাল লাগবে না বলে শ্যামল আমার হাতে-পায়ে ধরলেও আর মা হলাম না। বিনিময়ে ছেলেদের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছিস! মা’র গলায় ছুরি ধরছিস! মার। মেরে ফ্যাল।”

আকাশ ফাটিয়ে তখন হাসছে বিদিশা। ছুরি সরিয়ে নিচ্ছে। জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে শূন্যে পড়ছে, আর বলছে, “তোমাকে না মেরে বাঁচিয়ে রাখাটাই শাস্তি। বেঁচে থেকে দেখে যাও তোমার নতুন সংসারের কী হাল হয়। পুরনোটা ভেঙেছ তুমি, নতুনটা আমি ছারখার করে দেব, হাঃ হাঃ।”

আপনমনে এই সব চলে দিন শুরু হতেই। এক-একদিন বাবার ফোন পেয়ে কৃষ্ণনগর চলে যায় সে। বাবাকে দেখে সে খুশির ভান করে। কিন্তু আসলে তার মনে আগুন তখন দাউ দাউ করে জ্বলে। এই মানুষটার যারা ক্ষতি করেছে, তারা তার মস্ত বড় শত্রু—এরকম ভাবে, আর দাঁত কামড়ায়। অল্প বয়সের মনটায় একটু বেশি বয়সের ভার নিয়ে ফেলেছে বিদিশা, ফলে সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে বাধ্য।

“এনজয় দি রিদ্‌ম”—ডিজে-র ব্যারিটোন ভয়েস মিউজিক-মিশ্রিত ভেসে আসে। অর্ক বলে, “হেই বেবি, ইউ আর জাস্ট আউট!”

দীপ হেসে ওঠে জোর, “ফলের রসেই?”

চিমটিটা লাগে বিদিশার। বাড়িতে পার্টি হয় শ্যামলেশ সেন থাকলেই। মায়ের নজরদারিতে সে কোনও দিনই মদে আকর্ষণবোধ করেনি। নিজেরও ছিল আকণ্ঠ অভিমান। অভিজাত জীবনটাই বিদিশার পছন্দ নয়। মায়ের সঙ্গে যে-ক্লাসটা সে মেনটেন করে, সেখানে হুইস্কি কোনও ফ্যাক্টরই না, তবু বিদিশা এইসব কারণেই সে-স্বাদ থেকে আজও দূরে। দীপদের সঙ্গে নাইট ক্লাবে ঢুকে পড়া কোনও বয়সোচিত উত্তেজনার আকর্ষণে নয়, সে অন্য এক প্ল্যান ভাঁজছে মনে মনে, এসব তারই অঙ্গ। কিন্তু তা-ও অর্ক-দীপের তার পেছনে লাগাটা বিদিশা তাচ্ছিল্য হিসেবে নিল। সে তৎক্ষণাৎ হুইস্কির অর্ডার দিল। শান্তিনিকেতনে ভদ্‌কার ঢোক গিলতেই বমি-টমি করে কী কাণ্ড। আজ সে নিজেকে গুছিয়ে নিল।

অর্ক-দীপ হাততালি দিয়ে উঠল। নিজেরাও পরের রাউন্ডের অর্ডার দিল। দীপ বলল, “তুই কৃষ্ণনগর আর কলকাতার ককটেল। একটু গ্রাম্য, একটু আরবান।”

অর্ক বলল, “একটু ফলের রস, একটু হুইস্কি।”

বিদিশা চট করে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, “কাম অন। ডান্স উইথ মি।”

সে উঠে দাঁড়াতেই দীপ-অর্ক তড়িঘড়ি গ্লাস ফাঁকা করল। তাকিয়ে দেখল, সামনে এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা উদ্ভিদ-কিশোরী। জিন্স-প্যান্টের ওপর বিদিশা পরেছে ব্ল্যাক-শার্ট। বড় দুটো চোখের নীচে মোটা করে কাজলরেখা।

দীপ আর অর্ক নিজেদের মধ্যে বিহ্বল তাকিয়ে থাকল এক মুহূর্ত। তারপর দীপ বলল, “আর একটা করে সবাই। দেন ডান্স…”।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে ‘ওক্কে’ বলে বসে পড়ল বিদিশা। একটু পরেই গ্লাসে ঠোঁট ভিজিয়ে সে দেখল, বিরাট টিভি স্ক্রিন জুড়ে ছোটাছুটি করছে রক্তমাখা লোকজন। কারও মাথা রক্তভেজা। কারও হাতে গুলি লেগেছে, জামা লাল। পুলিশ গুলি ছুড়ছে। মেয়েরা, বাচ্চারা ছিটকে ছিটকে পড়ছে। একটু দেখে সে বুঝল, পশ্চিমবঙ্গের কোনও গ্রামে পুলিশ ও গ্রামবাসীর মারামারিতে ঘটনাটা ঘটেছে। তার মধ্যে আর কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। রাজনীতি সে বোঝেই না। ভীষণ অপছন্দ করে বিদিশা নেতাদের। তবে আজ বোধহয় বেশি কিছু হয়েছে, হলে ক্লাবে টিভিতে খেলা বা সিনেমা না দেখিয়ে নিউজ দেখাচ্ছে কেন?

সে চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু তার মাথার ভেতরে স্পষ্ট দাগ ফেলে গেল টাটকা রক্ত। তার ভেতরে শব্দ করে ভেঙে পড়ল কাচের চেনা কিছু। কোথাও একবিন্দু রক্ত সরীসৃপ হয়ে নামছে। বিদিশা একটু অপেক্ষা করল। টের পেল উষ্ণ, সরু এক প্রবাহকে। পাগল করা চোখ তুলে সে ডাকল, “অর্ক!”

অর্ক চমকে উঠল সেই চাউনিতে।

বিদিশা বলল, “দীপ, তোকেও বলছি।”

দীপ বুঝল আনাড়ি বিদিশাকে নেশা ধরছে। সে বলল, “শরীর খারাপ লাগছে? নাচবি না?”

বিদিশা চাউনি একই রকম রেখে আস্তে বলল, “আমার একটা উপকার করবি?”

দীপ বলল, “চল। পরে কথা হবে।”

অর্ক ভাবল অন্য কিছুও তো হতে পারে। বলল, “সিরিয়াসলি বলছিস?”

বিদিশা ম্লান হাসল, “এর চেয়ে সিরিয়াস কথা আমার জীবনে নেই।”

অর্ক বলল, “কেসটা খুলে বল তো!”

বিদিশা রহস্যময়ী হল, “আমি একটা প্ল্যান করেছি। তোরা দু’জন হেল্প করবি আমাকে?”

দীপ চোখ ছোট করল। “কী প্ল্যান?”

বিদিশা হুইস্কিতে আর-এক চুমুক দিল, “আমার জীবনটা তো জানিস। আমি বাঁচতে চাই।”

দীপ হা-হা করে হাসল, “তোর আবার কীসের দুঃখ? অত ফেমাস আর্টিস্টের মেয়ে তুই।”

বিদিশা তেড়ে উঠল, “ডোন্ট বি ক্রুয়েল, দীপ। ইউ নো আমি শ্যামলেশ সেনের মেয়ে নই। আমার বাবা একজন কবি। হি ইজ ডাইং।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল, “হারে, জয়শ্রী আন্টির ফার্স্ট হাজব্যান্ড কবি! হাউ সুইট! কবির সঙ্গে লাভ-অ্যাফেয়ার, দেন পেইন্টারের সঙ্গে…শি ইজ সো অ্যাডভেঞ্চারাস!”

বিদিশা দু’চোখে শীতল শাসানি রেখে তাকাল অর্কের দিকে। বলল, “অ্যাডভেঞ্চার তুই খুব পছন্দ করিস, না?”

অর্ক বুড়ো আঙুল নাচাল শূন্যে। তারপর আহ্লাদি চাপা শিস দিল। হুইস্কিবিজড়িত দীপ চেঁচাল, “আই টু!”

বিদিশা টেবিলের মাঝখানে মাথা ঝুকিয়ে দিল। অতঃপর দীপ-অর্কও। রচিত হল অভিসন্ধির দৃশ্য।

“আই ওয়ান্ট টু কিল হিম।”

“হোয়াট!”

“ওকে খুন করে আমি মা’কে শাস্তি দিতে চাই।”

“কার কথা বলছিস?”

“শ্যামলেশ সেনের।”

“এঃ! তুই কি পাগল হয়ে গেলি? এসব ভাবিস!”

“ইট্‌স মাই প্ল্যান। তোরা হেল্প করবি কি না তাই বল।”

“দিশা, মাই ডিয়ার, ক্রাইম-সিরিয়ালগুলো তোর মাথা খেয়েছে।”

“শাট আপ! আমি টিভি দেখি না।”

“চল, ডান্স ফ্লোরে যাই। ইউ আর লুকিং ওয়াইল্ড।”

“যাব। তোদের সঙ্গে ডান্স করব। ফরেস্ট বাংলোয় যাব। দেন ইউ উইল রিয়ালাইজ হাউ ওয়াইল্ড আই অ্যাম! বাট…”

কামনা ঘনাল বিদিশার চোখে। শান্তিনিকেতনে শরীর কেন যেন রাজি হয়নি। সংকোচ দানা বেঁধে ছিল মনের কোথাও। সংস্কার অত সহজে যায়! কিন্তু হুইস্কি এক অপূর্ব টোটকা এ ক্ষেত্রে। আজ অর্কদের সঙ্গে কোনও পান্থনিবাসে যেতে বিদিশার অসুবিধা হবে না। শরীর-খেলাতে আজ ভয় বা সংকোচের লেশ মাত্র থাকবে না। সে লজ্জাহীন ডানা মেলে দিচ্ছে দুই বন্ধুর ইন্দ্রিয়ে। বশীভূত হয়ে যাচ্ছে দুই সদ্য-যুবক, যারা উদ্দাম বল্গাহীন জীবনে বিশ্বাসী। আর যে-কোনও কিছুর বিনিময়ে বিদিশা অর্ক-দীপের আত্মসমর্পণই চায়।

ডান চোখ টিপে মোহময়ী বিদিশা বলল, “শ্যামলেশ সেনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব আমি। বাবাকে নিঃস্ব করেছে ওই স্কাউড্রেল। আমি প্রতিশোধ নেব। তোরা কি আমার সঙ্গে থাকবি? ইয়েস অর নো।”

অর্ক একটু আমতা-আমতা করল, “একটা সাধারণ ঘটনা নিয়ে তুই কি একটু বাড়াবাড়ি করছিস না দিশা?”

হিংস্র হয়ে উঠল মুহূর্তে বিদিশা, “কী সাধারণ ঘটনা রে? এ কি তোদের হাই-সোসাইটির পার্টিতে তোর মা’কে চুমু খেল তোর বাবার বস?”

অর্ক কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, “তোর নেশা হয়ে গেছে রে।”

কথাটায় কোনও আমল না দিয়ে বন্য-হয়ে-ওঠা মেয়ে বলে চলল, “এটা কৃষ্ণনগরের গল্প। কবিতাপাগল, রোমান্টিক এক মানুষের অপ্রতিষ্ঠাকে বিদ্রুপ করে তার বউকে নিয়ে চলে এল টাকাপয়সা-ওয়ালা এক বন্ধু। বন্ধুর বিশ্বাস চুরি করল সেই ইডিয়ট। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহিলা খ্যাতি আর বিত্তকেই পছন্দ করল। মেয়েকেও বানাতে চাইল তাদের মতো। কিন্তু সেই মেয়েটি তো খ্যাতিহীন, ঠকে-যাওয়া, বেঁচে থাকার বিশ্বাস হারিয়ে-ফেলা একজন মানুষের মেয়ে। সে বড় হওয়া মাত্র সব বুঝতে পেরেছে। মেয়েটা এখন কী করবে? খুন করবে! খুন! ওক্কে?”

একটানা আবেগী সংলাপ সেরে বিদিশা আচমকা নেমে-আসা শূন্যতার মুখোমুখি বিহ্বল হয়ে পড়ল কিছুটা। দীপ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিদিশার পেছনে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখল, “কুল বেবি, কুল। আমরা থাকব তোর পাশে। এখন চল, ডান্স করি।”

অনেকক্ষণ পর বিদিশা একটু হাসল। সে মাঝখানে, দু’পাশে দুই অল্প বয়সি পুরুষ। টলোমলো, অল্পবিস্তর নেশাতাড়িত সম্রাজ্ঞীর মতো মেয়েটা এগোচ্ছে নাচের প্রাঙ্গণে। জমকালো আলোর খেলা। গমগমে মিউজিক। বড় একটা ভিড় ছোট ছোট বৃত্তে ডান্স করছে। ওরাও একটা বৃত্ত হয়ে মিশে গেল সেখানে। আর কোনও শোকতাপ, রক্তপাত, কান্না নেই। কেবল তালে তালে পা ফেলো। মাথা ঝাঁকাও। শরীর উষ্ণ হবে। আকুল হবে। কিছু-বা বিমূর্তও।

হারিয়ে যাচ্ছে ডান্স ফ্লোরের সবাই। হারিয়ে যাচ্ছে বিদিশাও। হারিয়ে যেতে-যেতেও এক আজব ঘন বিষাদে আটকে গেল সে। আবার উথলে উঠল কান্না। ভিড় ঠেলে সে বেরিয়ে এল বাইরে। বাবার গলা শুনতে ইচ্ছে করছে। বাবাকে সে একটা মোবাইল কিনে দিয়ে এসেছে। পুরনো ঘরানার মানুষ তার বাবা। এবং কেমন যেন উদ্যমহীন। যন্ত্রটা ব্যবহার করতে শিখিয়ে দিয়ে এসেছে বিদিশা। তবু এখনও সড়গড় হন নি প্রভাতরঞ্জন। একবারও ফোন করেননি তিনি। বিদিশাই দু’-একবার করেছে। ও প্রান্ত থেকে ভেসে এসেছে ভীত, আড়ষ্ট কণ্ঠস্বর। যে-বাবা তাকে সামনে পেলে আবার জীবনীশক্তিতে উচ্ছল হয়ে ওঠেন, মোবাইলের ও প্রান্তের বাবা যেন তা নন। তবু বাবার কণ্ঠস্বর শুনবার জন্য এই মুহূর্তে মরিয়া বিদিশা। সে সর্বনাশের দিকে ছুটছে। তাকে ঘিরেও ঘনিয়ে উঠেছে সর্বনাশ। তবু যে-পবিত্রতা নিয়ে জন্মায় মানুষ, তা ফুরিয়ে ফেলার মতো বয়স এখনও হয়নি বিদিশার। বাইরের মনটা তার ধ্বংসাত্মক ভাবনায় ভরে আছে, ভেতরে তো এক-পৃথিবী অভিমান। সে তো আসলে স্নেহকাঙাল এক বালিকা। ফলে রাত বারোটা পেরিয়ে-যাওয়া ইন্দ্রিয়-সর্বস্ব মহানগরে ডুবে মরবার আগে বিদিশার অবচেতনে জন্ম নিয়েছে আকুলতা, এক বুক বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য আকুলতা।

বাবার নম্বরটা টিপছে সে, মাঝপথে বেজে উঠল বিদিশার চলমান ফোন। ভ্রু কুঁচকে সে দেখল শ্যামলেশ সেনের নাম ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে। কেটে দিল। কিন্তু বাবাকে আর ফোনে ধরা হল না তার। বারবার বেজে উঠতে থাকল তার যন্ত্র। কী ব্যাপার? শ্যামলেশ সেন তাকে এভাবে খুঁজছে কেন? দু’-তিনদিন হল শ্যামলেশ বিদেশ থেকে ফিরেছে। নিশ্চয়ই মায়ের কথাতেই এই খোঁজ। মাথায় খুন চেপে গেল বিদিশার। সে কাউকে কৈফিয়ত দেবে না, কেন সে নিশিক্লাবে রাত কাটাচ্ছে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। ইচ্ছে হলে সে রাতে না-ও ফিরতে পারে। খেলা তো শুরু হয়ে গেছে। আরও কত কিছু হবে! এখন শ্যামলেশের বিষ ঝেড়ে দেওয়া যাক। ফোনটা তীক্ষ গলায় ধরল বিদিশা, “ইয়েস৷”

“দিশা, তুমি কোথায়?”

“কেন?”

“বাইরের অবস্থা খারাপ। তুমি কোথায় একবার বলবে?”

“তা দিয়ে কী দরকার?”

“শোনো দিশা, তুমি বড় হয়ে গিয়েছ। তোমার মায়ের মতো আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না। তোমার জীবন তোমার।”

“এই জ্ঞান আমাকে না দিলেও চলবে।”

“প্লিজ শোনো। খুব ঝামেলা শুরু হয়েছে। ইনটিরিয়র এক গ্রামে পুলিশ-ভিলেজার্স সংঘর্ষের পর পলিটিক্যাল পার্টিগুলো রাস্তায় নেমে পড়েছে। কলকাতার রাস্তাতেও এখন দু’দলের ক্যাডাররা মারামারি করছে। তুমি ফিরবে কী করে?”

“আমি ফিরব না। আই হেট ইউ!”

ও-প্রান্ত একটু নীরব হল। তারপর বোঝানোর মতো করে শ্যামলেশ আবার উপস্থিত হলেন বিদিশার ফোনে, “প্লিজ। লিস্‌ন দিশা। আমার ধারণা তুমি সুস্থ নও। আমি তো আর তোমাকে শাসন করব না। জায়গাটা বলো। আমি নিজে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে আনতে।”

আর কোনও কথা আসছে না বিদিশার মাথায়। নেশা ও ক্রোধ—দুই মিলেমিশে তার চেতনাকে ঘুলিয়ে দিয়েছে। এক কথাই সে বলতে থাকল পাগলের মতো, “আই হেট ইউ…আই হেট ইউ…” হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল তার। নিচু হয়ে তুলতে যেতেই বমির ঝোঁক এল। দৌড়ে সে টয়লেটের দিকে গেল। ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাওয়া অর্ক ফোনটা তুলে ‘হ্যালো’ করতে ও প্রান্ত জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?”

ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল অর্ক, “আমি বিদিশার বন্ধু। অর্ক।”

“ও কোথায়?”

“বিদিশা বমি করছে বোধহয়। ওর ফোনটা পড়ে গিয়েছিল। আমি কুড়োলাম।”

“শোনো অর্ক, তুমি ছাড়া আর কে আছে বিদিশার সঙ্গে?”

“দীপ আছে।”

“হ্যাঁ, তোমরা কোথায় বলো তো?”

অর্ক উত্তরটা দেবার আগে একবার দেখে নিল দীপ কোথায়। দীপ আশেপাশে নেই। আবার কি ডান্সফ্লোরে গেল? একাই? অর্ক নাইট ক্লাবটার নাম বলে দিল ফোনে। ও প্রান্ত বলল, “প্লিজ, তোমরা ওয়েট করো। বাইরে ঝামেলা আছে। আমি যাচ্ছি।”

অর্ক তো-তো করল, “আপনি কি…”

উত্তর এল, “হ্যাঁ, আমি শ্যামলেশ সেন।”

ফোনটা কেটে গেল। অর্ক শ্যামলেশকে বলতেই পারল না দীপের গাড়িতে তারা এসেছে। দীপের গাড়িতেই তারা ফিরে যেতে পারে। যাক গে। হুইস্কি তাকেও তো দোলাচ্ছে। সে কোথায় দীপ, কোথায় বিদিশা, খুঁজতে চলল এলোমেলো।

আধঘণ্টার মধ্যেই শ্যামলেশ সেন এসে গেলেন নাইট ক্লাবে। দীপ নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। একটু রাগী ধরনের সে। ইচ্ছায় বাধা পড়লে বিস্ফোরিত হয়। অর্ক তবু ভেতরে কোথাও ভিতু। সে কাঁচুমাচু দাঁড়িয়ে ছিল। শ্যামলেশ প্রায় কোলে করে এলিয়ে-পড়া বিদিশাকে গাড়িতে তুললেন। তারপর অর্ককেও ডেকে নিলেন। অর্ককে বাড়ির কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে শ্যামলেশ সেন গাড়ি ছোটালেন হিন্দুস্থান পার্কের দিকে। বিদিশা পাশে ঘুমোচ্ছে।

ঘরে ফিরতেই ঘটনা। পাগলের মতো বিদিশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন জয়শ্রী। এলোমেলো চড় কষালেন। শ্যামলেশ আর ঠেকাতে পারছেন না যেন জয়শ্রীকে। কোনও ক্রমে জয়শ্রীকে তার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বিদিশাকে ওর ঘরে শুইয়ে দিলেন। তারপর জয়শ্রীর কাছে গেলেন। তাঁর মাথায় হাত রেখে বললেন, “নতুন সময়টাকে মেনে নাও, শ্রী। এসব এমন কিছু ব্যাপার না। এভাবেই ওরা ভাল-মন্দ শিখে যাবে।”

জয়শ্রী কেঁদে পড়লেন, “ও আমার ওপর রেগে গিয়েই এসব করছে।”

শ্যামলেশ বললেন, “এই বয়সটা অবুঝ হয়।”

জয়শ্রী আচমকা শ্যামলেশকে জড়িয়ে ধরলেন তীব্র ভাবে, “আর পারছি না। আমি কি অন্যায় করেছি কিছু? বলো…উঁ…উঁ…উঁ”। অপরাধবোধ আর অশ্রু-র মধ্যে তারা মিলিত হল বন্যতায়।