বিপিনের সংসার – ১০
দশম পরিচ্ছেদ
১
যেদিন বিপিন বাড়ি যাইবার ঠিক করিয়াছে, সেদিন সকালে দত্ত মহাশয়ের মেয়ে শান্তি তাহাকে চণ্ডীমণ্ডপে জলখাবার দিতে আসিল। একখানা কাঁসিতে চালভাজা ও নারিকেলকোরা, ইহাই জলখাবার। চা ইহারা বাঁধা নিয়মে খায় না, ক্বচিৎ কখনো সর্দি-কাশি হইলে ঔষধ হিসাবে খাইয়া থাকে। সুতরাং মেয়েটি যখন জলখাবারের কাঁসি নামাইয়া সলজ্জ কুণ্ঠার সহিত বলিল, সে চা খাইবে কিনা, বিপিন জিজ্ঞাসা করিল—চা হচ্চে?
মেয়েটি মৃদুকণ্ঠে বলিল, যদি খান তো করে নিয়ে আসি।
—না, শুধু আমার খাওয়ার জন্যে দরকার নেই।
—কেন দরকার নেই, নিয়ে আসচি।
উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই সে চলিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পরে এক পেয়ালা ধূমায়িত গরম চা আনিয়া দিল। দত্ত মহাশয়ের মেয়ে তাহার সহিত এত কথা ইহার পূর্বে কখনো বলে নাই, যদিও আর দু-একবার তাহাকে জলখাবার দিতে আসিয়াছিল। বিপিন ইহাদের বাড়ির আবরু কড়া বলিয়াই জানে।
মেয়েটি চা দিয়া তখনও দাঁড়াইয়া আছে দেখিয়া বিপিন ভাবিল পেয়ালা লইয়া যাইবার জন্যই সে দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে ব্যগ্রভাবে গরম চায়ের পেয়ালায় প্রাণপণে চুমুকের পর চুমুক দিতে দেখিয়া মেয়েটি হঠাৎ হাসিয়া বলিল, অমন করে তাড়াতাড়ি অত গরম খাওয়ার দরকার কি? আস্তে আস্তে খান—
বিপিন কথা বলিবার জন্যই বলিল, তুমি আর কত দিন আছ?
—এ মাসটা আছি।
—ও!
—আপনি নাকি আজ বাড়ি যাবেন?
—হ্যাঁ।
—ক’দিন থাকবেন?
—দিন পনেরো হবে।
মেয়েটি হঠাৎ বলিয়া ফেলিল—অত দিন?
পরক্ষণেই যেন কথাটা ও তাহার সুরটা ঢাকিয়া ফেলিবার জন্য বলিল—রুগীপত্তরও তো আছে আবার এদিকে—
—যদু ডাক্তার দেখবে আমার রুগী—একটা মোটে আছে।
—বাড়িতে কে কে আছেন?
—মা আছেন, আমার একটি বোন আর আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে।
—আপনার এখানে থাকতে খুব কষ্ট হয়, না?
—নাঃ, কি কষ্ট! বেশ আছি, তোমার বাবা যথেষ্ট স্নেহ করেন, বড় ভালো লোক।
—তবে আমাদের এখানেই থাকুন।
—আছিই তো। কোথায় আর যাব, ধরো—
—যদি আমাদের গাঁয়ে বাস করেন, আমি বাবাকে বলে আপনাকে জমি দেওয়াব। আসবেন?
বিপিন বিস্মিত হইল। কখনো এ মেয়েটি তাহার সম্মুখে এত দিন ভালো করিয়া কথাই কয় নাই—আজ এত কথায় তাহাকে পাইয়া বসিল কোথা হইতে? বলিল—তা কি করে হয়, পৈতৃক বাড়ি রয়েচে, সেখানে—
—কিন্তু ডাক্তারি তো এখানেই করতে হবে—
—সে তো বটেই।
—আপনি আজ বাড়ি যাবেন কখন?
—খেয়েদেয়ে যাব দুপুরে।
—আমি চলে যাবার আগে আসবেন কিন্তু—
—ঠিক আসব—নিশ্চয়ই আসব—
মেয়েটি চায়ের পেয়ালা ও কাঁসি লইয়া চলিয়া গেল।
বিপিন ভাবিল কেমন চমৎকার মেয়েটি। মনে বেশ মায়া আছে। হবে না কেন, কি রকম বাপের মেয়ে! দত্তমশায়ও চমৎকার মানুষ।
২
চা খাইয়া ডিসপেনসারিতে গিয়াই বিপিন যদু ডাক্তারের কাছে একখানি পত্র দিয়া একজন লোক পাঠাইয়া দিল—তাহার হাতের রোগীটা দেখিবার জন্য, যত দিন সে না ফেরে। তাহার পর দোর বন্ধ করিয়া বাহির হইবে, এমন সময়ে দরজার এক পাশে মেঝের উপর একখানা খামের চিঠি পড়িয়া আছে দেখিয়া সেখানা তুলিয়া লইল। ইতিমধ্যে কখন পিয়ন আসিয়া চিঠিখানা বোধ হয় দরজার ফাঁক দিয়া ফেলিয়া দিয়া গিয়াছে। খামখানার উপরকার হস্তাক্ষর দেখিয়া তাহার বুকের রক্ত যেন দুলিয়া উঠিল। এ লেখা মানীর হাতের লেখার মতো বলিয়া মনে হয় যেন! বাড়ির ঠিকানা ছিল, গ্রামের পোস্টমাস্টার সে ঠিকানা কাটিয়া এখানে পাঠাইয়াছে। নিশ্চয়ই মানীর চিঠি নয়—সে অসম্ভব ব্যাপার।
চিঠি খুলিয়া প্রথম দুই চার ছত্র পড়িয়াও সে কিছু বুঝিতে পারিল না, নিচের নামটা একবার পড়িয়া লইতে গিয়া তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল। মানীরই চিঠি। মানী লিখিয়াছে :—
আলিপুর
সোমবার
শ্রীচরণকমলেষু,
বিপিনদা, কতদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয় নি। কাল শেষরাত্রে তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি, যেন আমাদের বাড়ির মাঝের ঘরের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলচো। মন ভারি খারাপ হয়ে গেল, তাই চিঠি লিখছি তোমার বাড়ির ঠিকানায়। পাবে কিনা জানিনে।
বিপিনদা, কত দিন সারারাত জেগেছি তোমার কথা ভেবে। সর্বদা ভাবি, একটা কি যেন হারিয়েচি, আর কখনো পাব না। যদি পলাশপুরের চাকুরী না ছাড়তে, তবে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। আমি শ্বশুরবাড়ি এসে বাবার চিঠিতে জানলাম তুমি আর আমাদের ওখানে নেই। আমার কথা তুমি রাখলে না, আমি বলেছিলাম আমাকে না জানিয়ে চাকুরি ছেড়ে দিও না। কেনই বা রাখবে? আমার সত্যিই জানতে ইচ্ছে করে, তুমি আমার জন্যে কখনও কোনো দিন এতটুকু ভাবো কি না। হয়তো ভুলে গিয়েচ এতদিনে। হয়তো আমার এ চিঠি পাবেই না, যদি পাও, আমার কথা একটু মনে কোরো বিপিনদা। তুমি আজকাল কি করো, জানতে বড় ইচ্ছে হয়।
আমার ঠিকানা দিলাম না, এ পত্রের উত্তর চাই না। কত বাধা জানো তো সবই। তুমি যদি আমায় একটুও মনে করো চিঠিখানা পেয়ে, তাতেই আমার সুখ। আমার প্রণাম নিও। আশীর্বাদ করো, আর বেশি দিন না বাঁচি। ইতি—
মানী
বিপিন চিঠিখানা পকেটে রাখিয়া ডিসপেনসারির ভাঙা চেয়ারে বসিয়া পড়িল, এ কি অসম্ভব কাণ্ড হইয়া গেল! মানী তাহাকে চিঠি লিখিবে, একথা কখনও কি সে ভাবিয়াছিল? এতখানি মনে রাখিয়াছে তাহাকে সে?
অনেক দিন পরেই বটে। মানীর সঙ্গে কতকাল দেখা হয় নাই। আজ এই চিঠিখানার ভিতর দিয়া এতকাল পরে বহুদূরের মানীর সহিত আবার দেখা হইল। এতদিন কি নিঃসঙ্গ মনে করিয়াছে নিজেকে—সে নিঃসঙ্গতা যেন হঠাৎ এক মুহূর্তে দূর হইয়া গেল। মানী তাহার জন্য ভাবে, আর কি চাই সংসারে?
মানী লিখিয়াছে, সে কি করিতেছে জানিবার তাহার বড়ই আগ্রহ। যদি বলিবার সুবিধা থাকিত, তবে সে বলিত, মানী, কি করচি জানতে চেয়েচ, তুমি যে পথের সন্ধান আমায় দয়া করে দিয়েছিলে, সেই পথই ধরেচি। তোমার মুখ দিয়ে যে কথা বেরিয়েছিল, তাকে সার্থক করে তুলব আমি প্রাণপণে। তুমি যদি এসে দেখতে, এখানে ডাক্তারিতে আমি কেমন নাম করেচি, তা হলে কত আনন্দ পেতাম আজ। কিন্তু তা যে হবার নয়। কোনো রকমে যদি সে কথাটা জানাতে পারতাম।
বাড়ি ফিরিতেই দত্ত মহাশয়ের মেয়েটি তখনি আসিল। বলিল, উঃ, কত বেলা হয়ে গেল! আপনি কখন আর রান্না করবেন, কখনই বা খাবেন আর কখনই বা বেরুবেন?
—এই এখুনি তাড়াতাড়ি নিচ্চি।
—তার চেয়ে এক কাজ করি না কেন? আমি দুধ জ্বাল দিয়ে এনে দিচ্চি, আর বাবার জন্যে সরু চিঁড়ে তোলা থাকে তাই এনে দিচ্চি। রান্নার হাঙ্গামা এখন আর করবেন না।
—তাই হবে এখন তবে।
—নেয়ে আসুন, তেল দিয়ে যাই।
মেয়েটির এই নূতন ধরনের যত্ন বিপিনের ভালো লাগিতেছিল। বিদেশেবিভুঁয়ে এমন যত্ন কে করে?
স্নান করিতে গেল নদীতে—ক্ষীণকায়া নদী, স্থানীয় নাম মাৎলা, কচুরিপানার দামে বুজিয়া আছে। ওপারে বাঁশবন আর ফাঁকা মাঠ, এপারে নদীর ঘাটে যাইবার সুঁড়িপথের দুধারে কেলে-কোঁড়া ও শামলা লতার ঝোপ। শামলা লতায় এ সময় ফুল ফোটে, ভারি সুগন্ধ বাতাসে। ওপারে বাঁশবনে কুকো পাখি ডাকিতেছে। ধোপাখালি কাছারি থাকিতে একজন প্রজা একজোড়া কুকো পাখি তাহাকে দিয়া গিয়াছিল, বেশ সুস্বাদু মাংস।
মাৎলা নদীর যতখানি কচুরিপানায় বুজিয়া গিয়াছে, ততখানি জুড়িয়া সবুজ দামের উপর নীলাভ বেগুনি রঙের ফুল ফুটিয়াছে বড় বড় ডাঁটায়—যতদূর দেখা যায়, ততদূর ফুল, কি চমৎকার দেখাইতেছে!
আজ যেন সবই সুন্দর লাগিতেছে চোখে। যে মানীর সঙ্গে জীবনে আর দেখা হইবে না, তারই হাতের লেখা চিঠিখানা। কি অপূর্ব আনন্দ আর সান্ত্বনা বহন করিয়াই আনিয়াছে সেখানা আজ! সুপ্রভাত—কি অপূর্ব সুপ্রভাত!
দত্ত মহাশয়ের মেয়ে একবার বাহিরের উঠানে আসিয়া বলিল—জায়গা করি?
—করো, আমি যাচ্চি।
মেয়েটি যত্ন করিয়া আসন পাতিয়া জায়গা করিয়াছে, শুধু একখানা আসন দেখিয়া বিপিন বলিল, দত্ত মশায় খাবেন না?
—বাবা বাড়ি নেই, ওপাড়ায় বেরুলেন। তা ছাড়া এখনও রান্না হয়নি, শুধু আপনার চিঁড়ে দুধের ফলার—তাই আপনাকে খাইয়ে দিই। এতটা পথ আবার যাবেন—
সে একটি বড় কাঁসিতে ভিজানো চিঁড়ে লইয়া আসিল। বলিল, আপনি নাইতে গেলেন দেখে আমি চিঁড়েতে দুধ দিইচি—সরু ধানের চিঁড়ে, বেশি ভিজলে একেবারে ভাতের মতো হয়ে যায়—দাঁড়ান, কলা নিয়ে আসি—
কত যত্নের সহিত সে কলা ছাড়াইয়া দিল, গুড়ের বাটি হইতে গুড় ঢালিয়া দিল।
বিপিন খাইতে আরম্ভ করিলে বলিল, তেঁতুলের ছড়া-আচার খাবেন? বেশ লাগবে চিঁড়ের ফলারে। বলিয়াই উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া সে চলিয়া গেল, আসিতে কিছু বিলম্ব হইতে লাগিল দেখিয়া বিপিন ভাবিল, বোধ হয় আচার ফুরাইয়া গিয়াছে—মেয়েটি জানিত না, লজ্জায় পড়িয়া গিয়াছে বেচারি।
কিন্তু প্রায় দশমিনিট পরে সে একটা ছোট্ট পাথরের বাটিতে দু’তিন রকমের আচার আনিয়া সামনে রাখিয়া সলজ্জ কৈফিয়তের সুরে বলিল, আচারের হাঁড়ি, যে সে কাপড়ে তো ছোঁবার জো নেই, দেরি হয়ে গেল। এই যে করমচার আচার, এ আমি আর বছর করে রেখে গিয়েছিলাম, বাবা খেতে বড় ভালোবাসেন। দেখুন তো চেখে, ভালো আছে?
—বাঃ, বেশ আছে। তুমি আচার করতে জানো বড় চমৎকার দেখছি যে—
মেয়েটি লাজুক হাসি হাসিয়া বলিল, এমন আর কি করতে জানি, মা থাকতে শিখিয়েছিলেন। শ্বশুরবাড়িতে আমার শাশুড়িও অনেক রকম আচার করতে জানেন। এঁচড়ের আচার পর্যন্ত।
—আর কি কি আচার জানো?
—আমের জানি, নেবুর জানি, নংকার জানি—
—নংকার আচার বড় চমৎকার হয়, একবার খেয়েছিলাম—
—চিঁড়ে আর দুটো নেবেন?
—পাগল! পেট ভরে গিয়েচে, দুধ জ্বাল দেওয়া হয়েছে একবারে ঘন ক্ষীর করে—
খাওয়া শেষ করিয়া বিপিন বাহিরে আসিল। ভাবিল, বেশ মেয়েটি। এমন দয়া শরীরে, এমন মমতা, যেন নিজের বোনটির মতো বসে বসে খাওয়ালে।
মানীর কথা মনে পড়িল। মানী ও এই মেয়েটি যেন এক ছাঁচে ঢালাই, তবে প্রভেদও আছে, মানী মনে প্রেম জাগায় আর এ জাগায় স্নেহ ও শ্রদ্ধা।
কিছুক্ষণ পরে মেয়েটি একটা নেকড়ায় জড়ানো গোটাকতক পান আনিয়া বিপিনের হাতে দিয়া বলিল, পান ক’টা নিয়ে যান, রোদ্দুরে জলতেষ্টা পাবে, পথের জল খাবেন না কোথাও। কবে ফিরবেন?
বিপিন উঠানেই দাঁড়াইয়া ছিল, বলিল, আজ আর বাড়ি যাব না ভাবচি।
মেয়েটি অবাক হইয়া বলিল, যাবেন না?
—না, তাই বেলা দেখছিলাম এখানে দাঁড়িয়ে। এত দেরিতে বেরুলে পথেই রাত হবে।
—তবে যাবেন না আজ। মিছিমিছি চিঁড়ে খেলেন কেন, কষ্ট পাবেন সারাদিন।
—ফাঁকি দিয়ে চিঁড়ের ফলার করে নিলাম। রোজ তো অদৃষ্টে এমন ফলার জোটে না—
মেয়েটি সলজ্জ হাসিয়া বলিল, তা কেন, ভালোবাসেন চিঁড়ের ফলার? কালই আবার খাবেন।
বিপিনের ভারি ভালো লাগিল মেয়েটির এই কথাটা। এই অল্পক্ষণের মধ্যে মেয়েটি তার সরল মন ও কথাবার্তার গুণে বিপিনকে আকৃষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে।
মেয়েটি বাড়ির মধ্যে চলিয়া গেলেও বিপিনের মনে হইতে লাগিল, আবার যদি সে আসে, তবে বেশ ভালো হয়। বিপিনের এ ধরনের মনের ভাব হয় নাই অনেক দিন।
কিন্তু বহুক্ষণ সে আসিল না। না আসুক, বিপিন আর জালে জড়াইবে না। কেহই শেষ পর্যন্ত টেঁকে না ওরা। কেবল নাড়া দিয়া যায় এই মাত্র। কষ্টও দিয়া যায় খুব। মানী যেমন গিয়াছে, এও তেমনি চলিয়া যাইবে। দরকার কি এই সব আলেয়ার পিছনে ছুটিয়া?
মানী আলেয়া বটে—কিন্তু তার আলো তাহার মতো পথভ্রান্ত পথিককে পথ দেখাইয়াছে। খুবই কষ্ট হয় মানীর জন্য, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও কি ব্যথাভরা অপূর্ব আনন্দ নিয়ে আসে তাহার মুখখানি, তাহার সেই সপ্রেম দৃষ্টি মনে করিলে। সর্বদা তাহাকে দেখিতে পাইলে এ মনের ভার থাকিত না, এ কথা এখন সে বোঝে।
৩
দত্ত মহাশয় দিবানিদ্রা হইতে উঠিয়া বাহিরে আসিয়া বসিলেন। বলিলেন, শান্তি বলছিল, আপনি বাড়ি যাবেন বলে শুধু দুটি চিঁড়ে খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন সারাদিন—
—বলেছে বুঝি? কষ্টটা কি? না না—বেলা বেশি হল বলে আর যেতে পারলাম না। আপনার মেয়ে বড় যত্ন করেছে ওবেলা। বড় ভালো মেয়েটি—
—যত্ন আর কি করবে? আপনারা ব্রাহ্মণ, আমরা আপনাদের সেবাযত্ন করব সে তো আমাদের ভাগ্যি। সে আর এমন বেশি কথা কি—
দত্ত মহাশয় সেকেলে ধরনের গোঁড়া হিন্দু, ব্রাহ্মণের উপর তাঁহার অসাধারণ ভক্তি, কাজেই কথাটা তিনি অন্যভাবে লইলেন। কিছুক্ষণ বসিয়া জমিজমাসংক্রান্ত গল্প করিবার পর বলিলেন, এখানে কিছু ধানের জমি করে দিই আপনাকে। জমি সস্তা এখানে। বছরের ভাতের ভাবনা দূর হবে। ডাক্তারির ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে পসার সেখানে বাস।
দত্ত মহাশয় উঠিয়া চলিয়া গেলেন বাড়ির মধ্যেই। কিছুক্ষণ পরে দত্ত মহাশয়ের মেয়ে আসিয়া বলিল, বাবা বললেন, আপনি কিছু খেয়ে যান—
—কি খাব এখন?
—পরোটা ভেজেচি খানকতক, আপনি আর বাবা খাবেন—ভাত খান নি ওবেলা, খিদে পেয়েচে—
বিপিন স্বাস্থ্যবান যুবক, সত্যই তাহার ক্ষুধা পাইয়াছিল। এ সব ধরনের মেয়েমানুষে মনের কথা জানিতে পারে—মানীকে দিয়া সে দেখিয়াছে। অগত্যা সে বাড়ির ভিতর উঠিয়া গেল। মেয়েটি ওবেলার মতো যত্ন করিয়া খাওয়াইল—কিন্তু খুব বেশি কথা বলিল না, বোধ হয় দত্ত মহাশয় আছেন বলিয়াই।
দত্ত মহাশয় বলিলেন, আপনার ওবেলা খাওয়া হয় নি বলে আমি ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার মেয়ে ময়দা মাখতে বসেছে। আমি তো বিকেলে কিছু খাইনে। বললাম, কি হবে রে ময়দা এখন? তাই বললে, ডাক্তারবাবু ওবেলা ভাত খান নি, ওঁর জন্যে খানকতক পরোটা ভাজব। আমি তো তাতেই জানলাম।
ইতিমধ্যে গ্লাসে করিয়া একবার জল দিতে দত্ত মহাশয়ের মেয়ে কাছে আসিল। তাহার দিকে একবার ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিয়া বিপিনের মন শ্রদ্ধায় ও স্নেহে পূর্ণ হইয়া গেল। মেয়েটি দেখিতে ভালোই, মুখশ্রীও বেশ। এই নিঃসঙ্গ প্রবাস-জীবনে এমন একটি স্নেহপরায়ণা নারীর সান্নিধ্য পাওয়া সত্যই ভাগ্যের কথা।
বৈকালে সে নদীর ধার হইতে বেড়াইয়া আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়াছে, মেয়েটি আসিয়া বলিল, চা খাবেন?
বার বার তাহাকে খাটাইতে বিপিনের কুণ্ঠা হইল। সে বলিল, না থাক। একটা পান বরং—
—পান তো আনবই, চা-ও আনি। আপনি লজ্জা করেন কেন, চা তো আপনি খান—বললেই তৈরি করে দিই—
মিনিট কুড়ি পরে বিপিন চা খাইতে খাইতে মেয়েটির সঙ্গে কথাবার্তা বলিতেছিল। অত্যন্ত ইচ্ছা হইতে লাগিল, ইহার কাছে মানীর কথা বলিবার জন্য। এর মন সহানুভূতিতে ভরা, এ তাহার মনের কষ্ট বুঝিবে। বলিয়াও সুখ।
ইচ্ছা হইল বলে—শোন শান্তি, তোমার মতো একটি মেয়ের সঙ্গে আমার খুব আলাপ। সে আমাকে খুব ভালোবাসে, তোমার মতোই করুণাময়ী, মমতাময়ী সে। আজ তোমার সেবাযত্ন দেখে তার কথা কত মনে হচ্ছে জান শান্তি?
শান্তি বলিবে, বলুন না তার কথা, বড় শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে—
তারপর চোখে আগ্রহভরা দৃষ্টি লইয়া শান্তি তাহার সামনে বসিয়া পড়িবে, আর সে মানীর সহিত তাহার বাল্যের পরিচয়ের কাহিনী হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার সহিত শেষ সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত সব কথা বলিয়া যাইবে। বৈকাল উত্তীর্ণ হইয়া সন্ধ্যা নামিবে, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া নামিবে জ্যোৎস্নারাত্রি, বাঁশবনের মাথায় জ্যোৎস্নালোকিত আকাশে দু’দশটা নক্ষত্র উঠিবে, গাছপালা হইতে টপ টপ করিয়া শিশির ঝরিয়া পড়িবে, গ্রাম নিষুতি নিস্তব্ধ হইয়া যাইবে, ডোবার ধারের জগডুমুর গাছের খোড়লে রোজকার মতো লক্ষ্মীপেঁচাটা ডাকিবে, তখনও শান্তি গালে হাত দিয়া তন্ময় হইয়া এই অপূর্ব কাহিনী শুনিয়া যাইতেছে ও মাঝে মাঝে আর্দ্র চক্ষু আঁচল দিয়া মুছিতেছে, আর সে অনবরত বলিয়াই চলিয়াছে—তবুও হয়তো বলা শেষ হইবে না, হয়তো বা বলিতে বলিতে পুবে ফরসা হইয়া যাইবে, কাক কোকিল ডাকিয়া উঠিবে, ভোরের কুয়াসায় মাৎলার ধারের আম-শিমুলের বাগান অস্পষ্ট দেখাইবে, অথচ শান্তি উঠিবে না, শেষ পর্যন্ত ঠায় বসিয়া শুনিবে।
একথা বলা যায় কার কাছে? যে মন দিয়া শোনে, যে ভালোবাসে, সহানুভূতি দেখায়—যার মনে স্নেহ আছে, দয়া আছে, মায়া আছে সে বুঝিবে, অন্যে কি বুঝিবে?
তেমনি মেয়ে এই শান্তি।
কোন দূর নক্ষত্রের দেবলোক হইতে শান্তির মতো মেয়েরা, মানীর মতো মেয়েরা পৃথিবীতে জন্ম নেয়!
চা খাওয়া হইলে শান্তি পান আনিল।
বিপিন বলিল, তুমি এখানে আর কতদিন থাকবে শান্তি?
—এ মাসটা আছি।
—তুমি চলে গেলে আমার বড় খারাপ লাগবে—
কথাটা বলিয়া ফেলিয়াই কিন্তু বিপিনের মনে হইল, মেয়েটিকে এরূপ বলা উচিত হয় নাই! এ সব ধরনের কথা বলা হয়, যখন পুরুষ নারীমনের মুকুলিত প্রেমকে ফুটাইতে চায়। বিবাহিতা মেয়ে, কাল শ্বশুরবাড়ি চলিয়া যাইবে—প্রেম জাগিলে মেয়েটিই কষ্ট পাইবে। বিপিন আর ও-পথে পা দিবে না। মেয়েটি বোধ হয় সহজ ভাবেই কথাটা গ্রহণ করিল, নতুবা তাহার চোখে লজ্জা ঘনাইয়া আসিত। মানীকে দিয়া বিপিন ইহা অনেকবার দেখিয়াছে।
সে সরল ভাবেই বলিল, কেন?
বিপিন ততক্ষণে সামলাইয়া লইয়াছে। হাসিয়া বলিল—দুধচিঁড়ের ফলার ঘন ঘন যোগাড় হবে না!
বলিয়াই যেন পূর্ব কথাটা পেটুক লোকের খেদোক্তি ছাড়া আর কিছুই নহে, প্রমাণ করিবার জন্য সে নিজেই হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।
অনেক সময় প্রেম আসে করুণা ও সহানুভূতির ছদ্মবেশে। দত্ত মহাশয়ের মেয়ে সরলা পল্লীবালা, লোককে খাওয়াইয়া মাখাইয়া সে হয়তো খুশি—একটা লোক কোনো একটা বিশেষ জিনিস খাইতে ভালোবাসে, অথচ সে চলিয়া গেলে লোকটা তাহার প্রিয় সুখাদ্য হইতে বঞ্চিত হইবে ইহা তাহার মনে সত্যকার করুণা জাগাইল!
সে মনে মনে ভাবিল, আহা, ডাক্তারবাবু সরু ধানের চিঁড়ে খেতে এত ভালোবাসেন! আমি চলে গেলে কে দেবে? উনি যে মুখচোরা। কাউকে বলতেও পারবেন না!
মুখে বলিল, আমার শ্বশুরবাড়িতে কনকশাল ধানের চিঁড়ে হয়, খুব ভালো সরু চিঁড়ে আর কি সুগন্ধ! চিঁড়ে ভেজালে গন্ধ ভুর-ভুর করে ঘরে। আমাদের বাড়ির চেয়েও ভালো। আমি গিয়ে আপনার জন্যে পাঠিয়ে দেব।
বিপিন ভাবিল, তা দেবে তা জানি। তোমাদের আমি চিনি।
সন্ধ্যা হইয়া আসিল দেখিয়া শান্তি দ্রুতপথে সন্ধ্যাপ্রদীপ দিতে গেল।
