Accessibility Tools

বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিপিনের সংসার – ৯

নবম পরিচ্ছেদ

বিপিন থাকে দত্ত মহাশয়ের চণ্ডীমণ্ডপে, পাশের একখানা ছোট চালাঘরে রাঁধিয়া খায়। দত্ত মহাশয় বাড়ি হইতেই প্রতিদিন চালডাল দেন, বিপিনের তাহা লইতে বাধ-বাধ ঠেকিলেও উপায় নাই, বাধ্য হইয়া গ্রহণ করিতে হয়।

একদিন রোগী দেখিয়া সে একটি টাকা পাইল। দত্ত মহাশয়ের নাতিকে ডাকিয়া বলিল, হীরু, আজ তোমার মাকে বল, আজ আর আমায় সিধে পাঠাতে হবে না, রুগী দেখে কিছু পেয়েছি, তা থেকে জিনিসপত্র কিনে আনব।

এখানে কিছুদিন থাকিয়া সে দেখিল একটা ডাক্তারখানা না খুলিলে ব্যবসা ভালো করিয়া চলিবে না। পাশের গ্রামের নাম কাপাসডাঙা, সেখানে সপ্তাহে দুইবার হাট বসে, আট-দশখানি গ্রামের লোক একত্র হয়। দত্ত মহাশয়ের সহিত পরামর্শ করিয়া সেখানে হাটতলায় এক চালাঘরে টিনের উপর আলকাতরা দিয়া নিজের নাম লিখিয়া ঝুলাইল। একটা কেরোসিন কাঠের টেবিলে অনেকগুলি পুরনো শিশি বোতল সাজাইয়া দত্ত মহাশয়ের চণ্ডীমণ্ডপ হইতে সেই হাতল-ভাঙা চেয়ারখানা চাহিয়া আনিয়া টেবিলের সামনে পাতিয়া রীতিমতো ডিসপেনসারি খুলিয়া বসিল।

এ গ্রামেও লোক নাই, যেখানে সে থাকে সেখানেও লোক নাই। তাহার উপর নিবিড় জঙ্গল দুই গ্রামেই। দিনমানেই বাঘ বাহির হয় এমন অবস্থা। কথা কহিবার মানুষ নাই। সকালে উঠিয়া সে এখানে আসিয়া ডাক্তারখানায় বসে, দুপুরে ফিরিয়া স্নান ও রান্নাবান্না করে। আহারান্তে কিছু বিশ্রাম করিয়া আবার হাটতলায় আসিয়া ডাক্তারখানা খোলে। চুপ করিয়া সন্ধ্যা পর্যন্ত বসিয়া থাকে, তারপর অন্ধকার ভালো করিয়া হইবার পূর্বেই দত্তবাড়ি ফিরিয়া যায়, কারণ পথের দুধারের বনে বাঘের ভয় আছে।

রোগী বিশেষ আসে না। এসব অজ পাড়াগাঁয়ে লোকে চিকিৎসা করাইতে শেখে নাই, ঝাড়-ফুঁক শিকড়-বাকড়েই কাজ চালায়। বিপিন তাহা জানে, কিন্তু জানিয়া উপায় কি? তাহার মতো হাতুড়ে ডাক্তারের কোন শহরে স্থান হইবে?

বাড়িতে তাহার বাবার একজোড়া পুরনো চশমা পড়িয়া ছিল, সেটা সঙ্গে আনিয়াছিল, ডাক্তারখানায় বসিবার বা দৈবাৎপ্রাপ্ত কোনো রোগীর বাড়ি যাইবার সময়ে সেই চশমা চোখে লাগায়। কিন্তু সব সময় রাখা যায় না, সে চশমার কাচের ভিতর দিয়া সব যেন ঝাপসা দেখায়, যুবকের চোখের উপযুক্ত চশমা নয়, কাজেই অধিকাংশ সময়েই চশমা চোখ হইতে খুলিয়া পুঁছিবার ছুতা করিয়া হাতে ধরিয়া রাখিতে হয়।

আশপাশের গ্রাম হইতে মাঝে মাঝে লোক হাটবারে আসিয়া ডিসপেনসারিতে বসে। তাহারা প্রায়ই নিরক্ষর চাষী, চশমা-পরা ডাক্তারবাবুকে দেখিয়া সম্ভ্রমের সহিত বলে, স্যালাম ডাক্তারবাবু, ভালো আছ? আপনার ডিসপিনসিল ভালো চলছেন?

নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, বড্ড ডাক্তার গো! ভালো জায়গার ছাওয়াল, হাতের পানি খালি’ ব্যামো সারে! চেহারাখানা দ্যাখচ না চাচা?

কিন্তু ওই পর্যন্ত। পসার যে খুব বেশি জমে তা নয়। ইহারা নিতান্ত গরিব, পয়সা দিবার ক্ষমতা ইহাদের নাই।

একদিন একজন লোক তাহাকে আসিয়া বলিল, ডাক্তারবাবু, আপনাকে একটু দয়া করে যাতি হবে, রুগীর অবস্থা খুব সঙ্গীন। নরোত্তমপুরের যদু ডাক্তার এয়েছেন, আপনার নাম শুনে বললেন আপনারে ডাকতি। সলাপরামর্শ করবার জন্যি।

বিপিন গতিক সুবিধা বুঝিল না। যদু ডাক্তারের নাম সে শুনিয়াছে, তাহারই মতো হাতুড়ে বটে তবে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, অনেক দিন ধরিয়া নাকি এ কাজ করিতেছে আর সে একেবারে নূতন, যদি বিদ্যা ধরা পড়িয়া যায় তবে পসার একেবারে মাটি হইবে। বিপিন লোকটাকে তাড়াইবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর মুখে কহিল, ওসব কনসাল করার ফি আলাদা। সে আপনি দিতে পারবেন?

—কত লাগবে বাবু? যদুবাবু যা বলে দেবেন তাই দেব।

—যদুবাবুর সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক? তিনটাকা ফি দিতে পারবে?

—হ্যাঁ বাবু, চলুন, তিনডে টাকাই দেবানি। মনিষ্যি আগে, না টাকা আগে?

এত সহজে লোকটা রাজি হইবে, বিপিন ভাবে নাই। বিপদ তো ঘাড়ে চাপিয়া বসিল দেখা যাইতেছে। বলিল, গাড়ি নিয়ে আসতে হবে কিন্তু। হেঁটে যাব না।

রোগীর বাড়ি পৌঁছিয়া বিপিন দেখিল বাহিরের ঘরে একজন রোগামতো প্রৌঢ় লোক বসিয়া বিড়ি টানিতেছে, গায়ে কালো সার্জের কোট ও সাদা চাদর, পায়ে কেম্বিসের ফিতা-আঁটা জুতা। বুঝিল ইনিই যদু ডাক্তার। বিপিনের বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করিতে লাগিল।

প্রৌঢ় লোকটি হাসিয়া কালো দাঁতগুলি বাহির করিয়া বলিল, আসুন ডাক্তারবাবু আসুন, নমস্কার। এসেছেন এ দেশে যখন তখন দেখা একদিন না একদিন হবেই ভেবে রেখেছি। বসুন।

বিপিন নমস্কার করিয়া বসিল। পাড়াগাঁয়ের চাষীলোকের বাহিরের ঘর, অন্তঃপুর যেদিকে, সেদিকে কেবল মাটির দেওয়াল, অন্য কোনো দিকে দেওয়াল নাই। নতুন ডাক্তারবাবুকে দেখিবার জন্য বহু ছেলেমেয়ে ও কৌতূহলী লোক উঠানে জড় হইয়াছে।

এতগুলি লোকের কৌতূহলী দৃষ্টির কেন্দ্রস্বরূপ হওয়াতে বিপিন রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিল। কিন্তু ইহাও সে বুঝিল আজ যদি সে জয়ী হইয়া ফেরে, তবে তাহার নাম ও পসার আজ হইতেই এ অঞ্চলে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবে। জিতিতেই হইবে তাহাকে যে করিয়াই হউক।

যদু ডাক্তার বলিল, আপনার পড়াশুনা কোথায়?

বিপিন একটা জিনিস লক্ষ করিয়াছিল যদু ডাক্তার সম্পর্কে, লোকটা শিক্ষিত নয়। বিপিন মামলা মোকদ্দমা সম্পর্কে রানাঘাটে অনেক উকিল-মোক্তারের সঙ্গে মিশিয়াছে, তাহাদের কথাবার্তার সুর ও ধরন অন্য রকম। সে চশমার ভিতর দিয়া যেন সম্মুখের নারিকেল গাছের মাথার দিকে চাহিয়া আছে এমন ভাবে চশমাসুদ্ধ নাকের ডগাটি খুব উঁচু করিয়া বেপরোয়া ভাবে বলিল, ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে।

—ও! কোন বছর পাশ করেছেন?

—আজ তিন বছর হল।

—এদিকে কতদূর পড়াশুনা করেছিলেন?

লোকটা নিতান্ত গেঁয়ো বটে। ভালো লেখা-পড়া-জানা লোকে এসব কথা প্রথম পরিচয়ের সময় জিজ্ঞাসা করে না। মানীদের বাড়ি সে এতকাল বৃথাই কাটায় নাই। সে খুব চালের সহিত বলিল, আই এসসি পাশ করে ক্যাম্বেল স্কুলে ঢুকি।

যদু ডাক্তার যেন বেশ একটু ঘাবড়াইয়া গেল। বলিল, তা বেশ বেশ।

বিপিন মানীর প্রদত্ত ডাক্তারি বইগুলি পড়িয়া এটুকু বুঝিয়াছিল রোগ নির্ণয় জিনিসটা বড় সহজ নয় এবং ইহা লইয়া ডাক্তারে ডাক্তারে মতভেদ ঘটিলে সাধারণ লোকের পক্ষে ইহা বোঝা শক্ত যে কোন ডাক্তারের মত অভ্রান্ত।

সে বলিল, এ বাড়ির পেশেন্টের রোগটা কি?

—রেমিটেন্ট ফিভার, সঙ্গে রক্ত-আমাশা আছে, দেখুন আপনি একবার!

বিপিন ও যদু ডাক্তার বাড়ির মধ্যে গেল। রোগীর বয়স উনিশ-কুড়ির বেশি নয়, চেহারা রোগের পূর্বে ভালো ছিল, বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে।

বিপিনকে যদু ডাক্তার বলিল, আপনি দেখুন আগে।

বিপিন অনেকক্ষণ ধরিয়া নাড়ী টিপিয়া বুকেপিঠে নল বসাইয়া পিঠ বাজাইয়া বুক বাজাইয়া দেখিয়া বলিল, একটু নিমোনিয়ার ভাব রয়েছে।

যদু ডাক্তার তাড়াতাড়ি বিপিনের মতেই মত দিয়া বলিল, আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটা আমি লক্ষ করেছি।

বিপিন সাহস করিয়া আন্দাজে বলিল, টাইফয়েডের দিকে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। আজ ন’ দিনের দিন বললেন না?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, ন’ দিন। টাইফয়েডের কথা আমারও মনে হয়েছে—

বিপিন দেখিল লোকটা ভড়কাইয়া গিয়াছে, তাহার মতে মত দিতে খুবই আগ্রহ দেখাইতেছে। বলিল, আপনি একটা ভুল করেছেন যদুবাবু, কুইনেনটা দেওয়া উচিত হয় নি। প্রেসক্রিপশনটা দেখি ক’দিনের!

যদু সত্যই ভয় খাইয়া গিয়াছিল। সে দুখানা প্রেসক্রিপশন বিপিনের হাতে দিয়া ভয়ে ভয়ে বিপিনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সে হাতুড়ে ডাক্তার আর এ তরুণ যুবক, ক্যাম্বেল স্কুল হইতে বছর দুই পাশ করিয়াছে, আধুনিক ধরনের কত রকমের চিকিৎসা-প্রণালীর সহিত পরিচিত! কি ভুলই না জানি বাহির করিয়া বসে! যদু ডাক্তারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল।

কিন্তু বিপিন বুঝিল অনেক দূর আগাইয়াছে, আর বেশি উচিত নয়। যদু ডাক্তারকে হাতে রাখিলে এ সব পাড়াগাঁয়ে অনেক সুবিধা। এ-অঞ্চলে তাহার যথেষ্ট পসার, সলাপরামর্শ করিতেও দু’চার টাকা ভিজিট জুটাইয়া দিতে পারা তাহার হাতের মধ্যে।

সে গম্ভীর সুরে বলিল, চমৎকার প্রেসক্রিপশন। ঠিকই দিয়েছেন। কিছু বদলাবার নেই।

যদু ডাক্তার একবার সগর্বে চারিধারে সমবেত লোকজনের দিকে চাহিল। তাহার মন হইতে বোঝা নামিয়া গিয়াছে।

—যদুবাবু, একটু গরম জলের ফোমেন্ট করলে বোধ হয় ভালো হয়।

—আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আমিও কাল থেকে তাই ভাবছি—

—আর একবার জোলাপটা দেওয়ান—

—জোলাপ? নিশ্চয়ই। আমিও তা—

ফিরিবার পূর্বেই দুজনে খুব বন্ধুত্ব হইয়া গেল। দুজনের কেহই বুঝিতে পারিল না, পরস্পরকে তাহারা বুঝিয়া ফেলিয়াছে কিনা।

হাটতলায় বিপিনকে রোগীর আশায় বসিয়া থাকিতে হয় প্রায় সারদিনই। রোগী যদি আসিত, তবে চুপ করিয়া নিষ্কর্মা বসিয়া থাকিবার কষ্ট হয়তো পোষাইত, কিন্তু রোগী আসে না।

প্রথম মাস দুই রোগী হইয়াছিল, যদু ডাক্তারও কয়েকটি জায়গায় পরামর্শ করিবার জন্য তাহাকে ডাকাইয়া লইয়া গিয়াছিল, প্রথম মাসে কুড়ি এবং দ্বিতীয় মাসে পঁয়ত্রিশ টাকা আয় হইবার পরে বিপিনের মনে নতুন আশা, আনন্দ ও উৎসাহের সঞ্চার হইয়াছিল। পাঁচ টাকা ব্যয় করিয়া সে কলিকাতা হইতে ডাকে একখানা বাংলা ‘জ্বর-চিকিৎসা’ বলিয়া বই আনাইল। ভারি উপকার হইল বইখানি পড়িয়া। যদু ডাক্তারের ইচ্ছা ছিল তাহাকে দিয়া অসলারের বিখ্যাত বইখানা কেনাইবে। বিপিন বলিতে পারে না যে সে ইংরাজি এমন কিছু জানে না যাহাতে করিয়া সে অসলারের বই বুঝিতে পারে। সুতরাং সে কোনোরূপে এড়াইয়া পাশ কাটাইয়া চলিতে লাগিল। তৃতীয় মাস হইতে কেন যে দুরবস্থা ঘটিল, তাহা সে বোঝে না।

প্রথম দুই সপ্তাহ তো শুধু বসিয়া। কে একজন এক ডোজ ক্যাস্টর অয়েল লইয়া গিয়াছিল, দুই সপ্তাহের মধ্যে সে-ই একমাত্র রোগী ও খরিদ্দার।

মুদির দোকানে বাকি পড়িতে লাগিল, ডাক্তারবাবু বলিয়া খাতির করে তাই ধারে জিনিস দেয়, নতুবা কি বিপদেই পড়িতে হইত!

একদিন চুপ করিয়া বসিয়া আছে, প্রায় সন্ধ্যার সময় একজন লোক বিপিনের ডাক্তারখানার চালাঘরের সামনে দাঁড়াইয়া বলিল, এইটে কি ডাক্তারখানা?

বিপিনের বুকের মধ্যে কেমন করিয়া উঠিল।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, এসো, কোত্থেকে আসচো বাপু?

—আপুনিই ডাক্তারবাবু? পেন্নাম হই। আপনাকে যাতি হবে নরোত্তমপুর। যদুবাবু ডাক্তার চিঠি দিয়েছেন, এই নিন।

লোকটা একটা চিরকুট কাগজ বিপিনের হাতে দিল। বিপিন পড়িয়া দেখিল কলেরার রোগী, যদু ডাক্তার লিখিয়াছে তাহার স্যালাইন দিবার তোড়জোড় নাই, বিপিনকে সে সব লইয়া শীঘ্র আসিতে। বিলম্ব করিলে রোগী বাঁচিবে না।

স্যালাইন দিবার তোড়জোড় বিপিনেরও নাই। কিন্তু বিপিন একটা ব্যাপার বুঝিয়া ঠিক করিয়া লইল। জলে লবণ গুলিয়া শিরার মধ্যে ঢুকাইয়া দিতে বেশি বেগ পাইতে হইবে না। চিকিৎসা করিবার সাহস আছে বিপিনের। সে বাহির হইয়া পড়িল।

—শোনো, আমার বাক্সটা নিয়ে চল, পাঁচ টাকা দিতে হবে কিন্তু—

—চলেন বাবু আপুনি। যদুবাবু যা বলে দেবেন, তাই পাবেন।

রোগীর বাড়িতে পৌঁছিয়া গৃহস্থের সাধারণ অবস্থা দেখিয়া বিপিন ভাবিল, ইহাদের নিকট হইতে পাঁচ টাকা তো দূরের কথা, এক টাকা কি আট আনা পয়সা লইতেও বাধে।

যদু ডাক্তার বলিল, স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়, বিপিনবাবু।

রোগীর ব্যাপার খুব সুবিধার নয়, বিপিন নাড়ী দেখিয়া বুঝিল। বলিল, এ তো শেষ হয়ে এসেছে যদুবাবু। এরকম ঘাম হচ্ছে, নাড়ী নেমে যাচ্ছে, কতক্ষণ টিকবে?

যদু ডাক্তার বিপিনের অপেক্ষা অনেক অভিজ্ঞ লোক। সে আজ আট দশ বৎসর এই অঞ্চলে বহু রোগী ও বহু প্রকার রোগের অবস্থা দেখিয়া আসিতেছে। সে বলিল, স্যালাইন দিন আপনি—টিকে যেতে পারে।

বিপিনের জিদ চাপিয়া গেল। সে বলিল, নুন জলে গুলে ওর শির কেটে ঢুকিয়ে দিতে হবে। অন্য কিছু ব্যবস্থা নেই। কিন্তু রোগী তার মধ্যে মারা না যায়—

—আপনি শির কেটে নুনজল ঢোকান, আমি ওর মধ্যে নেই।

বিপিন অসীম সাহসী মানুষ। যে আসুরিক চিকিৎসা করিতে অভিজ্ঞ পাশ-করা ডাক্তার ভয় খাইত, বিপিন তাহা অনায়াসে বুক ঠুকিয়া করিয়া ফেলিল।

যদু বিপিনের কাণ্ড দেখিয়া ভয় খাইয়া বলিল—কত সি.সি. দেবেন বিপিনবাবু?

—সি.সি.-ফি. সি. কি মশাই এতে? বাংলা নুনগোলা জল, তার আবার সি. সি.! দেখুন আমি কি করি, আপনি যখন হাত দিচ্ছেন না!

এ পল্লীগ্রামের কোনো লোক এ ধরনের কাণ্ড দেখে নাই, ঘরের দোরের কাছে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া সবাই বিপিনের ক্রিয়াকলাপ দেখিতে লাগিল।

হঠাৎ রোগী একেবারে অসাড় হইয়া পড়িল।

যদু ডাক্তার বলিল, বিপিনবাবু, হয়ে গেল বোধ হয়!

—হয় নি। ভয় খাবেন না—

বিপিনের কথা কেহ বিশ্বাস করিল না। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়িয়া গেল। বিপিন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া সতেজ রাখিবার জন্য একটা ইনজেকশন করিল, যদু ডাক্তারের বারণ শুনিল না।

যদু বলিল, আপনি যা হয় করুন বিপিনবাবু, আমায় যেন এর পরে কেউ দোষ না দেয় তা বলে রাখছি।

বিপিন বলিল, যদুবাবু, সব সময় বই পড়ে ডাক্তারি চলে না, অন্ধকারে লাফিয়ে পড়তে হয়। বাঁচে না বাঁচে রোগী—আমার যা ভালো মনে হচ্ছে তা করে যাব।

যদু ডাক্তার বাহিরে চলিয়া গেল।

রোগী আর নাই বলিলেই হয়। কান্নাকাটি বেজায় বাড়িয়াছে ঘরের বাহিরে। বিপিন আর দুবার ইনজেকশন করিল, রোগীর বিছানার পাশ ছাড়িয়ে সে একটুও নড়িল না। তাহাকে যেন কি একটা নেশায় পাইয়াছে, কিসের ঘোরে সে কাজ করিয়া যাইতেছে সে নিজেই জানে না। আরও আধ ঘণ্টা পরে রোগী চোখ মেলিয়া চাহিল। রোগীর চোখের চাহনি দেখিয়া বিপিনের মন আহ্লাদে নাচিয়া উঠিল যেন, সে লোকজন ঠেলিয়া বাহিরে গিয়া দেখিল যদু ডাক্তার উঠানের গোলার তলায় দাঁড়াইয়া বিড়ি টানিতেছে ও কয়েকজন গ্রাম্য লোকের সহিত কি কথা বলিতেছে।

—আসুন যদুবাবু, একবার নাড়ীটা দেখুন তো! আর ভয় নেই, সামলে নিয়েছে।

যদু ডাক্তার আসিয়া রোগী দেখিয়া বলিল, বেঁচে গেল এ যাত্রা। ওকে যমের মুখ থেকে টেনে বার করলেন মশাই!

যে ঘরে রোগী শুইয়া আছে, সে ঘরের মেঝেতে বন্যার জল কিছুদিন আগেও ছিল প্রায় একহাঁটু, বাঁশের মাচার উপর রোগী শুইয়া, ঘরের চারিদিকে চাহিয়া বিপিন দেখিল কয়েকটি দড়ির শিকা এবং ছেঁড়া কাঁথার পুঁটুলি ও হাঁড়িকুড়ি ছাড়া অন্য আসবাব নাই। ইহাদের কাছে ভিজিটের টাকা লইতে পারা যায়?

বিপিন ও যদু বাহিরে চলিয়া আসিল। যদু বলিল, একটা ডাব খাবেন? ওরে ব্যাটারা, ইদিকে আয়, ডাক্তারবাবুকে একটা ডাব কেটে খাওয়া।

গ্রামসুদ্ধ লোক ঝুঁকিয়া পড়িয়া বিপিনের চিকিৎসা দেখিয়াছিল। সকলে বলাবলি করিতে লাগিল, এত বড় ডাক্তার বা এমন চিকিৎসা তাহারা জ্ঞানে কখনও দেখে নাই। যদু ডাক্তার লোকটা চালাক, দেখিল এ স্থানে বিপিনের প্রশংসা করিলেই সে নিজেও খাতির পাইবে, নতুবা লোকে ভাবিবে যদু ডাক্তারের হিংসা হইয়াছে। সুতরাং সে বক্তৃতার সুরে সমবেত লোকজনের সামনে বলিল, ডাক্তার অনেক দেখিচি, কিন্তু বিপিনবাবুর মতো সাহস কোনো ডাক্তারের দেখিনি। হাজার হোক পেটে বিদ্যে আছে কিনা! ভয়ডর নেই কিছুতেই।

একজন লোক গোটাচারেক কচি ডাব কাটিয়া আনিল। বিপিন বলিল, আমাদের ডাব তো দিচ্ছ, রোগীকে এখন অনবরত ডাবের জল দিতে হবে, সে তৈরি আছে তো?

—খান বাবু, আপনাদের ছিচরণ আশীব্বাদে দশটা নারিকেলের গাছ বাড়িতে। বাবু, শহর বাজার হ’লি এই গাছ কডার ফল বিক্রি করে বেশ কিছু প্যাতাম, এখানে জিনিসের দর নেই। কাপাসডাঙার হাটে ডাব একটা এক পয়সা, তাও খদ্দের নেই।

ফিরিবার সময় বিপিন ভিজিট লইতে চাহিল না। যদু ডাক্তার অনেক করিয়া বুঝাইল, পাড়াগাঁয়ে সবই এই রকম অবস্থার মানুষ। তাহা হইলে চলিবে কি করিয়া যদি ইহাদের নিকট ভিজিট না লওয়া যায়?

বিপিন বলিল—তা হোক, যদুবাবু। আমি ডাক্তারি করছি শুধুই কি নিজের জন্যে, অপরের দিকটাও দেখি একটু। আচ্ছা যাই, আজ হাটবার, ডাক্তারখানা খুলি গিয়ে ওখানে। লোক এসে ফিরে যাবে।

বিপিন ভিজিট লইবে কি, মানীর কথা এসময় অনবরত মনে পড়িতেছে। মানী তাহাকে এ পথে নামাইয়াছে, যদি সে কোনো গরিব রোগীর প্রাণদান দিয়া থাকে তবে তাহার বাপমায়ের আশীর্বাদ মানীর উপর গিয়া পড়ুক। মানীর লাভ হউক। এই অতি দুরবস্থাগ্রস্ত রোগীর নিকট সে মোচড় দিয়া টাকা আদায় করিলে মানীর স্মৃতির সম্মান ঠিকমতো বজায় রাখা হইত না।

কাপাসডাঙার হাটতলায় যখন সে ফিরিয়া আসিল তখন বেলা পড়িয়া আসিয়াছে।

আজ এখানকার হাটবার, পাড়াগাঁয়ের ছোট হাট, সবসুদ্ধ একশো কি দেড়শো লোক জমিয়াছে, খুচরো ঔষধ কিছু কিছু বিক্রয় হইয়া থাকে।

কুমড়া বেগুন বিক্রয় করিয়া যে যেখানে চলিয়া গেল। বিপিন ডাক্তারখানা বন্ধ করিয়া পাশে বিষ্ণু নাথের মুদির দোকানে হ্যারিকেন লণ্ঠনটি ধরাইতে গেল। বিষ্ণু খরিদ্দারকে খৈল আর ক্রাসিন তৈল মাপিয়া দিতেছে। বিপিন বলিল, বিষ্ণু, বাড়ি যাবে না?

বিষ্ণু বলিল, আমার এখনও অনেক দেরি ডাক্তারবাবু। এখন তবিল মেলাব, কালকের তাগাদার ফর্দ তৈরি করব, আপনি যান। হ্যাঁ ভালো কথা, আপনার যে ভারি সুখ্যাত শোনলাম!

—কে করলে সুখ্যাত?

—ওই সবাই বলাবলি করছিল। আজ কোথায় রুগী দেখে এলেন, তাকে নাকি শির কেটে নুনগোলা জল ঢুকিয়ে কলেরার রুগী একেবারে বাঁচিয়ে চাঙ্গা করে দিয়ে এসেছেন, এই সব কথা বলছিল। সবারই মুখে ওই এক কথা।

যাহারা প্রশংসা চিরকাল পাইয়া আসিতেছে, তাহারা জানে না জীবনে কত লোক আদৌ কখনো ও জিনিসটার আস্বাদ পায়ই না। বিপিনকে ভালো বলিয়াছিল কেবল একজন, সে গেল অন্য ধরনের ব্যাপার। কাজ করিয়া অনাদিবাবুর সুখ্যাতি সে কোনোদিনই অর্জন করিতে পারে নাই। এই প্রথম লোকে অযাচিতভাবে তাহার কাজকে ভালো বলিতেছে, তাহার ব্যক্তিত্বকে সম্মান দিতেছে, মানুষের জীবনে এ অতি মূল্যবান ঘটনা।

বিষ্ণু আরও বলিল, ডাক্তারবাবু, আপনি নাকি ওরা গরিব বলে এক পয়সা নেন নি? সবাই বলছিল, কি দয়ার শরীর! মানুষ না দেবতা! গরিব বলে শুধু একটা ডাব খেয়ে চলে এলেন বাবু!

হ্যারিকেন লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে দুধারের ঘন বনের ভিতরকার সুঁড়িপথ বাহিয়া বিপিন প্রায় দেড় মাইল দূর রামনিধি দত্তের বাড়ি ফিরিল।

দত্ত মহাশয় চণ্ডীমণ্ডপেই বসিয়া বিষয়সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখিতেছিলেন। তক্তপোশের উপর মাদুর বিছানো, সামনে কাঠের বাক্স, তাহার উপরে লণ্ঠন।

বলিলেন, আসুন ডাক্তারবাবু, আজ বাড়িতে আমার জামাই-মেয়ে এসেছে অনেক দিন পরে। আজ একটু খাওয়া-দাওয়া আছে, তা আপনাকে আর হাত পুড়িয়ে রাঁধতে হবে না। দুখানা লুচি না হয় অমনি গরিবের বাড়ি—

—বিলক্ষণ, সে কি কথা! তা হবে এখন। ওসব কি বলছেন? জামাইবাবু কই?

—বাড়ির মধ্যে গিয়েচেন। এতক্ষণ বাঁওড়ের ধারে বেড়াচ্ছিলেন, চা খেতে ডাক দিলে তাই গেলেন। ওরে কেষ্ট, ডাক্তারবাবুকে চা দিয়ে যা, সন্দে-আহ্নিক সেরে ফেলুন হাত-পা ধুয়ে।

ইহারা কখনও চা খায় না। আজ জামাই আসিয়াছে, তাই চা খাওয়ার ও দেওয়ার ব্যস্ততা। বিপিনের হাসি পাইল।

একটু পরে দত্ত মশায়ের জামাই বাহিরে আসিল। বিপিনের সমবয়সী হইবে, দেখিতে শুনিতে খুব ভালো নয়, মুখে বসন্তের দাগ।

দত্ত মহাশয়ের কথায় সে বিপিনের পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিয়া তক্তপোশের এক পাশে বসিল।

বিপিন বলিল, জামাইবাবু কোথায় থাকেন?

—আজ্ঞে কুলে-বয়ড়া। সেখানে তামাকের ব্যবসা করি।

—এখানে ক’দিন থাকবেন তো?

—থাকলে তো চলে না। এখন তাগাদা-পত্তরের সময়, নিজে না দেখলে কাজ হয় না। পরশু যাব ভাবচি।

জামাইয়ের সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হইল। আজ এবেলা রান্নার হাঙ্গামা নাই বলিয়াই বিপিন নিশ্চিন্ত মনে গল্প করিবার অবকাশ পাইয়াছে। দত্ত মহাশয়ের সঙ্গে অন্যদিন যে গল্প হয় তাহা বিপিনের তেমন ভালো লাগে না, দত্ত মহাশয় শুধু রামায়ণ মহাভারতের কথা বলেন। আজ সমবয়সী একজন লোককে পাইয়া অনেকদিন পরে সে গল্প করিয়া বাঁচিল।

তামাক খাইবার উপায় নাই, দত্ত মহাশয় বসিয়া আছেন। অনেকক্ষণ পরে বোধ হয় তাঁর খেয়াল হইল, তিনি উপস্থিত থাকাতে ইহাদের ধূমপানের অসুবিধা হইতেছে। বলিলেন, তাহলে বসুন ডাক্তারবাবু, আমি দেখি খাওয়া-দাওয়ার কতদূর হল, এদিকে রাতও হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভিতর হইতে আহারের ডাক পড়িল।

পাশাপাশি খাইবার আসন পাতা হইয়াছে দত্ত মহাশয় ও জামাইয়ের। বিপিন ব্রাহ্মণ, সুতরাং তাহার আসন একটু দূরে পৃথকভাবে পাতা।

একটি চব্বিশ-পঁচিশ বছরের তরুণী লুচি লইয়া ঘরে ঢুকিয়া সলজ্জভাবে বিপিনের দিকে চাহিল।

দত্ত মহাশয় বলিলেন, এইটি আমার মেয়ে। শান্তি, ডাক্তারবাবুকে প্রণাম কর মা।

তরুণী লুচির চুপড়ি নামাইয়া রাখিয়া বিপিনের পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিল। তারপর সকলের পাতে লুচি দিয়া চলিয়া গেল।

বিপিনের হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল আর এক দিনের কথা। মানীদের বাড়ি, সেও এই রকম জামাই আসিয়াছিল, রান্নাঘরে এই রকম জামাইবাবু, অনাদিবাবু ও সে খাইতে বসিয়াছিল। সেদিন আড়ালে ছিল মানী—দেড় বৎসর আগের কথা।

আর কি তাহার সঙ্গে দেখা হইবে? সম্ভব নয়। দেখাসাক্ষাতের সূত্র ছিঁড়িয়া গিয়াছে। আর সে সম্ভাবনা নাই।

ভাবিতেই বিপিনের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়া উঠিল। লুচির ড্যালা গলায় আটকাইয়া গেল, কান্না ঠেলিয়া আসে। মন হু হু করিয়া উঠিল। ইহারা কে? ওই যে শ্যামা মেয়েটি আধঘোমটা দিয়া পরিবেশন করিতেছে, কে ও? বিপিন ইহাদের চেনে না। অতি সুপরিচিত পরিবেশের মধ্যে ইহারা সবাই অপরিচিত। কোনো দিক দিয়াই বিপিনের সঙ্গে ইহাদের কোনো যোগাযোগ নাই।

শান্তি আসিয়া পায়েসের বাটি প্রত্যেকের পাতের কাছে রাখিয়া সেই ঘরের মধ্যেই দাঁড়াইয়া রহিল। দত্ত মহাশয় বিপিনের ডাক্তারির প্রশংসা করিতেছিলেন, শান্তি একমনে যেন তাহাই শুনিতেছিল।

বিপিন একবার মুখ তুলিয়া চাহিতেই শান্তির সঙ্গে চোখাচোখি হইয়া গেল। শান্তি তাহারই দিকে চাহিয়া ছিল এতক্ষণ নাকি? বিপিন কেমন অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিল।

দত্ত মহাশয় তাঁহার মেয়েকে অনুযোগ করিতে লাগিলেন, তিনি লুচি খাইতে ভালোবাসেন না, তবে কেন তাঁহাকে লুচি দেওয়া হইয়াছে? দত্ত মহাশয়ের আহারাদির বিশেষত্ব আছে, পূর্বে অবস্থা ভালো থাকার দরুনই হউক বা যে জন্যই হউক, তাঁহার খাওয়া-দাওয়া একটু শৌখিন ধরনের। তাঁহার জমিতে সাধারণত মোটা নাগরা ধান হয়, কিন্তু সে ধানের চাল তিনি খাইতে পারেন না বলিয়া সেই ধানের বদলে উৎকৃষ্ট সরু চামরমণি ধান সংগ্রহ করিয়া আনেন সোনাতনপুরের বিশ্বাসদের গোলাবাড়ি হইতে। বারমাস তিনি এই চামরমণি ধানের চাল ছাড়া খান না। বাড়ির আর কেহ নয়, শুধু তিনি। অন্য সকলের জন্য ক্ষেতের মোটা চালের ব্যবস্থা। তবে অতিথিসজ্জন আসিলে অবশ্য অন্য কথা।

বড় বগী থালায় চূড়ার আকারে ভাত বাড়িয়া চূড়ার মাথায় ক্ষুদ্র কাঁসার বাটিতে গাওয়া ঘি দিতে হইবে। ঢাকনিওয়ালা ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসে তাঁহাকে জল দিতে হইবে। খুব বড় কাঁটাল কাঠের সেকেলে পিঁড়ি পাতিয়া থালায় সুগোছালো করিয়া ভাত সাজাইয়া না দিলে তাঁহার খাওয়া হয় না।

অনেকদিন পরে মেয়ে আসিয়াছে, দত্ত মহাশয় একটু বেশি সেবা পাইতেছেন। পুত্রবধূরা শ্বশুরের সেবা যথেষ্ট করিলেও বিপত্নীক দত্ত মহাশয়ের তাহা মনে ধরে না। মেয়ে কেন ভাত সাজাইয়া না দিয়া লুচি খাওয়াইতেছে, ইহাই হইল দত্ত মহাশয়ের অনুযোগের কারণ।

খাওয়ার পর বিপিন বাহিরে যাইতেই দালানের পাশে জানালার দিকে চাহিল—মানী দাঁড়াইয়া আছে! কেহ নাই। রোজ তাহার খাওয়ার পরে বাহিরে যাইবার পথে এইরূপ জানালার ধারে সে দাঁড়াইয়া থাকিত। কি ছাইভস্ম সে ভাবিতেছে? এটা কি মানীদের বাড়ি যে মানী দাঁড়াইয়া থাকিবে জানালায়? বাহিরে সে একাই আসিয়া তামাক খাইতে বসিল।

বেশ অন্ধকার রাত্রি। উঠানের নারিকেল গাছের মাথায় জটপাকানো অন্ধকার, কিন্তু ক্রমশ স্বচ্ছ তরল হইয়া উঠিতেছ, পূর্ব দিগন্তে চাঁদ উঠিবার সময় হইল বোধ হয়। গোলার পাশে হাস্নুহানার ঝাড় হইতে অতি উগ্র সুগন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে। এমন রাত্রে ঘুম হয়?

শুধুই বসিয়া ভাবিতে ইচ্ছা করে।

আর কি কখনও তাহার সঙ্গে দেখা হইবে না?

আজ যে ডাক্তার হিসাবে তাহার এত খাতিরযত্ন, লোকমুখে এত সুখ্যাতি, এ সব কাহার দৌলতে?

যে তাহাকে এ পথ দেখাইয়া দিয়াছিল সে আজ কোথায়?

আজ বিশেষ করিয়া ইহাদের বাড়ির এই জামাই আসার ব্যাপারে মানীদের বাড়ির তিন বৎসর পূর্বের সে ঘটনা তাহার বিশেষ করিয়া মনে পড়িয়াছে। এমন এক দিনেই মানীর সঙ্গে তাহার আলাপ হয় আবার নূতন করিয়া, বাল্যের দিনগুলির অনেক, অনেক পরে। মানীর জন্য এত মন-কেমন করে কেন?

বিপিন কত রাত্রি পর্যন্ত জাগিয়া বসিয়া রহিল। সে আরও বড় হইবে। ভালো করিয়া ডাক্তারি শিখিবে। মানীর যে দেওর বীজপুরে থাকিয়া ডাক্তারি করে, তাহার কাছে গেলে কেমন হয়? বিপিন নিজের মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি অনুভব করে। সে ডাক্তারি খুব ভালো বোঝে, এ কাজে তাহার ঈশ্বরদত্ত স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে, কিন্তু আরও ভালো করিয়া শেখা চাই জিনিসটা।

ভাবিতে ভাবিতে কখন সে ঘুমাইয়া পড়িল।

শেষরাত্রে বিপিন স্বপ্ন দেখিল মানী আসিয়াছে। হাসিমুখে তাহার দিকে চাহিয়া বলিতেছে, পোলাও কেমন খেলে বিপিনদা? তোমার জন্যে আমি নিজের হাতে—ভালো লাগল?

ঠিক তেমনি হাসি, সেই সুপরিচিত অতি প্রিয় মুখ!

বিপিন বলিল, আমি মরে যাচ্ছি মানী, তোকে দেখতে না পেয়ে। তুই আমায় বাঁচা, আমায় ডাক্তারি শেখাবিনে বীজপুরে তোর দেওরের কাছে?

খুব ভোরে বিপিন হাত মুখ ধুইয়া সবে চণ্ডীমণ্ডপে এক ছিলিম তামাক সাজিয়া বসিয়াছে, এমন সময় দত্ত মহাশয়ের মেয়ে শান্তি এক কাপ চা আনিয়া রোয়াকের ধারে রাখিয়াই বিন্দুমাত্র না দাঁড়াইয়া চলিয়া গেল।

বিপিন একটু অবাক হইয়া গেল। ইহাদের বাড়ির আবরু বড় কড়া, এতদিন এখানে আছে সে, বাড়ির কোনো মেয়ে, অবশ্য মেয়ে বলিতে দত্ত মহাশয়ের দুই পুত্রবধূ, কখনও তাহার সামনে বাহির হয় নাই। শান্তি যে বড় বাহিরে আসিয়া চা দিয়া গেল! তবে হাঁ, শান্তি তো আর ঘরের বউ নয়, বাড়ির মেয়ে। তাহার আসিতে বাধা কি? সেদিন সারাদিনের মধ্যে শান্তি আরও অনেকবার বিপিনের সামনে বাহির হইল। শান্তি মেয়েটি বেশ সেবাপরায়ণা ও শান্ত। চেহারার মধ্যে একটা মিষ্টত্ব আছে, যদিও দেখিতে এমন কিছু সুশ্রী নয়।

এক জায়গায় ভালোবাসা পড়িলে আর দু জায়গায় কিছু হয় না।

ভালোবাসা এমন জিনিস, যাহা কখনও দুই নৌকায় পা দেয় না। হয় এ নৌকা, নয় ও নৌকা। কত মেয়ে তো আছে জগতে, কত মেয়ে তো সে নিজেই দেখিল, কিন্তু মানীর মতো মেয়ে সে কোথাও দেখে নাই। আর কাহারও দিকে মন যায় না কেন?

পরবর্তী দুই তিন দিনের মধ্যে বিপিন অনেকগুলি রোগী হাতে পাইল। রোজ সকালবেলা ডাক্তারখানা খুলিতে গিয়া দেখে যে ডাক্তারখানার সামনে হাটচালায় রীতিমতো রোগীর ভিড় জমিয়া গিয়াছে, সকলে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। ম্যালেরিয়ার সিজন পড়িয়া গিয়াছে। দুই তিন দিনের মধ্যে সে ভিজিটই পাইল সাত-আট টাকা।

বিপিনের ডাক্তারখানা এই সপ্তাহ হইতেই বেশ জমিয়া উঠিল। গোগা, মল্লিকপুর, সরুলে প্রভৃতি দূর গ্রাম হইতেও তাহার ডাক আসিতে লাগিল। সকলে বলাবলি করিতে লাগিল, যদু ডাক্তারের পসার একেবারে মাটি হইয়া গেল নূতন ডাক্তারবাবু আসাতে।

দত্ত মহাশয় একদিন বলিলেন, আপনার চেহারাখানার গুণে আপনার পসার হবে ডাক্তারবাবু। ডাক্তারের এমন চেহারা হওয়া চাই যে তাকে দেখলেই রোগীর রোগ আদ্ধেক সেরে যাবে। আপনার সম্বন্ধেও সকলেই সেই কথা বলে। যদু ডাক্তার আর আপনি! হাজার হোক আপনি হলেন ব্রাহ্মণ! কিসে আর কিসে!

বিপিন হিসাব করিয়া দেখিল সে পাঁচ মাস আদৌ বাড়ি যায় নাই। অবশ্য এই পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথম তিন মাস কিছুই হয় নাই, শেষ দুই মাসে প্রায় দেড়শত টাকা আয় হইয়াছে। ম্যালেরিয়ার সিজন এখনও পুরোদমে চলিবে আরও অন্তত এক মাস। এই সময়ে একবার বাড়ি ঘুরিয়া আসা দরকার।