Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)
বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)
0/45
বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ৩০

(৩০)

বিয়ের দিন সকাল থেকেই বুকটা মুচড়ে ব্যথা করছিল সুচন্দ্রার। বয়সে ওর থেকে বারো বছরেরও বেশি বড়ো একটা বিপত্নীক লোককে ও বিয়ে করছে বলে ওর বাড়ির মত ছিল না বিয়েটায়। মা তো শেষ ধাপ অবধি বাধা দিয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনরা টিটকিরি দিচ্ছে কেউ কেউ, সেই খবরও কানে এসে পৌঁছেছে ওর। কিন্তু সুচন্দ্রা কিছুকে পাত্তা দেয়নি। যে আমেরিকা ওকে নিয়ে গেল না দীপ্র, সেই আমেরিকাতেই ও যাবে, এই এক লক্ষ্য থেকে নিজের সংকল্পে স্থির থেকেছে।

“আমার বাবা মা-কে কিন্তু আমি আমেরিকায় নিয়ে যাব। এক্ষুনি নয়, তবে সুযোগসুবিধে মতো।” একটা কফিশপে নিজের হবু বরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বলেছিল সুচন্দ্রা।

জয়ব্রত মিত্রর বোধহয় ভালো লেগে গিয়েছিল সুচন্দ্রাকে। তাছাড়া উনি এমন একটা মেয়ে খুঁজছিলেন যে হাসিমুখে ওনার আগের পক্ষের বাচ্চা মেয়েটাকে মায়ের যত্নেই বড়ো করে তুলবে। সুচন্দ্রার তাই নিয়ে কোনো আপত্তি না-থাকাটা জয়ব্রতকে শান্তি দিয়েছিল অনেকটা।

“শুধু এই বাচ্চার ব্যাপারটা এখনই বাড়িতে জানাবেন না আপনি। তাহলে হয়তো….”

“বাড়ির লোক ভীষণভাবে বেঁকে বসবে নাকি?” জয়ব্রত হেসে উঠল। তারপর গলা পালটে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কম্প্রোমাইজ করছেন না তো? সেক্ষেত্রে কিন্তু আমি বারণ করব আপনাকে এগোতে।”

“আপনার কী আমাকে পছন্দ হয়নি?”

“অবশ্যই হয়েছে। আর তাই তো জানতে চাইছে, আপনিও আমায় পছন্দ হয়েছে বলেই এগোতে চাইছেন তো সম্পর্কটায়?”

সুচন্দ্রা উত্তর না দিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। কী করবে? দীপ্রর চেহারাটা ভেসে উঠছিল যে চোখে। যাকে কোনোদিন দেখেনি সেই সবটা ছেয়ে আছে। তার তুলনায় এই চল্লিশ পেরোন, টাক পড়ে যাওয়া লোকটা কে? হ্যাঁ, কম্প্রোমাইজ করছে সুচন্দ্রা। নিজের ইচ্ছায় করছে। ভেতরটা ভেঙে গেলে, বাইরেটাও ভেঙে দিতে ইচ্ছে হয় বলেই আপোষ করছে। “চুপ করে থাকবেন না। আপনার কথার ওপর সবকিছু ডিপেন্ড করছে…”

“আমি রাজি বলেই তো দেখা করতে এসেছি। সুচন্দ্রার গলার আওয়াজ ওর নিজের কান অবধিই পৌঁছোয়নি।”

“তাহলে কিন্তু দিনসাতেকের মধ্যেই বিয়েটা সেরে নিতে হবে। ম্যাক্সিমাম দশ। আমার হাতে একদম ছুটি নেই। আর আমি আপনাকে নিয়েই আমেরিকায় ফিরতে চাই।”

“কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আমার ভিসা ইত্যাদি…”

“ওগুলো আমার ওপরে ছাড়ুন না…” নিজের স্বপ্নগুলো ছেড়ে যে বেরিয়ে আসে তার কোনো কিছু ছাড়তেই অসুবিধে হয় না আর। সুচন্দ্রারও হয়নি। কিন্তু যখন ও দীপ্রর পাশে দাঁড়ানো মেয়েটাকে চিনে গিয়েছিল তখন সেই কথাটা দীপ্রকে না জানানো অন্যায় হত। তবু জানানোর আগে আবার একবার ভালো করে সব খোঁজ নিয়েছিল সুচন্দ্রা। এমনকী রামকালীতলা চলে গিয়েছিল একদিন। অনেক ফ্ল্যাট হয়ে জায়গাটা চেনার জো নেই আর। তবু পুরোনো বাসিন্দাদের অনেকেরই মনে আছে ঘটনাটা। বিজয়া দশমীর দিন অত সুন্দর একটা মেয়ের মাথায় কোনো লুম্পেন যদি সিঁদুর দিয়ে দেয়, কেই বা চট করে ভুলতে পারে?

সেই মন্টু গুন্ডা তো খুন হয়ে গেছে— কিন্তু মেয়েটা কোথায়? ওদের পরিবারই বা কই? বাবা মারা গেছেন কিন্তু মা আর দিদি? নেই, কোনো খোঁজ নেই। পরস্পরবিরোধী নানা কথা নানাদিক থেকে ভেসে আসতে শুনল সুচন্দ্রা। কিন্তু সেগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই। ফিরে আসার আগে একজনের রেফারেন্সে কানাই নামের সেই ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে পেয়ে গেল অমূল্য জিনিসটা। মন্টু গুন্ডা সিঁদুর দিচ্ছে মেয়েটার মাথায়, সেই ছবিটা নিজের ক্যামেরায় ধরে রেখেছিল কানাই। পরে মন্টুর শাসানিতে ছবিটা লুকিয়ে ফেললেও নিজের মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল ওর, এই ছবিটাকে নিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাগ লেগেছে ছবিটাতে, ছোপ ধরেছে তবু নিজের কাছছাড়া করেনি ও জিনিসটাকে। কিন্তু আজ যখন তার জন্য পাঁচহাজার টাকা দিতে চাইছে মেয়েটা তখন ও আর ছবিটা আটকে রাখার কারণ খুঁজে পেল না। বহুদিন একটু বিলিতি জিনিস পেটে পড়েনি। এই ছবিটার কল্যাণে যদি… ইস যদি বিলেতে জন্মাত তাহলে রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি তুলত কানাই। সবই কপাল…

*****

ছবিটা স্ক্যান করে দীপ্রকে মেইল করল সুচন্দ্রা। আর তার সঙ্গে লিখল যা লেখার। ওই মেইলেই। তিন চার দিনেও কোনো উত্তর না পেয়ে ফেসবুকে মেসেজ করল সবটা। নিজের ডেথ সার্টিফিকেট তো সুচন্দ্রা নিজের হাতেই সই করেছে কিন্তু দীপ্রকে তো বাঁচাতে হবে। আশ্চর্য যে নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য যে দায়ী তাকে শাস্তি দিতে একটুও মন করছিল না সুচন্দ্রার। ও শুধু ভাবছিল, দীপ্র কেন এখনও পড়ছে না, কেন এখনও দেখছে না ওর পাঠানো এত্তেলা?

বিয়ের দিন সকালে সেই কথা ভেবেই বুকে ব্যথা করছিল সুচন্দ্রার। কিন্তু দুপুরের দিকে পাঁচ মিনিটের জন্য নেট অন করে ও দেখল ওর মেসেজের নীচে ‘সিন’ দেখাচ্ছে। দেখেছে, দীপ্র দেখেছে! এবার ও নিশ্চয়ই নিজেকে বাঁচাবার রাস্তা নেবে। আর নেওয়ার সময় ওর সুচন্দ্রার কথা মনে পড়তে বাধ্য।

থাকলই না হয় দীপ্রর থেকে দূরে। কিন্তু দূরে থাকলেও বুঝি কাছে থাকা যায় না?

ভাবতেই চোখ ফেটে জল এল সুচন্দ্রার। কিন্তু একইসঙ্গে বুকের ব্যথাটা কমে গেল। ওর প্রশ্বাসটা শাস্তির নিশ্বাস হয়ে মিশে গেল পৃথিবীতে। সুচন্দ্রা মোবাইল বন্ধ করার আগে দীপ্রর ছবিতে ঠোঁট ছোঁয়াল একবার।

(৩১)

যেদিন সানফ্রানসিসকো এসে পৌঁছোল সেদিন বিকেলেই দীপ্রকে নিয়ে ঘুরতে বেরোল বিশাখা। আর অসম্ভব মনমরা হয়ে থাকা দীপ্রকে একরকম জোর করেই ট্রামে তুলল। সানফ্রানসিসকোর ট্রামগুলো খুব অভিনব। ওদের গোটাটাই কাঠের তৈরি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ওরা কখনও উঁচুতে ওঠে, কখনও বা নীচে নামে। সেই যাত্রাপথে পাদানিতে দাঁড়িয়েও অনেকে ঝোলে। এমনই একটা দেশ এটা যে কনডাক্টর যখন বলে “পা-দানিতে দাঁড়ানোর জন্য আর দুটো জায়গা খালি আছে মাত্র”, দুইয়ের বদলে চারজন উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু দীপ্রর উঠে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছে ছিল না। ও শুধু ভাবছিল যে এই শহরটায় পা রাখার পরদিনই ও প্রশান্ত মহাসাগরের বেশ খানিকটা ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে। একটা পাথরের হোঁচট খেয়ে আর একটা পাথর ধরেই সামলে নিয়েছিল। তারপর একটা পাথরে বসে অন্য একটা পাথরে বসে লিখেছিল বিশাখার নাম। সেই নামটাই যে এতবড়ো ভার হয়ে হয়ে উঠবে, ও কী ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেছিল সেই মুহূর্তে?

বিশাখা হাত ধরে টেনে তুলল দীপ্রকে, “বুড়োদের মতো বসে আছে শুধু। পা-দানিতে গিয়ে দাঁড়াই চলো, সমুদ্রের মিষ্টি হাওয়া আমাদের ছুঁয়ে এপার থেকে ওপারে চলে যাবে।”

দীপ্র বলতে পারল না যে ওর জীবনের সব হাওয়াই তো লোনা হয়ে গেছে। আবার কোন জাদুবলে তা মিষ্টি হবে? “সানফ্রানসিসকোর মিউজিয়ামটা আমায় দেখাতে নিয়ে গেলে না, এত করে বললাম।” বিশাখা বলে উঠল।

“যাওয়া যাবে কখনও সময় পেলে।” দীপ্র জবাব দিল।

“সময় কী ওরকম মুঠো মুঠো পড়ে থাকে? সময় বয়ে যায় আর তার ভেতরেই যে কাজগুলো করবার সেগুলো করে নিতে হয়।” বলতে বলতে বিশাখা হাত ধরে পা-দানিতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল দীপ্রকে।

দীপ্র বাইরে তাকিয়ে দেখল, মেঘ করে আসছে আর সানফ্রানসিসকোর অগণিত পায়রা উড়ছে হাওয়ায়। ওরা বোধহয় আগেভাগেই বৃষ্টির খবর পায়। ইশ মানুষও যদি ওদের মতোই একটু আগেভাগে খবর পেত, কখন রোদ ঝলমলাবে আর বৃষ্টি নামবে কখন?

পরের স্টপেজেই তিন চারটে লোক উঠল ট্রামে আর দীপ্র খেয়াল করল তাদের সবার হাতেই একটা করে বাদ্যযন্ত্র। একজন গিটার বাজাচ্ছে, একজনের ঠোঁটে বাঁশি আর একটা লোক মাউথ অর্গ্যান বাজাচ্ছে। ভেতরে অনেক ফাঁক সিট থাকা সত্ত্বেও ওরা পা-দানিতেই দাঁড়িয়ে বাজাতে শুরু করল। সানফ্রানসিসকোতে ব্যাপারটা খুব একটা অবাক করা নয় বলে তত কিছু পাত্তা দিল না দীপ্র। কিন্তু পরের স্টপ আসতেই ও খেয়াল করল যে ওকে আর বিশাখাকে প্রায় ঘিরে ফেলেছে লোক তিনটে। একটু সরে দাঁড়াতে গেল দীপ্র। আর তখনই লোকটাকে ট্রামে উঠতে দেখল।

ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল দীপ্রর। ও বিশাখার দিকে চাইল। বিশাখা ওর চোখের থেকে চোখ সরিয়ে লোকটাকে ইংরেজিতে বলল, “আগের স্টপেজে উঠলে না কেন?”

(৩২)

মন্টু যখন ওর হাত দুটো চেপে ধরে ওর মাথায় সিঁদুর দিয়ে দিচ্ছিল তখন মধুরার মনে হচ্ছিল যে শেষ হয়ে গেল সবকিছু। সেই ঘটনার পর যখন টিটকিরি শুনতে হতো ঘরে বাইরে তখনও মনে হত সব শেষ। এমনকি মন্টুর কল্যাণে যখন একটু দম নেওয়ার জায়গা হল জীবনে তখনও কালো ছাড়া কোনো আলো দেখতে পায়নি মধুরা। মন্টু তো ওর গম্ভব্য নয়, মন্টুকে তো ও চায়নি কোনোদিন। তাই মন্টুর রাইভ্যাল গ্যাং-এর ফটিক ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে জেনে ভয় নয় খানিকটা ভরসাই পেয়েছিল মধুরা। সিনেমা দেখে বেরোনোর সময় ফটিককে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। নিজেকে সামলাতে না পারা ফটিক যখন ওর কাছে এসে মধুরার বুকটা ছুঁয়ে যায় মধুরা ওর চোখে চোখ রেখে বলেছিল, “এইটুকুতেই খুশি? আরও বেশি পেতে ইচ্ছে করে না?”

লোভে পাগলপারা ফটিক দশদিনের মাথায় মন্টুকে খুন করে গুলি চালিয়ে। মন্টু বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে কোথায় আসবে সেই খবর অবশ্য বিশাখাই ফটিককে জানিয়েছিল।

মন্টুকে খুন করার ছ-দিনের মাথায় কলকাতার গোপন ঠিকানায় ফটিক গ্রেফতার হয়ে যায়। আর জেলে বসে ও জানতে পারে না যে মধুরাই ইন্সপেক্টর সরকারকে জানিয়ে এসেছিলে ফটিক ওকে থ্রেট দিচ্ছে মৌলালির গোপন ডেরা থেকে।

ইন্সপেক্টর বিশ্বপতি সরকার জানতেন যে থ্রেট দেওয়ার সময়ে কেউ নিজের গোপন ঠিকানা বলে দেয় না। কিন্তু ততক্ষণে মধুরার চেহারা ওর ভেতর চরকির মতো ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে। ইন্সপেক্টর সরকারের সাহায্যেই মধুরা নিজেকে বিশাখা করে ফেলে। নাম পদবী পালটে একটা নতুন অস্তিত্বের ভীষণ দরকার ছিল ওর। কলকাতায় ভাড়ার ফ্ল্যাটটাও ওই বিশ্বপতি সরকারেরই দেখে দেওয়া। সরকারবাবু শুধু দেখতে পাননি পেছনের সেই গাড়িটাকে। গোয়া থেকে বম্বে ফেরার পথে রাস্তায় মাইনাস করার জন্য বিশ্বপতি সরকার নামতেই গাড়িটা প্রবলবেগে পেছন থেকে ধাক্কা মারে তাকে। গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে গোয়ায় বেড়াতে গিয়েই আলাপ হয়েছিল বিশাখার। সে পেশায় ড্রাইভার ছিল না, আমেরিকার একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত ভ্রমণপিপাসু ছিল।

বিশাখার মতো একটা মেয়েকে মাঝবয়সী একটা পুলিশ অফিসার জোর করে ধরে এনেছে শুনে রাগে পাগল হয়ে গিয়েছিল সেই বহুজাতিকের কর্মী শান্তনু। সেই রাগটাই হিংসা হয়ে আছড়ে পড়েছিল। বিশ্বপতি যে গাড়িটা ড্রাইভ করছিলেন নিজে (ড্রাইভারের দৃষ্টির সম্মুখে মধুরাকে চটকাচটকি করতে অসুবিধা তাই) সেই গাড়িটা তুবড়ে রাস্তাতেই পড়ে রইল। বিশ্বপতি ‘ভাড়ার মেয়ে’ নিয়ে গোয়া বেড়াতে গিয়েছিলেন এই খবর পেয়ে ওঁর পরিবারও কেস ধামাচাপা দেওয়াতেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর ওদিকে শান্তনু নিজেই কী জানত যে ইন্সপেক্টর সরকারকে সরিয়ে দেবার জন্য যেমন ও ছিল, ওকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো প্যাট্রিককে খুঁজে পেয়ে গেছে বিশাখা?

অকারণে খুনের পর খুন করে যাবে মধুরা নিজেও কী এমন উন্মাদ ছিল? মধুরার নিজের তো মনে হয়নি। মধুরা পরিকল্পনা করে খুন না করালে, মন্টু গ্যাং-ফাইটেই মরত একদিন। আর তখন লোকাল গুণ্ডার বিধবা বউ হিসেবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াত ও? তাই মন্টুকে সরাবার জন্য ফটিককে দরকার হয়ে পড়েছিল। আর কাজটা হয়ে যাবার পর ফটিককে না সরালে, মন্টুকে সরিয়ে লাভ কী হতো। একটু মুক্তির নেশায় থানার ওসিকে পটাতে শুরু করে মধুরা। বিনিময়ে, আদর ভালোবাসা কিছুই দিতে অসুবিধা ছিল না কিন্তু ‘আমার বউটা বাজা বুঝলি। তোকে আমায় একটা বাচ্চা দিতে হবে’ বলে বিশ্বপতি মধুরাকে প্রেগন্যান্ট করার জন্য ক্ষেপে ওঠে।

শান্তনু সে সময় একটা দমকা বাতাস হয়ে এসেছিল, জীবনে। ওর সঙ্গে আমেরিকা যাওয়ার পর মধুরা সত্যি আর পেছন ফিরে তাকাতে চায়নি। ‘বিশাখা’ হয়ে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল বাকি জীবনটা।

শান্তনুর বাচ্চাকাচ্চার কোনো চাহিদা ছিল না। কিন্তু ওর অভ্যেস হয়ে দাঁড়াল রাজাবাদশার মতো ঘুরে বেড়ানোর আর প্রতি রাত্রে সিঙ্গল মন্টের। আমেরিকা কাউকে জমিদার হয়ে বাঁচার সুযোগ দেয় না। কিন্তু শান্তনু সেটাই চাইতে আরম্ভ করল বলে নানান পরিকল্পনা করতে হতো। দীপ্রকে জীবনে জড়িয়ে নেওয়াও তেমন একটা পরিকল্পনা। মধ্যে, দীপ্র যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর একেবারে ক্ষেপে উঠেছিল শান্তনু। যে বিশাখাকে তোয়াজ করে চলত ও তাকেই যা না হয় তাই বলতে শুরু করে। দীপ্রর নামে বড়ো টাকার ইন্সিরিওনেস করে ওকে মেরে ফেলে সেই টাকাটা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়াতে ওর আসলে মাথার ঠিক ছিল না। নিজের খেলার বোড়ে খুঁজে না পেয়ে, ও নিজেকেই বোড়ে হিসেবে ভাবতে চাইছিল।

নিকারাগুয়া থেকে প্লাস্টিক সার্জারি করে ফিরে আসবে শান্তনু এটাই ঠিক ছিল। আবার ওদের সংসার চলতে থাকবে তরতরিয়ে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজে বেড়াতে গিয়ে জুয়ায় অনেক অনেক টাকা হেরে মধুরাকে ক্রমাগত চাপ দিতে শুরু করে শান্তনু টাকার জন্য। শান্তনু মৃত প্রমাণ করে যে টাকা পেয়েছে তার একটা কানাকড়িও বাজে খ করার ইচ্ছে মধুরার ছিল না। কিন্তু একদিকে শান্তনুর গালাগালি অন্য দিকে প্যাট্রিকের বাড়তে থাকা আগ্রহ মধুরাকে বাধ্য করে দীপ্রর কাছে যেতে। দীপ্র ফিরে আসার পর একটু দম নিতে পারবে ভেবেছিল ও। কিন্তু দীপ্র ও তো সন্দেহ করতে শুরু করল শান্তনু বেঁচে আছে। তাহলে পুলিশের সন্দেহ করতে কত সময় লাগবে? ওদিকে প্লাস্টিক সার্জারি না করেই আমেরিকায় ফিরে আসার জন্য পাগল হয়ে উঠল শান্তনু। ওর প্রত্যেকটা ফোন মধুরাকে আতঙ্কের সেই কিনারে ঠেলে দিত যেখানে প্রতিটা মুহূর্তে ও আমেরিকার সেই জেলখানাগুলো দেখত যেখানে প্রত্যেকটা সেলে নতুন আসা একটা মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁচজন করে পুরোনো কয়েদি। তবু শান্তনুর ক্ষেত্রে প্যাট্রিককে যে লাইসেন্স দিয়েছিল দীপ্রর ক্ষেত্রে কখনোই তা দিত না মধুরা। দিতে বাধ্য হল কারণ কবে কোথায় মামাবাড়িতে এসে ওকে চিনে ফেলা মেয়েটা দীপ্রকে ফেসবুকের ইনবক্সে সব জানিয়ে দিল। মেয়েটার অবশ্য জানার কথা নয় যে দীপ্রর ফেসবুকের পাসওয়ার্ড ও জেনে নিয়েছিল দীপ্ররই অসতর্কতায়। কিন্তু মেয়েটার মেসেজ পড়ার সুযোগ না পেলেও, প্যাট্রিকের নির্বুদ্ধিতায় দীপ্র সন্দেহ করতে শুরু করল ওকে। তখন আর অন্য কী উপায় ছিল সামনে?

নিজের মায়ের দুর্ব্যবহারে চিরকাল বাচ্চাকাচ্চা থেকে দূরে থাকতে চাওয়া মধুরা যেদিন টের পায়, দীপ্রর সন্তান ও ধারণ করেছে ওর শরীরে সেদিন থেকে ও বদলাতে শুরু করেছিল, নিজের অজান্তে। বদলাচ্ছিল বলেই, দীপ্রকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হলেও, বাচ্চাটাকে রাখবে, এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও। তারপরও এটাই সত্যি যে দীপ্রকে খুন করতে ও চায়নি, চায়নি, চায়নি। আগেরগুলোও কী চেয়েছিল?

(৩৩)

প্যাট্রিকের হাতটা এমনভাবে দীপ্রর নাক আর মুখটা চেপে ধরল যে ওর নিশ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। হয়তো ওভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরে যেত দীপ্র। কিন্তু সেই অবস্থাতেই ওর ছোটোবেলার কথাটা মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, ছোটোবেলায় ও কথাটা বলে ফেলেছিল। বলে ফেলেছিল বলেই ওকে বাড়ি ছেড়ে হস্টেলে চলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু আজও ওকে কথা বলতেই হবে আবার। এভাবে চুপ করে মরে যেতে পারে না ও।

নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে প্যাট্রিকের হাত থেকে নিজের মুখটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে দীপ্র তাই ইংরেজিতে চিৎকার করে উঠল, “বিশাখা তুমি আমায় খুন করতে চাইছ কেন? তোমার পেটে তো আমার বাচ্চা।”

কথাটা ইংরাজিতে বলার জন্যই প্যাট্রিক চমকে উঠে তাকাল মধুরার দিকে, “তুমি বলেছিলে শুধু আমার বাচ্চা পেটে ধরবে। শুধু আমার।”

মধুরা কিংবা বিশাখা একটা ঘোরের মধ্যে থেকে বলে উঠল, “ও মিথ্যে বলছে।”

দীপ্র হেসে উঠল, “আমি সত্যিই বলছি।”

দীপ্রর হাসিটা শেষ হওয়ার আগেই প্যাট্রিক প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভার বার করে চকিতে গুলি চালিয়ে দিল বিশাখার পেটে। একটা, দুটো, তিনটে।

গুলির শব্দগুলো আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই পুলিশের হটার শোনা গেল।

(৩৪)

মানুষ মরে গেলে তার আর কোনো শাস্তি হয় না। হতে পারে না। তাই মধুরা ওরফে বিশাখারও কোনো শাস্তি হল না। বিশাখাকে মেরে ফেলার পরে প্যাট্রিক নিজেও বোধহয় নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। নইলে পুলিশ ট্রামে উঠে আসার আগেই দীপ্রকে গুলি চালিয়ে মেরে ফেলতে ওর খুব একটা অসুবিধা হতো না। আমেরিকার পুলিশ মন্দের জন্য যেমন মন্দ, ভালোর জন্য সাধারণত ভালো। আমেরিকার আইনও তুলনায় কম হয়রানি করে লোকজনকে। বিশাখা আর দীপ্রর জয়েন্ট ইনসিওরেন্সের আফটার ডেথ বেনিফিটের পুরো টাকাটাই তাই বেশ সহজেই হাতে পেয়ে গেল দীপ। বড়োলোক হয়ে গেল একঝটকায়। কিন্তু ওর অন্ধকার কী তাতে কাটল? না আরও বেড়ে গেল?

সুচন্দ্রা এক মাঝবয়সী লোকের বউ হয়ে ফেসবুকে একের পর এক নিজের দাম্পত্যের ছবি আপলোড করতে থাকল। দীপ্র, সুচন্দ্রাকে আনব্লক করার ফলে সেই ছবিগুলো দেখতে পেত সবই কিন্তু তারপর আবার, কে জানে কেন, ফিরে যেত ওর কাছে থাকা বিশাখার ছবির কাছে। বিশাখার অতীত এবং সে ওর সঙ্গে কী করতে চাইছিল তা জানার পরও সেই অনাগত সন্তানের জন্য বুকে মোচড় দিত দীপ্রর যে ওর আর বিশাখার ভবিষ্যৎ হতেই পারত।

অতীত আর ভবিষ্যতের দড়ি টানাটানিতে ক্লান্ত দীপ্র একসময় ঘরের সব আলো নিভিয়ে ফেলল। আর ওই অন্ধকারের ভেতর ওর মাথায় দপদপ করতে থাকল, মৃত পিতৃত্ব আর মৃত দাম্পত্য। কিন্তু সংসার ভেঙে গেলে বা দাম্পত্য মরে গেলেও প্রেমের বোধ মরে না। মরতে পারে না। তাই, যাপনের ওপাশে একটা নতুন সূর্য তার সবটুকু আলো নিয়ে অপেক্ষা করে মানুষের জন্য। ওর জন্যেও করছে নিশ্চয়ই। দীপ্রর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল।

***