Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১১

পর্ব ১১

সকলে হাঁটতে হাঁটতে আবার এগল গেটের দিকে। নারেঙ স্বাগতদের বললেন, ‘একই জায়গায় যখন আছি তখন বাজারে বা আঙ্করভাটে নিশ্চয়ই আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যাবে। আপনাদের সঙ্গ আমার বেশ লাগল।’

তাঁর কথা শুনে নাতাশাও সৌজন্য দেখিয়ে বলল, ‘আপনার সঙ্গও আমাদের ভালো লেগেছে। আবার দেখা হলে আমাদেরও ভালো লাগবে।’

হাঁটতে হাঁটতে গেটের মুখে এসে পৌঁছে গেল সবাই। ঠিক সেই সময় নারেঙ বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। ফেরার সময় আমি আপনাদের সঙ্গী হতে পারছি না। বুলের সঙ্গে আমার ব্যবসায়িক কিছু আলোচনা আছে। তা সারতে আমার বেশ খানিকটা সময় লাগবে। তারপর আমি ফিরব।’

নাতাশা বলল, ‘ঠিক আছে আপনি আলোচনা সারুন। আমরা এখন চললাম।’

নারেঙ খাম সেখানেই রয়ে গেলেন। স্বাগতরা উঠে পড়ল গাড়িতে। যে পথে তারা এ জায়গায় এসেছিল সে পথেই ফিরতে লাগল তারা।

গাড়ি থামানো হল ব্যাটারির দোকানের সামনে। ঠিক যেমন গাড়িতে তারা এল তেমনই একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে দোকানে। রামমূর্তির কেনা মালপত্রও ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছে গেছে। দু’জন লোক সেগুলো গাড়িতে তুলছে। খামারের গাড়ি থেকে নেমে রামমূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারা। রামমূর্তি আর ব্যাটারির দোকানের মালিক দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রামমূর্তি তাঁর সঙ্গে কথা থামিয়ে স্বাগতদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুমির খামার কেমন দেখলে?’

স্বাগত জবাব দিল ‘ভালো। অনেক কুমির দেখলাম।’ নাতাশা বলল, ‘তবে প্রাণীগুলো বড় ভয়ঙ্কর।’

স্বাগতদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা তখন ফেরার জন্য তার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। চীনা ব্যাটারির দোকানের মালিক সেই গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ গাড়িটা আমি চিনি। আপনারা বুলের খামারে কুমির দেখতে গিয়েছিলেন?’

সুরভী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ। ওখানেই। আপনি ওই খামারে গেছেন?’

চীনা ব্যবসায়ী জবাব দিলেন, ‘না, যাইনি। যাওয়ার কোনও ইচ্ছাও নেই। জায়গাটা সত্যিই ভয়ঙ্কর।’

লোকটার বক্তব্যের মধ্যে কোনও একটা কথা লুকিয়ে থাকার ইঙ্গিত সম্ভবত টের পেলেন রামমূর্তি। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কিছু কি ঘটেছিল ওখানে?’

ব্যাটারির দোকানের মালিক একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা!’

‘কী ঘটনা? সেটা বলা যাবে কি?’ আবার প্রশ্ন করলেন রামমূর্তি।

চীনা লোকটা গলাটা একটু খাদে নামিয়ে বলল, ‘কথাটা বলছি, কিন্তু আমার কাছ থেকে কথাটা জেনেছেন তা কাউকে বলবেন না। আমি অন্য দেশ থেকে এ দেশে এসে ব্যবসা করি। আমার তাতে সমস্যা হতে পারে। খামেরা এমনিতেই আমাদের পছন্দ করে না এ কথা হয়তো আপনি জানেন।’

রামমূর্তি বললেন, ‘জানি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’

ব্যাটারির দোকানের চীনা মালিক বলল—‘কয়েক মাস আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল। এই বাজারেই একটা দশ-বারো বছরের বাচ্চা ছেলে থাকত। দোকানদারদের ফাইফরমাস খেটে সামান্য কয়েকটা পয়সা আয় করত আর বাজারের ভিতরই একটা শেডের নীচে ঘুমাত। ছেলেটাকে কাজ ও থাকার জায়গা দেবে বলে বুল তাকে তার খামারে নিয়ে যায়। কিন্তু তারপর ছেলেটা নিখোঁজ হয়ে যায়। বাচ্চাটা অনাথ ছিল। এক বুড়ি তাকে কিছুদিন লালন-পালন করেছিল। বুড়িটাই বুলের কাছে ছেলেটার খোঁজ করতে গেলে বুল তাকে বলে ছেলেটা নাকি খামারের কাজ ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে তা তার জানা নেই। বুড়ি তখন পুলিসের কানে ব্যাপারটা তুললে বুলকে আটক করে পুলিস। সবার ধারণা বুলের কুমিররা ছেলেটাকে খেয়ে ফেলেছে। কিছু দিনের জন্য বুলের দোকান ও খামারও বন্ধ করে দেয় পুলিস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা প্রমাণের অভাবে বুলকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বুলের খামারের কুমিররা নরখাদক!’

রামমূর্তি ঘটনাটা শুনলেন, তবে কোনও মন্তব্য করলেন না ব্যাপারটা নিয়ে।

দোকানের সামনেই আরও ঘণ্টাখানেক সময় কাটাল সকলে। ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়া শেষ হল একসময়। গাড়িতে যে লোকগুলো মালপত্র ওঠাচ্ছিল তারাই ভারী ভারী ব্যাটারিগুলোকে ওপরে তুলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাগত টুকটুকে উঠে পড়ল। তিনটে গাড়ি একসঙ্গে রওনা হয়ে গেল মন্দির নগরীতে যাওয়ার জন্য। শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল তারা। বিকাল হতে চলেছে। স্বাগতদের চোখে পড়তে লাগল উল্টো দিক থেকে মন্দির নগরী হয়ে ফিরে আসছে ট্যুরিস্টদের গাড়িগুলো। একসময় স্বাগতরা বিষ্ণু মুখমণ্ডল লাঞ্ছিত প্রাচীন তোরণ অতিক্রম করে প্রবেশ করল আঙ্করের প্রাচীন নগরীতে।

স্বাগতরা যখন নিজেদের থাকার জায়গায় গিয়ে পৌঁছল তখন বিকাল হয়ে গেছে। মালপত্র নামানো শুরু হল গাড়ি থেকে। ঠিক এই সময় এদিনের মতো কাজ শেষ করে বাইরের চত্বরে মজুরের দল বেরিয়ে এল ঘরে ফেরার জন্য।

কতটা কাজ এগিয়েছে এ কথা রামমূর্তি মজুর সর্দার হেরুমকে জিজ্ঞেস করতে, সে জানাল স্বাগতরা মন্দিরের ভিতরে যে প্রাঙ্গণ পর্যন্ত প্রবেশ করেছিল সে জায়গা অবধি ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়ে গেছে। ঘরগুলোর দেওয়ালও সাফ করা হয়ে গেছে। এ কথা জানিয়ে হেরুম তার সঙ্গীদের নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য রওনা হল। যে লোকগুলো গাড়ির সঙ্গে এসেছিল তারাও তাদের কাজ শেষ করে সন্ধ্যা নামার আগেই মন্দির নগরী ত্যাগ করার জন্য রওনা হয়ে গেল।

যে লোকেরা এসেছিল তারা ফিরে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামল। অন্য রাতের মতোই সকলে মিলে রান্নার আয়োজন শুরু করল। আর তার সঙ্গে শুরু হল সারাদিনের নানা ব্যাপার নিয়ে কথাবার্তা। বিক্রম নাতাশাকে প্রশ্ন করল, ‘মন্দিরের প্রেতেরা নাকি বুলের খামারের ওই বিশাল কুমির দুটো কারা বেশি ভয়ঙ্কর বল তো? ধরা যাক এখন এই চত্বরে আমাদের একপাশে হাজির হল প্রেতের দল, আর অন্য দিকে কুমির দুটো? তখন কোন দিকে ছুটব আমরা?’ নাতাশা জবাব দিল, ‘এসব অবান্তর বিষয় নিয়ে আমি ভাবতে চাই না। আর জবাবও দিতে চাই না।’ প্রীতম বলল, ‘ভূত-প্রেত বলে কোনও বস্তু আছে কি না আমার তা জানা নেই। তবে কুমির দুটো যে ভয়ঙ্কর তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর চীনা ব্যবসায়ীর কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে ব্যাপারটা কল্পনা করলেই বুক কেঁপে ওঠে!’

রান্নার পাঠ চুকল এক সময়। রামমূর্তি স্যর তাঁর ঘরে কাজ করছিলেন। স্বাগত তাঁকে ডেকে আনল। এক সঙ্গে বসে খাবার সময় তিনি বললেন, ‘কাল থেকে আবার জোর কদমে কাজ শুরু করতে হবে আমাদের। হেরুম তো বলে গেল আমরা যে ঘরগুলোতে ঢুকেছিলাম তার দেওয়ালগুলো পরিষ্কার করেছে। দেখা যাক দেওয়াল গাত্রের ছবি থেকে মন্দির সম্পর্কে কোনও সূত্র মেলে কি না? খাওয়া সেরে আজ সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়। পরিশ্রম করার আগে ঘুমটা জরুরি।’

তাঁর কথা মতোই খাওয়া শেষ হওয়ার পর নিজেদের ঘরে চলে গেল সবাই। স্বাগতও নিজের ঘরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম নেমে এল তার চোখে।

হঠাৎই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল স্বাগতর। কে যেন আতঙ্কিতভাবে চিৎকার করছে! সেই চিৎকারে বাইরের প্রাঙ্গণের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাচ্ছে! স্বাগত কয়েক মুহূর্তর মধ্যে বুঝতে পারল, গলাটা নাতাশার! এত রাতে কী ঘটল আবার? স্বাগত বিছানা ছেড়ে দ্রুত উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। হ্যাঁ, চিৎকারের শব্দটা নাতাশাদের ঘর থেকেই আসছে। নাতাশা আর বিক্রমদের ঘর দুটো কাছাকাছি। স্বাগতর ঘরটা সে দুটো ঘর থেকে কিছুটা তফাতে। আর রামমূর্তি স্যরের ঘরটা উল্টো দিকে খানিকটা দূরে।

স্বাগত দেখল বিক্রম আর প্রীতমও নিজেদের ঘর থেকে বেরিয়ে নাতাশাদের ঘরে গিয়ে ঢুকল। সেও এরপর এগিয়ে গিয়ে ঢুকল সে ঘরে। খাটের ওপর সুরভীকে জাপটে ধরে বসে আছে নাতাশা। আতঙ্কিত মুখে সে বলে চলেছে, ‘ভূত! ভূত! আমি ঠিক দেখেছি! জানলাটা বন্ধ না করে দিলে সে নিশ্চয়ই বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে আমার গলা টিপে ধরত!’ একটা বড় টর্চ হাতে নিয়ে ইতিমধ্যে রামমূর্তি স্যরও ঘরে প্রবেশ করলেন। একসঙ্গে সবাইকে দেখে একটু যেন ধাতস্থ হল নাতাশা।

তারপর তার মুখ থেকে যা শোনা গেল তা হল, খাওয়া সেরে বিছানায় এসে শোওয়ার পর প্রথমে সে ঘুমিয়ে পড়লেও খানিক আগে ঘুম ভেঙে গেছিল তার। জানলার পাশেই সে শোয়। সে তাকিয়ে ছিল বাইরের দিকে। হঠাৎ সে দেখতে পায় একটা কালো মূর্তি মন্দির তোরণের বাইরে বেরিয়ে সোজা এদিকে আসতে থাকে। কালো কাপড় ঢাকা সেই মূর্তি। নাতাশার মনে হচ্ছে সে এই ঘরের দিকে আসছিল। তাই সে তারপর জানলা বন্ধ করে চিৎকার শুরু করে।

নাতাশার কথা শুনে রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘তোমার দৃষ্টি বিভ্রম হয়ে থাকতে পারে। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেক সময় এমন হয়।’

নাতাশা বলে উঠল, ‘না স্যর আমি স্পষ্ট দেখেছি ভূতটাকে!’

কথাটা শুনে রামমূর্তি সারের মুখে এবার মৃদু বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে আমি ব্যাপারটা দেখছি। এখন যে যার মতো ঘরে শুয়ে পড়। কাল সকালে কাজ করতে হবে আমাদের।’—এই বলে নাতাশাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে পড়লেন তিনি। তাকে অনুসরণ করল স্বাগত আর অন্য দু’জন। ভিতর থেকে সুরভী ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে বেরিয়ে চারপাশে বিশেষত মন্দির তোরণের গায়ে টর্চের তীব্র আলো বেশ কয়েকবার ঘোরালেন রামমূর্তি স্যর। না, কেউ কোথাও নেই।

এরপর তিনি বললেন, ‘মেয়েটা এত ভীতু হলে তো কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা। যাই হোক ওর সামনে আর কেউ ভূত-প্রেত এসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা কর না। যাও এবার তোমরা ঘুমাতে যাও। আর দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই তো ভোরের আলো ফুটে যাবে।’

স্বাগত নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। সে ভাবতে লাগল নাতাশা কি সত্যিই কিছু দেখেছে? সে কিন্তু বেশ জোরের সঙ্গেই দাবি করল কথাটা। সেই বাঁদরটা নয় তো? যাকে স্বাগত রাতের বেলা দেখেছিল মন্দির তোরণে?’ -এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে মজুরদের দল আসার পর স্বাগতরাও সবাই এসে উপস্থিত হল চত্বরে। প্রফেসর রামমূর্তিও এসে উপস্থিত হলেন। নাতাশাকে আর গত রাতের প্রসঙ্গে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। যে লোকটা দুপুরে রান্না করবে সেও এসেছে মজুরদের সঙ্গে। তাকে রান্নার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সবাই একসঙ্গে প্রবেশ করল মন্দির তোরণের ভিতর। একই রকম আছে ভিতরের প্রাঙ্গণটা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মূর্তি, ভাঙা স্তম্ভ ইত্যাদি। জিনিসগুলো স্বাগতরা যেভাবে রেখে গিয়েছিল বা পড়েছিল ঠিক তেমনই। সেগুলো অতিক্রম করে স্বাগতরা এগতে যাচ্ছিল মন্দিরের ভিতর দিকে প্রবেশের জন্য। ঠিক সেই সময় প্রথমে তাদের সামনে ঠক করে একটা পাথরের টুকরো এসে পড়ল! তারপর আর একটা!

বাঁদরদের বিরাট একটা দল এসেছে মন্দিরের মাথায়। এরপর তারা কেউ মন্দিরের মাথার ওপরের গাছগুলো ধরে লাফাতে শুরু করল, কেউ বা পাথর ছুড়তে শুরু করল। ঠিক আগের দিনের মতোই তারা যেন মন্দিরের ভিতর স্বাগতদের প্রবেশ করতে দিতে চায় না। পাথর বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাবার জন্য সবাই যে যার মতো প্রাঙ্গণের গায়ের স্তম্ভ-মূর্তির আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। রামমূর্তি স্যরের সঙ্গে স্বাগত আর হেরুমও গিয়ে দাঁড়াল প্রাঙ্গণের গায়ের এক ছাদের আড়ালে। রামমূর্তি বললেন, ‘রোজই যদি বাঁদরগুলো এমন কাণ্ড ঘটায় তবে তো বড় মুশকিলের ব্যাপার।’

স্বাগত বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলি স্যর। নাতাশা গত রাতে কোনও বড় আকৃতির বাঁদরকেও ভূত ভেবে থাকতে পারে। কারণ, দু-রাত আগে আমিও একটা বড় বাঁদরকে রাতের বেলায় মন্দির তোরণে দেখেছিলাম। ঘরের ভিতর থেকে তাকে দেখে আমিও প্রথমে মানুষ ভেবে ভুল করেছিলাম।’ রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘তাহলে হয়তো তাই হবে। কিন্তু এই প্রাণীগুলোকে কীভাবে এখান থেকে তাড়ানো যায় বল তো? নইলে এই প্রাণীগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’—এ কথা বলে তিনি তাকালেন হেরুমের দিকে। হেরুম বলল, ‘গাছগুলোতে ফলের থোকা ধরেছে দেখছেন? ওই ফলের লোভেই ওরা আরও এদিকে আসছে বলে মনে হয়। এগুলো ওদের প্রিয় খাদ্য।’

মন্দিরের ছাদের মাথায় তাকিয়ে স্বাগত ফলগুলো দেখতে পেল। সবুজ রঙের থোকা থোকা ফল। কয়েকটা বাঁদর সেগুলো খাচ্ছেও। রামমূর্তি স্যরও। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ‘গাছের মাথার ডালগুলো সাবধানে ছেঁটে দিলে আশা করি ছাদের কোনও ক্ষতি হবে না। আজ তোমরা সে কাজটাই কর। তাছাড়া মন্দিরের মাথায় এ দেশের একটা পতাকা লাগানোও প্রয়োজন। যেমন বিষ্ণু মন্দিরেও আছে। যাতে লোকে বুঝতে পারে সরকার এ জায়গা অধিগ্রহণ করে সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। পতাকা দেওয়া হয়েছে আমাকে টাঙাবার জন্য।

হেরুম বলল, ‘হ্যাঁ, গাছগুলোর ডালপালা ছেঁটে দিলে বাঁদরের উপদ্রব কমবে বলে মনে হয়। তবে জানেনই তো অনেকে বলে ওরা হল মন্দিরের ছদ্মবেশী প্রেতাত্মা। তেমন হলে ওরা গাছ কাটলেও এ জায়গা ছাড়বে না।’

হেরুমের কথার শেষ অংশটা শুনে রামমূর্তি মৃদু ধমকের স্বরে বললেন, ‘তোমাকে যে কাজটা করতে বলেছি সে কাজটা আগে করবে। তারপর দেখি ওরা বাঁদর না প্রেতাত্মা?’

বাঁদরদের বাঁদরামি কিছু সময়ে চলার পর থেমে গেল। স্বাগতরা লুকিয়ে পড়াতে তারা হয়তো ভাবল মানুষেরা রণে ভঙ্গ দিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল! প্রাণীগুলো চলে যাওয়ার পর আড়াল থেকে প্রাঙ্গণের ভিতরে এসে দাঁড়াল তারা। হেরুম তার লোকজনকে নিয়ে ছাদে ওঠার প্রস্তুতি শুরু করল। আর প্রফেসর রামমূর্তি ছোটখাট কিছু যন্ত্রপাতি আর সকলকে নিয়ে প্রবেশ করলেন মন্দিরের ভিতর।

ঘরগুলোর ভিতরের আগাছা, ঝোপ জঙ্গল দেওয়ালের ধুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তার ফলে প্রথম ঘরটাতে বাইরের থেকে খানিকটা আলোও ঢুকছে। মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঘরের ভিতরটা। দেওয়ালের গায়ে ফুটে উঠেছে বেশ কিছু অলঙ্করণ আর দুটো মূর্তি। দ্বিতীয় কক্ষে যাওয়ার পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে তারা। প্রফেসরের পিছন পিছন সবাই গিয়ে দাঁড়াল একটা মূর্তির সামনে। কত যুগ ধরে যে মূর্তিটা একটু আলোর অপেক্ষায় এভাবে এই কক্ষে দাঁড়িয়ে ছিল কে জানে?

মূর্তিটা একটা রক্ষী বা গার্ডের। পরনে তার প্রাচীন খামের রাজ সৈনিকের পোশাক। তার এক হাতে ধরা দণ্ডর মতো অস্ত্র। অন্য হাতের মুদ্রা যেন যারা এ কক্ষে প্রবেশ করেছে তাদের থামতে বলছে। মহাকাল তার শরীরের কিছুটা থাবা বসালেও রক্ষীর অবসর মোটামুটি অক্ষতই আছে। যে মূর্তিটা ভালো করে দেখার পর প্রফেসর অন্য পাশের মূর্তিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এ মূর্তিটাও অন্য মূর্তিটার মতনই। ভালো করে মূর্তি দুটো দেখার পর রামমূর্তি বললেন, ‘এ কক্ষ প্রথমে যখন নির্মাণ করা হয় তখন সম্ভবত এই মূৰ্তি দুটো এ ঘরে ছিল না।

পাথরের যে ব্লক দুটোর ওপর মূর্তি দুটো খোদাই করা হয়েছে সে ব্লক দুটো পরে দেওয়ালের গায়ে বসানো হয়। কারণ দেখ ব্লক দুটোর আড়াল থেকে ফুল-পাতার অলঙ্করণ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ তাদের গায়ের ওপরই বসানো হয়েছে রক্ষীর মূর্তি দুটো! ঘরের দু’পাশ থেকে অন্য দুটো যে গ্যালারি বা অলিন্দ বেরিয়েছে তাদের মুখও পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। তবে সেই দুই পথ না ধরে সবাই আগের দিনের মতোই প্রবেশ করল পরের ঘরটাতে। সে ঘরের দু’দিকে দুটো কপাটহীন দরজা। একটা দিয়ে স্বাগতরা ঘরে প্রবেশ করল, আর অন্য দরজাটা ঠিক তার বিপরীতে। সে দরজা দিয়ে ভিতরের দিকের ঘরগুলোর প্রবেশ পথগুলোও দেখা যাচ্ছে। বোঝা যায় বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে ভিতরের চত্বর পর্যন্ত প্রবেশ পথগুলো একই সরল রেখায় নির্মিত। দ্বিতীয় ঘরটাও প্রথম ঘরটার মতো। দেওয়ালের গায়ে নানান অলঙ্করণ আর দরজার দু’পাশে দেওয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন প্রহরী। তবে তাদের অস্ত্রর কিছুটা ভিন্নতা আছে। দণ্ডর বদলে তাদের হাতে তলোয়ার, আর অন্য হাত যেন থেমে যেতে বলছে বহিরাগত আগন্তুকদের।