Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১২

পর্ব ১২

এ ভাবে পরপর পাঁচটা কক্ষ অতিক্রম করল তারা। তারপর শেষ কক্ষে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাদের। সে কক্ষ অতিক্রম করলেই মন্দিরের ভিতরের সেই প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। সেখান থেকে আলো ঢুকছে ঘরের ভিতরে। আর তাতেই সারা দেওয়াল জুড়ে চোখে পড়ছে সারবদ্ধ অনেকগুলি মূর্তি। দু’পাশের দেওয়াল বেয়ে সার বেঁধে তারা যেন মন্দিরের ভিতরের চত্বরে প্রবেশ করার জন্য এগচ্ছে। তবে শুধু অস্ত্রধারী সৈনিক নয়, তাদের সঙ্গে আরও একদল মানুষ আছে। তারাই বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল স্বাগতদের। ভালো করে সেই মূর্তিগুলোকে দেখার জন্য সবাই দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নতুন মূর্তিগুলোর মস্তক মুণ্ডিত। তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনও পোশাক নেই। আর তারা দু’হাত দিয়ে একটা করে কলস ধরে রেখেছে। আর সেই মূর্তিগুলোর আগে-পিছে একজন করে রক্ষী বা সৈনিক। তারা যেন পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে কলস হাতে ধরা লোকগুলোকে। সবাই মিলে দেওয়ালের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে ঘুরে মূর্তিগুলোকে দেখার পর সুরভী জিজ্ঞেস করল, ‘এই মূর্তিগুলোর হাতে কীসের পাত্র সার?’

রামমূর্তি বললেন, ‘ঠিক এমন এক সারি মূর্তি যেন আমি বিষ্ণুমন্দিরে দেখেছি বলে মনে হয়।’ এ কথা বলার পর তিনি একটা আতস কাচ বার করে মুণ্ডিত মস্তক একটা মূর্তির মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগলেন। এ মূর্তিগুলো যে প্রাচীন তাতে সন্দেহ নেই। তাদের দেহ কোথাও কোথাও চটে খসে পড়েছে। তার দেখাদেখি অন্যরাও মূর্তিগুলো খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। প্রীতম হঠাৎ মূর্তি দেখতে দেখতে বলল, ‘স্যর, আপনার আতস কাচটা একটু দেবেন?”

রামমূর্তি স্যর প্রীতমের হাতে আতস কাচটা দিলেন। প্রীতম পকেট থেকে রুমাল বার করে মূর্তির হাতের কলসটা মুছে আতস কাচ দিয়ে সেটা দেখতে লাগল। সবাই এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। প্রীতম এরপর রামমূর্তি স্যরকে বলল, ‘এই দেখুন স্যর। কলসগুলো শিকল দিয়ে জড়ানো ছিল। এখন ক্ষয়ে গিয়ে শিকলটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে।’

রামমূর্তি প্রথমে ম্যাগনিফাইন গ্লাসটা হাতে নিয়ে কলসটা দেখার পর তারিফের স্বরে বললেন ‘আশ্চর্য চোখ তো তোমার!’

স্বাগতও এরপর কাচটা নিয়ে দেখল কলসটা। হ্যাঁ, ছবিতে দেখা যাচ্ছে কলসটা শিকল জড়ানো। এরপর আরও কয়েকটা কলস পরীক্ষা করে দেখা গেল তাদের গায়েও শিকল আঁকা আছে!

স্বাগত একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘মূর্তিগুলোর হাতে কলসগুলোর গায়ে শিকল জড়ানো। অর্থাৎ এগুলো মুখবন্ধ ধাতব কলসের ছবি। কলসের মুখ যাতে কেউ খুলতে না পারে তাই কলসগুলোতে ধাতব শিকল জড়ানো ছিল। কিন্তু সৈন্য পরিবৃত হয়ে শিকল জড়ানো ধাতব পাত্র করে লোকগুলো কী নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়?’

স্বাগতর প্রশ্ন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রম বলল, ‘ধন রত্ন নয় তো স্যর?’

প্রফেসর কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকার পর বললেন, ‘সেটা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আজ আমাদের কাজ হবে ব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে এই মূর্তিগুলোর গা থেকে যত্ন করে প্রতিটা ধূলিকণা সরিয়ে ফেলা। দেখা যাক তাতে যদি আরও কিছুর সন্ধান মেলে।’

রামমূর্তি এরপর স্বাগতদের উদ্দেশে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এরপরই আগের ছেড়ে আসা ঘরটার দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে? কে ওখানে?’ —এ কথা বলেই তিনি দু’পা এগিয়ে পাশের ঘরটাতে ঢুকে পড়লেন। স্বাগতও তাঁর পিছন পিছন ঘরটাতে ঢুকল।

যে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে লোকটা ঘরটার চারপাশে বিস্মিতভাবে তাকাচ্ছিল তাকে প্রফেসর আর স্বাগত চিনতে পারল। লোকটা বিষ্ণুলোকের গাইড ফঙ! স্বাগতদের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লোকটা বলল, ‘বা!, মন্দিরটাকে আপনারা পরিষ্কার করাচ্ছেন দেখছি। এবার সত্যি বুঝতে পারছি আপনারা ট্যুরিস্ট নন।’

এ কথা বলে লোকটা হাসল। প্রফেসর রামমূর্তি কিন্তু তার কথা শুনে হাসলেন না। তিনি বললেন, ‘তুমি এখানে ঢুকেছ কেন?’

ফঙ নামের গাইড বলল, ‘এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। ইচ্ছা

হল তাই ভিতরে ঢুকে পড়লাম। যদিও এ মন্দিরে আগে কোনওদিন ঢুকিনি। মন্দির তোরণ ঝোপ জঙ্গলে ঢাকা ছিল তাই মন্দিরে ঢোকার উপায় ছিল না। মন্দিরের আরও ভিতরে কী কী দেখলেন আপনারা?’

রামমূর্তি তার প্রশ্নর জবাব না দিয়ে বললেন, ‘তুমি এখান থেকে চলে যাও।’

ফঙ বলল, ‘চলে যাব কেন? আপনারা বিদেশ থেকে এসে এ মন্দিরে ঢুকছেন, আর আমি স্থানীয় লোক হয়ে নিজের দেশের মন্দিরে ঢুকতে পারব না? আমি মন্দিরের ভিতরটাও ঘুরে দেখব।’

রামমূর্তি এবার গলার স্বরে কাঠিন্য ফুটিয়ে বললেন, ‘না। তোমাকে এখন ভিতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। তুমি যে পর্যন্ত এসেছ, আগে আমি তোমাকে দেখলে আসতে দিতাম না। আমরা বিদেশি ঠিকই। কিন্তু সরকারি নির্দেশে এই মন্দিরে ঢুকেছি কাজ করতে। সরকারি অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও লোকের এ মন্দিরে ঢোকা বারণ। তুমি চলে যাও।’

ফঙ এবার বলল, ‘বুঝেছি তোমরা কেন আমাকে চলে যেতে বলছ। পাছে তোমরা দামি কিছু খুঁজে পেলে আমি তার ভাগ চাই সেজন্য। অনেকেই তো এখানে মন্দির সংস্কার বা অন্য কোনও কাজের অছিলায় এখানে আসলে গুপ্তধন খুঁজতে আসে।’

ফঙের কথা শুনে রামমূর্তি রুক্ষ স্বরে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। আমার কাজ আছে। এবার মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে যাও তুমি।’

ফঙ এরপর আর বাক্যালাপের চেষ্টা করল না। অন্যরাও এবার পাশের ঘর ছেড়ে এ ঘরে চলে এসেছে। ফঙ সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে অদ্ভুতভাবে একবার হাসল। তারপর পিছু ফিরে রওনা হল বাইরে যাওয়ার জন্য। কক্ষগুলোর দরজা সমান্তরালে অবস্থান করার জন্য ফঙ যতক্ষণ না মন্দিরের বাইরে বেরল ততক্ষণ তাকে দেখতে পেল স্বাগতরা। লোকটা মন্দির ত্যাগ করল, ব্যাপারটাতে নিশ্চিত হওয়ার পর প্রফেসর বললেন, এ ধরনের স্থানীয় লোক মন্দিরে ঢুকে আমাদের কাজের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বলা যায় না, হয়তো ট্যুরিস্টদের মন্দির দেখাবার জন্য নিয়ে এল এখানে। ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা একটা সরকারি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে হবে মন্দির তোরণে।”

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘চল মন্দিরের ভিতরের চত্বরটা একবার দেখে আসি। তারপর তোমরা কাজ শুরু করবে।’

স্বাগতরা প্রথমে আগের ঘরে ফিরে এল। তারপর অন্যপাশের চত্বরটাতে নেমে এল। সেটাও পরিষ্কার করে ফেলেছে শ্রমিকরা। চত্বরের দু’পাশে স্তম্ভের ছাদওয়ালা দুটো লম্বা অলিন্দ। মন্দিরে প্রবেশ করলেই প্রথম যে ঘরটা, সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা পথ দুটো এসে যুক্ত হয়েছে চত্বরের দু’পাশের অলিন্দর সঙ্গে। আর সামনে ওপর দিকে ধাপে ধাপে উঠে গেছে বিভিন্ন কক্ষ, ঝুল বারান্দা, প্রাঙ্গণ বা সিঁড়ি। তবে তার গায়ে এখনও লতাগুল্মর বিস্তার। সেগুলো পরিষ্কার না করলে জায়গাটার ভিতরে প্রবেশ করা যাবে না।

রামমূর্তি স্যরের সঙ্গে স্বাগতরা চত্বরটা বেশ খানিকটা সময় এদিনও ঘুরে দেখল। অলিন্দর স্তম্ভের গায়ে যে মূর্তিগুলো চোখে পড়ল সে সবই রক্ষীদের মূর্তি।

বিক্রম বলল, ‘আপনি যাই বলুন স্যর, এই মন্দিরের ভিতর আমি যেন কেমন গুপ্তধনের গন্ধ পাচ্ছি। ওই শিকল বাঁধা কলস হাতে লোকগুলোর মূর্তি, চারপাশে এত রক্ষীপ্রহরীর মূর্তি এসব যেন তারই ইঙ্গিত করছে।’

রামমূর্তি স্যর হেসে বললেন, ‘গুপ্তধনের খোঁজ যদি মেলে তবে তা আমাদের সরকারি কোষাগারে তুলে দিতে হবে। বড় জোর তার জন্য সামান্য কিছু আর্থিক পুরস্কার লাভ হতে পারে আমাদের। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।’—এ কথা বলে এরপর তিনি সামনে মাথার দিকে উঠে যাওয়া মন্দির, দেউল, প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ধারণা এ মন্দিরে কোনও রহস্য থাকলে তা লুকিয়ে আছে ওই অংশের কোনও জায়গাতে। ওই জায়গাটাই মন্দিরের মূল অংশ। কারণ ওর মাথাতেই মন্দির শৃঙ্গের অবস্থান। সাধারণত পর্বত আকৃতির শীর্ষদেশ মন্দিরের যে ছাদের ওপর অবস্থান করে, সেই ছাদের নীচেই থাকে দেবতার অধিষ্ঠান-গর্ভগৃহ বা গুরুত্বপূর্ণ কক্ষগুলো। আগামী দু’দিন মজুরদের দিয়ে মন্দিরের ওই মূল অংশটা যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করাব। তারপর দেখি ভিতরের কী মেলে?’ রামমূর্তি এরপর স্বাগতদের নিয়ে ফিরে এলেন কলস হাতে মূর্তি আর রক্ষীদের মূর্তি খোদিত ঘরটাতে। স্বাগতদের কাজ শুরু হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওদিকে মজুরের দলও ছাদের মাথায় উঠে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। গাছ কাটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। দুপুর একটা নাগাদ খাবার এল। চত্বরে বেরিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল তারা। তারপর আবার ঘরটাতে ঢুকে কাজ শুরু করল সকলে। বিকেল সাড়ে চারটের সময় রামমূর্তি বললেন, ‘আজকের মতো আমাদের কাজ এখানেই শেষ।’

সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। ঘরের আলোও কমে আসতে শুরু করেছে। কক্ষগুলো ত্যাগ করে মন্দিরের বাইরে বেরবার জন্য এগল সকলে। বাইরে বেরিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে স্বাগতরা দেখল মজুররা ছাদের মাথায় ডালপালাগুলো কেটে ফেলেছে। তারাও এবার ছাদ থেকে নীচে নামার উপক্রম করছে। প্রফেসর ছাদের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা হেরুমকে বললেন, ‘বাঃ, খুব ভালো কাজ করেছ তোমরা।’ এরপর প্রাঙ্গণ, মন্দির তোরণ অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে রওনা হল সকলে।

স্বাগত ঘরে ফিরে ধুলোমাখা কাজের জামা-কাপড় ছেড়ে মুখ হাত ধুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। সারাদিন সে বদ্ধ ঘরের মধ্যে কাটিয়েছে তাই আর আবদ্ধ জায়গার মধ্যে থাকতে ভালো লাগল না। একটু উন্মুক্ত বাতাসের দরকার। তাই সে ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। চত্বর ছেড়ে সে এগল বনপথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে গেল তার পরিচিত সেই জায়গাতে। সেখানে ঝোপ-জঙ্গলের আড়াল থেকে পাথরের ফলকের গায়ে উঁকি দিচ্ছে এক নারী মূর্তি। আজও সে একইভাবে রয়েছে নির্জন বনপথের তরুছায়ায়। কয়েকটা দিন তার আসা হয়নি। এখানে। মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে আরও একজনের কথা মনে পড়ল তার। সেই খামের যুবতীর কথা। অবশ্য চারপাশে তাকিয়ে তাকে দেখতে পেল না সে। স্বাগত একবার তাকাল দূরে আকাশের প্রেক্ষাপটে জেগে থাকা বিষ্ণুলোকের দিকে। পাঁচটা বেজে গেছে, সূর্য ঢলতে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলোর আড়ালে। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সে বসল মাটিতে শুয়ে থাকা পাথরের স্তম্ভটার ওপর। যেমন সে বসে অন্যদিন। জঙ্গলের মৃদু শীতল বাতাসে তার শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল এদিন তারা যে ব্যাপারটা

আবিষ্কার করেছে সেটা নিয়ে। মূর্তিগুলোর হাতের শিকল বন্দি ঘড়া বা কলসগুলো সবার মনেই কমবেশি কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। কী ছিল ওই কলসের মধ্যে? হীরে-জহরত সোনা বা অতি মূল্যবান কিছু জিনিস? আর সে সব কি আজও ওই মন্দিরের মধ্যে লুকানো আছে?’

‘ওই মন্দিরে কী আছে আমি জানি।’ নারী কণ্ঠের কথাগুলো শুনে মৃদু চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকাতেই স্বাগত দেখতে পেল আজও এসে উপস্থিত হয়েছে সেই খামের কন্যা!

স্বাগতর দিকে তাকিয়ে আছে সে। মাত্র হাত দশেকের ব্যবধানে আজ সে এসে দাঁড়িয়েছে। তার শরীরের সুগন্ধীর মৃদু গন্ধও যেন এসে লাগল স্বাগতর নাকে। খামের যুবতী আবারও বলল, ‘ওই মন্দিরে কী আছে আমি জানি। ওখানে কি থাকতে পারে আপনি সেটাই ভাবছিলেন তো?’

স্বাগত অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। মেয়েটা থট রিডিং জানে নাকি? নইলে কী করে বুঝতে পারল সে কী ভাবছিল? স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘আপনি কী করে বুঝলেন আমি কী ভাবছি?’

মেয়েটা জবাব না দিয়ে মৃদু হাসল।

স্বাগতর মনে পড়ে গেল এই খামের যুবতীকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটার কথা। অদ্ভুত সেই স্বপ্ন! যুবতী তাকে নিয়ে পালাচ্ছিল, তারপর কুমির বেষ্টিত 
পরিখায় পড়ে গেছিল স্বাগত! স্বপ্নটা যেমন অদ্ভুত তেমন পরপর দু’দিন তার সামনে এ সময় এই নারীর উপস্থিত হওয়াটা, তার কথাবার্তা কেমন যেন একটা রহস্যময় বলে মনে হল স্বাগতর। আজ মেয়েটাকে দেখে স্বাগতর বেশ একটা কৌতূহল জন্মাল তার প্রতি। সে তাকে বলল, ‘তোমার আপত্তি না থাকলে আমরা বসে কথা বলতে পারি?’

খামের যুবতী মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল তার কথায়। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে স্বাগতর কিছুটা তফাতে একটা প্রস্তর খণ্ডর ওপর বসল।

কয়েক মুহূর্তর নীরবতা। স্বাগত এরপর যুবতীকে প্রশ্ন করল, ‘এর আগের দিন তোমার নামটা জানা হয়নি। আমার নাম স্বাগত। তোমার নাম কী?’

খামের যুবতী মৃদু হেসে বলল, ‘নাম জেনে কী হবে? তবে আমার নাম না জানলেও কথা বলতে আমাদের অসুবিধা হবে না।’

যার সঙ্গে কথা হচ্ছে তার নাম না জানলে মনের ভিতর একটা অস্বস্তি হয় ঠিকই। কিন্তু স্বাগত ভাবল, এখানকার খামের অধিবাসীদের রীতিনীতি এখনও তার ভালোভাবে জানা নেই। হয়তো বা খামের যুবতীরা স্বল্প পরিচিত পুরুষদেরকে তাদের নাম জানায় না। তাই সে দ্বিতীয়বার আর নাম জানতে চাইল না। তবে সে মেয়েটার কথার সূত্র ধরে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা যে মন্দিরে কাজ করছি সে মন্দিরে কী আছে তা তুমি জানো?’

খামের সুন্দরী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, জানি।’

অনেক সময় স্থানীয় স্থাপত্য নিয়ে অনেক লোককথাউপকথা প্রচলিত থাকে। হয়তো মেয়েটা তেমনই কোনও কাহিনি জানে ওই মন্দির সম্পর্কে। স্বাগত তাই তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ওই মন্দির সম্পর্কে কী জানো শুনি?”

মেয়েটা তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে। শৃঙ্গগুলোর পিছনে সূর্য ডুবে গেছে। আকাশটা লাল হয়ে আছে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, ‘ঠিক এই সময় ঘটেছিল সেই ঘটনাটা। আর তারপরই সন্ধ্যা নেমেছিল বিষ্ণুলোকে। সে ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তোমরা যে মন্দিরে প্রবেশ করেছ সেই মন্দির।’

স্বাগত আগ্রহ ভরে জানতে চাইল, ‘কী ঘটনা?’

যুবতী জবাব দিল, ‘বহু হাজার বছর আগের এক ঘটনা।’—এ কথা বলে আবারও থেমে গেল সে। অস্তাচলগামী সূর্যের রক্তিম আভা মাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে খামের যুবতী কী যেন ভাবতে লাগল।

স্বাগত আবার তাকে বলল, ‘বল শুনি সেই কাহিনি?’

যুবতী এবার আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল স্বাগতর দিকে। তারপর বলল, ‘সে কাহিনি অনেকটা বড়, অনেক কথা।’

স্বাগত বলল, ‘তুমি বল? শুনতে আমার অসুবিধা নেই।’

খামের সুন্দরী বলল, ‘তুমি যখন শুনতে চাইছ সে কাহিনি তখন তা বলব তোমাকে। তবে আজ নয়। অন্যদিন। আর কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নেমে যাবে, আমার কাহিনি শেষ করা যাবে না।’—এ কথা বলে হঠাৎই উঠে দাঁড়াল যুবতী। তারপর স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘ও মন্দিরে কেউ পা না রাখলেই ভালো হতো।’

স্বাগত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কেন?’

মেয়েটা আর স্বাগতর কথার জবাব দিল না। হাঁটতে শুরু করল সে। হঠাৎই যেমন সে স্বাগতর সামনে আবির্ভূত হয়েছিল তেমনই কয়েক মুহূর্তর মধ্যে হারিয়ে গেল জঙ্গলের আড়ালে।

তার আচরণ দেখে স্বাগত মনে মনে বলল, ‘বড় অদ্ভুত মেয়ে তো! যেমন হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়, তেমন হঠাৎই চলে যায়! কেমন যেন রহস্যময় আচরণ!’

আর এরপরই সে কিছুদূর থেকে মৃদু কথাবার্তার শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখতে পেল সুরভী-নাতাশা-বিক্রম আর প্রীতমকে। তারা একসঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছে। স্বাগতকে এরপর তারা দেখতে পেয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল।

চারজন এসে দাঁড়াল স্বাগতর সামনে। বিক্রম তাকে বলল, ‘এখানে একলা দাঁড়িয়ে কী করছ?’

স্বাগত বলল, ‘এ জায়গাটা বেশ সুন্দর লাগে আমার। ছায়াঘন সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ। আবার এখান থেকে বিষ্ণুলোকের মাথায় সূর্যাস্তও দেখা যায়। তাই এখানে এসে বসেছিলাম।’

নাতাশা বলল, ‘হ্যাঁ, চারপাশটা বেশ সুন্দর। বিষ্ণুলোকের মাথার ওপরের আকাশটাও এখান থেকে ভারী সুন্দর লাগছে! চারপাশে তাকাতে তাকাতে সুরভীর হঠাৎ চোখ পড়ল ঝোপ-জঙ্গলের আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া সেই নারী মূর্তির উপর। সেটা দেখতে পেয়েই সে এগিয়ে গেল তার সামনে। অন্যরাও এগিয়ে গেল সে জায়গায়। স্বাগত আগের দিনও খেয়াল করে দেখেছে দিন শেষের একটা মায়াবি আলোক রেখা এসে পড়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটার উপর। এদিনও সেই আলো এসে পড়েছে তার শরীরে। সুরভী সেই মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী অদ্ভুত সুন্দর মূর্তিটা!’ তারপর সে স্বাগতর উদ্দেশে বলল, ‘এ মূর্তিটা কার তুমি জানো? এখানে কোথা থেকে এল?’

স্বাগত বলল, ‘সম্ভবত কোনও অপ্সরা বা নর্তকী এমন কারও মূর্তি হবে। নিশ্চয়ই আশপাশের কোনও সৌধর গায়ে বসানো ছিল। কোনও কারণে এখন একলা ওখানে পড়ে আছে।’

নাতাশা বলল, ‘কেমন যেন নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছে মূর্তিটাকে। আচ্ছা, এটাকে আমাদের কাজের জায়গায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না? এত সুন্দর একটা মূর্তি এমন অনাদরে এখানে পড়ে আছে।’

স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, যায়। প্রফেসর রামমূর্তি যদি নির্দেশ দেন।’