Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৬

পর্ব ১৬

আ ছাড় মেরেই খান্ত হল না সেই হাতি। সে পদদলিত করতে লাগল হরিদেবের দেহ। শুধুমাত্র একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত হল তাঁর দেহ। হাতিটা এরপর হরিদেবের সেই দেহটাকে শুঁড়ে তুলে ছুঁড়ে দিল পরিখার জলে। ছুটে এল কুমিরের ঝাঁক। হতভাগ্য হরিদেবের আর রাজা হওয়া হল না। পুরো ঘটনাটা ঘটতে কিছু মুহূর্ত মাত্র সময় লাগল। এরপরই অন্য হাতিগুলোকে দিয়ে ঘিরে ফেলা হল ঘাতক হাতিটাকে। সে আর অন্য কোনও ক্ষতি করতে পারল না। শঙ্খধ্বনি থেমে গেল, বিষ্ণু মন্দিরের চারপাশ ভরে উঠল হাহাকার আর আতঙ্কিত মানুষের চিৎকারে। ঠিক এইসময় সেখানে উপস্থিত হলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। ঘাতক হাতির পিঠ থেকে ততক্ষণে তার মাহুতকেও নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে। ধরণীন্দ্রবর্মন ঘটনাটা দেখেই বললেন, ‘এই মাহুত নিশ্চয়ই চামেদের পাঠানো ঘাতক। মাহুতের অঙ্কুশের ইশারা ছাড়া শিক্ষিত হাতি এ কাজ করতে পারে না। আমি যদি আগে আসতাম তবে আমার ভাগ্যেও মৃত্যু লেখা ছিল। কিন্তু এ অন্যায়ের কোনও ক্ষমা নেই।’ এই কথা শুনে তাঁর নিজের অনুগামীরা তো বটেই এমনকী হরিদেবের অনুগামীরাও চিৎকার করে বলে উঠল ‘হত্যা কর, হত্যা কর ওই ঘাতককে।’

ধরণীন্দ্রবর্মন উপস্থিত জনতার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আর কালক্ষেপ করলেন না। ধরণীন্দ্রবর্মনের নির্দেশে তখনই খড়্গার আঘাতে মাহুতের মুণ্ড ছিটকে পড়ল মাটিতে। বিজয় উৎসব সেদিনের মতো স্থগিত হয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সে উৎসব পালিত হল ধরণীন্দ্রবমর্নের রাজ্যাভিষেক উৎসবের সঙ্গে। খামের সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসলেন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন। হতভাগ্য হরিদেবের রাজ সিংহাসনে বসা তো হলই না, এমনকী মৃত্যুর পর বিষ্ণুলোকেও স্থান হল না তাঁর।’—এ কথা বলে থেমে গেল খামের সুন্দরী।

স্বাগত বলল, “বিষ্ণুলোকে তাঁর স্থান হল না কেন? হরিদেবের পিণ্ডদান করা হয়নি?”

খামের যুবতী বলল, ‘সে কথা সময়মতো বলব। আজ আমার কথা এ পর্যন্তই থাক।’

স্বাগত বলল, “কিন্তু আমরা যে মন্দিরে কাজ করছি এ ঘটনার মধ্যে তার কথা কোথায়? সেটাই তো বললে না তুমি।”

খামের যুবতী তার কথার জবাবে বলল, ‘সে কথা জানার জন্য ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে। সবে তো শুরুর কথা বললাম তোমাকে। তবে এর সঙ্গেই মালার মতো গেঁথে আছে সব ঘটনা। ধরে নাও তোমার মন্দিরের ব্যাপারটা এ মালার শেষ পুঁতির মতোই।’

স্বাগত মৃদু হতাশভাবে স্বগত্যোক্তি করল—’আজ তবে এইটুকুই!’

খামের যুবতী বলল, ‘হ্যাঁ। এ কথা বলে সে আঙুল তুলে দেখাল বিষ্ণুলোকের দিকে। স্বাগত খেয়াল করল যুবতীর কথা শুনতে শুনতে সূর্যদেব কখন যেন মুখ লুকিয়ে ফেলেছেন বিষ্ণুলোকের আড়ালে। আকাশের বুকে জেগে আছে তার লাল আভাটুকু। কিছুক্ষণের মধ্যে তা মুছে গিয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করবে।

খামের যুবতী এবার উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল স্বাগতও। মেয়েটা বিষ্ণুলোকের মাথার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আকাশটা রক্তের মতো লাল তাই না?’

স্বাগত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, অনেকটা ওইরকমই লাগছে।’

মেয়েটা সেদিকে তাকিয়েই বলল, ‘ওই প্রাচীন মন্দিরের ভিতর আর প্রবেশ না করাই তোমাদের পক্ষে ভালো হবে বলে মনে হয়।’

স্বাগত বলল, ‘কেন বল তো?’

খামের কন্যা এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, ‘আমি আবার আসব তোমাকে গল্প শোনাতে।’

স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও আসব।’

মেয়েটা এরপর আর কোনও কথা বলল না। সে হাঁটতে শুরু করল জঙ্গলের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে স্বাগত চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। খামের যুবতীর বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে স্বাগত ফেরার পথ ধরল। সে যখন মন্দিরের কাছে ফিরে এল তখন ঝুপ করে সন্ধ্যা নামতে শুরু করল বিষ্ণুলোকে।

পরদিন নির্দিষ্ট সময়ই উপস্থিত হল মজুরদের দল। তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রফেসর রামমূর্তির পিছন পিছন মন্দিরে প্রবেশ করল স্বাগতরা পাঁচজন। ছাদের ডালপালা কেটে দেওয়াতে কাজ হয়েছে মনে হল। বাঁদরের দল আর আসেনি। তোরণ, বাইরের চত্বর আর ঘরগুলো একে একে অতিক্রম করে তারা সকলে প্রথমে গিয়ে উপস্থিত হল ভিতরের প্রাঙ্গণে মূল মন্দিরের সামনে। তার গায়ের ঝোপ, জঙ্গল, লতা, গুল্ম প্রায় অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে মজুরেরা। ওপরের দিকে সামান্য কিছু অংশ পরিষ্কার করা বাকি। স্বাগতদের চোখের সামনে জেগে উঠেছে মন্দিরের নানা অংশ স্তম্ভ, অলিন্দ, কক্ষ, খিলান। কত বছর ধরে লতাগুল্মর আড়ালে তারা নিজেদেরকে আত্মগোপন করে রেখেছিল কে জানে? মজুরদের সর্দার বলল, ‘জঙ্গল পরিষ্কারের কাজটা তারা এদিনের মধ্যেই শেষ করে ফেলবে। তার কথা শুনে রামমূর্তি বললেন, ‘তোমাদের কাজ তাড়াতাড়ি মিটে গেলে আজই মন্দিরের ওপরে ওঠার সিঁড়ি যেখানে আছে, ভিতরে ঢুকে তার পথটা আগে পরিষ্কার করে ফেলবে। কালই মন্দিরের ভিতরে ঢুকব আমরা।’

হেরুমকে আরও কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে স্বাগতদের নিয়ে রামমূর্তি আবার ঘরগুলোতে ফিরে এলেন। তাঁর নেতৃত্বে ঘরগুলোর পরিমাপ নিতে শুরু করল সকলে। ভিতরের দিক থেকে পরিমাপ করতে করতে বাইরের দিকে এগতে থাকল তারা। স্বাগত একটা জিনিস খেয়াল করল রামমূর্তি স্যর কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘরের মেঝেতে যে সব জায়গায় ধুলো জমে আছে সে সব জায়গাগুলো ভালো করে দেখার চেষ্টা করছেন। তিনি কি সেই ছোট পদচিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করছেন? এমনটাই স্বাগতর মনে হল। তাদের কাজ এগিয়ে চলল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে সময়ও। স্বাগত ভোর বেলা উঠেই মনে মনে ভেবে রেখেছে, বিকেলে কাজ শেষ হওয়ার পর সে আজও যাবে সেই খামের নারীর কাহিনি শুনতে। দেখা যাক আজ সে এই মন্দিরের প্রসঙ্গে কিছু বলে কি না? কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই তার মনে পড়তে লাগল সেই খামের যুবতীর কথা। সে যেন রহস্যময়ী।

অন্য ঘরগুলো একে একে পরিমাপ করার পর বাইরের দিকের শেষ ঘরটায় এসে উপস্থিত হল সকলে। রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘এ ঘরটা মাপা হয়ে গেলেই, আজকের মতো তোমাদের কাজ শেষ।’

কথাটা শুনে স্বাগত ভাবল, ভালোই হবে। বিকেল হলেই সে রওনা হতে পারবে ওই খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। আজ তাহলে অনেকটা সময় পাওয়া যাবে তার গল্প শোনার জন্য।

সে ঘরে কাজ শুরু করল তারা। সূর্য মাথার ওপর। বাইরে থেকে বেশ খানিকটা আলোও ঢুকছে ঘরে। তাতে স্বাগতদের কাজের সুবিধা হচ্ছিল। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে বলতে কাজ করছিল স্বাগতরা। হঠাৎ বাইরে থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—‘আপনারা কেউ আছেন? বাইরে তাকিয়ে সবাই দেখতে পেল প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করে ভিতরের চত্বরে এসে দাঁড়িয়েছে নারেঙ খাম আর গাইড ফঙ!

রামমূর্তি বললেন, ‘ফঙ আবার এসে হাজির হয়েছে দেখছি! কিন্তু এর সঙ্গে লোকটা কে? ট্যুরিস্ট নাকি?’

স্বাগত বলল, ‘ওই ভদ্রলোকই নারেঙ খাম। তার কথা শুনেছেন আপনি।’

রামমূর্তি ঘর ছেড়ে চত্বরে বেরিয়ে এলেন। আর তার সঙ্গে স্বাগতরা সকলে। তাদেরকে দেখতে পেয়ে হাসি ফুটে উঠল নারেঙ খামের মুখে। তার হাতে গত দিনের মতোই ক্যামেরা বসানো স্টিলের স্টিকটা রয়েছে। নারেঙ খাম এগিয়ে এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। গাইড ফঙও এল তার পিছন পিছন। নারেঙ খাম প্রথমে পরিচিত মুখগুলোর উদ্দেশে ‘হাই-হ্যালো’ বলার পর প্রফেসর রামমূর্তির দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল ‘আপনি তো প্রফেসর রামমূর্তি। আমার নাম নারেঙ খাম। আপনি হয়তো আমার কথা আপনার সঙ্গীদের মুখ থেকে শুনেছেন।’

তার সঙ্গে করমর্দন করে প্রফেসর রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, শুনেছি।’

নারেঙ খাম বলল, ‘আপনাদের এই মন্দিরটা দেখব বলে চলে এলাম।’

নারেঙের কথা শুনে রামমূর্তি, ফঙকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন, ‘ওই কি আপনাকে এখানে আনল?’

রামমূর্তি স্যরের বাচনভঙ্গি দেখে স্বাগত অনুমান করল নারেঙের এ মন্দির দেখতে আসার ব্যাপারটা তিনি পছন্দ করছেন না।

নারেঙ হেসে জবাব দিল, ‘ও আমার গাইড। ও পথ চিনিয়ে আমাকে এখানে আনল ঠিকই, তবে আমিই ওকে এখানে আমাকে নিয়ে আসতে বললাম। আপনারা এ মন্দিরে কাজ করছেন জানি। তাই ভাবলাম এখানে আসি। মন্দির দেখাও হবে আর পরিচিত মানুষদের সঙ্গেও দেখা হবে। চলে এলাম।’—এ কথা বলে স্বাগতদের দিকে তাকাল মিস্টার নারেঙ।

রামমূর্তি বললেন, ‘এ মন্দির এখনও ট্যুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। সবেমাত্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।’

নারেঙ বলল, ‘তা আমি জানি। তবে বর্তমানে মন্দিরটা যতটুকু দেখা সম্ভব সেটুকুই দেখব আমি।’

রামমূর্তি তাকে নিরস্ত করার জন্য বললেন, ‘এখনও ধুলো, বালি, জঞ্জালে ভরে আছে মন্দির। জঙ্গল কাটার কাজ চলছে। আমাদের ধুলো মাখা পোশাক দেখে আশা করি ব্যাপারটা অনুমান করতে পারছেন?’

নারেঙ খাম কিন্তু তাঁর কথা শুনে দমল না। সে বলল, ‘আপনি আমার এই দামি স্যুটে নোংরা লাগার ভয় করছেন? এমন স্যুট আমি একবাক্স সঙ্গে এনেছি। চিন্তা করবেন না। এবার তবে ভিতরটা ঘুরে দেখি? চিন্তা নেই, আমি আপনার কাজের কোনও ব্যাঘাত ঘটাব না।’

প্রফেসর রামমূর্তি এবার পরিষ্কার বললেন, ‘দুঃখিত। আমরা বাইরের কোনও লোককে আমাদের কাজ শেষ হওয়ার আগে এখানে প্রবেশ করতে দিতে পারি না। এটা সরকারি নির্দেশও বলতে পারেন।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নারেঙ খাম বলল, ‘সরকার অবশ্য বিশেষ ক্ষেত্রে তার নিয়ম শিথিল করেন।’

রামমূর্তি বললেন, ‘আপনার কথার অর্থ?’

নারেঙ খাম বলল, ‘ব্যাপারটা আমি কাউকে জানাতে চাইছিলাম না। কারণ, কোনও কিছু দান করলে আমি ব্যাপারটা গোপন রাখি। বাধ্য হয়ে আপনাদের জানাতে হচ্ছে ব্যাপারটা।’

এ কথা বলে তিনি পকেট থেকে দুটো কাগজ বের করে এগিয়ে দিলেন রামমূর্তির দিকে। রামমূর্তির পাশে দাঁড়ানো স্বাগতও ঝুঁকে পড়ল কাগজটা দেখার জন্য। প্রথম কাগজটা একটা সরকারি মানি রিসিভ। তাতে লেখা আছে এ দেশের সরকার আঙ্করভাটের প্রাচীন সৌধগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নারেঙ খামের থেকে পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে গ্রহণ করলেন! অঙ্কটা দেখে চমকে গেল স্বাগত। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রাতে চল্লিশ লাখ টাকা আর কম্বোডিয়ান রিয়ালে হিসাব করলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় কাগজটা দেখল স্বাগতরা। তাতে লেখা, নারেঙ খামকে এ দেশের সরকার আঙ্করের যে কোনও সৌধে প্রবেশ করার ও ছবি তোলার বিশেষ অনুমতি প্রদান করছে। কাগজ দুটো দেখে রামমূর্তি আর স্বাগত, দু’জনেই বুঝতে পারল যে ওই বিপুল অঙ্কের অর্থ দান করার ফলেই এ দেশের সরকার নারেঙকে এই বিশেষ অনুমতি দিয়েছে।

নারেঙ এরপর রামমূর্তি স্যরকে বলল, ‘আপনার ইচ্ছা হলে কাগজগুলোতে যে টেলিফোন নম্বর দেওয়া আছে, অথবা আপনার নিজস্ব সরকারি দপ্তরে ফোন করে জেনে নিতে পারেন যে কাগজ দুটো আসল নাকি নকল?’

প্রফেসর রামমূর্তি তার হাতে কাগজগুলো ফিরিয়ে দিয়ে

বললেন, ‘থাক, তার দরকার নেই।’

কাগজগুলো ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে নারেঙ বলল, ‘এইসব প্রাচীন সৌধগুলো আমার জন্মভূমির ঐতিহ্য। অনেক দিন ধরেই আমার ইচ্ছা ছিল এ সবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু করব। ফ্রান্স থেকে আমার জন্মভূমি দেখতে আসার পিছনে এটাও একটা কারণ।’

এ কথা বলার পর সে রামমূর্তির উদ্দেশে বলল, ‘এবার নিশ্চয়ই আমাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধা দেবেন না? আপনিও সঙ্গে চলুন না। আপনি পণ্ডিত মানুষ। আমি আর্কিওলজির ব্যাপারটা বুঝি না। কোনও কিছু দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলে সেটা আপনি বুঝিয়ে দিতে পারবেন।’

রামমূর্তি বললেন, ‘স্বাগত তুমি আমার সঙ্গে এসো। মন্দিরের ভিতরটা ওকে ঘুরিয়ে আনি। আর অন্যরা পরিমাপের কাজটা শেষ করে ফেল।’

এ কথা বলার পর সে রামমূর্তির উদ্দেশে বলল, ‘এবার নিশ্চয়ই আমাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধা দেবেন না? আপনিও সঙ্গে চলুন না। আপনি পণ্ডিত মানুষ। আমি আর্কিওলজির ব্যাপারটা বুঝি না। কোনও কিছু দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলে সেটা আপনি বুঝিয়ে দিতে পারবেন।

স্বাগত বুঝতে পারল, রামমূর্তি, নারেঙের সঙ্গে মন্দিরের ভিতরে যাচ্ছেন সেটা নারেঙের অনুরোধের কারণে নয়। নারেঙকে তিনি একা মন্দিরের ভিতর ছাড়তে চাইছেন না, চোখে চোখে রাখতে চাইছেন। এরপর নারেঙ, ফঙকে নিয়ে সবাই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল, প্রথম কক্ষটাতে পা রেখেই চারপাশে তাকিয়ে নারেঙ জানতে চাইল, ‘এটা কোন দেবতার মন্দির?’

‘জানা যায়নি।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন রামমূর্তি।

অন্যরা সে ঘরেই কাজে রয়ে গেল। রামমূর্তি আর স্বাগত নারেঙ ও ফঙকে নিয়ে এগল পরের ঘরগুলোতে যাওয়ার জন্য। রক্ষীদের মূর্তিগুলো দেখতে দেখতে নারেঙ রামমূর্তি স্যরকে জিজ্ঞেস করল, এখানকার ঘরে এত পাহারাদারের মূর্তি কেন? সত্যি কত পরিশ্রম করে এসব পুরাকীর্তি উদ্ধার করছেন!’

রামমূর্তি স্যর জবাব দিলেন, ‘জানি না।’

এমন কাট কাট সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে রামমূর্তি স্যর যেন নারেঙকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন এখানে তাদের উপস্থিতি তিনি মোটেও পছন্দ করছেন না। যথেষ্ট গম্ভীর তার মুখ।

নারেঙ অবশ্য ব্যাপারটা গায়ে মাখছে না বলেই মনে হল স্বাগতর। সে নিজের মনে ঘরগুলো দেখতে লাগল আর ছবি তুলতে লাগল। তবে স্বাগত খেয়াল করে দেখল গাইড ফঙের দৃষ্টি যেন অনেক বেশি সজাগ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরের প্রতিটা কোণ, মেঝে থেকে দেওয়াল বেয়ে ছাদ পর্যন্ত।

একটার পর একটা ঘর অতিক্রম করতে করতে একসময় তারা পৌঁছে গেল সেই শেষ ঘরটাতে। যেখানে সার বেঁধে দেওয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে রক্ষীবেষ্টিত মূর্তিগুলো। সেদিকে তাকিয়েই নারেঙ ‘ওয়াও!’ বলে মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বার করে দেওয়ালটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ফঙও তার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। অগত্যা রামমূর্তি আর স্বাগতও গিয়ে দাঁড়াল তাদের একপাশে। স্বাগত দেখল, মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ফঙের মুখটা ‘হাঁ’ হয়ে গেছে! বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে মূর্তিগুলোর দিকে! নারেঙ স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘কাদের মূর্তি এগুলো?’

প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘জানি না।’

কিন্তু গাইড ফঙ বলল, ‘শূদ্র-ব্রাহ্মণদের মূর্তি।’

একজন লোক একই সঙ্গে ব্রাহ্মণ আর শূদ্র হবে কীভাবে? নিজের অজান্তেই স্বাগতর মুখ থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে এল ‘শূদ্র-ব্রাহ্মণ’ মানে?’

ফঙ হয়তো বা স্বাগতর কথার জবাব দিতে চাইছিল কিন্তু তার আগেই রামমূর্তি ক্ষুব্ধভাবে বিদ্রূপের স্বরে বলে উঠল, ‘তুমি তো সব ব্যাপারে বেশ পণ্ডিত দেখছি, সরকার তো আমাদের বদলে তোমাকেই এসব কাজে নিয়োগ করতে পারেন।’

তাঁর কথা শুনে ফঙও ক্ষুব্ধ স্বরে রামমূর্তিকে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি লেখাপড়া না জানা একজন অশিক্ষিত গাইড, পণ্ডিত নই। আপনি পড়াশোনা জানা পণ্ডিত মানুষ। তাই আপনি আপনার লোককে জানিয়ে দেবেন শূদ্র-ব্রাহ্মণ কাদের বলা হতো।’ ফঙ আর প্রফেসর রামমূর্তির মধ্যে বাকযুদ্ধ অপ্রীতিকর জায়গায় পৌঁছতে পারে অনুমান করে নারেঙ বলল, ‘ফঙ তুমি থাক। এগুলো যাঁদের ছবি হয়ে থাক না কেন, ভাস্কর্যগুলো সুন্দর।’ স্বাগতও কোনও পক্ষ থেকে অবাঞ্ছিত বাক্যালাপ যাতে না হয়, সে জন্য বলল, ‘এ ঘরটা দেখা হয়ে গেলে আমরা সামনের দিকে এগতে পারি?’

নারেঙ বলল, ‘দাঁড়ান, এ মূর্তিগুলোর ছবি তুলে নিই। নারেঙ এরপর বেশ কয়েকটা ছবি তুলল মূর্তিগুলোর। ফঙ অবশ্য এরপর আর কিছু বলল না। সে ঘর ছেড়ে তারা বেরিয়ে এসে ভিতরের প্রাঙ্গণে দাঁড়াল। তারপর সামনের মন্দির কাঠামোর দিকে তাকিয়ে নারেঙ বলল, “বাঃ কী সুন্দর। এটাই তবে আসল মন্দির তাই না?’

রামমূর্তি তার কথার কোনও জবাব দিলেন না। তবে স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, তবে ওর ভিতরে ঢোকা যাবে না। দেখতেই তো পাচ্ছেন জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ চলছে।’