Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৭

পর্ব ১৭

স্বাগত যখন বলল, তখন সত্যিই দু’জন লোক মন্দিরের গা বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে লতাগুল্ম কাটছিল। যদিও তাদের কাজ শেষ হয়ে এসেছে বলে স্বাগতর মনে হল। স্বাগতর কথা শুনে নারেঙ আর এ মুহূর্তে মন্দিরের ভিতরে ঢোকার ইচ্ছা প্রকাশ করল না ঠিকই তবে সে ফঙকে নিয়ে মন্দিরের কাছে এগিয়ে গিয়ে একতলার অলিন্দে বাইরে থেকে একটু উঁকি ঝুঁকি মারার পর মন্দিরের বেশকিছু ছবি তুলে নিল।

রামমূর্তি এরপর নারেঙের উদ্দেশে বলল, ‘আশা করি আপনার দেখা শেষ হয়েছে এবার? আমার অন্য কাজ আছে।’ রামমূর্তির কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে নারেঙ বলল, ‘এই মন্দিরের ভিতরে যখন ঢোকা যাবে না, তখন আপাতত আমার দেখা শেষ। এবার আমি ফিরব।’

নারেঙ খাম এরপর তার সঙ্গীকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার পথ ধরল। রামমূর্তি আর স্বাগতও চলল তাদের সঙ্গে। ভিতরের প্রাঙ্গণ থেকে কক্ষটাতে প্রবেশ করার পর ফঙ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আবারও বেশ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল দেওয়ালের গায়ের মূর্তিগুলোর দিকে। তা দেখে স্বাগতর মনে হল এ লোকটা কি এই মূর্তিগুলোর রহস্য সম্পর্কে কিছু জানে? রামমূর্তি তাদের তাড়া লাগিয়ে বললেন, ‘আমার কিন্তু অন্য কাজ আছে।’

এরপর আবার হাঁটতে শুরু করল সবাই। তারা যখন বাইরে বেরবার জন্য শেষ ঘরে পৌঁছল তখন অন্য চারজনের কাজ শেষ হয়ে গেছে। নারেঙ তাদের উদ্দেশে বলল, তো আপনাদের সঙ্গে গল্প করা হল না। তবে আমি আবার আসব। তখন কথা হবে।’— এই বলে ঘরের বাইরে নারেঙ তার সঙ্গীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রামমূর্তি কিন্তু তাদের পিছু ছাড়লেন না। তিনি তাদের সঙ্গে প্রবেশ তোরণ অবধি চললেন। আর তাঁর সঙ্গে স্বাগতও। তোরণের কাছে পৌঁছে নারেঙ রামমূর্তিকে বলল, ‘চলি তাহলে? আবার দেখা হবে।’

রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, যান। তবে আপনাকে একটা কথা জানিয়ে দিই, সরকারি কাগজে শুধু আপনার প্রবেশের অনুমতির কথা বলা হয়েছে। অন্য কাউকে কিন্তু প্রবেশ করতে দিতে আমি বাধ্য নই।’

রামমূর্তির কথাগুলো যে ফঙকে উদ্দেশ করে বলা তা বুঝতে অসুবিধা হল না স্বাগতর। কথাটা শুনে ফঙ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসল। নারেঙ খাম অবশ্য কোনও প্রত্যুত্তর দিল না। সে ফঙকে নিয়ে তোরণের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। তারা চলে যাওয়ার পর রামমূর্তি মন্তব্য করলেন, ‘গাইড ফঙটা একদম রাবিশ। আজেবাজে গল্প শোনানোই এদের কাজ।’ এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি ঘর থেকে ঘুরে আসছি। আর হ্যাঁ, তুমি আবারও সবাইকে মনে করিয়ে দাও যে, কোথাও কখনও বাইরের কোনও লোকের সঙ্গে এ মন্দিরের কোনও বিষয় সম্পর্কে কেউ যেন কোনও আলোচনা না করে।’ এ কথা বলে তিনিও তোরণের বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

স্বাগত ফিরে এসে ঘরে প্রবেশ করতেই প্রীতম তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপারটা কী বলো তো?’

স্বাগত তাদেরকে সব কথা বলল, একই সঙ্গে রামমূর্তি স্যরের নিষেধটাও তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিল। নাতাশা শুনে বলল, ‘নারেঙ খাম তো দেখছি তবে মারাত্মক বড়লোক!’

বিক্রম নাতাশাকে বলল, ‘তোমার যদি লোকটাকে পছন্দ হয়ে থাকে, আর নারেঙ যদি রাজি হয় তবে আমি তোমাদের মধ্যে সেতু বন্ধনের কাজ করতে পারি।’

নাতাশা বলল, ‘তুমিও তো কোনও কম্বোডিয়ান মেয়েকে বিয়ে করে এখানে থেকে যেতে পার। রোজ তোমাকে সে কুমিরের মাংস রেঁধে খাওয়াবে।’

সুরভী আর প্রীতম অবশ্য এই মশকরাতে যোগ দিল না। প্রীতম বলল, ‘নারেঙ লোকটাকে আমার এমনিতে খারাপ বলে মনে হয়নি। তবে আঙ্করভাটের মন্দির সংস্কারের জন্য অর্থদান করে প্রাচীন স্থাপত্যের ভিতর প্রবেশ অনুমতি আদায়ের পিছনে ওর কোনও উদ্দেশ্য নেই তো?’

সুরভী প্রশ্ন করল, ‘কী উদ্দেশ্যর প্রতি ইঙ্গিত করছ তুমি?’

প্রীতম বলল, ‘এই ধর গুপ্তধনের অনুসন্ধান। ব্যবসায়ী মানুষরা হিসাব করে খরচ করে। অনেকগুলো টাকা দান করেছে লোকটা। অন্য কোনও কারণেও এই টাকা আসলে লগ্নি করেনি তো? মন্দিরে প্রবেশের অনুমতিপত্র সংগ্রহর ব্যাপারটাই আমার মনে কেমন যেন সন্দেহের কারণ ঘটাচ্ছে।’

প্রীতম যে কথাগুলো বলল তা স্বাগতরও মনে হয়েছে নারেঙের কাগজগুলো দেখার পর। যদিও মন্দিরে প্রবেশ করার পর নারেঙের হাবভাবে স্বাগত তেমন সন্দেহজনক কিছু দেখতে পায়নি। তবে ফঙের চোখের দৃষ্টি ভান্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলোকে দেখে কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। স্বাগত বলল, ‘কার মনে কী উদ্দেশ্য আছে তা তো আমাদের জানা নেই। আমরা যাতে কোনও বিপদে জড়িয়ে না পড়ি সে জন্য আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারও কিছু সন্দেহজনক মনে হলেই তা সঙ্গে সঙ্গে রামমূর্তি স্যর ও অন্যদেরকে জানানো দরকার।’

স্বাগতর কথা শুনে সুরভী মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল। দুপুরের খাবার চলে এল। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করার পর বিক্রম স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাজ তো শেষ? আমরা কি এখন তবে ঘরে ফিরে যাব?’

ঠিক এই সময় রামমূর্তি স্যর ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তোমরা ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পার। আমি ওদিকে গিয়ে কাজের তদারকি করি।’

ঠিক এইসময় মন্দিরের ভিতর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। আর তারপরই শোনা গেল মজুরদের সম্মিলিত চিৎকার চেঁচামেচি। রামমূর্তি সঙ্গে সঙ্গে ছুটলেন মন্দিরের ভিতর দিকে যাওয়ার জন্য। আর তাঁকে অনুসরণ করল স্বাগতরা।

অকুস্থলে ভিতরের প্রাঙ্গণে পৌঁছে তারা দেখতে পেল মন্দিরের ওপর দিকে যেখানে গাছ কাটা হচ্ছিল, ঠিক তার নীচেই মাটিতে পড়ে আছে একজন মজুর। মাথা ফেটে রক্ত বেরচ্ছে তার। আর তাকে ঘিরে উত্তেজিতভাবে কথা বলছে অন্যরা। স্বাগতরা সেখানে পৌঁছতেই হেরুম মন্দিরের ওপর দিকে অলিন্দ সংলগ্ন একটা কার্নিশ দেখিয়ে বলল, ‘ও ওখান থেকে পড়ে গেল।’

আহত মজুরের তখনও জ্ঞান আছে। তবে মাঝে মাঝে সে কেঁপে উঠছে। চোখের দৃষ্টিতে কেমন যেন একটা আতঙ্ক ভাব। রামমূর্তি তার ওপর ঝুঁকে পড়ে জানতে চাইলেন, ‘তুমি পড়ে গেলে কীভাবে?’

লোকটা জবাব দিল, ‘আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল।’

‘কে ধাক্কা মারল?’ জানতে চাইলেন রামমূর্তি।

সে বলল, ‘ভূ-উ-উ-ত!’ আর এরপরই যন্ত্রণা আর আতঙ্কে জ্ঞান হারাল লোকটা। স্বাগত খেয়াল করল অন্য মজুরদের চোখেও এবার আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। রামমূর্তি হেরুমকে বললেন, ‘ওর মাথার ক্ষতটা কাপড় দিয়ে বাঁধ। আমি গাড়ি ডাকছি। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

সেই পরিকল্পনা মতোই কাজ হল। রামমূর্তির ফোন পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটো টুকটুক এসে হাজির হল। আহত অচৈতন্য লোকটাকে ধরাধরি করে বাইরে এনে গাড়িতে তোলা হল। রামমূর্তি স্যর স্বাগতদের বললেন, ‘আমাকেও ওদের সঙ্গে যেতে হবে। আমি না ফেরা পর্যন্ত কেউ এ জায়গা ছেড়ে বাইরে যেও না। বলা যায় না, আমার হয়তো তোমাদেরকে প্রয়োজন হতে পারে।’ এই বলে তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন। আহত লোকটাকে নিয়ে প্রফেসর রামমূর্তি, আর অন্যরা রওনা হয়ে গেল সিয়েমরিপের দিকে। তারা চলে যাওয়ার পর নাতাশা বলল, ‘লোকটাকে কি সত্যিই ভূতে ধাক্কা মারল?’

তাকে আশস্ত করার জন্য সুরভী বলল, ‘এই কাঠফাটা রোদে ভূত আসবে কীভাবে? ও হয়তো নিজেই পা হড়কে পড়ে গেছে। তারপর আতঙ্কে ভুল বকছে!’

স্বাগত বলল, ‘এবার বরং তোমরা ঘরে ফিরে বিশ্রাম নাও। দেখা যাক স্যর ফিরে এসে কী বলেন?’

বেলা দুটো বাজে। চড়া রোদ বাইরে। সবাই এগল ঘরে ঢোকার জন্য। আর স্বাগতর মনে হল সে একবার মন্দিরটা ঘুরে আসবে, ঘরে ঢোকার আগে। তাই সে রওনা হল তোরণের দিকে। এর আগে স্বাগত যতবার মন্দিরে ঢুকেছে তার সঙ্গে অন্যরা থাকত। সূর্যের আলো থাকলেও তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে পা রাখতেই কেমন যেন একটা ছমছমে পরিবেশ অনুভব করল স্বাগত। চত্বরের নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকেই! বাইরের চত্বর তারপর ঘরগুলো অতিক্রম করে স্বাগত পৌঁছে গেল ভিতরের প্রাঙ্গণে। আর তখন সে দেখতে পেল একজনকে! বিরাট একটা বাঁদরি। লোকটা যেখানে পড়েছিল ঠিক সেখানে বসে মাটিতে পড়ে থাকা রক্ত সে দেখছে! স্বাগত সে দিকে এগতেই সে ধীরে ধীরে অন্য দিকে এগিয়ে এক লাফে চড়ে বসল একটা কার্নিশে। বাঁদরিটাকে দেখে স্বাগতর মনে হল সম্ভবত তাকেই সে কিছুদিন আগে সেই রাতে মন্দির তোরণে দেখেছিল। সম্ভবত বাঁদরিটা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। এরপর তার মনে হল, এমনও তো হতে পারে যে ওই বাঁদরিটাই মজুরটাকে হঠাৎ পিছন থেকে ধাক্কা মেরেছিল? এ কথাটা জানাতে হবে প্রফেসরকে। স্বাগত গিয়ে দাঁড়াল লোকটার রক্ত যেখানে পড়ে আছে সেখানে। সে ওপর দিকে তাকাল। লোকটা যে কার্নিশে দাঁড়িয়ে কাজ করছিল সেটা মোটামুটি চওড়া। সেখান থেকে পড়ে যাওয়ার কথা নয়। কার্নিশটার পিছনেই একটা অলিন্দ আছে। বেশ কয়েকটা থাম আছে যেখানে। তবে নীচ থেকে তাকিয়ে ওই অলিন্দে কী আছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে বেশ কিছুক্ষণ মন্দিরটা দেখল স্বাগত। তারপর পিছু ফিরল বাইরে যাওয়ার জন্য। সে খেয়াল করল বাঁদরিটা এখনও কার্নিশে বসে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল স্বাগত। তার মনে পড়ল বিকালে তার গল্প শুনতে যাওয়ার কথা। ওই খামের যুবতী আজ কী শোনাবে তা নিয়ে আকর্ষণ তৈরি হয়েছে স্বাগতর মনে। তার কথা ভাবতে লাগল স্বাগত। ঘুম এল না তার। বিকাল হতেই রোদের তাপ একটু কমতেই বাইরে বেরিয়ে এল সে। প্রফেসরের ফেরার জন্য স্বাগত অপেক্ষা করতে লাগল। সময় এগিয়ে চলল, সূর্যের তেজ কমে আসতে লাগল। একসময় বিকাল পাঁচটা বাজল। স্বাগতর মনে হতে লাগল, সেই যুবতী হয়তো সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে গল্প শোনাবার জন্য। সেখানে যাওয়ার জন্য স্বাগতর মন উদগ্রীব হয়ে উঠলেও প্রফেসর না ফেরা পর্যন্ত তার সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। একসময় অন্যরাও একে একে চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে এল। স্বাগতর সঙ্গে তাদের টুকটাক কথাবার্তা হলেও তার মন পড়ে রইল অন্যদিকে। সূর্য আরও ঢলতে শুরু করল। স্বাগত একসময় বুঝতে পারল খামের যুবতীর সঙ্গে আজ আর তার সাক্ষাৎ করতে যাওয়া হবে না। প্রফেসর রামমূর্তি যখন ফিরে এলেন তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। গাড়ি থেকে নেমে তিনি চত্বরে উঠে আসতেই সকলে ঘিরে দাঁড়াল তাঁকে কথা শোনার জন্য। রামমূর্তির মুখ গম্ভীর, বেশ ক্লান্তও দেখাচ্ছে তাঁকে। তিনি বললেন, ‘লোকটাকে সিয়েমরিপে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে এলাম। মাথায় অনেককটা সেলাই পড়েছে। পাঁজরের দুটো হাড়ও ভেঙেছে। তবে ডাক্তার বলল, ‘লোকটা বেঁচে যাবে। জ্ঞানও ফিরছে ওর।’

সুরভী কথাটা শুনে বলল, ‘এটা একটা ভালো খবর।’

নাতাশা জানতে চাইল, ‘আর কিছু বলল লোকটা?’

সে কথার জবাব না দিয়ে রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘আর একটা খারাপ খবরও আছে। মজুরের দল আমাকে আর হেরুমকে জানিয়ে দিল তারা আর এ মন্দিরে কাজ করবে না। ঘটনাতে ভয় পেয়েছে তারা।’

স্বাগত তাঁকে বলল, ‘আপনি চলে যাওয়ার পর আমি একলা মন্দিরে ঢুকে ওই দুর্ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি একটা বড় বাঁদরি বসে আছে। ও মনে হয় এই মন্দিরেই থাকে। এমনও হতে পারে যে ও-ই পিছন থেকে ধাক্কা মেরে লোকটাকে ফেলে দিয়েছে।’

কথাটা শুনে রামমূর্তি চুপ করে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, তা হতে পারে। বাঁদরগুলো মন্দিরে আমাদের উপস্থিতি পছন্দ করছে না।’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘মজুররা না এলেও আমাদের কাজ থামানো যাবে না। বাইরের জঙ্গল তো মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে। প্রয়োজন ভিতরটা আমরাই পরিষ্কার করব। কাল মূল মন্দিরের ভিতরে ঢুকব আমরা।’—এ কথা বলে তিনি নিজের ঘরের দিকে এগলেন।

পরদিন সকালে নির্দিষ্ট সময় ঘর ছেড়ে স্বাগত বাইরে বেরিয়ে এল। আজ তারা মূল মন্দিরে প্রবেশ করবে। স্বাগত বেরবার পরই সম্ভবত তাকে দেখেই তার অন্য সঙ্গীরাও একে একে বাইরে বেরিয়ে এল। প্রীতম, স্বাগতর কাছে এসে একটু চাপা স্বরে জানতে চাইল, ‘কাল রাতে কি কিছু ঘটেছিল? তুমি আর প্রফেসর মাঝরাতে মন্দিরে ঢুকেছিলে কেন?’

স্বাগত তার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, ‘কই আমি তো মন্দিরে ঢুকিনি।’

স্বাগতর জবাব শুনে প্রীতম মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘কিন্তু আমি যে দেখলাম বলে মনে হল!’

স্বাগত জিজ্ঞেস করল, “কী দেখলে?”

প্রীতম ইতস্তত করে বলল, ‘মাঝরাতে আমার হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমি বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। আমার ঘরটার জানলা থেকে প্রফেসরের ঘরটা দেখা যায়। আমি দেখলাম প্রফেসর বাইরে বেরিয়ে এলেন। হাতে একটা টর্চও ছিল। যেটা চাঁদের আলোতে চিকচিক করছিল। উনি ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা মন্দিরের ভিতর ঢুকে গেলেন। তারপরই তোমার ঘরের দিক থেকে একটা লোক এগল মন্দিরের দিকে। তোমারই মতো আকৃতি। আমার জানলার দিকে পিঠ ছিল বলে আমি অবশ্য মুখ দেখতে পারিনি। সেও তো দেখলাম মন্দিরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। আমি এরপর বেশ কিছুক্ষণ জেগে ছিলাম। কিন্তু কাউকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম না। তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।’

প্রীতমের কথা শুনে স্বাগত বেশ অবাক হয়ে গেল। সে বলল, ‘আমি ব্যাপারটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব প্রফেসরকে।’

প্রীতম এবার একটু সংকুচিতভাবে বলল, ‘না, থাক। তোমাকেই বললাম কথাটা। স্যরকে আর জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।’

স্বাগত বলল, ‘কেন?’

প্রীতম একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘নমপেন এয়ারপোর্টে ডিউটি ফ্রি শপ’ থেকে আমি দুটো হুইস্কির বোতল কিনেছিলাম। কাল রাতে শোবার আগে আমি কিছুটা পান করেছিলাম। এমনও হতে পারে যে আমি নেশার ঘোরে বা ঘুম চোখে ভুল দেখেছি। আমার দেখাটা সত্যি না হলে প্রফেসর কথাটা শুনে বিরক্ত হতে পারেন।’

ঠিক এইসময় জঙ্গলের পথ থেকে হেরুম চত্বরে উঠে এল আর প্রফেসর তাঁর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। স্বাগতরাও কথা থামিয়ে এগল। চত্বরের ঠিক মাঝখানে সবাই একসঙ্গে মিলিত হল। রামমূর্তি হেরুমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওদিকের কী খবর?’

হেরুম বলল, ‘লোকটা ভালো আছে। কিন্তু অন্য লোকদের কিছুতেই রাজি করাতে পারলাম না এখানে কাজ করার জন্য। তবে আমি কাজ করব আপনারা সঙ্গে থাকলে। মন্দিরের ভিতর একলা কাজে ঢুকব না।’

রামমূর্তি স্যর তার কথা শুনে বললেন, ‘তোমাকে একলা কাজ করতে হবে না। আমরা সবাই একসঙ্গেই কাজ করব। চল এবার মন্দিরের ভিতরে যাওয়া যাক।’

সবাই এরপর এগল মন্দির তোরণের দিকে। তোরণ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় হেরুম তার কোমরে ঝুলতে থাকা ধারাল দা-এর মতো অস্ত্রটা খুলে হাতে নিল। তা দেখে স্বাগত অনুমান করল, হেরুম কাজে যোগ দিতে এলেও তার আহত সহকর্মীর কথা তার মনেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

চত্বর আর ঘরগুলোকে অতিক্রম করে তারা পৌঁছে গেল ভিতরের প্রাঙ্গণের মূল মন্দিরের সামনে। তার ভিতরে প্রবেশ করার সময় রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘সবাই একসঙ্গে থাকবে। কেউ দল ছাড়া হবে না। এই প্রাচীন মন্দিরের ভিতর কোনও বিপদ লুকিয়ে আছে কি না তা আমরা জানি না। তাই সাবধানে একসঙ্গে চলাফেরা করতে হবে।’

এ কথা বলার পর তিনি নাতাশাকে ভূতের ভয় থেকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, ‘না, আমি ভূত-প্রেত এসব বিপদের কথা বলছি না। তবে সাপ-বিছে এ ধরনের প্রাণী থাকা আশ্চর্যর কিছু নয়। তাছাড়া ছাদ বা দেওয়াল থেকে পাথরের চাঙড় খসে পড়তে পারে। আমি এসব বিপদের কথা বলছি। ঠিক যেমন প্রথম দিন পিছনের কক্ষগুলোতে প্রবেশ করার সময়ও আমি তোমাদের সতর্ক করেছিলাম।’

বাইরে থেকে মন্দিরের অলিন্দতে প্রথম পা ফেললেন প্রফেসর রামমূর্তি। তাঁর সঙ্গে অস্ত্র হাতে মজুর সর্দার হেরুম। তারপর অন্যরা। টানা বারান্দা চলে গেছে সামনের দিকে তার এক পাশে কপাটহীন শূন্য কক্ষ। বারান্দা বা অলিন্দের ছাদগুলোকে ধরে রেখেছে পাথুরে থাম। প্রাচীন স্থাপত্যের মধ্যে দীর্ঘদিন মানুষ প্রবেশ না করলে যেমন ধুলোবালি ছড়িয়ে থাকে ঠিক তেমনই ধুলোবালি অলিন্দ বা ঘরগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু একটা জিনিস তারা খেয়াল করে দেখল যে মন্দিরের ভিতরটা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। স্তম্ভগুলোর গায়ে বসানো মূর্তিগুলো মোটামুটি অক্ষতই আছে। হয়তো বা বহু যুগ ধরে লতা-গুল্মর আবরণ মন্দিরের বাইরেটা আবৃত করে রাখায় মন্দিরের ভিতরের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। স্তম্ভর গায়ে যে মূর্তিগুলো রচনা করা আছে তা সবই অস্ত্রধারী রক্ষী বা গার্ডদের মূর্তি।

এত রক্ষীর আধিক্য দেখে সুরভী বলল, ‘এ মন্দিরটা রক্ষী নিবাস হিসাবে রূপান্তরিত করা হয়নি তো?’

রামমূর্তি বললেন, ‘ভিতরে ঢুকে দেখি কী পাওয়া যায়?’