Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৬

পর্ব ২৬

খামের যুবতীর কথা শুনতে শুনতে নিজের দেহে শীতলতা অনুভব করল স্বাগত। গাছের পাতাগুলো নড়ছে। মৃদু বাতাসও বইতে শুরু করেছে। খামের যুবতী বলে চলল, ‘লোকটা অজগরের মুণ্ডুচ্ছেদ করলেও আতঙ্কে কিছুক্ষণের জন্য সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল সেই নারী। তার যখন জ্ঞান ফিরল ততক্ষণে তাকে নাগপাশ থেকে মুক্ত করে ফেলেছে যুবক। চোখ মেলতেই সে নারী দেখতে পেল তার রক্ষাকর্তা যুবককে। ধীরে ধীরে উঠে বসল সেই নারী। যুবক তার কোমরে বাঁধা চামড়ার পাত্র থেকে নর্তকীর মুখে জল দিল। তা পান করে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হল সে। যুবক হাত বাড়িয়ে দিল চাম যুবতীর দিকে। সেই হাত অবলম্বন করে উঠে দাঁড়াল চম্পা। তখনও সে মৃদু মৃদু কাঁপছে। সে সেই অপরিচিত যুবককে বলল, ‘আপনি কে? এই মন্দিরের প্রহরী? সৈনিক?’

যুবক হেসে বলল, সঙ্গে তলোয়ার থাকলেও আমি প্রহরী বা সৈনিক নই। তলোয়ার আমার আত্মরক্ষা করার জন্য। আমি অন্য দেশের লোক।’

চম্পা হাতজোড় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, ‘আপনার ওই তলোয়ারই আজ আমার প্রাণ রক্ষা করল। কোন দেশের লোক আপনি?’

যুবক জবাব দিল, ‘জম্বুদীপের লোক। নাম, বহ্নি, আমি একজন বাস্তুকার ও ভাস্কর। মন্দির সংস্কার ও নির্মাণের কাজে আমি এদেশে এসেছি।’

জম্বুদ্বীপ অতি প্রাচীনকাল থেকেই মন্দির নির্মাণের জন্য বিখ্যাত ছিল। সে সময় মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন জম্বুদীপ থেকে বেশকিছু বাস্তুকারকে এ দেশে নিয়ে এসে চামদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলোর সংস্কার ও নতুন রাজধানী নির্মাণের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন….।’

খামের যুবতীর এ কথাগুলো শুনে স্বাগত বলে উঠল, ‘জম্বুদ্বীপ মানে তো আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। বহ্নি নামের ওই যুবক যে কাজে এসেছিল আমরাও তো হাজার বছর পর একই কাজ করতে এসেছি। কী অদ্ভুত মিল! হ্যাঁ, আমাদের দেশের প্রাচীন শিল্পীরা, মন্দির ভাস্কর্য নির্মাণে দক্ষ ছিল।’

খামের যুবতী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, জানি।’

বেশ বাতাস দিচ্ছে। আরাম অনুভূত হচ্ছে স্বাগতর শরীরে। যুবতী এরপর তাকে নিজের পরিচয় দান করে বলল, ‘আমার নাম চম্পা। বিষ্ণুলোকের নর্তকী আমি। চাম সৈন্যরা তাদের সঙ্গে আমাকে আনলেও পরে ফেলে পালায়। খামের সেনারা আমাকে বন্দি করে, তারপর মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের দয়ায় মুক্তি পাই। তিনিই আমাকে মন্দিরে আশ্রয় দেন।’

বহ্নি নামের স্থপতি-ভাস্কর বলল, ‘এই যে মন্দির দেখছ, এর সংস্কারের দায়িত্ব মহারাজ আমাকে অর্পণ করেছেন। কাজ শুরুর আগে মন্দির পরিদর্শনে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি একাকী নারী এই নির্জন স্থানে কেন এসেছিলে? মন্দির প্রাসাদ তো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। চামেরা বিগ্রহ ধ্বংস করেছে।’

বহ্নি নামের সেই জম্বুদ্বীপ দেশীয় যুবকের প্রশ্নের জবাবে চম্পা বলল, ‘এ পথে যাচ্ছিলাম, পুষ্পগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ হল। তা চয়নের জন্য এ স্থানে উপস্থিত হয়েছিলাম।’

হাজার প্রদীপ থালায় সেজে উঠেছে বিকালোকের গর্ভগৃহ প্রান। পুরোহিতরা প্রস্তুত সন্ধ্যারতি শুরু করার জন্য। ইতিমধ্যেই কিছু অভিজাত মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছেন সন্ধ্যারতির দর্শনের জন।। একসময়। সভাসদদের নিয়ে উপস্থিত হলেন ধরণী।

বিষ্ণুলোকের মাথায় সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। এবার চম্পাকে ফিরতে হবে। সে যুবকের উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন একবার আমার জীবন ভিক্ষা দিলেন, তারপর আজ আপনি আবার আমার জীবন দান করলেন। এ দানের কোনও প্রতিদান হয় না। কিন্তু আপনাকে যে সামান্য কোনও উপহার দেব সে সামর্থও আমার নেই।’

বহ্নি কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল তার দিকে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার। এরপর সে চম্পাকে বলল,’ইচ্ছা করলেই তুমি কিন্তু আমাকে উপহার দিতে পার।’

চম্পা মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘কী উপহার? আমার ওই পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া তো আমার কাছে কিছু নেই।’

বহ্নি হেসে বলল, ‘আমি তোমার নৃত্য দেখতে চাই। সেটাই হবে আমার প্রতি তোমার উপহার।’

শেষ বিকালের রাঙা আলোতে চম্পার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সুঠাম যুবক। চম্পার উত্তরের প্রতীক্ষায় সে চেয়ে আছে তার দিকে। যুবকের ঠোঁটের কোণে আবছা হাসির রেশ।

চম্পা বলল, ‘অবশ্যই আপনাকে আমার নৃত্য দেখাব আমি। আগামী কাল সন্ধ্যারতির সময় মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন মন্দিরে আসবেন। প্রধান পুরোহিত জানিয়েছেন আমাকে কাল নৃত্য প্রদর্শন করতে হবে। যদিও মহারাজ মন্দিরে এলে সাধারণ মানুষদের যে সময় মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। না, কিন্তু আপনি অভিজাত মানুষ। এ দেশে রাজ অতিথি। আপনার সে স্থলে প্রবেশের অসুবিধা হবে না।’

বহ্নি বলল, ‘আমি সে স্থানে নির্দিষ্ট সময় পৌঁছে যাব।’ সেই যুবকের থেকে বিদায় নিয়ে চম্পা সেই মন্দির প্রাসাদের প্রাঙ্গণ ছেড়ে রওনা হল বিষ্ণুলোকের দিকে।

শীতল ভাবটা এবার একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে স্বাগতর। বাতাসে মৃদু মৃদু কাঁপছে কথক খামের যুবতীর উত্তরীয়। একটু থেমে যে আবার বলতে শুরু করল, —’নিজের কক্ষে ফিরে এল চম্পা। বারবার তার কেবল মনে পড়তে লাগল তার প্রাণ রক্ষাকারী যুবক ‘বহ্নির কথা। সে রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সেই যুবকের হাত ধরে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে কখনও পুষ্প সুরভিত কাননে। কখনও বা নদীর পাড়ে। তাদের চারপাশে কত ফুল-প্রজাপতি-পাখির কূজন। ভোরবেলা যখন তার ঘুম ভাঙল তখনও সেই সুন্দর স্বপ্নর রেশ কাটল না। সকল কাজের মধ্যে সারাদিন তার মনে পড়তে লাগল সেই যুবকের কথা। এভাবেই দিন কেটে গেল একসময়। বিকাল হল, চম্পা প্রস্তুত হতে শুরু করল বিষ্ণুলোকে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য। অন্য দিনের চেয়ে এদিন সে যেন তার অঙ্গসজ্জায় খানিক বেশি মনোনিবেশ করল। তার সংগ্রহে থাকা সবচাইতে সুন্দর পট্টবস্ত্র অঙ্গে পরিধান করল। নিপুণভাবে ফুলমালায় সাজাল তার কবরী। ললাটে কুমকুম রচনা করার সময় মৃদু আশঙ্কাও তৈরি হল চম্পার মনে। যুবক কি সত্যিই তার নৃত্য দর্শন করতে আসবে? নাকি সে নিছক মজার ছলে কথাটা বলেছে? একসময় মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শোনা গেল। সন্ধ্যারতির আহ্বান জানায় ওই ঘণ্টাধ্বনি। চম্পা প্রবেশ করল মন্দিরে।

হাজার প্রদীপ থালায় সেজে উঠেছে বিষ্ণুলোকের গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ। পুরোহিতরা প্রস্তুত সন্ধ্যারতি শুরু করার জন্য। ইতিমধ্যেই কিছু অভিজাত মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছেন সন্ধ্যারতি দর্শনের জন্য। একসময় সভাসদদের নিয়ে উপস্থিত হলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। গর্ভগৃহ সংলগ্ন যে কক্ষে নর্তকীরা নৃত্য শুরু করার জন্য প্রতীক্ষা করে সে কক্ষ থেকে চম্পার চোখ খুঁজতে লাগল যুবক বহ্নিকে। কিন্তু সে তাকে দেখতে পেল না। সন্ধ্যারতি শুরু হল একসময়। তা শেষও হল। একসময় চম্পার ডাক এল নৃত্য প্রদর্শনের জন্য। কক্ষ ত্যাগ করে প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এল সে। বিগ্রহ ও মহারাজকে প্রণাম জানিয়ে নৃত্য শুরু করার আগে শেষ একবার বহির উপস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল চম্পা। অতিথি অভ্যাগতদের ভিড়ের মধ্যে সে তাকে দেখতে না পেলেও ভাবল হয়তো সে উপস্থিত আছে কোথাও। এরপর তার নৃত্য পরিবেশন শুরু করল। অপূর্ব সেই নৃত্য। দেবতা নয়, মহারাজ নয়, অন্য কোনও একজনকে তৃপ্ত করার জন্যই যেন সে নাচছে। অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল স্বয়ং মহারাজ সহ তাঁর সভাসদ, পার্শ্বচরেরা। চম্পার নাচ যখন শেষ হল মহারাজ বললেন, ‘এ নর্তকীর নৃত্য স্বর্গের অপ্সরাদেরও ঈর্ষা জাগাবে!’

মহারাজ এরপর সে স্থান ত্যাগ করে রওনা হলেন তাঁর প্রাসাদে ফেরার জন্য। তিনি চলে যেতেই মন্দিরের নিরাপত্তা, বলয় শিথিল হল। আর চম্পা গিয়ে দাঁড়াল এক স্তম্ভর আড়ালে। যার নিকটে তোরণদ্বার দিয়ে মন্দির ত্যাগ করবে সন্ধ্যারতি ও নৃত্য দেখতে আসা ব্যক্তিরা। একে একে মন্দির ত্যাগ করতে শুরু করল তারা। একসময় শেষ ব্যক্তিও তোরণ ত্যাগ করল, কিন্তু তাদের মধ্যে চম্পা খুঁজে পেল না সেই তরুণকে। বিষণ্ণভাবে সে স্থানেই দাঁড়িয়ে সে ভাবতে লাগল, যুবক কি পরিহাস করল তার সঙ্গে?

একসময় ঘড়ঘড় শব্দে গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ হওয়ার শব্দ কানে এল তার। চম্পা রওনা হল মন্দিরের বাইরে যাওয়ার জন্য। বাইরে এখন অন্ধকার নেমে গেছে। যদিও আকাশে চাঁদ উঠতে শুরু করেছে তবে তার আলো তখনও উজ্জ্বলতা লাভ করেনি। চম্পার কক্ষ প্রাকারের একদম শেষ প্রান্তে। অন্যদের থেকে বেশ খানিকটা তফাতে। সেদিকেই বিষণ্ণভাবে নতশিরে হাঁটছিল চম্পা। হঠাৎই একটা ছায়ামূর্তি তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। চম্পা চমকে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল তার দিকে। সেই আধো অন্ধকারের মধ্যেও তাকে চিনতে পারল চম্পা। এ যে সেই যুবক বহ্নি! যাকে দেখার প্রতীক্ষায়, যাকে নাচ দেখাবার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল সে। কয়েক মুহূর্ত দু’জনের দৃষ্টি বিনিময়ের পর চম্পা মৃদু অভিমানের স্বরে বলল, ‘আমার নৃত্য প্রদর্শন তো শেষ হয়ে গেছে। মন্দিরের দ্বারও বন্ধ হয়ে গেছে। আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার সামান্য সুযোগটুকু আপনি আমাকে দিলেন না।’

চম্পার কণ্ঠে অভিমানের সুর যেন বুঝতে পারল যুবক। সে বলল, ‘আমি সত্যি তোমার নাচ দেখতে আগ্রহী। সেই মতো এখানে আসব বলেও স্থির করেছিলাম। কিন্তু অপরাহ্ণে মহারাজের থেকে নির্দেশ এল তার নতুন রাজধানীর এক নির্মীয়মাণ মন্দির পরিদর্শন করে আসার জন্য। আমি যথাসম্ভব দ্রুত অশ্ব চালনার চেষ্টা করেছিলাম। তবুও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল ফিরে আসতে। তোমার নৃত্য প্রদর্শন দেখা আর হল না।’— এই শেষ বাক্যটা বলার সময় যুককের কণ্ঠে আক্ষেপ ফুটে উঠল।

চম্পা এবার ব্যাপারটা অনুধাবন করে বলল, ‘কিন্তু মহারাজ আবার কবে সন্ধ্যারতি দেখতে আসবেন, নৃত্য প্রদর্শনের জন্য আমার ডাক পড়বে তা তো আমার জানা নেই।’

বহ্নি বলল, ‘তুমি কি সত্যি আমাকে তোমার নৃত্য প্রদর্শনে আগ্রহী?’

চম্পা পাল্টা তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনিও কি সত্যি আমার নৃত্য দর্শনে আগ্রহী? তবে কীভাবে আপনি তা দর্শন করবেন বলুন?’

বহ্নি মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে বলল, ‘তোমার সঙ্গে যে স্থানে দেখা হয়েছিল সে স্থানে তুমি আগামী কাল উপস্থিত হতে পার। ওই মন্দির প্রাসাদে বিগ্রহ না থাকলেও নৃত্য মঞ্চ আছে। যে স্থানে নৃত্য পরিবেশন করত নর্তকীরা। আমি দেবতা বা মহারাজ নই, সাধারণ একজন ভিনদেশি বাস্তুকার শিল্পী। আমাকে একাকী নাচ দেখাতে তোমার আপত্তি না থাকলে তুমি সে স্থানে নৃত্য পরিবেশন করতে পার। আমি প্রাসাদ তোরণে তোমার জন্য প্রতীক্ষা করব।’

এই বলে নর্তকী চম্পার জবাবের প্রতীক্ষা না করে স্থান ত্যাগ করে হাঁটতে শুরু করল বাস্তুকার ভাস্কর বহ্নি। একসময় অন্ধকারের মধ্যে চম্পার চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল সে। চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ধরা দিতে শুরু করল পরিখার জলে।’ এ কথা বলে মুহূর্তর জন্য থামল খামের যুবতী। তারপর স্বাগতকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘যে মন্দির প্রাসাদে তাদের দু’জনের দেখা হয়েছিল, যেখানে যাওয়ার জন্য বহ্নি চম্পাকে আমন্ত্রণ জানাল তা এখনও আছে। সে স্থানেই তোমরা কাজ করছ।’

এ কথা শুনে স্বাগত তাকে বলল, ‘ওই মন্দির বা মন্দির প্রাসাদ সম্পর্কে তোমার সবকিছু জানা আছে তাই না?’

ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই চারপাশে অন্ধকার নেমে এল। গাছের ডালপালাগুলোও আন্দোলিত হতে শুরু করল। প্রবলভাবে। খামের যুবতী স্বাগতর প্রশ্নর জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ওই দেখ বিষ্ণুলোকের মাথা মেঘে ছেয়ে গেছে। দুর্যোগ শুরু হতে চলেছে। মন্দিরের বাইরে এবং ভিতরেও। তুমি এখনই ফেরার জন্য রওনা হও। নইলে বিপদ হবে। আমিও যাই।”

স্বাগতও এবার তাকিয়ে দেখতে পেল কালো মেঘে ছেয়ে গেছে বিষ্ণুলোকের মাথার আকাশ, নানাদিক থেকে আরও রাশি রাশি মেঘ ছুটে চলেছে সেদিকে। সূর্যাস্ত নয়। ওই মেঘের কারণেই অন্ধকার নেমে আসছে প্রাচীন মন্দির নগরীতে।

খামের যুবতী আবার তাকে তাড়া দিয়ে বলল, ‘যাও, যাও, চলে যাও। নইলে ফিরতে পারবে না। এ জায়গা ভালো নয়।’

অগত্যা স্বাগত ফেরার জন্য রওনা হল। প্রচণ্ড বাতাস। গাছগুলো পাগলের মতো আন্দোলিত হতে শুরু করেছে। এ জঙ্গলের এমন রূপ দেখেনি স্বাগত। অতি দ্রুত সে এগল। তাদের মন্দির প্রাসাদের দিকে। যখন সে তোরণ চত্বরে উঠে এল তখন প্রফেসর রামমূর্তি ছাড়া অন্য চারজন সেখানে দাঁড়িয়ে। বিক্রম বলল, ‘ভাবছিলাম তুমি ঝড়ের মধ্যে আটকে পড়লে নাকি? রামমূর্তি স্যরও কোথায় যেন বেরিয়েছেন।’

স্বাগত জবাব দিল, ‘আর একটু হলেই হয়তো আটকে যেতাম। সত্যিই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়েছে জঙ্গলে। এরপর আর স্বাগতর কোনও কথা হল না। জঙ্গলের দিক থেকে ধেয়ে আসা প্রবল বাতাসে ধুলোর ঝড় উঠতে শুরু হল চত্বরে। তার হাত থেকে বাঁচার জন্য সবাই যে যার ঘরের দিকে ছুটল। আর এরপরই বৃষ্টি নামল হাজার বছরের প্রাচীন মন্দির নগরীতে। এত প্রবল বৃষ্টি যে জানলা বন্ধ করে দিতে হল স্বাগতকে। বাতাসের ঝাপটায় জল ঢুকছে ঘরে। ঘরে বসে স্বাগত শুনতে লাগল বাতাসের শনশন শব্দ আর তুমুল বর্ষণ ধ্বনি। অরণ্যের বনানীগুলো আজ যেন খেপে উঠেছে। মাঝে মাঝে সড়সড় করে ডাল ভাঙার শব্দ ও কানে এল স্বাগতর। সময় এগিয়ে চলল, স্বাগত ভাবতে লাগল সেই খামের যুবতীর কথা। সত্যি কি সে এই মন্দির প্রাসাদ সম্পর্কে সবকিছু জানে? নাকি সে মনগড়া কাহিনি শুনিয়ে চলেছে স্বাগতকে? কিন্তু কেনই বা সে এসে উপস্থিত হয় স্বাগতকে তার প্রাচীন কাহিনি শোনাতে? কীই বা উদ্দেশ্য আছে তার পিছনে? খামের যুবতী এখনও তার নাম পরিচয় স্বাগতর কাছে স্পষ্ট ব্যক্ত করেনি। কী রহস্য লুকিয়ে আছে তার এই গোপনীয়তার পিছনে? এ মন্দিরে কি সত্যি কোনও গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে? নইলে নানান অদ্ভুত ব্যাপার দৃশ্যর অবতারণা ঘটছে কেন? এ সব নানান কথা স্বাগত বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগল।

ঘণ্টাখানেক পর স্বাগতর মোবাইলে প্রফেসর রামমূর্তির ফোন এল। কলটা রিসিভ করেই স্বাগত জানতে চাইল, “আপনি ফিরেছেন স্যার?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, একটু হাটতে গিয়েছিলাম। ঝড়-বৃষ্টি যখন শুরু হল তখন কাছেই একটা পুরানো ঘরের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি যখন কমছে না দেখলাম তখন বাধ্য হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ফিরে এলাম।’

এ কথা বলার পর তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমিও তো বাইরে গিয়েছিলে, মন্দিরের আশপাশে কাউকে ঘুরতে দেখলে কি?’

স্বাগত বলল, ‘না, কাউকে দেখিনি। কিন্তু কেন বলুন তো?’

প্রফেসর বললেন, ‘আমাদের একটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাই জিজ্ঞেস করলাম।’

স্বাগতর কথার জবাব দেওয়ার পর তিনি বললেন, ঝড়-বৃষ্টি কখন থামবে তা বোঝা যাচ্ছে না। চত্বরে তো আজ আর রান্না করা সম্ভব নয়। তাই যে যার ঘরে রাখা শুকনো খাবার খেয়েই শুয়ে পড়তে হবে। আর এই দুর্যোগের রাতে কেউ যেন ঘর ছেড়ে বাইরে না বেরয়। কথাগুলো অন্যদের বলে দাও। এ কথা বলবার জন্যই তোমাকে ফোন করলাম।’

প্রফেসর এরপর ফোন ছেড়ে দিলেন। স্বাগত তাঁর নির্দেশ মতো তার কথাগুলো প্রীতম আর সুরভীর মোবাইল ফোনে জানিয়ে দিল।

বেড়ে চলল রাত, বাইরে দুর্যোগের যেন বিরাম নেই। স্বাগত ভেবে চলল নানাকথা। রাত নটা নাগাদ ঝড়ের শব্দ কমল ঠিকই, কিন্তু ঝমঝম শব্দে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েই চলল। তবে বাইরে ঝড় বৃষ্টি হওয়াতে ঘরের পরিবেশ বেশ শীতলআরামপ্রদ হয়ে উঠেছে। জল-বিস্কুট খেয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে স্বাগত শুয়ে পড়ল। ঘুম নেমে এল তার চোখে।

একসময় একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল স্বাগত। নির্জন মন্দির তোরণে গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে আছে সে। দূরে দেখা যাচ্ছে বিষ্ণুলোক। গোধূলির আলো যেন তার শৃঙ্গগুলোতে আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। স্বাগত প্রতীক্ষা করছে একজনের আসার জন্য। একসময় জঙ্গলের ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করে তোরণের সামনে স্বাগতর কাছে এসে দাঁড়াল। সে সেই খামের যুবতী যে স্বাগতকে গল্প শোনায়। তবে তার পরনে এ সময় নর্তকীদের মতো পোশাক। মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা। কণ্ঠে, বাহুতে ফুলমালা, কুমকুম রঞ্জিত, চন্দন চর্চিত মুখমণ্ডল, মসী আঁকা চোখ। রমণী স্বাগতর দিকে তাকিয়ে হাসল। স্বাগত তাকে বলল, ‘আমি তোমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলাম। আমি জানতাম তুমি আসবে। খামের যুবতী বলল, ‘তোমার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে কি আমি পারি? তুমি আমার রক্ষাকর্তা। আজ আমি শুধু তোমার জন্যই নাচব।’

স্বাগত বলল, ‘চল তবে মন্দির প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করা যাক? মন্দিরের নৃত্যমঞ্চ অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য। বহুদিন হয়ে গেল সেই নৃত্য মঞ্চে কোনও নর্তকীর পদচিহ্ন পড়েনি।’

খামের যুবতী বলল, ‘হ্যাঁ, যাওয়া যাক। ওই স্থানেই নৃত্য প্রদর্শন করব আমি।’