বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৭
পর্ব ২৭
“স্বাগরা দু’জন এরপর তোরণ অতিক্রম করে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একটা প্রচণ্ড আর্তনাদের শব্দ ভেসে এল মন্দিরের ভিতর থেকে। ও কার আর্তনাদ? থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখে স্বাগতর ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু বাইরের বর্ষণসিক্ত অন্ধকার ভেদ করে আবারও সেই ভয়ঙ্কর আর্তনাদ বাইরে কোথা থেকে যেন ভেসে এল স্বাগতর ঘরে। ওই চিৎকারের শব্দটা তবে নিছক স্বপ্ন নয়? স্বাগত বিছানাতে উঠে বসল। ঠিক সেই সময় স্বাগতর মোবাইল বেজে উঠল। প্রীতমের ফোন। উত্তেজিত ভাবে সে বলল, ‘বাইরে কী ঘটেছে? বেশ কয়েকবার কোনও পুরুষ কণ্ঠের আতঙ্কিত চিৎকার শুনলাম। মনে হচ্ছে চিৎকারটা মন্দির তোরণের ভিতর থেকে আসছে।’
স্বাগত বলল, ‘আমিও চিৎকারটা শুনলাম। কী হয়েছে জানি না। তুমি বিক্রমকে নিয়ে বাইরে বেরও। আমি বেরচ্ছি।’
খাট ছেড়ে নেমে পড়ল স্বাগত। আর সময় নষ্ট না করে টর্চ আর একটা লাঠি নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল সে। বৃষ্টির তেজ একটু কমলেও এখনও তা হয়ে চলেছে। তার বাইরে বেরবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টর্চ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল প্রীতম আর বিক্রম। সুরভীও দরজা ফাঁক করে বাইরে উঁকি মারল। প্রীতমরা আর স্বাগত পরস্পরের কাছে এসে দাঁড়াল। বিক্রম আর প্রীতম তাদের টর্চের জোরালো আলো ফেলল মন্দির তোরণের গায়ে। তারা সেখানে কাউকে দেখতে পেল না ঠিকই কিন্তু এর পরমুহূর্তে আবারও একটা প্রচণ্ড আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেল তারা। আর সেটা ভেসে এল মন্দিরের ভিতর থেকেই। প্রীতম বলল, ‘চল আগে প্রফেসরকে ডাকি।’ কিন্তু তাঁকে ডাকতে হল না। দরজা খুলে নিজেই বেরিয়ে এলেন প্রফেসর রামমূর্তি। তাঁরও হাতে টর্চ। স্বাগতরা এগিয়ে গিয়ে তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল। নাতাশা আর সুরভীও ইতিমধ্যে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। প্রীতম রামমূর্তি স্যরকে বলল, ‘অমন ভয়ঙ্কর আর্তনাদ কে করছে স্যর?’
রামমূর্তি বললেন, ‘জানি না। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওই চিৎকার শুনেই বাইরে বেরলাম।’
বিক্রম বলল, ‘চলুন স্যর। একবার ভিতরে ঢুকে ব্যাপারটা দেখার চেষ্টা করি।’
নাতাশা প্রস্তাবটা শুনে ইতস্তত করে বলল, ‘এত রাতে মন্দিরের ভিতরে ঢোকা কি ঠিক হবে?’
রামমূর্তি স্যরও যেন একটু থমকে ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন, ভিতরে ঢোকা ঠিক হবে কি না।
কিন্তু বিক্রম বলল, ‘এমনও হতে পারে কেউ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে বিপদে পড়েছে। আমরা এতজন লোক। ভিতরে গেলে কী আর হবে?’
রামমূর্তি সার তাকালেন স্বাগতর দিকে। সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও মনে হয় অন্তত মন্দিরে তোরণের ভিতরে একবার আমাদের ঢোকা উচিত।’
স্বাগতর পরামর্শ শুনে রামমূর্তি স্যর নাতাশা আর সুরভীকে বললেন, ‘তোমরা ঘরেই থাক, প্রয়োজনে তোমাদের ডেকে নেব। এরপর বৃষ্টি মাথায় নিয়েই তারা এগল মন্দির তোরণের দিকে। স্বাগতরা তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করল। তাদের টর্চের আলো ছুঁয়ে যেতে লাগল দু-পাশের অলিন্দের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টিস্নাত মূর্তি স্তম্ভগুলোকে। আর এরপরই মুহূর্তর জন্য একটা গোঙানির শব্দ কানে এল তাদের। সেই শব্দ অনুসরণ করে স্বাগত টর্চের আলো ফেলল সেখানে। তারা দেখতে পেল চত্বরের শেষপ্রান্তে যে কক্ষগুলোর ভিতর দিয়ে মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে হয় সেখানে পড়ে আছে একজন লোক। সঙ্গে সঙ্গে তারা চারজন ছুটল সেদিকে। একসঙ্গে তিনটে টর্চের আলো পড়ল লোকটার দেহর উপর। বিভৎস এক দৃশ্য! মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার মাথা-মুখ একেবারে থেঁতলে গেছে। রক্তের স্রোত মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির জলের সঙ্গে। স্বাগতরা চিনতে পারল লোকটাকে —— গাইড ফঙ। স্বাগত তার উপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার এ অবস্থা কী করে হল ফঙ? কী হয়েছিল?’ বার কয়েক স্বাগত তাকে জিজ্ঞেস করার পর কথাটা ফঙের কানে গেল। সে কোনওক্রমে বলল, ‘কুমির! কুমির।” এই বলেই সে থেমে গেল। হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল তার বুকটা। জোরে জোরে সে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। প্রীতম বলল, ‘এ লোকটাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। স্যর আপনি গাড়ি ডাকার ব্যবস্থা করুন।”
রামমূর্তি বললেন, ‘তোমরা ওকে ঘরের ভিতর উঠিয়ে নিয়ে যাও। আমি আমার ফোনটা নিয়ে আসছি।’
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ফঙের শরীরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শেষ একটা হৃদয় বিদারক আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার কণ্ঠ থেকে। তারপর ফঙের শরীরটা স্থির হয়ে গেল। স্বাগত তার একটা হাত ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘ফঙ? ফঙ? আমরা তোমাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাব।’
কিন্তু ফঙ কোনও জবাব দিল না। তার বুকের ওঠা-নামা থেমে গেছে! প্রফেসর এরপর ফঙের শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার বুকে হাত রাখলেন। হাতের নাড়ি ধরেও পরীক্ষা করলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘লোকটা আর বেঁচে নেই। সম্ভবত ও এই ঘরগুলোকে অতিক্রম করে মন্দিরের ভিতরে ঢুকেছিল। আর সেখানেই কোনও ঘটনা বা এই ঘটনা ঘটেছে। দেখে তো মনে হয় ভারী পাথর ধরনের কিছু আঘাত লেগেছে ওর মাথায়।’
প্রীতম বলল, ‘তাহলে, কুমিরের ব্যাপারটা মিথ্যা নয়। আমি ঠিকই দেখেছিলাম। আমরা তাকে খুঁজে না পেলেও প্রাণীটা মন্দিরের ভিতরেই কোথাও আছে বা এই মন্দিরে এসে ঢোকে।’
রামমূর্তি বললেন, ‘আমারও তো ফঙের কথাটা শুনে তাই মনে হচ্ছে।’
বিক্রম বলল, “তাহলে কি আমরা কুমিরটার খোঁজে এখন ভিতরের প্রাঙ্গণটায় যাব?”
রামমূর্তি বললেন, ‘না, সেটা রিস্ক হয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে কোনও হাতিয়ার নেই। তাছাড়া পাথর টাথর খসে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘এখন তবে আমাদের কী করণীয়?’
রামমূর্তি ঘড়ি দেখে বললেন, ‘এখন আড়াইটে বাজে। ভোরের আলো ফুটতে আরও ঘণ্টা দুই সময় লাগবে। আপাতত আমরা বাইরে বেরিয়ে পুলিসকে ফোন করে ঘটনাটা জানাই। আপাতত ওর দেহটা ওখানেই থাক। পুলিস এসে যা করার করবে।’
বিক্রম জানতে চাইল, ‘পুলিস এসে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমরা কী বলব?’
প্রফেসর একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘ফঙের বলা কথাটা, অর্থাৎ কুমিরের ব্যাপারটা নিয়ে পুলিসকে কিছু বলার দরকার নেই। ব্যাপারটা ওরা বিশ্বাস নাও করতে পারে। উল্টে কোনও কিছু গোপন করার জন্য আমরা ব্যাপারটা বানিয়ে বলছি ভেবে আমাদেরকে এই মৃত্যুর ব্যাপারে সন্দেহ করতে পারে। পুলিসকে আমরা শুধু এটুকুই বলব যে, আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। চিৎকার শুনে আমরা তোরণের ভিতরে ঢুকে দেখি ফঙ মৃত অবস্থায় এখানে পড়ে আছে। পুলিসের সঙ্গে যা কথা বলার সেটা আমিই বলার চেষ্টা করব। প্রয়োজন না হলে তোমরা কথা বল না। কারণ, এ দেশের পুলিসের আচরণ সম্পর্কে আমাদের জানা নেই।’
বিক্রম বলল, ‘হ্যাঁ, সেটাই ভালো, আপনিই যা বলার বলবেন পুলিসকে।’
রামমূর্তি মাটিতে পড়ে থাকা লাশটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এ লোকটাকে আমি পছন্দ করতাম না ঠিকই, কিন্তু ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক।’
প্রীতম বলল, ‘ফঙ এই দুর্যোগের রাতে মন্দিরে ঢুকলই বা কেন?’
রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘সম্ভবত ঝড়বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে আমাদের চোখ এড়িয়ে গুপ্তধন বা ওই জাতীয় কিছু আছে কি না তা খোঁজার জন্য।’
এ কথা বলে তিনি বললেন, ‘চল। এখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আর লাভ নেই। পুলিসকেও ফোন করতে হবে আর এখানকার আর্কিওলজিক্যাল বিভাগকেও ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে হবে।’
ফঙের মৃতদেহটাকে সে জায়গায় ফেলে রেখে স্বাগতরা এগল বাইরে বেরবার জন্য। তারা যখন তোরণ অতিক্রম করতে যাচ্ছে তখনই হঠাৎ পিছন থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ স্বাগতর কানে এসে লাগল।
স্বাগত পিছনে ফিরে তাকিয়ে চাপা স্বরে প্রফেসরের উদ্দেশে বলল, ‘ওই দেখুন সার!’
তার কথা শুনে রামমূর্তি সহ অন্যরা ফিরে তাকাল। তারা দেখতে পেল ফঙ-এর মৃতদেহটা যেখানে পড়ে আছে তার কিছুটা তফাতে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। এরপর সে এগিয়ে গিয়ে ফঙের মৃতদেহের সামনে বসে ঝুঁকে পড়ল তার ওপর। আর বিক্রম সঙ্গে সঙ্গে টর্চের জোরালো আলো ফেলল তার ওপর। সেই বিরাট বড় বাঁদরিটা! যে একলা ঘুরে বেড়ায় মন্দিরে। প্রাণীটা ফঙের মুখটা ঝুঁকে দেখছিল। আলো ফেলতেই সে মুখ তুলে তাকাল। টর্চের আলোতে মনে হয় তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে এরপর এক লাফে সেখান থেকে সরে গিয়ে কাছেই একটা স্তম্ভ বেয়ে ওপরে উঠে ছাদের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। বিক্রম মন্তব্য করল, ‘আলো জ্বালাবার আগে ওকে ঠিক মানুষের মতোই মনে হচ্ছিল।’
তোরণ অতিক্রম করে সকলে এরপর বাইরে বেরিয়ে এল। বৃষ্টি এখনও হয়েই চলেছে।
নাতাশা আর সুরভী তাদের ঘরের দরজা খুলে ব্যাপারটা কী হয়েছে তা জানার প্রতীক্ষা করছিল। স্বাগতরা বাইরে বেরিয়ে তাদের দিকেই এগল। রামমূর্তি এগলেন নিজের ঘরের দিকে। স্বাগতরা তিনজন সুরভীদের ঘরের কাছে যেতেই নাতাশা উত্তেজিতভাবে জানতে চাইল, ‘মন্দিরের ভিতরে কে চিৎকার করছিল? লোকটাকে পেয়েছ?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। সে গাইড ফঙ।’
সুরভী জানতে চাইল, ‘মন্দিরের ভিতর এত রাতে কী করতে ঢুকেছিল লোকটা? ও চিৎকার করছিল কেন?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘কী করতে যে ঢুকেছিল তা জানি না। তবে সে আর বেঁচে নেই।’
নাতাশা আঁতকে উঠে বলল, ‘বেঁচে নেই মানে?’
বিক্রম বলল, ‘মাথার ওপর পাথর খসে পড়ে মারা গেছে মনে হয়। মৃত্যুর আগে সে আর্তনাদ করছিল।’
কথাটা শুনে নাতাশা বলল, ‘নিশ্চয়ই পাথরটা ওকে ভূতে ছুড়ে মেরেছে। আমার মন প্রথম থেকেই বলছিল এ জায়গাটা ভালো নয়, ভূত-প্রেতের আড্ডা।’
এ কথা আতঙ্কিত স্বরে বলার পর সে বলল, ‘আমি আর এ জায়গায় একদিনও থাকব না। তাতে আমার চাকরি যায় তাও ভালো। আমি প্রফেসরকে বলব, কালই আমাকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে।’
স্বাগত এ ব্যাপার নিয়ে আর নাতাশার সঙ্গে তর্কে গেল না। সে বলল, ‘এখন তোমরা শুয়ে পড়, কাল সকালে যা হওয়ার বা যা করার তা করা হবে।’
সুরভী ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। বিক্রম আর প্রীতমও ঢুকে পড়ল নিজেদের ঘরে। স্বাগতও নিজের ঘরে ফিরে শুয়ে ভাবতে লাগল ফঙের মৃত্যু কীভাবে হল? তার পাশে তো কোনও পাথরখণ্ড পড়ে ছিল না! সবথেকে বড় কথা মৃত্যুর আগে সে ‘কুমির, কুমির’ বলল কেন? তবে কি সত্যিই কুমির আছে বা কুমিরের আনাগোনা আছে এই মন্দিরে। প্রীতমের কুমির দেখার ব্যাপারটা তবে চোখের ভুল নয়। ঠিকই দেখেছিল সে। এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই সেই খামের যুবতীর কথা মনে পড়ে গেল স্বাগতর। সে তাকে রাতে একলা জঙ্গল বা মন্দিরের ভিতর ঢুকতে নিষেধ করেছিল। কোনও অঘটন ঘটতে পারে এ কথা কি সে অনুমান করেছিল? বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে নানা কথা ভেবে চলল স্বাগত। ঘুমাবার চেষ্টা করেও ঘুম এল না তার। দেখতে দেখতে ঘণ্টা দুই-তিন সময় কেটে গেল। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল।
জানালা দিয়ে স্বাগত দেখতে পেল প্রফেসর রামমূর্তি চত্বরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে দেখে ঘর ছেড়ে স্বাগত বেরল। অন্য দরজাগুলো খুলে নাতাশা-সুরভী-বিক্রম-প্রীতমও বাইরে বেরিয়ে এল। তাদের চোখমুখ দেখে স্বাগত বুঝতে পারল তারই মতো অন্যদেরও ঘুম হয়নি, সবার চোখেমুখেই উত্তেজনার ছাপ। বৃষ্টি সদ্য থেমেছে। চারপাশের বাতাস এখনও ভেজা। জলে ধোয়া জঙ্গলকে গাঢ় সবুজ দেখাচ্ছে।
সবাই এগিয়ে গিয়ে ঘিরে দাঁড়াল রামমূর্তি স্যরকে। তিনি কিছু বলার আগেই নাতাশা তার উদ্দেশে বলল, “আমি স্যর আর এখানে থাকব না, মন্দিরের ভিতরেও আর ঢুকব না। আপনি আমার ফেরার ব্যবস্থা করে দিন।”
তার কথা শুনে রামমূর্তি স্যর বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, “তোমার ইচ্ছা হলে চলে যাবে। তবে এখনই সে ব্যবস্থা করে দেওয়ার সময় আমার নেই।”
এরপর তিনি সবার উদ্দেশে বললেন, “আমি এখানকার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীকর্তা ডক্টর পিচকে খবরটা জানিয়েছি। তিনি সিয়েমরিপ থেকে রওনা হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এসে পড়বেন। পুলিসও আসছে। আমিই তাদের যা বলার বলব। তোমাদেরও হয়তো পুলিস প্রশ্ন করতে পারে। আমরা শুধু বলব, ‘রাত্রিবেলা মন্দিরের ভিতর থেকে চিৎকার শুনে আমরা মন্দিরের ভিতর ঢুকে দেখি ফঙ মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।’ বাড়তি কোনও কথা বলার দরকার নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা কিন্তু বিদেশি। অবাস্তব কোনও কথা বললে পুলিস আমাদের কোনও কারণে সন্দেহ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।”
স্বাগত তার কথা শুনে বুঝতে পারল, ফঙের ‘কুমির কুমির’ বলাটা এড়িয়ে যেতে বলছেন প্রফেসর। স্বাগত জানতে চাইল, ‘পুলিস যদি জানতে চায়, আমরা ফঙকে চিনলাম কীভাবে?’
রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘বলব, নারেঙ খামের গাইড হিসাবে সে তার সঙ্গে এ মন্দিরে এসেছিল। তার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াত ফঙ। তাই আমরা তাকে চিনি। ফঙের সঙ্গে আমাদের কী কথাবার্তা হয়েছিল সে সব কিছু বলারও দরকার নেই।’
সকলে বলল, ‘আচ্ছা স্যর।’
বিক্রম বলল, ‘মন্দিরের ভিতর ঢুকে ফঙের দেহটা একবার দেখে আসব নাকি?’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘না, তার দরকার নেই। পুলিস এলে একসঙ্গে ভিতরে যাব।’
কিছুক্ষণের মধ্যে পরপর তিনটে গাড়ি একসঙ্গে এসে দাঁড়াল মন্দির চত্বরের সামনে। একটা প্রাইভেট গাড়ি, একটা পুলিসের আর তৃতীয় গাড়িটা অনেকটা অ্যাম্বুলেন্সের মতো দেখতে। সেটা সম্ভবত শব বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে এসেছে। প্রাইভেট গাড়িটা থেকে মোটাসোটা চেহারার, খর্বকায় চশমা পরা ব্যক্তি নামলেন। রামমূর্তি বললেন, “উনি হলেন কিম। পুলিসের গাড়ি থেকে একজন উর্দি পড়া অফিসার ও কয়েকজন পুলিসকর্মী নামল। অফিসারের পোশাকে ও টুপিতে লাগানো এমব্লম আর ব্যাচ থেকে স্বাগতর অনুমান হল তিনি উচ্চপদস্থ পুলিস কর্মচারী। গাড়ি থেকে নেমে তাঁরা সকলে এসে দাঁড়াল স্বাগতদের সামনে। পুলিস কর্তাকে দেখিয়ে কিম তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন, “ইনি কমিশনার বাকুম।” তারপর তিনি পুলিস কমিশনারের সঙ্গে প্রফেসর রামমূর্তির পরিচয় করিয়ে দিলেন।
কমিশনার বাকুমকে দেখে স্বাগতর মনে হল সম্ভবত তিনিও খামের জনগোষ্ঠীর লোক। বাকুম স্বাগতদের দেখিয়ে রামমূর্তির কাছে তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন।
রামমূর্তি বললেন, ‘ওরা আমার সহকর্মী, সকলেই ভারতীয়।’ এ কথা বলার পর তিনি একে একে সকলের নাম জানালেন তাঁকে। কমিশনার জানতে চাইলেন, ‘আপনারা কতদিন হল এখানে কাজ করছেন?’
তাঁর প্রশ্নর উত্তর দিলেন প্রফেসর রামমূর্তি।
বাকুম এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘এবার বলুন, কী ঘটনা ঘটেছে? কখন ঘটেছে?’
রামমূর্তি কী বলবেন তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। তিনি সেইমতো জবাব দিলেন।
অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকটার সঙ্গে আপনাদের কীভাবে পরিচয়? সে কি এখানে যাওয়া আসা করত? আপনারা তাকে কাজে নিয়োগ করেছিলেন?’
রামমূর্তি বললেন, ‘না, আমরা তাকে কাজে নিয়োগ করিনি। আমরা তাকে মন্দিরের ভিতর ঢোকারও অনুমতি দিইনি। তবে সে এর মধ্যে একদিন নারেঙ খাম নামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে গাইড পরিচয়ে এ মন্দিরে এসেছিল।’
‘নারেঙ খাম কে?’ জানতে চাইলেন বাকুম।
রামমূর্তি এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগেই অধিকর্তা কিম বললেন, ‘ওই ভদ্রলোককে আমি চিনি। জন্মসূত্রে তিনি এ দেশের লোক। বর্তমানে ফ্রান্সে থাকেন, বড় ব্যবসায়ী। কিছুদিন হল এদেশে এসেছেন জন্মভূমি দর্শনের জন্য। ছবি তোলার জন্য। এখানকার মন্দির সংস্কারের জন্য তিনি অনুদানও দিয়েছেন। সরকারের তরফে আমি তাকে এখানকার প্রাচীন মন্দিরগুলো ঘুরে দেখার ছাড়পত্রও দিয়েছি। সিয়েমরিপের এক হোটেলে থাকছেন তিনি। তার ঠিকানা আমার কাছে আছে।’
পুলিস কমিশনার সেখানে দাঁড়িয়ে আর কোয়ারিজ না করে এরপর জানতে চাইলেন, ‘লাশটা এখন কোথায়?’
রামমূর্তি বললেন, ‘যেখানে সে পড়েছিল সেখানেই আছে। আমরা লাশ সরাইনি।’
বাকুম বললেন, ‘চলুন সেটা দেখি?’
নাতাশা বলল, ‘আমি কিন্তু ভিতরে যাব না। ওসব বীভৎস দৃশ্য দেখতে পারব না আমি।’
সে শুধু বাইরে রইল, বাকি সকলে এগল তোরণের দিকে।
একই জায়গায় পড়েছিল ফঙের লাশটা। তার শরীরের রক্ত বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে। তার দেহটা ঘিরে দাঁড়াল সবাই। দিনের আলোতে তার দিকে তাকিয়ে স্বাগত দেখল ফঙের মাথা আর মুখের একপাশটা একদম থেঁতলে গেছে। তার স্থির চোখ দুটো যেন চেয়ে আছে মন্দির তোরণের বিষ্ণুমূর্তির দিকে। বীভৎস দৃশ্য! বাকুম প্রাঙ্গণের চারপাশ দেখে নিয়ে বললেন, ‘ওর আঘাত লাগার ঘটনাটা এখানে ঘটেছে বলে মনে হয় না। ওর কাছাকাছি তো কোনও পাথর পড়ে নেই।’
