Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩১

পর্ব ৩১

তর্কী চম্পা জানতে চাইল, ‘কী সেই উপহার?’

বহ্নি তার বাহু আলিঙ্গন করে বলল, ‘এখনই তা তোমাকে বলব না। তাতে তোমার উপহার সম্পর্কে বিস্ময় নষ্ট হবে।’—একটানা কথাগুলো বলে থামল খামের যুবতী। তারপর বিষ্ণুলোকের দিকে তাকাল। সূর্য অদৃশ্য হতে চলেছে তার আড়ালে। স্বাগতও আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল খণ্ড খণ্ড মেঘগুলো যেন পরস্পরের দিকে মিলিত হওয়ার জন্য এগচ্ছে। অর্থাৎ বৃষ্টি নামবে।

খামের সুন্দরী স্বাগতকে বলল, ‘তুমি হয়তো ভাবছ আমি এত বিস্তৃতভাবে এ কাহিনি বলছি কেন? আসলে এ কাহিনি আমি হয়তো আর কোনওদিন কাউকে শোনাব না। তাই বিস্তৃত বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। আর তাছাড়া…।’ বাক্যটা শেষ না করেই থেমে গেল সে।

‘ —তাছাড়া কী?’

খামের যুবতী যেমন অনেক প্রশ্নর জবাব রহস্যময়ভাবে এড়িয়ে যায় তেমনই তার অসম্পূর্ণ বাক্যটা আর প্রকাশ করল না স্বাগতর কাছে। সে আবার তার কাহিনি বলতে শুরু করল-

“—সময় এগিয়ে চলল। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ধরণীন্দ্রবর্মনের নতুন রাজধানী। তার রাজ্যে শান্তি বিরাজমান। রাজকার্য থেকে অবসর মিললে দিনের শেষে আগের মতোই মহারাজ মন্দিরে যান সন্ধ্যারতির সময়। চম্পা ও অন্য নর্তকীরা তাঁর সামনে নৃত্য পরিবেশন করে। যদিও চম্পার মন সে সময়ও পড়ে থাকে অন্য একজনের প্রতি। ভাস্কর বাস্তুকার বহ্নিও চামেদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরটাকে নবরূপ দান করে চলেছে। কিন্তু শত কাজের মধ্যেও তার মন পড়ে থাকে চম্পার কাছে। এমন দিন। অনেক সময় হয় যেদিন হয়তো মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন বাস্তুকার ভাস্করকে তার নির্মীয়মাণ রাজধানীতে কোনও কর্ম উপলক্ষ্যে পাঠিয়ে দিলেন। অথবা মন্দিরে নৃত্যগীতের বিশেষ কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে চম্পা তার প্রেমিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারল না। সেদিন তাদের দু’জনের মনই আর কোনও বাধা মানতে চাইত না। মনে হতো সব কিছু ফেলে যেন তারা পরস্পরের কাছে ছুটে যায়। মনে হতো কত যুগ যেন তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়নি। এভাবেই প্রেম-বিরহে অতিক্রান্ত হচ্ছিল তাদের সময়।

মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন যেমন সন্ধ্যারতি দেখতে মন্দিরে আসেন তেমনই একদিন সন্ধ্যাকালে মন্দিরে এলেন। মহারাজের সঙ্গে তাঁর সভাসদরাও মন্দিরে আসেন। তাদের চম্পার মুখ পরিচিত। কিন্তু এদিন মহারাজের সঙ্গে যুবা বয়সি এক ব্যক্তি নৃত্য দেখতে এলেন যাঁকে ইতিপূর্বে চম্পা কোনওদিন দেখেনি। মেঘের মতো তাঁর গায়ের রং, অত্যন্ত বলশালী চেহারা শুধু নয়, তাঁর মধ্যে একটা কাঠিন্য আছে। চোখের দৃষ্টিও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, যেন অন্তরভেদী সেই দৃষ্টি। তাঁর গায়ের মূল্যবান বস্তু ও স্বর্ণালঙ্কার দেখে চম্পা অনুমান করল ওই ব্যক্তি কোনও প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। যাইহোক নির্দিষ্ট সময় চম্পা তার নৃত্য পরিবেশন শুরু করল। নাচতে নাচতে সে খেয়াল করল সেই নবাগত ব্যক্তি যেন অদ্ভুত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। একসময় তার নাচ শেষ হল। মহারাজা ধরণীন্দ্রবর্মন তাঁর সভাসদদের নিয়ে গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন। মহারাজ মন্দির ত্যাগ করার পর নর্তকীরাও একে একে মন্দির ত্যাগ করতে লাগল। নৃত্য প্রদর্শন করলেও চম্পার মন এদিন বিষণ্ণ ছিল বহ্নির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করতে পারার কারণে। তারই কথা ভাবতে ভাবতে মাথা নিচু করে মন্দির তোরণ অতিক্রম করতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় তার সামনে এসে উপস্থিত হল এক ব্যক্তি। চম্পা মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই কৃষ্ণবর্ণের ব্যক্তি যে কিছুক্ষণ আগে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের পাশে বসে তার নৃত্য দেখছিলেন। চম্পার মনে হল সেই অভিজাত ব্যক্তি যেন তার জন্যই চলে না গিয়ে মন্দির তোরণে প্রতীক্ষা করছিলেন। চম্পা প্রথাগতভাবে হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল। সেই ব্যক্তি কর্কশ স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তুই আমাকে চিনিস?’

চম্পা মাথা নেড়ে বলল, ‘না।’

সেই ব্যক্তি এরপর বললেন, ‘এমনিতে আমি এই মন্দিরে সন্ধ্যারতি দেখতে আসি না। আজ মহারাজ তাঁর সঙ্গী হতে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, তাই আমি এখানে এসেছিলাম। তবে তোর নৃত্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। রাজ পার্ষদদের মুখে শুনেছি তুই নাকি এ মন্দিরের শ্রেষ্ঠ নর্তকী। তোকে আমি এই স্বর্ণ মুদ্রা পুরস্কার দিলাম। এরপর তিনি একটা স্বর্ণ মুদ্রা তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে তুলে ধরলেন চম্পাকে দেওয়ার জন্য। চম্পা প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না। এই অপরিচিত ব্যক্তির থেকে স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণ করা উচিত হবে কি না। তাই সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা এরপর তাঁর আত্মপরিচয় দান করে বললেন, “তুই হয়তো জানিস না আমি একজন রাজপার্ষদ। নে মুদ্রাটা নে।’

এবার আর তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারল না চম্পা। মুদ্রাটা গ্রহণ না করলে তাঁকে অপমানিত করা হবে। হয়তো সে কারণে এই রাজপার্ষদ মহারাজের কাছে অভিযোগও জানাতে পারেন। মহারাজ শাস্তি দিতে পারেন চম্পাকে। সে সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে চম্পা অঞ্জলি পাতল। লোকটা মুদ্রাটা ছুঁড়ে দিলেন চম্পার হাতে। তারপর বললেন, ‘আমার নাম উগ্রদেব।’ এ কথা বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না। তোরণের ঠিক বাইরেই রথ প্রস্তুত ছিল। কয়েকজন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীও ছিল। তাদের নিয়ে তিনি অন্যত্র রওনা হলেন।

একদিন সাক্ষাৎ না হলেই সেদিনকে কেমন অতিবাহিত করেছে তা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করে বহ্নি আর চম্পা। পরদিন যখন তাদের দু’জনের সাক্ষাৎ হল তখন বহ্নির প্রশ্নের জবাবে চম্পা তার স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণের ঘটনাটা ব্যক্ত করল। তারপর সে বহ্নিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ওই রাজপার্ষদ উগ্রদেবকে চেন? তাঁর সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে? কেমন যেন কর্কশ দেখতে ওই যুবা পুরুষকে।’

বহ্নি বলল, ‘আমি দেখেছি তাঁকে। কিন্তু বাক্যালাপের তেমন সুযোগ ঘটেনি। কারণ নিতান্ত প্রয়োজন না হলে রাজসভাতে তিনি নিত্যদিন উপস্থিত থাকেন না। নিজ প্রাসাদ মন্দিরেই থাকেন। তিনি নিজে শুধু রাজপার্ষদই নন, আর এক প্রবীণ রাজপার্ষদ বিরুচের জামাতা তিনি। তবে আমি খেয়াল করে দেখেছি সভাকক্ষে উগ্রদেব উপস্থিত হলে মহারাজ তাকে বিশেষ সমাদর করে চলেন। তাঁর ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করে চলেন।’

‘এর কারণ কী?’ জানতে চাইল চম্পা।

বহ্নি বেশ কয়েক বৎসরকাল সময় এই মন্দির নগরীতে আছে। রাজসভাতেও বহুদিন তার যাওয়া আসা আছে। নানান লোকের সঙ্গে তার পরিচয়। সূর্যবর্মনের মৃত্যুর পর হরিদেবের মৃত্যুর ঘটনা, ধরণীন্দ্রবর্মনের সিংহাসন লাভের ঘটনা, এমনকী হরিদেবের মৃত্যুর পিছনে যে কোনও রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে সে আশঙ্কার কথাও ধরণীন্দ্রবর্মন লোকমুখে শুনেছে। সেই কথাগুলো বহ্নি ব্যক্ত করল চম্পাকে। তারপর বলল, ‘আমি এও শুনেছি যে উগ্রদেবকে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন তাঁর পার্ষদদের মধ্যে স্থান দিয়েছেন, তাঁকে সমাদরে রাখার চেষ্টা করেন যাতে উগ্রদেব তাঁর পিতার নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও প্রশ্ন তুলতে না পারেন, বিদ্রোহী মৃত্যু না হয়ে উঠতে পারেন, সে জন্য।’

চম্পা তার কথা শোনার পর বহ্নিকে প্রশ্ন করল, ‘সত্যি কি মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন সিংহাসন লাভের জন্য হরিদেবকে কৌশলে হত্যা করেছিলেন?’

বহ্নি বলল, ‘এ কথা আমার সঠিক জানা নেই। হরিদেবের বেশ কিছু অনুগামী আছেন যাঁরা এই সম্ভাবনার কথা বলে থাকেন। তবে প্রকাশ্যে নয়, একান্ত আলোচনায়। তেমনই এক ব্যক্তির মুখ থেকে কথাটা শুনেছিলাম। আমি এখানে অর্থ উপার্জনের জন্য আছি। রাজনীতি অতি জটিল বিষয়। আমার তোমার মতো সাধারণ মানুষের রাজনীতির বিষয়ে অধিক কৌতূহল বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই হরিদেবের মৃত্যু সংক্রান্ত বিষয়ে আমি কারও কাছে আগ্রহ প্রকাশ করিনি।’

এ কথা বলার পর বহ্নি বলল, ‘মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন যে ভাবেই সিংহাসনে আরোহণ করুন না কেন তিনি সুশাসক। রাজ্যের শান্তি বজায় রাখার জন্য কঠিন পরিশ্রম করে চলেছেন, নতুন রাজধানী নির্মাণ করছেন, বিষ্ণুলোকের সংস্কার সাধন করেছেন, এই পুরনো মন্দিরগুলোরও সংস্কার সাধন করছেন, তিনি প্রজাহিতৈষী নৃপতি বটে। এ রাজ্যে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে প্রজারা। তাই আমাদের মহারাজের মঙ্গল কামনা করা উচিত।’ চম্পা বলল, ‘হ্যাঁ। তিনি দয়ালুও বটে। তিনি আমার মতো একজন নারীর জীবন রক্ষা করেছেন, আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, অন্নের ব্যবস্থা করেছেন। আমি তাঁকে পিতার মতোই শ্রদ্ধা করি। তাঁর কোনও অমঙ্গল হোক আমি তা কোনওদিন চাইব না।’

এ কথা বলার পর তারা দু’জন ধরণীন্দ্রবর্মন-হরিদেব উগ্রদেবের প্রসঙ্গ ত্যাগ করে নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে মত্ত হল।

এর পরদিন দু’জন এসে হাজির হল নর্তকী চম্পার কাছে।” —এই বলে থেমে গেল খামের যুবতী। আকাশের দিকে তাকাল সে।

খামের যুবতী তার কথা থামিয়ে দিতেই স্বাগত বলল, ‘তারপর বল? কারা তারা?’

খামের কন্যা বলল, ‘আজ এ পর্যন্তই থাক। পরদিন বলব কারা তারা? দেখ মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ, সূর্য ডুবে গেছে। হয়তো এখনই বৃষ্টি আর অন্ধকার নামতে শুরু করবে। তার আগেই তোমার মন্দিরে ফিরে যাওয়া দরকার। অন্ধকার বড় বিপজ্জনক।’—এই বলে উঠে দাঁড়াল যুবতী। স্বাগত বিভোর হয়ে কাহিনি শুনছিল। সে এবার আকাশের দিকে খেয়াল করে দেখল খণ্ড খণ্ড মেঘগুলো একসঙ্গে জড়ো হয়েছে, তাদের রং গাঢ় হচ্ছে। স্বাগত বুঝতে পারল তার ফেরা দরকার। শুধু বৃষ্টি বা অন্ধকার নামার কারণে নয়, প্রফেসর রামমূর্তি তার খোঁজ করতে পারেন। সে মন্দির ত্যাগ করার পর ইতিমধ্যে ঘণ্টাখানেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে তারপর আর এ সময় তার মন্দির চত্বর ছেড়ে বাইরে থাকা উচিত হবে না। তাই স্বাগতও উঠে পড়ে বলল, ‘আমি আবারও চেষ্টা করব কাল তোমার কথা শোনার জন্য।’

খামের কন্যা তার কথার প্রত্যুত্তরে বলল, —‘আমিও আসব। তবে যাওয়ার আগে আবারও তোমাকে সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি রাত্রিবেলা একাকী বাইরে বেরিও না। আর মন্দিরে প্রবেশ কোরো না!’ —এই বলে সে অন্যদিনের মতোই এগিয়ে গিয়ে গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর স্বাগতও সেই স্থান ত্যাগ করে দ্রুত ফেরার পথ ধরল। কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল প্রফেসর রামমূর্তি হেঁটে আসছেন। তারা মুখোমুখি হতেই রামমূর্তি বললেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি? তোমাকে ফোন করলাম, কিন্তু সুইচড অফ বলছে!’

স্বাগত পকেট থেকে তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বার করে দেখে বলল, ‘সরি স্যর, মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। দূরে কোথাও যাইনি। কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।’

তিনি বললেন, ‘গতকালের ঘটনার পর স্বাভাবিক নিয়মেই আমার চিন্তা বেড়েছে। তাই তোমাকে খুঁজতে বেরলাম।’

এরপর তারা দু’জন মিলে মন্দিরে ফেরার পথ ধরল। ফিরতে ফিরতে রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘ফঙ যদি সত্যি খুন হয়ে থাকে তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তাহলে তো ধরে নিতে হবে অন্য কেউ মন্দিরে ঢুকেছিল। এমনও হতে পারে ফঙ তাকে সঙ্গে করেই এনেছিল তারপর কোনও কারণবশত যে ফঙকে খুন করে। ভূতে নিশ্চয়ই তাকে খুন করেনি?’

স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, তা তো নিশ্চয়ই। সে যদি খুন হয়ে থাকে তবে মানুষই তাকে খুন করেছে।’

রামমূর্তি বললেন, ‘ফঙের কথাবার্তা তো ভালো ছিল না। এটা শুধু আমার কথা নয়, নারেঙ খামও একই কথা বলেছে। হয়তো সে কারও সঙ্গে তার আচরণের জন্য শত্রুতা বাঁধিয়ে রেখেছে। সেই খুনটা করেছে।’

—‘ফঙ কী করতে মন্দিরে ঢুকেছিল বলে মনে হয়? গুপ্তধন খুঁজতে?’

প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘তার উত্তর একমাত্র সেই দিতে পারত।’

এরপর তিনি বললেন, ‘কাল সকালে আমি একবার সিয়েমরিপ যাব। ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটার আছে। বিকালের মধ্যেই ফিরে আসব।’

কথা বলতে বলতে তারা মন্দির চত্বরে পৌঁছে গেল। অন্যরা চত্বরেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে গল্প করা বা কথা বলার সুযোগ স্বাগতর হল না। তারা চত্বরে উঠে আসতেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। সবাই যে যার ঘরের দিকে ছুটল। অঝোরে বৃষ্টি। সেদিন আর তাই রাতের রান্না হবে না। যে যার মতো শুকনো খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি কমল বেশ রাতে। তারপর শুরু হল অবিশ্রান্ত ব্যাঙের ডাক। জঙ্গলের ভিতর গাছ বা কোটরে বসবাস করে তারা। বর্ষার জল পেয়ে আনন্দে কোটর থেকে বেরিয়ে পড়েছে, চত্বরেও উঠে এসেছে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল স্বাগত।

শেষ রাতের দিকে একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল সে। মন্দিরের ভিতর একলা ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। ঘুরতে ঘুরতে মূল মন্দিরের সামনে উপস্থিত হল। জায়গাটাকে যেন অন্যরকম মনে হল স্বাগতর। খুব প্রাচীন বলে আর মনে হচ্ছে না জায়গাটাকে। যেন নতুনভাবে কেউ সাজিয়ে তুলেছে। মন্দির বা চত্বরের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অপ্সরাদের বা অন্যমূর্তিগুলো যেন তাদের পুরনো অক্ষত রূপ ফিরে পেয়েছে। প্রাঙ্গণের একপ্রান্তে একটা মঞ্চও দেখতে পেল সে। নৃত্য মঞ্চ। তার চারপাশে কারুকাজ করা স্তম্ভ। এ মঞ্চ তো সে আগে দেখেনি! আর এরপরই নূপুরের শব্দ কানে এল তার।

নৃত্যমঞ্চর পিছনের কক্ষ থেকে ছমছম শব্দ করতে করতে বেরিয়ে এল এক নারী! সে এগিয়ে এল স্বাগতর দিকে। তবে তার মুখমণ্ডল ওড়নায় ঢাকা। স্বাগতকে সে বলল, ‘তুমি এসেছ। আমি জানতাম তুমি আসবে। আমি কত যুগ ধরে প্রতীক্ষা করে আছি তোমার জন্য। আমি তোমাকে নাচ দেখাব।’

স্বাগত তাকে বলল, ‘আপনি কে? এ মন্দিরে কোথা থেকে এলেন? আপনি মনে হয় অন্য কারও সঙ্গে আমাকে ভুল করছেন।’

সে নারী হেসে বলল, ‘আমি তোমাকে সত্যি চিনতে পেরেছি কি না তুমি তার পরীক্ষা নিচ্ছ? বহ্নি তোমাকে আমি ভুলব কীভাবে?’

স্বাগত অবাক হয়ে বলল, ‘আমি তো বহ্নি নই, স্বাগত। আর আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।’

সেই অবগুণ্ঠনবতী নারীর কণ্ঠে যেন অভিমানের সুর বেজে উঠল। সে বলল, ‘তুমি আমাকে সত্যিই চিনতে পারছ না ভাস্কর? ওই নৃত্যমঞ্চর কথাও ভুলে গেছ? যেদিন তুমি ওই মঞ্চে আমার নাচ দেখেছিল, ঠিক এই স্থানে দাঁড়িয়ে আমার হাত দুটো স্পর্শ করেছিলে, সে সব কথা কি কিছুই মনে নেই তোমার? সেই স্পর্শর কথা কিন্তু আজও আমি ভুলিনি।’

স্বাগত এবার আরও অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। স্বাগত তাকে বলল, ‘দেখুন আমি আপনাকে চিনি না। আপনি ভুল করছেন। এ মন্দিরে আপনি কীভাবে ঢুকলেন? কখন ঢুকলেন? এখানে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ।’

স্বাগতর কথা শুনে সেই নারী বলল, ‘তুমি কি আমার সঙ্গে পরিহাস করছ? নাকি সত্যিই চিনতে পারছ না আমাকে? তোমার আহ্বানেই তো আমি প্রবেশ করেছিলাম এই মন্দিরে। দেখ, আমার হাত দুটো স্পর্শ করে দেখ। এ স্পর্শ তোমার চেনা কি না? এই বলে সে তার হাতদুটো পিছন থেকে সামনে এনে স্বাগতর ডানহাতের পাতা দুটো জড়িয়ে ধরল। সেই নারী হাত স্পর্শ করতেই কোনও পরিচিত নয়, এক বিজাতীয় স্পর্শানুভূতি হল স্বাগতর। তার শরীর শিরশির করে উঠল। তারপর সেই নারীর হাতের দিকে তাকাতেই স্বাগত চমকে উঠল। মানুষের হাতের পাতার মতো দেখতে হলেও ও হাত ঠিক মানুষের মতো নয়। আঙুলগুলো সরু ও লম্বা। হাতের পাতার ওপরের অংশ রোমশ। বানরের হাত! তা দেখেই আতঙ্কে শিহরন খেলে গেল স্বাগতর শরীরে। সে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে গেল। কিন্তু সেই অবগুণ্ঠনধারী শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তার হাত।

এরপর সে হয়তো আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল স্বাগতকে। ঠিক সেই সময় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল একদল ব্যক্তি। প্রাচীন খামেদের মতো পোশাক তাদের পরনে। কোমরে ঝুলছে তলোয়ার, কারও হাতে তির ধনুক। সর্বাগ্রে যে ব্যক্তিটি, সে ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক বলশালী ব্যক্তি। সে স্বর্ণালঙ্কারে শোভিত। তার ঘূর্ণায়মান চোখের দৃষ্টি স্বাগতদের ওপর পড়তেই সে বলল, ‘ওই তো ওরা। নর্তকী চম্পা! আর সেই ভাস্কর!’