Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪

পর্ব ০৪

সবাই মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে সূর্যালোকে জেগে থাকা বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলোর দিকে। বিক্রম বলল, ‘কত ছবি দেখেছি ওই মন্দিরের, ওখানে আমরা যাচ্ছি এ ব্যাপারটা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!’

প্রীতম সেখানে দাঁড়িয়েই সেখান থেকে একটা ছবি নিল

মন্দির শীর্ষের। তারপর আবার তারা এগল সে দিকে। ধীরে ধীরে তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করতে লাগল আঙ্করভাটের বিষ্ণুমন্দিরের নানান অংশ। রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘আঙ্করভাট’ শব্দটা এসেছে সংস্কৃত ভাষা থাকে। ‘আঙ্কর’ হল সংস্কৃত ভাষাতে ‘নগর’ শব্দের স্থানীয় উচ্চারণ। এ জায়গাকে স্থানীয় মানুষরা ‘আঙ্কর হাম’ নামেও ডেকে থাকে। বিষ্ণুলোকে পৌঁছবার আগে এ জায়গার সম্পর্কে কিছু তথ্য তোমাদের জানিয়ে রাখি।’

এ কথা বলে একটু থেমে তিনি বলতে শুরু করলেন— দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশ কাম্পুচিয়া বা কম্বোডিয়া। হাজার বছর আগে খামের জাতি এ দেশ শাসন করতে শুরু করে। যার রাজধানী ছিল ঠিক এই অঞ্চল। যেখানে তারা গড়ে তুলেছিল এই মন্দির নগরী। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে এ অঞ্চলে তারা রাজধানী গড়ে তোলে। তবে শুধু বর্তমানের কাম্পুচিয়াই নয়। দু’শো বছর ধরে তারা সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়া শাসন করত। সূর্যবর্মন একসময় কিছুকালের জন্য চম্পা রাজ্যও দখল করে রাখেন। খামেরদের চিরশত্রু ছিল চাম জাতির লোকেরা। দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই দ্বিতীয় ধরণীবর্মন সিংহাসনে বসেন। তিনি চামেদের আকস্মিক আক্রমণ করেন ও অনুমান করা হয় সিংহাসনলোভী কিছু স্বজাতীয় মানুষের চক্রান্তের কারণে চামেদের কাছে পরাজিত হন। এগারোশো শতকের শেষ লগ্নে ওই সময় চামেরা এই মন্দির নগরীতে প্রবল ধ্বংসলীলা চালায়। বহু মূর্তি ধ্বংস করে, ধনরত্ন লুণ্ঠন করে, নারীদেরও অপহরণ করে নিজেদের লালসা চরিতার্থ করার জন্য। খামের রাজা সপ্তম জয়াবর্ধন আবার চামেদের হাত থেকে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। এ জায়গার কিছুটা উত্তরে তাঁর আবাসস্থল রচনা করেন ও ‘বায়ুম’ মন্দির নির্মাণ করেন। যা আঙ্করভাটের অন্যতম বিখ্যাত মন্দির। সে মন্দিরও আমি তোমাদের দেখাতে নিয়ে যাব। খামের সাম্রাজ্যের এই মন্দির নগরীর প্রধান রূপকার দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের সময়কাল থেকেই এখানে বৌদ্ধ ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। যে বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের প্রভাব বেশি ছিল। সূর্যবর্মন রাজনৈতিক কৌশলের কারণে বৌদ্ধধর্মের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কেউ কেউ বলেন বৌদ্ধরা তন্ত্রসাধনা করত বলে সূর্যবর্মন সমীহ করে চলতেন তাদের। তিনি বৌদ্ধদের ধর্মাচরণ ও তন্ত্র সাধনার জন্য কয়েকটি মন্দিরও নির্মাণ করান। তবে খামের রাজা জয়াবর্ধনের সময় থেকেই বৌদ্ধদের প্রভাব বাড়তে থাকে। জয়াবর্ধন যাদের পরামর্শে পরিচালিত হতেন তাঁর মধ্যে একজন বৌদ্ধ তান্ত্রিকও নাকি ছিলেন। যে কারণে বায়ুম মন্দিরসহ বেশ কিছু মন্দিরে তথাগতর মূর্তি দেখা যায়। এমনকী একসময় বিষ্ণুলোকের কিছু অংশে বুদ্ধের উপাসনা শুরু হয়। যে কারণে আঙ্করভাটের ওই বিষ্ণুমন্দিরকে বর্তমানে বলা হয় ‘হিন্দু বৌদ্ধ’ মন্দির। শেষ পর্যন্ত একসময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই এ স্থানের কর্তৃত্ব দখল করে নেয়। যা আজও বহমান। বর্তমানে এখানকার অধিকাংশ মানুষ খামের জনজাতির হলেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।’

হাঁটতে হাঁটতে ধীরে ধীরে এ কথাগুলো বলার পর একটু থামলেন রামমূর্তি। বিষ্ণুলোক এখন অনেকটাই কাছে এগিয়ে এসেছে। শুধু মন্দিরের শীর্ষদেশই নয় তার নিম্নভাগের অনেকটা অংশই এবার স্বাগতদের চোখে ধরা পড়ছে। রামমূর্তি এরপর আবার বলতে শুরু করলেন, ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের মধ্যে পর্তুগিজ ধর্মপ্রচারক আন্তেলিও ম্যাগদালনার সর্বপ্রথম এ জায়গা পরিভ্রমণ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি অভিযাত্রী মৌহাতের লেখার মাধ্যমে আঙ্করভাটের কথা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, মন্দিরগুলির মধ্যে একটি মন্দিরের শিল্প সুষমা রাজা সলেমনের মন্দিরকেও হার মানায়। যাঁরা মন্দিরটি নির্মাণ করেছেন তাঁরা মাইকেল এঞ্জেলোর থেকেও বেশি দক্ষ ছিলেন। প্রাচীন গ্রিস বা রোমের স্থাপত্যের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর এই মন্দির। তিনি যে মন্দির বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠা বিষ্ণুলোককেই বোঝাতে চেয়েছিলেন। তাঁর লেখা পড়ার পরই ইউরোপিয়রা আকৃষ্ট হয় এ জায়গার প্রতি। কারণ, এত বড় পুরনো মন্দির নগরীতে ধন-রত্ন থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই ব্যাপারটাই সম্ভবত তাদেরকে এ জায়গার প্রতি আকর্ষিত করে তোলে। আঙ্করভাট অন্বেষণে বেরিয়ে পরে তারা।’

রামমূর্তির কথার মাঝেই নাতাশা বলল, ‘অর্থাৎ ট্রেজার হান্টের জন্য এখানে আসতে শুরু করেছিল ইউরোপীয়রা। কিছু কি পেয়েছিল তারা?’

রামমূর্তি বললেন, ‘এখানে যে মূল্যবান পাথর পাওয়া যায় তা হল এমারেন্ড বা পান্না। সিয়েমরিপ বা রাজধানী নমপেনে বহু অলঙ্কারের দোকান আছে ওই সবুজ পাথরের। এখানকার কিছু মন্দিরে নাকি পান্না বা পান্নার তৈরি মূর্তি ছিল। সে সব নাকি ওই গুপ্তধনের সন্ধানীরা লুঠ করে বলে শোনা যায়।’

নাতাশার কথার জবাব দিয়ে তিনি তাঁর আগের বক্তব্যে ফিরে গিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, যে কথা তোমাদের বলছিলাম। ইউরোপিয়ানদের কাছে পরিচিত হতে শুরু করল এ জায়গা, এই দেশ। একসময় ফরাসিরা এ দেশ দখল করে তাদের উপনিবেশ বানায়। পঞ্চাশ বছর আগে খামের রুজ কমিউনিষ্ট পার্টি এ দেশের ক্ষমতা দখল করে। তাঁদের শাসনকালে কয়েক দশক ধরে বহু মানুষকে হত্যা করা হয় এখানে। তারপর ভিয়েতনাম অত্যাচারী পলপটের শাসনের পতন ঘটায়। এ দেশের জনজীবন আবার মোটামুটি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এই হল এ দেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।’

রামমূর্তির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাতাশা বলল, ‘হ্যাঁ, পলপটের কীর্তি আমরা দেখে এসেছি নমপেনের কিলিং ফিল্ডে। ও জায়গা এত ভয়ঙ্কর যে সহ্য করা যায় না!’

রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও দেখেছি ওই কিলিং ফিল্ড আর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। কোনও মানুষ যে এত হিংস্র হতে পারে তা ভাবা যায় না!’

কথা বলতে বলতে বিষ্ণুলোকের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেল তারা। এবার তাদের চোখে পড়তে লাগল পথের একপাশে সার সার মূর্তি। যদিও তাদের কোনওটাই আজ অক্ষত নেই। তাদের কোনও মুণ্ডু নেই, কারও বা হাত বা পা খসে পড়েছে। স্বাগত সেই সার সার মূর্তিগুলোকে ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারল তারা যেন কিছুটা তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে পাথরের তৈরি মোটা দড়ির মতো কোনও জিনিসকে দু’হাত দিয়ে ধরে রেখেছিল। যদিও তা মূর্তিগুলোর মতোই স্থানে স্থানে খসে পড়েছে। তা দেখে স্বাগত রামমূর্তিকে জিজ্ঞেস করল, ‘মূর্তিগুলো হাতে মোটা দড়ির মতো কী জিনিস ধরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে?’

রামমূর্তি বললেন, ‘যা তোমরা দেখছ তা হল মন্দির নগরীর প্রাকার। মাত্র কয়েকটা জায়গাতে এখন ওর চিহ্ন অবশিষ্ট আছে। মূর্তিগুলোর হাতে দড়ির মতো দেখতে যে জিনিসটা ধরা দেখছ সেটা আসলে মোটা দড়ি নয়। ওটা হল পুরাণ বর্ণিত শেষনাগ বা সাপের শরীর। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে শেষনাগ সর্পকুলের রাজা। ভগবান বিষ্ণুর শয্যার ওপর ছাতার মতো ফণা বিস্তার করে থাকে এই মহাসর্প। তার শরীর দিয়েই ঘেরা ছিল মন্দির নগরী ও বিষ্ণুলোক। এক অর্থে সে এই নগরীর পাহারাদারও বলা চলে। ওর মাথাটা তোমরা আর একটু এগুলেই দেখতে পাবে মন্দিরে প্রবেশ করার পথে।’

আঙ্করভাটের বিষ্ণুমন্দির! বিষ্ণুলোক। জঙ্গলের পথ ধরে তারা বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে নির্বাক বিহ্বলভাবে চেয়ে রইল তাদের সামনের বিশাল স্থাপত্যকীর্তির দিকে। তাকে ঘিরে রয়েছে চওড়া একটা পরিখা। তার জলে এসে পড়েছে বিষ্ণুলোকের বিশাল তোরণের প্রতিবিম্ব। পরিখা ও তোরণ অতিক্রম করলেই স্বাগতরা প্রবেশ করবে বিষ্ণুলোকে। তোরণের ওপারে বেশ কিছুটা দূরে রয়েছে বিষ্ণুলোকে ভগবান বিষ্ণুর আবাসস্থল সেই বিষ্ণুমন্দির। তার মাথার ওপরের পাঁচটি শৃঙ্গ এবার দেখতে পাচ্ছে স্বাগতরা। স্বাগত অনুমান করল বেশ কয়েক কিমি পরিধি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বিশাল স্থাপত্যের নানান অংশ। ঝলমলে একটা দিন। মেঘ মুক্ত নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে আঙ্করের সবচেয়ে বড় আর প্রাচীন মন্দিরটি। মন্দিরের চৌহদ্দিকে ঘিরে থাকা জলাশয়ের ওপর পাথরের তৈরি একটা সাঁকো আছে। তা দিয়ে জলাশয় অতিক্রম করে মন্দিরে যাওয়ার প্রবেশ তোরণের কাছে পৌঁছতে হয়। বেশ কিছু ট্যুরিস্ট সে পথ ধরে এগচ্ছে প্রবেশ তোরণের দিকে। অনেকে বাইরে থেকে ছবি তুলছে। বিশাল আকৃতির তোরণের ওপর সূর্যালোকে জেগে আছে বিশালাকৃতির বিষ্ণু মস্তক। অসম্ভব সুন্দর এক শিল্পকীর্তি। সময়ের নিয়মে তার কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও অপূর্ব সেই ভাস্কর্য মুহূর্তের মধ্যে যে কোনও মানুষের দৃষ্টি তার দিকে টেনে নিতে পারে। অচেনা কোনও শিল্পীর হাতে গড়া হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্য।

স্বাগত ও তারা চারজন বিস্মিতভাবে চেয়ে ছিল বিষ্ণুর সেই মুখমণ্ডলের দিকেই। তাদের হুঁশ ফিরল। তিনি বললেন, ‘তোরণের মাথার ওই বিষ্ণুর মুখমণ্ডল সত্যিই সুন্দর, তবে মূল মন্দিরে গেলে তার স্থাপত্যশৈলী অলঙ্করণ দেখলে তোমরা সত্যিই চমকে যাবে। চল এবার এগনো যাক?’

রামমূর্তির সঙ্গে আবার হাঁটতে শুরু করল সবাই। জলাশয় থেকে পাথরের সাঁকোটা বেশ খানিকটা উঁচুতে। সাঁকোয় ওঠার মুখটাতে পাথর বাঁধানো একটা চত্বর। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে সেই চত্বরে উঠে এল তারা। সে জায়গা দেখে স্বাগতরা বুঝতে পারল একসময় বিভিন্ন বিশালাকৃতি মূর্তি বসানো ছিল এ জায়গা ঘিরে। এখন কেবল দু’পাশে দুটো মূর্তি অবশিষ্ট আছে। তার মধ্যে একটা হল বিশালাকৃতির ফণাওলা শেষনাগের মাথা। তার শরীরের কিছুটা অংশ এখনও অবশিষ্ট আছে। সেটা দেখিয়ে রামমূর্তি বললেন, ‘এই সেই সর্পরাজ। যার শরীর দিয়ে বিষ্ণুলোকের প্রকার রচনা করা হয়েছিল। তোরণের ভিতরে মূল মন্দিরের চারপাশেও আবৃত করা এই মহাসর্পের অশ্বখুরাকৃতি কুণ্ডলী দিয়ে।’

আর একটি যে বিশাল মূর্তি অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার মাথার একটা অংশ ভেঙে গেলেও বোঝা যায় সেটা আসলে সিংহর মূর্তি। সৰ্প ও সিংহ দুটোই হল হিন্দুধর্মের প্রতীক। প্রাচীন মূর্তি দুটোর সামনে দাঁড়িয়ে তারা পাঁচজন কেউ বা ক্যামেরা বার করে কেউ বা মোবাইল ফোন ক্যামেরা দিয়ে নিজেদের ছবি তোলার পর এগল সাঁকো অতিক্রম করার জন্য। রামমূর্তি হাঁটতে হাঁটতে বললেন, সাঁকোর মুখের চত্বরটা মন্দিরের সমসাময়িক। কিন্তু যার ওপর দিয়ে আমরা হাঁটছি সেটা মাত্র কয়েকশো বছর আগে নির্মিত। আঙ্করভাটের মন্দির যখন নির্মিত হয় তখন এই চত্বর থেকে প্রবেশ তোরণে পৌঁছবার জন্য দড়ির রেলিং দেওয়া কাঠের পাটাতন বিছানো সাঁকো ছিল। প্রয়োজন বোধে নিরাপত্তার কারণে সেই সাঁকোকে সরিয়ে নিলে কেউ আর তোরণের কাছে পৌঁছতে পারত না। জলপূর্ণ এই বিরাট পরিখা সাঁতার কেটে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। কারণ, প্রকাণ্ড আকৃতির কুমিরের ঝাঁক ছাড়া থাকত এই পরিখাতে। আমাদের দেশের বহু দুর্গের চারপাশেও পরিখা রচনা করে তাতে কুমির ছেড়ে দিয়ে এমন কৌশলেই দুর্গর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হতো।

রামমূর্তি স্যরের কথাগুলো শুনেই স্বাগতর মনে পড়ে গেল গত রাতে দেখা অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা। নাতাশা জানতে চাইল, ‘এখনও কুমির আছে নাকি এখানে?’

রামমূর্তি হেসে বললেন, ‘বলা যায় না। সেই সময়ের কুমিরদের বংশধরদের মধ্যে দু-চারটে এখনও টিকে থাকলেও থাকতে পারে। তবে সিয়েমরিপে বেশ কয়েকটা কুমির খামার আছে। মাংস আর চামড়ার প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেখানে কুমির চাষ করা হয়।’

বিক্রম বলল, ‘হ্যাঁ, স্যর একজনের মুখে শুনেছি সে কথা।’

রামমূর্তি বললেন, ‘সপ্তাহে একদিন অন্তত এই প্রাচীন নগরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে সিয়েমরিপ শহরে যেতে হয় রসদ সংগ্রহ করে আনার জন্য। তোমাদেরও সে কাজে যেতে হতে পারে। সেখানে গেলে দেখবে কুমিরের চামড়ার তৈরি নানান জিনিসের দোকান আছে। আর রয়েছে কুমিরের কাঁচা মাংস বা রান্না করা মাংসর দোকান। কুমিরের মাংসের বার্গার এখানে বেশ জনপ্রিয়। শুধু স্থানীয় মানুষরা নয়, ইউরোপিয়দেরও বেশ তৃপ্তি করে সেই বার্গার খেতে দেখেছি আমি।’

রামমূর্তির কথা শোনার পর প্রীতম বেশ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল নাতাশার দিকে। যেন সে তাকে বলতে চাইল, ‘কুমিরের মাংসের বার্গার খাবে নাকি?’ আর নাতাশাও যেন প্রীতমের দৃষ্টি বুঝতে পেরে মুখ বাঁকাল তার উদ্দেশে। এ ব্যাপারটা খেয়াল করল স্বাগত।

সাঁকো অতিক্রম করে অপর প্রান্তের প্রবেশ তোরণের সামনে পৌঁছে গেল সকলে। তোরণের প্রবেশ মুখেও পাথর বাঁধানো একটা প্রাচীন চত্বর আছে সাঁকোর মুখে ওঠার চত্বরটার মতোই। তোরণের ভিতরে প্রবেশ করার আগে সেখানে এসে সকলকে নিয়ে থামলেন রামমূর্তি। তারপর বললেন, ‘এখানকার সব মন্দির তোরণ পূর্বমুখী। কেবলমাত্র এই বিষ্ণু মন্দিরের তোরণ পশ্চিমমুখী। এ দেখে গবেষকরা ধারণা করেন এই তোরণে শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ করা হতো। কারণ ধর্ম পুস্তকে নাকি লেখা আছে—শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদান সম্পন্ন হলে আত্মারা পশ্চিম পথে বিষ্ণুলোকে গমন করে।’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘প্রবেশ তোরণের এই চত্বরেই সম্ভবত মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, পিণ্ডদান এসব কাজ হতো। একটা বইতে আমি এ কথাও পড়েছি যে ওই পিণ্ডগুলো নাকি এই জলাশয় বা পরিখার কুমিরদের খাওয়াবার পরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কাজ সম্পন্ন হতো। আর তারপরই পুণ্যবান আত্মারা বিষ্ণুলোকে প্রবেশের, অর্থাৎ এই তোরণ অতিক্রম করার অধিকার অর্জন করত। তবে কুমিরকে পিণ্ড ভক্ষণ করার ঘটনা কতটা সত্যি তা আমার জানা নেই। ঘটনাটা একটা প্রচলিত, কল্পিত কাহিনিও হতে পারে।’ সুরভী বলল, ‘আমার মনে হয় পিণ্ডগুলো এই জলাশয়ে ফেলা হতো। এখনও যেমন আমাদের দেশে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর পিণ্ডগুলো গঙ্গা বা অন্য কোনও নদী বা জলাশয়ে গিয়ে ফেলে আসা হয়। যেহেতু এই পরিখায় কুমির থাকত তাই হয়তো তাদেরকে পিণ্ড খাওয়ানোর গল্প প্রচলিত আছে।’

বিক্রম বলল, ‘তুমি সম্ভবত ঠিকই বলেছ। পরিখাতে কুমির থাকার কারণেই এ গল্পর উৎপত্তি হয়েছে। ব্যাপারটা আসলে সত্যি নয়। কারণ, চাল-কলা-তিল-যব-ঘি এসব দিয়ে পিণ্ড প্রস্তুত করা হয়। আমার পিতৃশ্রাদ্ধর সময় আমি পিণ্ডদান করেছি। যে সব জিনিস দিয়ে পিণ্ড প্রস্তুত করা হয় তা সবই নিরামিষ বস্তু। কুমির তো মাংসাশী প্রাণী। সে চাল, যব এসব খেতে যাবে কেন?’

বিক্রমের কথা শুনে রামমূর্তি তারিফের স্বরে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। এ ব্যাপারটা আমি ভেবে দেখিনি। আমিও আমার পিতা-মাতার পিণ্ডদান করেছি। কোনও আমিষ জিনিস দিয়ে পিণ্ড বানানো হয় না। কুমির তা খেতে যাবে কেন?’—এ কথাগুলো ইংরেজিতেই বললেন প্রফেসর রামমূর্তি।

আর তারপর মুহূর্তেই একটা কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘কুমিররাই পিণ্ড খেত। আর কেন তা খেত তা আমি জানি।’

ইংরাজিতে বলা কথাগুলো কানে যেতেই রামমূর্তিসহ সকলে ফিরে তাকাল বক্তার দিকে। তাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে একটা লোক। অতি সাধারণ পোশাক তার পরনে—সস্তা দামের শার্ট আর গোড়ালির ওপরে বেশ খানিকটা ওঠানো খাঁকি প্যান্ট, পায়ে প্লাস্টিকের চপ্পল আর মাথায় তালপাতার তৈরি একটা টোকা বা টুপি। লোকটার পোশাকের মধ্যে একটা দুঃস্থভাব আছে। টোকার নীচে চোখ দুটো দিয়ে লোকটা চেয়ে দেখছে স্বাগতদের। তার ঠোঁটের কোণে আবছা একটা হাসিও যেন জেগে আছে। লোকটা ইংরাজিতে কথা বললেও তার চেহারা আর মুখমণ্ডল দেখে স্থানীয় খামের জনগোষ্ঠীর লোক বলেই মনে হল স্বাগতর। ভালো করে লোকটাকে দেখার পর রামমূর্তি লোকটাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী কারণে কুমিররা পিণ্ড খেত?’

প্রফেসরের কথার জবাবে লোকটা বলল, ‘সেটা জানার জন্য আপনাদের আমাকে মাথা পিছু দু’ডলার করে মোট বারো ডলার দিতে হবে। তাতে শুধু কুমিরকে পিণ্ডদানের কাহিনিই নয়। এই মন্দিরের নানান জায়গার নানান কাহিনি আমি শোনাব আপনাদের। এই মন্দির ভালো করে দেখতে তিনদিন সময় লাগে। আমি মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই বিষ্ণুলোকের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো দেখিয়ে আনব আপনাদের।’ কথাগুলো শোনার পর রামমূর্তি তার উদ্দেশে বললেন, ‘বুঝতে পারছি তুমি একজন গাইড।’

লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ। আমার নাম ফঙ। আমরা পাঁচ পুরুষ ধরে এ মন্দিরে গাইডের কাজ করি। এ মন্দিরের আনাচ-কানাচ আমি হাতের তালুর মতো চিনি। বিষ্ণুলোকের সব ইতিহাস আমার জানা। আপনারা আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন।’—এ কথা প্রত্যুত্তরের আশায় লোকটা চেয়ে রইল রামমূর্তির দিকে।

কিন্তু রামমূর্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর ফঙ নামের লোকটার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমার পরিচয় জেনে খুশি হলাম। কিন্তু আমাদের গাইডের দরকার নেই।’

লোকটা তাঁর কথা শুনে বলল, ‘কিন্তু গাইড ছাড়া এত বড় মন্দির ঘুরে দেখবেন কীভাবে? এই মন্দিরের কতগুলো অংশ আছে, কত কক্ষ আছে আর কত অলিন্দ স্তম্ভ আছে তা আপনারা ধারণা করতে পারবেন না! গাইড ছাড়া বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করা আর সাঁতার না জেনে মেকং নদীতে ঝাঁপ দেওয়া একইরকম ব্যাপার। ঠিক আছে আমি দু’ডলার আপনাদের কনসেশন করছি। দশ ডলারই না হয় দেবেন তাহলে। চলুন তবে আমরা তোরণের ভিতরে প্রবেশ করি?’

রামমূর্তি এবার গম্ভীরভাবে সেই গাইডের উদ্দেশে বললেন, ‘বললাম তো আমাদের গাইডের দরকার নেই।’ এ কথা বলে তিনি এগলেন তোরণের ভিতর প্রবেশ করার জন্য। স্বাগতরা সবাই অনুসরণ করল তাকে। কিন্তু ফঙ নামের লোকটা যেন নাছোড়বান্দা। সেও তাদের পিছন পিছন এগতে এগতে বলতে লাগল, ‘ঠিক আছে আমি আমার রেট আরও দু’ডলার কমিয়ে দিলাম। আট ডলার দিলেই হবে। আমি যেভাবে বিষ্ণুলোক ঘুরিয়ে দেখাব তেমন আর কেউ দেখাতে পারবে না আপনাদের।’

তার ঘ্যানঘ্যানানিতে অন্য কেউ সাড়া না দিলেও বিশাল সেই প্রাচীন তোরণের প্রবেশ করার মুখে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল নাতাশা। তারপর লোকটার দিকে ফিরে নিজের হাত ব্যাগ খোলার উপক্রম করে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে তোমাকে থাকতে হবে না। আমি তোমাকে এমনিতেই দু’ডলার দিচ্ছি। সেটা নিয়ে তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাও। দেখ অন্য কারও গাইডের প্রয়োজন আছে কি না!’

নাতাশার কথা শুনে প্রথমে চুপ করে গেল লোকটা। তারপর নাতাশা তাকে দেওয়ার জন্য টাকা বার করতে যেতেই লোকটা বলল, ‘আমি গাইডের কাজ করে টাকা উপার্জন করি ঠিকই, কিন্তু ভিক্ষা নিই না। ইচ্ছা হলে আমি এ দেশের মালিক হতে পারতাম।’

শেষ বাক্যটা বলার সময় ফঙ নামের লোকটার মুখে কেমন যেন অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল! এ কথা বলার পর ফঙ আর দাঁড়াল না। স্বাগতদের পাশ কাটিয়ে তোরণ অতিক্রম করে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। লোকটার সঙ্গে নাতাশার কথোপকথনের কারণে কয়েক মুহূর্তর জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছিল সবাই। এ ঘটনার জন্য রামমূর্তি কিছু না বললেও সুরভী তাকে বলল, ‘লোকটাকে এমনভাবে টাকা দিতে যাওয়া ঠিক হয়নি। মনে হয় ওর আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছে।’