Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪১

পর্ব ৪১

প্রফেসর বললেন, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। দেখি কী করি?’

এরপর আর কথা বাড়াল না নারেঙ। মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে সবাইকে নমস্কার করে তাদের পাশ কাটিয়ে হাঁটতে শুরু করল। স্বাগতরাও এগল মন্দিরের দিকে।

চত্বরে উঠে এল স্বাগতরা। নাতাশা আর সুরভী চত্বরেই এক পাথর খণ্ডর ওপর বসেছিল। স্বাগতদের সামনে তারা এগিয়ে এল। দু’জনেরই চোখেমুখে উৎকণ্ঠার চিহ্ন। সুরভী জানতে চাইল, “কী দেখলে?”

সুরভী তার কথার জবাব পাওয়ার আগেই নাতাশা বলল, ‘আমি আর খুনোখুনির কথা শুনতে চাই না। আমি ঘরে গেলাম।’ এই বলে সে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

স্বাগত সুরভীর প্রশ্নর জবাবে বলল, ‘হ্যাঁ, ঘটনাটা সত্যি। হোয়াঙ খুন হয়েছে। পুলিস তার দেহ তুলে নিয়ে গেল।’

প্রফেসর এরপর সুরভীকে জিজ্ঞেস করল, ‘নারেঙ খাম তো এখানে এসেছিল। সে তোমাদের কী বলে গেল?’

সুরভী উত্তর দিল, ‘সে বলল, সে নাকি চলে যাচ্ছে। তাই যাওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। নাতাশা তাকে খুনের কথাটা বলল, সেটা শুনে নারেও বলল, আমাদের নাকি এখানে থাকা উচিত হবে না। তারপর সে আমার কাছে জল খেতে চাইল। আমি ঘর থেকে জল এনে দিলাম, জল খেয়ে সে চলে গেল।’

প্রফেসর আর কারও সঙ্গে কোনও কথা বললেন না। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। তিনি ঘরে চলে যাওয়ার পর সুরভী বলল, ‘নাতাশা কিন্তু আজকের ঘটনা শুনে আরও ভয় পেয়ে গেছে। আমি ঘরে যাই, ওকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করি।’ —এ কথা বলে সেও এগল ঘরের দিকে।

বিক্রম বলল, ‘তাহলে আজ আমাদের সিয়েমরিপ যাওয়া ক্যান্সেল, তাই তো?’

প্রীতম বলল, ‘হ্যাঁ, আজ আর কোথাও যাওয়া উচিত হবে না। তাছাড়া মুডটাও নষ্ট হয়ে গেল।’

হেরুম স্বাগতদের কাছে জানতে চাইল, ‘আমি কী করব?’

স্বাগত বলল, “তুমি যখন এসেই পড়েছ তখন দুপুরের রান্নাটা সেরে দিয়ে যাও।’

স্বাগতর নির্দেশ পালন করতে সে এগল ভাঁড়ার ঘরের দিকে।

চত্বরেই এরপর বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্বাগতরা তিনজন কথাবার্তা বলল খুনের ঘটনা নিয়ে। তারপর নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়াল। বড্ড কড়া রোদে, তাদের আর চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হল না। নিজের ঘরে ঢোকার আগে স্বাগত হেরুমকে বলে এল সে যেন খাবার সকলের ঘরে পৌঁছে দেয়।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হেরুম তার কাজ সেরে ফেলল। স্বাগতর ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পর আর কোনও কাজ না থাকায় বাড়ি ফেরার পথ ধরল।

খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে স্বাগত নানা কথা ভাবতে লাগল। হোয়াঙের মৃত্যুর সঙ্গে কি এই মন্দিরের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে? তার মৃত্যু আর ফঙের মৃত্যু কি একসূত্রে গাঁথা? হেরুম বলেছিল ফঙ যেদিন মারা যায়, তার আগে সে সিয়েমরিপে হোয়াঙের সঙ্গে ফঙকে কথা বলতে দেখেছিল! হোয়াঙ কি সত্যি ব্যাঙ ধরতে এসেছিল, নাকি এসেছিল অন্য কোনও কারণে? প্রফেসরের সঙ্গে সত্যিই কি তার শুধু ডলার ভাঙাবার সম্পর্ক ছিল? নাকি প্রফেসর কিছু গোপন করছেন? প্রফেসর আজকের ঘটনার পর কী সিদ্ধান্ত নেবেন? তিনি কি এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবেন? — এ সব কথা ভেবে চলল স্বাগত। ভাবতে লাগল খামের যুবতীর কথাও। তার পরিচয় কী? কেন তার মধ্যে এত গোপনীয়তা, নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা?? —এ সব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ স্বাগত খেয়াল করল জানলার বাইরে পাথুরে চত্বরে কড়া রোদ যেন হঠাৎই নরম হয়ে আসতে শুরু করেছে! কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাগত বুঝতে পারল আকাশে আবার বর্ষার মেঘ জমতে শুরু করেছে।

স্বাগতর অনুমানই ঠিক হল। বিকেল হওয়ার আগেই বাইরে যেন সন্ধ্যা নেমে এল। তারপর শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। স্বাগতর আর ঘরের বাইরে বেরনো হল না। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল এক সময়। কিন্তু বৃষ্টির বিরাম নেই। সন্ধ্যার কিছু পরে রামমূর্তি স্যরের ফোন এল। তিনি বললেন, ‘বৃষ্টির যা অবস্থা তাতে রাতে জলে ভিজে রান্না করার প্রয়োজন নেই। শুকনো খাবার খেয়ে রাতটা কাটিয়ে দিও। ব্যাপারটা অন্যদের জানিয়ে দাও।’

স্বাগত বলল, ‘জানিয়ে দিচ্ছি। আমরা এখানে থাকব কি না সে ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিলেন?’

রামমূর্তি স্যর জবাব দিলেন, ‘আশা করছি কালকের মধ্যেই সে ব্যাপারে তোমাদের জানিয়ে দেব।’ এ কথাটা বলে স্বাগতকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কোন কল কেটে দিলেন রামমূর্তি স্যর। স্বাগত অন্য দুই ঘরে থাকা বিক্রম আর সুরভীর মোবাইল ফোনে কথাটা জানিয়ে দিল।

স্বাগতর ঘরের বাতির জোর কমে এসেছে। হয়তো বা অন্য ঘরের আলো- পাখার অবস্থাও তাই। রামমূর্তি স্যর যদি এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে সিয়েমরিপ গিয়ে ব্যাটারিতে চার্জ দিয়ে আনতে হবে। রাত আটটা নাগাদ এক প্যাকেট বিস্কুট আর জল দিয়ে রাতের খাওয়া শেষ করে স্বাগত শুয়ে পড়ল। আবার নানান প্রশ্ন ভিড় করতে লাগল তার মনের মধ্যে। বাইরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। সময় এগিয়ে চলল। স্বাগত ভাবতে লাগল খামের যুবতীর কথা। সে তাকে তার কাহিনি শোনাবার জন্য এত উদগ্রীব ছিল কেন? আর কেনই বা কাহিনির শেষ অংশ তাকে সে শুনিয়ে যেতে পারল না? তার কীসের এত ভয়? কাকে এত ভয়? যে কারণে সে সব সময় নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চায়? এ সব কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় স্বাগত ঘুমিয়ে গেল।

স্বাগত একটা স্বপ্ন দেখছিল। সে দাঁড়িয়ে আছে বিষ্ণুলোকের সামনে পরিখার পাশে। বেলাশেষের আলোতে ঝলমল করছে বিষ্ণুলোকের চূড়াগুলো। চারপাশে অগণিত জনতার ভিড় আর কোলাহল। বিষ্ণুলোকের প্রবেশ তোরণ সাজানো হয়েছে ফুল মালা দিয়ে। আর সামনে নির্মাণ করা হয়েছে কাঠের তৈরি এক মঞ্চ। রংবেরঙের নিশান উড়ছে সেখানে। স্বাগতর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নর-নারীদের পরনেও নতুন পোশাক। মাঝে মাঝে জনতার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে দেখা মিলছে সৈনিকদের। তাদের শিরস্ত্রানগুলোও ঘষেমেজে ঝকঝকে করে তোলা হয়েছে। তাদের পোশাক, বর্মও সব ঝকমক করছে। চারপাশের অগণিত নর-নারীর মধ্যে স্বাগতর চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে একজনকে। সেই খামের যুবতীর আজ এই উৎসবস্থলে তার কাছে আসার কথা। স্বাগতর চোখ তাকেই খুঁজছে। ক্রমশ জন সমাগম বাড়ছে। কিন্তু তার দেখা নেই! সময় এগিয়ে চলেছে। ক্রমশ স্বাগতর মনে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সূর্য ঢলতে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের আড়ালে। একসময় বাদ্যযন্ত্রর শব্দ ভেসে আসতে লাগল মন্দিরের ভিতর থেকে। তা শুনে জনতা উল্লাসধ্বনি করে উঠল, ‘মহারাজ বাইরে আসছেন! মহারাজ দর্শন দেবেন’ বলে! স্বাগত তার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল একবার তোরণের দিকে, আর একবার তার চারপাশের ভিড়ের দিকে। বাদ্যযন্ত্রর শব্দ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠল। সভাসদ, ব্রাহ্মণ পুরোহিত পরিবৃত হয়ে মহারাজ তোরণের বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর রাজচ্ছত্র দেখার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের কোলাহল তীব্র হয়ে উঠল। স্বাগতও দেখতে পেল সেই সোনার তৈরি বিশাল রাজচ্ছত্র। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে সে তার সবটুকু কিরণ যেন ঢেলে দিয়েছে তার ওপর। দীর্ঘ দণ্ডর মাথায় শোভিত সেই রাজছত্র ধীরে ধীরে এগচ্ছে মঞ্চর দিকে। ওই মঞ্চে উঠেই মহারাজ দর্শন দেবেন প্রতীক্ষারত প্রজা ও অতিথি অভ্যাগতদের। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই স্বাগত দেখতে পেল সেই খামের যুবতীকে। তার কিছুটা তফাত দিয়ে ভিড় ঠেলে সে অন্যদের মতোই সামনের দিকে এগবার চেষ্টা করছে। স্বাগত আর উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, ‘এই তো আমি এখানে।’ কিন্তু স্বাগতর কণ্ঠস্বর অগণিত জনতার উল্লাসধ্বনি আর বাদ্যযন্ত্রর শব্দে হারিয়ে গেল। স্বাগতর ডাক যেন সে শুনতেই পেল না। স্বাগত এরপর তার পশ্চাদ্ধাবনের চেষ্টা করল। কিন্তু মহারাজকে দর্শন করতে আসা উন্মত্ত, উদ্বেলিত প্রজাদের ভিড় আর ধাক্কাধাক্কিতে খামের যুবতীর কাছে পৌঁছতে পারল না স্বাগত। জনতার ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল খামের যুবতী। তবুও স্বাগত চেষ্টা করে যেতে লাগল যেদিকে যুবতী গিয়েছে অর্থাৎ মঞ্চর দিকে এগুবার জন্য। সোপানশ্রেণি বেয়ে মঞ্চে উঠছেন মহারাজ। স্বাগত একবার দেখল সেই দৃশ্য। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের নামে জয়ধ্বনিতে আকাশ বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। কিন্তু মঞ্চর দিকে তাকাবার অবকাশ নেই স্বাগতর। সে খুঁজছে সেই খামের যুবতীকে। আর এরপরই হঠাৎ যেন মুহূর্তর জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল জনতা, আর তারপরই চারপাশে উৎসবে মুখরিত জনতার আনন্দধ্বনি যেন পাল্টে গেল। আতঙ্কিত স্বর ভেসে উঠল চারপাশে। যে জনতা মঞ্চর দিকে এগবার চেষ্টা করছিল তারাই উল্টো মুখে পালাবার চেষ্টা করতে লাগল। ঘটনাটা কী হল তা বুঝে ওঠার আগেই পলায়মান জনতার ধাক্কা খেয়ে স্বাগত পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ যেন দ্রুত আলো মুছে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করল বিষ্ণুলোকে। চারপাশে এরপর নেমে এল জমাট বাঁধা অন্ধকার। শুধু তার কানে আসতে লাগল জনতার আতঙ্কিত চিৎকার। কয়েকজন তাকে পদদলিত করে গেল। পদপৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য স্বাগত উঠে দাঁড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। দমবন্ধ হয়ে আসছে তার! এরপরই স্বাগতর ঘুম ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল স্বপ্ন দেখছিল। তার শরীর ঘেমে গিয়েছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ বেশ খানিকটা কম, তার পরিবর্তে ভেসে আসছে অসংখ্য ব্যাঙের কলরব। তা অনেকটা যেন স্বপ্নের মধ্যে শোনা 
জনকোলাহলের মতোই।

জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে শুলো স্বাগত। সে দেখল বাইরে বৃষ্টি পুরোপুরি না থামলেও মেঘ অনেকটাই সরে গিয়েছে। কারণ, আবছা চাঁদের আলো এসে পড়ছে চত্বরে। গলাটা শুকিয়ে গেছে স্বাগতর। হয়তো বা স্বপ্নটা দেখার জন্যই। স্বাগত বিছানা থেকে নেমে বোতল থেকে জল পান করে আবার শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় জানলার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল। একটা ছায়ামূর্তি যেন এসে দাঁড়িয়েছে জানলার পাশে! আবছা একটা ছায়া পড়েছে জানলার কপাটে। ছায়াটা দুলছে। কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মুহূর্তর মধ্যে স্বাগত নিশ্চিত হওয়ার পর বলে উঠল, ‘কে? কে ওখানে?’

প্রথমে কোনও জবাব মিলল না। স্বাগত কাছেই টেবিল থেকে টর্চটা উঠিয়ে নিল বাইরে আলো ফেলার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে জানলার বাইরে থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল — ‘আলো জ্বালিও না। আমি এসেছি।’

নারী কণ্ঠ স্বর। যে স্বর স্বাগতর পরিচিত। বৃষ্টি ভেজা বাতাসে একটা পরিচিত সুগন্ধও এসে লাগল তার নাকে। জানলার সামনে আত্মপ্রকাশ করল এক নারী। স্বাগতও দু’পা এগিয়ে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বর্ষণসিক সেই নারীকে চিনতে ভুল হল না স্বাগত। সেই খামের যুবতী উপস্থিত হয়েছে তার জানলার ওপাশে। প্রাথমিক বিস্ময়েরর ঘোর কাটিয়ে উঠে স্বাগত তার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি এখানে এসেছ!’

চাপা স্বরে সেই নারী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এনেছি। আমার গল্পের শেষ অংশটা তোমাকে শোনাবার একটা শেষ চেষ্টা করতে।’

স্বাগত বুঝে উঠতে পারল না, এত রাতে এই নারীকে তার ঘরে আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে কি না? তবে খামের যুবতী তার সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে বলল, ‘না, আমি ঘরে প্রবেশ করব না। তাতে দু’জনেরই বিপদ হতে পারে। আমি এখানে দাঁড়িয়েই আমার কাহিনি দ্রুত শেষ করে চলে যাব। আগামী কাল পূর্ণিমা। তার আগেই আমার গল্পের শেষ অংশটা শুনতে হবে তোমাকে।’

স্বাগত বলল, ‘জানো, আমি একটু আগে তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখছিলাম।’

স্বাগত কী স্বপ্ন দেখছিল জানতে চাইল না খানের যুবতী। জল ঝরছে তার শরীর বেয়ে, বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ ভিজে চলেছে তার। চাঁদের আলোতে যুবতীর মুখমণ্ডলে যেন একটা উৎকণ্ঠা-উত্তেজনার ভাব ফুটে আছে। সে বলল, ‘এবার গল্পর শেষটা বলি তোমাকে। সেটা শোনার পর তুমি হয়তো রক্ষা করতে পারবে বিষ্ণুলোককে।’

এ কথা শুনে স্বাগত জানতে চাইল, “বিষ্ণুলোককে রক্ষা করতে পারব মানে? কীসের থেকে রক্ষা?”

তার এ প্রশ্নর জবাব না দিয়ে একবার চত্বরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তার কাহিনিতে চলে গেল খামের যুবতী। বলতে শুরু করল, “হ্যাঁ, উগ্রদেবের প্রাসাদের ভিতরেই রইল চম্পা। প্রতি মুহূর্তে তার মনের মধ্যে উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। উৎসবের দিন তো এসেই গেল। এই প্রাসাদ থেকে মুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট স্থানে সে বহ্নির সঙ্গে মিলিত হতে পারবে কি? পালিয়ে যেতে পারবে কি দূর দেশে তার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার জন্য? একই সঙ্গে কালচক্রসহ অন্য চামেরা এসে উগ্রদেবের প্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করেছে কেন সে ব্যাপারেও শঙ্কার সৃষ্টি হল চম্পার মনে। তাদের নৃত্য প্রদর্শন করে নিজ কক্ষে ফিরে আসার পর এসব কথা ভাবতে ভাবতে সারা রাত প্রায় জেগেই কাটিয়ে দিল চম্পা।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর বেশ খানিকক্ষণ বাদে খাদ্য দিতে আসা ভৃত্যর করাঘাতে ঘুম ভাঙল চম্পার। খাদ্য দিয়ে চলে গেল লোকটা। মাঝে আজ আর কাল দুটো দিন। সে কি পারবে এ প্রাসাদ থেকে মুক্ত হতে? একই কথা ভাবতে লাগল চম্পা। সকাল গড়িয়ে দুপুর হল, তারপর বিকাল।

বিকাল হতেই চম্পার মন বহ্নির জন্য ছটফট করতে লাগল। আজও হয়তো বহ্নি আসবে তাকে একঝলক দেখার জন্য। কিন্তু চম্পার দেখা সে পাবে না। বিকাল হতেই একজন রক্ষী এসে চম্পাকে ফুল দিয়ে বলে গেল সন্ধ্যার পর সে তাকে নাচঘরে অতিথিদের কাছে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য নিয়ে যাবে।

সে চলে যাওয়ার পর নিজের বিহ্বলতা কাটিয়ে মনকে শক্ত করল চম্পা। সে বুঝতে পারল এ দুটো দিন তার মন শক্ত রাখা জরুরি। যাতে কোনও কারণে তার প্রতি কারও মনে কোনও সন্দেহ না হয়। ঠান্ডা মাথায় তাকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ফুলমালা, চন্দনে নিজেকে সজ্জিত করে তুলল চম্পা, পায়ে বেঁধে নিল ঘুঙুরের ছড়া। সন্ধ্যা নামার পর রক্ষী এসে তাকে নিয়ে গেল অতিথিদের প্রমোদ কক্ষে।

আগের দিনের মতোই মশালের উজ্জ্বল আলোতে আলোকিত কক্ষ। মদিরার পাত্র হাতে উপস্থিত দাসীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কক্ষে প্রবেশ করল চামেরা। তবে তাদের সঙ্গে গৃহস্বামী উগ্রদেব নেই। তাঁর আগমণের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল চম্পা। কিন্তু কালচক্র তার উদ্দেশে বলল, ‘তুই নাচ শুরু কর।’ অগত্যা চম্পা তার নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল। মদিরা পান করতে করতে তার নৃত্য উপভোগ করতে লাগল চামেরা। রাত বেড়ে চলল। মদিরার নেশায় মাঝে মাঝে অসংলগ্ন কথাও বলতে শুরু করল চামেরা। তখন প্রায় মধ্যরাত। নৃত্য প্রদর্শন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে চম্পা। ঠিক এমন সময় হঠাৎই বাদ্যকাররা বাজনা থামিয়ে দিল। নৃত্যরত অবস্থাতেই চম্পা দেখল মখমলের পর্দা সরিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন উগ্রদেব। চম্পাও থেমে গেল। উগ্রদেব এসে দাঁড়ালেন চামেদের সামনে। তারপর তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘বিষ্ণুলোকে উৎসবের আয়োজনের তদারকি করতে আমাকে সারাদিন সে স্থানেই থাকতে হয়েছে। এই মাত্র প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। আশা করি আমার অনুপস্থিতিতে আপনাদের আমোদের কোনও ত্রুটি হয়নি?’

সবাই ঘাড় নেড়ে বলল —’একদমই নয়।’

এরপরই একজন নেশাগ্রস্ত চাম উগ্রদেবের উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজ, আপনি এবার আসন গ্রহণ করুন।’

তাঁকে মহারাজ, বলে সম্বোধন করায় মুহূর্তর জন্য যেন একটা অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল উগ্রদেবের চোখে-মুখে।

ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালেন তিনি। তারপর হাতের ইশারায় তাঁর অতিথিরা ছাড়া অন্য যারা ছিল তাঁদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। তা দেখে চম্পার মনে হল উগ্রদেব সম্ভবত কিছু আলোচনা করবেন চামেদের সঙ্গে। নিজ কক্ষে ফিরে এল চম্পা। ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন যথা নিয়মে ভোরের আলো ফুটল। এই একটা দিন এ প্রাসাদে কাটিয়ে যেভাবেই হোক চম্পাকে পরদিন প্রাসাদ ত্যাগ করতে হবে। সকাল-দুপুর নিজ কক্ষেই রইল চম্পা। বিকাল হওয়ার কিছু আগে করাঘাতের শব্দ শুনে সে ভাবল তার জন্য হয়তো ফুলমালা নিয়ে কেউ এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে সে দেখতে পেল প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গা এসে উপস্থিত হয়েছে। খড়্গ চম্পাকে বলল, ‘প্রভু উগ্রদেব ও তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরেরা কেউ প্রাসাদে নেই। তারা বিষ্ণুলোকে উৎসবের আয়োজনে গিয়েছে। সেই সুযোগে আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলাম। কাল তো আষাঢ় পূর্ণিমা। মহারাজের জন্মোৎসব পালিত হবে।’

খড়্গাকে দেখে চম্পার মনের ভিতরটা নেচে উঠল। সে বুঝতে পারল অর্থ লালসাই খড়্গাকে বিপদের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তার কাছে টেনে এনেছে। চম্পা খড়্গাকে বলল, ‘হ্যাঁ, কাল যেভাবেই হোক আমাকে কিছু সময়ের জন্য প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আমি যথাসম্ভব দ্রুত গিয়ে মুদ্রার থলি নিয়ে ফিরে এসে তোমার হাতে তুলে দেব।’

খড়্গা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি সে ব্যাপারেই তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।’ এরপর সে চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে চাপাস্বরে বলল, ‘শোনো নর্তকী। কাল মধ্যাহ্নে প্রভু উগ্রদেবও প্রাসাদ ত্যাগ করে বিষ্ণুলোকে উৎসবস্থলের উদ্দেশে রওনা দেবেন। তিনি তাঁর সৈনিক-রক্ষীদের সকলকে নির্দেশ দিয়েছেন উত্তম পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দ্বিপ্রহরের পর বিষ্ণুলোকে যাত্রা করার জন্য। বিকালবেলা এ প্রাসাদে সামান্য কয়েকজন রক্ষী-ভৃত্য ছাড়া অন্য কেউ থাকবে না। তুমি বিকালে প্রাসাদ ত্যাগ করে সূর্যাস্তের আগেই আবার ফিরে আসবে।’

চম্পা বলল, ‘কিন্তু তোরণের প্রহরী যদি আমাকে প্রাসাদের বাইরে বেরতে বাধা দেয়?’

খড়্গা বলল, ‘সেই দ্বাররক্ষী আমার বিশেষ ঘনিষ্ঠ। উৎকোচ প্রদান করে আমি তাকে বশ করব, সে তোমাকে আটকাবে না। এবার আমি যাই। কাল প্রধান তোরণে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে।’

চম্পা বলল, ‘আচ্ছা।’

খড়্গা আর সে স্থানে দাঁড়াল না। দ্রুত স্থান ত্যাগ করল প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার জন্য।