Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৫

পর্ব ৪৫

খামের যুবতী তাকে এনে দাঁড় করাল ঠিক সেই স্থানে যে স্থানে দেওয়ালের গায়ে এক শূন্যস্থান ঘিরে বৃত্তাকারে রচিত আছে শূদ্র ব্রাহ্মণদের মূর্তিগুলো। মুহূর্তের জন্য সে স্থানে এসে থমকে দাঁড়াল খামের যুবতী। তারপর পাশের এক কক্ষের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল, ‘যাও এবার তুমি ভিতরে প্রবেশ কর। তুমি পারবে সে স্থানে পৌঁছতে। যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে বিষ্ণুলোককে। থামাতে হবে তাকে।’

স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘কাকে?’

যুবতী বলল, ‘সেখানে গেলেই তুমি সব দেখতে পাবে। আর বিলম্ব কর না। তার কাজ হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তার আগেই তোমাকে বন্ধ করতে হবে, পণ্ড করতে হবে তার কাজ।’

স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘তুমি যাবে না?’

যুবতী জবাব দিল, ‘আমি তোমার পিছনেই আছি।’

স্বাগত তাকাল অন্ধকার কক্ষের দিকে। তার মনের ভিতর থেকে আবারও কেউ যেন বলে উঠল, ‘প্রবেশ কর, প্রবেশ কর।’

হয়তো সেই নির্দেশ আর খামের যুবতীর কথার মধ্যে যে প্রবল রহস্যর হাতছানি লুকিয়ে আছে তা অনুসন্ধান করার জন্যই স্বাগত প্রবেশ করল সেই কক্ষে। এ কক্ষগুলোতেও তারা অনুসন্ধান চালিয়েছিল তাই কতকগুলো কক্ষ তার চেনা। অন্ধকার হাতড়ে সে সেই পরিচিত অন্ধকারের মধ্যেই আগুয়ান। যুবতী তাকে অনুসরণ করছে কি না স্বাগত তা বুঝতে পারল না। কারণ তার পায়ের কোনও শব্দ নেই। পরিচিত কক্ষগুলো পেরিয়ে এসে এই কক্ষে সে থামল। সে কক্ষ থেকে বাইরে বেরবার কোনও রাস্তা নেই। ছাদের ফাটল গলে মৃদু চাঁদের আলো এসে পড়েছে একদিকের দেওয়ালের গায়ে। প্রফেসর আর তার সঙ্গীদের সঙ্গে একবার এ কক্ষে এসেছিল স্বাগত। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু এবার সে কী করবে? অন্য দিকে তো যাওয়ার রাস্তা নেই। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বাগত। ঠিক সেই সময় পিছন থেকে খামের যুবতীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল… ‘থামলে কেন? পথ কীভাবে বের করতে হবে। তা তো তোমার জানা ভাস্কর!’

যুবতীর বলা ‘ভাস্কর’ শব্দ যেন অনুরণিত হতে লাগল স্বাগতর কানে—ভাস্কর! ভাস্কর!

সূদুর কোন অতীত থেকে যেন ভেসে এল এই সম্বোধন! এ নামে কেউ যেন তাকে ডাকত! তার মস্তিষ্কে যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হল। কয়েক মুহূর্তর জন্য যেন ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঢেকে দিল তার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে, চোখের পাতা মুদে এল। যুবতীর কণ্ঠ আবার তার কানে এল, ‘চোখ মেল ভাস্কর, চোখ মেল। পথ তো তোমার চেনা।’

চোখ মেলল স্বাগত। তার মনে হল বহু যুগ পর ঘুম ভেঙে সে যেন জেগে উঠল। আর তারপরই স্বাগতর মনে হল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ কক্ষ তো তার চেনা! এ কক্ষ থেকে কোথায় কীভাবে যেতে হবে তাও তার জানা! ওই তো দেওয়ালের গায়ে সেই জায়গাটা! স্বাগত এগিয়ে গেল দেওয়ালের কাছে। তারপর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে দেওয়ালের একস্থানে চাপ দিল। মৃদু শব্দ করে উন্মুক্ত হয়ে গেল দেওয়ালের একটা অংশ। স্বাগত প্রবেশ করল সেই গহ্বরের ভিতর। সংকীর্ণ সোপান শ্রেণি তার ভিতরে। ঠিক দেখা তার স্বপ্নের মতোই, নাকি শুধু স্বপ্নে দেখা নয়, কোন এক সুদূর অতীতে সত্যিই তার পদচিহ্ন পড়ে ছিল এ স্থানে? সিঁড়ি বেয়ে এগতে এগতে তেমনই মনে হতে লাগল স্বাগতর। যেন এ পথের প্রতিটা ধাপ, প্রতিটা বাঁক তার চেনা। অন্ধকারের মধ্যেও সে পেরিয়ে চলতে লাগল সেই গোলকধাঁধা। একের পর এক সোপান দিয়ে কখনও ওপরে উঠে, কখনও বা নীচে নেমে একসময় সে পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট স্থানে। যেখানে দেওয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যক্ষীমূর্তি। যার চোখে আঙুল বসালেই দেওয়াল সরে গিয়ে উন্মোচিত হয় কক্ষ। যেখানে রক্ষিত আছে সেই প্রাচীন কলসগুলো। কিন্তু স্বাগতকে সে কাজ আর করতে হল না। সে দেখল ইতিমধ্যেই দেওয়ালের সে স্থান উন্মুক্ত হয়ে আছে। ও পাশের কক্ষ থেকে আলো এসে পড়ছে এ পাশে। মৃদু কণ্ঠস্বরও যেন ভেসে আসছে কক্ষের ভিতর থেকে। অর্থাৎ যে কক্ষে ভাণ্ডগুলো রক্ষিত আছে সে স্থানে কেউ আছে! স্বাগত সন্তর্পণে এগল সেই কক্ষের দিকে।

কক্ষের প্রবেশমুখের দেওয়ালে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে স্বাগত উঁকি দিল ঘরে। ধাতব প্রদীপদণ্ডে বেশ বড় একটা মৃৎপ্রদীপ জ্বলছে। তার আলোতে সে কক্ষের বেশ খানিকটা অংশ আলোকিত। স্বাগত দেখতে পেল সেই বেদী। যার ওপর সাজানো আছে সেই প্রাচীন কলস বা ভাণ্ডগুলো। তবে তার মধ্য থেকে একটা ভাণ্ড মেঝেতে নামানো হয়েছে। তার মুখও উন্মোচিত হয়েছে। আর তার সামনে বসে আছে একজন লোক। তার পরনে প্রাচীন খামেদের মতো উজ্জ্বল পোশাক আর বিশেষ আকৃতির মস্তক বন্ধনী। তার সামনেই কলসটা আর কলাপাতায় সাজিয়ে রাখা নানান ধরনের উপচার পুজোর সামগ্রী। মৃদু স্বরে সে বিজাতীয় ভাষায় মন্ত্রোচারণ করে চলেছে লোকটা। স্বাগত দেখতে লাগল তাকে। কে ও? লোকটা কক্ষের প্রবেশপথের দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে। স্বাগত তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। লোকটা এরপর দু’হাতে একটা কলাপাতা তুলে নিল। তার মধ্যে রাখা আছে গোলাকৃতি একটা মণ্ড। মৃত মানুষের পিণ্ড দানের সময় চাল- যব তিল ইত্যাদি দিয়ে যেমন মণ্ড প্রস্তুত করা হয় ঠিক তেমনই দেখতে সেটা। লোকটা উন্মুক্ত প্রাচীন ভাণ্ডর মধ্যে সেটা মন্ত্রোচারণ করতে করতে ঢেলে দিল। তারপর সেই কলসটা ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকাল। স্বাগতর মনে হল ওই প্রাচীন কলসের মধ্যে কিছু একটা ছিল বা আছে। লোকটা ভাণ্ডটা ঝাঁকিয়ে ভিতরের সব কিছুকে একসঙ্গে মিশিয়ে দিল। তারপর এক হাতে কলসটা আর অন্য হাতে তার শরীরের আড়ালে থাকা একটা তীক্ষ্ণ ছুরি উঠিয়ে নিয়ে কার উদ্দেশে যেন বলল, ‘এবার তুমি এসো।’

এবার লোকটার কণ্ঠস্বর যেন চেনা মনে হল স্বাগতর। লোকটাও তার মুখটা একপাশে ফেরাল যাকে সে আহ্বান করল তার দিকে দেখার জন্য। স্বাগত তাকে চিনতে পেরে অবাক হয়ে গেল। এ যে কুলি সর্দার হেরুম! সে এসব কী করছে এই প্রাচীন কক্ষে? স্বাগতর কাছে অন্ধকারের মধ্যে থেকে সেই খামের যুবতীর চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আর দেরি কর না ভাস্কর। থামাও ওদের। ওই ভাণ্ড যেন ও এ কক্ষের বাইরে নিয়ে যেতে না পারে।’

এ কথা শুনতে শুনতেই স্বাগত দেখতে পেল হেরুমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল তাকে। এ যে নাতাশা! মৃদু মৃদু টলছে সে। হেরুম তার উদ্দেশে বলল, ‘এসো ভ্রামরী, এই নাও ছুরি। তোমার বুকের রক্ত দাও এ কলসে। তারপর আমি এ কলস নিয়ে বিষ্ণুলোকের পরিখার ধারে যাব। তিনি জেগে উঠবেন তারপর। আমরা দখল নেব এই মন্দির নগরী বিষ্ণুলোকের।’ ‘—এ কথা বলে সে ছুরিটা বাড়িয়ে দিল নাতাশার দিকে।

নাতাশা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। স্বাগতর তা দেখে মনে হল ছুরিটা নেওয়ার আগে মুহূর্তর জন্য যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। হেরুম তাকে সাহস দিয়ে বলল, ‘তোমার ভয় কী? এ শরীর তো তোমার নয় ভ্রামরী। এ শরীর তো অন্যের। এ শরীরের মৃত্যু ঘটলে তোমার ক্ষতি কী? তিনি জেগে উঠলে তুমি বিষ্ণুলোকে প্রবেশের সুযোগ পাবে। তোমার মতো আরও অনেকে হাজার বছর ধরে প্রতীক্ষা করে আছে আজকের রাতের জন্য। তাঁর জেগে ওঠার জন্য। ছুরিটা বুকে বসিয়ে দাও ভ্রামরী।

হেরুমের কথা শুনে নাতাশা অথবা ভ্রামরীর মনে দ্বন্দ্ব কেটে গেল। জড়ানো গলাতে সে বলল, ‘হ্যাঁ, দাও। তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন বিষ্ণুলোকের অধীশ্বর হওয়ার পর তিনি আমাকে বিবাহ করবেন। আমিই তো তাঁর কাছে সত্য উন্মোচন করেছিলাম।’ এই বলে সে হাত বাড়াল ছুরিটা নেওয়ার জন্য। ঠিক সেই সময় প্রদীপের আলোতে নাতাশার আঙুল ঝিলিক দিয়ে উঠল। স্বাগত দেখল নাতাশার আঙুলে পরা আছে সবুজ পাথর বসানো একটা সোনার আংটি। সাপের মতো দেখতে সেটা !

স্বাগতর পিছন থেকে খামের যুবতী এবার স্বাগতর উদ্দেশে বলে উঠল, ‘থামাও থামাও ভ্রামরীকে। আর দেরি কর না বহ্নি।’

নাতাশার হাতের ওই সর্পাঙ্গুরীয়, তার নাম হেরুম আর খামের যুবতীর ‘ভ্রামরী’ বলা, সর্বোপরি স্বাগতকে খামের যুবতীর এবার বহ্নি নামে সম্বোধন করা, এসব কিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে যেন স্বাগতকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সুদূর অতীতে। স্বাগতর মনে হল, হ্যাঁ, তার নাম তো বহ্নি। সে জানে কী রাখা আছে ওই কলসের মধ্যে। আর কী ঘটনাটাই না ঘটতে চলেছে। হ্যাঁ, তাকে আর জাগতে দেওয়া যাবে না। অঘটন ঘটার আগেই থামাতে হবে সবকিছু। মুহূর্তর মধ্যে স্বাগত ঢুকে পড়ল সেই কক্ষর ভিতর। নাতাশা কিংবা ভ্রামরী এখন হেরুমের হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নিজের বুকে সেটা বসিয়ে দেওয়া জন্য উদ্যত হচ্ছিল। স্বাগত হেরুমকে পিছন থেকে একধাক্কায় ঘরের দেওয়ালের গায়ে ছিটকে ফেলল। হেরুমের শরীরের আঘাতে, দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করানো একটা প্রাচীর অপ্সরার মূর্তি হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর উপুড় হয়ে পড়ল হেরুমের শরীরের ওপর। মূর্তির নীচে আটকে গেল গেল তার শরীর। এ কক্ষে স্বাগতর এমন আকস্মিক আবির্ভাব ঘটবে তা ঘরের ভিতর থাকা দু’জনেরই কেউ বুঝতে পারেনি। নিজের বুকে ছুরিটা বসাতে গিয়েও থমকে গেল নাতাশা। পাথরের ভারী মূর্তির তলায় চাপা পড়া হেরুম আর ছুরি হাতে ধরা নাতাশা মুহূর্তর জন্য বিস্মিতভাবে চেয়ে রইল স্বাগতর দিকে। আর এরপরই স্বাগত যখন এগিয়ে গিয়ে নাতাশার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিতে যাচ্ছে তখন হেরুম নাতাশার উদ্দেশে বলল, ‘খুন কর, খুন কর ওকে, ছুরি বসিয়ে দাও ওর বুকে। ওকে মেরে ফেল ভ্রামরী।’

নাতাশা স্বাগতকে দেখে থমকে গিয়েছিল। কিন্তু হেরুমের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখমণ্ডলে এক পরিবর্তন শুরু হল। তার মুখমণ্ডলে কয়েক পলকের মধ্যেই জান্তব হিংস্রতা ফুটে উঠল। ছুরিটা বাগিয়ে ধরে সে স্বাগতর উদ্দেশে বলল, ‘নতুন দেহ ধারণ করলেও এবার আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমিই ভাস্কর বহ্নি। তুমিই আমাদের মৃত্যুর কারণ, তোমার জন্যই বিষ্ণুলোকে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমরা। এবার তার প্রতিশোধ নেব আমি।’ সাপের মতো হিসহিস কণ্ঠে কথাগুলো বলে নাতাশা ছুরি হাতে এগিয়ে আসতে লাগল স্বাগতর দিকে। এ কোনও কোমলস্বভাবা নাতাশা নয়, যে ভূতের নাম শুনলে ভয় পেত, এ যেন প্রতিশোধপরায়ণা কোনও পিশাচিনী, যে স্বাগতকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। নাতাশা এরপর ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করতে লাগল স্বাগতকে। সেই আঘাত থেকে বাঁচার জন্য

স্বাগত সরে সরে যেতে লাগল। বৃত্তাকারে তারা ঘুরতে লাগল কক্ষের মধ্যে। তার নিজের শরীরের ওপর থেকে পাথরের মুর্তিটা সরাবার চেষ্টা করতে করতে হেরুম বলে যেতে লাগল, ‘ভ্রামরী ওকে খুন কর, খুন কর। প্রতিশোধ নাও।’

কোথায় সেই নরমস্বভাবা নাতাশা, যে মৃত মানুষের দাঁত দেখে জ্ঞান হারিয়েছিল, উজ্জ্বল দিনের আলোতেও একমুহূর্ত সঙ্গী ছাড়া মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণেও থাকতে ভয় পেত, মন্দির ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য আকুতি জানিয়েছিল। আর রাত হলেই প্রবল আতঙ্ক ঘিরে ধরত তাকে! এ যেন এক হিংস্র উন্মাদিনী। ছুরি চালাচ্ছে নাতাশা অথবা ভ্রামরী। একবার তার ছুরির একটা আঘাত ছুঁয়ে গেল স্বাগতর শার্টের একটা অংশ। কাপড়ের টুকরো খসে পড়ল। এরপরই স্বাগতর মনে হতে লাগল সে যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। ঘুরতে ঘুরতে নাতাশা তারা গতি বাড়িয়ে চলেছে। বিদ্যুতের মতো সে আঘাত হানার চেষ্টা করছে স্বাগতকে। তার হাত থেকে স্বাগতর নিস্তার নেই। কোন এক জন্মর প্রতিশোধ সে নেবেই। ওদিকে হেরুমও তার শরীরের ওপর থেকে পাথরের মূর্তিটা প্রায় সরিয়ে ফেলেছে। মেঝেতে বিছানো কলাপাতার ওপর যে উপচারগুলো দিয়ে হেরুম একটু আগে তার পূজা-অর্চনার কাজ সম্পন্ন করল তেমনই এক কলাপাতায় রাখা ঘৃতর ওপর হঠাৎ পা পড়ল স্বাগতর। পা পিছলে সে মাটিতে পড়ে গেল। তা দেখে অট্টহাস্য করে উঠল নাতাশা। তার এমন পৈশাচিক হাসি আর উল্লাস আগে কোনওদিন দেখেনি স্বাগত। উদ্যত ছুরি হাতে সে এগিয়ে আসতে লাগল মাটিতে পড়ে থাকা স্বাগতর বুকে সেটা বিধিয়ে দেওয়ার জন্য। আর এরপরই এক ঘটনা ঘটল। হঠাৎ সেই কক্ষে প্রবেশ করল সেই বড় বাঁদরীটা! যেটা একাকী ঘুরে বেড়ায় এই প্রাচীন মন্দিরে। ঘরে ঢুকেই যে পিছন থেকে লাফ দিল নাতাশার ওপর। আচম্বিতে এই ঘটনায় নাতাশার হাত থেকে ছুরিটা খসে ছিটকে পড়ল হেরুম যেখানে পাথরের মূর্তির তলা থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে যেখানে। ঝটাপটি শুরু হল বাঁদরী আর নাতাশার মধ্যে। নাতাশা একঝটকায় বাঁদরীটাকে নিজের শরীর থেকে খানিকটা তফাতে সরিয়ে দিল। কিন্তু পরক্ষণেই বাঁদরীটা ক্ষিপ্র গতিতে নাতাশার কাছে এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় কষিয়ে দিল নাতাশার গালে। আর সে আঘাত সহ্য করতে না পেরে নাতাশা ছিটকে পড়ল প্রদীপদণ্ডর ওপর। প্রদীপ সমেত দণ্ডটা মাটিতে পড়ে গেল। নিভে গেল প্রদীপ। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। এরপর ঝটাপটির শব্দ শুরু হল ঘরে। বাঁদরীটা আর নাতাশার মধ্যে ঝটাপটি শুরু হয়েছে ঘরের মধ্যে। স্বাগত কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎই ঝটাপটির শব্দ থেমে গেল। তার পরিবর্তে অন্য একটা শব্দ কানে এল, কেউ যেন ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে। আর এরপরই ঘরের ভিতর থেকে খামের যুবতীর কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘শয়তানটা কলস নিয়ে পালাচ্ছে, পালাতে দিও না। ওকে ধর।”

খামের যুবতীর কণ্ঠস্বর শুনে স্বাগত বিহ্বলতা কাটিয়ে তার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কোথায়? মেয়েটা আর বাঁদরীটাই বা কোথায়?’

প্রত্যুত্তরে খামের যুবতী বলল, ‘মেয়েটাকে আমি বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। ওকে নিয়ে ভেব না। তুমি যাও, ধর ওকে। যেভাবেই হোক কলসটা ছিনিয়ে নাও। নইলে সর্বনাশ হবে। যাও যাও ভাস্কর।’

স্বাগত এরপর আর দেরি করল না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এগল যেদিকে অস্পষ্ট পদচিহ্ন ছুটে চলেছে। এক সময় সেও ছুটতে ছুটতে হেরুমকে দেখতে পেল। কোনও এক ফাটল বেয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে সেখানে। সে দেখল হেরুম ভাণ্ডটা বুকে আগলে এগচ্ছে। তার অন্য হাতেও কী একটা জিনিস ঝিলিক দিয়ে উঠল। তা দেখে স্বাগত বুঝতে পারল শুধু ভাণ্ডটা নয়, ঘর ছেড়ে বেরবার আগে ছুরিটাও সে তুলে নিয়েছে। স্বাগত বুঝতে পারল যে তাকে বাধা দিতে গেলে হেরুম ছুরি বসিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না। স্বাগত তার চলার গতি শ্লথ করল যাতে তার পদশব্দ টের না পায় হেরুম। সে ভেবে নিল নিঃশব্দে তার কাছে গিয়ে পিছন থেকে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুরিটা তার হাত থেকে কেড়ে নিতে হবে। সেই মতোই স্বাগত অন্ধকারে নিজেকে ডুবিয়ে সন্তর্পণে এগল হেরুম যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে। কয়েকটা সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার পর একটা বাঁকের মুখে হেরুম অদৃশ্য হয়ে গেল। স্বাগত সেই বাঁকের মুখে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ওপাশে তাকে মারার জন্য হেরুম দাঁড়িয়ে নেই তো? যে হেরুমের পদশব্দ শোনার চেষ্টা করল, সে দাঁড়িয়ে পড়েছে নাকি এগচ্ছে তা বোঝার জন্য। ঠিক তখনই স্বাগতর একটা কণ্ঠস্বর কানে এল—“আপনার কাজ মিটে গিয়েছে? ওদিকে ওদের হুঁশ ফিরে এসেছে।”

প্রত্যুত্তরে হেরুম বলল, না কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। মেয়েটা বুকে ছুরি বসাবার আগেই বাঁদরীটা আর যার দরজায় তোমরা হুড়কো তুলে দিয়েছিলে সে কীভাবে যেন ঢুকে পড়ল ঘরে! কলসে রক্ত নেওয়া হয়নি।’

কথাটা শুনে প্রথমজন বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘লোকটা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ওই কক্ষে গেল কীভাবে রাজকুমার? এখন কী হবে? রক্ত কোথায় পাওয়া যাবে? হাতে তো সময় বেশি নেই!’

স্বাগত কথাটা শুনে ভাবল ‘রাজকুমার আবার কে? তৃতীয় কোন ব্যক্তিও ওপাশে আছে নাকি। এরপর হেরুমের গলা শোনা গেল, “রক্ত পাওয়া যাবে। চিন্তা নেই, তুমিও বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করতে পারবে।”

হেরুমের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঁকের ওপাশ থেকে প্রথমজনের তীব্র আর্তনাদ কানে এল। কিছু একটা পতনের শব্দ হল! এর কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই স্বাগত বুঝতে পারল একটা পদশব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে ওপাশের জায়গা থেকে। ওপাশটা স্তব্ধ হওয়ার পর ওপাশে সাবধানে উঁকি দিল স্বাগত। ওপাশে একটা ছোট চাতাল মতো জায়গা আছে। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি উঠেছে, নেমেছে সে জায়গা থেকে। বাইরের ফাটল বেয়ে মৃদু চাঁদের আলো আসছে সেখানে। কে একজন পড়ে আছে চাতালের মাঝখানে। স্বাগত আড়াল থেকে বেরিয়ে লোকটার কাছে গিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়তেই চিনতে পারল লোকটাকে। সে কুমির খামারের মালিক বুল। তার বুকে বিদ্ধ হয়ে আছে হেরুমের ছুরিটা! রক্তের ফোয়ারা বেরচ্ছে তার বুক থেকে। দেহটা মৃদু কাঁপছে। স্বাগত তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে ছুরি আপনাকে বসাল?’

সে শুধু যন্ত্রণা কাতর স্বরে জবাব দিল, ‘রাজকুমার!’

বিস্মিত স্বাগত জিজ্ঞেস করল ‘কে রাজকুমার?’

কিন্তু বুল স্বাগতর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সুযোগ পেল না। কথা থেমে গেল তার। বুলের দেহটা একবার মোচড় দিয়ে উঠল। তারপর একদম স্থির হয়ে গেল। স্বাগত বুঝতে পারল ও দেহে আর প্রাণ নেই। স্বাগত সোজা হয়ে দাঁড়াল। হেরুনকে ধরতে হবে তাকে। হঠাৎই স্বাগত দেখতে পেল একটা ছায়ামূর্তিকে। যে সেই চত্বরেই উঠে আসছিল। কিন্তু সে দৃশ্যটা দেখেই আবার পিছু ফিরে নীচে নামতে শুরু করল। অন্ধকারে তাকে চিনতে না পারলেও স্বাগত অনুমান করল সে হেরুম নয়। কারণ হেরুম নিশ্চয়ই বাইরের দিকে যাওয়ার পথ ধরেছে। আর এই পথটি ওপরের দিকে। তাই যে অদৃশ্য হল তার পিছু ধাওয়া না করে হেরুম যে পথে এগিয়েছে বলে অনুমান, সে পথেই এগল। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ওঠানামা করে স্বাগত উঠে এল সে ঘরে যে ঘরের দেওয়ালের গায়ে নির্দিষ্ট স্থানে হাত চেপে সে উন্মুক্ত করেছিল মন্দিরের গোপন গোলকধাঁধা। সে ঘরে বেরিয়ে এসে আবার একবার থমকে দাঁড়াল সে। হেরুম ঘরগুলোর অন্ধকারে কোথাও লুকিয়ে নেই তো? ছুরি না থাকলেও সে পাথরের আঘাতে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে স্বাগতকে। আর এরপরই সে পিছনের গহ্বর থেকে পদশব্দ উঠে আসার শব্দ পেল। যে লোকটা হঠাৎ দেখা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে স্বাগতর পিছন পিছন ওপরে উঠে আসছে না তো? তবে ফাটলটা বন্ধ করে দেওয়ার উপায় নেই। বাঁদরীর কথাটা যদি ছেড়েও দেওয়া যায়, দেওয়ালটাকে আবার আগের জায়গাতে ফিরিয়ে আনলে ভিতরে আটকে পড়ে যাবে দুই নারী। তাই ওই কাজ না করে স্বাগত দেওয়ালের এক পাশে অন্ধকারে সরে দাঁড়াল। তবে সে লোক নয়, সিঁড়ি বেয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল খামের যুবতী আর নাতাশা অথবা ভ্রামরী। খামের কন্যা এরপর দেওয়ালের গায়ে চাপ দিয়ে ফোকড়টাকে আবার বন্ধ করে দিল। তারপর স্বাগতর উপস্থিতি টের পেয়ে তার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি এখানে কেন? কলস নিয়ে সে তো সম্ভবত বাইরে বেরিয়ে গেছে। ধরতে হবে তাকে।’

খামের যুবতীকে দেখতে পেয়ে স্বাগত তাদের নিয়ে এগল বাইরে বেরবার জন্য। এক সময় তারা যে স্থানে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সেখানে দেওয়ালের গায়ে একটা শূন্যস্থান ঘিরে রয়েছে শূদ্র ব্রাহ্মণদের মূর্তিগুলো। অলিন্দ বেয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে সে স্থানে। নাতাশা তখনও টলছে। তার হাত ধরে আছে খামের যুবতী। অলিন্দ বেয়ে সবাই মন্দির ত্যাগ করে বাইরে বেরবার জন্য এগতে যাচ্ছিল কিন্তু নাতাশারূপী ভ্রামরী একবার শেষ প্রতিরোধের চেষ্টা করল। খামের যুবতীর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়া চেষ্টা করতে করতে জড়ানো গলায় সে বলতে লাগল, ‘আমাকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস তোরা? আমি তোদের খুন করব।’

খামের সুন্দরী এরপর সজোরে চপেটাঘাত করল নাতাশার গালে। তারপর তার আঙুল থেকে একটানে সেই সর্বাঙ্গুরীয়টা খুলে ফেলে অলিন্দর বাইরে নীচে ছুঁড়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল নাতাশা। তারপর মাটিতে পড়ে গেল। স্বাগত এগতে যাচ্ছিল নাতাশার দিকে, কিন্তু খামের যুবতী স্বাগতকে বলল, ‘ভাস্কর তুমি সময় নষ্ট কর না। মেয়েটা মূর্ছিত হয়ে পড়েছে। জ্ঞান ফিরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি যাও, রক্ত যখন পেয়েছে এখন নিশ্চয়ই সে পিছনের দরজা দিয়ে বিষ্ণুলোকের দিকেই যাচ্ছে। তুমি যাও তাকে আটকাও। কলসটা সে যেন পরিখায় না ফেলতে পারে। যাও বহ্নি যাও।’

‘বহ্নি’ নামটা যেন স্বাগতর মধ্যে আবারও কাউকে জাগিয়ে তুলল। সে ছুটল হেরুমকে ধরার জন্য। নীচে নেমে এল স্বাগত। আবারও তার সব কিছু চেনা মনে হতে লাগল। পিছনে বেরবার রাস্তাটা তারা মন্দিরের ভিতর দিক থেকে এর আগে কোনও দিন খুঁজে পায়নি। মন্দিরের পিছনে গিয়ে সেদিকে যে মন্দিরে প্রবেশের একটা পথ ছিল স্বাগত সেটা একবার বাইরে থেকে দেখেছিল মাত্র। কিন্তু এবার মন্দিরের ভিতর থেকে সে পথে যাওয়ার রাস্তা অসুবিধা হল না স্বাগতর। নির্দিষ্ট একটা কক্ষে পৌঁছে দেওয়ালের একটা অংশে চাপ দিতেই খুলে গেল বাইরে যাওয়ার রাস্তা। যে পথ ধরে একটু এগিয়েই সে ফাটল গলে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। তারপর আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে ভেজা পথ ধরে ছুটল বিষ্ণুলোকের দিকে। দূর থেকে সে দেখতে পেল চাঁদের আলোতে বিষ্ণুলোকের মাথার ওপর ওড়াউড়ি করছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড়ের দল। তারা কি কোনও কিছুর প্রতীক্ষা করছে? অশুভ কোনও কিছুর? যেভাবেই হোক বিষ্ণুলোকের পরিখার কাছে পৌঁছবার আগে ধরতে হবে হেরুমকে। ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল স্বাগত। ভেজা পথে কয়েকবার পিছলে পড়ল সে, তারপর আবার ছুটতে লাগল। একসময় সে দেখতে পেল হেরুমকে। মাথায় এক হাতে কলসটা নিয়ে সেও ছুটে চলেছে। বিষ্ণুলোকের অনেকটাই কাছে তখন সে পৌঁছে গিয়েছে। তাকে ধরার জন্য আরও গতি বাড়াল স্বাগত। বিষ্ণুলোকের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেল তারা। চাঁদের আলোতে পরিখার জল চিকচিক করছে। সেদিকে ছুটছে হেরুম। ছুটতে ছুটতে হেরুম একসময় পৌঁছে গেল বিষ্ণুলোকে যাওয়ার জন্য যে সাঁকো আছে তার কাছে পরিখার পাড়ে। ঠিক তখনই যেন কোনও অজানা আতঙ্কে হঠাৎই বনভূমির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ভয়ার্ত কন্ঠে একসঙ্গে ডেকে উঠল পাখির দল। আরও একটা ব্যাপার ছুটতে ছুটতে স্বাগতর মনে হল। যেন ঝড় বইতে শুরু করেছে বনের ভিতর। কারা যেন হাজার বছরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে জেগে উঠে বনের ভিতর থেকে বিষ্ণুলোকের দিকে এগিয়ে আসছে হয়তো বা বিষ্ণুলোকে প্রবেশের আশায়। তারাই ঝড় তুলেছে জঙ্গলে।

তবু সেসব কিছুকে উপেক্ষা করে স্বাগত তিরের মতো ছুটল হেরুমের দিকে। পরিখার কিনারে দাঁড়িয়ে হেরুম। পরিখার জলে কলসটা অথবা কলসের ভিতরের বস্তুগুলো নিবেদন করার আগে কাদের যেন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে আহ্বান জানাচ্ছে! তার কাছে পৌঁছতেই হেরুমের মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ কানে এল স্বাগতর। হেরুন এরপর ঠিক যখন কলসটা মাথার ওপরে আরও তুলে ধরে কলসের ভিতরের বস্তুগুলো অথবা কলসসুদ্ধ সেগুলোকে পরিখার জলে ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাগত তার কাছে উপস্থিত হয়ে পিছন থেকে হেরুমের মাথার ওপর ধরা কলসটা ধরে টান দিল। কলসটা। জলে না পড়ে ছিটকে পড়ল কিছুটা দূরে মাটিতে। হেরুম ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনেই স্বাগতকে দেখল ঠিকই, কিন্তু সে স্বাগতকে প্রথমে আক্রমণ না করে এগল মাটিতে পড়ে থাকা কলসটার দিকে। এই মুহূর্তে তার একমাত্র লক্ষ্য যেন সময় নষ্ট না করে রক্তমাখা কলসের ভিতরের বস্তুগুলোকে পরিখার জলে নিক্ষেপ করা। হেরুম যখন ঝুঁকে পড়ে আবার কলসটা উঠিয়ে নিতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই স্বাগত ঝাঁপ দিল হেরুমের ওপর। দু’জনেই মাটিতে পড়ে গেল। হেরুম সে অবস্থাতেই চেষ্টা করতে লাগল কোনওভাবে যদি হাত বাড়িয়ে কলসটা ধরে পরিখাতে ছুঁড়ে ফেলা যায় সে জন্য। আর স্বাগত চেষ্টা করতে লাগল হেরুমের হাত যেন কিছুতেই কলসের কাছাকাছি না পৌঁছয় সে জন্য। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই ঝটাপটি শুরু হল তাদের মধ্যে। তার সঙ্গে মাটিতে লড়তে লড়তে স্বাগতর খেয়ালই রইল না তার পিছনেই পরিখার ঢাল। একসময় স্বাগত হেরুমকে জাপটে ধরে পাক খেল তাকে কলস থেকে দূরে সরাবার জন্য। কিন্তু তারপর তারা দু’জনে কেউই নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না। জড়াজড়ি করে তারা দু’জনে পিচ্ছিল পরিখার ঢাল বেয়ে জলে ছিটকে পড়ল!

জলের মধ্যেও শুরু হল দু’জনের মধ্যে প্রবল ধস্তাধস্তি। হেরুম পাড়ে উঠতে চাইছে কলসটা নেওয়ার জন্য। কিন্তু স্বাগত কিছুতেই তাকে ছাড়ছে না। স্বাগতর হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হেরুম একটা শেষ চেষ্টা করল। ধস্তাধস্তি করতে করতে হঠাৎই সুযোগ বুঝে তার কঠিন হাত দুটো দিয়ে চেপে ধরল স্বাগতর গলা, তারপর বলে উঠল, ‘এবার তোকে আমি শেষ করব। এই জল ছেড়ে তোর আর কোনও দিন ওঠা হবে না। স্বাগত দু’হাত দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল হেরুমের হাত দুটো গলা থেকে ছাড়াবার। কিন্তু স্বাগত কিছুতেই সেটা পারল না। সে দেখল হেরুমের মুখে চাঁদের আলোতে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে। আর এরপর হেরুম গলা চেপে ধরা অবস্থায় স্বাগতর মাথাটা জলের ভিতর ঠেসে ধরল।

দম বন্ধ হয়ে আসছে স্বাগতর। সে কিছুতেই জলের ওপর মাথা ওঠাতে পারছে না। বাতাসের অভাবে আর গলাতে বজ্রকঠিন চাপে তার শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে আসতে লাগল। কিন্তু এরপরই হঠাৎ হেরুম তাঁর গলাটা ছেড়ে দিল। জলের ভিতর তলিয়ে যেতে যেতেও শেষ পর্যন্ত স্বাগত মাথা তুলল জলের ওপর। তার ধাতস্থ হতে কয়েক মুহূৰ্ত সময় লাগল। তারপরই সে দেখল হেরুম পরিখার পাড় বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু শ্যাওলামাখা পাথর বাঁধানো পরিখার ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে সে আবার জলে পড়ে গেল। দ্বিতীয়বারও চেষ্টা করল কিন্তু সেবারও একই ঘটনা ঘটল। আবার সে জলে পড়ল। তৃতীয়বার সে আর সেই চেষ্টা করল না। জলে পড়ার পর সে একবার মাথা তুলে পরিখার জলের ওপর যেদিকে সাঁকোটা আছে সেদিকে একবার তাকাল। স্বাগতর যেন মনে হল সে দিকে তাকিয়ে হেরুমের মনে আতঙ্ক ফুটে উঠল। স্বাগতও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাকাল সেদিকে, মুহূর্তর জন্য স্বাগত যেন দেখল কী একটা জলের ওপর ভেসে উঠেই আবার জলের নীচে মিলিয়ে গেল। আর হেরুম এরপর জলের কিনারা ঘেঁষা সাঁকোর বিপরীত দিকে সাঁতরাতে শুরু করল। স্বাগত বড় বড় দম নিয়ে দেহে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করতে লাগল হেরুমের পিছু ধাওয়া করার জন্য। কিন্তু হঠাৎ‍ই যেন জলের নীচ থেকে একটা স্রোত এসে ধাক্কা দিয়ে একটু তফাতে সরিয়ে দিল। যেন তার কাছাকাছি জলের তলা দিয়ে কিছু একটা দ্রুত গতিতে চলে গেল। তারই ঝাপটা এসে লাগল তার গায়ে। সাঁতরে গিয়ে কিছুটা দূরে আবার জল বেয়ে ওপরে উঠতে গেল হেরুম। সেখানে মনে হয় ওপরে ওঠার জন্য একটা খাঁজমতো আছে। কারণ ঢালের গায়ে কয়েক পা উঠে পড়ল হেরুম। আর তখনই একটা ঘটনা ঘটল, তার পিছনে পরিখার জল হঠাৎই আকাশের দিকে ছিটকে উঠল আর তার সঙ্গে সঙ্গে জল থেকে লাফিয়ে উঠল বিশাল আকৃতির একটা কুমির। লাফিয়ে উঠে সে পিছন থেকে কামড়ে ধরল হেরুমের কোমর। আর পাড়ে ওঠা হল না হেরুমের। কুমিরটা তাকে জলে টেনে নামিয়ে নিল। শেষ একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার কণ্ঠ থেকে। তাকে নিয়ে জলের নীচে ডুব দিল দানব কুমিরটা। জলের ওপর তরঙ্গ দেখে স্বাগত বুঝতে পারল কুমিরটা তাকে পরিখার গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে! এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে স্বাগত হতভম্ব হয়ে গেল। আর এরপরই আরও বেশি একটা ভয় ধরানো ব্যাপার দেখতে পেল স্বাগত। কুমিরটা হেরুমকে যেদিকে টেনে নিয়ে গেল সেদিকে চাঁদের আলোতে জলের ওপর ভেসে উঠল আরও একটা বিশাল কুমির!

সে যেন স্বাগতকে দেখতে পেয়ে ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। ভয়ঙ্কর মৃত্যু আসন্ন দেখলে মানুষ বাঁচার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করে। স্বাগতও সেই চেষ্টাই করল। সে বুঝতে পারল পিছল ঢাল বেয়ে উঠতে গেলে সেও হেরুমের মতোই আবার জলে পড়ে যাবে। বর্ষাতে পরিখার জলস্তর সাঁকোর উচ্চতার বেশ খানিকটা নীচ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। কোনওভাবে যদি সাঁকোতে উঠে পড়া যায়। এই ভেবে সে পিছু ফিরে প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে সাঁকোর দিকে সাঁতরাতে শুরু করল। সে দেখল একটা ছায়ামূর্তি জঙ্গলের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে এসে সাঁকোর ওপর উঠে পড়ল। শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে স্বাগত পৌঁছে গেল সাঁকোর কাছে। কিন্তু স্বাগতর সাঁকোর ওপর ওঠা কখনওই সম্ভব হতো না যদি না ততক্ষণে যে সাঁকোতে উঠে এসেছে সে ওড়নার মতো একটা কাপড় দড়ির মতো করে সাঁকোর রেলিং-এর সঙ্গে বেঁধে জলের দিকে ঝুলিয়ে না দিত। স্বাগত দেখল সাঁকোর ওপর এসে উপস্থিত হয়েছে সেই খামের যুবতী। সে স্বাগতকে বলল, ‘উঠে পড়, কাপড়টা ধরে এখনই ওপরে উঠে পড়!’ স্বাগত কোনওক্রমে কাপড়টা ধরে সাঁকোর ওপর উঠে পড়ল। সে সাঁকোতে পা রাখার মুহূর্তেই পিছনে একটা ঘট করে শব্দ শুনল। স্বাগত পিছন ফিরে দেখল বিশাল আকৃতির একটা দানব কুমির জলের ওপর ভেসে উঠে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওই ‘খট’ শব্দটা আসলে কুমিরটার চোয়াল বন্ধ করার শব্দ। স্বাগত অনুমান করল কুমিরটা তাকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করেছিল, স্বাগতকে মুহূর্তর জন্য ধরতে ব্যর্থ হয়েছে কুমিরটা। সাঁকোর ওপরে স্বাগতকে দেখার পর দানব কুমিরটা বুঝতে পারল যে তাকে আর ধরা যাবে না। তাই সে এরপর পিছু ফিরে ডুব দিয়ে সেদিকে এগল যেদিকে তার সঙ্গী নরমাংস ভক্ষণ করছে। মাংসের ভাগ পাওয়ার জন্য কুমিরটা এগিয়ে গেল।

স্বাগত এরপর জলের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাল। জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসা সেইসব ভয়ঙ্কর ঝড়ের শব্দ তখন থেমে গিয়েছে। আকাশেও মেঘ নেই। আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে খামের যুবতী। সে স্বাগতকে বলল, ‘আর কোনও ভয় নেই তোমার। দেখ বিষ্ণুলোকের মাথার ওপর আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদ কেমন হাসছে!’

এরপরই সে বলল, ‘এবার আমাকে যেতে হবে।’

স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘কোথায়?’

সে বলল, ‘কলসটা তুলে নিয়ে গিয়ে সেটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে আসতে হবে রাত শেষ হওয়ার আগেই। শেষ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে বহু যুগের প্রতীক্ষার পর দেখা হল বহ্নি।’—এ কথাগুলো বলে সে পা বাড়াল, তার কার্য সম্পাদনের জন্য। স্বাগতও তার সঙ্গে এগতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার মাথার ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল। এগতে পারল না সে। দু’হাতে মাথা চেপে ধীরে ধীরে বসে পড়ল। এরপর স্বাগত জ্ঞান হারাল।