Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৬

পর্ব ৪৬

একটা অদ্ভুত গন্ধে সংজ্ঞা ফিরল স্বাগতর। চোখ মেলে সে দেখল মুণ্ডিত একজন লোক তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে তার নাকের কাছে ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত কিছু একটা মুঠো করে ধরে আছে। স্বাগত চোখ মেলতেই সে তার নাকের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল। স্বাগত কোথায়, কেন এমনভাবে শুয়ে আছে? তার সামনের লোকটাই বা কে এসব বুঝে উঠতে, মনে করতে স্বাগতর বেশ খানিকটা সময় লাগল। যেন বহু যুগ ঘুমাবার পর চোখ মেলল সে। মুণ্ডিত মস্তক লোকটা স্বাগতকে চুপ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে একসময় জানতে চাইল, ‘আপনি কি এখন সুস্থ বোধ করছেন? উঠতে পারবেন?’

তাঁর কণ্ঠস্বর কানে প্রবেশ করতেই যেন হুঁশ ফিরল স্বাগতর ‘সে চিনতে পারল লোকটাকে। তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব! আর তাঁকে চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাগতর মনে পড়ে গেল সব ঘটনা। কীভাবে কেন সে এমনভাবে শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে। স্বাগত উঠে বসল। তবে রাতের ঘটনা মনে পড়ে যেতেই আবার উত্তেজনা বোধ করল সে। সন্ন্যাসী জানতে চাইলেন, ‘আপনার সঙ্গে কী ঘটেছিল?’

উত্তেজিত স্বাগত বলতে শুরু করল, ‘সেই খামের যুবতীর ডাকে তার সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেছিলাম। আমি গিয়ে উপস্থিত হলাম মন্দিরের এক গোপন কক্ষে। সেখানে ছিল কুলি সর্দার হেরুম আর নাতাশা। হেরুম কী সব পুজোপাঠের পর তার হাতের কলসে রক্ত দিতে বলল নাতাশাকে। নাতাশা তার কথা শুনে নিজের বুকে ছুরি বসাতে যাচ্ছিল। আমি ঘরে ঢুকে তাদের বাধা দিতে গেলাম। নাতাশা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে আক্রমণ করতে এল। এমন সময় মন্দিরের বাঁদরটা সেই ঘরে ঢুকে নাতাশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রদীপ নিভে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল ঘর। তারপর আমি শুনলাম খামের যুবতীর কণ্ঠস্বর। কলস নিয়ে হেরুম তখন সেই ঘর ছেড়ে পালাচ্ছিল। খামের যুবতী তাকে ধরতে গেল। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। তারপর আমি সেই গোলকধাঁধার মধ্যে কুমির ব্যবসায়ী বুলের গলাও শুনলাম। হেরুমের সঙ্গে কথা বলল সে। তারপর দেখলাম বুল মাটিতে পড়ে আছে। তার বুকে হেরুমের ছোরা বেঁধা! সে বলল, ‘রাজকুমার তার বুকে ছোরা মেরেছে।’ এ কথা বলার পর সে মরে গেল। সে সময় আরও একজন লোককে আমি সেখানে মুহূর্তের জন্য দেখেছিলাম। কিন্তু আমি তাকে চিনতে পারিনি। তারপর একসময় আমি সেই মন্দিরের অচেনা গোলকধাঁধার বাইরে বেরিয়ে এলাম। খামের যুবতীও বাইরে বেরিয়ে এল। খামের যুবতী আমাকে বলল যে কলসে বুলের রক্ত নিয়ে হেরুম বিষ্ণুলোকের দিকে গিয়েছে। আমি যেন তাকে বাধা দিই। সে যেন কলসটা পরিখার নিক্ষেপ না করতে পারে। তার কথা শুনে আমি মন্দিরের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এদিকে ছুটে এলাম৷ হেরুম কলসটা বা তার ভিতরের জিনিস জলে ফেলার আগেই আমি তাকে ধরে ফেললাম। কলস মাটিতে পড়ে গেল তার হাত থেকে। আমরা দু’জনেও মাটিতে পড়ে গেলাম প্রথমে, তারপর ধস্তাধস্তি করতে করতে পরিখার জলে পড়ে গেলাম। পরিখার জলের মধ্যে আমার মাথা চেপে ধরে আমাকে দমবন্ধ করে প্রায় মেরেই ফেলছিল হেরুম। ঠিক তখনই একটা বিশাল কুমির এসে উপস্থিত হল। হেরুম পালাতে পারল না। কুমিরটা তাকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর দ্বিতীয় একটা প্রকাণ্ড কুমির আমাকে ধরার জন্য এগিয়ে এল। আমি কোনওক্রমে সাঁতরে এই সাঁকোর কাছে উপস্থিত হলাম। খামের যুবতীও সাঁকোতে হাজির হল। সে-ই ওপরে টেনে তুলে আমাকে বাঁচাল। তারপর সে কলসটা আগের স্থানে, মন্দিরের সেই গুপ্তকক্ষে রাখতে যাচ্ছে বলে চলে গেল। তারপরই সম্ভবত আমি জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম।’—একটানা উত্তেজিতভাবে কথাগুলো বলে থামল স্বাগত।

তার কথা শুনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী প্রথমে বললেন, ‘আজ রাতে এমন কিছু ঘটবে বলে আমি আন্দাজ করেছিলাম। মন্ত্রপূত ধূপের গুঁড়োও ছড়িয়ে এসেছিলাম যাতে ওই কলস নিয়ে কেউ মন্দির ত্যাগ করতে না পারে। কিন্তু ধূপের গণ্ডি বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেল। সে জন্যই হেরুম কলসটা নিয়ে বাইরে বেরতে পেরেছিল। আমার অনুমান হেরুমের নির্দেশেই বুলের খামারের দানব কুমির দুটোকে পরিখাতে ছাড়া হয়েছিল। বুল আর হেরুম শেষ পর্যন্ত মারা পড়ল! বিষ্ণুলোকে আর তাদের প্রবেশ করা হল না।’

এ কথা শোনার পর স্বাগত তাঁকে বলতে যাচ্ছিল, আমাকে পুরো ঘটনাটা একটু বুঝিয়ে বলবেন? আমার মাথার ভিতরে সব কিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে!

কিন্তু স্বাগত কথাটা বলার আগেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই খামের যুবতীর নাম কী? আপনার সঙ্গে কীভাবে তার যোগাযোগ? পরিচয়?’

প্রশ্ন শুনে নিজের অজান্তেই যেন স্বাগতর মুখ থেকে একটা নাম উচ্চারিত হল —‘চম্পা’।

ক্ষয়াটে চাঁদের আলোতে সন্ন্যাসীর মুখ মণ্ডলে একটা বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। বিস্মিতভাবেই যেন তিনি বললেন, ‘আপনি ঠিক বলছেন? সে নিজের নাম চম্পা বলেছিল?’

স্বাগত এবার নিজের কথা সংশোধন সে করে বলল, ‘না তার নাম চম্পা বলেনি। নিজের কোন পরিচয়ও দেয়নি আমাকে।’

‘তাহলে এই চম্পা নামটা হঠাৎ কেন বেরিয়ে এল আপনার মুখ থেকে?’ প্রশ্ন করলেন সন্ন্যাসী।

স্বাগত উত্তর দিল, ‘ওই খামের যুবতীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে পাথরের ফলকের গায়ে যেখানে একটা নারী মূর্তি ছিল সেখানে। সে আমাকে পুরনো দিনের ইতিহাসের একটা গল্প শোনাত, তা শুনতে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। তার কাহিনির প্রধান নারী চরিত্রের নাম ‘চম্পা’। নামটা মাথার মধ্যে ছিল। তাই নিজের অজান্তেই নামটা মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে স্বাগত বলল, ‘ওই যুবতী তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কথা সকলের থেকে আমাকে গোপন রাখতে বলেছিল, তাই তার কথা আমি এর আগে কাউকে বলিনি। সে উদগ্রীবভাবে আমাকে তার কাহিনি শোনাচ্ছিল। তবে কেন শোনাচ্ছিল তা আমার জানা নেই। যদিও সে কাহিনির শেষ অংশে পৌঁছেও কাহিনিটা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করতে পারেনি। তবে এটুকু জেনেছিলাম যে, তার কাহিনির সঙ্গে আমাদের মন্দিরের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। সেই ব্যাপারটা কী? আমাদের মন্দিরটার পরিচয় বা কী? মন্দিরে কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে কি না তা জানার আগ্রহে অথবা কোনও এক অদৃশ্য টানে তার গল্প শোনার জন্য আমি প্রফেসর বা অন্য কাউকে না জানিয়ে বিকালবেলা জঙ্গলে গোপনে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের সিংহাসনআরোহণ, তাঁর সভাসদ দিবাকর, মহামঙ্গল, বিরুচ, জম্বুদ্বীপ থেকে আগত ভাস্কর বহ্নি, তার প্রেমিকা নর্তকী চম্পা এসব চরিত্রদের নিয়েই খামের সুন্দরীর সেই কাহিনি। জানি না এ রাতের ঘটনার পর এই খামের যুবতীর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কি না? তার গল্পর শেষটুকু আর শোনা হবে কি না?’

স্বাগতর শেষ কথাগুলো শুনতে শুনতে উঠে দাঁড়ালেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, উঠে দাঁড়াল স্বাগতও। একটু চুপ করে থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘ওই খামের যুবতী আপনাকে আর তার গল্পর শেষ অংশ শোনাবে কি না তা আমার জানা নেই। তবে সে কেন আপনাকেই গোপনে গল্পটা শোনাবার জন্য উদগ্রীব ছিল, তা আমি অনুমান করতে পারছি। সে অনুমান করতে পেরেছিল একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে চলেছে। আপনার সাহায্যে যাতে সে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা আটকাতে পারে সে জন্যই সে গল্পটা আপনাকে শোনাত। যদিও গল্পটা সে শেষ না করতে পারলেও হেরুমকে আপনি কলসের ভিতরের জিনিসগুলো পরিখার জলে নিক্ষেপ করতে না দিয়ে তার ইচ্ছাপূরণ করেছেন। বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন তাকে, হয়তো বা আমাদের সবাইকেও।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘তবে খামের যুবতীর কাহিনির না বলা অংশটুকু আমি সম্ভবত জানি। আর ওই মন্দিরের পরিচয়ও আমি জানি। হ্যাঁ, ওই মন্দির মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের রাজত্বকালের এক বিশেষ ঘটনার সঙ্গে, খামের যুবতীর কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।’

রত্নসম্ভবের কথা শুনে স্বাগত বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘আপনি জানেন! কীভাবে জানলেন? কী সেই ঘটনা?’

ঠিক সেই সময় কাছেই একটা পায়ের শব্দ শুনে স্বাগত দেখল, একটা বাচ্চা ছেলে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। ছেলেটা দাঁড়াল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর পাশে। তাকে দেখে স্বাগতর স্থানীয় বালক বলেই মনে হল।

স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘কে ও?’

রত্নসম্ভব জবাব দিলেন, ‘ও আমার সঙ্গেই এসেছে। আমার আশ্রিত বলতে পারেন। এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়েছিল।’

স্বাগত এরপর আবার সন্ন্যাসীকে আগের প্রশ্নগুলো করতে যাচ্ছিল, কিন্তু সন্ন্যাসী আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, “ওই দেখুন, আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে। আর কিছু সময়ের মধ্যেই ভোরের আলো ফুটবে। চলুন, আমরা এখন ওই মন্দিরে যাই। বাকি কথা সেখানে গিয়ে শুনবেন। আপনার সঙ্গীরা এখনও সেখানে ঘরে আটকে আছে, তাদের মুক্ত করা দরকার।”

রত্নসম্ভবের কথা শুনে স্বাগতর নাতাশার কথা মনে পড়ল। খামের যুবতী তাকে মন্দিরের গোলকধাঁধা থেকে বের করে এনেছিল ঠিকই, কিন্তু নাতাশা তারপর সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিল। খামের যুবতী নাতাশাকে মন্দিরের বাইরে বের করে এনেছিল কি না, নাতাশার জ্ঞান ফিরেছিল কি না, তা কিন্তু স্বাগতর জানা নেই। হয়তো নাতাশা এখনও মন্দিরের মধ্যেই আছে। আর বাঁদরিটাও নিশ্চয়ই আছে। বলা যায় না। সে নাতাশাকে আক্রমণ করে বসতে পারে। নাতাশার কথাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে আর সন্ন্যাসীর সঙ্গে এ জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে বলল, ‘হ্যাঁ, চলুন। জানি না নাতাশা কেমন অবস্থায় আছে?’

এরপর তারা পরিখা অতিক্রম করে এগল মন্দিরের দিকে। নিশ্চুপভাবে মাথা নিচু করে কী যেন ভাবতে ভাবতে হেঁটে চললেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তাঁকে অনুসরণ করল সন্ন্যাসীর সঙ্গী বাচ্চা ছেলেটা আর স্বাগত। তারা চলতে চলতেই আকাশের অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করল। স্বাগতরা যখন মন্দিরের কাছাকাছি এসে পৌঁছল, তখন ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল বিষ্ণুলোকের মাথায়, জঙ্গল ঘেরা প্রাচীন মন্দির নগরীর মাথায়, শুরু হল পাখির ডাক। স্বাগতর মনে হল এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নর রাত এবার শেষ হল।

মন্দির চত্বরের কাছে পৌঁছতেই স্বাগত শুনতে পেল দরজা ধাক্কাবার শব্দ আর তার সঙ্গীদের কণ্ঠস্বর। মন্দির চত্বরে উঠেই স্বাগত ছুটল বন্ধ দরজাগুলো খোলার জন্য। প্রথমে সে খুলল সুরভীর ঘরের দরজা তারপর প্রীতমদের। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল তারা। প্রীতম উত্তেজিতভাবে স্বাগতর কাছে জানতে চাইল, ‘আমাদের বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে আটকে রেখেছিল কে? তুমি আর প্রফেসর কোথায় ছিলে?”

স্বাগত শুধু বলল, “আমিও তোমাদেরই মতো মাঝরাত পর্যন্ত ঘরে আটকেই ছিলাম।”

প্রীতম বলল, ‘যে নতুন লোকটা কাল আমাদের তালের রস দিয়ে গিয়েছিল, তার মধ্যে নিশ্চয়ই মাদক বা ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু মেশোনো ছিল। সেটা খাবার পরই প্রচণ্ড ঘুম পেতে লাগল, ঘুম ভাঙল মাঝরাত পেরবার পর। বাইরে বেরতে যেতেই দেখি দরজা বন্ধ। দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করলাম। সেই শব্দে বিক্রমও উঠে পড়ল। দু’জনে মিলে দরজা ধাক্কা দিতে দিতে তোমাকে আর প্রফেসরকে ডাকতে শুরু করলাম, কিন্তু সারা রাত ধরে ডেকেও কোনও সাড়া পেলাম না!’

সুরভী বলল, ‘ওই পানীয় পান করে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। তারপর প্রীতমদের দরজা ধাক্কানোর শব্দে ধীরে ধীরে হুঁশ ফিরল আমার। ঘড়ি দেখে চমকে উঠলাম। বাইরে বেরতে গিয়ে দেখি আমার ঘরের দরজা বন্ধ।’

বিক্রম এরপর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবকে দেখিয়ে জানতে চাইল, ‘তোমার ঘরের দরজা কে খুলে দিয়েছিল, উনি? নাকি প্রফেসর? প্রফেসর কোথায়?’

স্বাগত বলল, ‘উনি বা প্রফেসর নন, আমার ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিল অন্য একজন। মাঝরাতে আমি মন্দিরে প্রবেশ করেছিলাম, তারপর গিয়েছিলাম বিষ্ণুলোকের দিকে। বাকি রাতটুকু আমি সেখানেই ছিলাম। তারপর সেখান থেকে সন্ন্যাসী আমাকে এখানে ফিরিয়ে আনলেন। আমি তোমাদের দরজা খুলে দিলাম। তবে প্রফেসর আমার সঙ্গে ছিলেন না।’

প্রীতম প্রফেসরের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওঁর ঘরের দরজা তো বাইরে থেকে বন্ধ মনে হচ্ছে। উনি কি ঘরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন?’

সুরভী বলল, ‘স্বাগত তুমি কিছু জানলে, দেখলে আমাদের বল? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। নতুন কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে কি?’

রত্নসম্ভব তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘আপনাদের এক সঙ্গিনী কিন্তু সম্ভবত মন্দিরের মধ্যে রয়েছেন। তাঁকে আগে উদ্ধার করা দরকার। তারপর না হয় সবকিছু আলোচনা করবেন। তাঁকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত সময় নষ্ট না করাই ভালো। প্রফেসরও ঘরে আটকে আছেন কি না দেখে নেওয়া যাক।’

সুরভী তাঁর কথা শুনে বলে উঠল, ‘নাতাশা মন্দিরের ভিতরেই ছিল! আমরা তাকে খুঁজে পেলাম না কেন?’

স্বাগত কিছু জবাব দেওয়ার আগেই সন্ন্যাসী বললেন, ‘কারণ, তিনি যেখানে ছিলেন, সে জায়গা আপনাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। চলুন, দেখা যাক এখন তিনি কোথায় আছেন? কী অবস্থায় আছেন?’

সুরভী বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নাতাশাকে আগে খুঁজে বের করা দরকার। তারপর সব কথা শোনা যাবে।’

প্রীতম আর বিক্রমও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল সুরভীর কথাতে। এরপর সবাই পা বাড়াল। কিন্তু দু-পা এগিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটা। স্থানীয় ভাষায় সে কী যেন বলল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে। তার কথা শুনে সন্ন্যাসী বললেন, ‘ছেলেটা মন্দিরে ঢুকতে চাইছে না। ওর ভয় এখনও কাটেনি। ও আপনাদের কারও ঘরে এখন থাক।’

স্বাগত ইশারায় তার ঘরের খোলা দরজাটা দেখিয়ে দিল। সন্ন্যাসীর নির্দেশে ছেলেটা এগল স্বাগতর ঘরের দিকে।

মন্দিরে প্রবেশের আগে প্রথমে তারা গেল প্রফেসরের ঘরের সামনে। তাঁর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। বিক্রম দরজার হ্যাজবোল্টটা খুলে ফেলে ‘প্রফেসর…প্রফেসর’ বলে দু-বার হাঁক দিল। তাঁর সাড়া না মেলাতে এরপর দরজার পাল্লা ঠেলে বিক্রম, স্বাগত আর রত্নসম্ভব প্রফেসরের ঘরে প্রবেশ করল। কিন্তু তিনি ঘরে নেই। এর আগে স্বাগতরা কেউই প্রফেসরের ঘরের ভিতর ঢোকেনি। প্রফেসরকে না পেয়ে তারা বেশ খানিকটা অবাক হল, কিন্তু এরপরই ঘরের পিছন দিকের দেওয়ালের কোণে এক জায়গা থেকে আলো ঢুকতে দেখে বিক্রম বলল, ‘ওখানে আর একটা দরজা আছে মনে হচ্ছে!’

স্বাগত সেখানে এগিয়ে গিয়ে দেখল সেখানে একটা একপাল্লার সরু দরজা আছে। সে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। রত্নসম্ভব বললেন, ‘হয়তো বা তিনি ওই দরজা দিয়েই বাইরে বেরিয়ে গিয়েছেন, এমনও হতে পারে তিনিও মন্দিরের ভিতরেই আছেন, চলুন এবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকব।’

প্রফেসরের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে মন্দির তোরণের দিকে এগচ্ছিল তারা। ঠিক এই সময় পিছনে একটা শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখল প্রফেসর রামমূর্তি জঙ্গলের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে চত্বরে উঠে আসছেন। তাঁকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। রামমূর্তি দ্রুত স্বাগতদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘তোমরা সবাই ঠিক আছ তো? তোমাদের ঘরের দরজা কে খুলে দিল? ইনি, রত্নসম্ভব?’

তাঁর কথা শুনে বিক্রম বলল, “আমরা আটকে আছি আপনি জানতেন? কোথায় গিয়েছিলেন আপনি? যাওয়ার আগে আমাদের দরজা খুলে দিয়ে যাননি কেন? স্বাগত দরজা খুলে দিয়েছে।”

রামমূর্তি বললেন, “ওই তালের রসে কিছু মেশানো ছিল। তা খেয়ে আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওই শেষ রাতের দিকে তোমাদেরই দরজা পেটাবার আর চিৎকারের শব্দে আমারও হুঁশ ফিরল। দরজা খুলতে গিয়ে দেখি আমারও ঘরের দরজা বন্ধ। আমার ঘরে পিছন দিকে একটা দরজা আছে। সেটা খুলে বাইরে বেরতেই দেখলাম আমার ঘরের পিছন দিয়ে একটা নারীমূর্তি চত্বর অতিক্রম করে জঙ্গলের দিকে ছুটে পালাচ্ছে। যদিও আমি তাকে চিনতে পারিনি। কারণ, সে তখন প্রায় চত্বর ছেড়ে বনের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু কে ওই নারী? নাতাশা, নাকি অন্য কেউ? আমি মনে করলাম তাকে আগে ধরা দরকার। তোমাদের দরজা ধাক্কাবার শব্দ শুনলেও সেই মুহূর্তে আমি ওই নারীকে ধরাই প্রথম কর্তব্য স্থির করলাম। আমি পিছু ধাওয়া করলাম তার। জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়লাম, তার পায়ের শব্দ শুনে আমার মনে হল সে মন্দিরের পিছন দিকে যাচ্ছে। আমিও সেদিকে গেলাম তাকে ধরা গেল না। সে হারিয়ে গেল। তবে মন্দিরের পিছন দিকে আমি একটা ফোকর খুঁজে পেয়েছি। হয়তো বা একসময় সেখান দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা যেত। তবে আমি তার ভিতরে ঢুকিনি। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল, আর তারপর তোমাদের কথা মনে পড়তেই আমি এখানে ছুটে এলাম। আমাদের ঘরের দরজা কে বন্ধ করেছিল কেউ জানো?’ একটানা কথাগুলো বলে, প্রশ্ন করে থামলেন প্রফেসর।

সুরভী বলল, ‘কে দরজা বন্ধ করেছে আমরা জানি না। স্বাগত আর সন্ন্যাসী বলছেন নাতাশা সম্ভবত মন্দিরের ভিতরেই কোথাও আছে। চলুন আগে তাকে খুঁজে বের করি।’—এই বলে সে এগল তোরণের দিকে। প্রফেসরও আর কোনও কথা না বাড়িয়ে এগলেন সবার সঙ্গে। মন্দির তোরণ অতিক্রম করার আগে স্বাগত একবার তাকাল তোরণের মাথার ওপর বসানো হাজার বছরের প্রাচীন বিষ্ণুর মুখমণ্ডলের দিকে। ভোরের আলো এসে পড়েছে সেই মুখে। যেন একটা আবছা হাসি ফুটে উঠেছে দেবতার ঠোঁটের কোণে। সে দিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল, হাজার বছরের মৌনতা ভঙ্গ করে হয়তো বা মন্দিরের পরিচয় উন্মোচিত হতে চলেছে আজ। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তো বলেইছেন যে ওই খামের যুবতীর কাহিনির শেষ না হওয়া অংশটা তিনি জানেন। তা হয়তো তিনি ব্যক্ত করবেন সকলের কাছে। প্রাচীন ওই বিষ্ণুর মুখে হয়তো বা সে কারণেই হাসি ফুটে উঠেছে।

মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল সকলে। আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। গত রাতের সেই অন্ধকার আর নেই। প্রথম প্রাঙ্গণে ঢুকেই সুরভী হাঁক দিল; ‘নাতাশা তুমি কোথায়? তুমি কি এখানে আছ?’ বিক্রমও গলা মেলাল তার সঙ্গে। কিন্তু কোনও জবাব পাওয়া গেল না। তাদের হাঁক ডাক শুধু প্রতিধ্বনিত হল প্রাচীন মন্দিরের দেওয়াল গাত্রে। স্বাগত বলল, ‘সম্ভবত ও মূল মন্দিরের ভিতরে কোথাও আছে।’

তারা প্রবেশ করল প্রাঙ্গণ সংলগ্ন কক্ষগুলোতে। সেই আধো অন্ধকার কক্ষের দেওয়ালগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলো তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। তবে নাতাশা সেখানে নেই। বেশ কয়েকবার স্বাগতরা হাঁক দিল তার নাম ধরে। কিন্তু সেই কক্ষগুলো অতিক্রম করে মূল মন্দিরের সামনে প্রাঙ্গণের পৌঁছতেই তারা দেখতে পেল নাতাশা আর একজনকে। প্রাচীন মূল মন্দিরের প্রবেশ পথের বাইরে একটা পাথরের বেদির ওপর শুয়ে আছে নাতাশা। আর একজন লোক জলের বোতল থেকে তার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে। স্বাগতদের পদশব্দ শুনে সে লোকটা পিছনে তাকাতেই তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল স্বাগতরা। নারেঙ খাম! সে কোথা থেকে এল এখানে? তাদের দেখে নারেঙ বলল, ‘আপনারা এসে গিয়েছেন! মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। চেষ্টা করছি ওর জ্ঞান ফেরাবার।’

স্বাগতরা ছুটে গিয়ে দাঁড়াল নারেঙ আর নাতাশার কাছে। চোখ বুজে শুয়ে আছে নাতাশা। সুরভী নাতাশার কাঁধ ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে তার নাম ধরে ডাকল। কিন্তু সে চোখ মেলল না। রামমূর্তি বললেন, ‘হয়তো বা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। ওকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

স্বাগতর মনে পড়ল গত রাতে নাতাশাকে বাঁদরির চপেটাঘাতের কথা। নাতাশার হাত থেকে আংটি খুলে ছুঁড়ে দেওয়ার পর নাতাশার সংজ্ঞা হারানোর ঘটনাটাও মনে পড়ল। তবে সে ব্যাপারে কথা বললে সময় নষ্ট হতে পারে ভেবে স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, সে ব্যবস্থাই করুন। আগে ওর জ্ঞান ফোনো আর সুস্থ করে তোলা দরকার।’

প্রফেসর মোবাইল ফোন বের করলেন গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকবেন বলে। ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বললেন, —একটু দাঁড়ান, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি ওর জ্ঞান ফেরাতে পারি কি না।’—এ কথা বলে তিনি তার ঝোলার ভিতর থেকে একটা গাছের শিকড় ধরনের জিনিস বের করলেন। তারপর সেটা হাতের মুঠিতে নিয়ে নাতাশার নাকের কাছে ধরলেন। স্বাগত অনুমান করল ওই শিকড়ের গন্ধ শুকিয়েই তার জ্ঞান ফিরিয়েছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। ঠিক এই সময় বেশ কিছু পায়ের শব্দ পেয়ে স্বাগতরা দেখল কয়েকজন পুলিসকর্মীকে নিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছেন পুলিসকর্তা বাকুম। তিনি স্বাগতদের দেখতে পেয়ে তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে দ্রুত এসে দাঁড়ালেন কাছে, সংজ্ঞাহীন নাতাশার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “ওঁর কী হয়েছে। ওঁকে কোথায় পাওয়া গেল?”

নারেঙ খাম জবাব দিল, ‘মন্দিরের ভিতর থেকে। আমিই ওকে উদ্ধার করলাম।’

বাকুম স্বাগতদের ভিড়ের মধ্যে নারেঙ খামকে প্রথমে খেয়াল করেননি। কথাটা শুনেই বাকুম নারেঙের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়প্রকাশ করে বললেন, “আপনি তো দেশে ফেরার জন্য সিয়েমরিপ ছেড়েছিলেন। আবার কীভাবে এখানে ফিরে এলেন?”

নারেঙ খাম বলল, ‘কেন ফিরলাম, সে সব ঘটনাই আপনাদের বলব। আর কিছু গোপন রাখব না।’

ঠিক এই সময় নাতাশা কেশে উঠল সন্ন্যাসীর শিকড়ের গন্ধের প্রভাবে। কথা থামিয়ে সবাই তার দিকে তাকাল। কয়েকবার কাশার পর ধীরে ধীরে চোখ মেলল নাতাশা। সন্ন্যাসী নাতাশার নাকের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘বিপদ কেটে গিয়েছে।’ তবে নাতাশার চোখের ঘোলাটে দৃষ্টি কাটতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর উঠে বসল সে। সুরভী তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমার আর কোনও ভয় নেই নাতাশা। দেখ, আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে। পুলিসও আছে।’

নারেঙ নাতাশার দিকে জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিল। নাতাশা বোতলের জলটা পান করার পর যেন কিছুটা স্বাভাবিক হল। বাকুম জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছিল আপনার? আপনি দু’দিন কোথায় ছিলেন?’

নাতাশা বলল, ‘ভোর রাতে আমি ঘর থেকে বাইরে বেরিয়েছিলাম। জঙ্গলে ঢোকার মুখে হেরুমের থাকার কথা ছিল। সে ছিল। সে আমাকে একটা আংটি পরতে দিল। সেটা পরলে নাকি আমায় ভূত-প্রেত অপদেবতারা কিছু করতে পারবে না। সেই আংটিটা পরার পর তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমার মাথার ভিতরটা যেন কেমন করতে লাগল!’—এ কথা বলে একটু যেন ভাবার চেষ্টা করে নাতাশা বলল, ‘আমার এরপর আর কিছু মনে পড়ছে না। কী হয়েছিল আমার?’

বিক্রম জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি হেরুমের ডাকেই ঘর থেকেই বেরিয়েছিলে? সে তোমাকে বেরতে বলেছিল?”

নাতাশা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

—“কেন বেরতে বলেছিল? তাঁর সঙ্গে কোথায় যাচ্ছিলে তুমি?’

নাতাশা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ইতস্তত করে বলল, ‘এখানে আমার থাকতে ভয় করছিল। ওই হোয়াঙের খুনের খবরটা শুনে আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে যেভাবেই হোক এখান থেকে চলে যেতে হবে। সেদিন দুপুরে হেরুম যখন ঘরে খাবার দিতে এল তখন সুরভী স্নান করতে গিয়েছে। ও আমাকে বলল, তার মনে হচ্ছে আরও কোনও ভয়ঙ্কর বিপদ নাকি নেমে আসতে চলেছে এখানে। আমাদের মধ্যেও কেউ মারা পড়তে পারে ভূতের হাতে। আগে সে ভূতের ব্যাপারে বিশ্বাস না করলেও হোয়াঙের মৃত্যুর পর তার মনে হচ্ছে সত্যিই ভূত-প্রেত আছে এখানে। আমাদের আর এখানে থাকা উচিত হবে না। আমি তাকে বললাম, ‘আমিও তো এ জায়গা থেকে চলে যেতে চাই।’

এরপর সে আমাকে বলল, ‘তার টাকার প্রয়োজন। আমি যদি তাকে একশো ডলার দিই, তবে সে সব ব্যবস্থা করে দেবে। পাসপোর্টটা আর টিকিট বাবদ টাকাও দিতে হবে। সিয়েমরিপে তার চেনা ট্রাভেল এজেন্ট আছে। কাল সকালের ফ্লাইটেই সে আমার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করবে। তার জন্য শেষ রাতে আলো ফোটার আগেই আমাকে বেরতে হবে। আমাকে সিয়েমরিপ নিয়ে যাওয়ার জন্য হেরুম জঙ্গলে অপেক্ষা করবে।’

এ কথাগুলোর পর থামল নাতাশা। তারপর অনুতপ্ত হবার ভঙ্গিতে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি এতটাই আতঙ্কে ছিলাম যে, কাজটা আমি ঠিক করছি কি না সে জ্ঞান তখন আমার ছিল না। আমি পাসপোর্ট আর টাকা দিয়েছিলাম তার হাতে। তারপর ভোর রাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম সিয়েমরিপ যাওয়ার জন্য। এখন বুঝতে পারছি আমি কোনও বড় ভুল করেছিলাম।’ কথা শেষ করে মাথা নিচু করল নাতাশা। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। স্বাগতর মুহূর্তর জন্য মনে পড়ল গত রাতে ছুরি হাতে নাতাশার হিংস্র মুখমণ্ডল। কোমল স্বভাব, ভীতু প্রকৃতির নাতাশা যে এমন মূর্তি ধারণ করতে পারে, তা নিজে না দেখলে স্বাগত বিশ্বাসই করতে পারত না। তার মনে হল সত্যিই কি সেই ঘটনা ঘটেছিল? নাকি সবই কল্পনা?

সুরভী রুমাল দিয়ে নাতাশার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, “যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। এখন আর তুমি ব্যাপারটা নিয়ে মনখারাপ বা লজ্জাবোধ কোরো না। তুমি যে সুস্থ আছ, তোমাকে যে ফিরে পাওয়া গিয়েছে, এটাই আমাদের কাছে বড় ব্যাপার। আমরা তোমার সেদিনের অবস্থা বুঝতে পারছি। আমরা সবাই আগেও যেমন তোমার সঙ্গে ছিলাম তেমনই। এখনও আছি।”

বাকুম আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ‘একটু ভেবে দেখুন তো আপনি, এ দু’দিন কোথায় ছিলেন? আপনার সঙ্গে কী ঘটেছিল কিছুই কি মনে পড়ছে না?”

নাতাশা ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল, ‘তার কিছু মনে নেই।’

প্রফেসর বাকুমের উদ্দেশে বললেন, ‘নাতাশা মনে হয় এখনও পুরোপুরি মানসিকভাবে ঠিক হয়নি। ওকে আরও খানিকটা সময় দেওয়া দরকার। তারপর হয়তো বা ওর সব কথা মনে পড়বে।”

বাকুম এরপর অন্য সবার উদ্দেশে বললেন, ‘কাল সন্ধ্যা নামার পর এখানে কী কোনও ঘটনা ঘটেছিল?’

প্রীতম বলল, ‘কাল দুপুরে একজন তালের রস বিক্রেতা এসে আমাদের পানীয় দিয়ে গিয়েছিল। তা পান করে আমরা বেহুঁশ হয়ে পরি। মাঝরাতের পর আমার, বিক্রম আর সুরভীর হুঁশ ফেরে। দরজা খুলতে যেতেই দেখি কেউ বা কারা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে! দরজা খোলার জন্য হাঁক-ডাক করে কোনও কাজ হয়নি। তারপর ভোরের আলো ফোটার পর স্বাগত এসে দরজা খুলল, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীও সঙ্গে ছিলেন, কিছুক্ষণ পর প্রফেসরও জঙ্গলের দিক থেকে এলেন। আমরা তারপর মন্দিরের ভিতর ঢুকে দেখি নারেঙ জলের ছিটে দিয়ে নাতাশার জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করছেন। আর তারপর আপনিও এখানে উপস্থিত হলেন।’

প্রীতমের কথা শুনে পুলিস অফিসার সন্দেহের দৃষ্টিতে প্রফেসর, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আর স্বাগতর মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “আপনারা তাহলে গত রাতে ঘরের বাইরে ছিলেন। কেন ছিলেন?’

প্রফেসর প্রথমে বললেন, ‘আমিও ওই পানীয় পান করে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।’ এ কথা বলার পর কেন তিনি জঙ্গলে গিয়েছিলেন, কী ঘটেছিল সে প্রসঙ্গে স্বাগতদের যা জানিয়েছিলেন, সে কথাই বললেন পুলিস অফিসারকে।

বাকুম প্রফেসরের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘এই মন্দিরে অন্য মহিলা কোথা থেকে এল?’ এ কথা বলার পর তিনি প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গিনীর কথা শুনে আমার ধারণা হচ্ছে ওই হেরুম একজন অপরাধী। এখানে যে সব অপরাধ ঘটেছে তার সঙ্গে সে যুক্ত। লোকটাকে খুঁজে বের করতে হবে। তার আগে আপনাদের কথাগুলো শুনে নিই।’

বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বাকুমের কথা শুনে বললেন, ‘হেরুমকে আর পাওয়া যাবে না। কাল রাতে বিষ্ণুলোকে পরিখার জলে কুমির তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। উনি তার সাক্ষী।’ এই বলে তিনি স্বাগতকে আঙুল তুলে দেখালেন।

কথাটা শুনে বাকুমের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। স্বাগতর মনে হল তার মুখোমুখি দাঁড়ানো নারেঙ খামও যেন চমকে উঠল সন্ন্যাসীর কথা শুনে। পুলিসকর্তা বাকুম স্বাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তার মানে পরিখাতে কুমিরের ব্যাপারটা সত্যি! কে পরিখাতে কুমির ছাড়ল? কী ঘটেছিল কাল রাতে?’

স্বাগত জবাব দিল, ‘কে কুমির ছেড়েছিল জানি না। তবে সম্ভবত বুলের খামারের কুমির হবে। অমন দুটো দানব কুমির আমি বুলের খামারে দেখেছিলাম।’ এ কথা বলার পর স্বাগত গত রাতের ঘটনা বিবৃত করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নারেঙ খাম বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ও দুটো বুলের খামারেরই কুমির হবে। আমি এবার কিছু কথা বলতে চাই আপনাদের কাছে। বড় ভয়ঙ্কর লোক ওই হেরুম আর তার শাগরেদ বুল।’

নারেঙের কথা শুনে সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল তার দিকে। বাকুম তাঁকে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনার কথাই আগে শুনি। দেখি কী রহস্য উন্মোচন হয়?’

—’সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, ওঁর কথাই আগে শোনা যাক। উনিই তো নাতাশাকে উদ্ধার করেছেন। ওঁর কথার পর আমাদের অনেকেরই হয়তো কিছু বলার থাকবে। সবার সব কথা বলতে শুনতে সময় লাগবে, চলুন আমরা প্রাকারের গায়ে ওই পাথর খণ্ডগুলোর ওপর বসে কথা বলি।’

তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করলেন প্রফেসর। নাতাশা উঠে দাঁড়াল বেদি ছেড়ে। স্বাগতরা এবার খেয়াল করল, নাতাশার শরীরের আড়ালে নারেঙের সেলফি স্টিকটাও রাখা ছিল। নারেঙ সেটা তার হাতে তুলে নিল। তা দেখে প্রফেসর বললেন, ‘আপনার সেলফি স্টিকটাও রয়েছে দেখছি। আপনি ছবি তোলার জন্য আবার ফিরে এসেছিলেন নাকি?’

নারেঙ জবাব দিল, ‘না, ছবি তুলতে নয়, এই স্টিকটা হাতে নিয়ে ঘোরা আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আমি ফিরে এসেছিলাম আমার বিবেকের টানে। আপনাদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয় সে জন্য সতর্ক করতে। আমার সব কথা শুনলে আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।’

সকলে গিয়ে বসল প্রাঙ্গণ প্রাকারের গায়ে ছড়ানো পাথর খণ্ডগুলোর ওপর। আর পুলিসকর্মীরা দাঁড়িয়ে রইল মন্দিরের প্রবেশপথের কাছে আগে সকলে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সে জায়গাতেই।

কয়েক মুহূর্তর জন্য স্বাগতরা চুপ করে রইল সেখানে গিয়ে বসার পর। হয়তো সবাই কে কী বলবে তা নিজেদের মনে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। নারেঙ খাম তারপর বলল, “তাহলে আমি সব ঘটনা খুলেই বলি আপনাদের?”

বাকুম বললেন, ‘হ্যাঁ, বলুন। সত্যি কথা খুলে বললে আমার দিক থেকে কোনও ভয়ের ব্যাপার থাকবে না। যদি না আপনি কোনও অপরাধ করে থাকেন।”

নারেঙ বলল, “আমি অপরাধী হলে নিশ্চয়ই নাতাশাকে উদ্ধার করতাম না।’

এ কথা বলে নারেঙ খাম বলতে শুরু করল, ‘আপনারা হয়তো জানেন যে, আমার জন্ম এদেশে হলেও আমি জন্মের পর বিদেশে অর্থাৎ ফ্রান্সে চলে যাই। আমার বাবা সে দেশে গিয়েছিলেন জীবিকার সন্ধানে। এ দেশে তেমন কিছু নেই, ফ্রান্স বড়লোকদের দেশ। সেখানে অনেকরকম সুযোগ সুবিধা। সত্যি কথা বলতে কী সে সুযোগকে কাজে লাগিয়েওছিলেন আমার বাবা। যাই হোক দেশ ছাড়লেও তাঁর দেশের প্রতি টান ছিল। বাবার রক্তের সূত্রেই আমি সে টান পেয়েছি। তাঁর কাছে আমি এই মন্দির নগরীর কথা অনেক শুনেছি। শুনেছি, এ জায়গার প্রাচীন ইতিহাস কথা। তাই এ দেশে আসার জন্য দেখার জন্য আমার একটা টান তৈরি হয়। বাবার মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরি আমি। কুমিরের চামড়ার কদর আছে ফ্রান্সে। একদিন একজন আমাকে পরামর্শ দেয় এখান থেকে সস্তায় আমি কুমিরের চামড়া কম দামে কিনে নিয়ে গিয়ে ফ্রান্সে চড়া দামে বিক্রি করতে পারি। আমার বাবার মুখেও আমি এখানকার কুমির খামারের কথা শুনেছিলাম। বুলদের পুরনো দোকানটার কথাও শুনেছিলাম। বুলের বাবার সঙ্গে পরিচয় ছিল আমার বাবার। এখান থেকে কুমিরের চামড়া নিয়ে গিয়ে ব্যবসা করার কথাটা আমার মনে ধরে। আমি ফ্রান্সে বসেই খোঁজখবর নিয়ে যোগাযোগ করি বুলের সঙ্গে। সেও আগ্রহী হয় ব্যাপারটাতে। টেলিফোনে কথাবার্তা শুরু হয় আমাদের মধ্যে। তার সঙ্গে কথা চলাকালীনই একটা ব্যাপার হল। যা এদেশে আসার আগ্রহ আমার আরও বাড়িয়ে দিল।’—এই বলে থামল নারেও খাম। যেন কথাটা বলার আগে একটু ইতস্তত করল সে। প্রফেসর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেটা কী ব্যাপার?’

নারেও খাম এরপর বলল, ‘হ্যাঁ সেটা আমাকে বলতে হবে। কারণ তার সঙ্গে এখানকার ঘটনাগুলো, এ মন্দিরের ব্যাপার জড়িত।’

এরপর আবারও মুহূর্তর জন্য চুপ করল নারেঙ। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘একদিন বাবার পুরনো কাগজ ঘাঁটতে গিয়ে আমি একটা ছোট নোট বুক খুঁজে পাই। তাতে এই মন্দির নগরীর সম্পর্কে নানা টুকরো টুকরো বিবরণ লেখা ছিল। তারই মধ্যে এক জায়গায় লেখা ছিল এই নগরীর এক প্রাচীন মন্দিরের কোনও এক গোপন কক্ষে নাকি কোনও প্রাচীন জিনিস লুকানো আছে বলে তিনি জেনেছেন। যারা তা উদ্ধার করবে, তাদের নাকি ভাগ্য ফিরে যেতে পারে। তবে সে জিনিস এ মন্দিরের কোথায় লুকানো ছিল, তা বাবার জানা ছিল না। বাবা লিখেছিলেন তাঁর সেটা খোঁজার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে সেটা আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ওই লেখাটা আমার হাতে পড়ার পর আমার মনে হল আমি যদি এ দেশে এসে ওই প্রাচীন জিনিসটা খুঁজে বের করতে পারি তবে কেমন হয়। না অর্থের লোভে নয়, আমি জানি এসব মন্দির থেকে যদি কোনও কিছু উদ্ধার হয় সে জিনিস সরকারি সম্পত্তি। কিন্তু তা যদি এখনও মন্দিরে থেকে থাকে আর তা যদি আমি উদ্ধার করে সরকারের হাতে তুলে দিতে পারি তবে হয়তো এখানকার ইতিহাসের নতুন কোনও দরজা খুলে যেতে পারে। আর তাতে আমার নাম খ্যাতি দুটোই হবে এদেশের সরকারের কাছে। আমার জন্মভূমির জন্য কিছু করাও হবে আর সরকারের সুনজরে আমার ব্যবসার ক্ষেত্রে সুবিধাও হবে। এসব কথা ভেবে নিয়ে আমি শেষ পর্যন্ত পাড়ি জমালাম এদেশে। নমপেনে পৌঁছে আমার ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গেল আপনারা যাঁরা এই মন্দিরে কাজ করতে এসেছেন তাঁদের মধ্যে চারজনের সঙ্গে। যদিও আমি এই মন্দির নগরীতে আসার আগে জানতাম না, আপনারা ঠিক এই মন্দিরেই কাজ করতে এসেছেন। সেটা আমি এখানে আসার পর জানতে পারি ফঙের মুখ থেকে গাইড হিসাবে তাকে নিযুক্ত করার পর এই মন্দির সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বিষ্ণুলোকের তোরণে। প্রাথমিক অবস্থায় ওর কথাবার্তা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। আর এই কথাও সত্যি যে, এই মন্দির নগরীর অনেক কিছু তার নখদর্পণে ছিল। যদিও আমি ফঙকে প্রথমে বলিনি যে কী কারণে আমি মন্দিরে অনুসন্ধান করছি, কিন্তু ব্যাপারটা সে ধরে ফেলেছিল। তারপর আমি তাকে বাবার লেখাটার কথা জানাই। এই মন্দিরে আমাদের অনুসন্ধানের চেষ্টা আরম্ভ হয়।

এবার বলি, প্রাথমিক অবস্থায় আমি কিন্তু বুলের কাছে আমার এই মন্দির সম্পর্কে অনুসন্ধান বা তার কারণ বলিনি। কিন্তু ফঙের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর এক রাতে বুল আমার হোটেলে এসেছিল। তখন মদ্যপান করতে করতে নেশার ঝোঁকে আমি বুলকে আমার বাবার লেখার কথা, এই মন্দিরে আমার অনুসন্ধান চালানোর ইচ্ছার কথা বলে ফেলি। বুল আমাকে বলে যে সেও শুনেছে যে, এখানকার এই মন্দিরে নাকি প্রাচীন জিনিস লুকানো আছে। আর সে এই কথাও বলে তার অনুমান সরকারি তরফে আপনারা নাকি আসলে সেই গোপন জিনিস বা গুপ্তধনের অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। সে রাতে আর বুল কিছু বলেনি আমাকে।’

পরদিন আমি প্রথমে নিজে না এসে ফঙকে এখানে পাঠালাম মন্দির আর আপনাদের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে খোঁজ করার জন্য। কিন্তু প্রফেসর তাকে তাড়িয়ে দিলেন, আমি এও জানতে পারলাম যে, সরকারি অনুমতি ছাড়া মন্দিরে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ।

তাহলে এই মন্দিরে আমি ঢুকব কীভাবে? আমি মন্দিরের ভিতরে ঢোকার উপায় খুঁজতে লাগলাম।

আমি ফঙের সঙ্গে পরদিন সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম বিষ্ণুলোকে তাকে আমার সঙ্গে নিয়ে ঘোরার জন্য। বিষ্ণুলোকের ভিতর আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি হঠাৎ দেখি বুল সেখানে উপস্থিত হয়েছে। সে আমার কাছে জানতে চাইল, আমি এই মন্দিরে প্রবেশের ব্যাপারে কী পরিকল্পনা করেছি? আমি তাকে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে বললাম, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কীভাবে মন্দিরে ঢুকব? কারণ, প্রফেসর নিশ্চয়ই আমাকে মন্দিরে ঢুকতে দেবেন না। বুল আমাকে বলল, নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটা সে জানে। তাই এই ব্যাপারে সে একজনের সঙ্গে কথা বলেছে। সিয়েমরিপে একজন লোক থাকেন, তিনি নাকি রাজকুমার। অর্থাৎ এখানকার কোনও এক প্রাচীন রাজবংশর উত্তরাধিকার। গত রাতে আমার মুখ থেকে কথাগুলো শোনার পর বুল তাঁকে কথাগুলো জানিয়েছে। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী, আমাকে তিনি সাহায্যও করতে চান। আমি যদি আগ্রহী হই তবে বুল আমার সঙ্গে সন্ধ্যায় টেলিফোনে কথা বলিয়ে দেবে। আমি

রাজি হয়ে গেলাম। সন্ধেবেলা আমি উপস্থিত হলাম কুমির খামারে। বুল টেলিফোনে ধরিয়ে দিল সেই রাজকুমারকে। তিনি আমাকে বললেন, ব্যাপারটাতে তিনিও আগ্রহী। কারণ, তাঁর পূর্বপুরুষেরও একটা জিনিস ওই মন্দিরে রাখা আছে কোনও এক গুপ্ত কক্ষে। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ চালালে দু’জনেরই সুবিধা। সেই গুপ্ত কক্ষের খোঁজ পেলে তার কৃতিত্বের দাবিদার আমিই হব বলে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি আমাকে বললেন, পঞ্চাশ হাজার ডলার দিলে তিনি আমাকে মন্দিরে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেবেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমি মোটা টাকা সঙ্গে এনেছিলাম। আমি তাঁর কথায় রাজি হয়ে গেলাম। তবে তিনি আমাকে বললেন, তিনি এখনই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না। যথাসময় তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ফঙের কাছ থেকে বা এই মন্দিরে এসে আমি যদি কোনও তথ্য সংগ্রহ করতে পারি, তবে তা যেন আমি বুলের মাধ্যমে তাঁকে জানাতে থাকি। সে রাতেই আমি বুলকে টাকা দিয়ে দিলাম। আর একদিনের মধ্যেই আমার হাতে চলে এল সেই সরকারি কাগজগুলো। যা সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে এসেছিলাম আমি। কাগজগুলো কীভাবে অত দ্রুত রাজকুমার জোগাড় করে দিয়েছিলেন আমার তা জানা নেই। তবে আমি এটুকু বুঝেছিলাম ওপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।’ নারেঙের মুখে বারবার রাজকুমার শব্দটা শুনতে শুনতে স্বাগতর মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা। ছোরাবিদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী বুল তাকে বলেছিল, তাকে ছোরা বিধিয়েছে রাজকুমার!

নারেঙ এরপর একটু হেসে বলল, ‘আপনারা নিশ্চয়ই আসল কথাগুলো শোনার জন্য উদগ্রীব। তবে এবার আমি সেই কথাগুলো দ্রুত বলে ফেলি। আপনাদের মন্দিরে আমি এলাম, দেখলাম, মন্দিরের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম, কিন্তু বিশেষ কিছু সুবিধা করতে পারলাম না অনুসন্ধানের ব্যাপারে। সময় এগিয়ে চলল, কিন্তু হঠাৎ একদিন সকালে ফঙ আমাকে বলল, মন্দিরে কোথায় কত কক্ষ আছে, কীভাবে সেখানে যেতে হবে তার সন্ধান সে পেয়ে গিয়েছে। আমাকে তা সে জানাবে। আমাকে সে সেই গুপ্ত কক্ষে পৌঁছে দেবে তবে তার জন্য আমাকে তাকে আগে পাঁচ লক্ষ ডলার দিতে হবে। খুব বড় রকমের টাকা দাবি করে বসল ফঙ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, পথের সন্ধান সে কীভাবে জানল। সে উত্তর দিল, এক নারীর কাছে।

আমি ইতিমধ্যে পঞ্চাশ হাজার ডলার খরচ করে ফেলেছি। তবুও আমি এক লক্ষ ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি হলাম। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত কিছুতেই তিন লক্ষ ডলারের নীচে নামতে রাজি হল না। আমি ভাববার জন্য তার কাছে কয়েকটা দিন সময় চাইলাম। কিন্তু সে বলল, সে দেরি করতে পারবে না। কারণ প্রফেসর বা তার লোকজন যেকোনও মুহূর্তে তার সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। প্রয়োজনে সে অন্য লোককে সেই গুপ্ত কক্ষ ও গুপ্তধনের সন্ধান দেবে। যারা তাকে তার দাবি মতো পয়সা দেবে। তার এই কথা শুনে রাগ হয়ে গেল আমার। রোজই আমি তাকে মোটা পয়সা দিতাম, তার নানা দাবি পূরণ করতাম। আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে আমার তোমাকে দরকার নেই। তুমি চলে যাও। আমি তাড়িয়ে দিলাম ফঙকে।

সেদিন রাতে আমি আবার সাক্ষাৎ করলাম বুলের সঙ্গে। যেমন রোজ করি। বুলকে আমি কথাগুলো জানালাম। বুল আমাকে বলল, আমি যা করেছি, তা ভালোই করেছি। ফঙ ধাপ্পা দিয়ে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতলবও করতে পারে। আর তাকে নাকি সন্ধেবেলা জুয়ার আড্ডার মালিক চীনা হোয়াঙের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। হোয়াঙ লোকটা ভালো নয়, তার সঙ্গে পরামর্শ করে ফঙ আমার থেকে টাকা হাতানোর ব্যবস্থা করতে পারে। রাজকুমারও নিজে ওই গুপ্ত কক্ষের সন্ধান চালাচ্ছেন। হয়তো বা আমরা নিজেরাই খুঁজে নিতে পারব সে জায়গা।

এ ঘটনার একদিন পরই খুন হয়ে গেল ফঙ। আমার তখন মনে হয়েছিল হয়তো বা হোয়াঙকে নিয়ে ফঙ মন্দিরে ঢুকেছিল, তারপর হোয়াঙই তাকে খুন করেছে। বুলও তেমনই ইঙ্গিত দিল আমাকে।

সময় আরও এগিয়ে চলল। আমি ঘুরে বেড়াতে লাগলাম এই অঞ্চলে। এবার আসি চারদিন আগের ঘটনায়। আমি এখানেই আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। বুল আমাকে ফোন করে জানাল, রাজকুমার আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছেন। আমার সঙ্গে তাঁর বিশেষ দরকার আছে। তিনি নাকি সন্ধান পেয়েছেন কীভাবে ওই গুপ্ত কক্ষে পৌঁছতে হবে। আমি যেন সন্ধ্যার পর বুলের ফার্মে যাই। সন্ধ্যা নয়, উত্তেজনা সংবরণ না করতে পেরে আমি বিকেলবেলায় বুলের খামারে পৌঁছে গেলাম। ভিতরে ঢুকে দেখি বুল আর একজন লোক মিলে খামারের বড় কুমির দুটো বেঁধে একটা গাড়িতে তুলছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে আমি সেখানে পৌঁছে যাওয়াতে আমাকে দেখে একটু বিব্রত বোধ করল বুল।

কুমিরগুলো কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, মোটা দাম পাওয়াতে কুমিরগুলোকে সে বেচে দিচ্ছে। যে কুমির নিতে এসেছিল সে কুমির নিয়ে চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যে রাজকুমার এসে হাজির হল সেখানে। পরনে কোট-প্যান্ট, টুপি দিয়ে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা। কিন্তু সে টুপি খুলতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁকে আমি আপনাদের মন্দির দেখতে এসে দেখেছি। সে আপনাদের কুলি সর্দার হেরুম। সে আমাকে বলল, ‘সে ছদ্মবেশে কুলি সর্দার সেজে মন্দিরের ভিতর আপনাদের সঙ্গে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। সে ওই গোপন কক্ষে যাওয়ার সন্ধান পেয়ে গিয়েছে। আষাঢ় পূর্ণিমার রাতে সে আমাকে নিয়ে এ মন্দিরে ঢুকবে।’

এ কথা শুনে সুরভী বলে উঠল, ‘লোকটা কী ভয়ঙ্কর! ব্যাপারটা আমরা কেউ ধরতেই পারিনি।’

নারেঙ বলল, ‘হ্যাঁ, ভয়ঙ্কর তো বটেই। এরপর তার সঙ্গে কথা বলে আমি সেটা বুঝতে পারলাম। সে আমাকে বলল, আমাকে সে ওই গুপ্ত কক্ষের সন্ধান দেবে। তার পরিবর্তে আমাকে একটা কাজ করতে হবে। যেভাবেই হোক নাতাশার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তুলে দিতে হবে বুল আর হেরুমের হাতে! আমি এবার বুঝতে পারলাম হেরুমের মতলব ভালো নয়। আমি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, ‘কারণটা তার পক্ষে এখন বলা সম্ভব নয়। আমি হেরুমের কোনও অসাধু উদ্দেশ্য আছে বুঝতে পেরে জানিয়ে দিলাম আমার পক্ষে ও কাজ করা সম্ভব নয়। আমি কারও ক্ষতি করতে পারব না। তারা অনেক চেষ্টা করেও যখন আমাকে ওই দুষ্কর্ম করাতে রাজি করতে পারল না, তখন হেরুম নিজ মূর্তি ধারণ করল। সে বলল, আমাকে আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন সকালের মধ্যে এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে। কথোপকথনের কথা পুলিস বা প্রফেসরকে যেন না জানাই, হেরুমের পরিচয় প্রকাশ না করি। তাহলে আমার বিপদ হবে। ফঙ আমার সঙ্গী ছিল। তার খুন হওয়ার পিছনে নাকি আমি আছি বলে পুলিসের সন্দেহ। প্রয়োজনে হেরুম পুলিসকে বলবে যে, সে আমাকে দেখেছে ফঙকে খুন করতে! আমাকে তারা ফাঁসিয়ে দেবে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম তাদের কথা শুনে। সেটাই তাদের সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথন। হোটেলে ফিরে এসে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি তাদের কথামতো দেশে ফিরে যাব। পরদিন আমি সেটা জানিয়ে দিলাম অফিসার বাকুমকে যে একদিন বাদে আমি ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু আমার মধ্যে বিবেক কাজ করছিল, তাই ফেরার আগে আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে কৌশলে আপনাদের এই জায়গা ছেড়ে যেতে অনুরোধ জানাই।

যেদিন আপনাদের থেকে বিদায় নিতে এলাম সেদিনই শুনলাম হোয়াঙের দেহ পাওয়া গিয়েছে। আমার কেন জানি মনে হল এর পিছনে হেরুম আর বুলের হাত থাকতে পারে। আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। পরদিনই আমি ফেরার ফ্লাইট ধরব। সেই মতোই কাজ করলাম আমি।’ —একটানা কথাগুলো বলে একটু থামল নারেঙ। সবাই উত্তেজিতভাবে শুনছে তার কথা। ঠিক সেই সময় স্বাগত হঠাৎ খেয়াল করল সেই বড় বাঁদরিটা কিছুটা তফাতে প্রাচীরের ওপর এসে বসেছে। সেও যেন শুনছে তাদের কথা।