Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৭

পর্ব ৪৭

নারেঙ আবার বলতে শুরু করল তার কথা— – “এবার বলি, গত দিন বা রাতের কথা— আমি তো গতকাল ভোরের বিমানে সিয়েমরিপ ত্যাগ করলাম। কিন্তু বিবেকের তাড়না কাজ করতে শুরু করল। আমার মনে হতে লাগল, এখানে বিশেষত নাতাশার ওপর যখন বিপদ নেমে আসার আশঙ্কার কথা আমি জানি, তখন সেটা আপনাদের জানানো উচিত। আপনারাও এ দেশকে ভালোবেসে কাজ করতে এসেছেন, তা মন্দির সংস্কার বা গুপ্তধনের অনুসন্ধান যাইহোক না কেন। ক্রমে ক্রমে আমার মধ্যে বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠল। হেরুম বলেছিল, আষাঢ় পূর্ণিমার রাতে তার মন্দিরে প্রবেশের ইচ্ছার কথা। আমার মনে হল, ওই পূর্ণিমার রাতেই কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমার এখানে ফিরে আসা উচিত। সেইমতো ফ্লাইটে নয় সড়ক পথে ফেরার জন্য আমি নমপেন থেকে রওনা হলাম দুপুরবেলা। আট-দশ ঘণ্টা সময় লেগে গেল আমার এখানে আসতে। মাঝরাত হয়ে গেল এই নগরীর মুখে এসে পায়ে হেঁটে এখানে পৌঁছতে। এসে প্রফেসরের ঘরের দরজায় গিয়ে ডেকে কোনও সাড়া পেলাম না। আর তারপরই আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম কে যেন মন্দির তোরণের ভিতর প্রবেশ করছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে তোরণের ভিতর প্রবেশ করলাম। লোকটা তখন প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে ঘরগুলোর ভিতর প্রবেশ করল। তারপর তা অতিক্রম করে যখন ওই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম, একটা ছায়ামূর্তি মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করছে। পায়ের শব্দ শুনে মনে হল সে মন্দিরের উপরে উঠছে। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। কিন্তু ওপরে ওঠার পর আমি বুঝতে পারিনি যে, অন্ধকারে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওপরে উঠে কয়েক পা এগতেই পিছন থেকে সে কিছু একটা দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করল, আমি পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।’ —এই বলে থেমে গেল নারেঙ।

বিক্রম বলে উঠল, ‘তারপর? তারপর কী হল?’

‘আমার জ্ঞান ফিরল ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে তখন। উঠে বসার পর আমার কানে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ কানে এল। মনে হল যেন নারী কণ্ঠের শব্দ। সে শব্দ অনুসরণ করে আমি খুঁজে বের করলাম নাতাশাকে। সে তখন অচৈতন্যভাবে পড়ে থাকলেও মুখ দিয়ে শব্দ করছিল। আমি তাকে উঠিয়ে কাঁধে তুলে নীচে নিয়ে গেলাম। তারপর আপনারা এসে উপস্থিত হলেন। আমি এখন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, হেরুমই এসব কিছুর পান্ডা। সে বা বুলই আঘাত করেছিল আমাকে। হয়তো বা খুনই করত। আমি জানি না তারা সেই গোপন কক্ষে পৌঁছতে পেরেছিল কি না। তবে আমাদের সবার সৌভাগ্য আমরা সবাই বেঁচে গিয়েছি। নির্ঘাত ওরা দু’জনেই খুন করেছিল ফঙ আর হোয়াঙকে। আমার যা বলার ছিল তা আপনাদের বললাম। আমার কথা শেষ।’

দীর্ঘক্ষণ ধরে বলে নারেঙ তার কথা শেষ করার পর বাকুম বললেন, “আশা করি, আপনি সত্যি কথা বললেন। আপনার পুলিসের ভয়ের কোনও কারণ নেই।’

এ কথা বলার পর তিনি স্বাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আপনি বলুন আপনার কথা। কী ঘটেছিল গত রাতে?”

স্বাগত বলতে শুরু করল তার কথা। শুধু গত রাতের ঘটনা নয়, সেই খামের যুবতীর সঙ্গে তার পরিচয়ের কথা, তার গল্প শুনতে যাওয়ার কথা, তার গল্পের সংক্ষিপ্তসার সবই সে একে একে ব্যক্ত করল বেশ খানিকক্ষণ সময় ধরে। সত্যি কথাই বলল সে। স্বাগত তার কথা শেষ করার পর উপস্থিত সকলের মুখ দেখে বুঝতে পারল সবাই খুব আশ্চর্য হয়েছে, গত রাতের ঘটনা শুনে। বিশেষত খামের যুবতীর কথা শুনে। কেবল সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবই যেন ভাবলেশহীন। যেন খামের যুবতীর কাহিনি তার জানা।

স্বাগতর কথা শেষ হওয়ার পর প্রফেসর বললেন, ‘বাকুম যদি ওই খামের যুবতীকে খুঁজে বের করতে পারেন, তবে হয়তো অনেক কথা জানা যেতে পারে।’

বাকুম বললেন, ‘সে চেষ্টা আমি অবশ্যই করব। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব এবার আপনার কিছু জানা থাকলে বলুন।’

রত্নসম্ভব মৃদু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই বলব। তার আগে আমি নারেঙ খামকে তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাই।’

নারেঙ বলল, ‘হ্যাঁ, করুন। আমার গোপন করার মতো কিছু নেই।

রত্নসম্ভব বললেন, ‘আপনার স্বর্গত পিতার নামটা জানাবেন?’

নারেঙ বলল, ‘আমার পিতার নামের সঙ্গে এ ঘটনার সম্পর্ক কী?’

বাকুম বললেন, “উনি যখন জানতে চাইছেন তখন বলুন।’

নারেঙ বলল, ‘আমার বাবার নাম নাহুল খাম।’

রত্নসম্ভব বললেন, “তিনিই কি সেই নাহুল খাম, সেনাধ্যক্ষ? যিনি পলপটের হয়ে এই মন্দির নগরীর দখল নিয়েছিলেন?’

নারেঙ এবার একটু ইতস্তত করে বলল, ‘হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে? অনেকেই সে সময় পলপটের নির্দেশ পালন করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। তাছাড়া তাদের কোনও উপায় ছিল না।’

সন্ন্যাসী বললেন, “না, তেমন কিছু হয়নি, তবে নাহুল খামের নেতৃত্বে সে সময় বায়ুম মন্দিরে আক্রমণ চালানো হয়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করা হয়। আমি কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে এ মন্দিরে আত্মগোপন করি। সে সময় বায়ুম মন্দির থেকে এক প্রাচীন পুঁথি খোয়া গিয়েছিল। সে পুঁথি মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের সময়কালের বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তথা তাঁর অন্যতম পরামর্শদাতা বৌদ্ধ ভিক্ষু মহামঙ্গলের লেখা। তা থেকেই আপনার পিতা এ মন্দির সম্পর্কে জানতে পারেন, তাই তো? পলপটের পতনের পর শাস্তি এড়াতেই আপনার পিতাকে পরিবার নিয়ে ফ্রান্সে পালাতে হয়েছিল?’

বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা শুনে নারেঙ ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, “দেখুন, আপনি কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমার স্বর্গত পিতাকে এই আলোচনাতে টেনে এনে তাঁর সম্মানহানির চেষ্টা করছেন। প্রকারান্তরে তাঁকে পুঁথি চোর, খুনি বলছেন। আপনি সন্ন্যাসী ঠিকই, কিন্তু আমার পিতার সম্পর্কে অহেতুক বাজে কথা বললে আমিও কিন্তু আপনার সম্মান রক্ষা করে কথা বলতে পারব না।’

তার কথা শুনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন নারেঙের দিকে। তারপর বললেন, ‘একজন খুনি পিতার খুনি পুত্রের থেকে আমি কোনও শ্রদ্ধা বা সম্মান লাভ করতে চাই না।’

কথাটা শুনেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল নারেঙ। সে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বলল, ‘আপনি কিন্তু আমার ধৈর্যসীমা অতিক্রম করে যাচ্ছেন। এতক্ষণ আমি কথাটা বলিনি। কিন্তু এখন বলছি, আপনাকেও কিন্তু আমি মন্দিরের আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেছি। গতকাল রাতে এখানে আসার সময়ও আপনাকে মন্দিরের কাছে জঙ্গলের মধ্যে দেখেছি। বৃষ্টির রাতে আপনি জঙ্গলের মধ্যে কী করছিলেন? আমার তো ধারণা হচ্ছে, হেরুম আর বুলের সঙ্গে আপনিও তাদের কুকাণ্ডে যুক্ত। অনেক লোভী মানুষই সন্ন্যাসীর ভেক ধরে থাকে।”

নারেঙের কথা শুনে সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব উত্তেজিত না হয়ে শান্তস্বরে বললেন, ‘আমি নই, ওদের কুকর্মের সঙ্গী ছিলেন আপনি। এখন হেরুম আর বুলের মৃত্যু হয়েছে জেনে তাদের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে নিজে মুক্ত হতে চাইছেন। আপনি যা বলেছেন তার অর্ধেক হয়তো সত্য, কিন্তু বাকিটা মিথ্যা।”

নারেঙ বলল, ‘মনে হচ্ছে, আপনার মাথার গণ্ডগোল হয়েছে। আমিই তো প্রথমে কথাগুলো বললাম। তারপর স্বাগতর কথা শুনলাম। তার কথা শোনার আগে আমি তো জানতামই না যে, বুলও খুন হয়েছে।’

নারেঙের কথার মধ্যে যুক্তি আছে। অফিসার বাকুম কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করে একবার নারেঙের দিকে একবার সন্ন্যাসীর দিকে তাকালেন।

সন্ন্যাসী নারেঙের উদ্দেশে বলল, ‘গত রাতে স্বাগত গুপ্ত কক্ষের গোলকধাঁধা থেকে বেরবার সময় যে ব্যক্তিকে চকিতের জন্য দেখেছিল, সে ব্যক্তি আপনিই হবেন। আপনি অতিশয় ধূর্ত। যাতে আপনার ওপর কেউ সন্দেহ না করে তাই আপনি ফ্লাইট ধরে নমপেন গিয়ে আবার ফিরে এসে হেরুমদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। বুলের বুকে ছুরি বেঁধানো লাশ দেখে আপনি ওই গুপ্ত পথ থেকে স্বাগতদের অলক্ষে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারপর মন্দিরেই ছিলেন। হয়তো বা হেরুমের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। সকালবেলা যখন আমাদের গলার শব্দ পেলেন তখন আপনি ধরা পড়ে যেতেন এই ভয়ে নাতাশাকে উদ্ধারের অভিনয় করলেন। হেরুম যখন নাতাশাকে অপহরণ করে বা এই মন্দিরে তাকে আনা হয় তখন আপনি সম্ভবত নাতাশার সামনে উপস্থিত হননি, বা নাতাশা আপনাকে দেখেননি। তাই তাকে উদ্ধার করে জ্ঞান ফেরালে ভয়ের কোনও কারণ নেই ভেবেছিলেন আপনি।”

সন্ন্যাসীর কথা শুনে নারেঙ হেসে উঠে বাকুমকে বলল, ‘সন্ন্যাসীর মাথা হয় খারাপ হয়ে গিয়েছে, নইলে উনি কোনও কিছু লুকিয়ে আমাকে দোষীসাব্যস্ত করার চেষ্টা করছেন। উনি যা বলছেন, তা সবই হয় ওঁর অনুমান না হয় কল্পনা। আমি যে দোষী সে ব্যাপারে ওর কাছে কোনও প্রমাণ আছে কি?”

কথাটা শোনার পর সবাই তাকাল সন্ন্যাসীর মুখের দিকে তাকাল তার জবাবের অপেক্ষায়।

সন্ন্যাসী বলল, ‘নারেঙ যে হেরুমের সহযোগী হিসেবে চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল, ও যে একজন খুনি সে প্রমাণ একজনের মাধ্যমে আমি আপনাদের দিতে পারি।’

বাকুম বললেন, ‘কার মাধ্যমে ?’

রতুসম্ভব বলল, ‘প্রফেসর এখানে কাজ করবেন, সে খবর কোনওভাবে পাওয়ার পর একটা বাচ্চা ছেলেকে মন্দিরে নজরদারি করার জন্য ভয় দেখিয়ে এখানে এনে রেখেছিল বুল। তাকে একটা কুমিরের চামড়াও দেওয়া হয়েছিল, যেটা পরে সে বুকে হেঁটে ঘুরে বেড়াত। ছেলেটা এখানে আসার আগে অবশ্য মাসখানেক তাকে অন্যত্র লুকিয়ে রেখেছিল বুল। বলা যায় সে ছিল বুলের বন্দি। বুলের ভয়ে তার নির্দেশ মতোই সে পরিচালিত হতো। কিন্তু একটা ঘটনা দেখার পর সে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়ে মন্দির ছেড়ে পালায়, তারপর ঘটনাচক্রে বায়ুম মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হয়। আমি তার মুখ থেকেই ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা জানতে পারি।’

‘কী সেই ঘটনা?’ জিজ্ঞেস করলেন বাকুম।

রত্নসম্ভব বলল, ‘ফঙকে তাড়িয়ে দেয়নি নারেঙ। ফঙ সম্ভবত ওকে জানিয়ে দিয়েছিল কোনও নারীর কাছে সে গুপ্ত কক্ষে প্রবেশের সন্ধান পেয়েছে। তারই কোনও প্রমাণ দাখিলের জন্য রাতের অন্ধকারে সে নারেঙকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে। আর তাদের পিছনেই ছিল বুল। ফঙ নারেঙকে ব্যাপারটা বোঝাবার পর ফঙের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় বা পাছে ফঙ তার কথা টাকার লোভে অন্য কারও কাছে ব্যক্ত করে, সে জন্য বুল তাকে পিছন থেকে পাথরের মুগুর আঘাতে হত্যা করে। এরপর নারেঙ বুলকে সঙ্গে করে মন্দির ছেড়ে পিছনের একটা পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।’

সন্ন্যাসীর কথা শেষ হতেই নারেও চিৎকার করে বলে উঠল, ‘সব মিথ্যা বলছেন আপনি।’

রত্নসম্ভব বলল, ‘না, মিথ্যা নয়, সেই বালক আমার সঙ্গেই এখানে রয়েছে। সে মন্দিরের বাইরেই আছে। তাকে ডাকছি। তাকে ডাকলেই আমার কথার সত্যতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

সন্ন্যাসীর কথা শুনে মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গেল সবাই। আর এরপরই সবাইকে চমকে দিয়ে নারেঙ একটা কাজ করল। এক হাতে তার সেলফিস্টিকটা ধরে অন্য হাত দিয়ে তার হাতলে টান দিল। সেলফিস্টিকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা সরু সুতীক্ষ্ণ ছুরির মতো অস্ত্র— গুপ্তি! আর তারপর সে কাছেই বসে থাকা নাতাশার হাত ধরে তাকে একটানে উঠিয়ে নিয়ে তার পাঁজরে ফলাটা ঠেকিয়ে বলল, ‘কেউ যদি আমাকে যেতে বাধা দেয় তবে এ মেয়ের দেহে আমি ফুঁড়ে দেব। কেউ এক পাও নড়বে না।”

হতভম্ব সবাই। সবাই উঠে দাঁড়ালেও নারেঙকে এই মুহূর্তে বাধা দেওয়া উচিত হবে কি না তা স্বাগতরা কেউই বুঝতে পারল না। সত্যিই যদি সে অস্ত্রটা বসিয়ে দেয় নাতাশার শরীরে তা হলে কী হবে? নাতাশার মুখ মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছে। নাতাশার শরীরে অস্ত্রটা ঠেকিয়ে এরপর তাকে নিয়ে মন্দিরের বাইরে যাওয়ার জন্য এগতে শুরু করল। ঠিক এই সময় একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। কোথা থেকে যেন ঢিলের মতো একটা পাথর খণ্ড এসে লাগল নারেঙের মাথায়। মুখ দিয়ে একটা চিৎকার করে নিজের অবচেতনেই যেন সে নাতাশার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের মাথায় হাত দিল। আর সেই সুযোগে নাতাশাও তিরের মতো ছুটল অন্যদিকে। মুহূর্তের মধ্যে নারেঙ নিজের ভুল বুঝতে পারল। সে নাতাশার পিছনে না ছুটে ছুটল প্রাঙ্গণ ছেড়ে বাইরে পালাবার জন্য। আরও কয়েকটা পাথরের টুকরো এসে পড়ল ছুটন্ত নারেঙের গায়ে, আশপাশে। প্রাচীরের ওপর থেকে তাকে লক্ষ করে পাথর ছুঁড়ছে বাঁদরিটা! বাকুম রিভলভার বের করে নারেঙের উদ্দেশে বললেন, ‘তুমি থাম। নইলে আমি গুলি চালাব।’ নারেঙ কিন্তু থামল না। সে যখন প্রাঙ্গণের থেকে বাইরে বেরবার জন্য সিঁড়ির ধাপ বেয়ে দুই প্রাঙ্গণের মধ্যবর্তী ঘরগুলোতে প্রবেশ করতে চলেছে, ঠিক তখনই পুলিস অফিসার তাকে থামাবার জন্য শূনো গুলি চালালেন। সেই গুলি পাথরের দেওয়ালের মাথার দিকে কোথাও আঘাত করেছে কি না বোঝা গেল না। কিন্তু গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। নারেঙ তখন কয়েকধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করে ঘরগুলোর মধ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তার মাথায় ওপর থেকে খসে পড়ল একটা প্রাচীন মূর্তির মুণ্ড। সেই আঘাতে সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ল নারেঙ। বাকুম ও অন্য পুলিসকর্মীরা ছুটল তার দিকে। স্বাগতরাও ছুটল। নারেঙ উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু স্বাগতরা তার কাছে গিয়ে দেখল নারেঙের হাতের সূচ্যগ্র অস্ত্রটা কীভাবে যেন তার নিজের পাঁজরেই গেঁথে গিয়েছে! নারেঙ হাত দিয়ে টেনে সেটা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। বাকুম পুলিসকর্মীদের বললেন, ‘এখনই ওকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওকে বাঁচাতে হবে, ওর জবানবন্দি নিতে হবে।”

কথাটা কানে গেল নারেঙের। সে বিকৃত মুখে স্বাগতদের উদ্দেশে বলল, ‘তোরা আর কেউ কোনও দিন খোঁজ পাবি না ওই গুপ্ত কক্ষের। মরবি, তোরাও মরবি।’ —এ কথাগুলো বলতে বলতে জ্ঞান হারাল সে। পুলিসকর্মীরা তাড়াতাড়ি নারেঙের সংজ্ঞাহীন দেহটাকে নিয়ে বাইরের দিকে ছুটল তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অফিসার বাকুমও তাদের সঙ্গে এগলেন। তবে তিনি যাওয়ার আগে বলে গেলেন যে, তিনি পুলিসকর্মীদের রওনা করিয়ে দিয়েই ফিরে আসছেন। কেউ যেন এই প্রাঙ্গণ ত্যাগ না করে।

বাঁদরিটা তখনও একটা পাথরের টুকরো হাতে প্রাকারের ওপর বসে। সেদিকে তাকিয়ে বিক্রম বলল, ‘ঠিক যেন মানুষের মতো আচরণ করল তাই না? যেন ও বুঝতে পেরেছিল নারেঙকে পালাতে দেওয়া উচিত হবে না। হঠাৎ কেন ও পাথর ছুড়তে গেল নারেঙের দিকে?”

স্বাগত খেয়াল করল বিক্রমের কথা শুনে সেই পরিস্থিতিতেও মুহূর্তের জন্য যেন হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর ঠোঁটের কোণে। বাঁদরিটা অবশ্য আর প্রাকারের ওপর রইল না। লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে প্রাকার অতিক্রম করে মন্দিরের গা বেয়ে মন্দিরের মাথার ওপরের ছাদের দিকে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল!

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিসকর্তা বাকুম ফিরে এসে বললেন, “শ্বাস নিতে পারছে না লোকটা। মনে হচ্ছে শলাকাটা ওর ফুসফুসে বিঁধে আছে। ও হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে আপাতত আমার কাজ আমাকে করতে হবে। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। সেটা এবার আমাকে শুনতে হবে। তারপর যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা আমি নেব।’ বাকুমের নির্দেশ পালন করে সবাই আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসল। ঘটনার আকস্মিকতায় নাতাশা আবারও ভয় পেয়ে গিয়েছে। দাঁড়িয়ে কাঁপছিল সে। সুরভী তাকে জড়িয়ে ধরে নিজের পাশে বসাল। নাতাশাকে একটু ধাতস্থ হতে দেওয়ার জন্যই বসার পরও খানিকক্ষণ চুপ করে রইল সবাই। নাতাশা এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আপনারা কথা শুরু করুন। আমি ঠিক আছি।’

পুলিসকর্তা বাকুম নাতাশার কথা শোনার পর প্রফেসর রামমূর্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রফেসর তবে এবার আপনার বক্তব্য শুনি। আপনার নেতৃত্বেই মন্দিরের কাজ পরিচালিত হয়েছে। আর তারপর থেকেই মন্দিরকে কেন্দ্র করে নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার সূত্রপাত। প্রথমে ফঙ, তারপর হোয়াঙ। তারপর গত রাতে যদি বুল আর হেরুমের মৃত্যু হয়ে থাকে তবে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে চারজনের মৃত্যু হল আপনি এখানে এসে কাজ শুরু করার পর। হয়তো বা নারেঙও বাঁচবে না। এই শান্ত জায়গায় এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। কাজেই আপনার বক্তব্য পুলিসের তদন্তের স্বার্থে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রফেসর একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘এ দেশের সরকারের নির্দেশেই আমি এ মন্দিরে কাজ করতে আসি। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, এই মন্দিরে কাজ করব বলে আমি মন্দির নির্বাচন করিনি। সরকারি তরফেই আমাকে মন্দির নির্বাচন করে দেওয়া হয় কাজের জন্য। আমি মন্দিরে কাজের দায়িত্বগ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে আমার সঙ্গীরা মন্দিরে কাজ করতে আসেন। আমরা কাজ শুরু করি। তারপর একে একে ফঙ, নারেঙ খাম এদের আবির্ভাব ঘটে মন্দিরে। তবে পরপর কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে থাকায় আমিও ব্যাপারটা অনুমান করতে শুরু করি— আমাদের অলক্ষে অন্যকিছু ঘটনাও ঘটছে এই মন্দিরে। ওই যেমন মজুরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া, বাইরের প্রাঙ্গণে কুমিরের আবির্ভাব, বাচ্চা ছেলের হাতের ছাপের সন্ধান পাওয়া— এসব ঘটনা। আমার আরও একটা ধারণা হতে থাকে কেউ বা কারা রাতের অন্ধকারে অন্য কোনও পথে মন্দিরে প্রবেশ করছে। বেশ কয়েকদিন রাতে আমি ঘর থেকে বাইরেও বেরিয়েছিলাম। কখনও আমি মন্দিরে ঢুকেছিলাম, আবার কোনও রাতে আমি মন্দিরের আশপাশেও ঘুরে বেড়িয়েছি। কয়েকবার আমার মনে হয়েছিল একটা ছায়ামূর্তি যেন মন্দিরের ভিতর বা জঙ্গলের ভিতর মুহূর্তর জন্য দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল! কোনও সময়ে মূর্তিটিকে আমার মনে হয়েছে নারী, আবার কখনও বা পুরুষ! প্রাথমিক অবস্থায় আমি ব্যাপারগুলো আমার সহকর্মীদের কাছে জানাইনি, কারণ ওদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে বলে। বিশেষত নাতাশা এসব ঘটনা শুনলে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারে। আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত কোনও কিছুরই কিনারা করতে পারছিলাম না। তবে আমি মন্দির সম্পর্কে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বা তাদের আচরণে বুঝতে পারি, এই মন্দিরে কোনও গুপ্ত জিনিস রয়েছে। কেউ তার অনুসন্ধানের চেষ্টা করছে আবার কেউ বা চাইছে যাতে আমরা তার সন্ধান না পাই।’—এ কথাগুলো বলে মুহূর্তের জন্য থেমে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর দিকে তাকালেন রামমূর্তি।

স্বাগতর মনে পড়ে গেল বায়ুম বুদ্ধ মন্দিরে রত্নসম্ভবের ঘরের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা তাঁর ও প্রফেসরের মধ্যে কথোপকথন। রামমূর্তি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘যাই হোক আমি সেই গুপ্তধন বা গুপ্তকক্ষতে প্রবেশ করতে পারিনি, এমনকী এই মন্দিরের পরিচয়ও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে স্বাগত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের কথা শুনে, গত রাতে বা আজ একটু আগে পর্যন্ত যা ঘটল তা দেখে কয়েকটা ব্যাপার আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ওই যেমন মন্দিরে কুমিরের ব্যাপারটা, নারী মূর্তি দেখার বা ছায়ামূর্তি দেখার ঘটনাগুলো। স্বাগতর কথা শুনে জানলাম সত্যিই এই মন্দিরে এক গোপন কক্ষ আছে। আর গুপ্তধন বা অন্য কোনও মূল্যবান জিনিস উদ্ধারের জন্য যে হেরুম, বুল আর নারেঙকে নিয়ে গুপ্তধন বা ওই গুপ্তকক্ষ অনুসন্ধানের বা ওই গুপ্তকক্ষে পৌঁছবার জন্য ভয়ঙ্কর খেলায় লিপ্ত হয়েছিল তা তো এখন আমাদের সকলের কাছেই পরিষ্কার। হয়তো বা হেরুমই ওই মজুরকে কোনওভাবে কাউকে দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল মন্দির সম্পর্কে আমাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবার জন্য। যাতে আমরা রাতে কেউ মন্দিরে একলা প্রবেশ না করি, রাতে এ মন্দিরে তাদের আনাগোনা দেখতে না পাই সে জন্য।’

এবার তাঁর কথার মাঝখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বলল, ‘হ্যাঁ, এই ঘটনাটা ঠিক। বাচ্চা ছেলেটা আমাকে বলেছে যে, ঘটনার আগের রাতে বুল মন্দিরে এসেছিল। সে মন্দিরেই লুকিয়েছিল। সম্ভবত বুলই ধাক্কা দেয় ওই মজুরকে। বুল আর একজন রাতে আসা-যাওয়া শুরু করেছিল এই মন্দিরে। শেষের দিকে বুল নাকি তার দোকানের বড় কুমিরের চামড়াটাও এনেছিল। প্রয়োজনে সে সেটা পিঠে বেঁধে ঘোরাফেরা করত।

প্রফেসর তার কথা শুনে বললেন, ‘আমার সঙ্গীরা তবে ওই বাচ্চা ছেলেটা আর বুলকেই কুমির ভেবেছিল!’

বাকুম প্রশ্ন করলেন, “হেরুমের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয় কীভাবে?”

প্রফেসর বললেন, ‘সরকার যখন আমাকে এখানে এই মন্দিরে কাজের দায়িত্ব দেন, তখন আমি কাজ করবার স্থানীয় মজুরদের সন্ধান শুরু করি। কারণ, ভারত থেকে আর্কিওলজি বিভাগের মজুরদের এখানে এনে, রেখে তাদের দিয়ে কাজ করানো বেশ ব্যয়সাধ্য ছিল। সেই কারণেই স্থানীয় মজুরদের সন্ধান করি। এখানকার কর্তৃপক্ষ মজুর সংগ্রহের দায়িত্ব আমার ওপরেই চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজুরদের সন্ধান পেলেও আমি তাদের কাউকেই রাজি করাতে পারছিলাম না এই মন্দিরে কাজ করবার জন্য। কারণ তাদের সকলেরই বক্তব্য ছিল, মন্দিরে নাকি ভূত আছে। ভূতের হাতে প্রাণ খোয়াতে তারা রাজি নয়। এক বিকালে যখন আমি মজুর খোঁজার জন্য সিয়েমরিপ গিয়ে সেখান থেকে এখানে ফিরি, তখন দেখি একজন বেশ শক্তপোক্ত চেহারার স্থানীয় লোক তোরণের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে। তাকে প্রথমে দেখে আমি বেশ অবাক হয়ে যাই। সে আমার কাছ এসে বলে আমার সন্ধানেই সে এখানে এসেছে, আমাকে খুঁজতেই সে মন্দিরে ঢুকেছে। তার নাম হেরুম। সে শুনেছে যে আমি এ মন্দিরে কাজ করার জন্য কুলি-মজুরদের খুঁজছি। সে সেই কাজই করে। প্রয়োজনে সে আরও কয়েকজন লোকও জোগাড় করে দিতে পারে কাজের জন্য। তার সঙ্গে মজুরি ইত্যাদি বিষয়ে সাধারণ কিছু কথাবার্তার পর আমি রাজি হয়ে যাই তাকে কাজে নিয়োগ করতে। পরদিন থেকে সে কিছু লোকজন সঙ্গে এনে কাজ শুরু করে। হেরুমের সঙ্গে এভাবেই আমার পরিচয়। ও যে মূলচক্রী তা আমি ঘুণাক্ষরে টের পাইনি। ও আরও একটা কথা। যেদিন সকালে আমি সিয়েনরিপে গিয়েছিলাম, সেদিন রাতে মন্দির চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিলাম। সে রাতে আমি দু’জন লোককে খানিক দূর থেকে দেখতে পাই। তবে তাদের পরনে বর্ষাতি আর টুপি থাকাতে আমি তখন তাদের চিনতে পারিনি। ওদিক থেকে এসে তারা মন্দিরের দিকে এগল। আমিও দূরত্ব বজায় রেখে তাদের অনুসরণ করলাম। আমি যখন মন্দির চত্বরে এসে উপস্থিত হলাম, তখন তাদের আর দেখতে না পেয়ে বুঝতে পারলাম তারা তোরণ অতিক্রম করে মন্দিরে প্রবেশ করেছে। আমিও তোরণ অতিক্রম করে এই জায়গা পর্যন্ত এলাম। তারপর মন্দিরের ভিতরেও ঢুকলাম। ওপর তলায় একটা শব্দ পেয়ে ওপরেও উঠলাম। তারপর আমি আর তাদের খুঁজে পাইনি। এখন বুঝতে পারছি ওরা বুল আর হেরুম হবে। সম্ভবত ওরাই হোয়াঙকে খুন করেছে। পুলিসি ঝামেলা এড়াতে মিস্টার বাকুম, আপনাকে এই কথাটা আমি জানাব কি না তা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কিন্তু এখন কথাটা জানালাম। আর গত রাতের ঘটনা তো আপনারা সবাই জানেন। আমার যা জানাবার ছিল তা আপনাদের কাছে জানালাম।’

প্রফেসর রামমূর্তি তাঁর কথা শেষ করার পর বাকুম বললেন, ‘ওইদিন রাতের প্রসঙ্গ যখন উঠল, তখন আমার আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। ওইদিন রাতে আপনি কি মন্দিরের আশপাশে টহল দেওয়ার জন্য বাইরে বেরিয়েছিলেন নাকি বাইরে বেরবার পিছনে অন্য কোনও কারণ ছিল? ওইদিন আপনি সিয়েমরিপ গিয়েছিলেন। আমার কাছে এও খবর আছে যে, আপনি হোয়াঙের জুয়ার আড্ডাতেও গিয়েছিলেন। সোর্স মারফত আমি খবরটা পেয়েছি। হোয়াঙের মতো লোকের সঙ্গে আপনার মতো লোকের কীসের যোগাযোগ ছিল? ব্যাপারটা এমন নয় তো যে আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য বা আপনার ডাকে সাড়া দিয়েই হোয়াও এখানে এসেছিল আর তারপর…’

বাকুম তাঁর শেষ বাক্যটা সম্পূর্ণ না করলেও তাঁর কথার মধ্যে যে হোয়াঙের হত্যাকাণ্ডর ব্যাপারে প্রফেসরের প্রতি একটা সন্দেহের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে অসুবিধা হল না স্বাগতর।

প্রফেসরও বাকুমের বাচনভঙ্গির ইঙ্গিতটা ধরতে পারলেন। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘ডলার ভাঙাতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। হ্যাঁ, এ কথা ঠিকই তার থেকে পরবর্তীকালে আমি কিছু ঋণ নিয়েছিলাম সুদের বিনিময়ে। সে ঋণ আমি ব্যক্তিগত কারণে নিইনি। এই মন্দিরে কাজ করার জন্য সরকারি তরফে কাজের খরচ বাবদ কিস্তিতে টাকা দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে। প্রথমে দফায় আমাকে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল তা সামান্যই। তা ব্যয় হয়ে যায় বাসস্থান নির্মাণ, আলোর ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি কেনা এ সব কাজেই। তাই, পরবর্তীতে কাজ শুরু করার জন্য শ্রমিকদের মজুরি, আমার সহকর্মীদের ভরণপোষণের কথা চিন্তা করে আমি তার থেকে ঋণ গ্রহণ করি। অন্য কয়েক জায়গাতেও আমি ঋণের জন্য খোঁজখবর করেছিলাম। তারা চড়া সুদ দাবি করেছিল। এ কথা ঠিকই হোয়াঙ আমাকে মাঝেমধ্যে আকার ইঙ্গিতে বলত যে, আমি যদি এই মন্দিরের কোনও প্রত্নবস্তু তার কাছে বিক্রি করি, তবে সে ভালো দাম দেবে। কারণ, তার জুয়ার আড্ডায় আসা অনেক বিদেশি নাকি ওসব জিনিসের খোঁজ করে। স্বাভাবিকভাবেই আমি তার প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ফঙ খুন হয়ে যাওয়ার পর হেরুম আমাকে জানায় যে, আগের দিন নাকি ফঙের সঙ্গে হোয়াঙকে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। তার কথার মধ্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যে, হোয়াঙও ফঙকে খুন করে থাকতে পারে। আমি সিদ্ধান্ত নিই হোয়াঙের সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ রাখা ঠিক হবে না। আমি হোয়াঙ খুন হওয়ার আগে তার জুয়ার আড্ডায় গিয়েছিলাম। তার টাকা পরিশোধ করার জন্য। আমি আরও টাকার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম, তা ইতিমধ্যে মঞ্জুর হয়। আপনি খবর নিয়ে দেখতে পারেন ওইদিন প্রথমে আমি সিয়েমরিপে ব্যাঙ্কে গিয়ে প্রথমে টাকা তুলি, তারপর হোয়াঙের সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমার টাকা তোলার ব্যাপারটা প্রত্ন অধিকর্তা কিমও বলতে পারবেন, কারণ তিনি ব্যাপারটা অনুমোদন করেন। যাই হোক সেদিন আমি হোয়াঙকে টাকা পরিশোধ করতে গেলে হোয়াঙ আমাকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানায়। গাইড ফঙ খুন হওয়ার আগে সে সত্যি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। সে হোয়াঙকে বলেছিল, এই মন্দিরে গুপ্তধন লুকানো আছে। এক নারীর কাছে সে সন্ধান পেয়েছে গুপ্তধন যেখানে আছে সে পথের। মন্দির সংলগ্ন জঙ্গলেই নাকি সে থাকে। ওই নারী ফঙয়ের বহুদিনের চেনা। হোয়াঙ আমাকে বলে আমরা দু’জন যদি সে নারীকে খুঁজে বের করতে পারি, তবে গুপ্তধন পাওয়া যেতে পারে। তবে তা উদ্ধার হলে হোয়াঙকে তার আধা বখরা দিতে হবে। হোয়াওয়ের সঙ্গে আমি ফঙের কথোপকথন জেনে অবাক হলেও তার এই প্রস্তাবে সম্মত হইনি। সে তখন আমাকে বলে যে, রাতে এদিকে ব্যাঙ ধরতে আসবে। আমি যেন প্রস্তাবটা ভেবে দেখি। প্রয়োজনে রাতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। সিয়েমরিপ থেকে এখানে ফিরে আসার পর আমার মনে হয়, হোয়াঙ রাতে ওই নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এখানে আসছে না তো! হয়তো ফঙ সেই নারীর পরিচয় জানিয়ে দিয়েছে হোয়াঙকে। এই ভাবনাটা ক্রমশ সঞ্চারিত হয় আমার মধ্যে। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে জঙ্গলের মধ্যে হোয়াঙ কোনও নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে কি না সে আগ্রহও আমাকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তবে হোয়াঙের দেখা আমি বর্ষণ সিক্ত জঙ্গলের মধ্যে বেশ খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেও পাইনি। তারপর ওই দু’জন লোককে দেখে তাদের অনুসরণ করে আমি মন্দিরে ফিরে আসি।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন রামমূর্তি।

ঠিক এই সময় বাকুমের ফোন বেজে উঠল। ফোন কলটা রিসিভ করে ওপাশের বক্তব্য শুনে নেওয়ার পর বাকুম বললেন, ‘না, নারেঙ খামকে বাঁচানো গেল না। হাসপাতালে পৌঁছবার আগেই তার মৃত্যু হল!’

এ কথা বলার পর তিনি প্রফেসরকে বললেন, ‘আপনারা কেউই তো দেখছি সন্দেহের ঊর্ধে নন। এমনও তো হতে পারে হোয়াঙের ব্যাপারে আপনি যে কথাগুলো বললেন, তা সম্পূর্ণ সত্যি নয়? সে রাতে আপনার সঙ্গে হোয়াঙের দেখা হয়েছিল?’

পুলিস অফিসারের কথা শুনে প্রফেসর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘যা সত্য ঘটনা সেটাই আমি বলেছি। আমার সম্পর্কে যদি আপনার অন্য কিছু ধারণা হয়, তবে আপনি তদন্ত করে দেখতে পারেন।’

বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবার মুখ খুললেন। তিনি বললেন, ‘সে রাতের ঘটনা সম্পর্কে প্রফেসর সত্যি কথাই বলছেন, কারণ, সে রাতে আমিও জঙ্গলে ছিলাম। প্রফেসরকে আমি মন্দির ছেড়ে জঙ্গলে প্রবেশ করার পর অনুসরণ করি। তিনি তারপর কিছুক্ষণ জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করার পর ওই লোক দু’জনকে দেখে তাদের অনুসরণ করে মন্দিরে ফিরে আসেন।’

স্বাগত এবার বলল, ‘সেদিন ওই খামের যুবতীর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসার সময় জঙ্গলের মধ্যে হোয়াঙের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। আমাকে সে বলেছিল ব্যাঙ ধরতে সে এখানে এসেছে।’

সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের কথা শুনেই সম্ভবত পুলিস অধিকর্তা আর প্রফেসরকে কিছু প্রশ্ন করলেন না। তিনি সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘এবার আপনি আপনার কথা বলুন?’

সন্ন্যাসী বলতে শুরু করলেন, “এ মন্দিরের সঙ্গে আমার বহু পুরনো পরিচয়। স্থানীয় মানুষ হিসাবে তো বটেই। তাছাড়া পলপটের আমলে যখন তাঁর এক সহচর নাহুল এই জায়গায় এসে উপস্থিত হল, বায়ুম বুদ্ধ মন্দির সহ অন্য বুদ্ধ মন্দিরগুলো আক্রমণ শুরু করল, নির্বিচারে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সাধারণ মানুষদের হত্যা করতে শুরু করল, তখন আমি জঙ্গলাকীর্ণ এই প্রাচীন মন্দিরে এসে দীর্ঘকাল আত্মগোপন করেছিলাম। তারপর খামের রুজ প্রধান কমিউনিস্ট শাসক পলপটের পতন ঘটল। আমি আবার স্বস্থানে বায়ুম মন্দিরে ফিরে যাই। এই মন্দিরের ভিতর আমার সবকিছু চেনা শুধু ওই গোপন কক্ষ ছাড়া। যদিও মন্দিরে এক গোপন কক্ষ আছে, তা আমার জানা ছিল প্রাচীন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গলের প্রাচীন পুঁথির সূত্র ধরে। পালি ভাষায় রচিত সেই পুঁথির বেশ খানিকটা অংশ আমি পালি থেকে খামের ভাষাতে অনুবাদও করি। ওই নাহুলের আক্রমণের সময় সেটাও পুঁথির সঙ্গে খোয়া যায়। সম্ভবত তা পাঠ করেই এ মন্দিরে লুকানো গুপ্তকক্ষ সম্পর্কে জেনেছিল নাহুল বা তার দলের কেউ। যদিও ওই গুপ্তকক্ষের হদিশ এই মন্দিরের কোথায় তা পুঁথিতে লেখা ছিল না। আর আমার অনুবাদও অসম্পূর্ণ ছিল। তবে আমি নিজে মূল পুঁথিটি পাঠ করেছি বলে জানি সন্ন্যাসী মহামঙ্গল তাঁর লেখায় ওই প্রাচীন কক্ষে প্রবেশ করতে নিষেধ করে গিয়েছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের তিনি জানিয়ে গিয়েছিলেন, ‘ওই প্রাচীন স্থানের দ্বার উন্মুক্ত হলে সমগ্র বিষ্ণুলোকে প্রচণ্ড বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে।’ তাই আমি সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করিনি। কেউ সেখানে প্রবেশ করুক তাও চাইনি। দীর্ঘদিন জনমানবহীন অবস্থাতে পড়েছিল এই মন্দির। আমি মাঝে মধ্যে ঔষধি জড়ি-বুটির সন্ধানে এলে মন্দিরটা এসে দেখে যেতাম। মন্দির চত্বরে এসে তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে উঁকি দিয়ে যেতাম কোনও কোনও দিন। দেখতাম যেমনই ছিল, তেমনই আছে এ নিঃসঙ্গ মন্দির। কিন্তু প্রফেসর এখানে আসার ক’দিন আগেই আমার মনে হয় এ মন্দিরে কাদের যেন আনাগোনা শুরু হয়েছে। তোরণের সামনের অংশটা ওপর থেকে নেমে আসা লতাপাতা দিয়ে আবৃত ছিল। হাত দিয়ে তা সরিয়েই আমি মন্দিরের ভিতর উঁকি দিতাম। একদিন দেখলাম তার কয়েকটা ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে আছে। সেগুলো হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম ওগুলো বাঁদর ছেঁড়েনি। ওগুলো কোনও ধারালো জিনিস দিয়ে কাটা। কেউ বা কারা যেন তোরণের ভিতর ঢোকার সুবিধার্থে কয়েকটা লতাগুল্ম কেটেছে। আর একদিন মন্দির চত্বরে উঠে আসার পর তোরণের ভিতর থেকে বাঁদরদের চিৎকার শুনতে পেলাম। ওদের আচরণ আমি বুঝি। বায়ুম মন্দিরে প্রচুর বাঁদর আছে। মানুষ দেখলে বা বিজাতীয় প্রাণী দেখলে ওরা অনেক সময় ভয় বা অসন্তোষে উত্তেজিতভাবে এমন কোলাহল করে। আমি সেই চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি এসে তোরণের ভিতর উঁকি দিলাম ঠিকই, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। তবে আমি অনুমান করলাম, কেউ মন্দিরের ভিতরে আছে। এ মন্দিরের পিছন দিকে একটা প্রবেশ পথ ছিল। বিষ্ণুলোক থেকে একটা পথ ধরে সেই প্রবেশপথে পৌঁছনো যায়। বহু শত বৎসর পূর্বে মন্দিরে প্রবেশের সে পথ পাথর দিয়ে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কালের নিয়মে সেখানে পাথর খসে গিয়ে একটা ফোকরের সৃষ্টি হয়েছে। একদিন সেখানে গিয়ে দেখলাম আধপোড়া একটা সিগারেটের টুকরো আর পায়ের ছাপ। বুঝলাম মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আমি নজর রাখতে শুরু করলাম এই মন্দিরের ওপর। শেষ রাতে আমি এদিকে চলে আসতাম। মন্দিরটা দেখার জন্য। লতা-গুলা সংগ্রহর জন্য। বুল তখন হেরুমের নির্দেশে এখানে যাওয়া-আসা শুরু করেছে। শুধু নজরদারির জন্য নয়, হয়তো বা ছেলেটাকে ভবিষ্যতে বলি দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল ওদের। সে পালানোতে ওরা নাতাশাকে নির্বাচন করে সে কাজের জন্য। শিশু বা দুর্বল প্রকৃতির মানুষদের এ কাজে নির্বাচন করলে কাজের সুবিধা হয়। যাই হোক এরপর প্রফেসর এসে উপস্থিত হলেন, আমার সঙ্গে তার পরিচয় হল। আমি তাকে এই মন্দিরে কাজ করতে নিষেধ করলাম, কিন্তু তিনি নিষেধ শুনলেন না। তারপর দুর্ঘটনাগুলো ঘটতে থাকল। ফঙের মৃত্যুর পরই আমি অনুমান করতে পারি, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনা ঘটার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। সামনেই আষাঢ় পূর্ণিমার রাত আসছে। মহামঙ্গলের পুঁথিতে বলা ছিল ভবিষ্যতে কোনও এক আষাঢ় পূর্ণিমার রাত এই মন্দিরের পক্ষে শুভ নাও হতে পারে। ইতিমধ্যে বাচ্চা ছেলেটাও আমার কাছে পৌঁছে গেল। তার কথা শোনার পর ব্যাপারটা আমার কাছেও স্পষ্ট হয়ে গেল। তবে আমি নিজের চোখে কাউকে খুন হতে দেখিনি। আর বাচ্চা ছেলেটাও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে পালানোর কারণ আমার কাছে ব্যক্ত করেনি। শেষে গতকাল সন্ধ্যায় সে আমাকে বলে ফঙ খুন হওয়ার দেখার ব্যাপারটা। তবে সব থেকে ধূর্ত হল হেরুম। সে সবসময় সারা শরীর আর মুখ ঢেকে মন্দিরে প্রবেশ করত। যার ফলে বাচ্চাটা তাকে চিনে উঠতে পারেনি। এমনকী জঙ্গলেও যখন রাতে ঘুরে বেড়াত তখনও সে আপাদমস্তক ঢেকেই ঘুরে বেড়াত, তাই আমি তাকে চিনতে পারিনি। বাচ্চা ছেলেটার মুখে গতকাল আমি ফঙকে কে হত্যা করেছে সেটা জানতে পারি। আর যে পুলিসকর্মীরা নাতাশার খোঁজে বিভিন্ন জায়গাতে খোঁজখবর করছিল, তারা গতকাল দুপুরের দিকে বায়ুম মন্দিরের দিকেও গিয়েছিল। তাদের মুখ থেকে আমি জানতে পারি নাতাশার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা। আমি অনুমান করতে পারি, ভয়ঙ্কর ঘটনাটা কাল আষাঢ় পূর্ণিমার রাতেই ঘটতে পারে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার পর আমি বাচ্চাটাকে সঙ্গী করেই এখানে এলাম। মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ না করলেও আমি মন্দিরের প্রবেশপথে কিছু মন্ত্রপূত জিনিস ছড়িয়ে দিই যদি তার সাহায্যে অঘটন রোখা যায় সে জন্য। কিন্তু তা বৃষ্টির জলে ধুয়ে গিয়েছিল। এরপর আমি আর বাচ্চাটা কাছেই জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে থাকি, লক্ষ রাখি মন্দিরের ওপর। মাঝরাতে আমি দেখতে পাই স্বাগত এক নারী মূর্তির সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করল। আমি জঙ্গলের আড়াল থেকে লক্ষ করতে লাগলাম মন্দির তোরণ। মৃদু অস্পষ্ট শব্দও যেন ভেসে আসতে লাগল মন্দির থেকে। রাত এগিয়ে চলল একসময় দরজা ধাক্কানোর শব্দ আর হাঁক-ডাক শুরু করলেন প্রফেসরের সহকর্মীরা। আমার কী করা উচিত, তা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আর এরপরই আমি দেখলাম সেই নারী মূর্তিকে।