Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৭

পর্ব ০৭

সেই প্রাচীন তোরণ অতিক্রম করে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল সকলে। এই প্রাঙ্গণও জঙ্গল আবৃত ছিল। তবে শ্রমিকের দল কয়েক সপ্তাহের প্রচেষ্টাতে জায়গাকে পরিষ্কার করে ফেলেছে। বিক্ষিপ্তভাবে চত্বরটাতে ছড়িয়ে আছে কাটা গাছের গুড়ি আর বিভিন্ন ভাঙা মূর্তি, স্তম্ভ থেকে খসে পড়া পাথরের ফলক আর পাথরের টুকরো। প্রাঙ্গণের মাঝখানে এসে রামমূর্তি থামলেন। স্বাগতদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির। উচ্চতা আনুমানিক আশি ফুট মতো হবে। মন্দিরের মাথার ওপর একটা গাছ দেখা যাচ্ছে। সেটা ছাদেই জন্মেছে নাকি ছাদ ফুঁড়ে আকাশে উঠেছে তা বাইরে থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে তার থেকে নেমে আসা মোটা মোটা ঝুরি বা শিকড়গুলো আবৃত করে আছে কাঠামোটাকে। একইভাবে মন্দিরের গায়ের দুটো গাছের ডালপালাও আলিঙ্গন করে রেখেছে মন্দিরকে। মোটা মোটা সব শিকড় আর ডাল। দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশাল কয়েকটা ময়াল সাপ আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গন করে রেখেছে। আগলে রেখেছে হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরকে। তবে তার প্রবেশ মুখ উন্মুক্ত করে ফেলেছে শ্রমিকরা। প্রাঙ্গণের দু’পাশে স্তম্ভ যুক্ত অলিন্দ সমৃদ্ধ সার সার কক্ষ আছে। যা গিয়ে মিলিত হয়েছে মন্দিরের সঙ্গে। সেই অতিপ্রাচীন কাঠামোর দিকে তাকিয়ে রামমূর্তি বললেন, ‘এই প্রাচীন গাছগুলোর জন্যই সম্ভবত মন্দিরটা আজও দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের গায়ের ভিতরের গাছ কাটার কাজ খুব সাবধানে করতে হবে। নইলে হয়তো দেখা গেল কোনও গাছের শিকড় সরাতে যেতেই পুরো মন্দিরটাই হুড়মুড় করে ধসে পড়ল! আজ আমরা এই প্রাঙ্গণটা জরিপ করব, বিভিন্ন মূর্তি, পাথরের টুকরোগুলোর পরিমাপ করব। এসব কাজ করতেই আমাদের বেশ কয়েকটা দিন কেটে যাবে। আর ওদিকে শ্রমিকরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকে কাজ করবে। আজই ওরা প্রথম মন্দিরে ঢুকবে, আমরাও ঢুকব। হয়তো এই প্রাচীন মন্দির আমাদেরই পদার্পণের অপেক্ষায় ছিল এতদিন। মন্দিরের ভিতরটা একটু দেখে নিয়ে শ্রমিকদের তাদের কাজ বুঝিয়ে বাইরে এসে তোমাদের নিয়ে কাজ শুরু করব। আমাকে অবশ্য দু’দিকের কাজের খেয়ালই রাখতে হবে।’ এ কথা বলে তিনি শ্রমিকদের মধ্যে একটা শক্তপোক্ত চেহারার লোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চল হেরুম, তোমার লোকদের নিয়ে এবার মন্দিরের ভিতরে ঢোকা যাক?’

হেরুম নামের লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল রামমূর্তি স্যরের কথায়। রামমূর্তি স্বাগতদের বললেন, ‘হেরুম হল শ্রমিকদের দলপতি। তারই নেতৃত্বে কাজ করে অন্যরা।’

সকলে এরপর এগল মন্দিরের প্রবেশমুখের দিকে। তবে এ মন্দিরের প্রবেশদ্বারের মাথাতে কোনও বিষ্ণুর মুখমণ্ডল নেই। এমনও হতে পারে যে একসময় হয়তো ছিল, কিন্তু মহাকালের গর্ভে তা হারিয়ে গেছে। রামমূর্তি বললেন, ‘মন্দিরের ভিতরটা পরিষ্কার করা হলে লেজার পরিমাপ যন্ত্র দিয়ে কক্ষগুলো পরিমাপ করতে হবে। আর উন্মুক্ত জায়গাগুলো ফিতে দিয়েই পরিমাপ করব। যেমন বাইরের প্রাঙ্গণটাও ফিতের সাহায্যেই মাপব আমরা।’

শ্রমিক আর স্বাগতদের নিয়ে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের মুখে এসে দাঁড়ালেন রামমূর্তি। পূর্বমুখী এই মন্দিরের কপাটহীন প্রবেশ মুখ দিয়ে বাইরের আলো কিছুটা ভিতরে প্রবেশ করছে। স্বাগতরা ভিতরে একটা ছাদ যুক্ত বড় ঘরের মতো জায়গা দেখতে পাচ্ছে বাইরে থেকে। মন্দিরের ভিতরে একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করার পর রামমূর্তি প্রথমে এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবলভাবে আন্দোলিত হতে শুরু করল মন্দিরের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মাথার ওপরের গাছের শাখাপ্রশাখাগুলো। মন্দিরের মাথার ওপর থেকে ছোট ছোট পাথরের টুকরো আর ধুলো খসে পড়লে লাগল স্বাগতদের ওপর। মনে হল হঠাৎই যেন ঝড় উঠেছে মন্দিরের চারপাশে।

চমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পিছু হটে এল সকলে। আর এরপর তারা ওপর দিকে তাকিয়ে গাছগুলোর আন্দোলিত হওয়ার কারণটা বুঝতে পারল। প্রচুর বাঁদর আছে গাছগুলোতে। এতক্ষণ তারা পাতার আড়ালে বসে ছিল। স্বাগতরা তাদের উপস্থিতি বুঝতে পারেনি। মন্দিরের কাছে যেতেই লম্ফঝম্প শুরু করেছে প্রাণীগুলো। আর মন্দিরের মাথায় গাছের ডালের আঘাতে ধুলো খসে পড়ছে।

প্রীতম একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে সেটা গাছের মাথায় ছুঁড়ে মারতে যাচ্ছিল বাঁদরগুলোকে তাড়াবার জন্য। একই কাজ করতে যাচ্ছিল স্বাগতও। কিন্তু হেরুম সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ও কাজ করবেন না স্যর। বিপদ হবে। এখানকার বাঁদরদের পাথর ছুড়ে মারলে ওরাও পাল্টা পাথর ছুঁড়ে মারে। মন্দিরের মাথায় অনেক পাথরের টুকরো আছে। আমরা বিপদে পড়ে যাব। কাজ করতে পারব না। এখানকার বায়ুম মন্দিরেও অনেক বাঁদর আছে। একবার একজন সাহেব ব্যাপারটা না জেনে বাঁদরকে পাথর মেরেছিল। বাঁদরের দল খেপে গিয়ে লোকটাকে এমনভাবে পাথর ছুঁড়ে মারে যে লোকটা মারাই যায়। বায়ুম মন্দির গেলে দেখবেন এ ব্যাপারে সাইনবোর্ডে ট্যুরিস্টদের সাবধান করা আছে। আর তাছাড়া…।’ এই বলে থেমে গেল লোকটা।

‘তাছাড়া কী?’, জিজ্ঞেস করল বিক্রম। হেরুম একটু ইতস্তত করে বলল, ‘অনেক বাঁদরের মধ্যে মৃত মানুষের আত্মা বাস করে এইসব পুরনো মন্দিরে। জঙ্গলে দিনের বেলা তারা বাঁদরের রূপ ধরে ঘুরে বেড়ায়। পুরনো মন্দিরগুলোকে ওরা পাহারা দেয়। ওরা শান্ত না হলে ওদের খুশি করার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।’

রামমূর্তি আগেই স্বাগতদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে তারা যেন শ্রমিকদের এমন কিছু না বলে যে তা শুনে তাদের ধর্ম ভাবনা বা বিশ্বাসে আঘাত লাগে। কাজেই তারা হেরুমের কথা শুনে কোনও মন্তব্য করল না।

বাঁদরগুলোকে অবশ্য খাবার দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হল না। ধীরে ধীরে তাদের লাফানো ঝাঁপানো কমে এল। ছাদের ওপর থেকে ধুলো খসে পড়াও বন্ধ হল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাঁদরদের বিরাট দলটা কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। চারপাশের পরিবেশ আবার শান্ত হয়ে গেল। রামমূর্তি আবার এগলেন মন্দিরে প্রবেশের জন্য। এবার আর কোনও সমস্যার সৃষ্টি হল না। স্বাগত আর মজুরদের সঙ্গে নিয়ে রামমূর্তি প্রবেশ করলেন মন্দিরের ভিতর। বেশ বড় একটা ঘর, মাথার ওপর উঁচু ছাদ। সে ঘর থেকে তিনটে প্রবেশ পথ বেরিয়েছে ভিতরে যাওয়ার জন্য। আঙ্করের বিষ্ণু মন্দিরের মতোই এ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করেও বেশ ঠান্ডা অনুভব করল স্বাগতরা। এই ঘরের মতন জায়গা থেকে ভিতরে ঢোকার যে তিনটে পথ তার একটা লতাপাতার বেষ্টনী দিয়ে আবদ্ধ। আর একটি পথ রুদ্ধ হয়ে আছে মাথার ওপর থেকে পাথর খণ্ড খসে পড়ে। যতটুকু দেখে বোঝা যাচ্ছে তাতে রুক্ষ্ম হয়ে যাওয়া পথের ওপাশে অলিন্দ আছে। আর তৃতীয় পথটিতে কিছু ঝোপঝাড় থাকলেও তা ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা যেতে পারে। রামমূর্তি হেরুমকে বললেন, ‘যে দুটো পথ বন্ধ আছে তাদের মুখ থেকে ঝোপজঙ্গল পাথর সরিয়ে ফেলতে হবে। তার আগে যে পথটা খোলা তা দিয়ে এগিয়ে দেখি সামনে কতদূর যাওয়া যায়?’

এ কথা বলে তিনি স্বাগতর হাতে তাঁর একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে অন্য ব্যাগ থেকে একটা বড় টর্চ বার করলেন। হেরুম তার কোমর থেকে অনেকটা মাংস কাটার চপারের মতো দেখতে দা-এর মতো অস্ত্র বার করল। ধারালো অস্ত্রটার কয়েক কোপেই সাফ করে ফেলল, যে পথে তারা এগবে তার সামনের লতাগুল্মের ঝোপ। রামমূর্তি আর হেরুম একসঙ্গেই প্রবেশ করল দ্বিতীয় কক্ষটাতে। তারপর একে একে অন্যরাও প্রবেশ করলে সেখানে। রামমূর্তি টর্চের জোরালো আলো ফেললেন যে কক্ষে, সে কক্ষ থেকেও মন্দিরের ভিতরে যাওয়ার জন্য কপাটহীন দরজা আছে। তবে আলো না ঢুকতে পারার কারণে সে কক্ষে ঝোপজঙ্গল তেমন জন্মাতে পারেনি। গাছের কয়েকটা শিকড় শুধু ছাদ ফুঁড়ে দেওয়ালের কয়েকটা জায়গাতে নেমে এসেছে। কিন্তু ঘরের মেঝেতে পুরু ধুলো জমে আছে। ছাদ আর দেওয়ালের চুনটা খসে সম্ভবত ওই ধুলোর সৃষ্টি হয়েছে। অথবা বাইরে থেকে কোনওভাবে তা প্রবেশ করেছে ঘরে। বাতাসও বেশ কিছুটা ভারী ঘরটার মধ্যে। রামমূর্তি বললেন কত যুগ পরে যে আবার এই ধুলোতে মানুষের পদচিহ্ন পড়ল কে জানে! দুশো বছর, পাঁচশো বছর এমনকী তার চেয়েও বেশি বছর হতে পারে। এরপর তিনি এগিয়ে গেলেন একটা দেওয়ালের দিকে। ব্যাগ থেকে একটা বুরুশ বার করে দেওয়ালের এক জায়গায় ধীরে ধীরে ঘসতেই ধুলো সরে গিয়ে তার আড়াল থেকে অলঙ্করণ ফুটে উঠল। একটা ফুলের ছবি। হাজার বছর আগে কোনও নাম না জানা শিল্পী পাথরের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিল সে ফুল। রামমূর্তি হেরুমকে বললেন, ‘দেওয়ালের গা থেকে ধুলোগুলোও সরিয়ে ফেলতে হবে।’

পরপর এমন বেশ কয়েকটা ঘর এভাবেই অতিক্রম করল তারা। কোনও ঘর পুরো অন্ধকার, আবার কোনও ঘরে ছাদের ফাটল গলে ক্ষীণ আলো ঢুকছে। সে সব ঘরের দেওয়ালও পরীক্ষা করলেন রামমূর্তি। দেওয়ালের ধুলো সরালেই তার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে জ্যামিতিক নকশা বা অলঙ্করণ। একটা ঘরের দেওয়ালের ধুলো সরাতেই তার আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করল মানুষের হাতের একটা অংশ। সম্ভবত ধুলোর আড়ালে মানুষের ছবি রয়েছে। স্বাগত বলল, ‘দেওয়ালগুলো অনেকটা বিষ্ণু মন্দিরের গ্যালারির মতো মনে হচ্ছে।’

রামমূর্তি বললেন, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। দেওয়ালের ধুলো সরালে আসল ব্যাপারটা বোঝা যাবে।’

এরপর তারা একটা ঘরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল বাইরের আলো ঢুকছে সেখানে। একটা উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার আছে সেখানে। বাইরেটাও দেখা যাচ্ছে সে কক্ষ দিয়ে। তা দিয়েই বাইরে বেরিয়ে পড়ল সকলে। এবার তারা বুঝতে পারল সত্যিই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করা গেছে। প্রাঙ্গণের মতো ছাদহীন ফাঁকা একটা জায়গা। তার তিন দিকে স্তম্ভ সমৃদ্ধ ছোট, বড় নানান মন্দির বা কক্ষ। দ্বিতল বা ত্রিতলের মন্দিরের মতো কাঠামো রয়েছে। প্রতিটা তলের সম্মুখভাগে চওড়া ধাপ বা প্রাঙ্গণের মতো রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে সেই প্রাঙ্গণগুলো অতিক্রম করে ওপর দিকে উঠতে হয়। কিছু জায়গায় ওপরে ওঠার জন্য পাথরের সিঁড়ি আছে, আবার কিছু জায়গায় তা ধসে পড়েছে। ঠিক যেমন খসে পড়েছে মন্দিরগুলোর গা থেকে মূর্তি বা ছাদের কার্নিশের মতো অংশগুলো। যে জায়গাতে স্বাগতরা এসে দাঁড়িয়েছে তার মাথাটা উন্মুক্ত বলে পাখির ঠোঁট বা বাতাস এখানেও গাছের বীজ বয়ে এনেছে। যে কারণে এ জায়গা ও বিভিন্ন অংশে ঝোপজঙ্গল আর গাছপালা জন্মেছে। প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে ছোট পাথুরে রেলিং দেওয়া একটা ঘেরা জায়গা দেখতে পেয়ে রামমূর্তির পিছন পিছন সকলে গিয়ে উপস্থিত হল সে জায়গাতে। অনুচ্চ প্রাকার দিয়ে ঘেরা একটা জলাধার বা চৌবাচ্চার মতো অংশ রয়েছে সেখানে। গতকাল বিষ্ণু মন্দিরের বিভিন্ন প্রাঙ্গণেও এমন জলাধারের সঙ্গে স্বাগতদের পরিচয় করিয়েছেন রামমূর্তি। সে সব জলাধার থেকে জল নিয়ে একসময় মন্দিরের নানান কাজে ব্যবহার করা হতো। আনুমানিক বারো ফুট গভীর শুষ্ক জলাধারের ভূমিতল সংলগ্ন একটা বেশ গহ্বর আছে। সম্ভবত ওই পথেই একসময় জল প্রবেশ করত জলাধার বা চৌবাচ্চায়। তবে বিষ্ণুলোকের প্রাঙ্গণে যে জলাধারগুলো আছে তাতে সিঁড়ি আছে নীচে নেমে জল সংগ্রহ করার জন্য। কিন্তু এই চৌবাচ্চার নীচে নামার জন্য কোনও সিঁড়ি নেই। তার পরিবর্তে প্রাকারের এক জায়গার ফাঁক গলে একটা ঢালু রাস্তা নেমে গেছে নীচের দিকে। জলাধারটা শুষ্ক, তার ভিতরেও আগাছা জন্মেছে। সেটা দেখার পর চারপাশে ওপর-নীচে তাকিয়ে রামমূর্তি বললেন, ‘বিষ্ণুলোকের মতো বিশাল না হলেও এ মন্দিরটাও কম বড় নয়। এই উপমন্দিরগুলোর আড়ালে কোথাও প্রধান মন্দির লুকানো থাকতে পারে। হয়তো সেখানে কোনও বিগ্রহও থাকতে পারে। যতক্ষণ না ভালো করে মন্দিরের সর্বত্র অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে ততক্ষণ জানা যাবে না এই মন্দিরে কোন দেবতা পূজিত হতেন?’

এ কথা বলে তিনি যেন স্বগতোক্তির স্বরেই বললেন, ‘কিন্তু যতদিন না এ মন্দিরটা কোন দেবতা বা দেবীর ছিল তা উদ্ধার করা যাচ্ছে ততদিন এ মন্দিরকে কী নামে ডাকা যায়?’

নাতাশা বলল, ‘বিষ্ণু মন্দির ছাড়া অন্য কোনও দেবতার মন্দিরও এখানে হতে পারে?’

রামমূর্তি বললেন ‘হ্যাঁ, পারে। দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের পূর্বসূরি খামের নৃপতিরা অনেকেই শৈব্য ধর্মের উপাসক ছিলেন। নানান বৈদিক দেবদেবী এমনকী 
স্থানীয় লৌকিক দেবতারও উপাসনা করতেন তাঁরা। তাঁদের উপাসনার জন্যও তো খামের স্থাপত্য শৈলীতেই নির্মিত মন্দির ছিল। সূর্যবর্মন এ স্থানে বহু মন্দির নির্মাণ করে জায়গাটাকে মন্দির নগরীতে রূপান্তর করেছিলেন এবং নিজে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি অন্য দেবতাদের মন্দিরগুলোকে বিনষ্ট করেছিলেন। তার পরবর্তীকালে বেশ কিছু রাজাও বৈষ্ণব ধর্মের পরিবর্তে অন্য দেবদেবীর উপাসনা শুরু করেন। এটা তেমন কোনও মন্দিরও হতে পারে। বিষ্ণুদেবের মুখমণ্ডল সে সময় এ অঞ্চলের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে কারণে এখানকার প্রত্যেক মন্দিরের প্রবেশ তোরণের মাথায় বিষ্ণুর মুখমণ্ডল স্থাপন করা হতো। বৌদ্ধধর্ম যখন এখানে রাজধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখনও এই একই কারণে ওই মুখমণ্ডলগুলো তোরণ বা মন্দিরের মাথা থেকে সরানো হয়নি। আঙ্করভাট আর বিষ্ণুর মুখমণ্ডল সমার্থক ব্যাপার বলা যেতে পারে।’

প্রীতম জানতে চাইল, ‘সরকারি নথিতে এ মন্দিরকে কী নামে ডাকা হয়েছে?’

রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘নামে নয়, সরকারি নথিতে এই মন্দিরকে চিহ্নিত করা হয়েছে সংখ্যা দিয়ে। ‘আন এক্সপ্লোর টেম্পল নম্বর থার্টিন’ বলে।’

একথা বলে একটা মজার ছলেই তিনি বললেন, ‘দেখা যাক এই তেরো নম্বর মন্দির আমাদের কাজের পক্ষে অশুভ না শুভ হয়?’

বিক্রম বলল, ‘আপাতত এই মন্দিরের একটা নাম আমার মাথায় এসেছে। আপনি অনুমতি দিলে বলতে পারি।’

রামমূর্তি বললেন, ‘কী নাম শুনি?’

বিক্রম বেশ গম্ভীরভাবে বলল, ‘প্রেতলোক।’ বিষ্ণুলোকের সঙ্গে বেশ মিল থাকবে এ নামে। এখানকার মানুষরা তো বিশ্বাস করেন যে যাঁরা বিষ্ণুলোকে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সেই সব প্রেতাত্মারা এসব মন্দিরে অবস্থান করেন। সেদিক থেকে ভাবলেও এই নামটাই আপাতত যুক্তিযুক্ত।’ বিক্রমের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন রামমূর্তি। তবে তিনি এ নাম গ্রহণ করলেন না বর্জন করলেন তা বোঝা গেল না। তিনি বললেন, ‘আমরা এখন আর এ জায়গার থেকে বেশি এগব না। আগে শ্রমিকরা এই চত্বর পর্যন্ত আগামী দু’দিনে পরিষ্কার করে ফেলুক তারপর আমরা মন্দিরের আরও ভিতরে ঢুকব। চল এবার বাইরে বেরনো যাক।’

শ্রমিকদের সর্দার হেরুমকে কীভাবে কাজ করতে হবে তা বুঝিয়ে দিতে দিতে সে জায়গা ত্যাগ করে বাইরে বেরবার জন্য এগলেন রামমূর্তি। তাকে অনুসরণ করল স্বাগত ও অন্যান্যরা।

সেই প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার আগে স্বাগতর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বিক্রম বলল, ‘প্রেতাত্মারা কিন্তু আমাদের ওপর লক্ষ রাখছে!’

স্বাগত জিজ্ঞেস করল, ‘তার মানে?’

বিক্রম আঙুল তুলে দেখাল একটা কার্নিশের দিকে। সেখানে একটা বেশ বড়সড় লালমুখো বাঁদর বসে ওপর থেকে দেখছে তাদের। বিক্রমের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে স্বাগত হেসে ফেলল। ঠিক যে পথ দিয়ে তারা মন্দিরের ভিতরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিল। আবার সেই পথ ধরেই অর্থাৎ অন্ধকার কক্ষগুলোকে অতিক্রম করে আবার বাইরের প্রবেশ তোরণ আর মন্দিরের মধ্যবর্তী চত্বরে ফিরে এল। দু’জন শ্রমিককে রামমূর্তি সেখানে নিজেদের সঙ্গে রাখলেন কাজের সহায়তার জন্য। আর হেরুম তার বাকি সঙ্গীদের নিয়ে আবার মন্দিরের ভিতরে চলে গেল তাদের কর্তব্য পালনের জন্য।

রামমূর্তি তাঁর ব্যাগ থেকে মাপার ফিতে, আরও কিছু যন্ত্রপাতি, ল্যাপটপ, কাগজপত্র বার করলেন। তারপর তিনি স্বাগতদের কীভাবে জায়গাটার, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা প্রস্তরখণ্ড, মূর্তি বা মূর্তির ভগ্নাবশেষগুলোর পরিমাপ করতে হবে তা বুঝিয়ে দিলেন। স্বাগতদের পাঁচজনের দলটাকে দুটোভাগে ভাগ করে কাজের দায়িত্ব দিলেন তিনি। নাতাশা, বিক্রম, প্রীতম চত্বরটার পরিমাপ করবে, স্বাগত আর সুরভী মূর্তি, ভাঙা পাথরের টুকরোগুলোর মাপজোক ও তাদের নাম্বারিং করবে। আর সব কিছুর তত্ত্বাবধান করবেন তিনি।

স্বাগত আর সুরভীকে তিনি চত্বরটার এক কোণে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা একটা মূর্তির সামনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘এটাই একমাত্র মূর্তি যেটা খণ্ডিত হয়নি। প্রথমে এটার মাপ নিতে হবে তিন ভাগে। মাথা ও গলার মাপ, দেহকাণ্ডর মাপ ও কোমরের নীচের পায়ের অংশের মাপ, দেওয়ালের গা থেকে খসে পড়া মূর্তিগুলো একই আকৃতির হয়। একটা মূর্তির পরিমাপ পাওয়া গেলে তার ওপর ভিত্তি করে অন্য মূর্তিগুলো জুড়তে সুবিধা হবে।’

এ কথা বলে তিনি নাতাশাদের কাছে চলে গেলেন তাদের নিয়ে পুরো জায়গাটার পরিমাপ করার জন্য।

কাজ শুরু হয়ে গেল স্বাগতদের। দু’জন শ্রমিকের সাহায্যে সাবধানে ধরাধরি করে সেই মূর্তিটাকে প্রথমে চিৎ করে শোয়ানো হল। মূর্তির নাকটা ভেঙে গেছে, তাছাড়া খুব বেশি ক্ষতি হয়নি সেই পুরুষ মূর্তির। স্বাগত আর সুরভীর মনে হল সম্ভবত এটা কোনও পাহারাদার বা গার্ডের মূর্তি। কারণ দু’হাত দিয়ে তার বুকের কাছে একটা দণ্ড ধরা আছে। এরপর মূর্তিটার মাপ নেওয়া শুরু হল। ওদিকে জায়গাটার পরিমাপ নেওয়ার কাজও শুরু হল। সময় এগিয়ে চলল। মূর্তিটার পরিমাপ নেওয়ার পর প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে থাকা মূর্তির খণ্ডিতাংশ, পাথরের টুকরোগুলোর পরিমাপও শুরু হল। বাইরে সকলের কাজের তদারকির সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে মজুরদের কাজও দেখে আসতে লাগলেন রামমূর্তি।