Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৯

পর্ব ০৯

স্বাগতদের আরও আধ ঘন্টা মতো সময় লাগল সিয়েমরিপ শহরে প্রবেশ করতে। ছোট শহর, তবে একটা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট আছে। যাঁরা পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে আঙ্করভাট সরাসরি এসে দেখতে চান তাঁরা ওই এয়ারপোর্ট ব্যবহার করেন। বলা যেতে পারে এ শহরটা পর্যটকদের শহর। মন্দির নগরীতে সাধারণ পর্যটকদের রাত্রিবাস করতে দেওয়া হয় না। আঙ্কর ভাট দেখার জন্য তাদের এখানেই থাকতে হয়। তাই অজস্র হোটেল রেস্তরাঁ গড়ে উঠেছে এখানে। তবে শহরটা বেশ সাজানো গোছানো সুন্দর। হোটেল ঘর বাড়িগুলো অনেকটা করে ফাঁকা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে। সারবদ্ধ দোকানগুলোর মাঝে চওড়া রাস্তা। তবে চার চাকার গাড়ির সংখ্যা কম, টুকটুক গাড়ির সংখ্যাই বেশি। হয়তো তার কারণ এ দেশের অর্থনীতি খানিকটা দুর্বল বলেই। প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেলেও অত্যাচারী শাসক পলপটের শাসনকালের ক্ষত এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি এ দেশ। রাস্তার মোড়ের আইল্যান্ডগুলোতে সাজানো আছে প্রাচীন সৌধের অংশ। কোথাও প্রাচীন মূর্তি, কোথাও কারুকাজ করা স্তম্ভ বা প্রাকারের অংশবিশেষ। বলাবাহুল্য মন্দির নগরীর থেকেই সংগ্রহ করে আনা হয়েছে এসব প্রাচীন স্থাপত্য। রাস্তা সংলগ্ন ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলেছে নানান জাতের মানুষ। মাথায় তালপাতার টোকা বা টুপিওলা কম্বোডিয়ান, মুণ্ডিত মস্তক, ভিক্ষাপাত্র হাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে সাদা চামড়ার পর্যটকরা। আর আছে চীনারা। রামমূর্তি বললেন, ‘বহু চীনা ব্যবসায়ী আছে এখানে। এখানকার প্রধান ব্যাঙ্কও চীনাদের দ্বারা পরিচালিত। তবে সাধারণ খামেরা খুব একটা পছন্দ করে না তাদের। কারণ তাদের রুটি রুজির ব্যাপারটা নাকি ধীরে ধীরে চীনা ব্যবসায়ীরা দখল করে নিচ্ছেন।’

চারপাশ দেখতে দেখতে এক সময় নিজেদের গন্তব্য পৌঁছে গেল স্বাগতরা। জায়গাটার নাম ‘ওল্ড মার্কেট’ অর্থাৎ পুরনো বাজার। রাস্তার দু’পাশে ঢালু কাঠ বা টিনের ছাদওলা সার সার দোকান। নানান ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি হচ্ছে সেখানে। তাছাড়া অন্য নানান জিনিসের দোকানও আছে সেখানে। প্রসাধনী দ্রব্য থেকে ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য সবকিছু বিক্রি হয় এখানে। দোকানগুলোর সামনে ফুটপাত দখল করে বসে আছে খামের রমণীরা তাদের ফলের পসরা নিয়ে। তার মধ্যে আছে ড্রাগন ফল আর অনেকটা কাঁঠালের মতো দেখতে স্থানীয় একরকম ফল। দু’পাশের দোকানের মধ্যবর্তী রাস্তাটা বেশ ঘিঞ্জি। বহু মানুষের ভিড়। তার মধ্যে কিছু বিদেশি ট্যুরিস্ট থাকলেও সাধারণ স্থানীয় মানুষেরই ভিড় বেশি। গাড়ি থেকে নেমে সকলে একজোট হওয়ার পর রামমূর্তি বললেন, ‘আমাদের এখানে বাজার করে মালপত্র সব গাড়িতে ওঠাতে অন্তত তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগবে। আগামী সাত দিনের রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যাব। এটাই এ শহরের একমাত্র বাজার যেখানে একসঙ্গে সবকিছু পাওয়া যায়। ওই যাকে বলে ‘আলপিন টু এলিফ্যান্ট।’

রামমূর্তির কথা শুনে বিক্রম প্রশ্ন করল, ‘এখানে কুমিরের মাংস পাওয়া যায় স্যর?’

তিনি এ প্রশ্নর জবাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, এখানে বেশ কয়েকটা হোটেলে কুমিরের মাংস পাওয়া যায়। আমরা তো অনেকটা সময় থাকব এখানে। ইচ্ছা হলে খেয়ে দেখতে পার। এখানে দামও সস্তা।’ নাতাশা এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমি কিন্তু ওসব হোটেলে খেতে যাব না। এ ব্যাপারটা আগেই জানিয়ে দিলাম।’

রামমূর্তিকে অনুসরণ করে এরপর বাজারের ভিতর প্রবেশ করল সকলে। বাজারের ভিতরটাও ঘিঞ্জি। লোকজনের ভিড় সেখানে। রামমূর্তি প্রথমে একটা দোকানে গিয়ে বেশ কয়েকটা বড় নাইলনের বস্তা কিনলেন রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিক্রম বলল, ‘স্যর, বস্তার বদলে ব্যাগ কিনলে হতো না? তাহলে আমরা দু’হাতে দুটো করে ব্যাগ টেনে নিয়ে যেতে পারতাম?’ তিনি হেসে বললেন, ‘তোমাদের কিছুই টেনে নিয়ে যেতে হবে না। অন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা আছে। কারণ, এখান থেকে চার্জ করা ভারী ব্যাটারি নিয়ে যেতে হবে। ওই গাড়ির লোকজনই ব্যাটারি আর মালপত্র বড় গাড়িতে তুলে নেবে। আর আমরা যেভাবে এসেছি সে ভাবেই ফিরব টুকটুক চেপে।’

স্বাগতদের নিয়ে বাজারের নানান অংশে নানান দোকানে জিনিস কেনার জন্য ঘুরতে শুরু করলেন তিনি। শাক-সব্জির দোকান থেকে শুরু করে গ্রোসারির দোকান। বেশ কিছুদিন যাবৎ এখানে থাকার কারণে কয়েকটা দোকান রামমূর্তির পরিচিত। সেসব দোকানের সঙ্গে স্বাগতদের পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। যাতে প্রয়োজনবোধে স্বাগতরা সব জিনিস নিজেরাই এসে কিনে নিয়ে যেতে পারে। ঘণ্টা দুই সময় কেটে গেল স্বাগতদের বাজারে ঘুরতে ঘুরতে। রামমূর্তি এরপর বললেন, ‘আমি নিরামিষভোজী হলেও তোমরা যদি আমিষ রান্না করে খেতে চাও তবে আমার আপত্তি নেই। মাংস কিনে নিয়ে যেতে পার। সপ্তাহে এই একটা দিনই এ সুযোগ মিলবে। তবে তোমাদের জন্য মাংস বলতে যা তোমাদের মুখে রুচবে তা হল মুরগি আর শূকর। বাকি মাংসগুলো হয়তো তোমরা খাবে না।’

বিক্রম বলল, ‘বাকি মাংস মানে কি কুমির? আমার খেতে কোনও আপত্তি নেই।’

রামমূর্তি বললেন, ‘শুধু কুমির কেন? সাপ, ব্যাঙ, গোসাপ—এই সবকিছুর মাংসই এখানে পাওয়া যায়।’

সুরভী জানতে চাইল, ‘মাছ পাওয়া যায় না?’ হয়তো সে বাঙালি বলেই প্রশ্নটা করল।

রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, পাওয়া যায়। মেকং নদীর থেকে আনা বিরাট বিরাট ক্যাট ফিশ, স্ট্রিং ফিশ। আর বাকি মাছগুলোর নাম জানি না।’

এ জবাব শুনে সুরভী আর আগ্রহ জানাল না মাছ খাবার জন্য। শেষ পর্যন্ত একটা দোকান থেকে মুরগি কেনা হল। কেনাকাটার কাজ মেটার পর রামমূর্তি বললেন, ‘আপাতত আমাদের কাজ শেষ। এবার ব্যাটারির দোকানে যেতে হবে। চার্জ দেওয়া নতুন ব্যাটারি নিয়ে যাব আর পুরনো ব্যাটারিগুলো গাড়িতে ফিরে আসবে।’

স্বাগত জানাল, ‘আমার ঘরের ব্যাটারিরও চার্জ শেষ। ফ্যান ঘুরছে না।’

তারা সকলে এরপর বাজারের ভিতরের অংশ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। তারা এরপর যে জায়গায় এসে উপস্থিত হল নানান ধরনের ইলেকট্রিক্যাল জিনিস, জামা কাপড় ও আরও নানান ধরনের জিনিসের দোকান সেখানে।

রামমূর্তি গিয়ে হাজির হলেন তাঁর পূর্ব পরিচিত ব্যাটারির দোকানে। বিরাট বিরাট বাক্সর মতো ভারী ব্যাটারি রয়েছে সেখানে। দোকানের মালিক চাইনিজ। দোকানে ঢুকে আর সঙ্গে কথা বলে রামমূর্তি স্বাগতদের জানালেন, ‘ব্যাটারি চার্জ হতে আরও অন্তত দু-ঘণ্টা সময় লাগবে। এ সময়টা তোমরা নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াতে পার। ব্যক্তিগত টুকিটাকি জিনিস কিছু কেনার থাকলে তা কিনেও নিতে পার। আমি এখানেই থাকব।’

সুরভী বলল, ‘তাহলে স্যর আমরা চারপাশটা ঘুরে দেখি?’

রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, যাও। প্রয়োজনে দুপুরের খাওয়া সেরে নিতে পার। আমাদের ফিরতে প্রায় বিকাল হয়ে যাবে।’ স্বাগত ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না যে সে রামমূর্তি স্যরের সঙ্গেই থাকবে নাকি অন্যদের সঙ্গে যাবে। সম্ভবত তিনি স্বাগতর মনের ভাব পাঠ করে হেসে বললেন, ‘তুমিও যাও ওদের সঙ্গে। আমি তো বলেইছি যে আমার অবর্তমানে তুমিই দলপতি।’

স্বাগত বেশ লজ্জাবোধ করল কথাটা শুনে। অন্য চারজন তার সমগোত্রীয় ও বন্ধুস্থানীয়। তাই কাজের বাইরে দলপতি শব্দটা একটু অস্বস্তিকর।’

বিক্রম তার স্বভাব সুলভ ঢঙে স্বাগতর উদ্দেশে কথায় চিমটি কেটে বলল, ‘স্যর, আমাদের সঙ্গে চলুন।’

স্বাগত এরপর তাদের সঙ্গে এগল। সকালে বেরবার আগে সবাই হালকা টিফিন সেরে বেরিয়েছে। কিছুটা এগিয়ে একটা স্ন্যাক্সের দোকান দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। কফি আর ভেজ-ননভেজ স্যান্ডুইচ বিক্রি হচ্ছে সেখানে। কফি আর নন ভেজ স্যান্ডুইচ নিল তারা। স্যান্ডুইচ মুখে তোলার আগে নাতাশা খামের দোকানিকে জিজ্ঞেস করল স্যান্ডুইচে ক্রোকোডাইল মিট আছে কি না?

লোকটা নাতাশার কথাটা পুরোটা বুঝতে পারল না। এখানকার সাধারণ মানুষরা কাজ চালানোর মতো কয়েকটা ইংরেজি শব্দ ছাড়া ইংরেজি বলতে বা বুঝতে পারে না এ ব্যাপারটা খেয়াল করেছে স্বাগত। তবে এ লোকটা ‘ক্রোকোডাইল’ শব্দর মানেটা বুঝতে পারল। নাতাশার কথা শুনে সেই দোকানদার উল্টো দিকের ফুটপাতের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ক্রোকোডাইল, ক্রোকোডাইল!’

লোকটার দৃষ্টি অনুসরণ করে স্বাগতরা তাকিয়ে দোকানটা দেখতে পেল। কাচ ঢাকা শো-রুমের মতো একটা দোকান। তার দরজার বাইরে দু’পাশে দুটো ছোট কুমির অর্থাৎ কুমিরের চামড়া ঝুলছে। তবে সেটা মাংসর দোকান নয়। দোকানের গায়ে শোকেসে সাজানো আছে চামড়ার তৈরি ব্যাগ, বেল্ট, জুতো এসব। বলা বাহুল্য যে সব জিনিস কুমিরের চামড়ার তৈরি। দোকানের মাথার সাইন বোর্ডে ইংরেজিতে লেখা ‘ক্রোকোডাইল লেদার্স’। আর তার সঙ্গে কম্বোডিয়ান হরফে আরও কিছু লেখা আছে যা স্বাগতরা পড়তে পারল না। দোকানটা দেখার পর প্রীতম বলল, ‘খাওয়া সেরে চল একবার দোকানটায় যাই। কুমিরের মাংস খেতে আপত্তি থাকলেও আশা করি নাতাশার এ ব্যাপারে আপত্তি থাকবে না?’

নাতাশা তার প্রশ্ন শুনে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, তার এ ব্যাপারে কোনও আপত্তি নেই। কফি স্যান্ডুইচ খাওয়া হয়ে গেলে ফুটপাত টপকে তারা সবাই গিয়ে হাজির হল দোকানটার সামনে। তারপর কাচের পাল্লা ঠেলে দোকানের ভিতর একে একে ঢুকে পড়ল। দোকানের ভিতরে শোকেসগুলোর মধ্যে সাজানো আছে কুমিরের চামড়ার তৈরি নানান জিনিস। একদিকের দেওয়ালের বেশ খানিকটা ওপরে দেওয়ালের গায়ে টাঙানো আছে মাথা সহ বিশালাকৃতির একটা কুমিরের চামড়া। যেন একটা দানবাকৃতির টিকটিকি দেওয়ালের গায়ে বসে আছে। দোকানের ঢোকার পর ওই

কুমিরের চামড়াটাই প্রথম তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আর তারপর তারা দেখতে পেল দু’জন লোককে। কুমিরের দেহটা যেখানে টাঙানো তার ঠিক নীচেই ক্যাশ কাউন্টার। সেই কাউন্টারের ভিতর বসে আছে একজন লোক। আর কাউন্টারের বাইরে একটা চেয়ারে স্বাগতদের দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে একজন লোক। সে দু’জন লোক নিজেদের মধ্যে কী যেন কথাবার্তা বলছিল। স্বাগতরা দোকানে ঢোকার পর কাউন্টারের ভিতরে বসা লোকটা কথা থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এসে স্পষ্ট ইংরেজিতে বলল, ‘এখানে কুমিরের চামড়ার সব জিনিস ন্যায্য মূল্যে পাবেন আপনারা। ঠকবার কোনও ভয় নেই। কুমিরের চামড়া বলে অন্য কোনও প্রাণীর চামড়া বিক্রি করি না। আমার কুমিরের খামার আছে। কুমির শিকার আর কুমিরের চামড়ার ব্যবসা আমরা সাতপুরুষ ধরে করি। ওই তার প্রমাণ।’—এ কথা বলে আঙুল তুলে দেওয়ালে টাঙানো একটা বাঁধানো ফটোগ্রাফ দেখালেন লোকটা।’

তাঁর কথা শুনে সকলে তাকাল ছবিটার দিকে। বেশ বড় আকারের বাঁধানো একটা সাদা কালো ছবি। দেখেই বোঝা যায় ছবিটা অনেক পুরনো। ছবির মধ্যে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে বড় লাঠির মতো একটা দণ্ড। আর তার পায়ের সামনে রয়েছে বিশালাকৃতির একটা কুমির। সম্ভবত সেটা মৃত।

কুমিরটার আকার লোকটার আকারের তিনগুণ হবে। আর তাদের পিছনে দেখা যাচ্ছে কোনও প্রাচীন স্থাপত্যের অংশ।

স্বাগতরা আগ্রহভরে ছবিটা দেখার পর লোকটা বলল, ‘ওটা আমার গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের ছবি। আপনারা হয়তো আঙ্করভাট দেখেছেন বা দেখতে যাবেন। এই ছবিটা দেড়শো বছর আগে এক সাহেবের তোলা। তিনি এখানে মন্দির সংস্কারের কাজে এসেছিলেন। তিনি কাজ শুরু করার পরই একজন করে শ্রমিক উধাও হয়ে যেতে লাগল। সাহেব পরে বুঝতে পারলেন যে, মন্দিরের গায়ে যে পরিখা আছে সেখানে কুমির আছে। জলে নামলে সে-ই টেনে নিয়ে যাচ্ছে মানুষকে। আমাদের এখানকার লোকজন কুমিরের মাংস খেলেও মন্দিরের কুমির মানে সে দেবতার পোষ্য।

প্রাচীনকালে আঙ্করভাটের মন্দিরের পরিখাতে কুমির ছাড়া থাকত। তাদের নাকি ধর্মীয় কাজেও ব্যবহার করা হতো, মন্দিরের পাহারাদারের কাজও করত তারা। কাজেই প্রথমে কেউ দেবতার অভিশাপ লাগার ভয়ে কুমিরটাকে মারতে চায়নি। শেষে আমার ওই পূর্বপুরুষ নরখাদক কুমিরটাকে শিকার করেন। সাহেব খুশি হয়ে তাঁকে এই ছবিটা তুলে উপহার দেন।’—একটানা কথাগুলো বলে স্বাগতদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য থামল লোকটা।

বিক্রম প্রীতমকে জিজ্ঞেস করল, ‘কুমির কি সাত-আটশো বছর জীবিত থাকতে পারে?’

প্রীতম বলল, “তা পারে না ঠিকই তবে শুনেছি পঞ্চাশষাট বছর বাঁচে। যে কুমিরগুলোকে পরিখায় ছাড়া হয়েছিল। এ নিশ্চয়ই তাদেরই কোনও বংশধর হবে। আমি ঠিক এমনই একটা সংবাদপত্রে পড়েছিলাম। রাজস্থানের কোনও একটা জায়গাতে প্রাচীন দুর্গ সংলগ্ন পরিখা সংস্কারের সময় তার মধ্যে এমনই এক জীবন্ত কুমিরের সন্ধান মিলেছিল।’

স্বাগতরা এরপর শোকেসে রাখা জিনিসগুলো দেখতে শুরু করল। সুরভী দেওয়ালে ঝোলানো একটা হাত ব্যাগ খুলে নিয়ে সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, “এর দাম কত?’

মাঝবয়সি শক্তপোক্ত চেহারার খামের লোকটা জবাব দিল, ‘পঁচাত্তর ডলার ম্যাডাম।’

সুরভীর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল স্বাগত। সুরভী বলল, ‘ভারতীয় মুদ্রাতে হিসাব করলে ব্যাগটা দামি হলেও এয়ারপোর্টের দোকানগুলোর থেকে এখানে অনেক কম দাম।’

দোকানদার এরপর সুরভীকে বলল, ‘নিয়ে নিন ম্যাডাম। খাঁটি জিনিস। সব দেশে তো কুমিরের চামড়ার জিনিস পাওয়া যায় না। আপনারা কোন দেশ থেকে এসেছেন?’

সুরভী জবাব দিল ‘ইন্ডিয়া থেকে।’

আর সুরভীর জবাবের সঙ্গে সঙ্গেই কাউন্টারের সামনে তাদের দিকে পিঠ দিয়ে বসা লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে ফিরে দাঁড়াল তাদের দিকে। তারপর লোকটা বলে উঠল, ‘আবার ঠিক দেখা হয়ে গেল আপনাদের সঙ্গে।’

লোকটা স্বাগতর অপরিচিত হলেও সঙ্গীদের চোখের দৃষ্টি দেখে স্বাগত অনুমান করল লোকটা তাদের পূর্ব পরিচিত। লোকটার দিকে তাকিয়ে নাতাশা প্রশ্ন করল, “মিস্টার নারেঙ খাম! আপনি কবে এসেছেন এখানে?’

লোকটা হেসে জবাব দিল, ‘কাল রাতে। আপনি আমার নাম মনে রেখেছেন বলে আনন্দিত হলাম।’

প্রীতম হেসে নারেঙ খাম নামের লোকটার উদ্দেশে বলল, ‘আপনি সেদিন কিলিং ফিল্ডে আমাদের যে উপকার করেছেন তা সত্যিই ভোলার নয়।’

প্রীতমের কথা শুনে লোকটা তাদের কাছে এসে বলল, ‘ওটা অতি সামান্য একটা ব্যাপার। এভাবে কথা বলে লজ্জা দেবেন না।’—এ কথা বলে লোকটা কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকাল স্বাগতর দিকে। তা দেখে বিক্রম স্বাগতর পরিচয় দান করে লোকটাকে বলল, ‘ওঁর নাম স্বাগত। আমাদের মতোই ইন্ডিয়ান। একই কাজে এসেছেন উনি। আমাদের সহকর্মী ও বর্তমানে আমাদের টিম লিডার।’

তাকে এ কথা বলার পর নারেঙ খামের সঙ্গে তাদের কোথায় কীভাবে পরিচয় হয়েছে বিক্রম সেটা সংক্ষেপে জানিয়ে দিল স্বাগতকে। নারেঙ খাম আর স্বাগত করমর্দন করল। লোকটা এরপর পকেট থেকে নোটবুক বার করে স্বাগতকে বলল, ‘দাঁড়ান আপনার নামটা লিখে নেই। আপনার বন্ধুরা জানেন এটা আমার একটা অভ্যাস। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলে আমি তাঁর নাম লিখে রাখি। এ দেশ নিয়ে আমি একটা ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখব।’

দোকানদার লোকটা নারেঙ খাম আর তাদের কথোপকথন শুনছিল। নারেঙ খাম তার কাজ শেষ করে সে লোকটাকে দেখিয়ে বলল, “ইনি মিস্টার বুল। এই দোকানের আর একটি কুমির খামারের মালিক।’—এ কথা বলার পর সে স্বাগতদের পরিচয়দান করল লোকটার কাছে।

দোকান মালিক বুল, সুরভীকে বলল, ‘আপনারা যখন নারেঙের পরিচিত তখন ব্যাগটার জন্য আরও দশ ডলার কম দিলেই চলবে। পছন্দ হলে ব্যাগটা নিয়ে নিন।’

ব্যাগটার দাম আরও কমে যাওয়াতে সুরভী বলল, ‘আচ্ছা দিয়ে দিন।’

নিজের পার্টস থেকে টাকা বার করে বুল নামের লোকটাকে দিল সুরভী। ইতিমধ্যে প্রীতম একটা বেল্ট হাতে নিয়ে দেখছিল। বুল নামের লোকটা বলল, ‘নিতে পারেন বেল্টটা। কুমিরের লেজের চামড়া সব থেকে বেশি টেকসই হয়। তা দিয়ে বানানো।’

প্রীতম জবাব দিল, ‘বেল্টটা পছন্দ হয়েছে ঠিকই তবে আজ নয় অন্য দিন এসে কিনব। আমরা তো বেশ কিছুদিন এখানে থাকব। তার ফাঁকে একদিন এসে কিনে নিয়ে যাব।’

বিক্রম বলল, ‘আমারও একটা ছোট ব্রিফকেস কেনার ইচ্ছা আছে। আমিও পরে এসে কিনব।’

বুল নামের লোকটা সম্ভবত খুশি হল কথাগুলো শুনে। সে বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আসবেন। আমার দোকান সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তারপর আমি খামারের কাজে চলে যাই।’