গ্যাস-লাইট ভূত – সমুদ্র পাল
গ্যাস-লাইট ভূত
যে গল্পটা আমি বলছি—তা ঘটেছিলো বছর দুই আগে। এর সত্যতা প্রমাণ করতে এখনও ডজন খানেক লোক বেঁচে আছে। এখানে কিন্তু সাধারণ ভূতুড়ে গল্পের ভয় ধরাবার মতো কোনো উপাদান নেই। না আছে ভাঙাচোরা নির্জন বাড়ি, না কবরখানা, মাঝরাতের ঘন্টা বাজার আওয়াজও নেই, শেকলের ঝনঝনানি অথবা কোনো আর্তনাদও নেই। এক কথায়, আসল ভূতের গল্প সাজানো-গোছানো কোনো ভূতের রাজত্ব নয়। ব্যাপারটা ঠিকমতো বুঝতে গেলে কুড়ি মাস আগের লেকটাউনের একটা ঘটনায় আসছি।
একজন যুবক সেখানে একটা কটেজ ও ভিলা স্টাইলে একটা নতুন বাড়ি তৈরী করে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সে খারাপ সঙ্গে মিশে একেবারে গোল্লায় যায় এবং বাড়িটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেই বাড়িটা শ্যামল যে কি ভাবে খবর পেয়ে ভাড়া নিলো তা জানা যায় নি। সে কে এবং কোথা থেকেই বা এলো তা কেউই জানে না। তাকে দেখতে খুউব সুন্দর, পাথরে খোদাই করা যেন তার মুখ। কিন্তু চেহারাটা কাঠ-খোট্টা ও ভাবলেশহীন। সে যুবকও নয়, বৃদ্ধও নয় তার কোনো বন্ধু তার সঙ্গে কখনো দেখা করতে আসে না। তবে তাকে দেখে মনে হয় বেশ অবস্থা সম্পন্ন। লেকটাউনের লোকেরা ঠিক করলো তার পরিচয় না জানা পর্যন্ত তার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকাই ভালো। আর শ্যামলও কখনো তার মনের অবস্থা কাউকে জানতে দেবার সুযোগ দেয়নি। সেও যতোটা পারে তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলে।
একমাত্র ডাক্তারই একমাত্র লোক যে তার বাড়িতে ঢুকেছিলো। শ্যামল একদিন দুপুর বেলায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তার চাকর ছুটে গিয়ে ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তার এসে দেখে লেকটাউনের নতুন অধিবাসীটি কোচের ওপর শুয়ে আছে। তার শরীর ঠান্ডা ও শক্ত। চোখ দু’টো স্থির, দেখলেই মনে হয় একজন মরা শুয়ে আছে।
এক ঘন্টা পর শরীরের কাঠিন্য দূর হলো, চোখ দু’টোও আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। তারপর রেগেমেগে সে উঠে বসে ডাক্তারকে বললো–কে আপনি?
—ডাক্তার সেনগুপ্ত। আপনার চাকরের কাছ থেকে শুনলাম আপনি অসুস্থ, তাই দেখতে এসেছি আপনাকে।
—আপনাকে ধন্যবাদ। যখন আমার ডাক্তারের দরকার হবে তখন নিশ্চয়ই আপনাকে ডেকে পাঠাবো।
ডাক্তার হাসিখুশি ও খোশমেজাজের লোক। এ ব্যাপারটাকে সে আমলই দিলো না। তিনি কোনো দোষ ধরলেন না। কিন্তু তার ব্যবহারে সন্তুষ্টও হলেন না । —তাহলে আমি চলি, ডাক্তার দরোজা খুলে বেরোতে যাচ্ছিলো।
—অনুরোধ করছি একটু থাকুন ডাক্তার। আমি আপনাকে বোধ হয় অসন্তুষ্ট করেছি। একটু থেমে বললো মাঝে মাঝেই আমার এরকম ফিট ধরে। কখন এমনটা হবে আমি বলতে পারি না। আমাকে এ রোগটা আক্রমণ ক’রে এক-ঘন্টা দু’ঘন্টা এমন কি তিনঘন্টা পর্যন্ত বোধশক্তিহীন করে সমস্ত দেহ অসাড় করে দেয়। এ সময়ে কোনো ডাক্তারের পটুতা আমার উপকার করতে পারে না। ডাক্তার ডাকতে কেউ যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমি ভালো হয়ে যাই, এখন যেমন দেখলেন।
—সেই সময় কি আপনার মন অচেতন থাকে? ডাক্তার গম্ভীর স্বরে জিগ্যেস করলেন।
ক্লান্তিতে হাই তুলতে তুলতে শ্যামল বলে বর্তমান সময়ের জন্যে অচেতন, কিন্তু অতীতে আমি জীবিত থাকি ।
—প্রথম যখন আক্রান্ত হন কোনো ব্যথা অনুভব করেন?
—হ্যাঁ, মনে হয় একটা বরফের হাত বুকের উপর চেপে বসেছে। তারপর সেটা আরো চাপ দেয়, দারুণ ব্যথা বোধ করি, শেষে জ্ঞান হারাই।
—হুঁ। অদ্ভুত তবে নতুন নয়। আপনার জন্যে কিছু ওষুধ পাঠাতে পারি, যদি আপনি অনুমতি দেন, আশা করি এতে আপনার কষ্ট দূর হবে।
—আপনার মতো অনেক ডাক্তারই এরকম ওষুধ দিয়েছেন—কোনো লাভ হয়নি। ডাক্তারী ওষুধে আমার বিশ্বাস নেই।
—ডাক্তারীর ওপর আপনি ভুল ধারণা পোষণ করেন।
—ডাক্তারীর ওপর ততোটা নয়, যতোটা ডাক্তারের ওপর। শঠ ও বোকা লোকদের নিয়ে এই পৃথিবী। বোকা লোকেরা ওষুধ নেয় আর প্রতারকরা ওষুধের ব্যবস্থা করে।
—তাহ’লে শ্যামলবাবু, ধরে নিতে হবে পৃথিবীতে আপনি শ্রেষ্ঠ, কিছু ব্যবহার করতে উপদেশ দেবার মতো শঠ আমি নই, আর সেটা গ্রহণ করবার মতো বোকাও নন ।
—আপনার ওভাবে সিদ্ধান্ত করা ঠিক নয়, কারণ আমার মতো একজন হতভাগ্য প্রতারকের খেলা খেলতে গিয়ে বোকা বনেছি আর এই অবস্থায় পরিণত হয়েছি। আপনি যদি আমার জীবনের কথা শুনতেন, তবে আপনি —
কি শ্যামলবাবু—
—আপনি এক দুঃখীর কথা জানতেন ।
কথাটার ওভাবে শেষ হওয়াতে ডাক্তারকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিলো। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যেতে যেতে তার মাথায় নানা চিন্তার উদয় হলো। সে কি কোনো পাগলের সঙ্গে কথা বলছিল না বইয়ে পড়া কোনো রহস্যজনক নায়কের সঙ্গে গল্প করছিলো, যা সচরাচর দেখা যায় না!
এরপর অনেক দিন কেটে গেছে। লেকটাউনে ‘শ্যামলের রহস্য’ রয়েই গেল। ডাক্তারের সঙ্গেই যা দু’একবার কথা হয়েছিলো। আর কারোর সঙ্গে সে বড় একটা ভদ্রতা বা সৌজন্য দেখাতো না।
তারপর একটা সময় এলো যখন তাকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশতে হয়েছিল। ভোজ সভাতেও তাকে অংশ নিতে হয়েছিলো।
ভোজসভায় আলোচ্য বিষয় ছিলো চক্ররেল লেকটাউনের মধ্যে দিয়ে যাবার বিরুদ্ধে। একজন স্থানীয় নেতা দাঁড়িয়ে বাগ্মিতার মধ্যে দিয়ে রেল কোম্পানীর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে লেকটাউনের সহজ সরল পরিবেশকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টাকে উচ্চরবে নিন্দা করতে লাগলো। সকলেই একসঙ্গে হৈ হৈ করে ওঠায় সভাটা পন্ড হ’বার উপক্রম হলো। তখন শ্যামল উঠে আস্তে আস্তে বক্তৃতা আরম্ভ করলো। এমন বক্তৃতা লেকটাউনে আগে কখনো শোনা যায় নি। সমস্ত ঘটনা পরিষ্কারভাবে ও সংক্ষেপে বলে তাড়াতাড়ি দরখাস্ত লেখবার এবং সই করবার জন্যে জোর দিল।
সমস্তক্ষণ সে শান্ত হয়ে বসেছিল। যখন দরখাস্ত লেখবার তোড়জোড় চলছে, তখন সে বললো আর কষ্ট করে কাজ নেই। আপনাদের দরখাস্ত কোনো কাজেই আসবে না ।
—আপনি কি করে জানলেন? তীক্ষ্ণ কন্ঠে নেতাটি জিগ্যেস করলো।
—আমি ঠিকই বলছি আজ থেকে উনিশ মাস পরে লেকটাউনের ভেতর দিয়ে চক্ররেল খাবে।
নেতাটি ক্ষোভের স্বরে বললেন- আপনি একজন মিথ্যা ভবিষ্যদ্বক্তা। বলা বাহুল্য যে, আগন্তুক শ্যামলের ভবিষ্যৎ বাণী করা সত্ত্বেও দরখাস্ত তৈরী হলো
এবং সকলের সই হ’বার পর সভা ভেঙে গেল।
—দেখলেন তো, আমরা দৃঢ়ভাবে আমাদের পরিকল্পনা চালিয়ে গেলাম, যদিও আপনি শুধুই অসাফল্যের ভবিষ্যদ্বানী করলেন—
আগন্তুক শ্যামলকে নমস্কার করে বললো শুভ রাত্রি বন্ধু ।
—আটমাসের মধ্যে আমরা আবার মিলিত হবো।
—আপনি নিশ্চয়ই অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যদ্বানী করেন। নেতাটি কথাগুলো বলে ঈষৎ মাথা নামিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেই ভোজসভায় ডাক্তার সেনগুপ্তও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। শ্যামলের মনোযোগ আকর্ষণ করে ডাক্তার সেনগুপ্ত বললেন—এক আশ্চর্য লোক আপনার বন্ধু।
—খুব।
—মাফ করবেন, আমি ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না, তবে আমার পেশার স্বার্থে জানতে চাইছি, উনি কি কোন আভ্যন্তরীণ রোগে ভুগছেন ? আমি বলতে পারি কোনো রোগই নয়।
এটা অদ্ভুত! এরকম রোগ আমি কোনো জীবন্ত মানুষের দেখিনি। সে জীবন্ত মানুষ নয়, এই কথা বলে শ্যামল চলে গেল। ডাক্তার ভয়ে বিস্মিত হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলো।
এই ভোজসভার আট সপ্তাহ পরে সেই নেতাটি সাইকেলে চড়ে শিকারী কুকুর নিয়ে বেরিয়েছিল। একটা ছোট ঝোপ পার হতে গিয়ে সে হোঁচট খেল। নেতাটি আঘাত পায় নি। সাইকেলও নষ্ট হয়নি। সাইকেলে চড়ে মাঠ, ঝোপ-ঝাড় পেরিয়ে সাইকেলটা একটা গাছের বেড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলো। নেতাটি দূর থেকে দেখলো সাইকেলটা একটা পুকুরের কাছে দাঁড়িয়ে, তার পাশে মানুষের এক মূর্তি। মানুষটা বিনা টুপীতে সান্ধ্য পোশাকে সজ্জিত। নেতাটি মুহূর্তে তাকে চিনতে পারলো দু’মাস আগের ভোজসভার সেই আগন্তুক।
‘হোস্ট’ হোটেলের চার দেওয়ালের মধ্যে তাকে যেমন দেখেছিল হুবহু সেইরকম। কিন্তু খোলা জায়গায় এইরকম পোশাকে তাকে দেখে নেতাটি চমকে উঠলো। সে সাহসী হলেও তাকে এড়িয়ে যেতে পারতো। সেই গতিহীন মূর্তিটার পাশ দিয়ে না গিয়ে সাইকেলের কাছে পৌঁছবার জন্যে একথলে টাকাও সে দিতে পারতো, কিন্তু সেটা অসম্ভব ছিলো। ভয়লেশহীন মুখে আগন্তুককে সাইকেলটা ধরবার জন্যে ধন্যবাদ জানালো। কিন্তু সে মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। অবশেষে যখন নেতাটি সাইকেলে চড়ে বসলো তখন মূর্তিটা নড়ে উঠলো। তার দিকে ফিরে দু’টো আঙুল খোয়ানো হাত বাড়িয়ে পুকুরের দিকে নির্দেশ করলো।
নেতাটি সাইকেলে চড়ে চলে গেল।
দিনে দিনে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস পেরিয়ে গেল। রেল কোম্পানী লেকটাউনের ভেতর দিয়ে লাইন পাতা শুরু করলো। শত শত মজুর কাজে লেগে গেল। নেতাটির কাছে স্মরণীয়—পুকুরটায় জল বার করবার সময় একটা কিছু দেখতে পেয়ে কাজ বন্ধ হয়ে গেল। কর্মকর্তারা সেখানে হাজির হলো। পুকুরের কাদার মধ্যে আধপোঁতা অবস্থায় একটা মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেল।
ডাক্তার সেনগুপ্তকেও ডাকা হয়েছিল। তিনি পরীক্ষা করবেন বলে কঙ্কালটায় কেউ হাত দেয়নি। কঙ্কালটি পরীক্ষা করবার পর ডাক্তার বললো এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার। এর একটা হাতের দু’টো আঙুল নেই!
এ ব্যাপারে কিছুই করার ছিলো না। কঙ্কালটাকে একটা কফিনের মধ্যে পুরে কবরখানায় কবর দিয়ে দেওয়া হলো। হঠাৎ ডাক্তার-এর মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। হয়তো শ্যামল এই কঙ্কালের বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারে। তাঁর সেই রহস্যময় বন্ধুটির বাঁ হাতের দু’টো আঙুল ছিল না। ডাক্তার ফেরার সময় শ্যামলের সেই বাড়িতে গেল। ডাক্তার দরোজায় ধাক্কা দিলো, কোনো সাড়া শব্দ নেই। দরোজাটা ভেজানো ছিলো, ঠেলতেই খুলে গেল। সে বসার ঘরে গেল, যেখানে এই বাড়ির অদ্ভুত মালিকের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল। প্রথমেই নজরে পড়লো, শ্যামল বসু মেঝেয় পড়ে আছে। তার সুন্দর মুখখানা যন্ত্রনায় ভয়ঙ্করভাবে বিকৃত। সে মারা গেছে।
সত্যিই কি সে মারা গেছে না কি সেই ফিটের অসুখে সে পড়েছে! ডাক্তার সেনগুপ্ত তাকে নানাভাবে পরীক্ষা করলো, তার পর নিশ্চিত হলো সত্যিই তার মৃত্যু হয়েছে— ফিটের নিদারুণ যন্ত্রণা তাকে শেষ করে দিয়েছে। মৃত দেহের বুকের ওপর একটা হাত সজোরে চেপে ধরার স্পষ্ট দাগ দেখা গেল। সেই হাতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঙুল নেই। এ রহস্য, রহস্যই থেকে গেছে। এ রহস্য
সমাধানের কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। শুধু এইটুকু বলতে পারি এ গল্পের সত্যতা প্রমাণ করতে এখনও যারা বেঁচে আছে তারাও এই অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
