জীবনদাতা ভূত – সমুদ্র পাল
জীবনদাতা ভূত
ভবেশ গুপ্ত অনেক দিন বেকার হয়ে বসেছিলো। অবশেষে একটা চাকরী পেলো বটে, কিন্তু সে একটা অতি ভয়ংকর জায়গায়। সহজে সেখানে কেউ যেতে চায় না। যারা গেছে, তারা আর কেউই ফেরেনি। অদ্ভুতভাবে তাদের সব মৃত্যু হয়েছে। রোগ নেই, ব্যাধি নেই, সারাদিন কাজকর্ম করে সে রাতে ঘরে শুয়েছে। সকালে দেখা গেছে সে আর জীবিত নেই।
ঘরে শুয়ে শুয়েই সে মারা গেছে। মুখ বিশ্রী কিম্ভূতকিমাকার হয়ে গেছে।
সব কিছু দেখে মনে হয়—একমাত্র ভয়ই তার মৃত্যুর কারণ।
কিন্তু কিসের ভয়?
কেউ তা এখনো জানতে পারেনি।
তবে লোকে বলে, ভূতের ভয়েই সে হঠাৎ এভাবে মারা গেছে।
এখানে নাকি ভীষণ ভূতের উপদ্রব।
ভবেশগুপ্ত এসব কথায় কান দেয়নি, বিশ্বাসও করেনি।
ছোটবেলা থেকেই সে খুবই সাহসী। এসব আজব ব্যাপার সে কোনো কালেই বিশ্বাস করে না।
সে ভাবলো, চোর-ডাকাত হলে দেখা যাবে; কিন্তু ভূত? সে শহুরে ছেলে ঐ সব ভূত-ফুত মানে না।
চাকরী নিলো ভবেশ।
সন্ধ্যার ট্রেনে উঠে পড়লো সে।
বড় লাইন থেকে গাড়ি বদল করে ছোট লাইনের গাড়িতে চড়তে হয়। সেই লাইনের ওপরেই সব শেষে ছোট্ট স্টেশন—শিমুলডিহি।
নির্মল আকাশ। ভবেশ ট্রেনে বসে আকাশের শোভা দেখতে দেখতে চললো। মাঝে মাধ্যে নানা স্টেশন! স্টেশনে টিম্ টিম্ করে আলো জ্বলে। ট্রেন একটু দাঁড়ায়— আবার চলে।
দেখতে দেখতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ভবেশ। তার কামরায় এখনো আটদশজন লোক।
ঘুম ভাঙল অনেক রাতে।
দেখলো কামরা ফাঁকা।
একজন বুড়ো মতো লোক চাদর মুড়ি দিয়ে চুপ করে বসে আছে।
লোকটা বেশ লম্বা। চোখ দু’টো বেশ জ্বলজ্বল করছে। মুখটা প্রায় ঢাকা–ভালো করে দেখা যায় না ।
ভবেশকে উঠতে দেখে বললে — কোথায় যাওয়া হবে?
—শিমুলডিহি।
—চলুন আমিও ওখানেই যাচ্ছি।
—আপনি কি ওখানেই থাকেন ?
—না।
—আচ্ছা, চৌধুরী কোম্পানীর যে কারখানাটা তৈরী হচ্ছে সেটা চেনেন?
—চিনি।
—-স্টেশন থেকে কতো দূর ?
—কাছেই।
—আচ্ছা, ঐ কারখানায় কাজ নিয়ে দু’তিনজন নাকি আগে মারা গেছে। কারণটা কি জানেন ?
—না। তা, আপনি এখানেই চাকরি নিয়ে এলেন বুঝি ?
—কি আর করি, বেকার ছিলাম। তাই পেটের দায়ে…
—যদি মারা যান।
—তা হ’লে ছেলেপুলে, বাবা-মা না খেয়ে মরবে।
—হুঁ। বুড়ো মা-বাবাকে খেতে দেওয়া ভালো। অনেকে তা দেয় না। যেমন আমার ছেলে ছিলো পাজী। বলে সে উঠে দাঁড়ালো। বললে—চলি।
—আচ্ছা নমস্কার ।
—হ্যাঁ, চলুন স্টেশন এসে গেছে। ভবেশ বিছানা বাক্স নিয়ে নামলো। কিন্তু লোকটি যে কোথায় গেল আর দেখা গেল না।
ভবেশ স্টেশন মাস্টারকে সব কথা খুলে বললো। স্টেশন মাস্টার বললো—একজন লোক এসেছে আপনাকে নিয়ে যেতে।
—তাই নাকি ?
লোকটি এলো। সে বললে-স্যার, আপনার কোয়াটার আছে।
—তাই নাকি !
লোকটার সঙ্গে ভবেশ কোয়ার্টারে গেল। তখন ভোর হয়ে এসেছে। লোকটার নাম কমল। সত্যিই সে বেশ বিনয়ী লোক। ভবেশ বললে—একটা কথা—
—বলুন।
—এই ঘরেই আগের লোকেরা সব মারা গেছে তাই না ?
—হ্যাঁ। তবে আপনার ভয় নেই। ভূতে কিছু করবে না।
—কেন? কেন ভূতে আমায় কিছু করবে না?
—আপনি যে বদ্যি।
—ও।
কথাটা শুনলেও ভবেশ আশ্বাস পেলো না। বললে — আচ্ছা, দু’জন দারোয়ান আছে না? তারা সব কোথায় ?
—সব ভাঙ্ খেয়ে স্টেশনের পাশে ঘুমোচ্ছে। আপনি যে আসবেন তা তো তারা জানতো না।
— তো বটে।
—টাকা-পয়সা সঙ্গে আছে তো?
—না। কোম্পানী মাত্র দুশো টাকা দিয়েছে। কাজ শুরু হ’লে পরে আরও পাঠাবে।
—টাকা সাবধানে রাখবেন।
—সে তো নিশ্চয়ই।
—কাল থেকেই কাজ শুরু হবে তো, স্যার ?
—নিশ্চয়ই এই জন্যেই তো আমার এখানে আসা।
—ঠিক আছে। কমল আর কিছু প্রশ্ন করলো না।
পরদিনই কাজ শুরু হলো। প্রথম কাজ হলো গাছপালা, জঙ্গল কাটা। বড় বড় গাছের জঙ্গল সব কেটে সাফ করতে হবে। তারপর কারখানা হবে। আগের লোকেরা অনেক টাকা এনেছিলো, কিন্তু কাজ বিশেষ হয়নি। টাকা লোকগুলি মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে উধাও।
ভবেশ তাই প্রথমেই কাজে মন দিলো। হনুমান সিং, তেওয়ারী আর কমলকে বললো যতো পারো লোকজন সব ডেকে আনো ।
অতএব কুলি-কামিন জোগাড় হলো। বিপুল উৎসাহে জঙ্গল কাটা শুরু হলো টাকা তিনদিনেই শেষ।
তৃতীয় দিনে ভবেশ হেডঅফিসে টেলিগ্রাম করলো। এক্ষুনি আরও টাকা চাই। অন্ততঃ এক হাজার।
হেড অফিস দু’দিন পরে একজন ইন্সপেক্টর পাঠালো। তিনি এসে সব দেখে শুনে তো অবাক। পাঁচদিনে বিরাট অঞ্চলের গাছ কাটা শেষ জমিও পরিষ্কার হয়ছে অনেকটা। তিনি খুশিমনে চলে গেলেন।
পরদিন ফিরলেন স্পেশাল ইঞ্জিন বুক করে। সঙ্গে নিয়ে এলেন দু’হাজার টাকা। দু’হাজার টাকা দিয়ে বেলা বারোটা নাগাদ তিনি চলে গেলেন।
ভবেশ কিন্তু একেবারেই নিশ্চিন্ত ছিলো না। সে স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে ইতিমধ্যেই ঘনিষ্ঠতা করে নিয়েছিল। ভবেশ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—একটা কথা আপনার কাছে জানতে চাই—এই মানে—এই সব লোক যারা মারা যায়, তা কি ভূতুড়ে ব্যাপার নাকি?
ভদ্রলোক মুচকি হাসলেন।
ভবেশ অবাক হয়ে বললো— হাসছেন যে! আপনি ভূত বিশ্বাস করেন নাকি ?
—না।
—আপনিই বুঝুন, ভূতে মানুষ মারতে পারে—কিন্তু টাকা পয়সা চুরি হলো কেন ? -তা ঠিক।
—তাই মনে হয়, এটা কোনো কু-লোকের কু-কীর্তি।
—কারা মনে হয় ?
—তা জানি না। তবে আপনি এক কাজ করবেন।
—কি বলুন তো?
—টাকা এনে আপনি ঐ টিনের চালের কোয়ার্টারে শোবেন না ।
—তা হ’লে ?
আপনি স্টেশনে শোবেন। আর টাকা রাখবেন এই স্টেশন ঘরের সিন্দুকে । ভবেশ ভেবে দেখলো, তিনি মন্দ বলেন নি। স্টেশন মাষ্টারকে বললো- আপনি খুব ভালো পরামর্শ দিয়েছেন। সিন্দুকেই টাকা রাখবো।
—হ্যাঁ, চাবিও কাছে রাখবেন। জানালা দরোজা বন্ধ করে শোবেন।
—আচ্ছা।
ভবেশ বুঝলো স্টেশন মাস্টার লোকটি সজ্জন। সে সত্যিই তার হিতাকাঙ্খী। সে এসব কথা আর কাউকে বললো না ।
সেদিন দু’হাজার টাকা আসতেই ভবেশ স্টেশন মাস্টারের স্মরণ নিলো। স্টেশন মাস্টার তাঁর নিজের কোয়ার্টারে শোন। তাই স্টেশনের ঘরে তিনি ভবেশকে শুতে দিলেন।
ভবেশ টাকাটা সিন্দুকে রেখে চাবিটা কোমরে গুঁজে রাখলো।
এবার যেন সে কিছুটা নিশ্চিন্তই হলো।
দরোজা ভালো করে বন্ধ করে শুলো সে। তবে জানালা বন্ধ করলো না। জানলাতে গরাদ দেওয়া। তাই কে ঢুকবে?
সারাদিন পরিশ্রম করেছে—বড্ড ক্লান্ত। তাই শুয়ে পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই সে ঘুমে কাদা হয়ে গেল।
কতোক্ষণ যে সে ঘুমিয়েছিল তা খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে। দেখে আশ্চর্য কান্ড, সে বিছানায় শুয়ে নেই।
সে মেঝেতে শুয়ে। তার হাত-পা বাঁধা। মুখটাও একজন বাঁধছে! দু’জন লোকে তাকে শক্ত করে ধরে আছে। দু’জনেরই মুখ কালো কাপড় বাঁধা। তাদের চেনা যায় না। ভবেশ ভাবছিলো এরা ঢুকলো কেমন করে ?
তাকিয়ে দেখে জানালার একটা গরাদ ভাঙা। তার মানে, ওরা গরাদ ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে!
নিজের বুদ্ধিহীনতায় নিজেকেই সে ধিক্কার দিলো।
সে বললো—বাবা, টাকা পয়সা নাও প্রাণে মেরোনা।
—চাবি কোথায় ? একজন বললো।
ভবেশ কোনোমতে বললো – কোমরে। কোমর থেকে লোকটা চাবি খুলে নিয়ে সিন্দুক খুললো। বিরাট টাকার থলে। তাতে নোট, টাকা, রেজকি—সব মিলিয়ে দু’হাজার টাকা আছে। একজন জানালার কাছে ছিলো। অন্যজন সিন্দুক খুলছিলো।
ভবেশ প্রমাদ গুণলো। মনে মনে ভগবানকে ডাকতে লাগলো ভবেশ।
হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল ।
একজন লম্বা লোক যেন হঠাৎ হাওয়ায় ভর করে জানালা দিয়ে ভেতরে ঝাঁপিয়ে ।
পড়লো ভবেশ হকচকিয়ে গেল। এ যে সেই সেদিনের ট্রেনে দেখা লম্বা লোকটা। এখানে ও এলো কি করে?
লোকটাকে দেখেই জানালার কাছের লোকটা পালিয়ে গেল । সিন্দুকের কাছের লোকটার নিকটে গিয়ে সে কি যেন করলো। সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুক-চোর আর্তনাদ করে উঠলো। মৃত্যুযন্ত্রণার শব্দ। ভবেশও জ্ঞান হারালো
ভোরের দিকে ভবেশের জ্ঞান ফিরলো। সে দেখলো মেঝেতে শুয়ে আছে। দরোজা ভেঙে ঘরে ঢুকলেন স্টেশন মাষ্টার। সঙ্গে চারজন পুলিশ—আর সেই কোম্পানীর ইন্সপেক্টর সাহেবটি।
ভবেশকে টাকা দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হননি। তাই তিনিও স্টেশন মাষ্টারের বাড়িতে গোপনে অপেক্ষা করছিলেন।
ভবেশকে মুক্ত করা হলো।
ভবেশ দেখে ঘরের কোণে সিন্দুকের পাশে পড়ে আছে একজন চোর। তার মুখের কাপড় সরালে দেখা গেল সে হনুমান সিং।
টাকার থলেটা মেঝেতে পড়ে আছে। আর তারই ছোরা তার বুকে মেরে কে যেন তাকে হত্যা করে গেছে।
তারপর তেওয়ারিকেও পাওয়া গেল একটা গাছের নিচে! তার বাঁ পা-টা ভেঙেছে। তাকে দু’ঘা লাগাতেই সে সব স্বীকার করলো—আমরা দু’জনেই আগের লোকদের মেরে টাকা চুরি করেছি। এবারও করতে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে এলো তালগাছের মতো লম্বা ঐ লোকটা!
সেই তো এসে হনুমান সিং-এর ছোরা দিয়েই তাকে খুন করেছে। টাকার তোড়াটা ফেলে রেখে গেছে।
তেওয়ারী পালাচ্ছিলো! লোকটা তাকে ধরে তার পা ভেঙে দিয়েছে। এতোক্ষণে ভবেশ ঘটনাটা বুঝতে পারলো।
ঐ তালগাছের মতো লোকটাই তার প্রাণ রক্ষা করেছে।
সে লোকটা নিশ্চয়ই মানুষ নয়—কোনো একটা প্রেতাত্মা ।
তার অসহায় অবস্থার কথা ভেবে প্রেতাত্মাই এভাবে তার প্রাণ ও টাকা রক্ষা করেছে। ভবেশের চোখে জল ভরে এলো
সে মনে মনে বললো—হে অদৃশ্য আত্মা, তুমিই আজ আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। তুমি আমার অন্তরের প্রণাম গ্রহণ করো। তবে কমল একথা মানলো না।
সে বললো—আগেই বলেছিলাম না, বদ্যিকে মারতে পারবে না। আপনি বদ্যি বলেই তো প্রেতাত্মা আপনাকে বাঁচালো ৷
ভবেশ সে কথার কোনো জবাব দিতে পারলো না ।
