১৮। বিভক্ত ভারত
১৮. বিভক্ত ভারত
এবার কাহিনীর শেষ অধ্যায়ে এসে পড়েছি। ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তান ডোমিনিয়নের উদ্বোধন করতে করাচিতে যান। করাচি থেকে তিনি ফিরে আসেন পরদিন বেলা বারোটায়। ওই দিনই অর্থাৎ ১৫ই আগস্ট রাত বারোটায় ভারত ডোমিনিয়ন জন্মলাভ করে।
দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দ ও জয়ের গৌরব উপভোগ করবার আগেই জনসাধারণ ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলো, নব-লব্ধ স্বাধীনতা তাদের মাথায় এক বিরাট দুঃখের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। একই কথা আমাদেরও মনে হয়। আমরাও বুঝতে পারি, স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করবার আগে আমাদের সুদীর্ঘ বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হবে।
কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েই দেশবিভাগ মেনে নিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে দেশের সমগ্র জনসাধারণই এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছে। কংগ্রেস সমগ্র জাতির প্রতিনিধি এবং মুসলিম লীগের পেছনেও বিরাট সংখ্যক মুসলমানের সমর্থন ছিল। এই কারণেই ধরে নেওয়া হয়েছিল, দেশের জনসাধারণ দেশবিভাগ মেনে নিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দেশবিভাগের অব্যবহিত পূর্বে এবং পরে আমরা যখন দেশের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করি তখনই আমরা বুঝতে পারি, এটা শুধু নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির প্রস্তাবের মধ্যে এবং মুসলিম লীগের খাতাপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে, ভারতের জনসাধারণ দেশবিভাগ সমর্থন করেনি। প্রকৃত ব্যাপার হলো, জনগণের হৃদয় ও মন এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি, মুসলিম লীগ ভারতের বিরাট সংখ্যক মুসলমানের সমর্থন লাভ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে আরো একটি বড় অংশ প্রথম থেকেই লীগের বিরোধিতা করে এসেছে। দেশবিভাগের সিদ্ধান্তের ফলে এঁদের অবস্থা রীতিমতো গুরুতর হয়ে ওঠে। হিন্দু এবং শিখরা প্রথম থেকেই দেশবিভাগের বিরুদ্ধে ছিল। কংগ্রেস দেশবিভাগ মেনে নিলেও তাদের মন থেকে বিরোধিতা দূর হয়নি। এবার যখন দেশবিভাগ বাস্তব ঘটনায় পরিণত হয়েছে তখন এর চেহারা দেখে মুসলিম লীগের কট্টর সমর্থকরাও ভীত হয়ে ওঠেন। তাঁরা তখন প্রকাশ্যেই বলতে থাকেন, এরকম দেশবিভাগ তো আমরা চাইনি।
আজ দশ বছর বাদে সে সময়কার সেই পরিস্থিতির পর্যালোচনা করতে বসে আমি দেখতে পাচ্ছি, সে সময় আমি যে কথা বলেছিলাম সেই কথাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি তখন সুস্পষ্টভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম কংগ্রেসের নেতারা খোলা মন নিয়ে দেশবিভাগ মেনে নেননি। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ রাগের বশে এবং কেউ কেউ হতাশার মনোভাব নিয়ে এই ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছিলেন। লোকে যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে অথবা উত্ত্যক্ত কিংবা ভীত হয়ে কোনো কাজ করে তখন তারা সে কাজের ভবিষ্যৎ ফলাফল সম্বন্ধে সঠিকভাবে বিচার-বিবেচনা করতে পারে না। সুতরাং যারা সেদিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশবিভাগের কথা বলেছিলেন, তারা তখন এর ভবিষ্যৎ ফলাফলের কথা অনুধাবন করতে সক্ষম হননি।
কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে দেশবিভাগের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন সর্দার প্যাটেল। কিন্তু তিনিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন না যে এর দ্বারা ভারতের সব সমস্যার সমাধান হবে। তিনি দেশবিভাগের কথা বলেছিলেন চরম উত্ত্যক্ত হয়ে এবং আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তাঁর প্রতিটি কাজে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ভেটো প্রয়োগ করায় তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। তিনি তাই ক্রোধান্বিত হয়ে মনে করেছিলেন দেশবিভাগ মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তিনি আরো মনে করেছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও তা বেশিদিন টিকতে পারবে না। সুতরাং দেশবিভাগ মেনে নিলে তার বিষক্রিয়া মুসলিম লীগ হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে যাবে। তাঁর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে অল্পদিনের মধ্যেই পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে এবং যেসব প্রদেশ পাকিস্তানে যাবে সেগুলো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়বে।
দেশবিভাগের ব্যাপারে জনসাধারণের মনোভাব কিরকম ছিল তা বুঝতে পারা যায় ১৪ই আগস্ট। সেদিনটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্বোধন দিবস। জনসাধারণ যদি খুশি মনে দেশবিভাগ মেনে নিত তাহলে পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ এবং বাংলার হিন্দু ও শিখরা মুসলমানদের মতোই আনন্দিত হতেন। কিন্তু ওইসব প্রদেশ থেকে যেসব খবর আমাদের কাছে আসতে থাকে তা থেকে আমরা বুঝতে পারি জনসাধারণ দেশবিভাগ মেনে নিয়েছে বলে কংগ্রেস যা ধরে নিয়েছিল তা নিতান্তই ভিত্তিহীন।
১৪ই আগস্ট তারিখটি পাকিস্তানের মুসলমানদের আনন্দের দিন হলেও হিন্দু ও শিখদের কাছে এটি ছিল শোকের দিন। এই মনোভাব শুধু যে সাধারণ মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাই নয়, কংগ্রেসের অনেক নেতাও এই মনোভাবই পোষণ করতেন। সে সময় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আচার্য কৃপালনী। তিনি ছিলেন সিন্ধু প্রদেশের অধিবাসী। ১৪ই আগস্ট তিনি এক বিবৃতি প্রচার করে বলেন, ওই দিনটি হলো ভারত ধ্বংসকারী শোক-দিবস। পাকিস্তানের হিন্দু ও শিখরাও প্রকাশ্যেই এইরকম মনোভাব ব্যক্ত করতেন। এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। কারণ ভারতের জাতীয় প্রতিষ্ঠান দেশবিভাগ মেনে নিলেও সমগ্র জাতি এতে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
এই প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, দেশবিভাগ যদি দেশের জনসাধারণের মনে এতোই ক্রোধ ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল তাহলে তাঁরা কেন তা মেনে নিলেন? কেন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়নি? তাছাড়া যে বিষয়কে সবাই অন্যায় বলে মনে করেছিল তা গ্রহণ করবার জন্য তাড়াহুড়োই বা কেন করা হয়েছিল? ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষ বিভক্ত হবে এবং স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। সুতরাং তা যদি প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারবে না বলে বিবেচিত হয়ে ছিল তাহলে সেই ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল এবং কেনই বা পরবর্তীকালে তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল? আমি বারবার বলেছি, প্রকৃত সমাধানের পথ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। এবং সেজন্য আমি সাধ্যমতো চেষ্টারও ত্রুটি করিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমার সহকর্মী ও বন্ধুরা তখন আমাকে আদৌ সমর্থন করেননি। কেন তাঁরা বাস্তব ঘটনাবলীর প্রতি অন্ধ হয়ে ছিলেন তার একমাত্র ব্যাখ্যা হলো ক্রোধ এবং হতাশা তাদের দৃষ্টিশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তাছাড়া ভারতের স্বাধীনতার জন্য ১৫ই আগস্ট তারিখটি নির্দিষ্ট হবার ফলে তাঁদের মনে যে আনন্দের সঞ্চার হয়েছিল তার ফলে তাঁরা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে পড়েছিলেন। এবং এই কারণেই তারা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন।
ব্যাপারটি যেন মিলনান্ত এবং বিয়োগান্ত ঘটনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। দেশবিভাগের পরে মুসলিম লীগের যেসব নেতা ভারতে থেকে যেতে বাধ্য হলেন তাঁদের অবস্থা রীতিমতো হাস্যস্পদ হয়ে পড়ে। জিন্না সাহেব করাচি চলে যান এবং ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে তাঁর ভারতীয় অনুগামীদের প্রতি এক ফতোয়া জারি করে যান যে এখন থেকে তারা যেন ভারতের সু-নাগরিক হিসেবে ভারতেই বসবাস করেন। জিন্না সাহেবের এই বিদায়-বাণী তাঁদের মনে প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি করে। এঁদের মধ্যে অনেকে ১৪ই আগস্টের পরে আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং ক্রোধ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, জিন্না বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের গভীর গাড্ডায় ফেলে রেখে গেছেন।
জিন্নার প্রতি তাঁদের ক্রোধের কারণ প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। জিন্না কীভাবে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন সে কথাও আমি বুঝতে পারিনি। তিনি তো প্রকাশ্যেই দেশবিভাগের দাবি তুলেছিলেন, এবং এ কথাও প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়েই পাকিস্তান গঠন করা হবে, সুতরাং ওই ভদ্রলোকদের বক্তব্য আমাকে রীতিমতো বিস্মিত করে। এবারে যখন দেশবিভাগের পরিকল্পনাটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে এবং পাকিস্তান গঠিত হয়েছে তখন মুসলিম লীগের এইসব পাণ্ডারা হঠাৎ জিন্না সাহেবকে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করছেন। ব্যাপারটি সত্যিই হতবুদ্ধিকর।
কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আমি তাঁদের এই মনোভাবের কারণ বুঝতে পারি। ওইসব লীগপন্থী নেতারা মনে মনে পাকিস্তানের যে চিত্র এঁকেছিলেন বাস্তবক্ষেত্রে তা না হওয়াতেই তাঁদের এই ক্ষোভ। পাকিস্তানের আসল চিত্র এবং পাকিস্তান গঠিত হলে যেসব অসুবিধা দেখা দেবে তা তাঁরা আগে ভাবতেই চাননি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হলে যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সেগুলো যে ভারতেই থেকে যাবে এ তো জানা কথা। উত্তর প্রদেশে এবং বিহারে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সুতরাং এও জানা কথা দেশবিভাগের পরে ও দুটি প্রদেশ ভারতেই থেকে যাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও লীগের ওইসব পাণ্ডা মূর্খের মতো ভেবে নিয়েছিলেন পাকিস্তান কায়েম হলে সমগ্র মুসলমান সমাজ একটা আলাদা জাতি হিসাবে গণ্য হবেন এবং নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করবেন। এরপর যখন মুসলিম-প্রধান প্রদেশগুলো ভারতের বাইরে চলে গেল, বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হলো এবং জিন্না সাহেব করাচিতে চলে গেলেন তখন ওইসব নেতৃস্থানীয় লীগপন্থীরা দেখতে পেলেন তাঁদের পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গেছে। এই কারণেই জিন্না সাহেবের বিদায়-বাণীকে তাঁরা গোদের ওপর বিষফোড়া হিসেবে মনে করলেন। ওঁরা আরো বুঝতে পারলেন দেশবিভাগের ফলে ওঁরা আগের চেয়েও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের আগেকার কাজকর্মের ফলে হিন্দু সমাজকেও তাঁরা শত্রু করেছেন।
মুসলিম লীগের ওইসব নেতা তখন বার বার বলতে থাকেন তাঁরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুসমাজের দয়ার পাত্র হয়ে পড়েছেন। আগে তাঁরা যেভাবে হিন্দুদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন তার ফলে এখন তাদের অবস্থা রীতিমতো গুরুতর হয়ে পড়েছে। আমি তখন মন্ত্রিমিশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে যে অভিমত প্রকাশ করেছিলাম সেই কথা তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিই। ১৯৪৬ সনের ১৫ই এপ্রিল এক বিবৃতির মাধ্যমে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতীয় মুসলমানদের সাবধান করে বলেছিলাম পাকিস্তান যদি সত্যিই গঠিত হয় তাহলে তারা ঘুম ভেঙে দেখতে পাবেন বেশির ভাগ মুসলমান পাকিস্তানে চলে গেলেও ভারতে যারা থেকে যাবেন তাঁদের থাকতে হবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে।
১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট
স্বাধীনতা উৎসব যাতে যথোপযুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয় সেই উদ্দেশ্যে ১৫ই আগস্টের জন্য এক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কথা হয় যে ওইদিন গভীর রাত্রে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং সেই অধিবেশনেই ভারতকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হবে। পরদিন সকাল নটায় আবার পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং সে অধিবেশনে লর্ড মাউন্টব্যাটেন উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। বলা বাহুল্য, এই পরিকল্পনা অনুসারেই কাজ হয়। সারা শহর সেদিন আনন্দে এমনই উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল যে জনসাধারণ দেশবিভাগজনিত শোকও সাময়িকভাবে বিস্মৃত হয়েছিলেন। শহর এবং শহরতলী থেকে লক্ষ লক্ষ নরনারী স্বাধীনতা উৎসবে যোগ দেবার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হয়েছিলেন। কথা হয়েছিল বেলা চারটের সময় স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। তাই প্রচণ্ড দাবদাহ অগ্রাহ্য করে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন। জনতা এতো বিশাল ছিল যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর গাড়ি থেকে নামতেই পারেননি। গাড়ির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি তাঁর উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন।
সেদিন জনগণের আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রায় বিকারের পর্যায়ে এসে গিয়েছিল। কিন্তু সে আনন্দ আটচল্লিশ ঘণ্টাও স্থায়ী হলো না। ঠিক তার পরদিনই বিভিন্ন স্থানে হানাহানির সংবাদ প্রচারিত হওয়ায় রাজধানীর বুকে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। শহরের বুকে ছড়িয়ে পড়ল হত্যা, মৃত্যু এবং নৃশংসতার হৃদয়বিদারক সংবাদ। সংবাদে জানা গেল, পূর্ব পাঞ্জাবে হিন্দু ও শিখরা দলবদ্ধভাবে মুসলমান মহল্লাগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। তারা বহুসংখ্যক গৃহে অগ্নিসংযোগ করেছে এবং শত শত নিরপরাধ নরনারী ও শিশুকে হত্যা করেছে। পশ্চিম পাঞ্জাব থেকেও একই ধরনের সংবাদ পাওয়া গেল। সেখানে মুসলমানরা নির্বিচারে হিন্দু ও শিখ নরনারী ও শিশুদের হত্যা করেছে। পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় পাঞ্জাবেই পাইকারি হারে ধ্বংস এবং হত্যাকাণ্ড চলছে। ব্যাপার গুরুতর দেখে পূর্ব পাঞ্জাব থেকে একের পর এক মন্ত্রী দিল্লীতে ছুটে আসছেন। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস নেতারাও আসতে লাগলেন। ঘটনার ভয়াবহতা দেখে তারা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। চরম হতাশা প্রকাশ করে তাঁরা বলেছিলেন এই হত্যাকাণ্ড কিছুতেই থামানো যাবে না। আমরা তাদের বলি তারা সেনাবাহিনীকে আহ্বান করেননি কেন? আমাদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বলেন পূর্ব পাঞ্জাবে যে সেনাবাহিনী রয়েছে তার ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করা যাচ্ছে না এবং তাদের কাছ থেকে কোনো রকম সাহায্য পাবার কথাও চিন্তা করা যায় না। তাঁরা দিল্লী থেকে সেনাবাহিনী পাঠাবার কথা বলেন।
প্রথম দিকে দিল্লীতে কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়নি; কিন্তু সারা দেশ জুড়ে যেভাবে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল তাতে দিল্লীতেও যে-কোনো সময়ে দাঙ্গা শুরু হয়ে যেতে পারে। সুতরাং দিল্লীতে যে ক্ষুদ্রায়তন রিজার্ভ বাহিনী ছিল সে বাহিনীকে দিল্লীর বাইরে পাঠানো যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত হয়নি। আমরা তাই অন্য প্রদেশ থেকে সেনাবাহিনী এনে পূর্ব পাঞ্জাবে পাঠাবো বলে স্থির করি। কিন্তু সেই বাহিনী পৌঁছবার আগেই রাজধানীতে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে আগত হৃতসর্বস্ব উদ্বাস্তু নরনারীর কাছ থেকে সেখানকার মর্মন্তুদ ঘটনাবলীর সংবাদ দিল্লীর হিন্দুদের মধ্যে প্রচারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লী শহরেও হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। দিল্লীর সেই দাঙ্গা শুধু উদ্বাস্তু এবং সাধারণ মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সরকারী কর্মচারীদের বাসভবনগুলোও আক্রান্ত হতে থাকে। পশ্চিম পাঞ্জাবের গণহত্যার সংবাদ দিল্লীতে প্রচারিত হবার পরেই দিল্লীর গুণ্ডাশ্রেণীর লোকেরা মুসলমানদের মহল্লাগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। দিল্লীর সেই হত্যালীলার নেতৃত্ব দেয় কিছুসংখ্যক শিখ।
এক রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের জামিন হিসেবে বিবেচনা করবার মারাত্মক মনোবৃত্তির কথা জেনে আমি কতোটা উদ্বেগ বোধ করেছিলাম সেকথা আগেই বলেছি। দিল্লীতে এবার সেই মনোবৃত্তিই নগ্নভাবে প্রকটিত হলো। পশ্চিম পাঞ্জাবের মুসলমানরা যদি ওখানকার হিন্দু ও শিখদের ওপরে নির্যাতন করে থাকে তার জন্য দিল্লীর নিরীহ মুসলমানদের দায়ী করা হবে কেন, এবং তাদের ওপরে প্রতিশোধই বা নেওয়া হবে কেন? এই তত্ত্বটি এমনই মারাত্মক ও সাংঘাতিক যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিই তা মেনে নিতে পারে না।
সেনাবাহিনীর মতিগতিও রীতিমতো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। দেশবিভাগের আগে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক মনোভাব বিদ্যমান ছিল না। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ এবং সেনাবাহিনী বিভক্ত হবার পরে সেনাবাহিনীর ভেতরেও সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লীতে তখন যে সেনাবাহিনী উপস্থিত ছিল তার বেশির ভাগ সৈনিকই ছিল হিন্দু ও শিখ। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারা গেল দিল্লীর আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ওদের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না। আমরা তাই দক্ষিণ ভারত থেকে সেনাবাহিনী আমদানি করবো বলে স্থির করি। দেশবিভাগের ফলে দক্ষিণ ভারতে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া হয়নি, এবং সেই কারণে ওখানকার সেনাবাহিনীর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করেনি। তাই দক্ষিণ ভারতের সেনাবাহিনীকে যখন দিল্লীতে নিয়ে আসা হয় তখন তারা খুব ভালোভাবে রাজধানীর পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।
দিল্লীর মূল শহরাঞ্চল বাদে কেরলবাগ, লোদী কলোনি, সব্জী মণ্ডি এবং সদর বাজার প্রভৃতি উপকণ্ঠ অঞ্চলগুলোতে বহুসংখ্যক মুসলমান বাস করতেন। ওইসব অঞ্চলে জীবন ও ধনসম্পত্তি মোটেই নিরাপদ ছিল না। কিন্তু তৎকালীন অবস্থায় সেনাবাহিনীর সাহায্যে তাদের রক্ষা করবার মতো ব্যবস্থা অবলম্বন করাও সম্ভব ছিল না। ওখানে তখন এমন এক অবস্থা বিরাজ করছিল যে মুসলমানরা রাত্রে ঘুমোবার সময় পরদিন জীবিত অবস্থায় শয্যাত্যাগ করতে পারবেন কিনা সে বিষয়েও তারা সন্দিহান ছিলেন।
সেই অগ্নিকাণ্ড, নরহত্যা এবং দাঙ্গার সময় আমি সামরিক অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে দিল্লীর বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করি। আমি লক্ষ্য করি, মুসলমানরা তাদের মনোবল হারিয়ে চরম হতাশার মধ্যে বাস করছিলেন। বহু মুসলমান আমার বাড়িতে আশ্রয় চান। তাঁদের মধ্যে ধনী এবং খ্যাতনামা লোকও অনেক ছিলেন। কিন্তু তাঁদের তখন পরনের জামাকাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কেউ কেউ আবার দিনের আলোয় ঘর থেকে বেরুতেই সাহস পাচ্ছিলেন না। তাঁদের সেনাবাহিনীর প্রহরায় গভীর রাত্রে অথবা পরদিন ভোরে আমার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। দেখতে দেখতে আমার বাড়িটা সর্বহারা উদ্বাস্তুতে ভরে গেল। কিন্তু তখনো সবাইকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যাপার দেখে আমি আমার বাড়ির কম্পাউন্ডে অনেকগুলো তাবু খাটিয়ে দিই। ধনী দরিদ্র, যুবক-বৃদ্ধ, নরনারী নির্বিশেষে বহুসংখ্যক মানুষ প্রাণভয়ে ভীত হয়ে পশুর মতো বসবাস করতে বাধ্য হন।
শীগগিরই বুঝতে পারা যায় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছুদিন বিলম্ব হবে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থিত বাড়িগুলো রক্ষা করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এক অঞ্চলে রক্ষী মোতায়েন করলে অন্য অঞ্চলে হাঙ্গামা শুরু হতে থাকে। আমরা তাই স্থির করি মুসলমানদের কয়েকটি সুরক্ষিত জায়গায় আশ্রয় দিতে হবে। একটি আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করা হয় পুরনো কেল্লায়। ওখানে তখন কোনো দালান ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল আস্তাবলের মতো কয়েকটা বস্তিঘর। সেগুলোও ভরে গেল। বিপুলসংখ্যক মুসলমান সারাটা শীতকাল সেই বস্তিতে কাটাতে বাধ্য হন।
শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দিল্লীতে তখন কয়েকজন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। আজ আমি দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, ওইসব ম্যাজিস্ট্রেটের মনোনয়ন সর্বক্ষেত্রে সুষ্ঠু হয়নি। ওঁদের মধ্যে কয়েকজন যথাযথভাবে কর্তব্য পালন করেননি। একজনের কথা আজও আমার মনে আছে। কংগ্রেসের একজন হিন্দু সদস্য তাঁর কাছে মুসলমানদের তরফ থেকে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। তিনি ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেন, একটা মুসলিম মহল্লা আক্রান্ত হবার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় ওখানকার মুসলমান পরিবারগুলো মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চাইছে। ম্যাজিস্ট্রেট তখন কোনো রকম ব্যবস্থা তো করলেনই না, উপরন্তু সেই কংগ্রেস সদস্যকে তার অসাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির জন্য উপহাস করেন। তিনি বলেন, একজন হিন্দু তাঁর কাছে মুসলমানদের পক্ষে ওকালতি করতে এসেছেন দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
এই ঘটনা থেকেই সে সময়ের অবস্থাটা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং কিছুসংখ্যক কংগ্রেস সদস্য কর্তব্যকার্যে অবহেলা করলেও কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং বেশির ভাগ কংগ্রেস সদস্য তখন খুব ভালোভাবেই কাজ করেছিলেন। কংগ্রেসের হিন্দু এবং শিখ সদস্যরা জাতীয়তাবাদী মনোভাব নিয়ে দৃঢ়ভাবে বিপদের মোকাবিলা করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। নানা মহল থেকে ওঁদের ওপর বিদ্রূপ বর্ষিত হলেও ওঁরা তাতে ভ্রূক্ষেপ করেননি।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশবিভাগের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে আগে আমি তার সমালোচনা করেছি। কিন্তু এবার তিনি যেভাবে দেশের সেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছিলেন তার জন্য এবার আমি তাঁকে অকুণ্ঠ সাধুবাদ জানাচ্ছি। দেশবিভাগের সময় তিনি অসীম ধৈর্য এবং অদম্য কর্মশক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন এবং দ্রুততার সঙ্গে যাবতীয় জটিল সমস্যার সমাধান করেছিলেন। এবার তিনি আরো বেশি ধৈর্য ও কর্মশক্তি নিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পুনঃসংস্থাপনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর সৈনিকের শিক্ষা এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করে। সে সময় তাঁর নেতৃত্ব এবং সেনাবিভাগের অভিজ্ঞতা ছাড়া আমরা সেই কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারতাম কিনা সন্দেহ। তিনি সে সময়কার পরিস্থিতিকে যুদ্ধকালীন অবস্থা হিসেবে ধরে নিয়ে কাজে নেমেছিলেন এবং যুদ্ধের সময় যেমন সব কাজ ঘড়ির কাঁটার মতো চলে সেইভাবেই সমস্যাগুলোর সমাধান করেছিলেন। কাজে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একটি কার্যকরী পরিষদ গঠন করেছিলেন। স্থির হয়েছিল যে সেই পরিষদ প্রতিটি ঘটনা বিবেচনা করে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কার্যকরী পরিষদ বাদে একটি জরুরী পর্ষদও গঠন করা হয়েছিল। সেই পর্ষদের সদস্য ছিলেন মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী। প্রতিদিন সকালে মন্ত্রিসভার কক্ষে পর্ষদের অধিবেশন বসতো। সভাপতিত্ব করতেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন স্বয়ং। অধিবেশনে বিগত চব্বিশ ঘণ্টার ঘটনাবলী সম্বন্ধে বিচার-বিবেচনা করে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। শান্তি স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত সেই পর্ষদ নিয়মিতভাবে কাজ করেছিল। পর্ষদের কাছে যেসব খবর আসতো তা থেকে পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা যেত।
শাসক হিসাবে জওহরলালের ভূমিকা
প্রকৃত শাসকের একটি প্রধান গুণ হলো তার নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের জীবন ও ধনসম্পত্তি রক্ষার গ্যারান্টি দেওয়া। ১৯৪৬-৪৭-এর বিপজ্জনক দিনগুলোতে জওহরলাল যেভাবে কাজ করেছিলেন তা থেকে বুঝতে পারা যায় যে প্রকৃত শাসকের যাবতীয় গুণাবলীই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। প্রথম যেদিন তিনি সরকারে যোগদান করেন সেই দিনই তিনি বুঝতে পারেন, রাষ্ট্র শাসনের ব্যাপারে হিন্দু মুসলমান শিখ খ্রীষ্টান পারসি বৌদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিটি ভারতবাসীকেই সমদৃষ্টিতে দেখতে হবে এবং আইনের চোখে সবাই সমান অধিকার ও সমান সুযোগ-সুবিধে পাবে।
শাসক হিসেবে জওহরলালের গুণাবলীর পরিচয় সর্বপ্রথম পাওয়া যায় ১৯৪৬ সনে। কলকাতার হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরেই নোয়াখালিতে দাঙ্গা শুরু হয়। ওখানে হিন্দুরা বিরাটভাবে অত্যাচারিত হতে থাকেন। নোয়াখালির প্রতিশোধ নেওয়া হয় বিহারের মুসলমানদের ওপরে। বিহারের হিন্দুরা ওখানকার মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ চালাতে থাকে। অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ায় বিহারের প্রাদেশিক সরকার পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সক্ষম না হওয়ায় ভারত সরকারকে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। আমি সে সময় প্রায় দু সপ্তাহ পাটনায় ছিলাম। সেই সময় জওহরলাল যেভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন এবং বিহারের মুসলমানদের ধনপ্রাণ রক্ষা করেছিলেন তা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমরা প্রত্যেকেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছিলাম কিন্তু এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আমাদের মধ্যে জওহরলালই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করেছিলেন।
এই সময় গান্ধীজী অত্যন্ত মানসিক অশান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। মুসলমানদের জীবন ও ধনসম্পত্তি রক্ষার জন্য এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনবার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের এবং ক্ষোভের সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন তাঁর প্রচেষ্টা সফল হচ্ছে না। প্রায়শই তিনি জওহরলাল, সর্দার প্যাটেল এবং আমাকে ডেকে পাঠাতেন এবং আমাদের কাছ থেকে শহরের ঘটনাবলীর বিবরণ জানতে চাইতেন। এই সময় তিনি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছিলেন প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আমাদের ভেতরে মতবিরোধ রয়েছে। মতবিরোধ আসলে আমার আর জওহরলালের সঙ্গে সর্দার প্যাটেলের। এর ফলে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার ওপরেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা দু দলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং বড় দলটি সর্দার প্যাটেলকে খুশি করবার জন্য তাঁর নির্দেশমতোই কাজ করতে থাকে। সেই দলটি বাদে একটি ক্ষুদ্রতর দল আমার এবং জওহরলালের দিকে তাকিয়ে থাকে। দিল্লীর চীফ কমিশনার খুরশেদ আহমেদ ছিলেন সাহেবজাদা আফতাব আহমেদের পুত্র। তিনি কড়া লোক ছিলেন না। তাছাড়া তিনি এমন আশঙ্কাও করতেন, তিনি যদি কোনো রকম কড়া ব্যবস্থা অবলম্বন করেন তাহলে তাঁকে হয়তো মুসলমানতোষণকারী হিসেবে গণ্য করা হবে। এই আশঙ্কার জন্য তিনি শুধু ‘দিনগত পাপক্ষয়’ করে চলেন এবং শহরের আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার ভার ডেপুটি কমিশনারের ওপরে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন। চীফ কমিশনারের এইরকম নিষ্ক্রিয়তার ফলে ডেপুটি কমিশনার নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতেন। ইনি ছিলেন শিখ সম্প্রদায়ের লোক। কিন্তু শিখ হলেও ইনি মাথায় লম্বা চুল রাখতেন না এবং দাড়ি কামিয়ে ফেলতেন। এর জন্য শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে বিশেষ সুনজরে দেখতেন না। দেশবিভাগের আগে থেকেই তিনি দিল্লীর ডেপুটি কমিশনারের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৫ই আগস্টের কয়েকদিন আগে কথা উঠেছিলো তাঁকে পূর্ব পাঞ্জাবে বদলি করা হবে। কিন্তু দিল্লীর বহুসংখ্যক নাগরিক এবং বিশেষ করে বহু মুসলমান তাঁকে দিল্লীতে রাখবার জন্য আমাদের কাছে অনুরোধ করেন। তাঁরা বলেন, ইনি একজন নিরপেক্ষ এবং কড়া অফিসার, সুতরাং তৎকালীন পরিস্থিতিতে ওঁকে বদলি করাটা উচিত হবে না।
অতএব ডেপুটি কমিশনারকে দিল্লীতেই রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু পাঞ্জাবের ঘটনাবলীর ফলে দিল্লীতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিস্তারলাভ করায় তিনি আর পূর্বের মতো কড়া মনোভাব এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছিলেন না। আমার কাছে এমন সব খবর আসতে থাকে যে ইনি সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। এক বছর আগে তাঁকে দিল্লীতে রাখবার জন্য যেসব মুসলমান তাঁর পক্ষে ওকালতি করতে এসেছিলেন, তারাই আবার আমার কাছে এসে অভিযোগ জানাতে থাকেন দিল্লীর মুসলমান নাগরিকদের রক্ষার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করছেন না। বিষয়টি সর্দার প্যাটেলকে জানানো হয়, কিন্তু তিনি সে কথায় কানই দেন না। সর্দার প্যাটেল ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সুতরাং দিল্লীর শাসনব্যবস্থা সরাসরি তাঁর অধীনেই ছিল। নরহত্যা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা বেড়ে চলতে থাকায় গান্ধীজী তাঁকে ডেকে পাঠান এবং পরিস্থিতির মোকাবিলা করবার জন্য তিনি কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা জানতে চান। সর্দার প্যাটেল তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, তাঁর কাছে যেসব খবর আসছে সেগুলো বিরাটভাবে অতিরঞ্জিত। তিনি এমন কথাও বলেন, মুসলমানদের অভিযোগ করবার মতো কোনো কারণই নেই। একদিনের কথা আমার সুস্পষ্টভাবে মনে আছে। সেদিন আমরা তিনজনই গান্ধীজীর সামনে বসেছিলাম। জওহরলাল দুঃখের সঙ্গে বলেন, দিল্লীতে মুসলমানদের যেভাবে বিড়াল-কুকুরের মতো হত্যা করা হচ্ছে তা তিনি সহ্য করতে পারছেন না। তাদের প্রাণরক্ষা করতে না পেরে তিনি নিজেকে অসহায় এবং উপহাসাস্পদ বলে মনে করছেন। দিল্লীতে যেসব হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে সে সম্বন্ধে জনসাধারণ তাকে প্রশ্ন করলে তিনি তাঁদের কি উত্তর দেবেন! জওহরলাল বার বার বলেন, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠায় তিনি মানসিক অশান্তি ভোগ করছেন।
এই সময় সর্দার প্যাটেলের মনোভাব দেখে আমরা অবাক হয়ে যাই। দিল্লী শহরে যখন প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে সেই সময় তিনি অবলীলাক্রমে গান্ধীজীকে বলেন, জওহরলালের অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই; এখানে-সেখানে হয়তো দু-চারটে ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলো যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করে মুসলমানদের ধনপ্রাণ রক্ষার ব্যবস্থা করেছে; এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। আসলে তিনি যা বলতে চান তা হলো, জওহরলাল নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজের সরকারের বিরুদ্ধেই বিষোদ্গার করছেন।
সর্দার প্যাটেলের কথা শুনে জওহরলাল কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে থাকেন। পরে তিনি হতাশভাবে গান্ধীজীর দিকে তাকিয়ে বলেন, এই যদি সর্দার প্যাটেলের অভিমত হয় তাহলে তার আর কিছু বলবার নেই।
সর্দার প্যাটেলের মন তখন কীভাবে কাজ করছিল তা আরো একটি ঘটনা থেকে বুঝতে পারা যায়। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন মুসলমানদের ওপরে দিনের পর দিন যেভাবে আক্রমণ চলছে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। এই উদ্দেশ্যে তিনি এক আজব তত্ত্বের অবতারণা করে বলেন, শহরের মুসলমান মহল্লা থেকে বহুসংখ্যক মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। তাঁর বক্তব্য হলো দিল্লীর মুসলমানরা হিন্দু ও শিখদের ওপরে আক্রমণ চালাবার মতলবেই ওইসব অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেছিল সুতরাং হিন্দু ও শিখরা যদি আগে থেকেই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন না করতো তাহলে মুসলমানরা তাদের সমূলে ধ্বংস করে ফেলতো। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে পুলিস কেরলবাগ এবং সব্জী মণ্ডি থেকে কিছু কিছু অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে এনেছিল। সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে সেইসব অস্ত্রশস্ত্র মন্ত্রীদের সভাকক্ষের পাশের ঘরে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা যখন দৈনন্দিন সম্মেলনে যোগদান করবার উদ্দেশ্যে সভাকক্ষে যাচ্ছিলাম তখন সর্দার প্যাটেল আমাদের বলেন, সভাকক্ষে যাবার আগে আমরা যেন পাশের ঘরে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্রগুলো দেখে আসি। সেখানে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, অস্ত্রগুলো একটা টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অস্ত্রগুলো লক্ষ্য করতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, ওখানে কয়েক ডজন রান্নাঘরের উপযোগী মরচে-পড়া ছুরি, কিছু পকেট-ছুরি এবং কিছুসংখ্যক পেনসিল কাটবার ছুরি রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলোর আবার বাঁট ছিল না। এগুলো ছাড়া আরো যেসব জিনিস ছিল সেগুলো হলো কিছুসংখ্যক লোহার গজাল—যেগুলো বেড়া দেবার কাজে দরকার হয় এবং কয়েকটা ঢালাই লোহার জলের পাইপ। সর্দার প্যাটেলের কথায় ওগুলোই হলো মুসলমানদের সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্র যা হিন্দু ও শিখদের সমূলে ধ্বংস করবার জন্য যোগাড় করে রাখা হয়েছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটেন খান-দুয়েক ছুরি হাতে তুলে নিয়ে শ্লেষের সুরে বলেন, এইসব অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যেই তারা দিল্লী শহর দখল করবার মতলব করেছিল। যুদ্ধের ব্যাপারে তাদের আশ্চর্য উদ্ভাবনী শক্তি দেখা যাচ্ছে।
আগেই বলেছি, শহরের বিরাটসংখ্যক মুসলমান পুরনো কেল্লায় বাস করছিলেন। শীত এসে পড়ায় তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। তাদের মাথার ওপরে কোনো রকম আচ্ছাদন ছিল না। এর চেয়েও নিদারুণ অবস্থা হলো শৌচাগারের অভাব। একদিন সকালে ডঃ জাকির হোসেন পর্ষদের সামনে সাক্ষ্য দিতে এসে পুরনো কেল্লার অব্যবস্থার কথা বর্ণনা করেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে মন্তব্য করেন, হতভাগ্য মানুষদের মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে এনে জীবিত অবস্থায় কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথা শুনে পর্ষদ আমাকে পুরনো কেল্লা পরিদর্শন করে সেখানকার অবস্থা সম্বন্ধে সব কথা জানাতে বলেন। আমি সেইদিনই ওখানে গিয়ে সরেজমিনে সব কিছু দেখে আসি। পরবর্তী বৈঠকের দিন পর্ষদ অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। সেনাবিভাগকে যতগুলো সম্ভব তাঁবু ধার হিসেবে দিতে বলা হয়, যাতে হতভাগ্য মানুষগুলো অন্তত ছাউনির নিচে মাথা গুঁজে থাকতে পারে।
গান্ধীজী অনশনের সিদ্ধান্ত নিলেন
গান্ধীজীর মানসিক অশান্তি দিনের পর দিন বেড়েই চলেছিল। একসময় তাঁর সামান্যতম ইচ্ছাকে পূরণ করবার জন্যও সমগ্র জাতি উন্মুখ হয়ে থাকতো কিন্তু এখন তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধেও কেউ কর্ণপাত করছিল না। ব্যাপারটি অসহনীয় হয়ে উঠলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এখন তাঁর সামনে একটিমাত্র পথই খোলা আছে এবং তা হলো অনশন। দিল্লীতে শান্তি স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন করার কথা ভাবছেন। আমার কাছ থেকে এই খবর জানতে পেরে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এতোদিন যারা নিশ্চেষ্ট হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই কাজে নেমে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পারেন, গান্ধীজীর তৎকালীন শারীরিক অবস্থায় যেমন করেই হোক তাঁকে অনশনের সংকল্প থেকে প্রতিনিবৃত্ত করা দরকার। তাঁরা তখন গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে অনশনের সংকল্প পরিত্যাগ করবার জন্য অনুরোধ করেন। গান্ধীজী তাঁদের কথা মেনে নিতে সম্মত হন না। অনশনের সংকল্পে তিনি অটল থাকেন।
গান্ধীজী সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয়েছিলেন সর্দার প্যাটেলের মতিগতি লক্ষ্য করে। সর্দার প্যাটেল ছিলেন গান্ধীজীর একান্ত বিশ্বস্ত এবং প্রিয় সহচর। সর্দার প্যাটেলের যা কিছু উন্নতি তার সবই হয়েছিল গান্ধীজীর সাহায্যে। কংগ্রেসের বেশির ভাগ নেতারই আগে থেকে কিছু কিছু রাজনৈতিক ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু সর্দার প্যাটেল এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের তেমন কোনো ঐতিহ্য ছিল না। এই দুজন নেতাকে গান্ধীজীই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। গান্ধীজী যখন আমেদাবাদে ছিলেন সেই সময় তিনি সর্দার প্যাটেলকে রাজনীতিতে আনেন এবং ধাপে ধাপে তাঁকে ওপরে তুলে দেন। প্যাটেলও সর্বতোভাবে গান্ধীজীকে সমর্থন করতে থাকেন। তিনি কীভাবে গান্ধীজীর কথার প্রতিধ্বনি করতেন সে কথা আমি আগেই বলেছি। গান্ধীজীই প্যাটেলকে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য করেন এবং গান্ধীজীর সাহায্যেই প্যাটেল ১৯৩১ সনে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হন। এ হেন প্যাটেল যখন গান্ধীজীর নীতির বিরোধিতা করতে থাকেন তখন স্বাভাবিকভাবেই গান্ধীজী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
গান্ধীজী বলেন, তার চোখের সামনেই দিল্লীর মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে এবং এই কাজটি হচ্ছে যখন তাঁর প্রিয় বল্লভভাই ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে রাজধানীর আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত। প্যাটেল যে শুধু মুসলমানদের ধনপ্রাণ রক্ষা করতেই অক্ষম হয়েছেন তাই নয়, তিনি বাস্তব ঘটনাকে লঘুভাবে চিত্রিত করে যাবতীয় অভিযোগকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। এই কারণেই গান্ধীজী বলেন, এখন তার হাতে শুধু তার শেষ অস্ত্র, অর্থাৎ অনশন ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তিনি তাই ১৯৪৮ সনের ১২ই জানুয়ারী থেকে অনশন শুরু করেন। একদিক থেকে বিবেচনা করলে তার এই __ সর্দার প্যাটেলের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এবং প্যাটেলও সে কথা ভালো করেই জানতেন।
গান্ধীজীকে অনশনের সংকল্প থেকে প্রতিনিবৃত্ত করতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। আমাদের অনুরোধে কর্ণপাত না করে তিনি অনশন শুরু করেন। অনশনের প্রথম দিন সন্ধ্যার সময় জওহরলাল, সর্দার প্যাটেল এবং আমি তাঁর পাশে বসেছিলাম। পরদিন সকালে সর্দার প্যাটেলের বোম্বাই যাবার কথা। তিনি গান্ধীজীর সঙ্গে গতানুগতিকভাবে কথা বলেন এবং কথাপ্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে গান্ধীজী অকারণেই অনশন করছেন। তিনি আরো বলেন, গান্ধীজীর এবারের অনশন জাতীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বেশ কিছুটা তিক্ত কণ্ঠে বলেন, গান্ধীজী এমনভাবে কাজ করছেন যেন মুসলমানদের হত্যা করার জন্য তিনিই দায়ী।
গান্ধীজী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মৃদুস্বরে বলেন, ‘আমি তো চীনদেশে অবস্থান করছি না। আমি এখন দিল্লীতেই রয়েছি। তাছাড়া আমি আমার চোখ এবং কানও হারাইনি। আপনি যদি আমার নিজের চোখ ও কানকে অবিশ্বাস করে এই কথা মেনে নিতে বলেন যে মুসলমানদের অভিযোগের কোনো কারণই নেই, তাহলে আমি আপনাকে বুঝতে পারবো না, অথবা আপনিও আমাকে বুঝতে পারবেন না। হিন্দু ও শিখরা আমার ভাই, তারা আমার নিজের রক্তমাংসের মতো। তাঁরা যদি ক্রোধে অন্ধ হয়ে থাকেন তাহলে আমি তাদের ওপর দোষারোপ করবো না। আমি আশা করবো আমার অনশনের ফলে তাঁদের মনে শুভবুদ্ধি ফিরে আসবে।’
সর্দার প্যাটেল একটি কথাও না বলে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তাঁর হাবভাব দেখে মনে হলো, তিনি ওখান থেকে চলে যাচ্ছেন। আমি তখন তাঁকে বাধা দিয়ে বলি, বর্তমান অবস্থায় তাঁর বোম্বাই যাওয়া বন্ধ করে দিল্লীতেই থাকা উচিত। কারণ তাঁর অনুপস্থিতিতে গান্ধীজীর অবস্থা কিরকম দাঁড়াবে তা কেউ বলতে পারে না।
আমার কথার উত্তরে প্যাটেল প্রায় চিৎকার করে বলেন, ‘এখানে থেকে কী করবো? গান্ধীজী আমার কথা শুনতেই প্রস্তুত নন। তিনি বিশ্ববাসীর সামনে হিন্দুদের মুখে কলঙ্কের কালি লেপে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; এই যেখানে তাঁর মনোভাব সেখানে আমি আর এখানে বসে থাকতে পারি না; কাজেই আমি বোম্বাই যাবই।’
সর্দার প্যাটেলের কথাগুলো এবং বিশেষ করে তাঁর উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনে আমি রীতিমতো মর্মাহত হই। গান্ধীজীর মনেও তাঁর এই কথাগুলো যে কী রকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে সে কথাটা মনে করে আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হই। আমরা তাই মনে করি এরপর সর্দার প্যাটেলকে আর কিছু বলা নিরর্থক। একটু পরেই প্যাটেল ওখান থেকে চলে যান।
গান্ধীজীর অনশনের প্রতিক্রিয়া
সর্দার প্যাটেল গান্ধীজীর ওপরে বিরূপ হলেও দিল্লীর অধিবাসীরা মোটেই বিরূপ ছিলেন না। গান্ধীজীর অনশনের সংবাদ প্রচারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লীসহ সমগ্র ভারতবর্ষ বিচলিত হয়ে ওঠে। দিল্লী শহরে এটি বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো কাজ করে। যেসব লোক সেদিন পর্যন্ত গান্ধীজীর বিরোধিতা করে এসেছেন তাঁরা দলে দলে আমাদের কাছে এসে বলেন গান্ধীজীর জীবনরক্ষার জন্য তাঁরা সবকিছু করতে প্রস্তুত আছেন।
অনেকে গান্ধীজীর সঙ্গেও দেখা করেন এবং তাঁর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, দিল্লীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। গান্ধীজী তাদের কথায় বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেন না। ছদিন জ্বরভাবের মধ্যে কেটে যায়। তৃতীয় দিন দিল্লীতে একটি জনসভা আহ্বান করা হয়। গান্ধীজীর অনশন বন্ধ করবার জন্য কি কি ব্যবস্থা অবলম্বন করা যায় তা স্থির করবার জন্যই উক্ত জনসভা আহূত হয়।
সভায় যাবার পথে আমি গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করি এবং জনসভার কথা তাকে জানিয়ে দিই। আমি তাকে আরো বলি, কি কি শর্তে তিনি অনশন ত্যাগ করতে পারেন তা যদি আমাকে জানিয়ে দেন তাহলে আমি সেগুলো জনগণের সামনে দাখিল করতে পারি এবং সভায় উপস্থিত জনগণকে বলতে পারি যে সেইসব শর্ত পালিত হবে বলে গান্ধীজী যদি নিঃসন্দেহ হন তাহলে তিনি অনশন ভঙ্গ করতে পারেন।
গান্ধীজী বলেন, ‘এটা একটা কথার মতো কথা বটে। যাই হোক, আমার প্রথম শর্ত হলো, হিন্দু ও শিখদের আক্রমণের ফলে যেসব মুসলমান দিল্লী পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের সবাইকে ফিরিয়ে এনে তাঁদের নিজ নিজ বাড়িতে পুনর্বসতি দিতে হবে।’
গান্ধীজীর এই প্রস্তাব তাঁর সদিচ্ছার অভিব্যক্তি হলেও বাস্তবক্ষেত্রে একে কার্যকর করা নানা কারণে সম্ভব ছিল না। দেশবিভাগের ফলে লক্ষাধিক হিন্দু ও শিখ হৃতসর্বস্ব অবস্থায় ভারতে চলে এসেছেন। আবার লক্ষাধিক মুসলমান পূর্ব পাঞ্জাব থেকে পাকিস্তানে চলে গেছেন। দিল্লী থেকেও হাজার হাজার মুসলমান পাকিস্তানে চলে গেছেন। আবার পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে সমসংখ্যক বা তার চেয়েও বেশি হিন্দু ও শিখ দিল্লীতে এসে মুসলমানদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। এটা যদি দু-চার শো লোকের ব্যাপার হতো তাহলে হয়তো গান্ধীজীর এই শর্ত পালন করা সম্ভব হতো। কিন্তু তা যখন হাজার হাজার নরনারীর ব্যাপার তখন এই শর্ত পালন করতে হলে নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে। যেসব হিন্দু ও শিখ বাস্তুহারা হয়ে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে দিল্লীতে এসে কোনো রকমে মাথা গোঁজবার মতো আশ্রয় পেয়েছেন তাঁদের যদি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয় তাহলে তাঁরা কোথায় যাবেন? তাছাড়া যেসব মুসলমান দিল্লী পরিত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে গেছেন তারা হয়তো পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় তাঁদের কেমন করে খুঁজে বের করা যাবে? মুসলমানদেরও ফিরিয়ে আনা যাবে না এবং হিন্দু ও শিখদের নতুন করে আশ্রয়হীন করা যাবে না। তা করতে হলে মুসলমানদের যেভাবে প্রথমে বিতাড়িত করা হয়েছে প্রায় সেইভাবেই হিন্দু ও শিখদেরও আর একবার বিতাড়িত করতে হবে।
আমি গান্ধীজীর হাত দুটি ধরে বলি, তিনি যেন এই শর্তটি পরিত্যাগ করেন, কারণ ‘মুসলমানদের খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনা যাবে না এবং যেসব হিন্দু ও শিখ কোনো রকমে মাথা গুঁজে থাকবার মতো আশ্রয় পেয়েছে তাদের দ্বিতীয়বার আশ্রয়হীন করা যাবে না’। আমি তাই গান্ধীজীর কাছে আবেদন জানাই তিনি যেন এই শর্তটির ওপরে জোর না দিয়ে নয়হত্যা ও গৃহদাহ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে বলে প্রথম শর্ত দেন। এই সম্পর্কে তিনি আরো একটি শর্ত জুড়ে দিতে পারেন, এখনো যেসব মুসলমান ভারতে রয়েছেন তারা যাতে শান্তিতে এবং সম্মানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বাস করতে পারেন তার জন্য অবিলম্বে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রথমে গান্ধীজী এতে সম্মত হননি এবং তাঁর প্রথম শর্তের ওপরেই জোর দিতে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে অসুবিধেগুলোর কথা শোনবার পর তিনি আমার প্রস্তাবে সম্মত হন। আমি তখন গান্ধীজীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর পরবর্তী শর্তসমূহ জানাতে বলি।
আমার কথার উত্তরে গান্ধীজী বলেন, মুসলমানদের যেসব মসজিদ ও ধর্মস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোকে অবিলম্বে মেরামত করতে হবে। ওইসব ধর্মস্থান অমুসলমানদের দ্বারা অধিকৃত থাকায় মুসলমানরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে আছেন। গান্ধীজী বলেন, ওইসব জায়গা থেকে অমুসলমানদের অবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো দিন যাতে ধর্মস্থানের ওপরে আক্রমণ করা না হয় তার জন্য নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এরপর গান্ধীজী নিম্নলিখিত শর্তগুলো দেন:
১। হিন্দু ও শিখরা অবিলম্বে মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ বন্ধ করবে এবং মুসলমানদের এই বলে নিশ্চয়তা দেবে যে তারা ভাইয়ের মতো একসঙ্গে বাস করবে।
২। হিন্দু এবং শিখরা এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করবে যাতে একজন মুসলমানও প্রাণভয়ে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য না হয়।
৩। চলন্ত ট্রেনে মুসলমানদের ওপরে যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং যেসব হিন্দু ও শিখ ট্রেনে আক্রমণ চালাচ্ছে তাদের প্রতিনিবৃত্ত করতে হবে।
৪। যেসব মুসলমান বিভিন্ন ধর্মস্থানের নিকটে বাস করছেন (যেমন নিজামুদ্দিন আউলিয়া, খাজা কুতুবউদ্দীন বকতিয়ার, নাসিরুদ্দিন চিরাগ দেলভী) এবং তাঁদের বাড়িঘর পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের সবাইকে তাঁদের নিজ নিজ বাড়িতে পুনর্বসতি দিতে হবে।
৫। দরগা কুতুবউদ্দীন বকতিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই দরগা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য ধর্মস্থান সরকার কর্তৃক সহজেই মেরামত হতে পারে। কিন্তু গান্ধীজী চান ওইসব মেরামতের কাজ হিন্দু ও শিখদের করতে হবে, কারণ এতে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
৬। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি হলো হৃদয়ের পরিবর্তন। অন্যান্য শর্ত পালন করবার আগে এটাই সবচেয়ে বেশি দরকার। অতএব হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের নেতাদের গান্ধীজীর কাছে এসে জানাতে হবে যে তাঁদের মনে আর কোনো রকম বিদ্বেষ বা বিক্ষোভ নেই।
এইসব শর্ত পালন করা হলে এবং পালন করা হবে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হলে গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করতে পারেন।
আমি গান্ধীজীকে কথা দিই, তাঁর প্রতিটি শর্তই পালিত হবে।
গান্ধীজীর ইচ্ছানুসারে কাজ হলো
বেলা দুটোর সময় আমি সভায় উপস্থিত হই এবং গান্ধীজীর শর্তগুলো শ্রোতাদের কাছে পেশ করি। আমি তাদের আরো বলি, গতানুগতিকভাবে প্রস্তাব পাস করলে তিনি খুশি হবেন না। তিনি যেসব শর্ত দিয়েছেন সেগুলো পালন করা হবে বলে তাঁকে নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমি তাই আপনাদের মতামত জানবার উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। গান্ধীজীর শর্তগুলো পালন করা হবে বলে নিশ্চয়তা দিতে আপনারা প্রস্তুত আছেন কি না, সে কথা আপনারা আমাকে এখনই জানিয়ে দিন।
সভায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার নরনারী উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা একবাক্যে জানালেন, ‘আমরা অক্ষরে অক্ষরে গান্ধীজীর শর্তগুলো পালন করব। এর জন্য যদি প্রাণ দিতে হয় তবুও আমরা পিছপা হব না’।
আমি যখন বক্তৃতা করছিলাম সে সময় অনেকে গান্ধীজীর শর্তগুলো কাগজে লিখে নিয়ে সেইসব কাগজের ওপরে শ্রোতাদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করছিলেন। সভা শেষ হবার আগেই হাজার হাজার লোক সেইসব কাগজে স্বাক্ষর করলেন। দিল্লীর ডেপুটি কমিশনার একদল হিন্দু ও শিখ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে তখনই বেরিয়ে পড়লেন খাজা কুতুবউদ্দীন দরগাটিকে মেরামত করবার জন্য। একই সঙ্গে দিল্লীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতারা ঘোষণা করলেন, গান্ধীজীর শর্তগুলো যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় তার দায়িত্ব তাঁরা গ্রহণ করছেন। দিল্লীর বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং দল থেকে প্রতিনিধিরা আমার কাছে এসে জানিয়ে গেলেন, গান্ধীজীর শর্তগুলো তাঁরা মেনে নিয়েছেন। তাঁরা আমাকে অনুরোধ করলেন, আমি যেন গান্ধীজীকে তাঁদের কথা জানিয়ে দিই এবং তাঁর অনশন ত্যাগের জন্য অনুরোধ করি।
পরদিন সকালে দিল্লীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আমি একটি ঘরোয়া সভায় মিলিত হই। উক্ত সভায় গান্ধীজীর শর্তগুলো নিয়ে আর একবার আলোচনা করা হয়। এই আলোচনার ফলে স্থির হয় আমরা বিড়লা ভবনে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের বক্তব্য পেশ করব। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি বেলা দশটায় বিড়লা ভবনে গিয়ে গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করে বলি, আমি এখন পুরোপুরিভাবে নিঃসন্দেহ হয়েছি যে তাঁর প্রতিটি শর্তই যথাযথভাবে পালিত হবে। আমি আরো বলি, তাঁর অনশন হাজার হাজার মানুষের হৃদয় পরিবর্তন করেছে এবং তাদের মনে শুভবুদ্ধি ফিরে এসেছে। হাজার হাজার লোক এই বলে শপথ নিয়েছে, এখন থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনই হবে তাদের প্রথম কাজ। এই কথা জানিয়ে দিয়ে আমি গান্ধীজীর কাছে আবেদন জানাই, তিনি যেন অবিলম্বে অনশন ভঙ্গ করে লক্ষ লক্ষ মানুষের উৎকণ্ঠা দূর করেন।
আমার কথা শুনে গান্ধীজী খুশি হলেও তখনই অনশন ভঙ্গ করতে সম্মত হলেন না। সেদিনটি আলোচনা এবং মতবিনিময়ের মধ্যেই কেটে গেল। তাঁর দৈহিক শক্তি কমে এসেছিলো এবং শরীরের ওজনও যথেষ্ট হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। তিনি তাই বিছানায় শুয়েই সমাগত জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য শুনছিলেন এবং সত্যিই তাঁদের হৃদয়ের পরিবর্তন হয়েছে কি না তা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ আলোচনা এবং মতবিনিময়ের পরে তিনি জানান, পরের দিন তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন করবেন।
পরদিন সকাল দশটায় আবার আমরা তাঁর কাছে উপস্থিত হই। জওহরলাল আগে থেকেই তাঁর কাছে বসে ছিলেন। ডঃ জাকির হোসেন এবং পাকিস্তানের হাই কমিশনারও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। হাই কমিশনারকে পাঠানো হয়েছিলো গান্ধীজীর অবস্থা জানবার জন্য। ভদ্রলোক বাইরে অপেক্ষা করছেন শুনে গান্ধীজী তাকে ডেকে পাঠান। গান্ধীজীর ঘরে তখন সর্দার প্যাটেল ছাড়া মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। গান্ধীজী তখন ইশারায় বুঝিয়ে দেন, যাঁরা শপথ নিতে চান তাঁরা এবার তা করতে পারেন। হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের পনেরো জন নেতা একে একে এগিয়ে এসে এই বলে শপথ বাক্য উচ্চারণ করেন যে তাঁরা গান্ধীজীর শর্তগুলো বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন। শপথ গ্রহণের কাজ শেষ হলে গান্ধীজী আর একবার ইশারা করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ মহলের নরনারীরা রামধুন গান গাইতে শুরু করেন। এই সময় তাঁর পৌত্রী এক গ্লাস লেবুর রস নিয়ে ওখানে আসেন। গান্ধীজী ইশারা করে গ্লাসটিকে আমার হাতে দিতে বলেন। আমি তখন গ্লাসটি নিয়ে তাঁর মুখে তুলে দিই। গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করেন।
গান্ধীজী অনশন শুরু করবার পরে স্টেটসম্যান পত্রিকার ভূতপূর্ব সম্পাদক মিঃ আর্থার মুরও অনশন শুরু করেন। তিনি অনশন করছিলেন ইম্পিরিয়াল হোটেলে। হিন্দু-মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তাঁর অনশনের খবর পেয়ে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই দাঙ্গাহাঙ্গামার অবসান না হলে তিনি অনশনে প্রাণত্যাগ করবেন। বহুদিন যাবৎ তিনি ভারতে বাস করছিলেন এবং এ দেশকে নিজের দেশ হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেন, একজন ভারতবাসী হিসেবে এই অমানুষিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য বলে মনে করেন। তিনি আরো বলেন, ভারতে যেসব ঘটনা ঘটছে তার দর্শক হবার চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয়। এখন আমি তাঁর কাছে খবর পাঠালাম গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করেছেন, সুতরাং তিনিও যেন আর অনশন না চালিয়ে যান।
গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করলেও তাঁর দৈহিক শক্তি ফিরে আসতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যায়। ইতিমধ্যে প্যাটেলও বোম্বাই থেকে ফিরে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের সাক্ষাৎকারের সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেদিন আমি আর একবার গান্ধীজীর মহানুভবতার প্রমাণ পাই। প্যাটেল তাঁর কাছে উপস্থিত হলে তিনি আন্তরিকভাবেই তাঁকে গ্রহণ করেন। তাঁর মনে তখন ক্রোধ বা ক্ষোভের লেশমাত্র ছিল না। প্যাটেল এতে বেশ কিছুটা অসুবিধেয় পড়েন। কিন্তু তখনও তিনি শুকনো শিষ্টাচারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। গান্ধীজীর প্রতি তিনি খুশি ছিলেন না। তাছাড়া, মুসলমানদের ধনপ্রাণ রক্ষার জন্য তিনি যা করেছেন তাও তিনি খুশিমনে মেনে নিতে পারেননি।
গান্ধীজীর বিরুদ্ধাচারীদের মধ্যে প্যাটেল ছাড়া আরো কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় হিন্দু ছিলেন। গান্ধীজীর প্রার্থনাসভার শুরু থেকেই এঁরা গান্ধীজীর বিরোধিতা করতে শুরু করেন। এঁরা প্রকাশ্যেই অভিযোগ আনেন যে গান্ধীজী হিন্দুদের স্বার্থকে বলি দিচ্ছেন। ব্যাপারটা তখন শুধু দিল্লীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হিন্দুমহাসভা এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের নেতৃত্বে হিন্দুদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই বলতে থাকেন, গান্ধীজী হিন্দুদের স্বার্থ বলি দিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করছেন। এঁদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক গান্ধীজীর প্রার্থনাসভাতেও ঝামেলা শুরু করেন। প্রার্থনাসভায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠ করা হতো। এইসব ধর্মগ্রন্থের ভেতর বাইবেল এবং কোরাণও ছিল। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মহাসভা ও আর.এস.এস.-পন্থী ব্যক্তিরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, প্রার্থনাসভায় কোরাণ এবং বাইবেল পড়া চলবে না। এই ব্যাপারে হ্যান্ডবিল এবং পুস্তিকাও বিতরণ করা হয়। এই ধরনের প্রচারের ফলে অনেকেই গান্ধীজীর ওপরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে হিন্দুসমাজের শত্রু হিসেবে মনে করতে থাকেন। একটি ইস্তাহারে এমন কথাও লেখা হয় যে তিনি যদি তাঁর কর্মপন্থা পরিত্যাগ না করেন তাহলে তাঁকে নীরব করে দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে।
গান্ধীজীর ওপরে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের আক্রমণ
গান্ধীজীর অনশন তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এবার এঁরা গান্ধীজীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে বলে স্থির করে। গান্ধীজী তাঁর প্রার্থনাসভা পুনরায় শুরু করবার কয়েকদিন পরেই তাঁকে লক্ষ্য করে একটি বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। সৌভাগ্যক্রমে তাতে কেউ আহত হয়নি কিন্তু সারা ভারতের জনসাধারণ এই খবর জেনে মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন। গান্ধীজীর ওপরে কেউ যে বোমা নিক্ষেপ করতে পারে তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারতেন না। কিন্তু সেই অকল্পনীয় কাজটিই হতে দেখা গেল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই দেশবাসী এতে বিচলিত হয়ে পড়েন। এ ব্যাপারে পুলিসের ভূমিকা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। পুলিস গতানুগতিকভাবে একটা তদন্ত করলেও আসামীকে তারা খুঁজে বের করতে পারে না। বিড়লা ভবনের মতো সুরক্ষিত প্রাসাদে কিভাবে আততায়ী বোমা নিয়ে প্রাচীর-ঘেরা বাগানে ঢুকতে পারে অথবা এই পরিকল্পনার পেছনে কারা ছিল সে কথাও পুলিস জানতে পারেনি। আরো বিস্ময়ের কথা হলো, এই বোমা নিক্ষেপের পরেও গান্ধীজীর জীবনরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়নি। এই আক্রমণের ফলে স্পষ্টতই বুঝতে পারা গিয়েছিল, একদল লোক গান্ধীজীকে হত্যা করতে কৃতসংকল্প হয়েছিল। সুতরাং এটা আশা করা মোটেই অসঙ্গত ছিল না যে দিল্লীর পুলিস এবং সি.আই.ডি. গান্ধীজীর জীবনরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করবে। কিন্তু চরম লজ্জা এবং দুঃখের কথা এই, পূর্বোক্ত ঘটনার পরেও বিশেষ কোনো ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়নি।
আরো কয়েকদিন পরের কথা। গান্ধীজী তখন আবার তাঁর দৈহিক শক্তি ফিরে পেয়েছেন এবং আবার তিনি প্রার্থনান্তিক ভাষণ দিতে শুরু করেছেন। হাজার হাজার নরনারী গান্ধীজীর প্রার্থনাসভায় আসতেন। গান্ধীজী তাই মনে করতেন প্রার্থনাশেষে ভাষণ দিলে সমাগত ব্যক্তিদের কাছে তাঁর নীতিকে পৌঁছে দেওয়া যাবে।
১৯৪৮-এর ৩০শে জানুয়ারী। সেদিন বিকেল আড়াইটের সময় আমি বিড়লা ভবনে গিয়ে গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করি। তাঁর সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবার জন্যই আমি তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা করে আমি বাড়িতে ফিরে যাই। কিন্তু বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায়, আরো কয়েকটি বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়নি। আমি তাই আবারও বিড়লা ভবনে যাই। কিন্তু ফটকের সামনে উপস্থিত হতেই আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি ফটক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফটকের বাইরের ময়দানে তখন হাজার হাজার মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখে মুখে আমি উৎকণ্ঠার চিহ্ন দেখতে পাই। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে আমি গাড়ি থেকে নেমে ফটকের সামনে এগিয়ে যাই। আমাকে দেখতে পেয়ে দ্বাররক্ষী ফটক খুলে আমায় ভেতরে আসতে দেয়। ভেতরে ঢুকে আমি সোজা এগিয়ে যাই বাড়ির সদর দরজার দিকে। দরজার ফোকর দিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে বাড়ির একজন অধিবাসী দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। আমি যখন ভেতরে ঢুকছিলাম সেই সময় একজন লোক অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘গান্ধীজী পিস্তলের গুলিতে আহত হয়েছেন। তিনি এখন অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছেন!’
খবরটা এতোই আকস্মিক এবং শোকাবহ যে আমি একেবারে স্থাণুর মতো হয়ে যাই। আমি তখন এক অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় গান্ধীজীর কক্ষে প্রবেশ করি। সেখানে যেতেই দেখি গান্ধীজী মেঝের ওপরে পড়ে আছেন। তাঁর মুখটা অস্বাভাবিক রকমে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর চোখ দুটি নিমীলিত ছিল। তাঁর দুই পৌত্র তাঁর পা দুটি ধরে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আমি যেন স্বপ্নের ঘোরে শুনতে পেলাম “গান্ধীজী আর নেই”।
