Accessibility Tools

ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

ভূতের অট্টহাসি – সমুদ্র পাল

ভূতের অট্টহাসি

বাড়ির একতলার ছোট্ট বৈঠকখানা ঘরে সুজয় শুতে ভালোবাসে। ভাইবোন কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে এক ঘরে শুতে চায় না কখনো৷

বৈঠকখানা ঘরটা রাতের বেলা ফাঁকা পড়ে থাকে। ঐখানেই শুয়েই তার আনন্দ।

ক্লাস এইটে পড়ে সুজয়। কিন্তু এই বয়সেই অদ্ভুত তার সাহস। ভয় কাকে বলে তা সে জানে না।

একদিন রাতের বেলা।

রাত তখন প্রায় বারোটা কি একটা হবে। সুজয়ের ঘুম ভেঙে গেল।

—সুজয়, ও সুজয়।

—কে?

সুজয় দরোজা খুলে দিলো। দেখলো – তার বন্ধু বিভাস সামনে দাঁড়িয়ে ফিক্ ফিক্ করে হাসছে।

—এ কিরে, এতো রাতে তুই!

—হ্যাঁ, এই এলাম, আর কি!

—কোত্থেকে?

—মিনিজয়া থেকে সিনেমা দেখে ফিরছি।

—তা এতো রাতে?

—তোর এখানেই থাকবো যে আজ।

—বাড়ি যাবি না?

—না।

—কেন?

—বাবা-মা, আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ভালো করে বিভাসের দিকে তাকালো সুজয়। বিভাসের মুখে মৃদু হাসি। দুঃখের লেশমাত্র নেই। সুজয় দেখলো বিভাস সুন্দর করে আজ সেজেছে। পরনে গরদের পাঞ্জাবী, পাজামা, হাতে আংটি। পায়ে দামী জুতো।

—এতো সেজেছিস কেন?

—বাবা-মা বাড়ি থেকে তাড়াবার আগে সব ভালো ভালো পোশাক দিয়ে সাজিয়ে বলেছে – আর কখনো এ বাড়িতে ঢুকবি না তুই। আশ্চর্য কথাবার্তা বিভাসের।

সুজয় তাকে বসতে বললো। বিভাস বিছানায় বসলো। কিন্তু কি আশ্চর্য সে বিছানায় বসলেও, বিছানা একটুও কুঁকড়ে গেল না। যেন তার দেহের কোনও ভার বা চাপও নেই।

সুজয় অতো খুঁটিয়ে ভাবলো না। সে বললো — এখন রাগ-টাগ রাখ তো! চল বাড়ি যাই। তোর বাবা-মাকে তোর ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলবো এখন।

—না, এখন আর নড়তে পারছি না। পেটে দারুণ ব্যথা করছে।

—বেশ তো তবে শুয়ে পড় এখানে। সকালে তোকে পৌঁছে দিয়ে আসবো।

—না, আর বাড়ি যাবো না।

—তবে কোথায় যাবি?

—অনেক দূর দেশে। আচ্ছা, অনেক দূর দেশে কোথায় যাই বল তো? যেখানে মানুষজন খুবই কম। ধর গ্রীণল্যান্ড যাকে বলে এস্কিমোদের দেশ বরফের দেশে যাবো। ভূগোলে পড়িস নি।

—কিন্তু অনেক টাকা লাগবে যে যেতে সেখানে।

—কিছুই লাগবে না।

—কেন?

—আমি এমনভাবে যাবো যে কেউ দেখতেই পাবে না আমাকে।

—তোর যত্তোসব পাগলামির কথা রাখ, এখন চুপ করে শুয়ে পড় দেখি।

—আচ্ছা আচ্ছা শুচ্ছি।

বিভাস খাটে শুয়ে পড়লো। সুজয় মেঝেতে মাদুর পেতে একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়লো।

ঘণ্টাখানেক পরে। হঠাৎ সুজয়ের ঘুম ভেঙে গেল।

দেখলো ঘরের মধ্যে বিভাস নেই। আশ্চর্য! ছেল্টো গেল কোথায়? সুজয় দুশ্চিন্তায় পড়লো।

ডাক দিলো বিভাস বিভাস

কোনো উত্তর নেই।

ভালো করে চারিদিকটা তাকালো।

দরোজা খোলা রয়েছে। কখন যে খিল খুলে বিভাস বাইরে গেছে তা সুজয় জানতেও পারে নি।

সুজয় বাইরে এলো।

হঠাৎ শুনলো একটা হাসি।

কে হাসে? তাকিয়ে দেখলো বিভাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে!

—তুই ওখানে কেন রে?

—বড্ড পেটে ব্যথা। তাই একটু রাস্তায় এলাম হাওয়া খেতে।

— চল শুয়ে পড়বি চল।

—না।

—তবে চল্ তোর বাড়িতে দিয়ে আসি।

—বারে, আমি বাড়িতে যাবো না, বলেছি না তোকে একটু আগে।

—তবে কোথায় যাবি?

—আমি চলে যাবো।

বিভাস চলতে লাগলো।

সুজয় ডাকলো —এই বিভাস শোন্ – কে শোনে কার কথা? বিভাস ছুটে চললো। সুজয়ও চললো তার পিছু পিছু।

কিছুটা যাবার পর দূরে আলো দেখা গেল। কয়েকজন লোক যেন আসছে এদিকে।

ওরা কারা।

সুজয় দাঁড়ালো।

বিভাস বললো – সুজয়, তুই আমার কাছে একটা টাকা পেতিস্। একবার ধার নিয়েছিলাম, তোর মনে আছে?

– হ্যাঁ।

—এই নে টাকা।

বিভাস একটা একটাকার কয়েন ছুঁড়ে দিলো সুজয়ের দিকে। তারপর হাসতে হাসতে পাশের গলিতে ঢুকে পড়লো।

সুজয় অনেক ডাকাডাকি করেও তার সাড়া পেলো না।

এদিকে আলো হাতে লোকজন এগিয়ে এলো। সুজয় দেখলো সামনেই বিভাসের বাবা।

সুজয় বললো —কাকাবাবু, আপনারা কি বিভাসকে খুঁজতে বেরিয়েছেন?

—খুঁজতে ? সে কি, বাবা। বলে, বিভাসের বাবা কঁকিয়ে উঠলেন— বিভাস যে আজ সন্ধ্যায় মারা গেছে। এই যে তার মৃতদেহ নিয়ে আমরা চলেছি শ্মশানের দিকে।

—মারা গেছে !!!

—হ্যাঁ, কলেরা হয়েছিল। পেটে কি অসহ্য ব্যথা

—কিন্তু সে যে একটু আগেও আমার সঙ্গে ছিলো। ঐ ‘তো’ গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়লো।

—সে কি?

—হ্যাঁ, আমি নিজে দেখলাম। গায়ে সুন্দর পাঞ্জাবী, পাজামা, জুতো….

—আমরা তো মরার পর তার সব ভালো ভালো জিনিষ তাকে পরিয়ে দিয়েছি।

সুজয় ভাবতে লাগলো। সে কি এ পর্যন্ত তাহলে সবই ভুল দেখলো? বিভাসের বাবা বললেন। যাও বাবা, তুমি বাড়ি যাও। – বলো হরি, হরি বোল।

লোকগুলো বিভাসের মৃতদেহ নিয়ে এগিয়ে এলো। এতক্ষণে সুজয়ের ভয় লাগছিলো।

সে দেখলো একটা ট্যাক্সি আসছে। সে তাতে উঠে পড়ে চললো বাড়ির দিকে।

ওদিকে মৃতদেহ নিয়ে লোকজন সব চলে গেল অন্য দিকে গাড়ি ছুটলো।

সুজয় হঠাৎ দেখতে পেলো, বিভাস যেন ছুটে চলেছে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে। পরনে সেই পোশাক! মুখে তেমনি হাসি।

সুজয় চমকে উঠলো।

বিভাস ডাকলো — সুজয়!

—কিরে?

—আমাকে সঙ্গে নিবি না?

—না, তুমি বিভাস নও। তুমি অন্য কেউ, আমাকে ছলনা করছো। সুজয় ড্রাইভারকে আরো জোরে চালাতে বললো। ড্রাইভার না বুঝে আরো জোরে চালাতে লাগলো।

বিভাস বললো —ও, তাহলে তুইও আমাকে ভালোবাসিস না? ঠিক আছে, তবে তুই বাড়ি যা। আমি চললুম। এদেশ ছেড়ে এক্ষুণি চলে যাবো।

বিভাস অন্য দিকে চলে গেল। তারপর থেকে সুজয় আর কখনো বিভাসের প্রেতাত্মাকে দেখতে পায় নি।