ভূতের কেরামতি – সমুদ্র পাল
ভূতের কেরামতি
একটি শস্য শ্যামলা বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সেই গ্রামের গায়েই ছিল একটা বিশাল ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
যেখান থেকে জঙ্গল শুরু, ঠিক সেখানেই পথের ধারে ছিলো বেশ বড় একটা পাকুড় গাছ। সেই গাছে বাস করতো একটা ভূত। ভূতটা ছিলো সাংঘাতিক লম্বা, আর তার চেহারাটি বিদঘুটে। তবে ভূতটার একটা গুণ ছিলো। দোষ না করলে কাউকে কিছু বলতো না।
ও পথ দিয়ে দিনের বেলায় যাতায়াত করতে কেউ কোনো দিন ভয়ও পায়নি না কেউ কোনো দিন কিছু দেখেও নি।
তবে রাতের বেলায় সাহস ছিলো না কারোর ঐ পথ দিয়ে যাতায়াত করার। গ্রামের সকলেই দেখেছে রাতের বেলায় পাকুড় গাছটায় বিরাট লম্বা মতো কোনো একটা জীব দোল খায় আর মাঝে মধ্যে একটা শব্দ ভেসে আসে – আমি করাল দ্রংষ্টা আমি করাল দ্রংষ্টা!
গ্রামের সকলে মিলে একদিন ঠিক করলো যে কোনো প্রকারে ঐ পাকুড় গাছটা কেটে ফেলতে হবে, গাছটা কেটে ফেলেলে ভূত আর থাকবে না। কিন্তু মুস্কিল হলো গাছ কাটা নিয়ে। কোনো মজুরই গাছ কাটতে চাইলো না। ওদের মনে ভয়— যে গাছ কাটবে, ভূত তারই সর্বনাশ করে ছাড়বে।
অবশেষে গ্রামবাসীরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলো— যে ঐ পাকুড় গাছ কেটে ফেলবে, তাকে এক হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। ঐ গ্রামে এক বুড়ি থাকতো। বুড়ির নাম ছিলো সন্ধ্যা। বৃড়র একটা মাত্র ছেলে। ছেলেটার নাম ভক্তদাস।
ভক্তদাস সৌখীন মেজাজের তরুণ। বুড়ি মাকে সে যত্ন করে না, খেতে পরতেও দেয় না। মনের দুঃখে বুড়ি মনে মনে ঠিক করলো এতো কষ্ট করে বেঁচে থাকার চেয়ে ভূতের হাতে মরা ঢের গুণে ভালো।
গ্রামবাসীদের ঢোল পেটানো শুনে বুড়ি সন্ধ্যা ছেলের কাছে গিয়ে বললো বাবা ভক্তদাস, আমি আর সংসারের যাতনা সহ্য করতে পারছি না। আমাকে একটা কুড়ুল এনে দে। আমি আজ রাতে গিয়ে ভূত যে পাকুড় গাছাটায় থাকে, সেই গাছটা কেটে ফেলবো। এতে তোরও লাভ হবে এক হাজার টাকা। আর ভূতের হাতে প্রাণটা দিয়ে আমিও সংসার যাতনা থেকেও মুক্তি পাবো।
মায়ের কথা শুনে ছেলে তো মহাখুশি। বিনা পরিশ্রমে এক হাজার টাকা লাভ। আবার ঘরের বালাই বুড়ির হাত থেকেও মুক্তি। এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়। অতএব ভক্তদাস সঙ্গে সঙ্গে একটা ধারালো কুড়ুল এনে মায়ের হাতে দিয়ে দিলো।
সেদিন ঠিক দুপুর রাতের বেলা সন্ধ্যা বুড়ি কুড়ুল কাঁধে নিয়ে চললো জঙ্গলের ধারে সেই পাকুড় গাছটি কাটতে।
চারিদিকে আলকাতরার মতো অন্ধকার। বুড়ির পরনে সাদা থান কাপড়। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো পেত্নী ধীর পায়ে পাকুড় গাছটার দিকে এগিয়ে চলেছে।
বুড়ি পাকুড় গাছটির কাছে যেমনি পৌঁছেছে অমনি তার কানে গেল একটা খোনা খোনা শব্দ — আমি করাল দ্রংষ্টা, আমি করাল দ্রংষ্টা
সেই শব্দ শুনে বুড়ি থমকে দাঁড়ালো কয়েক মুহূর্তের জন্যে। পরক্ষণেই ও চিৎকার করে বলে উঠলো আমার নাম সন্ধ্যা, আমার নাম সন্ধ্যা বলেই হো হো করে হেসে উঠলো জোরে। আর সেই সঙ্গে ঐ পাকুড় গাছের গোড়ায় বসিয়ে দিলো কুডুলের এক কোপ।
বুড়ির বেশভূষা আর গলার স্বর শুনে ভূত ভাবলো তারই কোনো জাতভাই, তাকে তাড়িয়ে নিজের আড্ডা মজবুত করবার জন্যে পাকুড় গাছটিকে কাটতে আরম্ভ করেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি নেমে এলো গাছের ওপর থেকে। তারপর সন্ধ্যা বুড়িকে উদ্দেশ্য করে বললো – দেখো, আমরা হ’লাম জাতভাই। কোনো ঝগড়া-ঝাঁটি করা আমি মোটেই পছন্দ করি না। কেননা যখন বেঁচেছিলাম অযথা এক দাঙ্গায় আমি মরে গিয়ে ভূতের যন্ত্রণা ভোগ করছি। তাছাড়া এই গাছটি কেটে তোমার কি লাভ হবে? তার চেয়ে আমার এই রত্নহারটি তুমি নাও, আর এখান থেকে কেটে পড়। আমি যখন তোমার কোনো অপকার করিনি, তখন তুমিই বা আমার অপকার করবে কেন?
সন্ধ্যা বুড়ি মনে মনে ভাবলো, ভূত আমাকে পেত্নী ভেবেছে নিশ্চয়ই। তাই সে এরকম কথা বলছে।
কিন্তু অন্ধকারেই ভূতের হাতের রত্নহারের উজ্জ্বলতা দেখে বুড়ি বেশ বুঝতে পারলো যে, ঐ রত্নহারটি অনেক দামী। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পিশাচ ভূতের হাত থেকে রত্নহারটি নিয়ে বললো ভাই, তুমি তোমার জায়গায় আরামে থাকো। আমি চললাম আমার জায়গায়।
এই বলে রত্নখচিত বহুমূল্য হার নিয়ে সন্ধ্যা বুড়ি বাড়িতে ফিরে এলো। এসে ছেলে ভক্তদাসের কাছে সব ঘটনা বিস্তারিত জানিয়ে তার হাতে সেই রত্নহার দিয়ে বললে – এবার থেকে আমার দেখাশোনা একটু ভালো করে করিস, বুঝলি তো?
মায়ের মুখে ভূতের কাহিনী শুনে ভক্তদাসের লোভ বেড়ে গেল। মনে মনে সে ভাবলো, আমিও যদি মায়ের মতো সাদা কাপড়ে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে কুড়ুল হাতে ঐ পাকুড় গাছটি কাটতে শুরু করে দিই, তাহলে ভূতটি নিশ্চয়ই আমাকেও তার জাতভাই মনে করে ভয়ে ভয়ে কোনো রত্নহার বা মোহর বা অন্য কোনো মহামূল্যবান বস্তু কিছু দিয়ে দেবে।
এই ভেবে সেই রাতেই সে আপাদমস্তক সাদা কাপড় ঢাকা দিয়ে ভূত সেজে কুড়ুল হাতে হাজির হলো সেই পাকুড় গাছের তলায়। তারপরেই গাছের গোড়ায় বসিয়ে দিলো কুডুলের এক কোপ।
পরক্ষণেই শোনা গেল পিশাচ ভূতের কন্ঠস্বর — আমি করাল দ্রংষ্টা, আমি করাল দ্রংষ্টা। কে এই গাছের গোড়ায় কুড়ুলের ঘা বসায়?
ভূতের কথা শুনে ভক্তদাসও ভূতের মতো খ্যান খ্যানে গলায় প্রথমে অট্টহাস্য করে উঠলো। তারপর হুঙ্কার দিয়ে বললো – আমি ভক্তদাস, আমি ভক্তদাস। আজ আমি তোকে এখান থেকে তাড়াবো। তারপর এই পাকুড় গাছ হবে আমার আড্ডা।
ভক্তদাসের কথা শেষ হতেই বিকট অট্টহাসিতে সমস্ত জঙ্গল কেঁপে উঠলো। তারপর সে কিছু বুঝে ওঠবার আগেই এক প্রচণ্ড চড় এসে পড়লো। ভক্তদাসের ডান গালে।
এক চড়েই ভক্তদাস চোখের সামনে হাজার হাজার সর্ষে ফুল দেখতে লাগলো। আর সেই সঙ্গে ভূতের ক্রুদ্ধ গর্জন কে তুই ভক্তদাস? আমি যখন বেঁচেছিলাম, তোর জন্যেই আমাকে বিনা দোষে, বিনা অপরাধে মৃত্যুবরণ করে এই ভূত হয়ে আজ এখানে ওখানে করে বেড়াতে হচ্ছে। তুই দেখছি মরে গিয়েও আমার পিছু ছাড়িনি? ভূত হয়ে আবার আমার পেছনে লেগেছিস? আজ আমি তোকে শেষ করবো। এই কথা বলেই ভক্তদাসের অন্য গালে আর একটা প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দিলো। ভক্তদাস অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
পরদিন গ্রামবাসীরা ভোরবেলাতেই ছুটে এসেছিলো সেই পাকুড় গাছের তলায়। কারণ তারা রাতে ভূতের হুঙ্কার শুনেছিলো।
পাকুড় গাছের নিচে এসে ওরা ভক্তদাসকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে আর পাশেই কুড়ুলখানা দেখে বুঝে নিলো, একহাজার টাকার লোভে ভক্তদাস এসেছিলো পাকুড় গাছ কাটতে; তার ফল হলো এই।
অনেক চেষ্টা করার পর তিনদিনের মাথায় ভক্তদাসের জ্ঞান ফিরেছিলো। কিন্তু সে আর নিজেকে সুস্থ বা সবল করতে পারেনি। তবে যতোদিন বুড়ি মা বেঁচেছিলো, মায়ের সেবা যত্ন করেছিলো মন দিয়ে।
