মায়াজাতক – ১৫
(১৫)
‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বোস! আপনারা আসুন!’ একটি অল্পবয়সি ছেলে এসে সুনেত্রা আর অভীককে ডাকে। ওরা আবার কয়েকদিন পর এসেছে সেই ক্লিনিকে। আজ ডাক্তার বলে দেবেন সুনেত্রার আইভিএফ সফল হয়েছে কি না। অতএব আজ আবার একটা পরীক্ষার দিন। এই পরীক্ষা হয়তো সুনেত্রার জীবনে শেষ পরীক্ষা হবে। আর সহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই। মনে মনে ভাবল যা হবে আজই হবে! এরপর আর এই যুদ্ধ ও লড়তে পারবে না। হয়তো জয়ী হবে না হয় নিজেকে গুটিয়ে ফেলবে। আর হয়তো গুটিয়ে ফেলতে ফেলতে একদিন ও শেষ হয়ে যাবে। অভীকের উঠে দাঁড়ানোর আগেই সুনেত্রা উঠে দাঁড়ায়। অভীক ওর মধ্যে এই বদলটাকে ভালোভাবে নেয় না। ও বুঝতে পারে সুনেত্রার মনের মধ্যে ঝড় উঠেছে। ওরা দু’জন ডাক্তারের রুমের দিকে দিকে এগিয়ে যায়। রুম থেকে যে দম্পতি বেরিয়ে এল তাদের মুখে হাসি। সে মনে হয় গর্ভবতী। তার পেটে হালকা একটা বেবি বাম্প দেখা যাচ্ছে। মেয়েটি স্বাস্থ্যের জন্য তার পেটের এই হালকা স্ফীত অংশটা চট করে কেউ দেখলে বুঝতে পারবে না। কিন্তু তার মুখের হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে সে গর্ভবতী। ছেলেটার হাতের ইশারায় অভীক আর সুনেত্রা বুঝতে পারে তাদেরকে চেম্বারে ঢুকতে বলছে। ছেলেটি এই ক্লিনিক এরই। খুব সম্ভবত ও পেশেন্টদের ডিল করে।
‘আসুন বসুন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বোস ‘
সুনেত্রা আর অভীক বসতেই ডক্টর ফাইলটা বের করেন। বের করে তার মধ্যে একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলেন, ‘ওষুধগুলো সব কন্টিনিউ হয়েছে তো?’ সুনেত্রা মাথা নাড়ে।
‘বেশ তাহলে চলুন। টেস্টগুলো করে নেওয়া যাক। এত টেনশন করবেন না! আমি তো আছি।’ সুনেত্রাকে দেখে ডক্টর দেবরায় কথাটা বলেন। সুনেত্রা ডাক্তারের সাথে পর্দা ঘেরা আরেকটি ঘরে প্রবেশ করে। ওখানে একটা অ্যাটাচড বাথরুমও আছে। সুনেত্রাকে একটা কিট দেওয়া হয় টেস্ট করার জন্য আর তারপর তাকে ওই বেডে শুয়ে আরও কিছু পরীক্ষা করাতে হবে। সুনেত্রা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতে ডাঃ দেবরায়ের একজন হেলপিং হ্যান্ড ওর থেকে স্যাম্পল কালেক্ট করে নেয়। তারপর সে টেস্ট কিটে সেটা দেয়। সুনেত্রা ডাক্তারের নির্দেশে বেড়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু ওর মনের মধ্যে প্রবল একটা টেনশন কাজ করছে। যে মেয়েটি হাতে কিটটা নিয়ে ছিল সে সুনেত্রার দিকে সেটা ফেরায়। ও দেখে একটু একটু করে তাতে একটা লাল দাগ ফুটে উঠেছে। এরপরে সেই হালকা রংটা ছুটে চলেছে শেষের দিকে। মনের মধ্যে ঝড় বইতে থাকে ওরম। আরেকটা দাগ কি ফুটে উঠবে? নাকি উঠবে না? এই ভাবনায় ওর মাথার ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন। আর তখনই খুব হালকা একটা দাগ ফুটে উঠল কিটে! সত্যিই দুটো দাগ? নাকি একটা? সুনেত্রা ভুল দেখছে কি? ভ্রম হচ্ছে ওর? না না! দুটোই তো। সুনেত্রার মনে হয় ও হয়তো পাগল হয়ে যাবে আনন্দে। এই দুটো দাগ দেখার জন্য ও না জানি কত কত দিন মাস বছর অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু ডক্টর কী বলবেন? সত্যিই দুটো দাগ তো?
‘কনগ্র্যাচুলেশনস মিসেস বোস!’
‘কনগ্রাচুলেশনস? তার মানে সফল হয়েছে ট্রিটমেন্ট? আমি সফল হয়েছি?’ মনের মধ্যে কথাটা আসতেই কেঁদে ফেলে সুনেত্রা। এ কান্নায় কোনও দুঃখ নেই। এটা আনন্দের কান্না। এতে কোনও কষ্ট নেই। আর তার জন্যই চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে জলটা।
চেয়ারে বসে বসে দুশ্চিন্তা করছে অভীক। কী জানি ভিতরে কী হচ্ছে? আজ যদি উল্টোপাল্টা কিছু হয় নিতে পারবে না সুনেত্রা! কী করে তখন সামলাবে ও! এইসব আকাশ-পাতাল ভাবনাচিন্তা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বড্ড অস্থির লাগছে ওর। না না! ও কি একবার ভিতরে গিয়ে দেখবে? কিন্তু ভিতরে যাওয়া তো বারণ। যদি সুনেত্রার কিছু হয়ে যায়? এভাবে বসে থাকা যাবে না! উঠে দাঁড়াল অভীক। পর্দা ঘেরা ঘরটার দিকে এগোতে যাবে ঠিক তখনই দেখে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এসেছেন ডক্টর। তাঁকে দেখে প্রশ্ন করতে চেয়েও অভীক কোনও প্রশ্ন করতে পারল না। ওর গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বেরোল না। তার পিছন পিছন বেরিয়ে এল সুনেত্রা। ওর মুখটা থমথমে। হাত-পা সরল না। প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছে। মনে হল ওর পা দুটো কেউ মাটির সাথে শক্ত করে আটকে দিয়েছে। সুনেত্রা সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর অভীকের চোখের সামনে ওর হাতের মধ্যে বন্ধ করে রাখা কী যেন একটা মেলে ধরল। টেস্ট কিট! অভীক সেটার দিকে তাকাল। তাকাতেই ওর মুখের ভাব পালটে গেল। সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে বলে ‘পজিটিভ?’
মাথা নাড়ে সুনেত্রা। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আর কিছু বলতে পারে না। অভীক ওর হাতটা ধরে টেনে এনে চেয়ারে বসায়। তারপর সীমন্তিনী দেবরায়ের দিকে তাকিয়ে দুহাত জোড় করে বলে ‘আপনি… আপনি যে আমাদের কাছে কী তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। সত্যিই ভগবান!’
ডক্টর দেবরায় অল্প হাসেন, ‘এই আনন্দ উচ্ছল মুখগুলো দেখব বলেই এই কাজ করে যাচ্ছি। আপনাদের মুখে হাসি ফোটাতে আমার এই প্রয়াস যেন আজীবন চালিয়ে যেতে পারি! এটুকু প্রার্থনা করবেন।’
সুনেত্রা বলে, ‘আপনি যে কী পুণ্যের কাজ করছেন, কী অসাধ্য সাধন করছেন তা আমার মত ভুক্তভোগী মানুষরা জানছে। সবাই জানবে একদিন। আপনার আরও নাম হোক! আরো অনেক বাবা-মার কোল ভরিয়ে দিন। প্রার্থনা করি আমি।’
ডক্টর দেবরায় নিজের চেয়ারে বসে বলেন, ‘ধন্যবাদ! এইবার কিন্তু আরও বড় পরীক্ষা। খুব যত্নে থাকতে হবে আপনাকে। ওরকম টেনশন করা যাবে না। খুব কেয়ার নিতে হবে নিজের। খুব সাবধানে থাকতে হবে। কোনওরকম কাজকর্ম করা চলবে না। কোথাও ট্রাভেল করতে পারবেন না। জাস্ট প্রয়োজনে প্রত্যেক কুড়ি দিন অন্তর আমার কাছে চেকআপে আসা ছাড়া আর কোনও ট্রাভেল একদম নয়। আমার সাথে ফোনে সবসময় যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের সহায়তায় আমি সবসময় ফ্রি আছি! কোনওরকম কোনও যদি প্রবলেম মনে হয় অবশ্যই আমাকে ফোন করে জানাবেন। আর কিছু মেডিসিন লিখে দিচ্ছি। এই কাগজটা আমাদের মেডিক্যাল স্টোরে দেবেন। ওখান থেকে কুড়ি দিনের ওষুধ দেবে। এই প্রেসক্রিপশন ওরা রেখে দেবে। সেটা আবার আমার কাছে এই ফাইলে চলে আসবে।’
‘আচ্ছা থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর।’ কথাটা বলে ডাক্তারের রুম থেকে বেরিয়ে এল অভীক আর সুনেত্রা। বাইরে এসে ওরা এগিয়ে গেল মেডিক্যাল স্টোরের দিকে। মেডিক্যাল স্টোরটা ওরা আগের দিনে চিনে নিয়েছিল। আগের দিন কয়েকটা ওষুধ নিতে হয়েছিল। সেদিনের মতো আজকেও ওরা মেডিক্যাল স্টোরে গিয়ে কাগজটা জমা দেয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ছোট ছোট কয়েকটি কন্টেনার ওদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগের দিন প্রশ্নটা করবে ভেবেও অভীক করে না। আজ জিজ্ঞাসা করল, ‘মেডিসিন গুলোর নাম? এখানে নাম্বার ওয়ান নাম্বার টু করে লেখা গায়ে লেভেলিংয়ে। আর কোনটা কখন খেতে হবে সেটা লেখা আছে। কিন্তু এগুলোর নাম?’
কাউন্টারে থাকা ছেলেটি একবার ভালো করে মুখের দিকে তাকিয়ে নেয় তারপরে বলে, ‘ডক্টর নিশ্চয়ই আপনাদেরকে বলে দিয়েছেন যে আমাদের এখান থেকেই মেডিসিন নিতে হয়।
‘হ্যাঁ সেটা তো বলেছেন।’
‘এটা আসলে এখানের পলিসি। যাতে কোনও পেশেন্ট বাইরে থেকে মেডিসিন পারচেজ না করে। সেই জন্যই এখানে আমাদের নিজের প্যাকেজিং করা হয়। আর যদি কোনও জিজ্ঞাস্য থাকে তাহলে সেটা আপনি ডক্টরকে করে নিতে পারেন।’
সুনেত্রা অভীকের উপর রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বলে, ‘না না আমাদের কোনও জিজ্ঞাস্য নেই। তোমার সব বিষয়ে এত প্রশ্ন কেন? জানো তো উনি কী বলেছেন!’ অভীক একটু চুপ করে গিয়ে বলে, ‘না না ডক্টরকে জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই। আমি জাস্ট আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম।’
‘ওকে!’
সুনেত্রা অভীককে নিয়ে টানতে টানতে এগিয়ে আসে মেন দরজার দিকে। তারপর বলে, ‘প্লিজ তুমি এখানে আর কোনওরকম প্রশ্ন কোরো না। জানো তো কত সাধ্যসাধনার পরেও আমাদের মনস্কামনা পূর্ণ হচ্ছিল না। এখানে এই ডাক্তারের প্রচেষ্টায় সেটা হল। এখন প্লিজ ওনাকে ওনার মতন ট্রিটমেন্ট করতে দাও। আমাদের বাচ্চা আমরা হাতে পেয়ে যাই। তারপর তোমার যা জিজ্ঞেস করার কোরো তুমি ডক্টরকে। আশা করি উনি তোমাকে বুঝিয়ে দেবেন। আমাদের তো বাচ্চাটা নিয়ে কথা! তার বাইরে কোনও বিষয়ে ইনফরমেশনের দরকার নেই। উনি যা ওষুধ দিয়েছেন সেটাকে তো অবিশ্বাস করাও যায় না। সেই ওষুধ খেয়েই তো আমি প্রেগন্যান্ট হলাম। তাহলে এখন ওনাকে অবিশ্বাস করে কোনও লাভ আছে কি?’
অভীক বলে, ‘না না আমি অবিশ্বাস করছি না। তুমি খামোকাই আমাকে ভুল বুঝছ। দেখো তোমাকে তো ওষুধগুলো খাওয়াচ্ছি। আমি সেই জন্যই জানতে চাইলাম। ‘
‘দরকার নেই। ছাড়ো না এসব। এখন আমাদের আনন্দের সময়। এই সময় আর কোনও ভাবনাচিন্তা টেনশন আমরা নিতে চাই না। চলো বাড়ি ফিরতে হবে। তারপর আমার বাবা-মা, তোমার বাবা-মা সবাইকে খুশির খবরটা দিতে হবে তো।’
‘হ্যাঁ চলো।’ অভীকের মুখেও হাসি ফোটে। কত বছরের এই অপেক্ষা দিন আজ এসেছে। দুই বাড়ির সবাই যে কী পরিমাণ খুশি হবে তা ওরা আন্দাজ করতে পারছে।
***
ঘুম থেকে উঠতে যেমন একটা অস্বস্তি হয় খুশির। উঠে বাথরুমে ঢোকে। তারপর হড়হড় করে বমি করে। চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে আসে। শরীরটা ক’দিন ধরে ভালো লাগছে না। এখানে এসেছে পনেরো দিনের ওপর হয়ে গেছে। সেদিন যখন খাবার খেয়ে রেস্ট নিচ্ছিল। তারপরে সেই যে ঘুমিয়ে গেছে পরের দিন দুপুর দুটোর সময়ে ঘুম ভেঙেছে ওর। কী অদ্ভুতভাবে ঘুমিয়েছিল! না খাওয়া-দাওয়া, না চান করা! ঘুমিয়ে গেছে পড়ে পড়ে। কিন্তু দুটোর সময় ওঠার পরেই ওর মনে হচ্ছিল শরীরে কেন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হয়েছিল ইউরিনের জায়গায় কেমন যেন একটু হালকা ব্যথা ব্যথা করছে। কেন কী জন্য ও কিছু বুঝতে পারেনি। সবই ঠিকঠাক ছিল। ওই রিচা ম্যাডাম সেদিন ওকে বলেছিল যে ও খুব ক্লান্ত ছিল বলে এমন ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তাই বলে এত ক্লান্ত যে পরের দিন দুপুর দুটোয় উঠবে। ওঠার পরে সেদিন ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে। বিকালে মৃণাল এসেছিল ওর সাথে দেখা করতে। এসে ওকে স্যালারির টাকা বুঝিয়ে ওর দিয়ে দেওয়া টাকাটা নিয়ে চলে গিয়েছিল। তার পরের দিন আবার এসেছিল। ফোনে ওর মার সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছিল। বেশ ঠিকঠাকই যাচ্ছিল তিন-চারদিন। তারপর ওকে এনজিওতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও দেখে অনেক মেয়ে কাজ করছে। এখানে বিভিন্ন রকমের হাতের কাজ করা হয়। কাজের জায়গা দেখে খুশির বেশ ভালো লাগে। ওকে রিচা ম্যাডাম বলে যে আরও কয়েকটা দিন পর ও জয়েন করবে অফিসে। কারণ এখন প্রোডাক্ট ডেলিভারি হতে চলেছে। এখন কাজ কম। এটা হয়ে যাওয়ার পরে আবার নতুন কাজ শুরু হবে তখন ওকে লেগে পড়তে হবে কাজে। এরপরেও দু-তিনদিন অন্তর অন্তর ওর মায়ের সাথে কথা হয় কিন্তু ইদানীং ওর শরীরটা ঠিক ভালো যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন সকাল হলেই কেমন একটা অসুস্থ অসুস্থ লাগে। বমি পায়। কিছু খেতে ভালো লাগে না। দুর্বল লাগে। রিচা ম্যাডাম খুব ভালো। ও অসুস্থ আছে বলে এখনও ওকে কোম্পানিতে জয়েন করতে দেয়নি। কিন্তু দু’বেলা ওর যথেষ্ট যত্ন নিচ্ছেন। টাইম টু টাইম খাওয়া-দাওয়া, ফল দেওয়া। এমনকি মাঝে মাঝে কিছু ওষুধ এনে খাইয়ে দেন। বলেন যে ভালো হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। সত্যি দিনে এই ওষুধগুলো খাওয়ার পর খুশির মনে হয় বমি বমি ভাবটা একটু কম লাগে। শরীরটা একটু ভালো লাগে। কিন্তু আর একটা টেনশন খুশির মনের মধ্যে হচ্ছে। তিনদিন আগে ওর ডেট ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি এখনও। মাঝেমধ্যে এমন চার-পাঁচদিন দেরি হয়। দেখা যাক! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রিচা ম্যাডাম দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে আসে। এসেই খুশিকে বলেন, ‘কী হয়েছে শরীর খারাপ লাগছে আবার?’
খুশি বলে, ‘না ওই একটু বমি পাচ্ছিল।’
‘এই খাবারটা আর ওষুধটা খেয়ে নাও।’
খুশি খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বলে, ‘ম্যাম আমি এবার কাজে জয়েন করতে চাই। আমি কতদিন এভাবে বসে থাকব! আর তাছাড়া প্রথম মাসের মাইনে নিয়েছি, দ্বিতীয় মাসে তো আমাকে কাজের মধ্যে ঢুকতেই হবে। তা না হলে তখনই বা কেন মাইনে পাব?’
‘তোমাকে কি এ বিষয়ে কিছু বলা হয়েছে? তুমি কাজ করতে এসেছ তুমি কাজ করতে চাইছ এটাই তো অনেক বড় কথা! প্রথম মাসে আমরা সব এমপ্লয়ি কে এডভান্স সেলারি দিয়েছি। সেই মাসে কাজ একটু হালকা থাকে। এখন তোমার হঠাৎ করে শরীর খারাপ হয়ে যাবে সেটা তো কারও জানা ছিল না। তার মানে এই নয় যে তোমাকে কাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে। সামনের মাসের মধ্যে তুমি ঠিক জয়েন করে যাবে। একটা মাস যাক। আর মাইনে নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না। তুমি ঠিক টাইমে পেয়ে যাবে। আর তোমার মায়ের কাছেও মৃণাল ঠিক টাইমে দিয়ে আসবে টাকা। আচ্ছা তুমি এবার খেয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নাও। আজকে ডক্টর আসবেন তোমাকে একটু চেকআপে করতে। দেখি ডাক্তার কী বলেন তুমি কবে থেকে জয়েন করতে পারো!’
‘ঠিক আছে।’ খুশি মাথা নাড়ে।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই রিচা ম্যাডামের ফোনে একটা ফোন আসে। সেটা রিসিভ করে উনি বলেন, ‘হ্যাঁ এসে গেছেন? আচ্ছা দাঁড়ান আমি আসছি।’ কথাটা বলেই ফোনটা রেখে উনি খুশির দিকে তাকিয়ে বলেন ‘ডক্টর এসে গেছেন। তুমি একটু ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি ওনাকে নিয়ে আসছি।’
কিছুক্ষণের মধ্যে রিচা ম্যাডাম একজন ডাক্তারকে নিয়ে উপরে আসেন। এই ভদ্রলোকের বয়স ৪০ থেকে ৪২ খুব সম্ভবত। খুশিকে রিচা ম্যাডাম বিছানায় শুয়ে পড়তে বলে। খুশি শুয়ে পড়ে। ডক্টর স্টেথো দিয়ে ওকে চেকআপ করতে থাকে। তারপর হাত দিয়ে ভালো করে পেটের এপাশ ওপাশ দেখে নিয়ে বলেন, ‘না না সব ঠিকই আছে। অসুবিধা কিছু নেই।’
খুশি উঠে বসে। তারপর বলে, ‘কিন্তু ডাক্তারবাবু আমার না প্রত্যেকদিন সকালবেলা হলে কেমন শরীরটা খারাপ লাগে। গা গোলায়। বমি বমি পায়। একদম ভালো লাগে না। শরীরটা খুব দুর্বল মনে হয়।’
ডক্টর ওর ওষুধের স্ট্রিপগুলো দেখতে দেখতে উত্তর দেন, ‘ওটা একটু হবে, এখন এরকম হয়।’
‘এখন এরকম হয় মানে?’ খুশি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
ডক্টর রিচা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে নেন। রিচা বলে, ‘মানে এই বয়সে একটু এরকম হয়। একটু বেশি খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম হওয়াতেই আমার মনে হয় এটা হয়েছে।’ তারপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আবার বলে, ‘ওষুধপত্র সব ঠিক আছে তো?’
ডাক্তার ওঁর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ এগুলোই কন্টিনিউ হবে। তারপর আমি মেডিসিন যখন চেঞ্জ করে দেব নেক্সট চেকআপে দেখব সেটা।’
‘আবার চেকআপ? আমার কী হয়েছে ডাক্তার বাবু? এতবার চেকআপ করতে হবে? আমার কি খুব খারাপ কিছু হয়েছে?’
‘না না সেরকম কিছুই না। উনি তো বললেন!’ ডাক্তার অল্প কথায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন
‘তাহলে আপনি আবার চেকআপের কথা বলছেন?’
‘ওটা আমরা তো বলিই পেশেন্ট যাতে ঠিক হয়েছে কি না বুঝি।’
‘আচ্ছা আর একটা বিষয় আমি জানি না আপনাকে বলা দরকার কি না। তবু জানাই আমার ডেট পেরিয়ে গেছে এখনও হয়নি। বুঝতে পারছি না কোনও অসুবিধা হয়েছে কি না। এর আগেও হয়েছে ৩-৪ দিন দেরি।’
‘ওসব কিছু না। তুমি এখন রেস্ট নাও। ওটা তো মাঝে মধ্যে হয়। ওরকম কখনও একমাসও গ্যাপ হয়ে যায়। ওটা কোনও ব্যাপার নয়।’ ডাক্তার কিছু বলার আগেই রিচা ম্যাডাম উত্তর দেয়।
‘একমাস? তার মানে তো কোনও সমস্যা থাকলে হয়? তাহলে কি আমার কোনও সমস্যা হয়ে গেল?’
‘উফ! তুমি এত চিন্তা কোরো না। তুমি বড্ড বেশি ভাবো। এখন রেস্ট নাও। আমি ওনাকে নিচে ছাড়তে যাচ্ছি।’ কথাটা বলে রিচা ম্যাডাম ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আসুন আপনি চলুন আমার সাথে।’ এই কথা বলে রিচা ম্যাডাম আর ডাক্তার ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। খুশির মনটা কেমন খচখচ করতে থাকে। ওর মনে হয় এরা যেন ওর থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছে। আচ্ছা ওর কি খারাপ কিছু হল? সেটা কি ওকে বলতে চাইছে না? যদি খারাপ কিছু হয় তাহলে ও তো ওর মাকে আর কখনও দেখতে পাবে না। তাহলে দরকার নেই এসবের কিছু। ও গ্রামেই ফিরে যাবে। ওর মায়ের কাছে থাকবে যদি চরম খারাপ কোনও রোগ হয় ওর! তাহলে সেই দিনগুলো মায়ের সাথেই কাটাবে। অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে খুশিকে। ওর মনে হয় এই কথাগুলো জানানো দরকার
এদেরকে। থাকবে না এখানে ও! ওর মায়ের কাছে যাবে! যা হবে হবে। কিন্তু ও মায়ের কাছে থাকবে কথাটা ভাবতেই খুশির মনে হয় এদেরকে এবার বলা দরকার মনের কথাটা। ও বিছানা থেকে ধীরেসুস্থে উঠে ঘরের বাইরে বেরোতে থাকে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামে আর তখনই শুনতে পায় ডাক্তার আর রিচা ম্যাডামের কথোপকথন।
‘আপনি আর কতদিন লোকাবেন ওর থেকে?’ ডাক্তার প্রশ্নটা করে রিচা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে।
‘যতদিন পারা যায়!’ রিচা ম্যাডাম উত্তর দেয়।
‘কিন্তু এভাবে সম্ভব নয়। আর এরকম করতে থাকলে তো কোঅপারেট করবে না আমাদের সাথে। তখন কিন্তু খুব মুশকিল হয়ে যাবে। তাছাড়া আর কয়েকদিনের মধ্যে নিজেই বুঝতে পেরে যাবে। আগের কেসগুলোতে কিন্তু এতটা প্রবলেম হয়নি।’
‘হ্যাঁ আগের কেসগুলোতে এতটা প্রবলেম হয়নি। এবার ফালতু কাজ করেছে মৃণাল। মেয়েটা যথেষ্ট শিক্ষিত। বেশি পাকা। অনেক কিছু জানে বোঝে। অন্যান্যবার তো মোটামুটি গ্রামের একেবারে অশিক্ষিত মেয়েগুলোকে নিয়ে আসে। এবার কি করতে যে এই শিক্ষিত মেয়েটাকে নিয়ে এলো?’
‘যাইহোক আপনি কিন্তু সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করুন। না হলে প্রবলেমে পড়বেন আর বুঝতেই তো পারছেন ক্ষতি কিন্তু দু’জনারই! যার জন্য এত কিছু করা ক্ষতিটা কিন্তু তারও।’
‘বুঝতে পারছি আপনি কথাটা….’
এসব শুনে খুশির মাথাটা কেমন গুলিয়ে যায়। এরা কী বলছে এসব? কথা ওর থেকে কী লুকাচ্ছে এরা? এর আগে মেয়েরা এখানে এসেছে মানে? শিক্ষিত-অশিক্ষিত! কী বলছে এরা?
খুশি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কী লুকাচ্ছেন আপনারা আমার থেকে? বলুন! কী জানতে পেরে যাব আমি?’
‘সর্বনাশ করেছে।’ রিচা ম্যাডাম চিৎকার করে ওঠে।
‘এখানে এসেছ কেন? চলো চলো উপরে চলো।’
‘না আমি যাব না। আগে বলুন আমার থেকে কী লুকাচ্ছেন?’উত্তেজিত হয়ে ওঠে খুশি।
‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু একটা করুন!’
ডাক্তার তার কথা শুনে নিজের ব্যাগ হাতড়ে একটা ইঞ্জেকশন বের করেন। তারপর তাতে ওষুধ ভরে রেডি হয়ে এগিয়ে আসেন খুশির দিকে। রিচা ম্যাডাম চেপে ধরে রাখে খুশিকে। তারপর সিঁড়িতে বসিয়ে দেয়। কিছুতেই নড়তে পারছে না খুশি। মনে হচ্ছে ও যেন অনেক বেশি দুর্বল হয়ে গেছে এই ক’দিনেই। ডাক্তার ছুটে এসে ইঞ্জেকশনটা পুশ করে দেয় খুশির হাতে।
‘কী দিলেন এটা আমাকে? কেন দিলেন?’ চিৎকার করে ওঠে খুশি। কিছুক্ষণ ছটফট করে চেষ্টা করে উঠে দাঁড়াবার। কিন্তু বেশিক্ষণ পারে না। আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে মনে হয় যেন ও ঘুমিয়ে পড়ছে।
(১৬)
দরজায় কলিং বেলের শব্দ হতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যান শর্মিলা দেবী। এতক্ষণ খুব দুশ্চিন্তায় কাটছিল তাঁর। দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েও দরজাটা খোলার সাহস হচ্ছে না। আবার কলিং বেল বাজতে চমকে ওঠেন। দরজার ছিটকানি খুলে দরজাটা হাট করতেই দেখা যায় অভীক আর সুনেত্রা দাঁড়িয়ে আছে।
কাঁপা কাঁপা গলায় শর্মিলা দেবী জিজ্ঞেস করেন, ‘এবারেও কি কিছু হয়নি?’
সুনেত্রা কিছু বলতেই যাবে অভীক বলে, ‘আমরা ভিতরে আসি আগে মা! তারপর কথা বলছি।’ শর্মিলা দেবীকে সরিয়ে অভীক আর সুনেত্রা ভেতরে ঢুকে এসে দরজাটা বন্ধ করে।
‘আমি জানতাম কিছু হবে না। আমাদের কপালে সেই সুখ নেই! কথাটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শর্মিলা দেবী। সুনেত্রা তার হাতটা চেপে ধরে বলে, ‘কেঁদো না। খুশির খবর আছে মামনি।’
এই কথাটা শুনে সুনেত্রার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকান শর্মিলা দেবী। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে, ‘কী বললে? খুশির খবর?’
অভীক মুচকি হেসে বলে, ‘হ্যাঁ সেটাই তো বলতে চাইছিলাম। খুশির খবর আছে। এখনই সুনেত্রার বাড়ি থেকেও ওর বাবা-মা আসবে। ওনাদেরও খবর দেওয়া হয়েছে।’
শর্মিলা দেবী সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরেন। বহুদিন পর এমন আদর করলেন উনি নিজের বউমাকে। তারপর জোরে হাঁক পাড়তে থাকেন ‘কি গো শুনছ? তোমার ছেলে বউমা কী বলছে শুনে যাও।’
ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন অনিলবাবু, ‘কী হয়েছে?’ প্রশ্নটা করতেই সবার মুখে হাসি দেখে বলেন, ‘সত্যি? সত্যিই হয়েছে?’
‘হ্যাঁ বাবা।’ অভীক উত্তর দেয়। সুনেত্রা হাসি মুখে মাথা নিচু করে শোবার ঘরের দিকে চলে যায়। তারপর ঘরের আয়নাটা সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আজকে নিজেকে কেমন যেন সুন্দর দেখতে লাগছে ওর। আসলে কোনও সাজ কোনও গয়নাই মুখের হাসি আর মনের আনন্দর সাথে তাল মেলাতে পারে না। আজ সবাই কত খুশি! এই আনন্দের দিন দেখবে বলে কতদিন অপেক্ষা করেছে ওরা সবাই। সুনেত্রা ওর মা-বাবাকে যখন ফোনটা করেছিল ফোনের ওপাশে সবাই আনন্দে কাঁদছিল। সুনেত্রা তাদের আনন্দ ফোনের এপার থেকে অনুভব করতে পারছিল।
***
নার্সিংহোমের ডিউটি শেষে বাড়ির দিকে রওনা দেয় লিসা। আজকে ওর ডিউটি ছিল রাত বারোটা অব্দি। একটা পেশেন্টের জন্য আরও একঘণ্টা সময় বেশি লেগে গেল। এই পেশেন্টটা লিসার বেশ খাতিরের পেশেন্ট হয়েছে। মালদার পার্টি! নিজের সুবিধা-অসুবিধা লিসাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। তার বদলে মোটা টাকাও বকশিস দেয়। ডেলিভারি হয়েছে পেশেন্টটার। ওর আর ওর বাচ্চার একটু স্পেশালি খেয়াল রাখে লিসা। ওর বাড়ির লোকও বেশ ভালো। এইতো আজকে ২০০০ টাকা ওর হাতে গুঁজে দিল। কাল আর আজকের বকশিস মিলিয়ে। লিসার বাড়ি নার্সিংহোম থেকে খুব বেশি দূরে নয়। একটা অটোর দূরত্ব। কিন্তু রাত যা হয়েছে এই সময় অটো পাচ্ছে না ও। তাই হাঁটা লাগিয়েছে। রাস্তার ফুটপাথ ধরে হেঁটে পাশের গলিটা ধরল লিসা। এটা একটু শর্টকাট। অন্তত কিছুটা সময় কম লাগবে এখন। এইসব গলিগুলো ফাঁকা হয় এইসময়। বাড়িগুলোর আলো নিভে গেছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে যে যার মতো। শুধু স্ট্রিট লাইটের আলোগুলো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সামনে একটু এগোতেই স্ট্রিটলাইটটা অদ্ভুত ভাবে দপ দপ করছে। জ্বলছে নিভছে। মনে হচ্ছে এটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সেটাকে পেরিয়ে লিসা আর একটু এগিয়ে গেছে। এখানে বাঁ পাশে একটা ছোট ফাঁকা জায়গা আছে। এখন জঙ্গল হয়ে গেছে। হ্যাঁ ফাঁকা জায়গা এখানে থাকার কথা নয়। চারপাশে বড় বড় ফ্যাট গজিয়ে উঠেছে। এই জায়গাটাও ফ্ল্যাট হবে। কিন্তু একটা কী শরিকি ঝামেলায় আইনি জটিলতায় ফেঁসে আছে। তাই এখনও ফ্ল্যাটটা হয়ে ওঠেনি। হঠাৎ লিসার মনে হল ওর পিছনে কে যেন আছে। কিন্তু পিছন ফিরতে কাউকে দেখতে পেল না। নিজের মনের ভুল ভেবে আবার পুরনো ছন্দে এগিয়ে যেতে লাগল। এইবার একটা ছোট কী যেন পিঠে এসে পড়ল। জোরে লাগল ওর। ‘উফ’ বলে চিৎকার করে উঠল। পিছন ফিরে দেখে একটা পাথরের ঢেলা। তার মানে কেউ নিশ্চয়ই ওকে ছুঁড়ে মেরেছে। এবার দেখার চেষ্টা করে লিসা। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। সামনে ফিরে দ্রুত গতিতে হাঁটতে থাকে। তখনই ওর মনে হয় ওর পিছনে কেউ যেন ছুটে আসছে। লিসা ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে একবার পিছন ফিরে দেখে। একটা লোক কালো রঙের পোশাক পরে। কে এটা? কেন তাড়া করছে ওকে? কী উদ্দেশ্যে লোকটার? একা মেয়ে রাস্তাঘাটে কত রকমের বিপদ হয়। আজ কি তেমনি কোনও বিপদের সম্ভাবনা আছে ওর? প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায় লিসা। প্রাণপণে ছুটতে থাকে। কিন্তু ওর পিছনের ব্যক্তি যেন পায়ের গতি আরও বাড়িয়ে নিয়েছে। ছুটতে ছুটতে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে লিসা। বুঝতে পারে ওর বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। পিছন ফিরে চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার ক্ষতি কোরো না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও।’ ভারী কণ্ঠস্বরে উত্তর আসে ‘তোকে ছেড়ে দেব বলে তো আজ আসিনি!’
চমকে ওঠে লিসা! লোক নয়! এ যে একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর। মহিলা? একজন মহিলা ওকে ধাওয়া করছে? কে হতে পারে এ! কী উদ্দেশ্য ওর?
‘আ…আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি? কে তুমি?’
‘আমি কে সেটা তোর না জানলেও চলবে। তুই আমার কোনও ক্ষতি করিসনি।’
‘তাহলে? তাহলে আমায় তাড়া করছ কেন তুমি? কী চাই তোমার? ‘আমার কিছু চাই না। তোকে কিছু দিতে এসেছি। কারণ তুই অনেকের ক্ষতি করেছিস।’
‘ক…কী বলছ তুমি? কী ক্ষতি করেছি আমি? আর… কী দিতে চাও তুমি?’
‘মৃত্যু! আমি তোকে তোর সব পাপ থেকে আজ মুক্ত করে যাব।’
‘ন…না! ছেড়ে দাও আমাকে…. বাঁচাও…’ চিৎকার করার শুরুতেই ওর মুখটা চেপে ধরে এই মহিলা। তার মুখ দেখতে পায় না লিসা। তবে তার হাতে উঠে আসা ছুরিটা দেখতে পেয়েছে ও।
***
রাত দুটো বাজে। একটা ঝোপের ধারে ঢুকে গেল কালো পোশাক পরা সেই ব্যক্তি। একটু আগেই যে নার্স মেয়েটিকে খুন করেছে! ঝোপের অন্ধকার থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে এল এক নারী মূর্তি। সেই কালো পোশাকের ব্যক্তিকে আর কোথাও দেখা যায় না। এই নারী মূর্তি ঝোপের আড়াল থেকে বেরোতেই একটু দূরে এসে একটা টোটো দাঁড়াল। মহিলাটি উঠে গেল তাতে। তারপর টোটো চালক তাকে নিয়ে রওনা দিল। রাত প্রায় আড়াইটা যখন বাজতে যাবে তখন তারা এসে থামল একটা বস্তির সামনে। সেখানে দু’জনেই নেমে পড়ল। তারপর অন্ধকার গলির মধ্যে ঢুকে পাঁচ নম্বর বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটি বাড়ির তালা খুলে ভিতরে ঢুকতে মহিলাটি তার পিছন পিছন ঢুকে গেল। তারপর দরজা বন্ধ করে দিল। অন্ধকার ঘরে হালকা আলো জ্বালাল মহিলাটি। তারপর গিয়ে দাঁড়াল পর্দা ঢাকা আয়নাটার সামনে। পর্দাটা তুলে দিয়ে নিজেকে অন্ধকারের মধ্যে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর চুড়িদারের ওপরের অংশটা একটু তুলে খোলা পেটটার দিকে তাকাল। একদম নিচের দিকে একটা কাটা চিহ্ন। এটা ওকে মনে করিয়ে দেয় জীবনের সবথেকে বড় ঘাটিকে। লোকটা ওর পিছনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বলে ‘যতবার তুমি ওই দাগটাকে দেখবে ততবার তুমি মনে জোর পাবে। মেয়েটা পিছনে ফিরে লোকটার বুকে মাথা রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে। তারপর বলে, ‘ও তো থাকলে পারত! ও আমার কাছে আসার আগেই কেন চলে গেল?’ লোকটা ওর মাথায় একটা হাত রেখে বলল ওর অপরাধী তোমার অপরাধী আরও অসংখ্য মানুষের ওই অপরাধী গুলোকে তোমায় শেষ করতে হবে। না হলে ওর মতো তোমার মতো কত প্রাণ ওখানে ঝরে যাবে।’
(১৭)
মাথাটা ঝিমঝিম করছে খুশির। চোখ খুলতেও পারছে না। বুঝতে পারছে না কেন এরকম লাগছে। অনেক কষ্টে একটু এপাশ-ওপাশ করে চোখটা খোলে তো কিন্তু চোখ খুলতেও দেখে চারপাশে অন্ধকার। বিছানা থেকে কোনওক্রমে নামার চেষ্টা করে। হাতড়াতে থাকে। এইদিকেই তো ছিল সুইচ বোর্ডটা। কী হল এখানে তো কিছু নেই! একটু এগিয়ে গিয়ে খুশি ধাক্কা খায় কিসে যেন একটা। এটা তো একটা ছোট আলমারির মতো এটা তো এখানে ছিল না। হাতড়ে হাতড়ে সেই আলমারিটাকে পার করে গিয়ে দেওয়ালে খুশি পায় সুইচ বোর্ড। সেখানে প্রথমে একটা সুইচ টেপে। কিন্তু সেটা অন করতেও কোনও আলো জ্বলল না। খুশি পরের সুইচটা অন করল। কিন্তু এবারেও কোনও আলো জ্বলল না। ঘরে একটা ফ্যান চলছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। সেটা হয়তো অন আছে। সেইটা এখনো হাতে লাগেনি ওর। এইবার আরেকটা সুইচে আঙুল চালাতেই একটা টিমটিমে আলো জ্বলে উঠল। এটা আগের আলোটার মতন জোরালো নয়। কিন্তু সেই আলোতে ঘরের দিকে চোখ মেলে তাকাতেই খুশি চমকে গেল। এটা কোন ঘর? এই ঘরে তো ছিল না ও এতদিন! এটা ওকে কোথায় নিয়ে এসেছে ওরা! তার মানে ওই ইঞ্জেকশনটা… খুশি সব কথা একটা একটা করে মনে করার চেষ্টা করল। ওকে ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়েছিল। তার আগে ও শুনেছিল যে ওর থেকে কিছু একটা লুকানো হচ্ছে। কিন্তু কী সেটাও জানতে পারেনি। আর তারপরে ওকে ইঞ্জেকশনটা দেওয়া হয়! তার মানে ওটা দিয়ে ওকে অজ্ঞান করা হয়েছে! কিংবা ঘুমের ইঞ্জেকশন ছাড়া আর কিছু…
খুশির গাটা গুলিয়ে উঠেছে আবার। বিড়বিড় করে ওঠে, ‘ওরা কোথায় নিয়ে এসেছে আমাকে? আচ্ছা আজকের ঘটনাই তো? না কালকের? কত তারিখ আজ?’ মাথায় সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। খুশি কোনওক্রমে বিছানা থেকে নেমে এসে দরজা ধাক্কা দেয়। প্রচণ্ড জোরে দরজা ধাক্কাতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘আমাকে খোলো। কে আছো? কেউ আছো? খুলে দাও দরজা। আমাকে যেতে দাও। আমি বাড়ি যাব। কেন আটকে রেখেছ আমাকে? কী করছ তোমরা আমার সাথে?’
খুশির চিৎকার বৃথাই গেল। কোনও শব্দ এলনা বাইরে থেকে। খুশি আবার জোরে জোরে ধাক্কা মারতে লাগল। তাও কোনও শব্দ এল না। ওর গলা শুকিয়ে গেল। হাতে ব্যথা হচ্ছে। শরীরের জোর নেই। আর পারছে না চিৎকার করতে। কোনওক্রমে ওখান থেকে উঠে এসে জল খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও জল পেল না। আবার দরজা ধাক্কা দিতে লাগল।
‘আমার জল তেষ্টা পেয়েছে! কেউ জল দাও!’
প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে চিৎকার করার পর দরজার ওপাশে শব্দ হল। ‘চিৎকার করে কোনও লাভ নেই! কেউ খুলতে আসবে না!’ একটা লোকের কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বর খুশি চেনে না। কারা বাইরে? এরা ওকে আটকে রেখেছে কেন? খুশি জোরে জোরে দরজা ধাক্কিয়ে বলে, ‘কে তুমি?’
‘আমি কে সেটা জেনে তোর কোনও লাভ নেই!’ কর্কশ গলায় উত্তর আসে।
‘আমাকে আটকে রেখেছ কেন?’
‘তুই এখনও বুঝতে পারছিস না!’
‘না পারছি না… আ…আচ্ছা একটা বারের জন্য খোলো। আমার জল তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল দাও। এখানে পাইনি জল।’
‘জল চেষ্টা পেয়েছে?’
‘হ্যাঁ! খুব!’
‘দাঁড়া!’ কথাটা বলতেই দরজাটা খুলে গেল। ঢুকে এল একজন লম্বা চেহারার স্বাস্থ্যবান পুরুষ। একে খুশি চেনে না। খুশির হাতে একটা জলের বোতল ধরিয়ে দেয় লোকটা। সেটা হাতে নিয়ে আগে অনেকটা জল ঢক ঢক করে খেয়ে নেয় খুশি। তারপর মুখটা মুছে একটা হাঁফ ছেড়ে প্রশ্ন করে, ‘কে তুমি? আমাকে এখানে আটকে রেখেছ কেন? কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে? এখানে তো আমি ছিলাম না। রিচা ম্যাডাম কোথায়?’
‘তোর এত প্রশ্নের উত্তর কেন দেব রে? শুধু এটুকু জেনে রাখ এখন থেকে আগামী বেশ কিছু মাস তোকে এখানেই থাকতে হবে।’
‘কিন্তু কেন?’
‘তুই তো কাজ করতেই এসেছিলিস।’
‘আমার চাকরির দরকার নেই। আমি বাড়ি ফিরে যাব। মায়ের কাছে।’
‘কী করে যাবি?’
‘আ…আমাকে ছেড়ে দাও। আমি নিজেই চলে যাব! মৃণালদাকে বলো একবার আমাকে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে দিতে!’
‘মৃণাল?’ খানিক হেসে নিল লোকটা। তার পর বলল, ‘তুই এখনও বুঝিসনি ও আমাদের কাজই করেছে। তোকে এখানে দেওয়ার জন্য ও টাকাও পেয়েছে।’
‘মৃণালদা…’ খুশির মাথাটা টাল খেল একবার
‘তোর কাছে তো সব থেকে বড় অ্যাসেট রয়েছে। কেউ তোকে যেতে দেবে না।’
‘মানে? আ… আমি কিছু নিইনি! আমার কাছে কিছু নেই। তোমাদের জিনিস আমি কেন নেব? আমাকে ছেড়ে দাও। আমার কোনও টাকাপয়সা লাগবে না। যে টাকা তোমরা দিয়েছ আমি সেটাও ফিরিয়ে দেব। আমাকে আমার গ্রামে ফিরে যেতে দাও। আমি বুঝতে পারছি তোমরা খারাপ কিছু করতে চাইছ। কিন্তু কী করতে চাইছ সেটা আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে এখানে রাখাতে যে তোমাদের কোনও ভালো উদ্দেশ্য নেই সেটা…’
‘একি! এর জ্ঞান ফিরে এসেছে!’ ঘরের ভেতর ঢুকে আসে একজন মহিলা। খুশি এইবার চিনতে পেরেছে তাকে। চিৎকার করে বলে, ‘রিচা ম্যাডাম! আপনি কেন আটকে রেখেছেন আমাকে? ছেড়ে দিন আমাকে! আমার কিছু চাই না। আমি শুধু আমার মায়ের কাছে যেতে চাই। আমি যা শুনেছি আমি সব ভুলে যাব। আমি জানি না আপনারা আমার সাথে কী করেছেন বা কী করতে চাইছেন। আমি শুধু আমার মায়ের কাছে যেতে চাই।’
‘সব হবে। কিন্তু আমাদের কথা না শুনলে তুমি তোমার মায়ের কাছে কেন, কোথাও যেতে পারবে না। আর তোমার মাকেও কোনওদিন খুঁজে পাবে না।’
‘মানে?’ চমকে ওঠে খুশি।
‘এখনও কিছু বুঝতে পারছ না?’
‘কী বুঝব?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে খুশি। তারপরে ওর কী যেন মনে হতে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা আমাকে সেদিন ইঞ্জেকশন দিয়ে আপনারা অজ্ঞান করে দিয়েছিলেন তাই না? তারপর আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন? এটা কোথায় আর আমি কতক্ষণ এরকম জ্ঞান হারিয়েছিলাম?’
‘দু’দিন!’ রিচা ম্যাডাম সংক্ষেপে উত্তর দেয়।
‘দু’দিন! কেন করছেন আমার সাথে এরকম আপনারা? কী লাভ
আপনাদের?’
‘কারণ তোমাকে আমাদের প্রয়োজন! আরও ভেঙে বলতে গেলে তোমার শরীরটা আমাদের প্রয়োজন।’
‘শরীর!’ আঁতকে ওঠে খুশি। শরীর শব্দটা শোনামাত্র ওর মনে হয় এরা খুব নোংরা কিছু করাতে চাইছে ওকে দিয়ে।
‘আরে এত ভাবনাচিন্তার দরকার নেই। তোমার শরীরটাকে আমরা শুধু কিছু মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছি।’
‘এসব কী অদ্ভুত কথা বলছেন আপনি? দেখুন আমার সাথে কোনও নোংরামো করার চেষ্টা করবেন না! ভালো হবে না কিন্তু!’
জোরে হেসে ওঠে রিচা, ‘ভালো হবে না? তুমি কী করতে পারবে? কী ক্ষমতা আছে তোমার? একটা সাধারণ গ্রামের মেয়ে! আর নোংরামো? কে বলেছে তোমাকে এসব? আমরা কোনও নোংরামো করাই না এখানে। খুব পবিত্র একটা কাজ হয়। ‘
‘পবিত্র কাজ?’ কৌতূহলী দৃষ্টিতে প্রশ্ন করে খুশি।
‘হ্যাঁ! আর সেটা কী তা তুমি আর ক’টা দিন পরেই টের পেয়ে যাবে।’ কথাটা বলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায় রিচা। আর সঙ্গে থাকা লোকটাকেও ডাক দেয়, ‘চলে এসো! দরজা বন্ধ করে দাও।’
লোকটা বেরিয়ে যেতে খুশি ছুটে যায় দরজার কাছে। তারপর কাতরভাবে বলতে থাকে, ‘আমাকে একবার আমার মায়ের সাথে কথা বলতে দিন। আমার খুব মায়ের জন্য মন খারাপ করছে। প্লিজ। দিন না একবার কথা বলতে!’
রিচা কী যেন একটা ভেবে বলে, ‘এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন সবসময়? এসব ঠিক নয়। যেভাবে বলব নিজের খেয়াল রাখবে। একটুও এদিক ওদিক হলে ভালো হবে না কিন্তু বলে দিচ্ছি।
‘আ…আমি তো কিছু করছি না। কী করতে পারব আমি এখানে আপনাদের নজরের সামনে বন্দি থেকে। আমাকে প্লিজ একটাবার মায়ের সাথে কথা বলতে দিন।’
রিচা একটা বাঁকা হাসি হাসে। তারপর বলে, ‘হ্যাঁ ডাক্তার বলেছেন তোমার মন ভালো রাখতে! তাহলে তোমার কথা তো শুনতেই হবে! দেব তোমার মায়ের সাথে কথা বলতে! কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে। তোমার মাকে কিছু বলা যাবে না। আর আমার কথামতো সবসময় চলতে
হবে। না খেলে হবে না, ওষুধও যেমন বলব তেমন খেয়ে যেতে হবে। না হলে কিন্তু তোমার মাকে… বুঝতেই পারছ আমরা কী করতে পারি! যদি তোমার মায়ের ভালো চাও আর তোমার মাকে এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দেখতে চাও তাহলে এই কথা আজ কেন আগামীদিনেও কেউ যেন জানতে না পারে। তুমি যদি আমাদের কথামতো এই কাজেই লেগে থাকতে পারো তাহলে তোমাকে আমরা তোমার মায়ের সাথে দেখা করতে দেব। টাকাপয়সা দেব। মায়ের কাছে যেতে দেব। সব করতে পারবে। শুধু প্রত্যেক সাত থেকে নয় মাস ধরে আমাদের সাথে এই কাজ তোমাকে চালিয়ে যেতে হবে।’
‘সাত থেকে নয় মাস?’ খুশির প্রশ্নে অদ্ভুত এক বিস্ময়।
‘ওই যে বললাম তোমার শরীরটা আমরা ভাড়া নিয়েছি কিছু মাসের জন্য! একবার সেই অ্যাসেট আমাদের কাছে চলে আসুক। তারপর তুমি যদি ভালো করে বাঁচতে চাও তাহলে পরবর্তী কাজের জন্য তৈরি হয়ে যাবে। আর তা না হলে ভেবে দেখব তোমার সাথে কী করা যায়। এখন রেস্ট নাও। পরে ফোনে কথা বলতে দেব। ততক্ষণ ভেবে নাও আমার শর্ত মানবে কি না?’ কথাটা বলে দরজাটা বন্ধ করে দেয় ওরা।
খুশির কেমন পাগল পাগল লাগছে। ও কিছুই বুঝতে পারছে না। আচ্ছা কী বলল ওরা? ওরা ওর শরীরটাকে ভাড়া নিয়েছে। মানে? কথাটা ভাবতেই খুশির আবার গাটা গুলিয়ে উঠল। ও এদিক ওদিক তাকাতে একটা অ্যাটাচড দরজা দেখতে পেল। ওটা নিশ্চয়ই বাথরুমের দরজা! ছুটে গিয়ে সেটা খুলে ভিতরে ঢুকে বেসিনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বমি করল বেশ কিছুটা। তারপর বেসিনের জলে মুখটা ভালো করে ধুয়ে নিল। এই বাথরুমের দেওয়াল হাতড়ে একটা সুইচ খুঁজে পেতেই সেটা অন করে খুশি। আর তখনই ওর মুখটা বাথরুমের ঝাপসা হয়ে আসা আয়নায় দেখতে পায়। তারপরেই ওর কী যেন একটা মনে হয়! চোখের কোল দুটো বসে গেছে। মুখে কেমন যেন ক্লান্তির ছাপ। ওর বমি পাচ্ছে! ওর অস্বস্তি হচ্ছে! ডেট পেরিয়ে গেছে কবে! তাও এখনও তো… কথাটা ভাবতেই বিদ্যুতের গতিতে ওর মাথায় খেলে গেল একটা কথা ‘শরীর ভাড়া নিয়েছে!’
***
জগিং করার সময় মোবাইলে একটার পর একটা গান চলতে থাকে দ্বৈতার। ওর পছন্দের কিছু গান। কানে এয়ার পড় লাগানো থাকে। এই মুহূর্তেও সেটাই করছে ও। সকালের হাওয়ায় নিজেকে ফ্রেশ করে নিচ্ছে। আরও কত লোকজন বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। কেউ ছুটছে। কেউ দ্রুত গতিতে হাঁটছে। কেউ একপাশে দাঁড়িয়ে ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করে নিচ্ছে। দ্বৈতা এবার বাড়ির পথ ধরল। ওকে বাড়ি ফিরে আবার রেডি হতে হবে। ওর কেসটায় প্রগ্রেস বলতে বিশেষ কিছুই হয়নি। রতনের সাথে যার ঝগড়া ছিল তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে পাঁচদিন পর। ব্যাটা মেদিনীপুরে ওর মাসির বাড়িতে লুকিয়ে ছিল। তাকে ধরেও রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু সে ঝগড়া, মদ খাওয়া, গালি দেওয়া এর বাইরে আর কিছুই মনে করতে পারছে না। আসলে মনে করতে পারছে না নয়, ও বলছে না। এখন এর বাইরে আর কিছু ঘটে থাকলে ও বলবে! লোকটা বারবার বলছে, ‘ওকে মারতে যাব কেন! আরও দশ হাজার টাকা ওর থেকেই ধার নেব ভেবেছিলাম। সেদিন ক্যাঁচালটা না হলে ওদিনই কথাটা পাড়তাম!’ দ্বৈতাও ওর পেট থেকে কথা বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও যেন ওর মন সায় দিচ্ছে না। ওর মনে হচ্ছে এই মদের ঠেক, ঝগড়া, এই লোকটা… এই সবকিছুর বাইরেও একটা কিছু আছে। একটা কিছু যা ওর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। রতনের এই রমরমা ব্যাপারের হিসাবটাও মিলছে না। এসব লোক ব্যাঙ্কে টাকা রাখে না। ঘরের মধ্যেই গোপন গোপন জায়গায় টাকা লুকিয়ে রাখে। হয়েওছে তাই। দ্বৈতা একটু খুঁজতেই সেই সব টাকা বেরিয়ে আসে। আড়াই লাখ টাকা প্রায়। রতনের শুধু চায়ের দোকান তো থাকতে পারে না। এর পিছনে নিশ্চয়ই আর কোনও ইনকামের সোর্স আছে। হতে পারে সেটার জন্য মারা গেছে! কিন্তু সেটাই বা বের করবে কী করে? দ্বৈতা রতনের বাড়ি থেকে তো এমন কোনও ক্লু পেল না। এসব টাকার হিসাবও পাওয়া গেল না। এমনকি রতনের স্ত্রীও এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। বাড়িতে যে এতগুলো টাকা ছিল আর সেসব এদিক ওদিক চোখের সামনেই লুকানো ছিল সেটা জানায় সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। দ্বৈতা বুঝতে পারছে না এই কেসের সূত্রটা ঠিক কোথায়!
জগিং শেষে প্রতিদিনের মতো বাড়ি ফিরে দ্বৈতা টেবিলে বসতেই কলিং বেলটা বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেখে সেই পেপারের ছেলেটা।
‘কি ম্যাডাম দিদি, আজকে তো খবরে তোমার নাম আছে।’
দ্বৈতা বলে ‘দেখি!’ পেপারটা ওর হাত থেকে নিয়ে চোখের সামনে রাখতেই প্রথম পেজে বড় বড় অক্ষরে হেডলাইন দেখতে পায় ‘অরণ্য গুহর খুনি এখনও অধরা।’ এটা দেখেই দ্বৈতার মাথাটা আবার ওই কেসে চলে গেল। এই কেসটাও এখনও সলভ হয়নি। কিছুতেই অরণ্য গুহর খুনির ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। খুনির মোটিভটাও ঠিক করে বোঝা যায়নি এখনও। কন্ট্রাক্ট কিলারের কাজ নয় বোঝা যায়! অতএব পিছনে প্রতিশোধ এবং শত্রুতার কারণ। কিন্তু কিসের প্রতিশোধ, কেনই বা শত্ৰুতা তা কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। ওঁর মৃত্যুর শোকে প্রায় গোটা রাজ্যের মানুষই স্তব্ধ। কতরকম সামাজিক কাজের সাথে যে যুক্ত ছিলেন উনি একটা বড় স্কুলের ট্রাস্টি। একটা অনাথ আশ্রম চালান। একটা এনজিওর সাথে যুক্ত। ইনিভেস্টিগেশন চলছে। এই সব জায়গায় খবর লাগানো হয়েছে, ইনফরমেশন কালেক্ট করা হয়েছে। কিন্তু কিছুই সুরাহা হয়নি।
খবরটা খানিকটা চোখ বোলাতেই রাগ হয় দ্বৈতার। ফ্রন্ট পেজে ওদের ডিপার্টমেন্টের নাম এসেছে। যদিও এটা বদনামের সুর। কিন্তু তবুও নামটা সেই ওর সিনিয়রের। এই কেসটা দ্বৈতাকে তো দিতে পারতেন ওর স্যার! দ্বৈতা ঠিক নিজেকে প্রমাণ করে দিত। প্রাণ লড়িয়ে দিত এটা সলভ করতে। যাই হোক। পরের আরও দুটো পাতা ওল্টাতে ছোট্ট করে একটা খবর সামনে এল দ্বৈতার ‘চাওয়ালার রহস্যজনকভাবে খুন!’ এটা দেখেই মেজাজটা আরও চটকে গেল। বুঝল এটার কথাই বলছিল পেপারের ছেলেটা। পেপারটা হাতে গুটিয়ে নিয়ে দ্বৈতা বলে, ‘তুই এবার যা! আমাকে পেপারটা পড়তে দে!’
দরজাটা বন্ধ করে এসে পেপারটা দলা পাকিয়ে টেবিলের উপর রাখল। ধুর! ওর আর আজ ভালো লাগছে না পেপারটা পড়তে। ঠিক এমন সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। সেটা রিসিভ করে ওপাশের কথা শুনতেই চমকে ওঠে দ্বৈতা, ‘কী? আবার খুন! আমি আসছি।’
(১৮)
‘উফ্ মা আবার ফল এখন?’ সামনের ফলের প্লেটটা দেখেই বিরক্ত হয় সুনেত্রা। এই একটু আগেই সকালের জলখাবার খেয়েছে ও। এক ঘণ্টা হবে হয়তো। এর মধ্যেই ওর শাশুড়ি ফলের প্লেট নিয়ে হাজির। ফল হচ্ছে সুনেত্রার দু’চোখের বিষ। কোনওকালেই ফল ওর পছন্দের জিনিস নয়। কিন্তু এখন নিয়ম করে সেটাই থালা ভরে খেতে হচ্ছে। দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেছে ওর প্রেগন্যান্সির। মর্নিং সিকনেস, ভমিটিং, উইকনেস এই সবকিছুই ওর মধ্যে দেখা গেলেও এগুলোকে শরীরের অসুস্থতা ভাবেনি সুনেত্রা। বরং ওর অংশ আসার আনন্দে সবকিছুকে ভীষণভাবে উপভোগ করেছে ও।
‘ওসব শুনব না। ডাক্তারের কথার বাইরে আমি যেতে পারব না। এই সময় ভালোমন্দ খেতেই হবে। তবে বাচ্চার গ্রোথ হবে। চুপচাপ খেয়ে নাও।’ কথাটা শাসনের সুরে বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন সুনেত্রার শাশুড়ি। সুনেত্রা জানে এই শাসনের মধ্যে একটা ভালোবাসা আছে। এই ভালোবাসা এই যত্ন এইসব সুনেত্রা কোনওদিন পাবে সেই আশা ছেড়েই দিয়েছিল। একটা বাচ্চা আসার খুশিতে কতকিছু পালটে যায়! ভেবেই অবাক লাগে সুনেত্রার। ওর বাবা-মা একদিন অন্তর একদিন আসছে ওকে দেখতে। স্কুলে সব জানাতে সেখানেও ওকে বলেছে আসার কোনও দরকার নেই। জমানো মেডিক্যাল লিভ, সিএল আর ম্যাটারনিটি লিভেই হয়ে যাবে। ওর খবরটা পেয়ে রোহিণী আর পুবালী যে কী খুশি হয়েছিল। ওকে দেখতেও এসেছিল ওরা। রোজ ফোন করে খবর নেয়।
ফলের প্লেটটা এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে টিভির রিমোটটা নিল সুনেত্রা। অনেকক্ষণ ধরে প্যানপ্যানানি একটা সিরিয়াল চলছিল। এইবার একটু চ্যানেলটা চেঞ্জ করে নিউজে দিল। আর তখনই টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা মহিলার ছবি। তার নাম লিসা। পেশায় একজন নার্স। গতকাল রাতে সে খুন হয়েছে। খবরটা শুনতেই হাত থেকে রিমোট, ফলের প্লেট সব পড়ে যায় সুনেত্রার। ও চিৎকার করে ওঠে ‘অভীক। অভীক…’ ওর এমন ভয়ার্ত চিৎকার শুনে সকলেই ছুটে আসে।
‘কী হয়েছে?’ সুনেত্রাকে কাঁপতে দেখে জড়িয়ে ধরে অভীক।
‘ও…ওই নার্স!’ টিভি স্ক্রিনের দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে দেখায় সুনেত্রা। অভীকও সেদিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে।
‘কী হয়েছে অভি? ও ওরকম করছে কেন?’ অভীকের বাবা আর মা প্রশ্ন করে।
‘এই নার্সই আমাদের ওই ক্লিনিকের খবর দেন। আর ওনাকে খুন করে দিয়েছে?’ উত্তর দেয় অভীক। তারপর বিস্মিতভাবে বলে ‘এত ভালো মানুষটা। ওকে খুন করে দিল! কেন করল ওই নার্সকে খুন?’
টিভির স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ওই ক্রাইম স্পট, রক্তাক্ত মৃতদেহ আর সুন্দর ছবিটা। বারবার মিলিয়ে মিলিয়ে দেখাচ্ছে। সুনেত্রা সেই ছবি দুটো দেখে কেমন যেন আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। ও বারবার বিড়বিড় করে যাচ্ছে, ‘ওনার কে এমন শত্রু থাকতে পারে! ওরকম একটা মানুষকে মেরে দিল! এই তো সেদিন কথা হল আমাদের। এত বড় উপকার করল! আমি আর ভাবতে পারছি না! আমার শরীর খারাপ লাগছে!’ কথাটা শোনামাত্র পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ওর শাশুড়ি ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘আরে তুই এরকম করছিস কেন? হতে পারে ওর কোনও ব্যক্তিগত শত্রু ছিল। এরকম করিস না! তোর শরীর খারাপ হয়ে যাবে তো!’
অভীক একটু ধাতস্থ হতেই ওর মায়ের কথাগুলো শোনে। ও-ও পরিস্থিতি বুঝে সুনেত্রাকে বলে, ‘হ্যাঁ তুমি টেনশন কোরো না। ডাক্তার কিন্তু বলেছে তোমাকে কোনওরকম স্ট্রেস বা টেনশন না নিতে! চলো আর টিভি দেখতে হবে না।’ কথাটা বলে সুনেত্রাকে একপ্রকার টেনে ঘরের দিকে নিয়ে গেল অভীক।
টিভিতে তখনও খবর চলে যাচ্ছে ‘ক্রাইম সিনে পৌঁছে গেছে গোয়েন্দা দপ্তরের অফিসারেরা.. আপনারা দেখতে পাচ্ছেন…’ দেখা যাচ্ছে দ্বৈতা এবং অনিকেতকে দু-তিনজন রিপোর্টার ছেঁকে ধরেছে। ওরা আসলে অরণ্য গুহর কেসটার থেকে সরে একটু সময় পেয়েছে। তাই জন্য আবার টাটকা একটা মার্ডার সিন কেউ মিস করতে চায়নি। আর এই নার্স মার্ডার কেসে দ্বৈতার কেসটাও নতুন করে হাইলাইটেড হল।
***
‘ম্যাম! আপনাদের কী মনে হচ্ছে? খুনটা কি একই খুনির করা? যদি তাই হয় তাহলে কেন এসব হচ্ছে হঠাৎ করে কলকাতায়? এর আগে একটা চাওয়ালা মারা গিয়েছিল। এখন একজন নার্স। আপনাদের কী মতামত? আগের কেসটার কিনারা হয়েছে কিছু?’ পরপর প্রশ্নগুলো ছুটে এল দু’তিনজন রিপোর্টারের কাছ থেকে। দ্বৈতা শুধু বলল, ‘ইনভেস্টিগেশন চলছে। আমরা কোনও ব্লু পেলেই আপনারা জানতে পারবেন।’
‘কিন্তু যদি কলকাতায় পরপর একই ব্যক্তি দুটো খুন করে থাকে তাহলে তো সিরিয়াল কিলিংও হতে পারে! আপনারা কি এরকম কিছু সন্দেহ করছেন? তাহলে আমাদের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কী হবে?’
‘আমি তো বললাম ইনভেস্টিগেশন চলছে। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারব না।’ কথাটা বলে এগিয়ে যায় দ্বৈতা। তারপর গিয়ে দাঁড়ায় বডিটার কাছে। ভালো করে লক্ষ্য করে একটা মোটামুটি ভালো সালোয়ার কামিজ পরেছিল লিসা। মুখশ্রীটা মোটামুটি ভালোই। দেখলে বোঝা যায় রীতিমতো মেন্টেন করত নিজেকে। চুল থেকে শুরু করে স্কিন সবেতেই পার্লার ও দামি প্রসাধনের ছোঁয়া আছে। কিন্তু সেই সবকিছুতে লেগে আছে এখন শুকনো রক্ত।
‘এই খুনটাও রাতের দিকেই হয়েছে আর সামনের দিক থেকেই হয়েছে। অদ্ভুতভাবে এই খুনেও ছুরির ব্যবহার। শুধু পার্থক্য ওই সামনে আর পিছনে। এবার ফরেন্সিক থেকে জানা যাবে একই ছুরি কি না! যদি ছুরি একই হয় তাহলে তো বেশ ভাববার বিষয়।’ দ্বৈতা ধীর স্বরে বলতে থাকে।
‘তার মানে একই ব্যক্তি এই দু’জনকে খুন করেছে?’ অনিকেত দ্বৈতার কথা শুনতে পেয়েই প্রশ্ন করে। ওর প্রশ্নটা শুনে দ্বৈতার ভুরু কুঁচকে যায় একই ব্যক্তি যদি পরপর দুটো খুন করে থাকে তাহলে কি তিন নম্বর কোনও সম্ভাবনা থাকে? তিন নম্বর খুন যদি হয় তাহলে কেসটা তো সিরিয়াল কিলিং-এর দিকে চলে যাচ্ছে। কলকাতায় সিরিয়াল কিলিং কিন্তু কেন? আগেরজন একজন চাওয়ালা আজকের জন একজন নার্স। এতে দু’জনের মধ্যে পেশাগত পার্থক্য বিশাল কিন্তু দুজনাই টার্গেট। এখন শুধু অপেক্ষা ছুরিটার বিষয়ে জানা। যদি এটাই হয় তাহলে এই কেস কিন্তু আর খুব একটা সাধারণ থাকছে না। কথাটা মাথায় আসতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে দ্বৈতা। তবে খুনের প্যাটার্ন তো মিলছে না। আগের খুনটা পিছন দিক থেকে হয়েছে। এবারেরটা সামনের দিক থেকে সাধারণত সিরিয়াল কিলাররা নিজেদের একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ফলো করে। এক্ষেত্রে যদি মার্ডার ওয়েপনটা মিলে যায় তখন একটা সম্ভাবনা থাকবে অন্তত সিরিয়াল কিলিং-এর। অথবা খুনটা এক ব্যক্তির করা কি না এটা বোঝা যাবে। এখন সেটা হলে এই দু’জনের মধ্যে কোনও ব্যক্তিগত যোগসূত্র আছে সেটা জানতে হবে।
‘খুনটাও প্রায় একইরকম তাই না?’ দ্বৈতাকে এতক্ষণ চুপ থাকতে দেখে অনিকেত আবার একটা প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ কিন্তু এটা সামনের দিক থেকে।’ এইবার দ্বৈতা উত্তর দিল।
অনিকেত একটু ভালো করে লক্ষ্য করে তারপর বলে, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ আপনি তো বলেছিলেন ওই ছুরির স্ট্রোকটা দেখতে।’ সেইমতো একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করে দেখে হঠাৎ করে আবার বলে ‘ম্যাডাম ওই অরণ্য গুহর কেসটাতেও সামনের থেকে ছুরি মেরেছিল। তবে ওখানে আবার বুকের উপর বারবার স্ট্যাব করেছে। তিনটে খুন এমন কাছাকাছি সময়ের ব্যবধানে হল! কিন্তু দেখুন কেমন আলাদা আলাদা টাইপের।
অনিকেতের কথাটা শুনতেই কেমন যেন দ্বৈতার মনে হল ‘এমন কী হতে পারে? ওটাও…’ তারপর নিজেকে বুঝিয়ে নেয়! বার বার ওই কেসটায় মাথাটা চলে যাচ্ছে! এই কথা বর্মন স্যারকে বাই এনি চান্স বলে ফেললে আর রক্ষে নেই। কী যে ভাববেন উনি। ভদ্রলোক হয়তো ভাববেন দ্বৈতার কেসটা নেওয়ার ইচ্ছে বলেই এসব মনে হচ্ছে। ওটা একটা হাইপ্রোফাইল কেস! হয়তো এরকম বলতেও পারেন যে শহরে যত ছুরি দিয়ে মার্ডার হবে সবগুলোকেই ও নিজের কেসের সাথে রিলেট করবে! এইসব কথাগুলোকে মাথার থেকে সরিয়ে দ্বৈতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর অনিকেতের দিকে ফিরে বলে, ‘এর মুখে একটা দাগ পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন চেপে ধরা হয়েছিল মুখটা। রংটা পরিষ্কার আর নরম মেয়েলি ত্বক তাই দাগটা বেশ স্পষ্ট! রতনের কেসটাতেও কিন্তু চেপে ধরার ব্যাপারটা ছিল। হালকা একটা দাগ ওর মুখেও ছিল।’
‘হ্যাঁ ম্যাম ভাইতো!’ অনিকেত আবার একবার খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে।
দ্বৈতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এই ক্রাইম সিনের সমস্ত ছবি আর আগের ছবি কালেক্ট করে আমার সাথে ডিপার্টমেন্টে মিট করবে। মনে তো হচ্ছে একই ব্যক্তির কাজ! দেখি পোস্টমর্টেমে কী বলে! আচ্ছা এই মহিলা কোথাকার নার্স ছিলেন?’
‘দাঁড়ান ম্যাডাম।’ কথাটা বলেই অনিকেত একটু এগিয়ে যায় লোকাল পুলিশ অফিসারের কাছে। ওর সাথেই ভদ্রলোক এগিয়ে এসে দ্বৈতার দিকে তাকিয়ে বলেন ‘নমস্কার ম্যাডাম!’
‘নমস্কার!’ দ্বৈতাও ভদ্রতা দেখায়।
‘ইনি… মানে এই লিসা সরকার ড্রিমল্যান্ড নার্সিংহোমের নার্স।’ ভদ্রলোক সোজা উত্তরে চলে আসতে বোঝাই গেল যে অনিকেত প্রশ্নটা আগেই করে নিয়েছে।
‘এটা কোথায়?’
‘এই তো কাছেই। খুব একটা দূরে না। ওটা একটা নার্সিংহোম কাম আইভিএফ ক্লিনিক।’
‘হোয়াট?’ রীতিমতো চমকে ওঠে দ্বৈতা।
‘কী হল ম্যাডাম?’ ভদ্রলোক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেন।
‘কিছু না। আমি ওই ক্লিনিকে যেতে চাই।’
‘হ্যাঁ চলুন না। আমিও যাচ্ছিলাম ওখানেই।’ ভদ্রলোক নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। দ্বৈতা আর অনিকেতও ওদের গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। গাড়িতে উঠতেই দ্বৈতা ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলে, ‘ওই জিপটাকে ফলো করে যাবে।’
অনিকেত বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুসখুস করছিল। এইবার প্রশ্নটা করেই ফেলল, ‘আপনিও ওই ফার্টিলিটি ক্লিনিকের কথাটা শুনে চমকে গেলেন কেন? ওই রতনের দোকানটাও একটা আইভিএফ সেন্টারের সামনে ছিল বলে?’
‘এক্স্যাক্টলি!’ দ্বৈতা সংক্ষেপে উত্তর দেয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওদের গাড়ি এসে পৌঁছায় ড্রিমল্যান্ড নার্সিংহোম এর সামনে। গাড়ি থেকে নেমে ওরা তিনজনের ঢুকে যায় নার্সিংহোমের পাশে থাকা আইভিএফ ক্লিনিকটার ভিতর। তারপর রিসেপশন ডেস্কে থাকা মেয়েটিকে দ্বৈতা জিজ্ঞেস করে, ‘আমি আপনাদের এই ক্লিনিকের মালিকের সাথে কথা বলতে চাই।’ মেয়েটি সহ সকলেই ঘাবড়ে যায় দ্বৈতা আর অনিকেতের পাশে থাকা পুলিশের ড্রেসের লোকটিকে দেখে। ওরা আন্দাজ করে নেয় দ্বৈতা এবং অনিকেতও পুলিশের লোক!
অনেক দম্পতি বসে আছে সামনের চেয়ারগুলোয়। ওরা নিশ্চয়ই ডাক্তারের সাথে ভিজিটে এসেছে। কেউ কেউ প্রেগন্যান্ট, আবার কেউ কেউ হয়তো নতুন এসেছে। এরকম পরিবেশকে উত্তপ্ত করতে চায় না দ্বৈতা। তাই ধীর ও মোলায়েম স্বরে বলে, ‘আপনাদের ক্লিনিকের একজন নার্স লিসা সরকার গতকাল রাতে খুন হয়েছেন। সে বিষয়ে আমরা একটু কথা বলতে এসেছি। এই ক্লিনিকের মালিক কে?’
মেয়েটি আমতা আমতা করে উত্তর দেয়, ‘ডক্টর কর!’
‘আচ্ছা! উনি ছাড়া আর ক’জন ডাক্তার এখানে আছেন?’
‘আরও পাঁচজন ডাক্তার আছেন।’
‘আচ্ছা ডক্টর কর কি পেশেন্ট দেখেন?
‘হ্যাঁ উনিই মেইনলি পেশেন্টদেরকে ডিল করেন। বিশেষ করে খুব ক্রিটিক্যাল কেস হলে উনি ডিল করেন প্রথমেই। বাকি ডাক্তাররাও পেশেন্ট দেখেন। তারপর প্রাইমারি চেক আপ হয়। কিন্তু সব শেষে ওনার কাছেই যায়।’
‘আচ্ছা ওনার সাথে এখন একটু কথা বলা যাবে?’
‘উনি তো পেশেন্ট দেখছেন!’
‘একটু তো কথা বলতেই হবে আমাদের সাথেও। আপনাদের ক্লিনিকের নার্স যখন খুন হয়েছেন! মালিককে তখন আমাদের সাথে কোঅপারেট তো করতেই হবে।’দ্বৈতার গলার সুর একটু কঠিন হতেই মেয়েটা সুড়সুড় করে ফোনটার দিকে সরে গিয়ে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যাডাম আমি খবর দিচ্ছি স্যারকে!’ কথাটা বলেই মেয়েটা ফোনটা নিয়ে ডায়াল করে। বোঝা গেল ডাক্তার করকে ফোনটা করেছে। এক মিনিটের মধ্যে ফোনটা রেখে বলল, ‘ম্যাম আপনারা ভিতরে যেতে পারেন।’
‘কোন দিকে?’ দ্বৈতা প্রশ্ন করে।
‘ও আপনাকে নিয়ে যাবে।’ বলে পাশে ছেলেটিকে ইশারা করে।
ছেলেটা বলে, ‘আসুন আমার সঙ্গে।’
দ্বৈতা অনিকেত এবং সেই অফিসার চেম্বারে ঢুকতেই ডাক্তার কর সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বসুন!’
দ্বৈতা হাত নেড়ে বলে, ‘ইটস ওকে। আমরা জাস্ট কয়েকটা বিষয়ে জানতে এসেছি।’
‘হ্যাঁ বলুন।’
‘আপনি খবরটা দেখেছেন নিশ্চয়ই?’
‘না প্রথমে দেখা হয়নি। একটু আগে নিউজটা পেয়েছি।’
‘সেই বিষয়েই আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।’
‘আচ্ছা!’
‘লিসা সরকার কেমন ছিলেন?’
‘ভালো। কাজের দিক থেকে বেশ সিনসিয়ার। এমনি তো কোনও প্রবলেম ছিল না।’
‘ওর সাথে কি কারও কোনও সমস্যা ছিল এখানে বা অন্য কোথাও? মানে আপনারা কি কিছু জানেন?’
‘দেখুন আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। নার্সদের সাথে আমার খুবই প্রফেশনালি কথা বার্তা হয়। ওদের মধ্যে যদি কারও সাথে কারও কিছু সমস্যা থেকে থাকে সেটা আপনি ওদের সাথে কথা বলেই বুঝতে পারবেন। মানে বাকি নার্স বা আদার্স এমপ্লয়ি যারা রয়েছে তাদের সাথে কথা বললে আপনি বুঝতে পারবেন। তবে আমার মনে হয় না আমার এই ক্লিনিক বা নার্সিংহোমে কারও সাথে কারওর এরকম স্তরে ঝামেলা আছে। আর লিসার ব্যক্তিগত জীবনে কী সমস্যা আছে বা ওর কারও সাথে কোনও সমস্যা ছিল কি না এই বিষয়ে আশা করি আমরা কেউ বলতে পারব না! অন্তত আমি তো জানি না। গতকাল ওর কটা অব্দি ডিউটি ছিল আপনি সেটা আমাদের চার্ট মানে রোস্টার দেখলে বুঝতে পারবেন। কালকের রোস্টার আমার এমপ্লয়িদেরকে বললে ওরা দিয়ে দেবে। আমি যেটা শুনলাম, ওর কালকে একটু রাতের দিকেই ডিউটি ছিল। বোধ হয় বারোটা সাড়ে বারোটা অবধি কিন্তু মনে হয় একটু লেট করে বেরিয়েছিল। কোনও পেশেন্টকে ভিজিট করার জন্য লেট হয়েছিল। পুরো ডিটেলস আপনি নম্রতার থেকেই পেয়ে যাবেন।’
‘নম্রতা কে?’
‘রিসেপশনে যে মেয়েটার সাথে আপনাদের একটু আগে কথা হয়েছে ওর নামই নম্রতা। ও-ই আপনাকে রোস্টার ডিটেলস এবং বাকি এমপ্লয়ি যারা লিসার সাথে কাজ করত তাদের ডিটেলস দিয়ে দেবে।’
‘আচ্ছা থ্যাঙ্ক ইউ!’
‘অফিসার একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি।’ ডক্টর কর একটু চিন্তিত ভাবে প্রশ্ন করেন।
‘হ্যাঁ বলুন!’
‘এই ঘটনাটাতে আপনারা আমার ক্লিনিক আর নার্সিংহোমকে ইনভল্ভ করবেন না তো?’
‘এটা তো তদন্ত করলেই বলতে পারব যে আপনাদের ইনভলভ হতে হচ্ছে কি না! তবে আপনাদের এমপ্লয়ি যখন! একটু তো টানাটানি হবেই।’
‘দেখুন আমি আপনাকে বলতে পারি ওর এই খুনের পেছনে কোনওভাবেই আমাদের নার্সিংহোম বা ক্লিনিক ইনভলভড নয়। দেখবেন যাতে আমাদের রেপুটেশনে কোনও এফেক্ট না পড়ে।’
‘সেটা সময় বলবে। আমি চেষ্টা করব শুধু সত্যিটা বের করার। আসি!’ হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায় দ্বৈতা এবং অনিকেত। ওরা রিসেপশনের দিকে এগোলে ওদের সাথে থাকা লোকাল থানার অফিসার প্রাইমারি কাজগুলো মিটিয়ে নেওয়ার জন্য বেরিয়ে যান। রিসেপশন ডেস্কে দ্বৈতা বেশ কয়েকজনের নাম জানতে পারে যাদের সাথে গতকাল ছিল লিসার ডিউটি। এদের সাথে বেশিরভাগ সময় ওর ডিউটি পড়ে। তাই এদের সাথে ওর বন্ধুত্ব একটু বেশিই। দ্বৈতা তাদের সাথে দেখা করার কথা বলতেই জানা যায় তাদের ডিউটি আবার আজ রাতে। নম্রতা জানায় তাদের সাথে এখন দেখা করা যাবে না! দ্বৈতা আবার তার ফর্মে ফিরে আসে। একটু জোর গলায় বলে, ‘আপনি এক ঘণ্টার মধ্যে এদের সকলকে ডেকে পাঠান। আমি কিছু জিনিস জিজ্ঞাসা করব।’
(১৯)
‘আচ্ছা মা বড় হলে কি সবাই পাল্টে যায়?’ বিছানায় মায়ের পাশে শুয়ে প্রশ্ন করে ছোট্ট মেয়েটা। ওর মা ওর মাথায় চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে, ‘ওমা পাল্টে যাবে কেন? হ্যাঁ দেখতে সবাই পাল্টে যায় ঠিকই। কিন্তু মানুষটা তো একই থাকে।’
‘মা স্বপ্নগুলো কি সত্যি হয় বড় হলে?’
‘হ্যাঁ হয় তো! ছোটবেলায় সবাই কত স্বপ্ন দেখে বড় হয়। এই হব। সেই হব। কারওর স্বপ্ন সত্যি হয়। আর কারও কারও স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। বড় হয়ে তারা অনেক কিছু হবে ভাবলেও হওয়া আর হয়ে ওঠে না।’
‘মা আমার স্বপ্ন সত্যি হবে? আমিও একটা স্বপ্ন দেখি জানো! আমার মনে একটা ইচ্ছা আছে।’
‘হ্যাঁ হবে তো! কী ইচ্ছা আছে বল! ‘
‘আমি বড় হয়ে একটা ভালো চাকরি করব। ভালো জায়গায় যাব। আর তোমাকেও নিয়ে যাব। তখন তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। আমি চাকরি করব আর তুমি পায়ের উপর পা তুলে আরাম করবে।’
‘ওরে বাবা! বোকা মেয়ে আমার! আমি পায়ের উপর পা তুলে আরাম করব কি না জানি না। তবে তুই বড় হয়ে খুব ভালো চাকরি করবি। আমার আশীর্বাদ রইল। তারপর তোর ভালো বিয়ে দেব। নাতিপুতির মুখ দেখব। তারপর আমার শান্তি।’
‘না না মা, আমি বিয়ে-টিয়ে করব না। ওসব হলে তো দূরে চলে যেতে হবে তোমার থেকে। তা হবে না। আমি তোমার কাছেই থাকব।’
‘আচ্ছা হয়েছে পাকা মেয়ে। নে এবার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়। দুপুর অনেক হল তো!’
‘মা আমি বড় হয়ে গেলেও তুমি এভাবেই আমার মাথায় বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। তুমি পাল্টে যাবে না কখনও। দেখো আমিও পাল্টে যাব না।’ মেয়েটা চোখ বন্ধ করে। চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। আর ঘুম নেমে আসে দু’চোখে।
হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকারের শব্দ হয়। খুশির ঘুম ভেঙে যায়। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে ডেকে ওঠে ‘মা… মা… কোথায় গেলে? এইতো তুমি আমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিলে!’ থমকে যায় খুশি। সম্বিত ফিরতেই ও নিজেকে আবিষ্কার করে সেই আধো অন্ধকার ঘরে। এতক্ষণ তবে স্বপ্ন দেখছিল! অন্তত স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে ছোটবেলায় ফিরে যেতে পেরেছিল। ফিরে যেতে পেরেছিল ওদের বাড়ির সেই বিছানাটায়। মায়ের পাশে শুতে পেরেছিল! মায়ের হাতের স্পর্শটুকু পেয়েছে। খুব কান্না পায় খুশির। এ কেমন জীবন পেল ও? ওর তো ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে চাকরি করবে। কিন্তু এ কোথায় এসে পড়ল! সবার স্বপ্ন পূরণ হয় না! ঠিকই বলেছিল ওর মা। কিন্তু ওর মা যে আশীর্বাদ করেছিল খুশির স্বপ্ন পূরণ হবে! তাহলে কী হল এটা? এমন নরকে কী করে এসে পড়ল ও? না ও চাকরি পেল। না ওর মায়ের ইচ্ছামতো ভালো বিয়ে হল। তবে একটা কথা ফলেছে! কথাটা ভাবতেই চমকে ওঠে খুশি। পেটের উপর হাত রাখে। এ কার অংশ? কার অস্তিত্ব? কাকে বহন করছে ও ওর শরীরে? এই লোকগুলো ওর সাথে কী করেছে, কীভাবে করেছে খুশি কিচ্ছু জানে না। শুধু জানে ওর শরীরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে একটা প্রাণ। এভাবে মা হতে কে চায়? খুশি তো চায়নি! ওর সাথে কেন এমন হল? কিচ্ছু করার নেই ওর। কাউকে কিচ্ছু জানাতে পারছে না। এরা খুব সাংঘাতিক। ওর মাকে যদি কিছু করে দেয়? এই ভয়ে খুশি আরও কিছু করতে পারছে না। ও বিশেষ কিছু করতে অবশ্য পারবে না। চিৎকার কেউ শুনতে পাবে না। ওকে বাঁচাতে কেউ আসবে না। ওর কাছে কোনও ফোনও নেই যে ও কাউকে খবর দেবে। কিন্তু যেটা খুশি করতে পারত সেটা হচ্ছে ওর মধ্যে বেড়ে ওঠা এই প্রাণটাকে শেষ করে দেওয়া। কিন্তু ও তো একটা মানুষ! কী করে করতে পারে এমন? তাই সেটাও করতে পারেনি। বহুদিন হল খুশির মায়ের সাথে কথা বলতে পারেনি। ওদের গ্রামের লোক হয়ে মৃণালদা কী করে এমন কাজটা করল ওর সাথে? আচ্ছা ওর মা কি ওর ফোনের আশায় বসে থাকে? ওরা নাকি খুশির মাকে জানিয়ে দিয়েছে খুশি কাজে খুব ব্যস্ত। সময় হলে ঠিক ফোন করে নেবে। খুশির খুব ইচ্ছে হয় ওর মায়ের সাথে একটু কথা বলার। ও খুব করে অনুরোধ করবে রিচা ম্যাডামকে! ও প্রমিস করবে ওর মাকে কিছু জানাবে না। যেন একটু কথা বলতে পারে। ওই সুযোগটুকু যেন ওরা করে দেয়। মনে মনে এমনটাই ভাবছিল খুশি। হঠাৎ খুব জোরে একটা চিৎকার শুনতে পায়। এই চিৎকারে গোঙানি, আর্তনাদ, কান্না সবকিছু মিশে আছে। একটা মেয়ের গলার স্বর। এই আওয়াজটাতেই তো ওর ঘুমটা ভেঙেছে!
‘কার চিৎকার? ওই রিচা ম্যাডাম তো নয়। ওই মহিলার গলার স্বর তো এমন নয়।’ খুশি চমকে যায় তারমানে ও ছাড়াও আরও কেউ আছে এখানে? সেও কি খুশির মতোই এই চক্রান্তের শিকার হওয়া নিরীহ মেয়ে? খুশি ওর বাথরুমের দিকের দেওয়ালের কাছে যায়। আওয়াজটা এখান থেকে জোরালো পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে জোরে জোরে দেওয়ালে চাপড় মারে আর প্রশ্ন করে, ‘কে আছো? কে আছো এখানে? তুমিও কি আমার মতোই কেউ? তোমাকেও আটকে রেখেছে?’
খুশি বুঝতে পারে মেয়েটা ওর পাশের ঘরে নেই। মনে হয় তার পরের ঘরটায় আছে। তাই খুশির আওয়াজ সে হয়তো শুনতে পাচ্ছে না। খুশি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দরজায় কান পাতে। শুনতে পায় হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে কারা। রিচা ম্যাডাম আর ওই লোকটা! ওদের দু’জনের গলার আওয়াজ খুশি শুনতে পাচ্ছে। ওরা চিৎকার করে বলছে, ‘মনে হচ্ছে ওর কিছু একটা সমস্যা হয়েছে! সাত মাস সবে!’ ছুটে যায় ওরা। ঘরটার দরজা খুলে যায়। সেই শব্দ খুশি পাচ্ছে। চিৎকার করে ওঠে রিচা ম্যাডাম, ‘সর্বনাশ! মেঝেতে পড়ে গেছে! ব্লিডিং শুরু হয়ে গেছে। এক্ষুনি ডাক্তারকে ফোন করতে হবে।’
কথাগুলো শুনতেই খুশির গলাটা শুকিয়ে আসে। ওর মতন সত্যিই আরও কেউ এখানে আছে। তার মানে খুশি একা নয়! এটা একটা বড় প্রতি কুক্ষিা নয়। এটা একটা বড় র্যাকেট। হঠাৎ খুশির মনে পড়ে যায় সেই দিনের কথাটা। যখন রিচা ম্যাডাম ওই ডাক্তারকে বলছিল এর আগে যারা এসেছে তারা কম শিক্ষিত। তার মানে এরা এই কাজ অনেক মেয়ের সাথে করেছে এবং খুশি ছাড়াও এখনো অনেক মেয়ের সাথেই করছে। কিন্তু মেয়েদেরকে প্রেগন্যান্ট এরা কেন করছে? কী উদ্দেশ্য এদের? খুশি ভাবতে থাকে ওর পেটেই বা কার সন্তান? কেউ কি ওর অজান্তে সেই অজ্ঞান অবস্থায় ওর সাথে নোংরামো করেছে? কিন্তু তার কোনো চিহ্ন তো খুশি দেখেনি। অন্তত কিছু তো সে খেয়াল করবে! না এমন কিছু তো খেয়াল করেনি। তাহলে কীভাবে হল এইসব? মেয়েটার ব্লিডিং হচ্ছে। বাচ্চাটার কী হবে? মেয়েটার কী হবে? ওরা খুশিকে বলেছিল অ্যাসেট আছে খুশির কাছে। এই বাচ্চাটার কথাই বলেছিল। ওরা ওদের অ্যাসেটকে নিয়ে নেবে সেটা খুশি বুঝে গেছে। এটাই হয়তো ওদের বিজনেস! কিন্তু তারপর তার সাথে কী করবে, কাউকে বেচে দেবে কি না কিছুই খুশি জানে না। ও বুঝতে পেরেছে খাওয়া-দাওয়া ওষুধপত্র এসব কিছু খেয়াল রাখা ডাক্তারের চেকআপ সবরকম যত্ন করা ওই বাচ্চাটার জন্যই। আচ্ছা বাচ্চাটাকে নিয়ে নেওয়ার পর ওরা কী করবে? ওরা তো বলেছিল খুশি যদি ওদের সাথে আরও কাজ করে তাহলে ভালো। তা না হলে… তার মানে কি আবার ওরা খুশির সাথে এমন কিছুই করবে? নিজের বিছানার উপর বসে পড়ে খুশি। কাঁদতে থাকে। ও কি একটা বাচ্চা বানানোর মেশিনে পরিণত হল? কিন্তু এরকম চলতে থাকলে তো শরীরে কিছুই থাকবে না আর। ও তো শেষ হয়ে বাবে। এমনিও এদের কথা না শুনলে এরা তো খুশিকে মেরে ফেলতে পারে। আর খুশির মায়ের কী হবে? মনে মনে কি ওর মা টের পাচ্ছে খুশির সাথে কী হচ্ছে? বুঝতে পারছে যে তার মেয়ে ভালো নেই?
বাইরে হঠাৎ আবার কথার আওয়াজ আসতেই খুশি বুঝতে পারে ডাক্তার এসেছে এবং মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোথাও। মেয়েটার কোনও শব্দ আর আসছে না। মনে হয় জ্ঞান হারিয়েছে। ওর চিৎকারটা এখনও যেন খুশির কানে বাজছে। খুশি দরজাতে জোরে জোরে চাপড় মারে। রিচা ম্যাডামকে বারবার ডাকতে থাকে। কয়েকবার ডাকতেই দরজাটা খুলে দেয় রিচা ম্যাডাম। তারপর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে? কোনও অসুবিধা হচ্ছে নাকি তোমার? পেটে ব্যথা করছে?’
খুশি বুঝতে পারে ওরা ওই মেয়েটির ঘটনায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। খুশি বলে, ‘না আমার কিছু হয়নি। ওই মেয়েটার কী হল?’
রিচা চমকে ওঠে। তারপর একটু গলা ঝেড়ে প্রশ্ন করে, ‘কোন মেয়েটা?’
‘ওই যে চিৎকার করে কাঁদছিল একটা মেয়ে। আপনি বলছিলেন ওর ব্লিডিং হয়েছে। মেয়েটা বেঁচে যাবে তো?’
‘হ্যাঁ বেঁচে যাবে। মরতে যাবে কেন! তোমার এসব জেনে তো কাজ নেই। তুমি নিজের দিকটা খেয়াল রাখো। কখনও কোনও ছোট অসুবিধা হলেও আমাকে জানাবে। একদম চুপ করে হজম করে যাবে না।’
‘না না! আমি জানাব।’
‘ভালো।’ কথাটা বলেই রিচা চলে যাচ্ছিল। খুশি পিছন থেকে ডাকল ‘শুনুন না একটু।’
‘বলো।’ ভুরু কুঁচকে তাকায় রিচা। খুশির গলাটা বেশ মোলায়েম শোনাচ্ছে।
‘অনেকদিন তো মায়ের সাথে কথা বলিনি। একবার কথা বলিয়ে দিন।’
‘বলেছি না এসব এখন হবে না।’
‘প্লিজ ম্যাডাম একবার বলিয়ে দিন। আমি কিছু বলব না। আমার খোঁজ না পেয়ে দুশ্চিন্তা করছে মা। কেমন আছে সেটাও তো জানতে ইচ্ছা করছে। আমার কাছে তো আপনাদের বাচ্চাটা আছে। বলুন আমার এই টেনশন তো ওর ক্ষতি করবে!’
দাঁতে দাঁত চেপে রিচা! বুঝতে পারে খুশি একটু বুদ্ধি করে কথা বলছে। তবে কথাটাও ভুল কিছু বলেনি। খুশির পেটে থাকা বাচ্চাটার একটুও ক্ষতি হলে রিচার কপালে খুব দুঃখ আছে। এমনিতেই আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। এরপর আবার একটা কেস হলে খুব চাপ হয়ে যাবে! এসব সম্ভাবনার কথা এক ঝলক ভেবে নিয়ে খুশির দিকে তাকিয়ে বলে ‘দেখ! ওপর চালাকি করবি না ঠিক আছে? তোর মায়ের সাথে কথা বলতে দিচ্ছি। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবি। আমার সামনে। আর বেশিক্ষণ কথা বলবি না।’ মহিলার তুমি থেকে তুই-এ নামতে একটু বেশিই সময় লেগে গেল দেখে খুশি মনে মনে হাসল। বুঝতে পারল ওর এই ঝোপ বুঝে কোপ মারায় কাজ হয়েছে। কিন্তু মনের ভাব মুখে আনল না ও। ভালো মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলে, ‘আপনার সামনে দাঁড়িয়ে সব কথা বলব। বিশ্বাস করুন আমি এইসব ব্যাপারে কিছু কথা বলব না। আপনার কোনও চিন্তা নেই। শুধু একটিবার মায়ের সাথে আমাকে কথা বলতে দিন। আমার খুব মন খারাপ করছে মায়ের জন্য।’
রিচা খুশির সামনে নিজের মোবাইলটা ধরে বলে, ‘নাম্বার বল। আমি ডায়াল করে দিচ্ছি।’
খুশি নাম্বারটা বলতেই রিচা ডায়াল করে ওর হাতে ধরিয়ে দেয়। খুশির ফোন ওপাশে রিং হতেই ওর তপন কাকা ফোনটা ধরল।
‘হ্যালো!’
‘তপন কাকা! আমি! খুশি বলছি!’
‘খুশি? কি রে এতদিন কোথায় ছিলিস? প্রায় এক মাস হতে চলল তুই কোনও ফোন করিসনি। গেছিস তাও দেড় মাস হয়ে গেছে। তোর মা তো রোজ এসে খবর নেয় তোর ফোন এসেছে কি না। এই চিন্তায় চিন্তায় ক’দিন শরীরখারাপ বাধিয়ে ফেলল।’
‘সে কী! মার কী হয়েছে?’
‘জ্বর হয়ে গেছিল। এখন ঠিক আছে।’
‘একটু ডেকে দাও না কাকা মাকে।’
‘হ্যাঁ দাঁড়া! ওই দেখো তোর মা-ই তো এদিকে আসছে। কী টান মেয়ে আর মায়ে! কথাটা বলেই জোরে হাঁক দেয় তপন কাকা, ‘ও বউদি। খুশির ফোন গো। শিগগিরি এসো!’
সেই হাঁকডাক খুশি ফোনের এপার থেকেও শুনতে পায় বেশ জোরে। খুশির মা ছুটে এসে ফোনটা ধরে।
‘হ্যালো! খুশি।’ আবেগঘন কণ্ঠস্বর তার।
‘মা!’ ডাকটা ডেকেই কেঁদে ফেলে খুশি। কিছুতেই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না।
‘ও…ও কী কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে তোর? কী হয়েছে মা আমাকে বল।’ খুশির মায়ের গলায়ও কান্নার সুর।
রিচা কটমট করে খুশির দিকে তাকাতেই নিজেকে সামলে নেয় খুশি। কান্নাটা আটকে বলে, ‘কিছু হয়নি মা। অনেকদিন পর তোমার গলাটা শুনলাম তো! তাই নিজেকে আর আটকে রাখতে পারিনি।’
‘তুই সত্যি বলছিস তো? আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে তুই ভালো নেই।’
‘না মা! আমি ঠিক আছি। তুমি কেমন আছো? আমার চিন্তায় কেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে মা? আমার চিন্তা করবে না একদম।’
‘আমার কিছু হয়নি। ও জ্বরজ্বালা কত হয়েছে আগে। তুই কবে আসবি রে? তোকে কতদিন দেখিনি। বলেছিলি যে প্রতিমাসে আসবি। একবার আয় না মা।’
খুব জোরে কান্না আসে খুশির। ও কি সত্যিই কোনওদিন আর ফিরে যেতে পারবে? কান্না চেপে রেখে বলে, ‘এখানে কাজের খুব চাপ গো মা। দেখি কবে ছুটি পাই।’
‘তাহলে ও কাজ ছেড়ে দে তুই। আমার কাছে আসতেই তো দিচ্ছে না ওরা তোকে। মৃণাল বলে গেল তোর কাজ হালকা হলেই তুই ফোন করবি, তুই আসবি। দাঁড়া আমি মৃণালকে বলব এমন কাজ দিল আমার মেয়েটাকে, যে সে মায়ের কাছেই আসতে পারছে না। আবার দেখ কাজ দেওয়ার আগে তো বলেছিল প্রতিমাসে আসতে পারবি। না না, মৃণালের সাথে কথা বলতে হবে।’
‘মা… মা তুমি আমার কথা শোনো। মৃণালদা অন্য অফিসে কাজ করে তো। ও ভেবেছিল যা তাই বলেছে। ছাড়ো! তুমি ভালো থাকো মা। তুমি সুস্থ থাকলে, ভালো থাকলে জানবে আমিও খুব ভালো থাকব। ‘তুই ভালো আছিস তো? খুশি আমার কেন জানি না তোর গলাটা ভালো ঠেকছে না।’
‘না না মা, ওই তোমার সাথে অনেকদিন পর কথা বলছি তো! একটু কান্নাকাটি করেছি তাই এরকম লাগছে।’
রিচা এদিক থেকে চোখের ইশারায় খুশিকে ফোন রাখার কথা বলে। খুশি সেটা দেখে নিয়ে ওর মাকে বলে, ‘মা খুব শিগগিরই আমি তোমার কাছে ফিরে আসব।’
এই কথাটা শুনে ওর মায়ের মনটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। ভিজে গলায় বলে, ‘এমন ভাবে বললি কেন রে? আয়। আয় চলে আয় আমার কাছে। করতে হবে না এসব চাকরি-বাকরি। চলে আয় তো! আমরা মা-মেয়ে এখানে অল্পেস্বল্পে কাটিয়ে দেব। ওই স্কুলের চাকরিটা তো করবি বলছিলিস, ওটাই করবি। চলে আয়!’
‘যাব মা। একটা কথা বলব মা?’
‘হ্যাঁ বল!’
‘তোমার মনে আছে মা, একদিন আমি বলেছিলাম সবার স্বপ্ন কি সত্যি হয়? তুমি বলেছিলে কারও কারও হয় আর কারও কারও হয় না, স্বপ্নই থেকে যায়। তোমার দেখা আমার জন্য বা আমার দেখা নিজের জন্য একটা স্বপ্ন মা স্বপ্নই রয়ে গেছে।’
‘এরকম বলছিস কেন?
তুমি নিজে ভাবলে বুঝতে পারবে। আচ্ছা, আমি এবার রাখছি মা আমাকে ডাকছে অফিস থেকে।’
‘রাখছিস? কতদিন কথা হয়নি। এত তাড়াতাড়ি রেখে দিবি?’ খুশির বুকটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে। কান্না দলা পাকিয়ে উঠে আসছে গলা দিয়ে। ওর মায়ের সাথে জানে না আবার কবে কথা বলতে পারবে। অনেক অনেক কথা বলতে ইচ্ছা করছে ওর মায়ের সাথে। কিন্তু রিচা ম্যাডাম বারবার চোখ রাঙাচ্ছে। খুশি বলে, ‘আমি আবার ফোন করব মা।’
‘কবে করবি? আমি বসে থাকব তোর ফোনের অপেক্ষায়।’
‘করব মা। খুব শিগগিরই করব। তুমি চিন্তা কোরো না।’ কথাটা বলে ফোনটা কয়েক সেকেন্ড ধরে থাকে খুশি। ও বুঝতে পারে ওর মাও ওপাশ থেকে ফোন রাখনি। আসলে যতটুকু মুহূর্ত মেয়ের নিঃশ্বাসের শব্দটুকু শোনা যায়! তবু তো সে ফোনে আছে। তারপর তো আবার চাতক পাখির মত অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে কবে মেয়েটা আবার ফোন করবে এই ভাবনা নিয়ে। খুশি ফোন কাটতে পারছে না। ওর প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে ফোনটা রাখতে। মা তো ফোনটা এখনও ধরে আছে। ও ফোন কাটবে কী করে। ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে লাইনটা কাট করে দেয় রিচা। খুশি এতক্ষণে চেপে রাখা কান্নাটা এবার উজাড় করে দিল। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। পিছন থেকে সেই মুশকো চেহারার লোকটা হাঁক দিল, ‘ম্যাডাম।’ রিচা ফিরে তাকাল। খুশি এখন এর নাম জানে। ও শম্ভু। একটা গুন্ডা! এই বাড়ি আর রিচার বডিগার্ড যেন।
‘চিড়িয়াকে বেশি উড়তে দেওয়া ঠিক না। আগের সেই কেসটা মনে আছে তো? ফুড়ুৎ হতে সাহস পেয়ে যায়।’
রিচা কী যেন একটা ভেবে একটু বিরক্ত হল। তারপর বলল, ‘ওর ডানাটাও হেঁটেই দিত স্যার। একটুর জন্য… এমন কত উড়তে চাওয়া চিড়িয়া মরে গেছে! ও উড়ে গিয়েই বা কী করে নিল?’ কথাটা বলে রিচা একটা বাঁকা তিরস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। খুশি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ওদের চলে যাওয়ার দিকে। কী বলতে চাইল ওরা? কে উড়ে গেছিল?
***
‘গতকাল আপনাদের সাথে ডিউটি ছিল লিসার?’ প্রশ্নটা করে দ্বৈতা ওর উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা চারজনের উদ্দেশ্যে। এদের মধ্যে দু’জন নার্স, একজন অ্যাটেনডেন্ট এবং একজন ওয়ার্ড বয়। চারজনে একসাথে মাথা নাড়ে সম্মতি সূচক ভঙ্গিত।
‘আপনাদের সকলকেই জিজ্ঞাসা করছি। লিসা কেমন ছিল?’
নার্স মেয়েটি বাকি তিন জনের দিকে তাকিয়ে বলে ‘ভালোই ছিল। অন্তত আমার সাথে ওর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।’
দ্বৈতা চোখের ইশারায় বাকি তিনজনকেও একই প্রশ্ন করে। তিনজনে প্রায় একসাথে উত্তর দেয়, ‘আমাদের সাথেও ভালোই সম্পর্ক ছিল।’
ওয়ার্ড বয়টা আরও বলে, ‘ওর সাথে কারও এই নার্সিংহোমে বা ক্লিনিকে ঝামেলা ছিল বলে তো আমাদেরও জানা নেই।’
‘আচ্ছা তাহলে এই ঝামেলা সংক্রান্ত প্রশ্নটা আপনাদের কাছে পৌঁছে গেছে?’ দ্বৈতার এই প্রশ্নে চারজনেই একসাথে ঢোঁক গেলে। তারপর ভয়ের চোটে একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। অ্যাটেনডেন্ট মহিলাটি আমতা আমতা করে বলে, ‘আজ্ঞে ম্যাডাম… না মানে এই কথাগুলোই তো আলোচনা হচ্ছিল। আসার সময় শুনলাম। সবাই একই কথা জিজ্ঞাসা করছিল একে অপরকে। আমরাও সে থেকেই বুঝলাম!’
‘বেশ! বুঝলাম!’ দ্বৈতা মাথা নাড়ে। তারপর জিজ্ঞাসা করে, ‘ওঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আপনারা কেউ কিছু জানেন? কারও সাথে কোনও সমস্যা?’
বাকি তিনজন মাথা নাড়লেও নার্স মেয়েটি চুপ করে থাকে। দ্বৈতার নজর সেটা এড়ায় না। ও মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তার মানে আপনি কিছু জানেন।’
নার্স মেয়েটি দ্বৈতার দিকে তাকিয়ে ভিজে গলায় বলে, ‘না মানে আসলে ওর সাথে থাকতে থাকতে জেনেছি আর কী!’
‘কী জেনেছেন?’
‘ওর একটা বয়ফ্রেন্ড আছে।’
‘আচ্ছা! কী নাম তার?’
‘কুণাল।’
‘সে কোথায় থাকে?’
‘ও থাকে হচ্ছে ওই বেহালার দিকে।’
‘আচ্ছা। এখান থেকে তো বেশ দূর।’
‘হ্যাঁ সাউথ-এর দিকে।’
‘গল্পটা কী?’
‘ওর সাথে এমনি ভালোই সম্পর্ক ছিল লিসার কিন্তু ইদানীং কিছুদিন ধরে শুনছি কিছু ঝামেলা চলছিল।’
‘কীরকম ঝামেলা?’
‘ওদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আর চার মাস পরে। কিন্তু ছেলেটি নাকি বিয়ে করতে চাইছে না। এই নিয়ে লিসার সাথে বেশ ভালোই ঝামেলা চলছিল। ও খুব আপসেট ছিল। অথচ….’
‘অথচ?’
‘লিসার থেকে ছেলেটি এর মধ্যে বেশ অনেক টাকাই নিয়েছে। সেগুলো ফেরত দিতে চায়নি। যেমন ধরুন একটা বাইক নিয়েছে। তারপরে দামি মোবাইল ফোন, হীরের আংটি। আবার শুনেছিলাম একটা ফ্ল্যাটের টাকা অ্যাডভান্স করেছে, বলছিল লিসা। লোন নেবে বলেছিল।’
‘বাপ রে আপনাদের তো ভালোই প্রতিপত্তি!’ দ্বৈতা একটু ব্যঙ্গাত্মক সুরে কথাটা বলে। তারপর বলে, ‘আচ্ছা কীরকম মাইনে আপনাদের মানে লিসার কী মাইনে ছিল?’
‘ওই সব কেটেকুটে ৩২ হাজার মতন হবে। কিন্তু ওর অনেক খরচ তো। ওকে ওর ফ্যামিলিকেও দেখতে হয়। মানে ওর অসুস্থ বাবা-মা আছে। ওর একটা ভাই একটা বোন আছে যাদের পড়াশোনা চলে।’
‘তার মানে এতগুলো খরচ চালিয়েও লিসা ম্যাডাম এরকম একটা বখাটে বয়ফ্রেন্ড পুষতেন মাত্র এই ক’টা টাকায়? তাইতো?’ দ্বৈতার প্রশ্নের ধরনে নার্স মেয়েটি ঠিক হ্যাঁ বলবে না কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু মাথা নাড়ে।
‘তা কোথায় পাব ওনার এই বয়ফ্রেন্ডটিকে?’
‘সেটা বলতে পারব না। লিসা কোনওদিন ওর চাকরি-বাকরির কথা কিছু বলেনি। বা কোথায় থাকে তাও জানি না। ‘
‘আচ্ছা তার মানে নির্ঘাত বেকার ছিল।’
‘হতে পারে!’
‘বেশ। বাকি ওই লিসার ফোন থেকেই পেয়ে যাব আমরা।’ কথাটা বলে দ্বৈতা উঠে যাচ্ছিল। কী একটা মনে হতে বলল ‘হসপিটালের কারও সাথে ওর ঝগড়া না-ই থাকতে পারে বাইরে থেকে আসা কোনও কারও সাথে কখনও? আপনাদের এখানে তো অনেক মানুষেরই থাকে পেশেন্ট পার্টিই বেশিরভাগ। কখনও কোনও ঝামেলাঝাটি হয়েছে? মনে পড়ছে এরকম কিছু?’
নার্স মেয়েটি একটু ভেবে উত্তর দেয়, ‘না তো। ও পেশেন্ট পার্টির সাথে খুব ভালোভাবে মিশে যায়। খুব ভালো সম্পর্ক থাকে তাদের সাথেও। ইনফ্যাক্ট আগের দিনও ওর একটু লেট হয়েছে ওই জন্য। একজন পেশেন্ট আছেন যার ডেলিভারি হয়েছে সবে। তো তারা বেশ পয়সাওয়ালা। লিসা ওই মহিলার বেশ খাতিরযত্ন করার জন্য বেশি টাকা পায় ওই মহিলার পরিবারের থেকে। মহিলার টুকটাক কাজের জন্যই একটু দেরি হয় সেদিন।’
‘আচ্ছা আপনাদের নার্সিংহোমের ক্লিনিকের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাই আমি। এই ধরুন লাস্ট এক মাসের।’
‘এ বিষয়ে তাহলে আমাদের স্যারের সাথেই আপনাকে কথা বলতে হবে।’
‘ঠিক আছে।’ কথাটা বলে দ্বৈতা অনিকেতকে বলে, ‘ব্যবস্থা করো! লাস্ট এক মাসের ফুটেজ দেখব। দেখি যদি কিছু পাওয়া যায়।’
দ্বৈতার কথামতো অনিকেত ডাক্তার করের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে। এক মাসের ফুটেজ পেয়ে যায়। বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না তাতে। দ্বৈতা তখন আগের একটা মাসের ফুটেজ দেখতে চায়। তাতে জাস্ট কিছুদিনের ফুটেজ যেতেই দেখা যায় একটা দম্পতির সাথে কথা বলছে লিসা। দ্বৈতা সেই ছবিটা দেখিয়ে ডক্টর করকে জিজ্ঞেস করে, ‘এরা কারা?’
ডক্টর কর বলেন, ‘আমার পেশেন্ট পার্টিই হবে। একটু দাঁড়ান, আমাকে চেক করে বলতে হবে সেদিনের তারিখ দেখে যে কারা হতে পারে।’
ডক্টর করের কথামতো সেইদিনের পেশেন্ট পার্টির লিস্ট এনে দেয় নম্রতা। তারপর ভিডিও দেখে নিজেই আইডেন্টিফাই করে এই দম্পতিকে। সে বলে, ‘ওই দিনের ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কারণ ওই কাপেলের মধ্যে মহিলাটি প্রচণ্ড কান্নাকাটি করছিলেন। এবং ছুটে গ্লাস ডোর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছিলেন। আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম তাকে দেখে। অবশ্য বুঝেছিলাম তাঁর কষ্টটা। ওনাদের নাম খুব সম্ভবত মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বোস।’
‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ! আই ক্যান রিমেম্বার!’ ডক্টর কর মনে করতে পারেন। বলেন ‘ওনার নাম খুব সম্ভবত সুনেত্রা আর ওর হাজব্যান্ডের নাম অ দিয়ে কিছু একটা! আই থিঙ্ক অভীক বোস! হ্যাঁ ওনারাই ছিলেন।’
‘কিন্তু ওনাদের সাথে লিসার কী কথা থাকতে পারে?’ দ্বৈতা প্রশ্ন করে।
‘নো আইডিয়া!’ ডক্টর কর উত্তর দেন।
নম্রতা বলে, ‘আমার মনে আছে ওইদিন আমার ডেস্ক থেকেই একটা জলের বোতল নিয়ে লিসা ওদের পিছন পিছন গেছিল। মহিলাটি খুব কান্নাকাটি করছিলেন। সেই জন্য লিসা জলের বোতলটা নিয়ে গেছিল। আমাকে বলেই নিয়ে গেছিল।’
দ্বৈতা ফুটেজটা আর একবার খেয়াল করে। হ্যাঁ, লিসা সত্যিই ওদেরকে জলের বোতল এগিয়ে দেয়। মহিলাটি জল খায় এবং তারপর লিসার সাথে টুকটাক কিছু কথাও বলে। কিন্তু কী কথা বলে সেটাই ফুটেজে ধরা পড়ছে না।
‘আচ্ছা এঁরা এখনও এখানে আছেন তো ট্রিটমেন্টের জন্য? আই মিন আপনার পেশেন্ট তো?’
ডঃ কর বলেন, ‘না ওনাদের আইভিএফ সফল হয়নি। ওনারা সেকেন্ড ট্রাই করেননি এখানে। আর কন্টিনিউ করেননি আমার এখানে।’ কথাটা শুনে দ্বৈতা চুপ করে যায়। এই দম্পতিকে অকারণ বিরক্ত করাটা কি উচিত? হয়তো না। লিসা ওদের সাথে একবার কথা বলেছে, জলের বোতল দিয়েছে এই কারণে আজকে দেড় দু’মাস পর লিসার মৃত্যুতে তাঁদেরকে খোঁচানোর কোনও মানে হয় না। দ্বৈতা বলে, ‘ওকে! আজকে আমি আসছি, ফারদার কোনও হেল্প লাগলে আপনাদের কিন্তু কোঅপারেট করতে হবে।’
ডক্টর কর মাথা নাড়েন, ‘নিশ্চয়ই অফিসার।’
