মায়াজাতক – ২০
(২০)
দ্বৈতা লিসার বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলে। ব্যাটাকে ধমকায় কিন্তু কিছুই ব্লু পায় না। ছেলেটা বেকার। কিচ্ছু রোজগারপাতি নেই। এদিকে লিসার ঘাড় ভেঙে দামি বাইক, ব্রেসলেট, চেন, মোবাইল সব হাতিয়েছে। আর মেয়েটা মারা গেছে সেটাই জানত না।
‘কীরকম ঢপের বয়ফ্রেন্ড রে তুই? তোর প্রেমিকা খুন হয়ে গেল! আর তুই মদের নেশায় এতই চুর যে সেই খবরও পাসনি? ইউজলেস! আমি না এলে তো এ খবর পেতে তোর আরও সময় লেগে যেত।’ দ্বৈতা একটু কড়কে দেয় ব্যাটাকে।
‘আ…আমি রোজ মদ খাই না ম্যাডাম। ওই মাঝে সাঝে…’ এখনও টলছে কুণাল। কথা বলতে গেলেও কথার খেই হারিয়ে যাচ্ছে।
‘এ তুই মানুষ তো? তোর গার্লফ্রেন্ড খুন হয়েছে। কানে ঢুকছে কথাটা? আর কে খুন করেছে বা কীভাবে হয়েছে এসব প্রশ্ন না করে তুই মদ নিয়ে পড়েছিস! শালা…’ আরও দু’একটা গালি গালাজ দিতে গিয়ে থেমে যায় অনিকেত। ও রীতিমতো রেগে গেছে। এরকম হলে ওর মুখ থেকে অনেক কিছু ঝরতে থাকে।
‘অ্যাঁ? কে মারল ওকে?’ এখনও ঢুলছে কুণাল।
‘যদি বলি তুই করেছিস!’ দ্বৈতা ওর কলার চেপে ধরে।
‘অ্যা! না না ম্যাডাম, এ কী বলেন… আমি তো ওকে ভালোবাসতাম! কতকিছু দিত ও আমাকে… এই যে দেখুন এই মদটাও ওর টাকায় কেনা আমার সোনার ডিম পাড়া মুরগিকে আমি কেন জবাই করব?’ একটু বমকে যায় ওর প্রতি সন্দেহের তির দেখে।
অনিকেত আর সহ্য করতে না পেরে এক চড় কষিয়ে দেয় কুণালের গালে। কুণালের মনে হল পুরো পৃথিবীটা ঘুরে গেল!
অনিকেত ওর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার কেটেছে মদের নেশা? এই তোদের মতো কিছু পাবলিকের জন্যই আজকাল মেয়েরা ছেলেদের বিশ্বাস করে না!’ তারপর দ্বৈতার দিকে ফিরে বলল, ‘সরি ম্যাডাম। আপনার পারমিশন নিইনি।’ দ্বৈতা মুচকি হাসে। অনিকেত ছেলেটা ভালো। দেখতেও মন্দ নয়। তবে স্বভাবে একটু বেশিই সরলসিধে! তার মধ্যে বেচারার কোনও গার্লফ্রেন্ডও নেই। কিন্তু মনের মধ্যে একটা যে ইচ্ছে আছে সেটা বোঝা যায়। ওইজন্যই গার্লফ্রেন্ড বিষয়টা ওর কাছে একটু সেন্সেটিভ!
‘বেশ করেছ! এটার একটু দরকার ছিল। নে এবার বল বিয়ে করতে রাজি ছিলিস না কেন?’
‘বিয়ে? ওই মালকে কেন বিয়ে করব? ও তো বুড়ি! আমার বয়সি একদম। গ্রামে আমার মা আমার জন্য মেয়ে দেখেছে। তাই…’ প্ৰথমে বেগ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেও পরক্ষণেই ওর মনে পড়ে যায় এই মাত্র একটা দাগ ওর গালে পড়েছে।
‘বাহ্ রে! জিনিস নেওয়ার বেলায় প্রেম করার বেলায় ওর বয়স ম্যাটার করেনি। আর বিয়ের সময় কচি মেয়ে চাই! অনিকেত, ওকে আরও ঘা কতক দিয়ে বেরিয়ে! আমি বাইরে ওয়েট করছি।’ কথাটা বলে দ্বৈতা বেরিয়ে যায়। অনিকেতকে দেখেই কুণাল বমকে গেছে! একটু আগের চড়টা মনে করে গালে হাত চলে গেছে। অনিকেতও ছাড়ার পাত্র নয়। আরও কয়েকটা থাপ্পড় কষিয়ে হাতের সুখ মিটিয়ে নিয়েছে।
বাইরে অনিকেত আসতেই বলে, ‘এই কি খুন করেছে ম্যাডাম? তাহলে ব্যাটাকে এখুনি নিয়ে যাই!’
দ্বৈতা বলে, ‘এই ব্যাটা কিছু করেছে বলে মনে হচ্ছে না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসে যাবে। ডক্টর আমাকে ফোন করে জানালেন ছুরির দাগ মিলে গেছে। ওটা একই মার্ডার ওয়েপন। অতএব খুনি একই!’
***
দ্বৈতার মাথা কাজ করছে না। এই সন্ধেবেলায় খাবার না খেয়ে চার কাপ চা খেয়ে নিয়েছে। তবুও মাথাটা খুলছে না। দুটো খুনের মাঝে লিঙ্ক দুটো। আইভিএফ ক্লিনিক, একটা খুনি আর তার ছুরি। যদিও আইভিএফ ক্লিনিক দুটো আলাদা। আর তো কিছুরই মিল নেই। ও বুঝতে পারছে না কীভাবে এই কেসটা সলভ করবে। তবে এটা বুঝতে পারছে এই খুনি খুব বুঝে শুনে তার টার্গেট চুজ করছে! র্যান্ডমলি টার্গেট বেছে নেওয়া হয়নি। কিছু তো কারণ আছে এই খুনগুলোর পিছনে।
‘নে এই ক’টা ছবি দেখ তো!’ দ্বৈতার মা ওর বেডরুমে ঢুকে আসেন। বিছানার উপর বসেই মোবাইলটা দ্বৈতার সামনে রাখে।
‘আরে কিসের ছবি? এখন এসব…’
‘আরে দেখই না! চারটেই তো ছবি এনেছি। তোকে বেশি বাছতে বলছি না। এর মধ্যে বেছে একটা সিলেক্ট কর তো দেখি! একটু কথাবার্তা এগোই তারপর তোর পছন্দ না হলে বিয়ে-টিয়ে করবি না। সে দেখা যাবে তখন।’
‘মানে? তুমি আবার আমার বিয়ে নিয়ে পড়েছ? উফ মা! আমার এখন প্রচণ্ড টেনশন! আমি এখন পারছি না এসব নিয়ে ভাবতে।’
‘তোমার মাথায় কবে টেনশন থাকে না! যখনই তোমাকে বিয়ের কথা বলি তখনই তোমার মাথায় অনেক টেনশনের পাহাড় এসে যাবে! আজকে আমি কিছু শুনব না কিন্তু! আমার দিব্যি। চারটে ছবির মধ্যে দেখ একটা!
দ্বৈতা এবার বিরক্ত হয়ে যায়। বলে, ‘তুমি এসব ছবি-টবি বাদ দাও তো! মারাত্মক কেসে ফেঁসে আছি আমি। এটা সলভ করতে না পারলে তোমার মেয়ের ফেস লস হবে। কী সব চলছে কলকাতায় তা তো জানো না! আর একটাও খুন হলে রিস্কে পড়ব কিন্তু আমি। কেসটার ইনভেস্টিকেশন আমি করছি।’
‘সারাদিন তো ডিপার্টমেন্টে এসব খুন-ডাকাতির কথা নিয়ে আলোচনা করিস। বাড়িতে অন্তত বন্ধ রাখ! এখানে মাথাটা একটু ফ্রেশ রাখ। না হলে তুই তো পাগল হবি আমাদের কেউ পাগল করে দিবি।’ মোবাইলটা দ্বৈতার দিকে আরেকটু এগিয়ে দেয় ওর মা। দ্বৈত বোঝে ওর মা এই মুহূর্তে নাছোড়বান্দা! ও বলে, ‘এই চারটে ছবির মধ্যে তোমার পছন্দ যেটা, তার সাথে কথা বলে নাও। তারপর আমি দেখব।’
‘আচ্ছা বেশ! তুই তো এই চারটে ছবি দেখলি না! বলছি আগের আরও দুটো ছবি আছে তো। ওই দুটো একসাথে মিশিয়ে নিয়েই একেবারে দেখব? নাকি…’
‘মানে? এই তো বললে চারটে আছে। আবার আগের দুটো কোথা থেকে এল?’
‘আগেরগুলো থেকে তো মাত্র কয়েকটা আমি পছন্দ করে রেখেছিলাম গত মাসে কিন্তু তোকে আর দেখানো হয়নি। এখন তাহলে এই চারটের সাথে ওই দুটো মিশিয়ে তারপরে যেমন মনে হয় ওই একটা-দুটো পছন্দ করি। তারপর কথা হবে খন!’
দ্বৈতার মায়ের বলা কথাগুলোর মধ্যে কী যেন একটা আছে! যেটা দ্বৈতার মাথায় ক্লিক করে কিন্তু ও ঠিক ধরতে পারছে না ব্যাপারটা। ওর মাকে বলল, ‘আরেকবার কথাটা বলো তো!’
‘কী কথা?’
‘ওই যে বললে চারটা ছবি আছে। আরও দুটো ছবি….’
‘ও ওটা! বললাম তো! চারটে তো এই রিসেন্ট বেছে রাখা। আগের গুলোর কথা তো আমিই ভুলে গেছিলাম। কিন্তু তোকে যখন ছবি দেখাতে এলাম তাই ভাবছিলাম এই সুযোগে পুরনো ছবি দুটোর কথাও বলে ফেলি।’ দ্বৈতার মা মেয়ের এই ছবি সম্পর্কে আগ্রহ দেখে বেশ খুশি হলেন।
দ্বৈতার মনে হল ওর মাথাতে যেন টিউব লাইট জ্বলে উঠল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ল্যাপটপটা স্টাডি টেবিল থেকে নিয়ে আসে বিছানার উপর।
ওর মা বলে, ‘কিরে কী হল? তুইও কি ম্যাট্রিমনি সাইট খুলবি নাকি?’
‘মা প্লিজ উল্টোপাল্টা কথা বোলো না।’
‘বলছিলাম যে তোর অ্যাকাউন্ট তো আমি একটা ক্রিয়েট করেই রেখেছি। তাহলে ওইটাই হ্যান্ডেল কর। নতুন করে আর খুলিস না।’
‘উফ্! তোমার কি ম্যাট্রিমনি আর এই বিয়ে ছাড়া আর কিছু মাথায় আসছে না? তোমাকে বললাম না ওই চারটে আর দুটো মিলিয়ে যে ছ’টা ছবি তুমি দেখে রেখেছ ওর মধ্যে যেটা পছন্দ হয় সিলেক্ট করো। তার সাথে একটু কথা এগিয়ে দেখো। তারপর আমাকে বলবে। তখন আমি দেখব পছন্দ হয় কি না তাকে। এখন প্লিজ আমাকে আর বিরক্ত কোরো না। আর হ্যাঁ আর এক কাপ চা দিয়ে যাও মা প্লিজ!
‘আনছি দাঁড়া!’ দ্বৈতার মা বেশ খুশি খুশি মনে মোবাইলটা নিয়ে চলে যায়। কতদিন পর মেয়ে অবশেষে ছেলে দেখাতে মত দিয়েছে।
দ্বৈতা ল্যাপটপ অন করে। গুগল সার্চ বার খুলে কিছু একটা সার্চ করতে থাকে। তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটা ফোন করে বলে, ‘একটু দেখো তো গত তিন-চার মাসের মধ্যে আমাদের কেসের সাথে মিল আছে এমন কোনও মার্ডার কেস আছে কি না? হয়তো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কিন্তু দেখবে যে কোনও কেসের সাথে এই আমাদের কেসটার মতন কোনও ছোট হলেও মিল আছে কি না। ফোনটা রেখে দ্বৈতা আবার ল্যাপটপের মধ্যে মুখ গোঁজে। আর বেশ কয়েকটা পুরনো নিউজপেপার পড়তে থাকে। খুঁজে খুঁজে সিলেক্ট করে তার মধ্যে দেখতে থাকে পুরনো খবর। ইতিমধ্যে আরও এক কাপ চা দিয়ে গেছে ওর মা। আর বলে গেছে এখন আর চা পাওয়া যাবে না। উনি ছবি সিলেক্ট করবেন মন দিয়ে। দ্বৈতার কানে সেসব কিছুই ঢোকেনি। ও এখন দ্রুত গতিতে ল্যাপটপের স্ক্রিনে একের পর এক নিউজ পড়ে চলেছে। এইসব খবর ঘাঁটতে ঘাঁটতে প্রায় দেড় ঘণ্টা বেরিয়ে গেল। দ্বৈতা এখনও কিছু পায়নি। ওদিকে অনিকেতও কিছু জানায়নি। একটু চায়ে চুমুক দিয়ে চোখটা বন্ধ করে দ্বৈতা। তারপর ক্লান্ত ভাবে ল্যাপটপ স্ক্রিনে চোখ রাখে। হঠাৎ একটা খবরে ওর চোখ আটকায়। বনগাঁয়ে যেতে গেলে সংহতি বলে এটা খুব ছোট্ট স্টেশন পড়ে। সেটার একটা ছোট খবর বেরিয়েছিল কিছু মাস আগে পেপারে। কিন্তু খবরটা এত ছোট্ট করে দেওয়া যে চোখে না পড়ার মতোই একটা লোক, তার নাম বিপ্লব। সে খুন হয়েছে মাঝ রাতের দিকে আর তার খুন হয়েছে গলায় আঘাতে। জানা যায় সে কলকাতায় চাকরি করত কোনও একটা নার্সিংহোমে। এই কথাটা দ্বৈতার মাথায় সন্দেহ জায়গায়। পরে এই খবরটার কোনওরকম আর আপডেট নেই। তাও দ্বৈতা লক্ষ্য করে আর একটু কিছুক্ষণ বসে আরও কিছু কেস খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু সেরকম কিছু পায় না আবার এই খবরটারও আর কোনও আপডেট পায় না। এটাকে নোট করে অনিকেতকে একটা ফোন করে বলে, ‘কাল সকালে সংহতি যেতে হবে। একটা মার্ডার কেস পেয়েছি।’
‘তাই নাকি ম্যাডাম? একদম আমাদের কেসটার মতো? আমি কিছুই পেলাম না তো সেরকম।’
‘আমাদের সাথে একটু মিল আছে। অ্যাকচুয়ালি দুটো মিল আছে। লোকটা খুন হয়েছে ছুরি দিয়ে এবং লোকটা কাজ করত কোন একটা নার্সিংহোমে কলকাতায়। এবার কী কাজ, কোন নার্সিংহোম, কী বৃত্তান্ত সেগুলো জানতে আমাদের ওখানে যেতে হবে।
‘আচ্ছা ম্যাডাম আপনি রেডি থাকবেন। আমি কালকে সকালে গাড়ি, ড্রাইভার নিয়ে চলে যাব।’
‘বেশ!’ ফোনটা রাখে দ্বৈতা।
অনিকেত তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে হাজির হয়। দ্বৈতার মা তাকে অল্প ব্রেকফাস্ট করতে জোর করলে সে না করে দেয়। দুটো বাটার ব্রেড আর এক কাপ চা খেয়ে দ্বৈতা বেরিয়ে পড়ে। ওরা যখন সংহতি পৌঁছায় সবার আগে সব থেকে কাছের থানায় যায়। সেখানে গিয়ে জানতে চায় কেসটার ব্যাপারে। ওসি জানান, বিপ্লবের ক্ষেত্রে খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এটুকু জানা গেছে বিপ্লব একটা নার্সিংহোম কাম ক্লিনিকে চাকরি করত। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি। দ্বৈতা তাকে কেস ফাইল চাইলে তিনি সেটা দেখান। তার মধ্যে ক্লিনিকের নাম এবং অ্যাড্রেস লেখা আছে, বিপ্লবের বাড়ির ঠিকানা লেখা আছে। দ্বৈতা জানতে চায়, ‘আপনারা গেছিলেন ওর কাজের জায়গায়?’
‘হ্যাঁ গেছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়েও তেমন কিছু জানতে পারিনি। এমনিতে ছেলেটার সাথে কারওর কোনও ঝামেলা যদিও কিছু ছিল না। কাজের জায়গা থেকে খুনটা হয়েছে বলেও মনে হচ্ছে না। আবার গ্রামে ওর একটা ঝামেলা ছিল একটা ছেলের সাথে। তাকে ধরেওছিলাম। কিন্তু ক’দিন নজর রাখার পর বুঝলাম ও নির্দোষ। তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি! দেখি কতদূর কী করতে পারি!’
দ্বৈতা বলে, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা?’
‘ওই যে ওই ফাইলেই আছে। দেখুন আপনি, হ্যাঁ হ্যাঁ ওই যে!’ লোকটা হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দেয়। সেটা চেক করে দ্বৈতা। সেখানেও সামনে থেকে ছুরি চালানো হয়েছে। ছবিটায় গলার সামনে দিয়ে ছোট্ট দাগে চোখ আটকায় দ্বৈতার। বুঝতে পারে এই কেস ওর কেসের সাথে যুক্ত। তার মানে শুরুটা অনেক আগে থেকেই হয়েছে।
‘আমি এটা হ্যান্ডেল করছি। আপনি আমাকে যাবতীয় ইনফরমেশন দেবেন। বিপ্লবের কেসটা নিয়ে কোনওরকম কিছু মিস করবেন না।’
‘আপনি হ্যান্ডেল করছেন মানে? এই একটা সামান্য…’ ভদ্রলোক একটু অবাক হন। দ্বৈতা বলে, ‘আপনি কলকাতায় ঘটে যাওয়া দুটো মার্ডার কেস সম্পর্কে শুনেছেন নিশ্চয়ই। একজন নার্স এবং একজন চায়ের দোকানের মালিক। ‘
‘হ্যা শুনেছি। এই ক’দিন আগে যে নার্সটা… ওটা বলছেন তো? হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়েটার ছবি তো বারবার দেখানো হচ্ছে। কিন্তু চাওয়ালার কেসটা তো…’ লোকটা মনে করার চেষ্টা করে।
দ্বৈতা বলে, ‘হ্যা ওটা কভারেজ সেভাবে পায়নি। এই দুটো খুন আমার ধারণা, আপনার এই বিপ্লবের সাথে মিলছে।’
‘কী বলছেন কী?’ চমকে ওঠেন ভদ্রলোক।
‘তার মানে বলছেন সিরিয়াল কিলিং-এর শুরুটা এই বনগাঁ থেকেই হয়েছে? মাই গড! আমি তো একটা সামান্য খুন ভেবেছিলাম।’
‘সামান্য? হ্যাঁ কেসটা জটিল কিংবা সহজ বলতেই পারেন তবে খুন কি আর সামান্য হয়?’
‘না মানে, ওটাই বলছিলাম আরকি! আমি তো ভেবেছিলাম এটা সিম্পল কেস একটা। যদিও এখনও সলভ হয়নি। কিন্তু সিরিয়াল কিলিং হবে ভাবিনি।’
(২১)
‘এমনিতে সব হেলদিই আছে। চিন্তার কিছু নেই। আপনারা আবার কবে আসবেন আমি বলে দিচ্ছি। তবে যদি কোনওরকম কোনও প্রয়োজনই পড়ে আমাকে ফোন করবেন। কোনও সমস্যা নেই আপাতত সেটা দেখে নিয়েছি। সব প্যারামিটার ঠিক আছে। যেভাবে রেস্টে আছেন ওভাবেই থাকবেন। ফুড চার্ট, মেডিসিন, জল সব ওইভাবেই মেন্টেন করবেন।’ সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেন ডক্টর দেবরায়।
অভীক প্রশ্ন করে, ‘আর ওষুধের কিছু চেঞ্জ-এর ব্যাপার নেই তো?’
ডক্টর দেবরায় বলেন, ‘না নেই এখনও। এই মেডিসিনগুলোই চলবে। আচ্ছা একটা ইউএসজি করতে হবে। আপনাদের নিয়ে যাবে আমার অ্যাটেনডেন্ট। মিস্টার বোস আপনি বাইরে দাঁড়াবেন। আমরা আপনার ওয়াইফকে নিয়ে ভিতরে যাব।’ কথাটা বলে সিমস্তিনী দেবরায় একটা বেল টিপলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন ফিমেল অ্যাটেন্ডেন্ট ভিতরে ঢুকে আসে এবং সুনেত্রাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। পিছন পিছন ডঃ দেবরায়ও যান। আর অভীকও তাদের পেছনে যায়। সুনেত্রা ভিতরে ঢুকে যায়। অভীক বাইরে অপেক্ষা করার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। ডক্টর যাওয়ার আগে বলে যান, ‘চিন্তার কিছু নেই। আমরা শুধু পেশেন্টকেই অ্যালাও করতে পারব ভিতরে। সেই জন্য বাইরেই দাঁড়াতে হবে আপনাকে।’
অভীক মাথা নাড়ে। সুনেত্রা বেডে শুয়ে আছে। ডক্টর ওর পেটের ওপরে একটা চটচটে জেল দিয়ে ট্রানসডিউসার প্রোবটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকেন। মনিটার স্ক্রিনটা ডাক্তারের দিকে। উনি সেটা দেখে নিয়ে সুনেত্রার দিকে ফিরে বলেন, ‘সব ঠিকই আছে। ঠিকঠাক গ্রোথ হচ্ছে। আচ্ছা এবার একটা সাউন্ড শোনাব!’ কথাটা বলে প্রোবটাকে আবার সুনেত্রার পেটের উপর ধরলেন ডাক্তার। তারপর সেই শব্দটা শুনতে পাওয়া গেল। ধক ধক করে বেশ জোরে আর দ্রুতগতির একটা শব্দ। শব্দটা থামতেই ডক্টর দেবরায় সুনেত্রাকে বলেন, ‘শুনতে পেলেন?’
সুনেত্রা বলে ‘হ্যাঁ!’
‘এটা হচ্ছে হার্টবিট! ‘
কথাটা শুনেই সুনেত্রার অদ্ভুত একটা আনন্দ হয়।আর সেই আনন্দ তোর চোখে জল চলে আসে। ওর সন্তানের হার্টবিট শুনেছে ও। ওর মনে হয় মনে হয় ও খুশিতে পাগল হয়ে যাবে। এমন দিন যে কোনওদিন পাবে তা একপ্রকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিল।
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ ডাক্তার দেবরায়ের হাত ধরে বলে সুনেত্রা, ‘আপনি আমার কাছে ভগবানের সমান।’
ডক্টর দেবরায় হাসিমুখে বলেন, ‘এটা আমার কাজ!’
অভীক বাইরে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছে। কে জানে ভিতরে কী হচ্ছে! ওর যে খুব চিন্তা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে যায়। সুনেত্রা বাইরে বেরিয়ে এসে অভীকের হাতটা চেপে ধরে। অভীক দেখে ওর চোখে জল। ও ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে? চিন্তার কিছু?’
সুনেত্রা বলে, ‘না! আমি এই প্রথমবার ওর হার্টবিট শুনতে পেলাম।’
কথাটা শুনে অভীকেরও মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। এত আনন্দ হচ্ছে ব্যক্ত করতে পারছে না। হয়তো সকলে সামনে আছে তাই! অন্য কোথাও থাকলে হয়তো দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদত। কিন্তু নার্সিংহোমের মধ্যে সেটা পারছে না।
***
দ্বৈতা আর অনিকেতের গাড়িটা এসে দাঁড়াল নিউ লাইফ ক্লিনিকের সামনে। অনিকেত বলে, ‘ম্যাম এটাই ওই বিপ্লবের কাজের জায়গা।’
গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে একবার নিউ লাইফ ক্লিনিক নার্সিংহোমটা ভালো করে দেখে নেয় দ্বৈতা। তারপর ভিতরে ঢুকে যায়। অনিকেত ও ওর পিছনেই যায়। রিসেপশন ডেস্কে গিয়ে দ্বৈতা জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনাদের এখানে বিপ্লব কাজ করত? ‘
রিসেপশন ডেস্কে, থাকা মেয়েটা উত্তর দেয়, ‘কে বিপ্লব?’
দ্বৈতা একটু কড়া গলায় বলে, ‘যার মার্ডার হয়েছে জাস্ট ক’মাস আগে!’
‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ! বিপ্লবদা।’ মেয়েটা দ্বৈতার দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়। তারপর প্রশ্ন করেন, ‘আপনি? ‘
দ্বৈতা একটা আইডি বের করে মেয়েটা চোখের সামনে ধরতেই মেয়েটার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। একটা ঢোঁক গিলে বলে, ‘আবার পুলিশ? এই কেস নিয়ে তো তখনই পুলিশ এসেছিল।’
দ্বৈতা বলে, ‘হ্যাঁ এসেছিল। কিন্তু কেসটা আনসলভড। ইনভেস্টিগেশন এখনও চলছে। আর যতদিন ধরে ইনভেস্টিগেশন হবে ততদিন যতবার খুশি পুলিশ আসবে কেমন? এবার আপনাদের মালিককে ডাকুন।’
মেয়েটা বলে, ‘ডক্টর এখন পেশেন্ট দেখছেন।’
‘হ্যাঁ দেখছেন কিন্তু আমাদেরকেও একটু দেখতে হবে। এই পেশেন্টকে দেখা হয়ে গেলে আমরা ওনার সাথে মিট করব।’
মেয়েটা একটা ফোন লাগায় কাউকে। ফোনটা পেয়ে একটা অল্প বয়সি মেয়ে ছুটে ছুটে আসে। এসে বলে, ‘হ্যাঁ বলুন! ম্যাডাম আসছেন। উনি ইউএসজি রুমের ওখান থেকে আসছেন। ‘
দ্বৈতা দেখে ইউএসজি রুমের দিক থেকে ডক্টর দেবরায় এবং তাঁর পিছন পিছন আর এক দম্পতিও আসছে। তাঁদের দেখে দ্বৈতার কেমন যেন চেনা চেনা লাগে। কিন্তু চিনতে পারে না। একটু বিড়বিড় করে বলে, ‘পিছনের ওই মেয়েটাকে আমার চেনা লাগছে কেন…’
অনিকেত একটু ইতস্ততভাবে বলে, ‘ম্যাডাম একটা কথা বলব?’ দ্বৈতা অন্যমনস্কভাবে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ!’
অনিকেত বলে, ‘ম্যাডাম ওই সামনের কাপলকে আমার না কেমন চেনা চেনা লাগছে!’
দ্বৈতা তিরের গতিতে অনিকেতের দিকে তাকায়, ‘তোমারও?’
‘ম্যাডাম আপনারও?’
‘ও মাই গড!’ দ্বৈতা বিস্ময়ে বলে ওঠে।
‘এরা তো ওই কাপল। লিসা যাদের সাথে কথা বলছিল।’
‘এক্সাক্টলি!’ দ্বৈতা আর অনিকেতের কথার মাঝে ডক্টর দেবরায় এসে উপস্থিত হন। তারপর শান্ত গলায় বলেন, ‘হ্যাঁ বলুন। বিপ্লবের কেসটার ব্যাপারে আবার আপনাদের কী জানার আছে?’
দ্বৈতা বলে, ‘ওই কথায় পরে আসছি। আগে বলুন ওনারা কি আপনার পেশেন্ট?
ডক্টর দেবরায় একটু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ! কেন?’
দ্বৈতা বলে, ‘কিছু না। এই প্রশ্ন-উত্তরটা আমি ওনাদের সাথেই সারব।’ কথাটা বলে দ্বৈতা এগিয়ে যায় সুনেত্রা আর অভীকের দিকে। তারপর প্রশ্ন করে, ‘আপনারা ডঃ দেবরায়ের পেশেন্ট?’
সুনেত্রা মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?
‘নমস্কার। আমি দ্বৈতা সান্যাল। লালবাজার থেকে এসেছি। একটা কেসের ইনভেস্টিগেশনে এখানে আসতে হয়েছে।’
‘ও আচ্ছা।’ সুনেত্রা আর অভীক পরস্পর পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। একজন পুলিশ অফিসারের তাদের কাছে কী প্রশ্ন থাকতে পারে এটাই দু’জনে ভাবছে।
‘আমি আপনাদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।’ দ্বৈতা বলে।
‘হ্যাঁ বলুন!’ উত্তরটা অভীক দেয়।
আপনারা ড্রিমল্যান্ড ক্লিনিকে গেছেন কখনও?’
অভীক আর সুনেত্রা একে অপরের দিকে আবার তাকায়। তারপর অভীক বলে, ‘হ্যাঁ এখানে আসার আগে আমরা ড্রিমল্যান্ড ক্লিনিকে গিয়েছিলাম।
‘ওখানে আপনাদের লিসা নামে কোনও নার্সের সাথে আলাপ হয়?’
এইবার সুনেত্রা-অভীক দু’জনেই বুঝতে পারে ওই মার্ডার কেসের সূত্রেই পুলিশ এসেছে। সুনেত্রা বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ওই যিনি মারা গেলেন তো?’
দ্বৈতা মাথা নাড়ে, ‘একদমই!’
‘হ্যাঁ ওনার সাথে আলাপ হয়েছিল। উনি আমাকে এই ক্লিনিকের খবরটা দিয়েছিলেন। খুবই ভালো মহিলা। উনিই সেদিন বলেছিলেন বলে আজ আমি এই ক্লিনিকে এসে উপকার পেয়েছি।’
‘উনি বলেছিলেন বলতে?’
‘ওনার বোনের বেবি হয়েছিল এখানে। ওনার বোনেরও আমার মতন ক্রিটিকাল কন্ডিশন ছিল। আমি ওই ক্লিনিকে গিয়েছিলাম কিন্তু আইভিএফ সফল হয়নি। তাই সেদিন আমি প্রচণ্ড কান্নাকাটি করায় উনি এসে আমাকে বলেন এই ক্লিনিকের কথা। এখানে ডক্টর দেবরায়ের আন্ডারে ওনার বোনের বেবি হয়। এই কথাটা ওনার থেকে জানতে পেরে আমরা এখানে এসেছিলাম। ভাগ্যিস এসেছিলাম! অথচ তারপরে দেখুন কী হল মানুষটার সাথে? এত বড় উপকার যিনি করলেন তিনি এইভাবে… ভাবতেই পারছি না! তার এমন শত্রুতা কার সাথে থাকতে পারে!’
দ্বৈতা বলে, ‘সেটা আমরা খুঁজে বের করে নেব। আচ্ছা লিসা আপনাদেরকে বলেছে যে ওর বোনের বেবি হয়েছে?’
‘হ্যাঁ!’
‘কিন্তু লিসার তো নিজের বোন বিবাহিত নয়। বা এমন ইনফরমেশন নেই যে তার বাচ্চা হয়েছে।’
‘সে কী?’ সুনেত্রা অবাক হয়ে তাকায়।
অভীক বলে, ‘আমরা জানি না ওটা ওনার নিজের বোন কি না বা কোনও কাজিন কি না! তবে উনি বোন বলেছিলেন। এটা আমাদের মনে আছে।’
দ্বৈতা এইবার ডঃ দেবরায়ের দিকে ফিরে বলে, ‘আপনি আমাকে একটা কথা বলুন তো! লিসাকে আপনি চেনেন?
‘দেখুন এইভাবে আমি কাউকে চিনি কি না কী করে বলব? আমার সাথে এরকম কারওর দেখা হয়েছে কি না এটা তো আমার মনে রাখা সম্ভব নয়। প্রায় প্রতিদিন অসংখ্য পেশেন্টের সাথে আমার দেখা হয় তাদের পরিবারের সাথে আমার কথা হয়। এভাবে যদি সকলের মুখ মনে রাখতে হয়, নাম মনে রাখতে হয় সেটা তো আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার!’
‘সে তো নিশ্চয়ই! কিন্তু লিসার রেফারেন্সেই তো উনি এখানে এসেছেন।’
‘হতেই পারে! আমি এরকম প্রচুর কেস হ্যান্ডেল করেছি! এখন কে লিসা আর কে তার বোন এটা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়।’
দ্বৈতা সুনেত্রার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে ‘আপনার মনে আছে লিসা তার বোনের নাম বলেছিল?’
সুনেত্রা মাথা নাড়ে, ‘না নাম বলেনি। তবে বলেছিল ওর বোনের বাচ্চা এখন বেশ বড়ই। মানে কিছু মাস বয়স তার।’
দ্বৈতা ডাক্তার দেবরায়কে বলে, ‘আমি আপনার ক্লিনিক এবং নার্সিংহোমের বিগত ছয় মাসের ফুটেজ দেখতে চাই। যদি তার আগের ও থাকে তাও দেখতে চাই। লিসা এখানে এসেছিল কি না দেখতে হবে। আর বিপ্লবের কেসটা তো আছেই।’
‘তা তো অবশ্যই! কিন্তু অফিসার ছয় মাসের আগের ফুটেজ তো আমরা রাখি না। ইভেন ছয় মাস অবধিও আছে কি না সেটা বলতে পারব না। তবে লাস্ট তিন থেকে চার মাসের ফুটেজ আপনি ডেফিনেটলি পাবেন।’
দ্বৈতা একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ডাক্তার দেবরায়কে আপাদমস্তক দেখে নেয়। ও বুঝতে পারে মহিলা অন্য ধরনের। অনেক কিছুই বলছেন আবার অনেক কিছুই সচেতনে গোপন করে যাচ্ছেন বা দেখাতে বা বলতে চাইছেন না। দ্বৈতা আর অনিকেত সিসিটিভি রুমে যায় এবং বিগত কিছুদিনের ফুটেজ দেখতে থাকে। ওদের সাথে ডক্টর দেবরায়কেও থাকতে হয়। ফলে আজকের যাবতীয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ পিছিয়ে দিতে হয়েছে।
দ্বৈতা ফুটেজ দেখতে দেখতে প্রশ্ন করে, ‘আপনার কী মনে হয় বিপ্লবের মার্ডার কেন হয়েছে?’
‘সেটা আমি কী করে বলব?’
‘বিপ্লব তো আপনার এখানের এমপ্লয়ি!’
‘দেখুন আমার এখানে অসংখ্য এমপ্লয়ি কাজ করে। তাদের হঠাৎ করে কোনও কিছু হলে কেন হয়েছে সেটা জানা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হ্যাঁ আপনার আগে যে অফিসার এসেছিলেন তিনিও প্রশ্ন করেছিলেন এখানে কারও সাথে বিপ্লবের কোনও বিবাদ ছিল কি না। তবে আমি তাকেও যা উত্তর দিয়েছিলাম আপনাকেও দিচ্ছি সে বিষয়ে, আমার মনে হয় এখানে অন্তত বিপ্লবের সাথে কারওর কোনও সমস্যা ছিল না। ওর ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা কারও সাথে ছিল কি না সে বিষয়ে তো আমাদের পক্ষে বলা মুশকিল।’
‘বেশ!’ আর কিছু বলে না দ্বৈতা। মনিটরের স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ দেখার পরেও এমন কিছুই সন্দেহজনক পাচ্ছে না ও। এই বিপ্লব লোকটা প্রায় অনেক পেশেন্ট পার্টির সাথে ভালোভাবে কথা বলছে দেখা যাচ্ছে। কিছু পার্টিকে দেখা যাচ্ছে বিপ্লবকে আলাদা করে মিষ্টির প্যাকেট দিতে। অনেককেই দেখা যাচ্ছে বিপ্লবের সাথে বেশ ভালোভাবে কথা বলতে। এই আলাদাভাবে বিপ্লবকে মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া বা ওর সাথেই বেশির খাতির একটু অন্যরকম লাগলেও এ বিষয়ের উত্তর নিশ্চিত তৈরি আছে এদের সকলের কাছে। নিশ্চয়ই বলবে বিপ্লব মানুষটাই এমন ছিল, বিপ্লব সকলের সাথে খুব ভালোভাবে মিশত! সম্ভাব্য উত্তরগুলো মাথায় উঁকি দিতেই এই প্রশ্নটা আর দ্বৈতা করে না। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফুটেজ দেখার পর বন্ধ করে দেয় সেটা। তারপর হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসছিলই সিসিটিভি রুম থেকে। হঠাৎ কী একটা মনে হতে আবার ফিরে গেল। তারপর বলে ‘আচ্ছা আমার মাথাটা বিপ্লবের দিকে ছিল বলে খেয়াল করলাম না। আপনাদের বিল্ডিংয়ের পিছনের দিকের ফুটেজ কোথায়?’
এই প্রশ্নটা আচমকা আশা করেননি ডক্টর দেবরায়। উনি প্রথমে একটু থমকে গেলেও তারপর বলেন, ‘আমাদের পেছনের দিকে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা রাখা হয়নি। আগে ছিল। সেটা খারাপ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আর নতুন করে লাগানো হয়নি। ‘
‘তাহলে পিছনে যখন আপনাদের কোনও টিভি ক্যামেরা নেই তখন আমি নিজের চোখেই পিছনের দিকটা দেখে আসি।’ দ্বৈতার প্রস্তাবে সম্মতি দিতে মন চায় না ডক্টর দেবরায়ের। কিন্তু উনি নিরুপায়! নিমরাজি হয়ে বলেন, ‘চলুন আমি নিয়ে যাচ্ছি।’ বলেই একজন অ্যাটেনডেন্টকে নির্দেশ দেন তাঁদের সাথে আসার জন্য।
দ্বৈতা অনিকেতকে বলে, ‘তুমি ইমিডিয়েটলি ড্রিমল্যান্ডে যাও। আর ছয় মাস আগের অবধি লিসার ফুটেজগুলো একটু দেখো তো। ভালো করে চেক করবে। দেখবে ও আর কোনও পেশেন্ট পার্টির সাথে কথা বলছে কি না! আর হ্যাঁ, এরকম যদি আরও পেশেন্ট পার্টি পাও তাহলে ওখানেই নার্সিংহোমে ওদেরকে দিয়ে আইডেন্টিফাই করিয়ে নামের লিস্ট আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করবে। ডু ইট ফার্স্ট।’ কথাটা বলামাত্র অনিকেত মাথা নেড়ে বলে, ‘ওকে ম্যাডাম!’
অনিকেত বেরিয়ে যেতেই দ্বৈতা ওর মোবাইল ফোনটা বের করে। তারপর ডিপার্টমেন্টের আর একজন সহকারীকে ফোন করে বলে, ‘তুমি একটু হ্যাপি ডে নার্সিংহোমে যাও। গিয়ে ওখানে নার্সিংহোম আর ক্লিনিকের ফুটেজে ভালো করে চেক করো রতুনের সাথে বিগত ছয় মাসে কতজন পেশেন্ট পার্টির বারবার কথা হয়েছে বা বেশিক্ষণ ধরে কথা হয়েছে! চা খাওয়ার জন্য শুধু নয়। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভালো মতো কথা। যাদেরকে পাবে তাদের ফটো ওই ক্লিনিকে ভালো করে দেখিয়ে তাদের নামের লিস্ট কালেক্ট করবে। আর আমাকে সেন্ড করো ইমিডিয়েটলি। খুব আর্জেন্ট।’ ফোনটা রেখে দ্বৈতা বলে, ‘চলুন এবার।’
ক্লিনিকের পিছন দিকটা এসে দ্বৈতা দেখে ক্লিনিক আর নার্সিংহোমের পিছন দিকে প্যাসেজটা কানেক্টেড। এখানেও কোনও পার্টিশন আলাদা করে নেই। আর একটা লিফট এখানে আলাদাভাবে আছে যেটা নার্সিংহোমের ব্যাক সাইডে। দ্বৈতা সেটা দেখতেই প্রশ্ন করে, ‘এই লিফটটা কেন?’
ডঃ দেবরায় উত্তর দেন, ‘এটা স্টাফদের জন্য। আর তাছাড়া ইমারজেন্সি পারপাস। যদি কখনও কোনও সমস্যা হয় তাহলে এটা ইমার্জেন্সি এক্সিট হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’
‘আচ্ছা! আমি লিফটে উঠব। আশা করি এক্ষুনি ওটা ইউজ হচ্ছে না!’ ডাক্তার দেবরায় এবং তাঁর অ্যাটেনডেন্ট পরস্পর পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে কথাটা শুনে।
‘এনি প্রবলেম?’ ওদের দেখেই প্রশ্ন করে দ্বৈতা।
‘না না। চলুন।’ ডক্টর দেবরায় মাথা নাড়েন। এই লিফটে লিফটম্যান নেই। নিজেদেরই অপারেট করতে হয়। লিফটের কন্ডিশন ভালোই আছে। এবং এটা যে সত্যিই ব্যবহার হয় সেটা বোঝা গেল। দ্বৈতা দেখল লিফটটা শুধুমাত্র সেকেন্ড ফ্লোরেই যায়। অ্যাটেনডেন্ট সেই বাটন প্রেস করতেই উপরে উঠতে শুরু করল লিফট। তারপর যেখানে গিয়ে থামল সেখানে দরজাটা খুলত দ্বৈতা একটু অবাক হল। এটা একটা ছোট রুম। এখানে ওটির বেশ কিছু জিনিসপত্র রাখা রয়েছে। এর সামনের দিকে রয়েছে আর একটা দরজা। সেটা ঠেলতেই দেখল সেটার ওপাশে মস্ত বড় ওটি। ‘এরকম ব্যবস্থা কেন? এটার কী প্রয়োজনীয়তা?’ দ্বৈতা পিছন ফিরে তাকায়।
ডঃ দেবরায় বলেন, ‘দেখুন এটা আমার নার্সিংহোম। এখানে আমি স্পেশালি যেকোনওভাবে বিল্ডিং বানাতে পারি। ওটি রুমের সাথে আমাদের আর একটা ছোট রুম করা রয়েছে যাতে এমারজেন্সি পারপাস কখনও এই ওটি রুমটাও ব্যবহার করা যায়। আর লিফটটা এখানে এসে কানেক্ট হয় কেন বললাম তো আপনাকে। পুরোটাই ইমারজেন্সি সিচুয়েশনের জন্য ক্রিয়েট করা। দেখুন বিপ্লবের মার্ডার কেস নিয়ে আপনি এখানে এসেছেন। তার সাথে আমার নার্সিংহোমের কোন রুমটা কেমন ভাবে তৈরি! আমার লিফট কোন ফ্লোরে যাবে এগুলো তো আপনার দেখার বিষয় নয়। তাই প্লিজ, আপনি এই ধরনের প্রশ্ন করবেন না আমি উত্তর দিতে বাধ্য নই।’
‘আমাদের না নির্দিষ্ট কোনও দেখার বিষয় থাকে না। আমরা যেখানে যেটা পাই সেখানেই খুঁজে দেখে নিই কিছু সন্দেহজনক আছে কি না! আমাদের কাজের জিনিস থাকলেও থাকতে পারে।’
‘দেখুন আমি কিন্তু এবার আপনার ওপর মহলে রিপোর্ট করতে বাধ্য হবো। আপনি এখানে একটা মার্ডার কেস নিয়ে এসেছেন ভালো কথা। কিন্তু আপনি আমার নার্সিংহোমের পরিবেশকে বিরক্ত করছেন। এগুলো আমরা অনেক হাইজিন মেনটেন করে রাখি। বাইরে থেকে যাকে তাকে যেকোনও ড্রেসে আমরা ওটি রুমে ঢুকতে দিই না।’
দ্বৈতা বুঝতে পারে এই মহিলা ইচ্ছাকৃতভাবে যেন তেন প্রকারেণ ওকে সরাতে চাইছে। তবে ওর কথাগুলোকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিতে দ্বৈতা এই মুহূর্তে পারবে না। তাই একটা তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বলে, ‘আপনার নার্সিংহোমের হাইজিন আমি নষ্ট করব না। চলুন।’
নিচে নেমে নার্সিংহোমের সামনের দিকে আসতেই ডক্টর দেবরায় বলেন, ‘আপনার আর কিছু জিজ্ঞাসা না থাকলে আমি এবার আমার পেশেন্টদেরকে অ্যাটেন্ড করব। তাঁরা অনেকেই অনেক ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে থাকেন। অনেকেই প্রেগন্যান্ট! অনেকে আইভিএফ করেছেন জাস্ট! এদের ক্ষেত্রে বেশিক্ষণ ওয়েট করিয়ে রাখা বা এভাবে বসিয়ে রাখা ঠিক না।’ দ্বৈতা অল্প হেসে বলে, ‘না এই মুহূর্তে আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই। তবে হ্যাঁ আমি এক্ষুনি এখান থেকে যাচ্ছি না। আপনি আপনার পেশেন্টদের অ্যাটেন্ড করুন।’
অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে চলে যান সিমস্তিনী দেবরায়। ঠিক তখনই দ্বৈতার ফোনে অনিকেত ফোন করে। ফোনটা রিসিভ করে ও, ‘হ্যাঁ বলো। কিছু পেলে?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম! ওই কাপেলের মতোই আরও একটা কাপলের সাথে লিসাকে কথা বলতে দেখা যায়।’
‘গ্রেট! তাদের নাম কিছু জানতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ আমি তাদের নাম আর ছবি আপনাকে সেন্ড করছি।’
দ্বৈতা ফোনটা রাখে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ খুলে দেখে অনিকেত একটা ছবি পাঠিয়েছে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লিসা এবং একদম সুনেত্রাদের মতোই দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি দম্পতি। অনিকেত তাদের নামও পাঠায়। দ্বৈতা সেই ছবিটা এই ক্লিনিকের রিসেপশন ডেস্কে দেখায়। মেয়েটি একটু ভুরু কুঁচকে ছবিটা দেখে। তারপর বলে, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কত মানুষ এখানে আসে। এভাবে চেনা সম্ভব নয়।’
‘বেশ! তাহলে এই যে এই নামটা দেখুন এন্ট্রি করে আপনাদের পেশেন্ট লিস্টে আছে কি না?’
‘সরি ম্যাম! এভাবে আমরা কনফিডেন্সিয়াল ইনফরমেশন দিতে পারব না!’
‘কনফিডেন্সিয়াল? এই ক্লিনিকের এমপ্লয়ি খুন হয়েছে। যেই মেয়েটি এখানে পেশেন্ট পাঠায় সেও খুন হয়েছে। এরপর আপনি কনফিডেন্সিয়াল দেখাচ্ছেন আমাকে? আমি কিন্তু ওই পেশেন্ট পার্টিকে ফোন করে জানব। তখন সেটা আপনাদের জন্য ভালো হবে না!’ দ্বৈতার কাছে ফোন নাম্বার নেই। সেটা আদায় করতে ওকেই আবার ওই নার্সিংহোমে ছুটতে হবে। অনিকেত পারবে না। ওকেও ওই প্রাইভেসির গল্প দেবে। তার চেয়ে ভয় দেখিয়ে যদি এখানেই তাড়াতাড়ি কাজটা করা যায়।
দ্বৈতার কথায় একটা ঢোঁক গেলে মেয়েটা। তারপর কিবোর্ডে খুট খাট শব্দ করে নামটা টাইপ করে বলে, ‘হ্যাঁ এই নামের একজন পেশেন্ট আছেন।’
‘নিশ্চয়ই এখনও চেকআপে আসেন?’
‘হ্যাঁ।’
দ্বৈতার কপালে ভাঁজ পড়ে। ও গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়। ওই দু’জন পেশেন্টকে লিসা এই ক্লিনিকে রেফার করে। অদ্ভুত ব্যাপার। লিসা হয়তো তাদেরকেও বলেছে এই নার্সিংহোমে এলে তাদের সুরাহা হবে! ব্যাপারটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়! যে কেউ যাকে খুশি কোনও নার্সিংহোম বা ক্লিনিক রেফার করতেই পারে যদি সে নিজে কোনও উপকার পেয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টা যে এমনই জলের মতো সহজ স্বচ্ছ নয়। তা দ্বৈতা ভালোই জানে। শুধু সেটার লিঙ্কটা পাচ্ছে না। এখন দেখতে হবে রতনের কেসে কী হয়! আরো এক ঘণ্টা দ্বৈতা ওখানেই কাটিয়ে দেয়। তারপর ওর কাছে আবার ফোন আসে। এইবার যাকে দ্বৈত রতনের ব্যাপারে খোঁজ লাগাতে বলেছিল সে ফোন করেছে। দ্বৈতা ফোন ধরতেই সে বলে, ‘ম্যাডাম ফুটেজ তো ওরা দেখিয়েছে। একটা পেশেন্ট পার্টি পাওয়াও গেছে। ওরা নাম দিতে চাইছে না। কারণ রতন ওদের এমপ্লয়ি নয়। আর বাইরে গিয়ে ওদের পেশেন্ট কার সাথে কথা বলছে তার জন্য পেশেন্ট ডিটেলস দিয়ে ওরা প্রাইভেসি নষ্ট করবে না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি দেখে নিচ্ছি।’ ফোনটা রেখে দেয় দ্বৈতা। ওর কেন জানি না মনে হচ্ছে এই পেশেন্টও এখানেই এসেছে। নাম নেই যখন এই ডেস্কের মেয়েটি কিচ্ছু বলবে না। দ্বৈতা ছবিটা নিজে ভালো করে দেখে। তারপর আবার ছুটে যায় সিসিটিভি রুমে। সেখানে গিয়ে বলে, ‘আমি ফুটেজগুলো আরেকবার দেখব।’
সিসিটিভি রুমের লোকটা বিরক্ত হলেও কোনও উপায় নেই। সে কোনও কথা না। আবার ফুটেজ চালিয়ে দেয়। দ্বৈতা বেশ কিছুক্ষণ ধরে আরও ভালো করে ফুটেজগুলো দেখে। হঠাৎ ওর নজরে একটা মুখ আসতেই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এই ওয়েট ওয়েট। এখানে পজ করুন। জুম করুন। ডান হাত দিয়ে একটা চাপড় মারে টেবিলের উপরে। মোবাইলের ছবিটার সাথে ভালো করে দেখেয়ে নিয়েছে ভিডিও ফুটেজের মুখটাকে মিলিয়ে। হ্যাঁ তার মানে রতন যার সাথে কথা বলেছিল সেই লোকটাও এই ক্লিনিকে এসেছিল। অনেক কিছু ক্লিয়ার হয়ে গেছে দ্বৈতার। ও আর একটাও কথা না বলে ওই ক্লিনিক থেকে সোজা বেরিয়ে আসে।
(২২)
আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় মেয়েটা। পরনে সেই কালো ট্র্যাকস্যুট। মাথার চুলটা এখন খোলা। নিজের মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ সবাই একসময় বলত ‘কী সুন্দর রে তোর চোখদুটো!’ গোটা মুখে নজর কাড়ত ওই চোখ দুটোই। আর এই চোখ দুটো কত কিছু দেখল। এই সমাজের কত নোংরা আর ভয়ংকর দিক যে দেখল! জামার পেটের কাছের অংশটা তুলে একবার দেখল মেয়েটা। সেই কাটা দাগটার একটু নজরে এল। আর নজরে এল কিছু সাদা সাদা দাগ। স্ট্রেচ মার্কস ওগুলো। এইগুলোই তো স্মৃতিগুলোকে তাজা রেখে দিল।
‘তুমি তৈরি তো?’পিছন থেকে প্রশ্নটা আসতেই মেয়েটা ফিরে তাকায়। ওর একমাত্র ভরসার মানুষটা এসে দাঁড়িয়েছে ওর পিছনে। মেয়েটা মাথা নেড়ে চুলগুলোকে গুটিয়ে হাতখোঁপা করে ক্লিপ দিয়ে আটকে নেয় ভালো করে। তারপর মাথার টুপিটা ভালো করে আটকে নেয়। ঘন অন্ধকার বাইরে এখন। কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই ওকে কাজ সারতে হবে। আজ আবার একটা কঠিন কাজ! যতই কঠিন হোক। সফল তো ওকে হতেই হবে।
***
সকাল সকাল ডিপার্টমেন্টে এসে কিছু হিসাব কষেছে দ্বৈতা। সামনের বোর্ডটার উপর তিনটা ছবি আটকে রেখেছে। প্রথমে বিপ্লবের ছবি। তারপর রতনের ছবি এবং তারপর লিসার ছবি। তিনটি ছবির নিচে লিখে রেখেছে নাম, খুনের ডেট আর ক্লিনিকের নাম। রতনের ছবি আর লিসার ছবি থেকে দুটো তির এনে মিলিয়েছে বিপ্লবের এই ক্লিনিকে।
দ্বৈতা বোর্ডের সামনে থেকে ফিরে এসে অনিকেতকে বলে, ‘এখনও পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী তিনজন দম্পতিকে এই ক্লিনিকে পাঠিয়েছে লিসা এবং রতন। এর আগেও নিশ্চয়ই অনেককে পাঠিয়েছে। সেই লিস্ট এখনও অব্দি আমরা কালেক্ট করতে পারিনি। হতে পারে এটা কোনও বিজনেস! হতে পারে নিউ লাইফ পেশেন্ট কালেক্ট করার জন্য ওদেরকে এজেন্ট হিসাবে রেখে দিয়েছে!’
‘হ্যাঁ ম্যাম এটা তো হতেই পারে! তাহলেও তো সেক্ষেত্রে আমাদের বলার কিছু থাকে না। এটা ওদের বিজনেস পলিসি হতে পারে।’
‘হ্যাঁ হতে তো পারে অনেক কিছু! কিন্তু খটকা তো লাগছে অন্য জায়গায়। সবটাই ঠিক ছিল শুধু এই তিনজন যদি মারা না যেত।’
অনিকেত সম্মতির সুরে মাথা নাড়ে। দ্বৈতা আবার বোর্ডের কাছে ফিরে যায় তারপর বলে, ‘আমি এই ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না! এই তিনজনকে মারা হল কেন আর কে খুনি? এই তিনজনের মধ্যে লিঙ্ক সাংঘাতিক কিছু একটা আছে। সাধারণ বিজনেস পলিসি যদি এটা হয় তাহলে তো এদেরকে মরতে হতো না। এরা তিনজনই হিসাবমতো কাজ করছে একটাই কোম্পানির জন্য। লোকে জানে তিনটে আলাদা ক্লিনিকের সাথে এরা ডিরেক্ট কিংবা ইনডিরেক্টলি যুক্ত! কিন্তু আদতে সবাই নিউ লাইফেরই লোক। খুনি একজনই। সে এদের ভালোভাবে ফলো করেছে। টার্গেট সেট করেছে। সুযোগ খুঁজেছে। কিন্তু এদেরই কেন? এছাড়াও আর একটা প্রশ্ন আমার মাথায় খেলছে এই কাপলগুলোকে কেন আইভি এফ ক্লিনিকে যেতে হয়েছে! এদের সমস্যা আছে তাই! তিনটেই আইভিএফ ক্লিনিক। দুটো আইভিএফ ক্লিনিকে এদের এতটাই সমস্যা হল যেটা একমাত্র নিউ লাইফ কিওর করতে পারছে? এখানে আমার অদ্ভুত একটা খটকা লাগছে। আমি জানি না এটা ডক্টরের ক্রেডিট নাকি অন্য কিছু!’
‘অন্য কিছু মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন ম্যাডাম?’ অনিকেত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় দ্বৈতার দিকে।
‘জানি না অনিকেত। জাস্ট আমার মন বলছে অন্য কিছু একটা থাকতে পারে। সেটা আমি যেন দেখতে পাচ্ছি না!’
দ্বৈতার কথাটা শেষ হতেই অনিকেতের ফোনটা বেজে ওঠে। দ্বৈতা সেদিকে ধ্যান দেয় না। ও ভাবতে থাকে ও কিছু মিস করছে। ওর ডাউট হচ্ছে কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না কী! অনিকেত ফোনটা রিসিভ করে আর তারপরে দু’এক লাইনের কথাতেই চমকে ওঠে অনিকেত। ফোনটা তড়িঘড়ি রেখে বলে, ‘ম্যাম আপনাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।’
দ্বৈতা নিজের জিন্সের পকেটে দেখে ওর মোবাইলটা সুইচ অফ হয়ে গেছে চার্জ আউট হয়ে গিয়ে।
‘হ্যাঁ! কিন্তু কেন কী হয়েছে?’
‘আবার একটা খুন হয়েছে।’
দ্বৈতা উত্তেজিত হয়ে বলে ‘খুন?’
‘হ্যাঁ একটি ছেলে খুন হয়েছে। কাল রাতে।’
‘এক্ষুনি বেরতে হবে। ক্রাইম লোকেশন পেয়েছ?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম!’
দ্বৈতা আর অনিকেত রওনা দেয়। গাড়িতে উঠে দ্বৈতা ওর থেকে ডিটেলসে জানতে চায় বিষয়টা।
‘ছেলেটার নাম মৃণাল। কলকাতায় কাজ করত। বাড়ি গ্রামের দিকে। কোথায় এখনও জানি না। তবে বাড়ি থেকে ফিরছিল, একটু রাত করেই নেমেছে। শিয়ালদা, সেখান থেকে উবের করে এখানের বাড়িতে এসেছিল, ওর বাড়ির কাছেই ওর খুনটা হয়েছে। ওর মোবাইল থেকে উবের ট্রেসটা পাওয়া গেছে।’
***
দ্বৈতা আর অনিকেত ক্রাইম লোকেশনে যায়। পিছন থেকে খুন। মুখে একটা চেপে ধরার দাগ আছে। তবে এইবারের কেসে একটু ধস্তাধস্তি হয়েছে। কিন্তু ব্লু এমন কিছুই পাওয়া যায়নি যাতে খুনি অবধি পৌঁছনো যায়। লোকেশনটা গলির ভিতর। সেখান থেকে ওর বাড়ির দূরত্ব বিশেষ নয়। প্রতিবেশীরা তেমন কিছু বলতে পারছে না। শুধু ও গ্রামের বাড়ি গেছিল এটা বলতে পেরেছে। ছোট পুরনো দোতলা বাড়িতে ভাড়া থাকত মৃণাল। বাড়ির মালিককে ফোন করা হয়েছে। তিনি ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। খবরটা পেয়ে আসছেন। তবে মৃণাল একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করত এটুকু ছাড়া তিনি কিছুই জানেন না। আসলে ঘর ভাড়াটা ঠিক টাইমে চলে যেত অ্যাকাউন্টে তাই আর বাকি খোঁজ রাখেননি। এখানে আশপাশের কেউই ওর কাজের জায়গাও চেনে না। ছেলেটা নাকি একদম কারও সাথে বিশেষ কথা বলত না।
দ্বৈতা ঘরের ভিতরটা দেখে। আসবাব কম। তবে কিছু দামি মদের বোতল আর আলমারি থেকে লাখ খানেক টাকা পাওয়া যায়। আর একটা এনজিওর নামে কিছু কাগজপত্র। যার থেকে জানা যায় ও এই এনজিওতে কাজ করত। মৃণালের মোবাইলটাও বেশ দামি। দ্বৈতা বডির পকেট থেকে ট্রেনের টিকিটটা বের করে দেখে নিয়েছে। বসিরহাটের দিকে। ওর গ্রাম থেকে ফেরার সময়ই মার্ডারটা হয়েছে। ওখানেও একটু টু দিয়ে আসা জরুরি।
‘ম্যাম কেসের পুরো ডিরেকশনই তো চেঞ্জ হয়ে গেল। এ তো কোনও ক্লিনিক বা নার্সিংহোমের সাথে যুক্ত নয়। এনজিওতে চাকরি করত। একে খুনি মারল কেন? খুনি একই তো?’
দ্বৈতার মুখটা থমথমে হয় রয়েছে। ও শুধু গম্ভীর গলায় বলে ‘খুনি একজন। আমি দেখে নিয়েছি বডির উন্ড। কিন্তু খুনির টার্গেট যারা ছিল তাদের সাথে এই ছেলেটাকে টার্গেট লিস্টে রাখার কারণটা বুঝতে পারছি না।’
‘তাহলে তো আমাদের কোনও ভাবনাচিন্তাই সফল হলো না।’
‘জানিনা! আমাকে মৃনালের গ্রামে যেতে হবে একবার। তুমি একটা কাজ করো তো। তুমি যাও দেখো ওর কাজের জায়গা থেকে কী ইনফরমেশন পাও! আমিও গ্রামের জন্য রওনা বিয়ে দেব এক্ষুনি।’
‘ওকে ম্যাডাম! আমি আপনাকে আপডেট দেব।’
(২৩)
গাড়িতে মৃণালের গ্রামে পৌঁছতে লাগে পাক্কা চার ঘণ্টা। কিছুটা দেরি ট্রাফিক জ্যামে পড়ার কারণেও হয়েছে। তবে দূরত্বটা মোটেই কম নয়। ট্রেনে গেলে অনন্তপুর নামতে হয়। তারপর দু’বার অটো পালটাতে হয়। সে অনেক ঝক্কির ব্যাপার। এই মুহূর্তে দ্বৈতা একাই সেখানে এসেছে। কারণ ওর সহকারী অনিকেতকে দ্বৈতা পাঠিয়েছে সেই এনজিওতে।
মৃনালের বাড়িতে পৌঁছে দ্বৈতা দেখে লোকজনে থই থই। মৃনাল অবিবাহিত ছিল। ওর সবকিছুই ওর বয়স্ক মা। তিনি শোকে কথা হারিয়েছেন। গ্রামের বাকি লোকজন বাড়িটায় থিক থিক করছে। গ্রামের মধ্যে এইরকম বাড়ি সত্যিই দেখার মতো! দোতলা বাড়ি। শহুরে কায়দায় বানানো। মৃণালের চাকরিটা তার মানে বেশ ভালোই ছিল। এই পর্যন্ত যে ক’টা মার্ডার হয়েছে এই কেসে, তাদের সকলেরই অস্বাভাবিকভাবে অর্থের প্রাচুর্য চোখে পড়েছে। মৃণালের ক্ষেত্রেও এই প্রাচুর্যটা অস্বাভাবিক কিনা জানতে হবে। এমনটাও হতে পারে ওর পোস্ট এমনই যে স্যালারি অনেক বেশি ছিল। বাড়িটা ভালো করে দেখতে দেখতে দ্বৈতার মনের মধ্যে এই কথাগুলোই ঘুরছিল। হঠাৎ ওর সামনে এসে এক বয়স্ক লোক জিজ্ঞেস করে—’তুমি কে?’
দ্বৈতা তার দিকে ফিরে জানায়, ‘আমি কলকাতা থেকে এসেছি। পুলিশের লোক। মৃণালের কেসটার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।’
পুলিশের লোক শুনে সবাই একটু সতর্ক ভঙ্গিতে একে অন্যের দিকে চাইল। ওই বয়স্ক লোকটাও একটু তফাতে দাঁড়াল। তারপর বলল ‘আসুন। ওর মা তো কথা বলতেই পারছে না। আপনি আমাদের সাথে কথা বলতে পারেন।’ আরও দুজন লোক এগিয়ে আসে দ্বৈতার দিকে। একজন আবার একটা প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে এল। বোঝা গেল এনারা গ্রামের অভিভাবকের মতো।
দ্বৈতা হাত দেখিয়ে বলে, ‘এসবের প্রয়োজন নেই। আমি জাস্ট কিছু প্রশ্ন করেই চলে যাব। আপনারা একটু মৃণালের ব্যাপারে বলুন তো! কেমন ছিল ও?’
একটা ছেলে এদের মধ্যে থেকেই বলল, ‘ভালো ছেলে ছিল মৃণালদা। শহরে কত ভালো চাকরি করত!’
‘কী চাকরি করত তুমি জানো?’
‘না সেটা জানি না। তবে ভালোই কিছু করত। ওই চাকরি করেই তো এত বড় বাড়ি করল।’
‘মৃণালের কারও সাথে ঝামেলা ছিল? কেউ কিছু জানেন এ বিষয়ে?
এইবার একজন মহিলা বলেন, ‘না না ও ঝামেলা করার মতো ছেলেই না! কত পরোপকারী ছেলে ছিল। গ্রামের একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে শহরে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ও।’
হঠাৎ একজন মাঝবয়সি মহিলা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে ঢুকে আসে মৃণালদের উঠোনে। তারপর এসে পাগলের মতো মৃণালের মায়ের কাছে বসে অস্থিরভাবে প্রশ্ন করে, ‘আ…আমার খুশিটা কোথায়? মৃণালের অমন হল আমার মেয়েটার কী হল? ওর কথা কেউ জানো? কি গো! কেউ কিছু বলো না। কোথায় আমার খুশি জানো?
‘উনি কে?’ প্রশ্ন করে দ্বৈতা!
‘ও তো খুশির মা। আপনাকে বলল না মৃণাল আমাদের গ্রামের দুটো ছেলেমেয়েকে শহরে কাজ করে দিয়েছে। তার মধ্যে একজন ওর মেয়ে।’
‘আর একজন? ‘
‘আর একজন অতনু। তিন মাস হল গ্রাম থেকে একবার ঘুরে গেছে।’
‘আর খুশি কোথায়?’
‘সে তো সেই যে গেছে তারপরে আর আসেনি এখানে।’
দ্বৈতা খুশির মায়ের কাছে যায়। তারপর প্রশ্ন করে ‘আপনার মেয়ে কতদিন হল এখান থেকে গেছে?’
ভদ্রমহিলা দ্বৈতাকে দেখে একটু অবাক হয়। গ্রামের বাকিরা বলে ‘উনি শহর থেকে এসেছেন। পুলিশ অফিসার।’ এই কথাটা শুনে ওঁর যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো হয়। চোখ দুটো মুছে দ্বৈতার পা দুটো ধরেন। তারপর পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার মেয়েটাকে খুঁজে দিন ম্যাডাম।’
‘এখান থেকে উঠুন।’ দ্বৈতা তাঁকে পায়ের কাছ থেকে তুলে প্রশ্ন করে, ‘এর মাঝে আসেনি গ্রামে?’
‘না।’
‘ফোন করেছিল?’
‘এই দুই মাসে মোটে সাতবার কথা হয়েছে ওর সাথে।’
‘কেন? ওর কাছে ফোন নেই?’
‘না। বলেছিল চাকরিটায় জয়েন করে একটা মোবাইলে কিনবে। কিন্তু কেনেনি।’
‘তাহলে আপনার সাথে কীভাবে যোগাযোগ করত?’
‘প্রথম দিকে মৃণালের ফোন থেকে করত, পরে কার যেন একটা ফোন থেকে করেছিল আমাকে বলেনি।’
‘আপনি জানেন ও কোথায় থাকে কলকাতায় বা কোথায় চাকরি করে?’
‘আমি কিছু জানি না। কিন্তু চাকরি করে ওই মৃণালের এনজিওতে।’
‘বেশ! আপনার মেয়ের সাথে লাস্ট কবে কথা হয়েছিল?’
‘তা বেশ কিছুদিন হয়ে গেল।’
‘আচ্ছা আমি দেখছি আপনার মেয়ের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় কি না।’ কথাটা বলেই দ্বৈতা অনিকেতকে একটা ফোন করে বলে, ‘ওদিকের আপডেট কী?’
‘ম্যাডাম এই মৃণাল এনজিওতে কাজ করছে বেশ অনেকদিন হল। আর এই এনজিওর ব্যাপারটা কেমন একটু অদ্ভুত টাইপের। মৃণাল কাজ করে এখানে। পোস্ট জিজ্ঞাসা করছি বলছে ওদের এখানে সকলেরই পোস্ট এবং কাজ কমবেশি একই। মৃণাল নাকি পাবলিক ডিলিং করত।’
‘এনজিওতে কী ধরনের পাবলিক ডিলিং করত?’
‘ওই বলছে নাকি বিভিন্ন জায়গায় যেত। বিভিন্ন গ্রামে যেত। সেখানে ছেলেমেয়েদের ওয়ার্কশপ করাত। আবার কোথাও কোথাও থেকে এমপ্লয়ি নিয়ে আসত।’
‘হুম! আচ্ছা আর একটা খোঁজ লাগাও তো। খুশি বলে একটি মেয়েকে ওদের এনজিওতে কাজ দিয়েছিল। মেয়েটা ওদের গ্রামের মেয়ে। এখন কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ছবি আমি তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ ফোনটা রেখে দ্বৈতা খুশির মাকে বলে ‘আপনার মেয়ের একটা ছবি আমাকে এনে দিন। আমি সেটা পাঠাচ্ছি। দেখছি আপনার মেয়ের নিশ্চয়ই খবর পাওয়া যাবে।’
খুশির মা ছুটে বেরিয়ে গেল মৃণালের বাড়ি থেকে। দ্বৈতা এসে মৃণালের মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। তারপর প্রশ্ন করল ‘মৃণাল এখান থেকেই গিয়েছিল সেদিন?’
ওর মা কোনও উত্তর দেয় না। ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। দ্বৈতা একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে বলে ‘দেখুন আমি জানি আপনার মনের অবস্থা ভালো নয়। আমি আপনাকে বেশি জোর দিতে চাইছি না। কিন্তু ওর ব্যাপারটা আমাকে তো তদন্ত করতে হচ্ছে। আপনিও নিশ্চয়ই চান আপনার ছেলের অপরাধী ধরা পড়ুক। কেন কী জন্য এসব হল বা কে করল এটা খুঁজে পেতে গেলে আমায় আপনার সাহায্য নিতে হবে।’
এইবার মৃণালের মা জড়িয়ে জড়িয়ে বলেন, ‘যে করেছে তাকে শাস্তি দেবেন। আমাকে একবার তাকে দেখাবেন। আমি জিজ্ঞাসা করব কেন করল? আমার ছেলে তার কী ক্ষতি করেছে? তবে এসব করে কিছুই তো লাভ হবে না। মৃণাল কি আর ফিরবে?’ দ্বৈতা কিছু বলে না। খুশির মা ইতিমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন। একটা ছবি নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে। ছবিটা হাতে নিয়ে দ্বৈতা দেখে একটা অল্প বয়সি মেয়ের হাসি মুখ। সর্বদা যেন হাসি খুশি। ছবিটা থেকে একটা ছবি তোলে তারপর সেটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয় অনিকেতকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে অনিকেতের কাছ থেকে ফোন আসে। ফোনটা রিসিভ করে কী আপডেট জানতে চাইলে সে বলে ‘খুশি নামে এখানে কেউ কাজ করে না। আর এই ছবি অনুযায়ী কাউকে এখানে কেউ চেনেও না। তবে একজন বলছে একদিন খুশিতে এখানে দেখেছিল। সে একদিন এসেছিল কিছুক্ষণের জন্য জাস্ট ওদের এনজিওটা দেখতে এসেছিল মৃণালের সাথে।’
‘এসেছিল বলছে? আচ্ছা তাহলে খুশি গেল কোথায়?’
‘কোনও আইডিয়া নেই ম্যাডাম। এখানে কেউ কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু আমি আপনাকে আরও একটা খুব জরুরি কথা জানাতে চাই।’ অনিকেতের গলাটা বেশ উত্তেজিত লাগছে। ও অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছে। খুশির ব্যাপারে কথাটা বলতে বলতে বারবার চাইছিল অন্য কিছু বলতে। দ্বৈতা বলে, ‘কী ব্যাপার অনিকেতু কী বলতে চাইছ তুমি?
‘এই এনজিওর মালিক অরবিন্দ মিত্র। কিন্তু এই এনজিওতে আরেকজনও যুক্ত ছিলেন। বেশ বড় শেয়ার হোল্ডার। কে জানেন?’
অনিকেতের কথার মধ্যে এমন কিছু আছে যাতে দ্বৈতার উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। ওর মনে বেশ কিছু সম্ভাবনা খেলে যাচ্ছে। চাপা গলায় প্রশ্ন করল, ‘কে?’
অনিকেতের উত্তর শুনতেই দ্বৈতার মুখের ভাব পালটে যায়।
***
‘আসব স্যার?’
রুমের বাইরে থেকে দ্বৈতার কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকান ডিসিডিডি অর্ঘ্যদীপ বর্মন। তারপর বলেন ‘হ্যাঁ এসো!’
দ্বৈতা একটু দ্রুত গতিতে ভিতরে ঢুকে আসে। বর্মন স্যার ওকে ভালো করে লক্ষ্য করে বলেন, ‘কী ব্যাপার বলত এমন আর্জেন্ট কল? তারপরে এইভাবে আসছ! এনিথিং সিরিয়াস?’
‘হ্যাঁ স্যার!’
‘কী বিষয়ে? তোমার কাছে এমন কিছু নিউজ আছে নাকি? খুনিকে পেয়েছ?’
‘ডিটেলসগুলো জানেন তো স্যার! আমি আপনাকে আপডেট দিয়েছিলাম।’
হ্যাঁ তোমার কেসটা যে এভাবে সিরিয়াল কিলিয়ের দিকে টার্ন নিয়ে নেবে সেটা তো আমিও বুঝতে পারিনি। কেসটা কিন্তু বেশ শোরগোল ফেলেছে।’ কথাটা বলেই দ্বৈতাকে বসার চেয়ারের দিকে ইশারা করে আবার বলেন, ‘আমাদের কিন্তু কেসটা তাড়াতাড়ি সলভ করতে হবে। আর একটাও যেন মার্ডার না হয়। এই রিসেন্ট মার্ডারটার আপডেট কী?’
‘স্যার আমি আপনাকে সেটা জানাতেই এসেছি। এই যে রিসেন্ট যে মার্ডারটা হল এর কর্মক্ষেত্র কিন্তু আগের মার্ডারগুলোর সাথে মিলছে না। এ একটা এনজিওতে চাকরি করত। কোনও ক্লিনিক বা নার্সিংহোমের সাথে যুক্ত এরকম কোনও তথ্য এখন অব্দি আমরা পাইনি। কিন্তু দুটো অন্যরকম তথ্য আমরা পেয়েছি।’
‘অন্যরকম তথ্য?’
‘হ্যাঁ। এই এনজিওতে কাজ করতে নিয়ে যাবে বলে একটি মেয়েকে মৃণাল তাদের নিজেদের গ্রাম থেকে নিয়ে যায়। মেয়েটার নাম খুশি। কিন্তু মেয়েটির দুমাসের ওপর হয়ে গেল তার বাড়িতেও ফেরেনি এদিকে এনজিওর কেউ মেয়েটাকে এনজিওতে কাজ করতে দেখেনি। কেবলমাত্র একদিন দেখেছিল একজন মৃণালের সাথে। এখন এই খুশির কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ও কোথায় আছে কীভাবে আছে কিছু ট্রেস করা যাচ্ছে না। ওর বাড়িতেও ফোন বহুদিন করেনি।’
‘তুমি কি এক্সপেক্ট করছ খুশি কোনওভাবে এর সাথে যুক্ত হতে পারে? মানে মৃণাল সেইরকম কিছু কাজ করে থাকতে পারে?’
‘হতে পারে। আবার এটাও হতে পারে যে খুশি নিজেই অনেক বড় বিপদে আছে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, আর একটা তথ্য পেয়েছি স্যার!’
‘হ্যাঁ বলো!’
‘এনজিওর নাম বললে কিছুটা বুঝতে পারবেন। যুব কল্যাণ সমিতি!’ ডিসিডিডি কী যেন একটা মনে করার চেষ্টা করেন। হঠাৎ করে উনি থম মেরে যান। দ্বৈতা বুঝতে পারে ওঁর মনে পড়ে গেছে।
‘হ্যাঁ স্যার অরণ্য গুহ! উনি যুক্ত ছিলেন এর সাথে। উনি এই এনজিওর একজন বড় শেয়ার হোল্ডার। নিশ্চয়ই দেবেশ স্যার ওখানেও কিছু ইনফরমেশন কালেক্ট করেছিলেন যেহেতু উনি যুক্ত ছিলেন। এবং উনি ভালো করেই জানেন যে অরণ্য গুহ এই এনজিওর সাথে যুক্ত ছিলেন। ‘
‘তাহলে তুমি কী বলতে চাইছ…’ বর্মন স্যার দ্বৈতার দিকে তাকান।
‘আমি বলতে চাইছি অরণ্য গুহ মার্ডার কেসটার সাথে এটা রিলেটেড!’
‘কিন্তু তোমার কেস আর ওর কেসটা কিন্তু ডিফারেন্ট!’
‘স্যার আপনি একটু আমার কথাটা শুনুন। এখানে যুক্ত থাকার জন্য আমি ওনার নাম বলছি না। ওনার মাডারের প্যাটার্নটাও দেখুন। সেই ছুরির ব্যবহার, সেই সামনের দিকে একটা স্ট্রোকে মার্ডার। মানছি যে বেশ কয়েকবার স্টাবিং হয়েছিল। আর মার্ডার টাইমিংটাও ডিফারেন্ট। ভোরের দিকে। কিন্তু স্যার অরণ্য গুহকে ভোরবেলা ছাড়া অন্য কোনও সময় একা পাওয়া সম্ভবও ছিল না।’
‘শুধু ছুরি দিয়ে মার্ডার হয়েছে বলে আর এনজিওর সাথে যুক্ত হয়েছে বলে…’
‘স্যার উনি যে এনজিওর সাথে যুক্ত ছিলেন সেই এনজিওর ভেতরে বিশাল বড় একটা গন্ডগোল আছে। এটা বোঝা যাচ্ছে। আপনি ভাবুন ওই এনজিওর একজন এমপ্লয়ি খুন হয়েছে। সেই খুন আমার কেসের সাথে রিলেটেড। এবং সেই এনজিওতে কাজ করবে বলে একটি মেয়ে এসেছিল গ্রাম থেকে মৃণালের সাথে। প্লিজ আমাকে একটু সুযোগ দিন। অরণ্য গুহ লিঙ্কটাকে যদি আমরা মিস করে যাই তাহলে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কেসটা সলভ হবে না স্যার। প্লিজ! প্রয়োজনে আমি আর দেবেশ স্যার একসাথে হ্যান্ডেল করতে পারি। আমার জাস্ট ইনফরমেশন লাগবে স্যার। প্লিজ আমাকে একটু পারমিশন দিন।’
ওর প্রতি বর্মন স্যার ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। কী যেন ভেবে নিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাকে এক্ষুনি কেসের চার্জ দিতে পারব না। তুমি প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন ওর কাছ থেকে কালেক্ট করো। যদি তুমি সেরকম কিছু প্রুফ করতে পারো তখন এই কেসের চার্জ আমি তোমাকে দেব। অবশ্য দেবেশ তোমার সাথে থাকবে যদি তুমি চাও!
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!’ দ্বৈতার মুখে হাসি ফোটে।
(২৪)
দ্বৈতা হাতে ফাইলটা নিয়ে একবার আড়চোখে দেবেশ স্যারকে দেখে নেয়। কেসে মাথা গলানোর জন্য ভদ্রলোক প্রচণ্ড অখুশি তা ভালই বুঝতে পারছে ও। দ্বৈতা ফাইলটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে দেখে দেবেশ অধিকারী বলেন ‘তোমার মনে হয় এই দুটো ইন্টারলিঙ্কড? সিরিয়ালকিলার কেসটা এই মুহূর্তে কলকাতাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু এটা ওটার সাথে লিঙ্কড না আই থিঙ্ক।’
দ্বৈতা ফাইল থেকে মাথাটা তুলে দেবেশ অধিকারীর দিকে তাকিয়ে বলে ‘আপনার কী মনে হয় স্যার? অরণ্য গুহকে কে মার্ডার করেছে?’
‘দেখো আমি যা বুঝতে পারছি! সে কোন কন্ট্রাক্ট কিলার তো নয়। একটা ক্লু পেয়েছি এর মধ্যে। একটা পলিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল আছে। ইনভেস্টিগেশনে যা জানতে পেরেছি ভদ্রলোক লাস্ট মোমেন্টে ডিসিশন নিয়ে নিয়েছিলেন রুলিং পার্টির হয়ে খেলবেন এবং এইবারের রুলিং পার্টির বেশ ভালো একটা পজিশন হয়ে যাচ্ছিল। অপজিশন পার্টির কাছে কিন্তু এর খবর ছিল।’
দ্বৈতা অল্প হেসে বলে, ‘স্যার এবার আর রাজনীতির গন্ডগোল নয়। সত্যি অন্য সমস্যা!’
‘মানে?’ দেবেশ অধিকারীর ভুরু কুঁচকে যায়। হাতে ধরে রাখা ফাইলটার একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কাগজটা বের করে দ্বৈতা দেবেশ অধিকারীর হাতে দিয়ে বলে, ‘একদম একই মাপের যে ছুরি দিয়ে অন্য খুনগুলো করা হচ্ছিল একদম সেই রকমই একটি ছুরিতে এই ঘটনাটা হয়েছে। তাহলে ছুরিও একই আর খুনিও একই হতে পারে না?’
দেবেশে স্যারের চোখ কপালে ওঠে। উনি দ্বৈতাকে বলেন, ‘তোমার রিপোর্টগুলো?’
দ্বৈতা ওর মোবাইল থেকে একটা ছবি বের করে ওঁর সামনে ধরে ‘দেখুন এই রিপোর্টে ছুরির যা ডেসক্রিপশন আর আপনার রিপোর্টে মাডার ওয়েপেনের যা ডেসক্রিপশন—দুটো একই।’ দেশের অধিকারী বুঝতে হয়তো অনেক কিছুই পেরেছেন কিন্তু মানতে একটু নারাজ। তিনি নিজের ফাইলটা দ্বৈতার হাত থেকে নিয়ে বলেন, ‘এর থেকে কি এটাই প্রমাণিত হয় যে কেস দুটো একই হতেই পারে?’
‘না শুধু এটা কেন? এনজিও মিলে যাচ্ছে। খুনের প্যাটার্নও অনেকটা মিলে যাচ্ছে। এর পরেও কি আপনার মনে হয় খতিয়ে দেখা উচিত নয় যে কেসটা ইন্টার লিঙ্কড কি না?’
লোকটা আর একটাও কথা বলে না। দ্বৈতা ফাইলটা পুনরায় ওঁর হাত থেকে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘরটা থেকে। তারপর সোজা ডিসিডিডির রুমে এসে নক করে। পারমিশন পেতেই ভিতরে ঢুকে আসে। তারপর ফাইলটা সামনে মেলে ধরে। তার সামনে আগেই রাখা ছিল দ্বৈতার ফাইলটা। দুটোর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট খুলে দ্বৈতা বর্মন স্যারকে বলে, স্যার আমি কি কিছু হলেও প্রুফ করতে পেরেছি যে আমার ভাবনায় কিছু পারসেন্ট হলেও সম্ভাবনা আছে?’
রিপোর্টগুলো ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিলেন ভদ্রলোক। আর পরমুহূর্তেই ওঁর মুখের ভাব পাল্টে গেল। উত্তেজিতভাবে বলেন, ‘আমার তরফ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা তুমি পাবে। অ্যান্ড ইফ ইউ ওয়ান্ট তোমার যার যার হেল্প লাগবে তারা প্রত্যেকে তোমাকে এই কেসে হেল্প করবে।’
দ্বৈতার মনের ভেতরটা কেমন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ও যে ঘুরপথে সেই অরণ্য গুহতেই মিশবে এটা ও ভাবতেই পারেনি! ওর মনে হচ্ছে এটাই ওর জীবনের সবথেকে বড় পরীক্ষা। নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, এই সাংঘাতিক আর অদ্ভুত খুনগুলোর কিনারা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।
ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে একটা ফোন করে কাকে যেন প্রশ্ন করে ‘যে নাম্বারটা পাঠিয়েছিলাম তার কল ডিটেলসটা পাওয়া গেছে?
ওই পাশ থেকে উত্তর আসে, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম কাজ চলছে। আজ সন্ধের মধ্যেই আপনি পেয়ে যাবেন।’
‘ভেরি গুড!’ কথাটা বলে ফোনটা কেটে দেয় দ্বৈতা।
***
ডিপার্টমেন্টেই নিজের রুমে বসে আছে দ্বৈতা। ওর মাথা নিচু। চোখটা বন্ধ। দু’হাত মুঠো করে জড়ো করে কপালে ঠেকানো। গভীর চিন্তায় মগ্ন। ঠিক এমন সময় অনিকেত এসে হাজির হয়, ‘ম্যাম আসব?’ মাথাটা তুলে দরজার দিকে তাকায় দ্বৈতা। তারপর মাথা নেড়ে অনুমতি দিয়ে বলে, ‘খুশির ব্যাপারে কোনও আপডেট পেলে?’
‘না ম্যাম! ওই মালিক লোকটা বেশ ধূর্ত। কিছুতেই মুখ খুলছে না। শুধু সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে বলছে, আমার মিটিং আছে… আমাকে আপনি ডিস্টার্ব করতে পারেন না…খুশির নাম শুনে বলছেন কে খুশি কে হাসি আমি অত বলতে পারব না… আমি এই এনজিওর ওনার… আমার কাছে হাজার হাজার এমপ্লয়ি আছে… শুধু এই বিজনেস নয়, অন্য বিজনেসেও হাজার হাজার এমপ্লয়ি… সকলের নাম যদি আমাকে মনে রাখতে হয় তাহলে খুব মুশকিল! উনি এটাও বলেন যদি নাম না থাকে রেজিস্ট্রারে, তাহলে সে কোনওদিন ওখানের এমপ্লয়ি ছিল না। ওর ব্যাপারে কিছু বলাও সম্ভব নয়।’
‘একটা মেয়ে কর্পূরের মতো উবে যেতে পারে না! হয় তাকে মেরে ফেলা হয়েছে অথবা সে নিজে কোথাও পালিয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় খুশির ছবি সার্কুলেট করে দাও। ওকে খুঁজে পেতে হবে আমাদের। কেউ না কেউ নিশ্চয়ই দেখেছে। শিয়ালদা স্টেশন থেকে বিভিন্ন বাস রুট সর্বত্র ছড়িয়ে দাও। আর অরণ্য গুহর বাড়িতে গিয়ে দেবেশ স্যার যা ইনফরমেশন এনেছেন তার বাইরে আর কিছু ওনার সম্পর্কে ওনার ফ্যামিলিও জানে বলে আমার মনে হয় না। লোকটা নিজের ইমেজ যা দেখায় তার বাইরে কিছু তো আছে!’ দ্বৈতার কথাটা শেষ হতেই দরজার বাইরে আবার নক হয়। ডিপার্টমেন্টের আরেকজন সহকারী এসে উপস্থিত হয়েছে। দ্বৈতা তাকে অনুমতি দিতে সে ভিতরে ঢুকে আসে। তারপর কয়েকটা কাগজ হাতে দেয়।
‘ম্যাম আপনি যে নাম্বারটা দিয়েছিলেন। এই কাগজে লাস্ট দু’মাসের পুরো কল রেকর্ড আছে। ইনকামিং আর আউটগোয়িং। আর ম্যাম আপনি যে আরেকটা নাম্বার দিয়েছিলেন সেই মৃণালের নাম্বার! ওটা থেকে সত্যিই কল এখানে এসেছিল কয়েকবার। আর আপনি যে ডেটটা বলেছেন সেই সময়ের একটা নাম্বার পাওয়া গেছে। এই যে!’ বলে একটা পেন্সিল দিয়ে মার্ক করে দেয় ছেলেটা। দ্বৈতা সেই নাম্বারটা ভালো করে দেখে। তারপর বলে ‘নাম্বারটা অন আছে?’
‘সুইচড অফ! আমরা করে দেখেছি।’
‘তাহলে এই নাম্বারটার ডিটেলস বের করো। কার নাম্বার, নাম্বারটার লোকেশন সমস্ত কিছু আমার চাই অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল।’
‘ওকে ম্যাম।’ কথাটা বলে ছেলেটা বেরিয়ে যায়।
‘ম্যাম এই খুনের উদ্দেশ্যটা কী বুঝতে পারছি না। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি যে ও যাদেরকে সিলেক্ট করেছে তাদের সাথে ওর অবশ্যই লিঙ্ক আছে।’
অনিকেতের কথা শুনে দ্বৈতা আবার ওর বোর্ডটার কাছে যায়। তারপর সেখানে একটা মার্কার দিয়ে কিছু লিখতে থাকে। আর বলতে থাকে, ‘বিপ্লব যে ক্লিনিকের সাথে যুক্ত সেই ক্লিনিকের সাথে ইন্ডিরেক্টলি লিসা এবং রতন যুক্ত। আবার এরা পেশেন্টদেরকে এই ক্লিনিকে পাঠাত। নিশ্চয়ই বিপ্লব তাদেরকে হ্যান্ডেল করত। বা তাদেরকে আইডেন্টিফাই করত! যা খুশি হতে পারে। এদের সবার থেকে আলাদা হচ্ছে অরণ্য গুহ, মৃণাল আর খুশির কেস। এই তিনজন ক্লিনিকের সাথে যুক্ত আর এই তিনজন টোটালি আলাদা। এনজিওর সাথে যুক্ত। এবং বিষয়টা এরকম দাঁড়াচ্ছে যে মৃণাল খুশি সহ অনেককেই নিয়ে আসে এই এনজিওতে কাজের জন্য বেশ! অরণ্য গুহ সেই এনজিওর একজন ভালো রকমের শেয়ার হোল্ডার অরণ্য গুহ খুন হওয়ার পরে খুশি আসে কলকাতায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খুশি কোথায়? এই যে ছ’টা নাম এখানে উঠে আসছে তার মধ্যে পাঁচজন খুন হয়েছে আর খুন একজনই করেছে। আর একজন মিসিং! ‘
‘তাহলে খুনিই কি খুশিকে সরিয়ে রেখেছে?’ অনিকেত প্রশ্ন করে। দ্বৈতা মাথা নাড়ে। বলে, ‘হতে পারে। কিন্তু এরকম সম্ভাবনা সত্যিই আছে কিনা আমি জানি না।’
‘আজব কেস। অদ্ভুতভাবে এনজিও, ক্লিনিক সব মিলে যাচ্ছে আবার মিলছে না। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। পরিষ্কার হলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
‘বাকি ক্লিনিকগুলো নয় তেমন… তবে নিউ লাইফ সত্যিই একটু অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে। পিছনের দিকে ওদের কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। একটা লিফট আছে পেছনের দিকে যেটা কিনা যায় একমাত্র একটি ওটিতে। ওদের কিন্তু আরও দুটো ওটি আছে। কিন্তু ওই সেজেন্ড ফ্লোরের ওটির মধ্যে আরেকটা ছোট্ট রুম। আমার এই নিউ লাইফ কেমন যেন ভালো ঠেকছে না।’
‘অথচ ম্যাম ওখানকার পেশেন্ট পার্টিদের সাথে যা কথা বলে বুঝলাম সবাই তো ডঃ দেবরায়কে ভগবান বলে। নাকি যাদের একদম বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদেরও বেবি হয়েছে ওনার আন্ডারে।’
‘হ্যাঁ! ওই দুটো কাপল লিসা যাদেরকে পাঠিয়েছে আর রতনেরটার সাথে আমি একটু কথা বলতে চাই। তুমি তিনজনকে ডেকে পাঠাও তো। ফিমেলদের ডাকার দরকার নেই। ওনারা প্রেগন্যান্ট। কেবলমাত্র ওদের হাজব্যান্ডদের ডাকো।’
