Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
মায়াজাতক – অমৃতা কোনার

মায়াজাতক – ২৫

(২৫)

‘আপনাদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আমি আপনাদের ডিস্টার্ব করতে চাইনি কিন্তু কিছু কথা যা আমি কেবলমাত্র আপনাদের থেকেই জানতে পারব এবং সেটা আমার কেসে খুব হেল্প করবে। আপনারা যদি প্লিজ কোঅপারেট করেন তাহলে আমার খুব উপকার হয়।’ দ্বৈতা নম্রভাবে কথাটা বলল ওর সামনে বসে থাকা তিনজন মানুষের উদ্দেশ্যে। এদের মধ্যে একজন হল অভীক আর দু’জন নিলয় এবং শুভ্র। তিনজনেই মাথা নাড়ে। অভীক বলে, ‘আমি চেষ্টা করব আমার সাধ্যমতো ইনফরমেশন দিতে যতটুকু জানি। বাকি দু’জনও মাথা নেড়ে বলে, ‘আমরাও চেষ্টা করব!’

দ্বৈতা মৃদু হেসে বলে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ! আমার প্রথম প্রশ্ন আপনার কাছে মিস্টার নিলয়। আপনাদের নিউ লাইফের কথা কে জানিয়েছিল?’

নিলয় উত্তর দেয় ‘ওই ড্রিমল্যান্ডের নার্স মেয়েটি… লিসা।’

‘বেশ! আপনি তার কথাতেই নিউ লাইফে যান।’

‘হ্যাঁ, উনি আমাদের বলেছিলেন ওনার বোনের বাচ্চা হয়েছে ওই ক্লিনিকে। ওনার বোনের নাকি খুব ক্রিটিক্যাল কেস ছিল। কোনওভাবেই বেবি হচ্ছিল না। সবাই যখন জবাব দিয়ে দেয় তখন এই ক্লিনিকে এসে তার বাচ্চা হয়।’

‘আচ্ছা মিস্টার অভীক, আপনাকেও এই কথাগুলোই বলেছিল না লিসা?’

অভীক মাথা নাড়ে।

‘আপনার ওয়াইফ কি এখন প্রেগন্যান্ট?’

নিলয় বলে ‘হ্যাঁ পাঁচ মাস চলছে!’

‘আর মিস্টার অভীক?’

‘আমার ওয়াইফের এই দুমাস ক্রস করেছে।’

‘আর আপনার শুভ্রবাবু? আপনাকে কে জানিয়েছিল নিউ লাইফের কথা?’

‘ওই যে আগের ক্লিনিকের বাইরে যে চায়ের দোকানটা আছে। ওই দোকানের মালিক।’

‘তার মানে রতন!’

‘এরকমই নাম ছিল ওনার।’

‘আচ্ছা আপনার ওয়াইফ…’

‘আমার ওয়াইফ চার মাসের প্রেগন্যান্ট।

‘বেশ! আচ্ছা ওনার বাইরেও অন্য ডাক্তার আপনারা এতো নিশ্চয়ই কনসাল্ট করেছেন এর মাঝে?’

তিনজনেই মাথা নাড়ে। অভীক বলে, ‘আগে যাঁদের দেখিয়েছিলাম তাঁরা সকলে জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আগে যেখানে গেছিলাম উনি বলেছিলেন প্রথম আইভিএফ আনসাকসেসফুল, আবার ট্রাই করা যেতে পারে। তবে সম্ভাবনা খুব কম। তারপর যখন ইনি সফল করে দেখালেন আর দ্বিতীয় কাউকে কনসাল্ট করিনি।’

নিলয় বলে, ‘আমার ওয়াইফকে পুরোপুরি না করে দিয়েছিলেন। যে কোনওভাবেই পসিবল নয়। আমি তো ডক্টর দেবরায়কে ভগবান মানি। উনি যা করে দেখিয়েছেন তারপর তাঁকে টপকে অন্য কোথাও গিয়ে সাহস দেখাতে পারিনি।’

শুভ্র বলে, ‘আইভিএফ করিয়েছি দু’বার। কোনওভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। ওনারা বলছেন আবার ট্রাই করা যাবে কিন্তু তাতে সাকসেস আসবে কি না বলা যাচ্ছে না। বারবার করেও যদি না হয় তাহলে কী হবে ভেবেই ভয় পাচ্ছিলাম। আমার স্ত্রী মানসিকভাবে পুরো ভেঙে গেছিল।’

‘আচ্ছা এই নিউ লাইফে যাওয়ার পর আপনাদের প্রত্যেকেরই ওয়াইফ কি ফার্স্ট টাইমে কনসিভ করেন?’

‘হ্যাঁ!’ সকলেই সম্মতির সুরে মাথা নাড়ে।

দ্বৈতা বিড়বিড় করে বলে, ‘এমন কী ম্যাজিক আছে ওনার কাছে? যেগুলো সম্ভব নয় সেটাও উনি সম্ভব করে দিচ্ছেন! এবং খুব ভালো মানের একজন ডাক্তার!’

‘আচ্ছা নিউ লাইফকে আপনাদের কেমন মনে হয়? ওখানে কি আপনাদের অড কিছু লেগেছে?’

নিলয় এবং শুভ দু’জনেই এক বাক্যে বলে, ‘না না আমার তো সেরকম কিছু মনে হয়নি!’ অভীক একটু চুপ করে যায়। তারপর বলে, ‘দেখুন আমারও তেমন কিছু মনে হয়নি। ঠিক ওর কি না জানি না তবে ওনাদের ট্রিটমেন্ট প্রসিডিওর আর পেশেন্ট হ্যান্ডেলিং অন্যরকম। একটু অন্যরকম লেগেছে আমার। আমি খারাপ বলছি না!’

দ্বৈতা একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এইবার কি কিছু ক্লু পাবে ও! প্রশ্ন করে ‘কী রকম?’

‘তেমন সিরিয়াস ব্যাপার কিছুই নয়। ওনারা পেশেন্ট ডকুমেন্টস মানে সব রিপোর্ট সবকিছু নিজেদের কাছে রেখে দেন। এটা ওনাদের প্রসিডিওর। আর অন্য কোনও ডাক্তার এই মুহূর্তে দেখানো বারণ আছে। এটা যদিও ওনার কথা অনুযায়ী ঠিকই। যদি অন্য ডক্টর অন্যরকম মেডিসিন বা ট্রিটমেন্ট শুরু করেন তখন সময়া হতে পারে। মেডিসিন ওনাদের থেকে নিতে হয়। আর টেস্টও ওখানেই করাতে হয়। বাইরে করা বারণ।’

শুভ্র বলে, ‘হ্যাঁ এটা ওনাদের নিয়ম আমারও প্রথমে একটু অদ্ভুত লেগেছিল। তারপরে বুঝলাম এটা ওনাদের বিজনেস। তা সেটা মেডিসিন হোক বা টেস্ট হোক নিজেদের কাছেই রাখতে চান। আর প্রেগন্যান্সি যখন এল আমার ওয়াইফের তখন আর মনে কোনও দ্বিধা রাখিনি। উনি কিন্তু ট্রিটমেন্ট শুরুর আগেই সৎভাবে সব টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস বলে দেন। যে রাজি হয় সেই কন্টিনিউ করবে এমনটাও উনি বলে দেন।’ দ্বৈতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কিছু ক্লু পেয়েছি ঠিকই। কিন্তু সবাই তো ওই ডাক্তার আর ক্লিনিকের নামে সুখ্যাতিই করে।

‘বেশ ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই। তবে আউট অফ কনটেক্সট একটা কথা জিজ্ঞাসা করব। আপনারা অবশ্য বলতে পারেন যে আমি যা যা প্রশ্ন করছি এগুলো আমার কেসের সাথে কীভাবে রিলেটেড! কিন্তু আপনার তো জানেন পুলিশদের অনেক সময় অনেক রকমের প্রশ্ন করতে হয়। কেসটাকে বোঝার জন্য বা খুনির মোটিভকে বোঝার জন্য। এই লাস্ট একটা করছি কাইন্ডলি আপনাদের একটু মতামতটা দেবেন।’

তিনজনেই একে অন্যের মুখ চেয়ে বলে ‘হ্যাঁ বলুন।’

‘আপনারা যুব কল্যাণ সমিতি নামে কোনও এনজিওর কথা জানেন? কোনওভাবে?’

সকলেই উত্তর দেয় ‘না তো!’

‘আচ্ছা! আপনার এবার আসতে পারেন।’

তিনজন চলে যেতেই দ্বৈতা অনিকেতকে বলে, ‘তুমি নিউ লাইফে যাও। ওখানে একটু সবাইকে জিজ্ঞেস করো তো ওরা কেউ এই এনজিওর কথা জানে কি না! আমি একটু স্যারের সাথে কথা…’ দ্বৈতার কথা শেষ হওয়ার আগেই ওর মোবাইল বেজে ওঠে।

ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশে শোনা যায়, ‘ম্যাম নাম্বারটা ট্রেস করা গেছে। রিচা দাস নামে একজনের নামে রেজিস্টার্ড।’

‘লোকেশন?’

‘আপনাকে হোয়াটঅ্যাপ করেছি এইমাত্র।’

দ্বৈতা দ্রুত হাতে ফোনটা কেটে হোয়াটঅ্যাপ চেক করে। তারপর স্বগোক্তি করে বলে, ‘হাইওয়ের দিকে?’

‘ম্যাডাম খুশি কি এখানেই আছে?’ অনিকেত প্রশ্ন করে।

‘সেটা জানি না। তবে খুশি যার ফোন থেকে ফোন করেছিল সেই ফোনটা এখানে আছে। আমাদের যেতে হবে।’

***

লোকেশনটা হাইওয়ের উপর। হাইওয়েগুলো সাধারণত একটু ফাঁকা ফাঁকাই হয়। টুকটাক ধাবা আর হোটেল থাকে। কেউ কেউ শখে বাংলো বাড়ি বা বাগানবাড়িও বানিয়ে রাখে। তবে সাধারণত মানুষজন এখানে বাস করে না। কিন্তু দ্বৈতার পাওয়া এই রিচা দাসের তথ্য অনুযায়ী সে এখানে বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই আছে। তারও আগে এখানে ছিল কি না সেটা জানা সম্ভব হয়নি। আজকাল প্রযুক্তির দরুন মোবাইল টাওয়ারের হেল্প নিয়ে দিব্যি অনেক ইনফরমেশন কালেক্ট করা যায়। এখন শুধু দেখার ওই লোকেশনে আছেটা কী? কারওর বাড়ি? এই রিচা দাস কে? ওর মোবাইলটা কি ওখানে আছে? নাকি রিচা দাসও সেখানে আছে? আর খুশি? খুশি ওখানে থাক বা না থাক, এই রিচা দাস বা এই মোবাইলের অধিকারী যে সে নিশ্চয়ই জানে খুশি কোথায় আছে!

কথাটা ভাবতে ভাবতে দ্বৈতার গাড়ি হাইওয়ের একটা ধারে এসে দাঁড়ায়। দ্বৈতা আর অনিকেত ছাড়াও ওদের সাথে আরও দু’জন অফিসার এসেছে। ওদের বলে রেখেছে যদি সেরকম প্রয়োজন হয় তাহলে আরও টিম ডাকতে হবে, সেই এমার্জেন্সি বুঝে ওরা যেন কল করে দেয়। টিম রেডি আছে। দ্বৈতা ড্রাইভারকে বলে, ‘গাড়িটা এখানেই থাক’। বাড়িটা দূর থেকেই দেখে দ্বৈতা। এই বাড়িটা বাস্তবে একটা বাগান বাড়ি! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এলাহি ব্যাপার স্যাপার। সামনে বিশাল বড় বাগান। একদম একটা বাংলো স্টাইলে তৈরি। সুইমিং পুলও আছে। দূর থেকে পুরোটাই বোঝা যাচ্ছে। দ্বৈতা সকলের উদ্দেশ্যে বলে, ‘প্রথমে আমি ভিতরে যাব। তোমরা তিনজন বাইরে থাকবে। দু’জন ব্যাকে চলে যাবে একজন ফ্রন্টে থাকবে। সাধারণত এরকম কেসে ব্যাক দিয়েই বেরোনোর চেষ্টা করে ওরা। আর ব্যাক ক্লিয়ার পেলে প্ল্যান চেঞ্জ হতে পারে। অ্যালার্ট থাকবে। দেখা যাক এখানে শুধু রিচা দাস আছে না আরও কেউ আছে!’

বাকি তিনজন মাথা নাড়লে দ্বৈতা গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তারপর লুকিয়ে লুকিয়ে এক ধারের পাঁচিলের পাশে এসে দাঁড়ায়। ও বোঝার চেষ্টা করে যে ঠিক কোন দিক দিয়ে এই বাড়ির মধ্যে ঢোকা সম্ভব। চারিদিকে বেশ বড় পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সামনের গেটে ঢোকাটা বোকামোর কাজ হবে। এত বড়ো বাড়িতে নিশ্চয়ই সিসিটিভি ক্যামেরা আছে! ভেতরে সেরকম লোকজন থাকলে তারা সতর্ক হয়ে যাবে। ওরাও অ্যাটাক করতে পারে। তাই দ্বৈতা কোথা থেকে ঢুকবে এটা ভেবে পাচ্ছিল না। হঠাৎ ওর নজরে পড়ে পিছনের দিকের পাঁচিলের পাশে একটা জায়গায় একটা লম্বা গাছ আছে। সেই গাছে উঠতে পারলে পাঁচিলের এক্সেস তো পাওয়া যাবে এছাড়াও গোটাটা দেখাও যাবে। দ্বৈতা ধীর পায়ে সেই গাছটার কাছে এগিয়ে যায়। তারপর কষ্টেশৃষ্টে সেটার উপর চড়ে। একটা ডালের মধ্যে পাতার আড়াল দিয়ে দ্বৈতা দেখে বিশাল বড় লনটার মধ্যে দুটো মুশকো মতো লোক। দেখলে বোঝা যায় এরা বাউন্সার টাইপের। আর বিল্ডিংয়ের পিছন থেকে তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। দ্বৈতার মনে হয় এরকম একটা বাংলোতে বাউন্সারের মতো লোক রেখে দেওয়ার কারণ কী? খুশি যেদিন ফোন করে সেটা এখান থেকেই ফোন করেছিল। অন্তত লোকেশন তো তাই বলছে। তার মানে খুশিকে কি এখানে আটকে রাখা হয়েছিল? তাহলে কি এখনও খুশি এখানে আছে? আর খুশিকে কেন আটকে রাখা হয়েছে? কথাগুলো ওর মাথায় আসতেই ও দেখে একটা ষন্ডামার্কা লোক এই বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে ওই লোক দুটোর কাছে গেল। তারপর ওদেরকে কী বলতেই ওরা মাথা নেড়ে ভিতরে ঢুকে গেল। দ্বৈতা বুঝল ভেতরে নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। এটাই সুযোগ ওকে এখনই এন্ট্রি নিতে হবে। দ্বৈতা কানে লাগানো ব্লুটুথে জানিয়ে দেয়, ‘এন্ট্রি। সবাই এদিকেই এন্ট্রি! কুইক

দ্বৈতা ওই দেওয়াল থেকে লাফ দেয় কার্নিসে। তারপর সেখান থেকে খুব ধীরে নেমে আসে। বেশি আওয়াজ করা যাবে না। ও দেখে এই জায়গাটা মোটামুটি একটা ক্যামেরা দূরের থেকে রেঞ্জের মধ্যে পড়ছে। তাছাড়া আর কোনও ক্যামেরার ফেস এদিকে নেই। এদিকে অন্ধকারও হয়ে এসেছে। তার মানে সেভাবে ক্যামেরায় আসছে না ও। এলেও কয়েক সেকেন্ডে মিলিয়ে যেতে হবে। ও দ্রুতগতিতে ওখান থেকে সরে বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে যতটা সম্ভব সিঁটিয়ে যায়। একটা আবার ডিরেকশন দিল ‘এক্স্যাক্ট আমার জায়গাটায় এখানে সিসিটিভি রেঞ্জ সেরকম নেই। একসাথে এন্ট্রি হবে।’

ও বোঝে এখন যখন ভিতরে কিছু একটা ঘটেছে। ওরা সেই কাজে ব্যস্ত। সিসিটিভি এই মুহূর্তে যদি কেউ চেক যদি করে তাহলেও তার সবাইকে খবর দিতে আর ওদের তৎপর হতে সময় লাগবে। সকলে দ্বৈতার মতোই ভিতরে ঢুকে পড়ে। তারপর ওরা খুব সন্তর্পণে এগিয়ে যায় লক্ষ্যের দিকে। বিশাল কাঠের দরজাটা অল্প ফাঁক করে খোলা। দ্বৈতার নির্দেশ মতো বাকি তিনজন পজিশন নিয়ে নেয়। আড়াল থেকে দ্বৈতা লক্ষ্য করে ভিতরে কিছু একটা নিয়ে একটু উত্তেজিতভাবে কথা চলছে। একজন মহিলা বলছে, ‘কী হয়েছে ডক্টর?’

‘তাড়াতাড়ি! ম্যাডাম আজকেই ডেলিভারি করে দেবেন। এটাকে এখন ফেলে রাখলে যেকোনও দিন এমার্জেন্সি ডেলিভারি করতে হতে পারে। আর এখন কোনও রিস্ক নেওয়া যাবে না!’

‘ডেলিভারি!’ শব্দটা নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকে দ্বৈতা এখানে হচ্ছেটা কী!

মহিলাটা বলে ‘এটা হয়ে গেলে বাকিগুলো এখন তাও কিছু মাস করে দেরি আছে।’

‘হ্যাঁ। সবকিছু ততদিনে থিতিয়ে যাবে।’ ডক্টর বললেন।

মহিলাটা উপরের দিকে উঠে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা মেয়েকে ধরে ধরে নিয়ে এল। মেয়েটাকে দেখে চমকে যায় দ্বৈতা। কী অবস্থা মেয়েটার! দেখে কী ভীষণ অসুস্থ লাগছে। মেয়েটা প্রেগন্যান্ট! একটা প্রেগন্যান্ট মেয়েকে এরা এভাবে রেখেছে কেন? প্রশ্নটা দ্বৈতা সহ বাকি তিনজনের মনেও উঁকি দিচ্ছে। ওই বাউন্সার টাইপের লোকদুটো মেয়েটাকে সিঁড়ি থেকে ধরে নিল। তারপর ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিল। এদের মধ্যে একজন আর ডাক্তার ওই মেয়েটিকে ধরে বাইরের দিকে নিয়ে আসছে। মেয়েটা এইবার কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘ছেড়ে দিন আমাকে। আমি আর পারছি না! বাড়ি যাব! আমি বাড়ি যাব! এভাবে আর পারছি না!’ ওই মহিলা পিছন থেকে ছুটে এসে মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে টান দেয়। তারপর বলে, ‘আর কতবার বলব এসব ন্যাকা কান্না কেঁদে লাভ নেই। বলেছি না এসব করলে বাচ্চাটার ক্ষতি হবে। ওকে ঠিক রাখার জন্যই তোর ন্যাকামো সহ্য করেছি। নইলে কবে…’

‘আহ্! প্লিজ! ওকে ছাড়ুন। ওর আর কিছুক্ষণের মধ্যে ডেলিভারি। ওর শরীর খারাপ হলে তখন কিন্তু ডেলিভারিতে সমস্যা হবে। আর তখন কিন্তু আপনিই সমস্যায় পড়বেন।’

ডাক্তারের কথাটা শেষ হতেই মহিলাটা ভয়ে মেয়েটার চুলটা ছেড়ে দেয়। তারপর ওই বাউন্সার দুটোর একটার উদ্দেশ্যে বলে, ‘আজ তুই যা ওদের সাথে। ও পাহারায় থাকুক।

সেই লোকটা মাথা নেড়ে ডাক্তার আর মেয়েটাকে নিয়ে বাইরের দিকে এগোতেই দ্বৈতা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে যায়। সাথে বাকি তিনজনও চারজনের রিভলভার তাক করা আছে ওদের দিকে।

‘এত তাড়া কিসের? অনেকক্ষণ ধরে অনেক নাটক দেখলাম। আর একটাও নাটক সহ্য করব না।’ দ্বৈতাদের আচমকা দেখে সকলেই কয়েক সেকেন্ড থমকে যায়। তারপর একটা বাউন্সার ওর দিকে ছুটে আসতে থাকে। দ্বৈতা তার পায়ের একদম পাতায় জুতোর সাইড ঘেঁষে একটা গুলি করে। ভয়ে ছিটকে যায় লোকটা। পায়ের পাতায় গুলিটা ছুঁয়ে গেছে। রক্ত বেরিয়ে এসেছে।

‘এটা ট্রায়াল ছিল। গুলি জাস্ট ছুঁয়ে গেছে। পরের গুলিটা একদম মাথায় করব। আর এক পাও কেউ যদি নড়েছে।’ কথাটা বলতে বলতে দ্বৈতা ভিতরে আরও ঢুকে পজিশন নিয়ে নেয়। সাথে বাকি তিনজনও দ্বৈতা মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলে, ‘ভয় পাবে না একদম। চলে এসো এদিকে।’

মেয়েটা এতদিনে যেন প্রাণ ফিরে পেল! দুর্বল শরীরটাকে যতটা সম্ভব দ্রুত পায়ে টেনে নিয়ে সে দ্বৈতার সামনে দাঁড়ায়। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমাকে বাঁচান এই শয়তানগুলোর থেকে। এরা খুব খারাপ।

‘চিন্তা কোরো না। আচ্ছা রিচা নামে কাউকে চেন?’

মেয়েটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় মহিলাটিকে, ‘ওই যে রিচা ম্যাডাম!’

দ্বৈতা তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘খুশি কোথায়?

রিচা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, ‘জানি না!’

দ্বৈতা একটা সজোড়ে চড় কষিয়ে বলে, ‘জানিস এবার?’

‘উপরে আছে।’ কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দেয় রিচা। চড় সে মেরেছে এতদিন। এই প্রথম পুলিশের কড়া হাতের চড় খেয়ে পুরো চোখের জল বের করে ফেলেছে।

দ্বৈতা অনিকেতকে বলে উপরে গিয়ে দেখতে। অনিকেত সেই কথা মতো উপরে যেতেই দেখে বেশ কয়েকটা ঘর আছে এখানে। আর সব ঘরের বাইরে এঁটো বাসন পড়ে আছে। অনিকেত প্রথম ঘরের দরজায় তালাটা গুলি মেরে খুলে দেয়। আর তখনই ভিতর থেকে গুটিশুটি মেরে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। তাকে দেখতেই অনিকেত হাঁক দেয়, ‘ম্যাম এখানে অন্য মেয়েও আছে।’

কথাটা শুনতেই দ্বৈতা রিচাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কটা মেয়ে আছে?’…

‘এখন ছ’টা।’

‘এখন ছ’টা মানে আগেও ছিল। কী করিস এদের দিয়ে?’

‘আমি কিছু করি না। আমি শুধু ইনস্ট্রাকশন ফলো করি। এদের দেখাশোনা করি।’

‘সেটা তো দেখিতেই পাচ্ছি।’

‘তোরা কী প্রেগন্যান্ট মেয়েদের ধরে আনিস?’

এইবার ওই মেয়েটা বলে, ‘না ম্যাম আমরা কেউ প্রেগন্যান্ট ছিলাম না। ওরা জানি না কীভাবে কী করেছে আমাদের সাথে। জানি না এটা কার সন্তান!’

দ্বৈতা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রিচাকে, ‘কী করেছিস এদের সাথে?’

‘আইভিএফ!’

‘হোয়াট?’চমকে ওঠে দ্বৈতা। আর তখনই দেখে সিঁড়ি দিয়ে অনিকেতের এর সঙ্গে নেমে আসছে কিছু মেয়ে। ওদের সকলেরই অবস্থা একই। সকলেই প্রেগন্যান্ট। চোখমুখের কী সাংঘাতিক অবস্থা! ভয়াবহ দৃশ্য মনে হচ্ছে যেন সবাইকে একসাথে দেখে। ওদের মধ্যেই দ্বৈতা দেখতে পায় সেই মুখটা। খুশি! এই তো মেয়েটা।

দ্বৈতা ডাকে ‘খুশি?’

খুশি জলভরা চোখে তাকায় ওর দিকে। তারপর পরিস্থিতি চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে। ছুটে এসে দ্বৈতার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আ…আপনি আমার নাম জানেন? আ…আমি মায়ের কাছে যাব! প্লিজ প্লিজ…’ দ্বৈতা হেসে ওর মাথায় বাঁ হাতটা রেখে বলে ‘যাবে তো!’ কথাটা শুনে যে কী পরম শান্তি পেল খুশি। মুহূর্তেই তার মুখে হাসি ফুটলো। আর সে জ্ঞান হারিয়ে দ্বৈতার গায়ে ঢলে পড়ল।

(২৬)

‘চিন্তার কিছু নেই তো ডক্টর?’ সুনেত্রা প্রশ্ন করে।

‘না না। তবে খাওয়া-দাওয়া করুন ভালো করে। বেবির ওয়েটগেন আর গ্রোথে কাজে লাগবে।’ কথাটা বলে ডঃ দেবরায় খসখস করে কিছু লিখে কাগজটা অভীকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই ব্লাড টেস্টগুলো করিয়ে নিন আজ এখানে।’

অভীক মাথা নেড়ে বলে, ‘আচ্ছা!’

ডঃ দেবরায় ওঁর টেবিলের বেলটা বাজান। আর তখনই দরজা খোলার শব্দ হয়। উনি অভীককে বলেন ‘যান এই অ্যাটেন্ডেন্ট আপনাদের নিয়ে যাবে ব্লাড টেস্টের জন্য।’

‘দাঁড়ান ডাক্তারবাবু! ব্লাডটেস্ট তো আমি করব আজ! আপনার। দেখতে হবে ওটা মানুষের না কি অন্য কিছুর?’ দ্বৈতা ভিতরে ঢুকে আসে। ডঃ সিমন্তিনী দেবরায় আচমকা ওকে দেখেই চিৎকার করে ওঠেন, ‘একি অসভ্যতা! আপনি এখানে এভাবে…’

‘অসভ্যতার দেখলেন কী? এটা তো সবে শুরু। আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে অরবিন্দ মিত্রর শালিকা! ‘

চমকে ওঠেন ডঃ দেবরায়। অভীক আর সুনেত্রা উঠে দাঁড়ায়। ওরা অবাক হয়ে দেখে দ্বৈতাকে। কী বলছে এই অফিসার? কেন বলছে তাও বুঝতে পারছে না। সুনেত্রা ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে অফিসার?’

দ্বৈতা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনাদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে।’

‘মানে?’ চমকে ওঠে সুনেত্রা। অভীক জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা?’

‘হ্যাঁ!’

‘কী যা তা বলছেন আপনি?’ রাগে ফুঁসতে থাকেন সিমন্তিনী দেবরায়।

‘একদম আওয়াজটা নিচে! আপনার সব কুকর্ম আমার জানা হয়ে গেছে। সবক’টাকে অ্যারেস্ট করেছি। ওরা আপনার জন্যই ওয়েট করছে। চলুন।’

অভীক আর সুনেত্রা চমকে যায়। ওদের কাছে সব অদ্ভুত ঠেকছে। কী বলছেন এই অভীসার তা ওরা বুঝতেই পারছে না। ভয় করছে সুনেত্রার। খুব ভয় করছে।

‘আপনারা জানেন না কী হচ্ছে এই সেন্টারের আড়ালে! কতরকম বেআইনি কাজ এরা করে চলেছে। আর আপনাদের মতো কিছু নিরীহ মানুষকে ঠকিয়ে চলেছে। আপনাদের ইমোশন আর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজনেস করে যাচ্ছে এরা।’ কথাগুলো বলে ডক্টর দেবরায়ের দিকে তাকিয়ে দ্বৈতা বলে, ‘আপনি সত্যিটা বলবেন না আমি বলব?’

মহিলা কিছু উত্তর দেন না। চুপ করে থাকেন

দ্বৈতা বলে, ‘এরা আপনাদের সাথে সিউডোসাইসিসের মতো নোংরা গেম খেলে!’

‘সিউডো… সাইসিস… কী এটা?’ অভীক প্রশ্ন করে।

দ্বৈতা একটু থেমে বলে ‘ফলস প্রেগন্যান্সি।’

‘মানে? কার ফলস প্রেগন্যান্সি?’ অভীক প্রশ্ন করে।

‘আপনার স্ত্রীর এবং এখানে আসা আরও অনেকের!’

‘মানে? আমি প্রেগন্যান্ট না?’ সুনেত্রার পা দুটো টলে যায়। ও ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। ‘আ…আমি প্রেগন্যান্ট। আপনি মিথ্যা কথা বলছেন। আমি ওর হার্টবিট শুনেছি। আমার সেইসব সিম্পটম…’ গলাটা কাঁপছে সুনেত্রার। আর কথা বলতে পারছে না ও। দ্বৈতা বলে, ‘মি. বোস আপনার ওয়াইফকে নিয়ে যান। আর এখান থেকে বেরিয়ে একজন ভালো গাইনোকে কনসাল্ট করুন। শুধু এটুকু জেনে রাখুন আমি সত্যি কথা বলছি। আপনার স্ত্রী এবং আরও অনেক মহিলার মধ্যে এটা ক্রিয়েট করা হয়েছে। আর সেটা ক্রিয়েট করেছেন এই দেবরায়।’

‘আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট নয়? আমাদের সন্তান আসেনি?’

‘এসেছে মি. বোস! আপনাদের সন্তান আছে! কিন্তু আপনার স্ত্রীর গর্ভে নয়। সে বড় হচ্ছে অন্য কারও গর্ভে।’

‘কী? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’ অভীক অস্থির হয়ে ওঠে।

‘আমার সন্তান এই যে এই যে আমার শরীরের মধ্যেই আছে। আছে! তুমি বল না প্লিজ ওনাকে। উনি ভুল বলছেন। আমি প্রতিমুহূর্তে ওকে অনুভব করি। উনি কেন বলছেন সে অন্য কারও শরীরে। কার শরীরে এটা কী করে সম্ভব?’ সুনেত্রা পাগলের মতো করতে থাকে। অভীক কিছুতেই ওকে সামলাতে পারছে না।

দ্বৈতা বুঝতে পারে সুনেত্রার মনের অবস্থা। এমন হওয়াটাই তো স্বাভাবিক! কী অবস্থা এই মানুষগুলোর হবে! ও অভীকের উদ্দেশ্যে বলে ‘আই অ্যাম সরি মি. বোস। কিন্তু আপনাদের সত্যিটা জানাটা খুব জরুরি। আমাকে বলতেই হত!’

‘কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? প্লিজ খুলে বলুন অফিসার। আমাদের মাথা কাজ করছে না। আমার স্ত্রীর অবস্থা তো দেখছেন!

‘বলছি! সব বলছি। আগে এই মহীয়সী মুখ খুলুক!’

‘যা বলার আমার লয়ার বলবে!’

‘লয়ার, জাজ যা খুশি ডাকতে পারেন। কোনও কাজ হবে না। আপনার জামাইবাবুও আমাদের কাছে জামাই আদর পেতে চলেছেন! আরেকজন মানে সো কল্ড সোশালওয়ার্কার অরণ্য গুহও যে আপনাদের সাথে লিঙ্কড সে প্রুফও আমাদের হাতে এসে গেছে। সুতরাং ওপর মহলেও বলে লাভ নেই।’ দ্বৈতার কথা শুনে ডক্টর দেবরায়ের মুখের অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ পালটে যায়। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। পাশের চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে নেন। এতক্ষণের রাগী ও দাম্ভিক মুখটায় মুহূর্তে কালো ছায়া নেমে এল!

‘মি. বোস আপনাদের সন্তান এই ডক্টরের দৌলতে অন্য একজনের গর্ভে বেড়ে উঠছে। এবং সেটা ইললিগালি। ফোর্সফুলি। তারা কেউ ইচ্ছুক নয়। তাদের অজান্তে তাদের শরীরে ইমপ্লান্ট করা হয়েছে এই ভ্রূণ। আপনার স্ত্রীর শরীরে সেটা প্রতিস্থাপন করা হয়নি। আপনার স্ত্রীকে ওষুধ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে সিউডো প্রেগন্যান্সি ক্রিয়েট করা হয় যাতে প্রেগন্যান্সির সমস্ত সিম্পটম দেখা যায়। বাকি মেডিক্যাল ব্যাপারস্যাপার উনিই জানাবেন। আমরা এদের পেশেন্ট লিস্ট নিয়েছি। সবাইকে ইনফর্ম করা হয়েছে। সবাই আসছে। আপনাদের সকলের সামনেই ওনাকে মুখ খুলতে হবে।’

‘ওহ মাই গড! এসব কী বলছেন! আ…আচ্ছা ড্রিমল্যান্ড-এ আমরা গেছিলাম ওখানেও কি?’

‘না ড্রিমল্যান্ড বা অন্য আইভিএফ ক্লিনিকে এমনটা হয় না। সব ক্লিনিক এমন নয়। ওখনে মানুষের সুরাহা হয়। কিন্তু যাদের এক্সট্রিম প্রবলেম থাকে তাদের ওনারা জানিয়ে দেন। হ্যাঁ অনেকেই বিজনেসের জন্য ইচ্ছা করে সেই সব কাপলকে বারবার আইভিএফ করায় আর তারপর জানায় যে পসিবল নয়। আর ওই গেমটারই উলটো গেমটা খেলে এরা। ওই ক্লিনিকেই আপনাদের সাথে দেখা হয় লিসার। যে বেসিক্যালি এই ক্লিনিকের এজেন্ট হিসাবে কাজ করছিল। শুধু লিসা নয়। এমন অনেকেই আছে যারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে এদের এজেন্ট হিসাবে। কী সাংঘাতিক পরিকল্পনা এদের। একদিকে আপনাদের চিট করছে। আর অন্যদিকে গ্রামগঞ্জ থেকে মেয়েদের বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তুলে আনছে। তাদের সারাটা জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে। বাচ্চা তৈরির মেশিন বানিয়ে দিচ্ছে।’

‘আমি সন্তানহীন বাবা-মায়ের কোল ভরিয়ে দিচ্ছি!’ দাঁতে দাঁত চিপে কথাটা বলেন ডক্টর দেবরায়।

‘হ্যাঁ কিন্তু তাদের ঠকিয়ে আর কিছু নিষ্পাপ মেয়েদের জীবন নষ্ট করে! এরা কেউ তো সারোগেসি চায়নি। ইন্ডিয়াতে কমার্শিয়াল সারোগেসি ব্যানড। কেবলমাত্র আলট্রুইসিক সারোগেসি লিগাল। যদি আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু কেউ চায় তবেই পসিবল! আর আপনি সেখানে নামমাত্ৰ অৰ্থ দিয়ে ফোর্সফুলি সারোগেসি করাচ্ছেন? আপনি কোনও সোশালওয়ার্ক করছেন না। ক্রাইম করছেন!’

***

‘নিন এবার নিজের দোষটা স্বীকার করুন। কীভাবে আপনি এই কাজগুলো করতেন?’ ডক্টর দেবরায়ের চেম্বারে দ্বৈতা আর অনিকেত তাকে জেরা করছে। উপস্থিত আছে তার শিকার হওয়া কিছু দম্পতি। সকলের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। কেউ কেউ বিদেশে সেটেল্ড। তাদের নাম্বার চেঞ্জ হয়ে গেছে। তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

‘যাদের প্রেগন্যান্ট হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে না আমি তাদের বিশ্বাস দিই যে আমি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তে তাদের প্রেগন্যান্সি আনতে পারি। অনেক জায়গায় ধাক্কা খাওয়ার পর তাদের মানসিক অবস্থা এমনিতেই দুর্বল থাকে। ওরা যেন তেন প্রকারেণ নিজেদের বাচ্চা চায় আর আমার এজেন্ট দ্বারা এখানে আসে। যখন ওদের আর কোথাও যাওয়ার নেই ঠিক তখনই আমি তাদের ভরসার একমাত্র জায়গা হই। যাতে ওরা আমার সব কথা শোনে। মানসিকভাব ওদের বিশ্বাস করাই যে ওদের প্রেগন্যান্সি এসেছে। তার জন্য আমি ওদের বাড়িতে টেস্ট করতে বারণ করি। ইঞ্জেকশন দিয়ে হরমোন লেভেলে পরিবর্তন ঘটাই। কিছু এমন কিট আছে আমাদের যাতে সবসময় পজিটিভ শো করে রেজাল্ট। কিছু পিলস দিয়ে পিরিয়ড স্টপ করাই। ওদের মানসিকভাবে এমন করে দিই প্রতি মুহূর্তে প্রেগন্যান্সির কথা বলে যে ওদের মনে হতে থাকে সব সিম্পটমস আছে। কিছু মেডিসনে ওবেসিটি আনি। ফলে শরীরে মেদ বাড়ে। এছাড়াও তাদের ফুল রেস্টে রেখে দিতে বলি। সব মিলিয়ে শরীরে স্থূলতা দেখা যায়। পেটও খানিকটা বাড়ে। ওদের মনে হয় বেবিবাম্প আসছে। অনেক ওষুধের এফেক্টে গ্যাস ফর্ম হয়। ওদের বিশ্বাস করাই যে পেটের ভিতর মুভমেন্ট হচ্ছে।’ অল্প থামেন ডক্টর দেবরায়।

‘আপনি এভাবে এত প্ল্যান করে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গেছেন!’ দ্বৈতার প্রচণ্ড রাগ হয়।

‘এরা মানতেই চায় না যে কোনওভাবে প্রেগন্যান্সি এদের আসা বা এলেও তা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তখনই এই পদ্ধতি নিতে হয়!’

‘বাহ্ কী যুক্তি! তারপর বলুন।’

‘এই কাপলদের থেকে এগ আর স্পার্ম কালেক্ট করে ফার্টিলাইজ করিয়ে অন্য মেয়েদের শরীরে ইমপ্ল্যান্ট করি।’

‘তাদের অজান্তে! ‘

‘হ্যাঁ। তাদের সেন্সলেস করা থাকে। কিছু বুঝতে পারে না।’

‘এই কাপলদের মধ্যে যারা ফিমেল তাদেরও একবেলার জন্য এখানে ভর্তি করি। সবটা এমনভাবে দেখানো হয় যাতে মনে হয় তাদের শরীরেই প্রতিস্থাপন হচ্ছে। কিন্তু বাচ্চা বড় হয়ে যায় অন্য একজনের গর্ভে। সকলের ক্ষেত্রে সেটাও হয় না। যেসব মহিলাদের এগ কোয়ালিটি একদমই ভালো না। তাদের ক্ষেত্রে তাদের এগ নেওয়া হয় না। সারোগেট মাদারের বডিতে ফাদারের স্পার্ম ডিরেক্ট ইঞ্জেক্ট করা হয়। এক্ষেত্রে সে আর সারোগেট থাকে না। সেই আসল মা হয়। যেমনটা মিসেস গোস্বামী আর মিসেস আগরওয়ালের ক্ষেত্রে করতে হয়েছিল।’

‘তারমানে এরা বাচ্চার বায়োলজিক্যাল মা নয়?’

‘না বাবা তার হাজব্যান্ডই কিন্তু মা অন্য কেউ।’

এই কথাটা শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন সেই দুই মহিলা। ‘আমি মানি না! অফিসার এদের মানলাম প্রেগন্যান্সিটা নকল। কিন্তু আমি নিজে ওটিতে গেছি। নিজে আমার বাচ্চাকে জন্ম দিয়েছি। আমার পেটে সেই সিকশনের দাগ আমি বহন করছি।’ এক মহিলা কথাটা বলতেই আরও দুজন তার সাথে গলা মেলায় ‘হ্যাঁ! আমারও!’

‘নিন বলুন! ওটিতে কী কারচুপি করেন আপনি?’

‘ওদের সি সেকশনের মতো পেট কাটা হয়েছে। পেস্টিং হয়েছে। মেডিসিন দিয়ে ব্লিডিং চালু করেছি। কিন্তু বাচ্চা পিছনের ছোট ওটিতে হয়েছে। সারোগেট মাদারের সি সেকশনের দ্বারা।’

‘যে কারণে ওনাদের বিল্ডিংয়ের ব্যাক সাইডে কোনও সিসিটিভি নেই। ওখানে একোটা লিফট আছে। যা দিয়ে সেই সারোগেট মাদারকে আনা হত পিছনের ওটিতে। আর এখনে ওটিতে নকল ডেলিভারি হত।’

‘হ্যাঁ। ওদের চোখে কালো কাপড় দেওয়া থাকত। তাই ওরা কিছু বুঝতেও পারত না। বাই মেডিসিন খুব অল্প বিএম আনা হয়েছে। আর বলেছি ওদের বিএম কম বাচ্চাকে ফর্মুলা মিল্ক খাওয়াতে হবে। এই সবকিছু চালিয়ে যাওয়ার জন্য ওঁদের বারণ করা থাকত বাইরে কোনও ডক্টর না দেখাতে কোনও টেস্ট না করাতে আর মেডিসিনও আমরা দিতাম নিজেদের লেবেলিং-এ। যাতে কখনও কোনও কিছু বেরিয়ে না আসে। আর ওরাও সেই মুহূর্তে বাচ্চা আসার আনন্দে সব মেনে নিত। সব ঠিকই ছিল। শুধু কে যে…’

‘কে যে আপনাদের এই চক্রের লোকগুলোকে একে একে মারতে শুরু করল বুঝতে পারছেন না! ভাগ্যিস সে শুরু করেছিল এই নোংরা সাফাইয়ের কাজ! তাই এত বড় একটা চক্র সামনে এল।’

‘ম্যাডাম আমার তো মনে হয় সে ভালোই! আমরা যাকে খুঁজছি সে অপরাধী নয়। অপরাধী তো এরা!’ অনিকেতের কথায় দ্বৈতারও মনে হয় ঠিকই তো। কিন্তু সে কে?

(২৭)

দ্বৈতা সব ভিক্টিম মেয়েদের লিস্ট নেয়। যাদেরকে এরা ব্যবহার করেছে সারোগেট হিসাবে। আর তখনই সামনে আসে আরেক তথ্য। এদের ক্রাইম শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। তাদের মধ্যে দু’জনকে এরা খুন করেছে। তাদের বাড়ির লোকও খোঁজ নেয়নি তেমন। কারণ তারাও বাপ-মা মরা মেয়েগুলোকে ঘাড় থেকে নামাতে পেরে বেঁচে গেছিল। কিন্তু একটা হিসাব কিছুতেই মিলছে না। একটি মেয়ের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। সে নাকি পালিয়েছিল। তার জন্ম দেওয়া সন্তান নাকি ডেলিভারির মুহূর্তেই মারা যায়। তার নাম জেনে তার গ্রামের বাড়িতে দ্বৈতা যায়। কিন্তু সেখানে সে তারপর আর যায়নি। একটা ছবি দ্বৈতা সেখান থেকে নিয়ে আসে এবং বিভিন্ন জায়গায় সার্কুলেট করে দেয়। যদি কেউ কোনও খবর দিতে পারে!

‘কী মনে হয় ম্যাডাম? ওই শ্রাবণী বলে মেয়েটি কি মারা গেছে?’

দ্বৈতা চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবছে। ডিপার্টমেন্টে বসে আছে অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই ভাবনার কিছুতেই কূল পাচ্ছে না। ওদিকে মেয়েটারও খবর কেউ দিচ্ছে না। চোখটা খুলে দ্বৈতা বলে, ‘হয় সে মারা গেছে নয় সে মারছে!’

‘আপনি বলছেন মেয়েটিই এই খুনগুলো করছে?’

‘বেঁচে থাকলে নয় কেন? ওর মোটিভ স্ট্রং। সময়গুলো দেখো। সবসময় ফাঁকা জায়গা রাত বা ভোর একা ব্যক্তি!’

‘একা একা একটা মেয়ে এসব করল?’

‘এখানেই একটা খটকা লাগছে অনিকেত। একা ও এই শহরে কী করে থাকবে? ওর তার মানে থাকার জায়গা আছে। খাচ্ছে কী? রোজগার কী করছে? নিশ্চয়ই কেউ আছে যে ওকে সাহায্য করছে। দেখি! ও যদি থাকে! তাহলে কেউ না কেউ তো আমাদের জানাবে! আমাদের নাম্বার তো দেওয়াই আছে।’

কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা নাম্বার থেকে ফোন আসে দ্বৈতার ফোনে। আননোন নাম্বার।

‘ম্যাডাম কেউ কি কিছু খবর পেল?’

‘দেখি!’ কথাটা বলে দ্বৈতা ফোনটা রিসিভ করে।

ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা যায় ‘নমস্কার ম্যাডাম! আমি আমার নাম বলছি না। কিন্তু আপনি যাকে খুঁজছেন তার খবর দেওয়ার জন্যই আমি ফোন করছি।’

কথাটা শোনামাত্র দ্বৈতা ফোনটা স্পিকারে দেয়। তারপর বলে, ‘আপনি কার কথা বলছেন?’ লোকটা বলে, ‘শ্রাবণীর কথা। ও আমার কাছেই আছে ম্যাডাম। আপনি যদি ওর সাথে দেখা করতে চান তাহলে এখানে চলে আসুন। আমি একটা ঠিকানা বলছি লিখে নিন। চিন্তা করবেন না। আমরা পালাব না। সব স্বীকারোক্তি দিয়ে দেব। আজ আর আমাদের কোনও কাজ নেই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম ওই শয়তানগুলোকে সমাজের সামনে আনবার জন্য।’

‘কিন্তু আপনি যে সত্যি বলছেন সেটা বুঝব কী করে?’

‘একটিবার ভরসা করেই দেখুন না ম্যাডাম। আমরা ঠকাব না।’ কথাটা বলেই লোকটা গড়গড় করে একটা জায়গার কথা বলল। তারপর ফোনটা কেটে দিল। দ্বৈতা ঘুরিয়ে ফোন করল কিন্তু সেটা রিং হিয়ে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না। দ্বৈতা একটা ফোন করে এই নাম্বারের ডিটেলস আর কারেন্ট লোকেশন ট্রেস করতে বলে। তারপর একটা টিম নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্যে। রাস্তায় ওর লোক খবর দেয় ফোনটার লোকেশন ওখানেই আছে যেখানে দ্বৈতাদের যেতে বলা হয়েছে। চেঞ্জ হয়নি। আর সমীরণ মণ্ডলের নামে রেজিস্টার আছে নাম্বারটা।

জায়গাটা হাইওয়ের ধারে। সেখানে পৌঁছে ওরা দেখে এটা একটা পরিত্যক্ত বিল্ডিং। কাজ বহুদিন যাবৎ বন্ধ। লোকটা সত্যি বলল কি না কে জানে! এখানে যদি অন্য কোনও উদ্দেশ্য থাকে? কথাটা ভেবেই দ্বৈতা টিম নিয়ে এসেছে। ওরা সকলে বাড়িটাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। তারপর দ্বৈতাকে অনুসরণ করে সাবধানে কয়েকজন ভিতরে ঢুকে আসে। কিন্তু ওরা কাউকে দেখতে পায় না। দ্বৈতা কয়েকবার হাঁক দেয়, ‘শ্রাবণী, সমীরণবাবু আমরা এসে গেছি।’

কোনও উত্তর আসে না। অনিকেত বলে, ‘ম্যাডাম একটু ভিতরে গিয়ে দেখি। মনে হচ্ছে কেউ প্র্যাঙ্ক করেছে।’

দ্বৈতা বলে, ‘আমার কেন জানি না তাই মনে হচ্ছে না। লোকটার কথায় মিথ্যে ছিল না। তোমরা ওদিকটা দেখো। আমি এদিকে দেখছি।’

কথা মতো সকলেই খুঁজতে লাগে তাদের। কয়েক সেকেন্ডেই একজন অফিসারের চিৎকার শোনা যায়, ‘ম্যাডাম শিগগিরি এদিকে আসুন।’ সকলেই সেদিকে ছুটে যায়। আর তারপরই তাদের নজরে আসে সেই বীভৎস দৃশ্য। ভাঙা নোংরা মেঝের উপর শুয়ে আছে দু’জন মানুষ। চিনতে অসুবিধা হয় না। একজন শ্রাবণী সেটা বোঝা যাচ্ছে। আর অন্যজন নিশ্চয়ই সমীরণ। ওদের মুখ দিয়ে ফেনা উঠে এসেছে। বোঝা যাচ্ছে বিষ খেয়েছে।

‘ওহ মাই গড!’ দ্বৈতা দ্রুত তাদের নাকের সামনে হাত রাখে। কিন্তু কোনও নিশ্বাস পড়ে না। ওরা মৃত!

‘ম্যাডাম অ্যাম্বুলেন্স ডাকব? বেঁচে আছে?’

মাটিতে একটা ঘুসি মেরে দ্বৈতা বলে, ‘কোনও লাভ নেই।’ কথাটা বলতেই ওর নজরে পড়ে শ্রাবণীর চুড়িদারের ওড়নায় কী যেন একটা বাঁধা আছে। দ্বৈতা সেটা খুলতেই দেখে একটা চিঠি।

‘সুইসাইড নোট?’ একজন অফিসার প্রশ্ন করে।

দ্বৈতা সেটাকে চোখের সামনে মেলে ধরে বলে, ‘স্বীকারোক্তি! বলেছিল দেবে!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ও জানে না কেন খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। একটা অচেনা অজানা মেয়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।

***

শ্রাবণীর গল্পটা হয়তো এদের সবার থেকে একটু বেশিই করুণ। মেয়েটা গ্রামের সহজ সরল মেয়ে। দেখতে সুন্দরী না হলেও একেবারে মন্দ নয়। ওর নিজের বলতে দিদি জামাইবাবু ছিল। তারা ওকে বেশিদিন আর নিজেদের সংসারে রাখতে চায়নি। বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে ঝাড়তে তো চেয়েছিল। কিন্তু খরচ করবে না। একদিন একটা দারুণ সম্বন্ধ এল। ছেলে কলকাতায় থাকে। বিয়ে হয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে। বউকেও নিয়ে যাবে। কিন্তু বিয়ে হবে মেয়ে নিয়ে গিয়ে। এরা তখন তাতেই রাজি হয়। সম্বন্ধ ভালো। টাকা লাগছে না। আর কী চাই! ছেলে তখন ফোন নাম্বার দেয়নি কিছু। বলেছিল ব্যাঙ্গালোর গিয়ে সে খবর দেবে। তখন নাম্বারও দেবে। শ্রাবণী চায়নি বিয়েটা করতে তবে দিদি জামাইবাবুর মনোভাব সে জানে। তাই না করেনি। তারপর শুরু হয় আসল গল্প। বিপ্লব ছিল সেই ছেলে। সে মিথ্যে কথা বলে শ্রাবণীকে অরণ্য গুহর কাছে নিয়ে আসে। বিপ্লব তখন অরণ্য গুহর হয়ে কাজ করত। আর এই অরণ্য গুহ এনজিওতে পাঠানোর আগে কিছু মেয়েকে নিজে একবার নিজের ভোগ্যবস্তু বানাত। শ্রাবণীও তার মধ্যে একজন। তারপর ডক্টর দেবরায় তাকে সারোগেট মাদার বানায়। তারপর গল্পটা খানিকটা বাকিদের মতোই। কিন্তু বাচ্চাটা ডাক্তারের ভুলে মারা যায়। যাদের বাচ্চা সেই দম্পতি বিদেশ চলে যায় কোনওক্রমে শ্রাবণী পালিয়ে আসে সেখান থেকে। তারপর তার দেখা হয় সমীরণের সাথে। এই প্রথম ভালোবাসা, স্নেহ, সহানুভূতি মেয়েটা পেল। সমীরণ ওকে গড়ে তুলল নতুনভাবে। ও একজন টোটো চালক। ছোট থেকেই লড়াকু স্বভাবের ছেলেটা প্রতিশোধের আগুন জ্বালাল নির্যাতিতা মেয়েটার উপর।

অরণ্য গুহর এই মেয়েদের নিয়ে ভোগের বিষয়টা বন্ধ হয় একটা মেয়ে সুইসাইড করায়। আর এক্ষেত্রে আসল বিজনেসটাই এফেক্টেড হচ্ছে। ফলে তার এইসব বন্ধ হয় আর বিপ্লব সিকিউরিটি গার্ড হিসাবে যোগ দেয় নিউ লাইফ ক্লিনিকে। অরণ্য গুহর আসল চেহারা সকলের সামনে আসতেই হট্টগোল পড়ে যায়। এখন দুই রাজনৈতিক দলই বল ঠেলাঠেলি করার মতো বলছে অরণ্য গুহর সাথে তাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। ওসব গুজব!

বিশাল একটা প্রেস কনফারেন্স অ্যারেঞ্জ করা হয়। তার মধ্যমণি দ্বৈতা সান্যাল এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কেস যা গোটা দেশে চর্চিত, সেটাকে সলভ করেছে অফিসার দ্বৈতা সান্যাল। ডিসিডিডি অর্ঘ্যদীপ বর্মন সকলের সামনে ওকে ইন্ট্রডিউস করান। কী অদ্ভুত! যা দ্বৈতা চেয়েছিল তা আজ পূরণ হচ্ছে। অথচ ও মনের মধ্যে একশো শতাংশ আনন্দ অনুভব করছে না। এই কেসটা অনেকগুলো কষ্টের মুখোমুখি দাঁড় করাল ওকে।

(২৮)

‘এখন কেমন আছ তুমি?’ নার্সিংহোমে খুশির বেডের সামনে এসে দাঁড়ায় সুনেত্রা। ওর চোখ মুখ অনেক শান্ত এখন। মাঝে সাতটা দিন কেটে গেছে। খুশি সহ বাকি সকল বন্দি থাকা মেয়েদের দ্বৈতা ভর্তি করিয়েছে নার্সিং হোমে। ওদের চিকিৎসা দরকার। খরচ সরকার বহন করবে। প্রত্যেকের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা ওসেছে। যেসব বাড়ির লোকেরা ওদের ফিরিয়ে নিতে চাইবে না তাদের কিছু ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

খুশি একটু উঠে বসে ‘এখন ভালো। কিন্তু আপনি…

‘আমিই সেই দুর্ভাগা! যে নিজের সন্তানকে জন্ম দিতে অক্ষম বলে তোমার গর্ভে সে বাড়ছে!’

‘আ…আপনি এভাবে বলছেন কেন!

‘আমি অফিসার সান্যালের কাছে সব শুনেছি তোমার কথা। তোমাকে একটা কথা বলব বোন?’

‘হ্যাঁ… বলুন!’

‘তুমি প্লিজ ওকে মেরে ফেলো না! ও যে আমার অংশ! আমি জন্ম দিতে অপারগ জানি। কিন্তু ও তো এসেছে ওর আরেক মায়ের কোলে! প্লিজ ওকে জন্মাতে দাও।’ সুনেত্রা খুশির হাত দুটো ধরে কেঁদে ফেলে। এই আরেক মা শব্দটা শুনে কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিল খুশির। সত্যিই তো ও আরেক মা-ই তো! ওর শরীরেই যে বেড়ে উঠছে সে! খুশিকে চুপ করে থাকতে দেখে সুনেত্রা বলে, ‘আমি শুনেছি আলট্ৰইসিক সারোগেসির কথা। তুমি যদি আমার বন্ধু হয়ে এতে সম্মতি দাও… জানি আমি হয়তো অন্যায় আবদার করছি। কিন্তু আমার যে তুমিই শেষ ভরসা। আমি কোনওদিন সন্তান জন্ম দিতে পারব না। এতই অভাগা আমি। বিশ্বাস করো সারোগেসি কোনওদিন চাইনি আমি। কিন্তু ভাগ্য আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। তুমি প্লিজ…’ আর কিছু বলে না সুনেত্রা। খুশি কোনও উত্তর দিচ্ছে না দেখে ও চুপ করে যায়। তারপর বলে, ‘রেস্ট নাও। ভালো থেকো। হয়তো কখনও দেখা হবে আবার!’

সুনেত্রা চোখটা মুছে উঠে দাঁড়ায়। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে এমন সময় খুশি বলে, ‘আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দেবে তো দিদি? ‘

কথাটা শুনে ফিরে তাকায় সুনেত্রা। ওর চোখ ছলছল করছে। খুশিরও। সুনেত্রা বলল, ‘বললাম যে তুমি ওর আরেক মা। আমার বোন!

‘বেশ তাহলে কী ফর্মালিটিজ আছে তাড়াতাড়ি সেরে নাও!’ দু’জনের মুখেই হাসি ফোটে।

***

‘কী করছ মা তুমি? সেই থেকে এত কাদের সাথে কথা বলছ? আমি আর বাবা কী বলছি একটু শুনবে তো!’ দ্বৈতা ওর মাকে হাঁক দেয়। ওর মা বিগত দু’ঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে।

‘আচ্ছা তাহলে এইবার রাখি? হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই! ভালো থাকবেন। দেখা হচ্ছে খুব শিগগিরি।’ ফোনটা রেখেই ওর মা বলে, ‘আরে তোর এই কেসটার পর এত ফোন আসছে। কী ভালো ভালো সব সম্বন্ধ কী বলব!’ দ্বৈতা আর ওর বাবা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। দ্বৈতা মাথায় হাত দিয়ে বলে, ‘তুমি যে কাকে একটা সিলেক্ট করেছিলে! তাহলে?’

‘আরে একদম কনফিউজড হয়ে গেছি। দাঁড়া আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। অনেক চয়েজ!’

দ্বৈতা আর ওর বাবা একসাথে বলে ‘বাঁচা গেছে!’

***