মায়াজাতক – ৫
(৫)
বাস থেকে নেমে রিক্সা নিল সুনেত্রা। এইটুকু রাস্তা। তবুও আজ আর হাঁটতে ইচ্ছা করছে না ওর। মনে হচ্ছে যেন কতদূর ওদের বাড়িটা। হাঁটার শক্তি নেই ওর। পায়ে জোর আসছে না। শরীর কেমন যেন ছেড়ে দিচ্ছে। শরীরের আর কী বা দোষ! মনটাই তো ঠিক নেই। ওর কি মানসিক অসুস্থতা হচ্ছে? কিন্তু ওর এই চাওয়াটাও কি ভুল? এ তো এক স্বাভাবিক চাওয়া! তাহলে ও অস্বাভাবিক কেন? প্রশ্নগুলো সারাক্ষণ মাথার মধ্যে বিরক্ত করে চলেছে। আর তারপরেই পূবালির কথাটা মনে পড়ে গেল। এই শেষ চেষ্টাটা তো করে দেখা যায়! যতই ডাক্তার বলুক সম্ভব নয়? একেবারেই কি নয়?
অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করছে ওর মধ্যে। বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়েই বিছানায় পড়েছে। খায়নি কিছুই। ওর শাশুড়িমা আজকাল ওর সাথে কথা কম বলে। তাই খায়নি আর এসেই শুয়ে পড়েছে দেখে একবার বলল, ‘সন্ধের খাবার কী খাবে নমিতাকে জানিয়ে দিও।’
সুনেত্রা কোনওক্রমে মাথাটা তুলে বলল, ‘আমি কিছু খাব না। তোমরা যা খাবে তাই বলে দাও।’
ওর শাশুড়ি আর দ্বিতীয় কথা বলেনি। শুধু বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে এল, ‘নির্ঘাত মাথাব্যথা। শরীরের আর কী দোষ। সত্যি কথা বললেই একটা অস্ত্র, রাত জেগে কান্নাকাটি। ও করে হবেটাই বা কী? শরীর খারাপটাই হবে। কী জানি কার যে নজর পড়ল আমার সংসারে! যা খুশি করুক। আমার আর ভালোলাগে না কিছু।’
সুনেত্রার আর এসবে কিছু যায় আসছে না। ওর কানেও ঢুকছে না কিছু। ও শুধু ভাবছে এই শেষ চেষ্টাটা যেন সফল হয়! আচ্ছা অভীক কি রাজি হবে? ওকে জানানোর পর ও যদি রাজি না হয়? না না… বোঝাতে হবে ওকে। কিন্তু ও তো একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ওর মনে পড়ে গেল সেই প্রথমের দিকের কথা।
.
ভয়ে ভয়ে ডাক্তারের চেম্বারের পর্দাটার সামনে এসে দাঁড়াল সুনেত্রা। অভীক পর্দাটা তুলে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছে। কিন্তু ও নড়তে পারছে না। ওর পা দু’টো কেউ যেন আঁঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে মাটির সাথে। কী ভার লাগছে পায়ে। মনে হচ্ছে এই পা তুলতেই পারবে না ও। অদ্ভুত অস্বস্তি, আশঙ্কা আর ভয় ওর ভিতরটা কুঁড়ে খাচ্ছে। ইচ্ছে করছে এক ছুটে পালিয়ে যাবে ও এখান থেকে। দরকার নেই কিছু জানার, কিছু বোঝার। যদি খারাপ কিছু বলে ডাক্তার! তখন কী করে সামলাবে সে নিজেকে? সমস্যাটা অভীক বা ওর যারই হোক! সেই ঝড় তো ওদের দু’জনের ওপরেই আছড়ে পড়বে!
ভিতরে ঢুকতে গিয়েও ঢুকল না অভীক। পাশে তাকিয়ে দেখল সুনেত্রাকে। বুঝতেই পারল মেয়েটা সাংঘাতিক টেনশনে আছে। সুনেত্রার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, সমস্যা যারই হোক! যা-ই হোক! তার সমাধান তো থাকবে। এত ভেব না।’
সুনেত্রা শুধু তাকায় অভীকের দিকে। কিছু বলতে গিয়েও ঠোঁট কেঁপে ওঠে। অভীকের হাতটাকে আঁকড়ে ধরে ঢুকল ও। ডাক্তারদের চেম্বার বা নার্সিংহোমগুলোয় একটা অন্যরকম গন্ধ থাকে। না খারাপ নয়। আবার রুম ফ্রেশনারের গন্ধ সেটাকে চাপা দিতে চাইলেও পেশেন্টদের নাক সেটা খুঁজে নিয়েই যেন বুঝতে পারে এটাই ডাক্তারের চেম্বার। আজ ওই গন্ধটা রুম ফ্রেশনারের গন্ধের সাথে মিশে নাকে ঢুকতেই সুনেত্রার ভিতরটা গুলিয়ে উঠল। ওর মনে হল আজ যেন গন্ধটা খারাপ কোনও বার্তা বয়ে আনছে।
‘ওহ মি. অ্যান্ড মিসেস বোস! আপনারা এসে গেছেন! বসুন।’ সুনেত্রা আর অভীককে উদ্দেশ্য করে বললেন গাইনোকলজিস্ট দময়ন্তী ঘোষাল। হাতে বেশ কিছু রিপোর্ট নাড়াচাড়া করে দেখছেন উনি। এগুলো সুনেত্রা আর অভীকের রিপোর্ট। রিপোর্ট নাকি ভাগ্য নির্ধারণের কাগজ? সুনেত্রার মনে হয় এক্ষুনি এখান থেকে ও বেরিয়ে যাবে। দরকার নেই ওর কিছু জানার। আরও কয়েকবার চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই ও কনসিভ করতে পারবে। কত মানুষেরই তো বাচ্চা হতে দেরি হয়। ওদেরও সেরকমই কিছু হয়েছে।
‘কিছু সমস্যা আছে ডক্টর?’ অভীক আর চুপ না থেকে প্রশ্ন করে। ডাক্তার ঘোষালের মুখটার মিহি হাসিটা মিলিয়ে গেছে। পেশেন্টকে কীভাবে ভালো বা মন্দ খবর জানাতে হবে তা ওঁর জানা।
‘হুম্! দেখুন! সমস্যা আছে। তবে সেটা আপনার নয়, মিসেস বোসের।’
ডাক্তারের মুখে এই কথাটা শোনামাত্র সুনেত্রার পা-টা টলে যায়। ওর মনে হল একটা হার্টবিট যেন মিস হয়ে গেল। এই… এই ভয়টাই ও পাচ্ছিল। এই কথাটাই তো ও শুনতে চাইছিল না। আর সেই আশঙ্কাই সত্যি হল!
‘আমার কী সমস্যা ডক্টর?’ শুকনো গলায় প্রশ্ন করে সুনেত্রা। এখানে আসা থেকে এই প্রথম ও কিছু বলল।
‘আপনার মেডিকাল রিপোর্টস বলছে আপনার পি.সি.ও.এস আছে। ফুল ফর্মে যাকে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম বলে। এটা থাকলে এমনিতে একটু প্রেগন্যান্সি আসতে ডিলে হয়। কিন্তু সেটা এমন কিছু নয়। একটু নিয়ম মেনে চললেই প্রবলেম সলভ হয়ে যায়। এখন বহু মেয়ের এই সমস্যা।’
‘তাহলে আমারও সমস্যা মিটে যাবে? আমি সব…সব নিয়ম মেনে চলব ডক্টর। আপনি শুধু বলুন কী করতে হবে। ব্যাকুল হয়ে ওঠে সুনেত্রা। ওর মনে হয় এই তো! খারাপের মধ্যেও আশার আলো দেখা গেছে।
‘মিসেস বোস! দেখুন এই সমস্যাটা আজকাল সেরকম সমস্যা নয়। কিন্তু আপনার আরও সমস্যা আছে। আর সেটা খুব রেয়ার একটা কেস। আপনার ইউটেরাসের একটা প্রবলেম আছে। সেটাকে আমাদের মেডিক্যাল টার্মে ইউনিকর্নয়েট ইউটেরাস বলা হয়। আপনার ইউনিকর্ণয়েট ইউটেরাস উইথ ভেরি স্মল ক্যাভিটি। এই ধরনের কেসে কনসিভ করার সম্ভাবনা খুবই কম এবং প্রবলেমেটিক। ইনফ্যাক্ট লাকিলি কনসিভ করলেও মিসক্যারেজের প্রবল সম্ভাবনা। বাকিদের যেমন দুটো ওভারি ওয়ার্কিং কন্ডিশনে থাকে। আপনার একটা। এরকম ক্ষেত্রে আপনার কনসিভ করাটা…’ কথাটা অসমাপ্তই রাখেন ডক্টর ঘোষাল।
সুনেত্রা কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে ওঁর দিকে। ওর যেন গোটা পৃথিবীটাই পালটে গেল এক লহমায়। অভীক নিজেকে এতক্ষণ শক্ত রেখেছিল। কিন্তু এইবার ওরও অসহায় লাগছে ভীষণ। খুব নার্ভাস লাগছে। কষ্ট হচ্ছে প্রবল। কিন্তু তার সঙ্গে ভয়ও হচ্ছে! সুনেত্রাকে সামলাবে কী করে? ও তো পাগল হয়ে যাবে!
***
সারা বাড়ি আলোয় আলোকিত! সবাই কী সুন্দর করে সেজেছে। সুনেত্রা, অভীক, সুনেত্রার বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই উপস্থিত! সবার মুখে হাসি-আনন্দ। পাড়া-প্রতিবেশী কত আত্মীয়-স্বজন সবাই এসেছে। আর সকলের মধ্যমণি হয়ে বসে রয়েছে একটা ছোট্ট বাচ্চা। সে খিলখিল করে হাসছে। সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল ‘মা!’
মা? এই মা ডাক শুনে চোখে জল চলে এল সুনেত্রার। ওর মনে হল হঠাৎ ওর আনন্দের পারদ ওর আবেগ সব অনেক অনেক উপরে উঠে গেছে। মনে হল যেন চারিদিকে সবকিছু শুভ, সবকিছু ভালো। কী আনন্দ! কী উচ্ছাস! কোথাও একটুও খারাপ নেই! কোনও দুঃখ নেই কোনও কষ্ট নেই! এক ছুটে সুনেত্রা বাচ্চাটার কাছে এসে ওকে কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটার গায়ে একটা গোলাপি জামা হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। বোঝা যাচ্ছে না সে ছেলে না মেয়ে। সুনেত্রা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। মনে হল এতদিন ধরে বুকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা কান্নাগুলোর এবার বাঁধ ভেঙেছে।
ঠিক এই মুহূর্তে একটা প্রচণ্ড শব্দ হল। ধরমড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে সুনেত্রা। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে ঘর অন্ধকার। দরজাটা খুলে গেছে। তাই অন্ধকারের মধ্যে ওই খোলা দরজা দিয়ে আলো ঢুকে এসেছে। সুনেত্রা চোখটা আবার বন্ধ করে নেয়। এই আলোর তীব্রতা এই মুহূর্তে ওর ভালো লাগছে না। চোখে অসুবিধা হচ্ছে। মাথার যন্ত্রণাটা বেড়ে যাচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ। কিন্তু চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না সুনেত্রার। এতক্ষণ সবটা তার মানে স্বপ্ন ছিল? এই সুন্দর স্বপ্ন কি ওর জীবনে শুধু স্বপ্নই হয়ে রয়ে যাবে. বাস্তবে কি কোনওদিন ধরা দেবে না?
‘সরি! তুমি ঘুমিয়ে ছিলে। ঘুমটা ভেঙে গেল। আসলে দরজাটা আটকে গেছিল। ভিতর থেকে লকড না। আর বাইরে থেকেও না। অথচ লকের জায়গাটা এমন জ্যাম হয়ে গেছিল! এই অটোলকের মুশকিল। খুব জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলতে হল।’ কথাটা বলতে বলতেই অভীক ঘরে ঢুকে এসে লাইট জ্বালাল। সুনেত্রা চোখ না খুলেই প্রশ্ন করল, ‘কখন এলে?’
‘এই তো! শরীর খারাপ লাগছে না কি?’ সুনেত্রার চোখ মুখের অবস্থা দেখে অভীক একটু চিন্তিত হয়ে উঠল।
সুনেত্রা মাথা নাড়ল। তারপর আস্তে আস্তে চোখ খুলল। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে রয়েছে। ফুলেও আছে। অভীক বুঝল কান্নাকাটি মাথার যন্ত্রণা আর ঘুম সব মিলেই এই অবস্থা হয়েছে চোখের। কাছে এসে ওর মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?’
সুনেত্রা নিজেকে সামলাতে না পেরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল, ‘আমার আর ভালো লাগছে না অভীক! আর সহ্য করতে পারছি না। সে তো ধরা দিল! কিন্তু আমার স্বপ্নে। আমি যে ওকে বাস্তবে চাই অভীক। আমি আর পারছি না।’
অভীক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘আবার? তোমাকে তো কতবার বলেছি সত্যিটা মেনে নাও সুনেত্রা! সবার জীবনে সব আনন্দ থাকে না। সব সুখ থাকে না। আমরা দু’জন দু’জনের সাথে আছি, পাশে আছি এটাও তো আমাদের সম্পর্কের জন্য অনেক। অনেক পরিবারে তো এই সুখটুকুও থাকে না।’
‘আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই অভীক।’ চোখের জল দুহাতের উল্টো দিকের পাতায় মুছে নিল সুনেত্রা।
‘কী বলবে? আবার কি অ্যাডপশনের কথা? আমি তো তোমাকে বলেছি আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মা-বাবা এমন করছে। আমরা পারব যে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসব তাকে এখানে সুস্থ পরিবেশ দিতে? মা-বাবা কোনওদিন তাকে মেনে নেবে না। আমি আর তুমি হঠাৎ করে এখান থেকে আলাদা হয়ে চলে যাব একটা বাচ্চাকে দত্তক নিয়ে, সেটাও তো হয় না সুনেত্রা। আমি একটা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর একটা দায়িত্ব থেকে এভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেব? সেটা কি হয়?’
‘না অভীক দত্তকের কথা নয়!’
‘তবে? কাঁধ থেকে অফিসের ব্যাগটা সাইডের একটা টেবিলে রেখে বিছানার সামনের চেয়ারটায় বসল অভীক।
‘আইভিএফ।’
‘আইভিএফ?’ ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করে অভীক।
‘হুম! পুবালি বলল আজ কথাটা। তখন আমিও ভাবলাম এটা ট্রাই করে দেখা যাক।’
‘দেখো পুবালি আমাদের প্রবলেমটা সম্পূর্ণরূপে হয়তো জানে না। বা মেডিক্যাল কন্ডিশন বুঝবে না। ও তো ডাক্তার নয়। কিন্তু আইভিএফ-এ কি আমাদের সমস্যাটার সমাধান হবে?’
‘আমি জানি না অভীক। আমরা তো কোনও ডক্টরের সাথে আইভিএফ নিয়ে কনসাল্ট করিনি। আমি ডাক্তার নই অভীক। কী হতে পারে আমি জানি না। আমি শুধু এটা জানি আমরা নরমাল প্রসিডিওর-এ কিছু করতে পারলাম না। তাহলে আমরা কি একবার আইভিএফ ট্রাই করে দেখতে পারি না? যদি এবার কিছু হয়? এত ঠাকুর পুজো, এত কিছু করলাম। কত কত জায়গায় মানসিক করেছি। যে যা বলেছে সব করেছি। নিশ্চয়ই মিরাকেল একটা কিছু হবে! আর আগেরবার ডাক্তার তো বলেছিলেন মিরাকেল ঘটে, আমাদের হাল না ছাড়তে। হতাশ না হতে।’
‘আমরা ওঁকে আর কনসাল্ট করিনি ঠিকই। আমরা তারপর তো আরও অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সকলের তো একই বক্তব্য। যদিও বা কনসিভ করো সেটা…’
‘থাক না অভীক। আর ওই কথা আমি শুনতে চাই না। একবার আইভিএফ ক্লিনিকে যেতে চাই আমি। ওখানে একবার কথা বলি প্রয়োজনে দুটো ক্লিনিক ভিজিট করব। একবার ট্রাই তো করি! যদি সেটা সফল হয়ে যায়! যদি প্রেগন্যান্সিটা লাস্ট করে যায়! কোনও ভাবে যদি মিরাকেল ঘটে যায়! আমাদের সাথে আর খারাপ হবে না বলো? আমি শুধু একটা চেষ্টা করতে চাই। আমি আর পারছি না অভীক।’ আবার অভিককে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সুনেত্রা।
অভীক কিছু বলতে পারে না। ওরও তো বাবা হওয়ার শখ ভীষণ ও-ও চায় ঘর আলো করে এই সংসারে, ওদের কোলজুড়ে ফুটফুটে একটা সন্তান আসুক। যে হবে ওদের সন্তান! সত্যি বলতে কী, দত্তক নেওয়ায় খারাপ কিছু নেই। কিন্তু প্রথমে কি কেউ দত্তক নেওয়ার কথা ভাবতে পারে? সবাই তো আগে নিজের সন্তান হওয়ার কথাই ভাবে। এতে তো অন্যায় কিছু নেই। সুনেত্রা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, একটা ছোট বাচ্চার থেকেও খারাপ কন্ডিশন এখন ওর। ওকে বাস্তবের মাটিতে টেনে হিঁচড়ে ফেলে কিছু করা সম্ভব নয়। অভীক সেটা বোঝে। ও বড্ড ভালোবাসে সুনেত্রাকে।
না! লাভ ম্যারেজ ওদের নয়। বিয়েটা অ্যারেঞ্জড। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে দু’জনের মধ্যে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর একটা বন্ডিং গড়ে ওঠে মাত্র কয়েকটা মাসে। যার শক্তি এখনও টিকিয়ে রেখেছে এই সম্পর্কটাকে। সুনেত্রার অবস্থা এমন হয়ে গেছিল যে ও খারাপ কিছু করে ফেলতে পারত। নিজের বাচ্চাকে নিজের গর্ভে ধারণ করা এবং জন্ম দেওয়ার জন্য ও মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তার জন্য কত উপাচার, কতকিছু! দোষ একা সুনেত্রারও নয়। পরিবার পরিস্থিতি আর চারপাশের মানুষজন সবকিছু ওকে এমন করে তুলেছিল যে ও সন্তানের জন্য পাগল হয়ে গেছিল। তারপর একজন ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করে একটু ঠিক হয়। এই ৬-৭ মাসে চারটে ট্রিপ করে ফেলেছে ওরা। ঘুরতে গেলে ওর মনটা একটু ভালো থাকে। কিন্তু আবার সেখানে যখন কোনও ছোট বাচ্চাকে দেখতে পায় তখন ওর মনের ভেতরটা কী যে হয়।
এইবার ওর মনে এত আশা জেগেছে। যদি এবারও কিছু সমস্যা হয়? ওকে তো রাখা যাবে মা! ওর ডিপ্রেশন চরম মাত্রায় পৌঁছে যাবে। এই ভয়টাই এখন অভীককে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
(৬)
একটা অন্ধকার ঘর। খুব হালকা পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে। যার ফলে ঘরে একটা আলো আঁধারের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে ঘরটার মধ্যে। ঘরটায় দম মিলিয়ে একটি মাত্র জানলা। সেটা বন্ধ করা। এমনকি দরজাটাও বন্ধ! এই ঘরে থেকে দিন বা রাত বোঝার একটাই উপায়। উপরের দিকের একটা ভেন্টিলেয়ার। দিনের বেলায় ওখান দিয়ে আলো আসে আর রাতে আসে না। সারা ঘরে আসবাব বলতে কেবলমাত্র একটা খাট, একটা ড্রেসিং টেবিল আর একটা আলমারি। এর বাইরে আর কিচ্ছু নেই। ঘরটাও অবশ্য খুব একটা বড় না। সাধারণ ঘরের থেকেও খানিকটা ছোটই বলা চলে।
সিঙ্গেল বেডের খাটটার উপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে একটা নারী শরীর। অস্থিরভাবে এপাশ ওপাশ করছে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না কি অসুবিধা হচ্ছে তার। শুধু মনে হচ্ছে ফুলে থাকা পেটটার মধ্যে কিছু যেন একটা হচ্ছে। উঠে বসে মেয়েটা। সে গর্ভবতী। পেটে একটা হাত রেখে বোঝার চেষ্টা করে ঠিক কী অস্বস্তি হচ্ছে ওর। তারপর ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে এগিয়ে আসে আয়নার দিকে। ঠিক করে চলতে পারছে না মেয়েটা। একটু পা টেনে টেনে একটু ধীরে ধীরে আর খুব অসুবিধার মধ্যে সে একটু একটু করে এগিয়ে আসে আয়নাটার কাছে। আয়নার পর্দা সরিয়ে দেখার চেষ্টা করে নিজেকে। আলো অন্ধকার ঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে ওর মুখ, রং, শরীর সবকিছু কেমন যেন একটা অন্ধকারের ছায়া পড়ে গেছে। নিজেকে দেখতে যে কেমন লাগছে সেটাই ও বুঝে পায় না! মেয়েটা মুখের ওপরে এলিয়ে থাকা চুলগুলো দুই হাতে সরিয়ে দেখে নিজেকে। চোখের তলায় বিস্তর কালি পড়েছিল যেদিন নিজেকে শেষবার ভালো করে দেখেছিল ও। কালিটা এখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আসলে ঘরের পরিবেশটা এমন যে ও কালি আর আলাদা করে বোঝা যাবে না। এই সময় সবাই বলে মেয়েদের চেহারা খারাপ হলেও দেখতে ভালোই লাগে। ওকেও কি ভালো লাগছে? কী করেই বা লাগবে? ওষুধ খাওয়াদাওয়া ঠিক হলেও মনের যত্ন কোথায়। নিশ্চয়ই ও দেখতে খুব বাজে হয়ে গেছে! খুব কান্না পায় মেয়েটার। কাঁদতে থাকে ও। পেটের উপর ডান হাতটা রেখে শুধু বলে, ‘আমি এসব চাইনি! চাইনি আমি এসব! না চাইতেই এমন দিন দেখতে হল। এই দিনটার জন্য তো সব মেয়েই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমার কাছে এভাবে এল কেন এই দিনটা? না আমি তার আনন্দ অনুভব করছি না বাদ দিয়ে থাকতে পারছি। আবার নিজের এই অংশকে অস্বীকারও করতে পারি না। কিসের যেন একটা টানে বেঁধে গেছি।’
কান্না থামায় মেয়েটা। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, ‘এসব ভেবেই বা কী লাভ? আমি তো আর ধরে রাখতে পারব না তোকে! আমি কী করব? আমার আর কি কিছুই করার নেই? বল! তুই বল তোর আমার সম্পর্ক কি এটুকুই? কেন হল তোর আর আমার সম্পর্ক? আমিতো চাইনি! আর যখন হল তখন কী করে ছেড়ে দিই? শুধু দিন গুনছি তোর থেকে আমি কবে যেন আলাদা হয়ে যাব। তুই তখন থাকতে পারবি আমাকে ছাড়া? আমি থাকতে পারব? কে জানে! সব হয়তো মানিয়ে যায়।’
এই শেষ কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ করে একটা যন্ত্রণা অনুভব হয় মেয়েটার। চিৎকার করে ওঠে সে। কিছু একটা ঘটতে চলেছে বুঝি! তবে কি সেই সময় এসে উপস্থিত হল? মেয়েটা কোনওক্রমে পা টেনে টেনে বিছানার কাছে এসে বসে। যন্ত্রণাটা দেখতে মারাত্মক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে, আর সহ্য করতে পারছে না। চিৎকার করে ওঠে আর সেই চিৎকারে মনে হয় যেন ওর শরীরের সমস্ত শক্তি বেরিয়ে যাচ্ছে। চেষ্টা করে ও নিজেকে টেনে বিছানায় শোয়াতে। কিন্তু পারে না। মেঝের উপর পড়ে গেল। আর তারপরেই যন্ত্রণাটা আরও বেড়ে গেল। এইবার সে আরও জোরে কোকিয়ে ওঠে। ওর আর্তনাদ আর কান্নার শব্দে গোটা ঘর গমগম করে উঠছে। মেয়েটার মনে হয় ও এবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। এই যন্ত্রণা ও আর সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু তার মধ্যেও ও শুনতে পেল কিছু পায়ের শব্দ। ওর মনে হল কারা যেন উপরের দিকে উঠে আসছে। কেউ কি ওকে বাঁচাবে? নাকি ওইভাবেই পড়ে থাকবে ও? আর মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে? হ্যাঁ ওইতো। দরজাটা খুলে গেছে। বাইরের আলো এসে ঢুকছে ঘরের মধ্যে। আর দুটো ছায়া মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা বুঝল তাদের মধ্যে একটা নারী মূর্তি এবং অন্যটি পুরুষ মূর্তি। তারা দু’জনেই ওর দিকে এগিয়ে আসছে। কী যেন বলছে চিৎকার করে। কিন্তু মেয়েটার কানে ঢুকছে না। শুধু একটা ক্ষীণ শব্দ আসছে কানে। ওরা ছুটে আসছে ওর দিকে। ওরা কি ওকে বাঁচিয়ে নেবে। আর বাচ্চাটাকে? ওকে বাঁচিয়ে নেবে তো? মেয়েটার যন্ত্রণার মধ্যেও ওর পেটে থাকা বাচ্চাটার কথা মনে হয়। আর ডান হাতটা অজান্তেই পেটের উপরে উঠে আসে। গর্ভধারিণী মা সকল বিপদ থেকে যেন বাঁচানোর পণ করেছে তার শিশুকে। আর কিছু বুঝতে পারল না মেয়েটা। হাতটা পেটের উপরে দিয়েই ও জ্ঞান হারাল।
(৭)
রাত দেড়টা বাজে। কলকাতা শহর এখনও সজাগ! হ্যাঁ অলিতে গলিতে থাকা বাড়িগুলো ঝিমিয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু বড় রাস্তার বড় বড় স্ট্রিটলাইটগুলো আর দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা গাড়িগুলো এখনও শহরটাকে জাগিয়ে রেখেছে। তবে ওই ব্যস্ত বড় রাস্তার থেকে অনেকটা ভিতরে সরে এসে বস্তিগুলো এখন নিঝুম। ঘুপচি গলিগুলো ফাঁকা। এরকমই একটা বস্তিতে ঢোকার রাস্তাটায় হেঁটে চলেছে রতন। কাজ সেরে সে অনেকক্ষণই ফিরে আসতে পারত। কিন্তু কাজের পরে জমে ওদের একটা আড্ডা। সেই ঠেকেই রাত অবধি পড়ে থাকে ও। কতদিন ভোর রাতে বাড়ি ফেরে। সেখানে ভালোরকম খানাপিনা চলে! রোজ খানাটা অবশ্য ওই টুকটাক চাটেই সীমাবদ্ধ। আসল মেইন কোর্স ওখানে পানীয়। সেখান থেকে মোটামুটি পুরো মাতাল অবস্থায় রতন বেরিয়ে এসেছে। টলতে টলতে এসে এই সবে নিজের বস্তির রাস্তাটা ধরেছে। আর গুনগুন করে গেয়ে চলেছে হিন্দি গানের লাইন—‘ঝুমে জো পাঠান… মেরি জান… মেহফিল জম্ জায়েগি!’
শাহরুখ খানের ‘পাঠান’ সিনেমাটা বেশ কিছুদিন হল সিনেমা হলে গিয়ে দেখে এসেছিল রতন। শাহরুখ খান ওর প্রিয় হিরো। আরেকটা সিনেমা বেরিয়েছে ওর প্রিয় হিরোর। জওয়ান! সেটাও দেখতে যাবে রতন। আসলে ওর আদব-কায়দা একটু আলাদা। না না। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো বস্তির বাকি লোকগুলোর মতন দিন আনি দিন খাই অবস্থায় না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে সিনেমা দেখবে এমন লোক রতন নয়। সে ভারী হিসেবি লোক। তবে ভালো-মন্দ খেয়ে-পরে মাঝে মধ্যে সিনেমা হলে শাহরুখের সিনেমা দেখা কিংবা রেস্টুরেন্টের খাবার এনে খাওয়ানোর মতন সামর্থ্য রতনের আছে। এই এঁদো বস্তিতে ও পড়ে রয়েছে কেবল জন্মস্থান বলে। তবে বেশিদিন না! রতনের ইচ্ছা একটা ভালো জায়গা দেখে ভাড়া উঠে যাবে! তবে তাতেও একটা সমস্যা আছে। ভালো পাড়ায় গিয়ে থাকতে গেলে যেটুকু বিদ্যে ওর আর ওর বউয়ের লাগবে সেটা ওদের নেই। দেখা যাবে সেই পাড়াতে গিয়ে ওর বউ হয়তো কারও সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিল। সেই রিস্কটা নিতে পারছে না রতন। সেই জন্যই আর যেতে পারছে না। ভালো বাড়িতে না যেতে পারলেও রতন পরিবারের লোকদের স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ওর মেয়েটা একদম পড়াশোনায় ভালো না। ক্লাস এইটে পড়ে। কিন্তু কোন একটা ছোকরার সাথে নাকি ঘুরে বেড়ায়। স্কুলে যায় না। রতনের কানে খবর এসেছে। রতন ঝুটঝামেলায় যায় না। ও বুঝে গেছে মেয়েটার দ্বারা পড়াশোনা হবে না। ঠিকই করে নিয়েছে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দেবে। কোনদিন পালিয়ে যাবে! তার চেয়ে ছি ছি হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া ভালো। ওই ছেলে তখন বিয়ে করতে না চাইলে অন্য ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেবে। মেয়েটা বাউন্ডুলে হলেও রতনের ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ক্লাস সিক্সে পড়ে। ওকে ভালো টিউশনি দিয়েছে রতন। ইচ্ছা আছে কলেজ পাশ করাবে ভালোভাবে। তার জন্য টাকা লাগবে অনেক। তাই হিসাব করে জমিয়ে রাখছে সব। ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেলে ও আর কাজ করবে না! চায়ের দোকানটাও বেচে দেবে। ধুর! অত পোষায় নাকি তখন? তাছাড়া তখন সে চাকরিওয়ালা ছেলের বাপ! চায়ের দোকান চালাবে না মোটেই। পায়ের উপর পা তুলে আরামে দিন কাটাবে।
নিজের বস্তির পাড়ায় ঢুকে পড়ল রতন। সবাই মোটামুটি ঘুমিয়ে পড়েছে। দু-একটা বাড়িতে আলো জ্বলছে টিমটিমে। কোনওক্রমে টাল খেতে খেতে যখন বাড়ির গলিটায় বাঁক নেবে তখনই কিসে যেন একটা ধাক্কা খেয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল রতন। সামলে নিয়েছে কোন মতে। রাগের চোটে গালি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে ‘শালা! রাস্তার মাঝখানে বস্তা কে রাখলি রে?’ কিন্তু পরক্ষণেই পিছন ফিরে তাকিয়ে রতনের ভুল ভাঙল। না বস্তা তো নয়। একটা মানুষ মনে হচ্ছে। নিজেকে সামলে কোনওমতে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে রতন। চোখ সরু করে বোঝার চেষ্টা করে এটা কে। কিন্তু পেটে যা পড়েছে তাতে ভালো করে তাকানো ওর পক্ষে মুশকিল। একটু কাছে এগিয়ে আসে ও। এটা মানুষ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কে সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
‘এ কে রে তুই? রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’ লোকটা কোনও উত্তর দেয় না। রতনের মাথা গরম হতে শুরু করে, ‘কীরে কানে বয়রা নাকি? শুনতে পাস না? রাস্তার মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’
সেই ব্যক্তি এবারও কোনও উত্তর দেয় না। রতন ভীষণ রেগে গেছে। একে ওর মাতাল অবস্থা। তার ওপর এত রাত হয়েছে! খুব ঘুমও পেয়েছে। তার উপর বাড়িতে যেতে যাবে আর রাস্তার মাঝখানে একটা লোক যদি খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকে কেমন লাগে! আর একটু হলে রতন গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত নর্দমাটার মধ্যে। নোংরা নর্দমা—গোটা বস্তির নোংরা জল ওটা দিয়েই পাস করে।
‘এটা দেখি শুধু বয়রা না। মুখেও বোবা! তবে রে! মাঝ রাতে ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সাথে? দাঁড়া! দেখাচ্ছি তোকে মজা শালা! আজকেই তোর নটাঙ্কি শেষ করব আমি।’ কথাটা বলে রতন রাস্তার আশপাশে কিছ একটা খুঁজতে লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাশে একটা ছোট লাঠি পড়ে থাকতে দেখে। খুব একটা শক্তপোক্ত সেটা নয়। তবু এই অবস্থায় রতনের মনে হয় ওটাই ওর অস্ত্র! হয়তো ছাগল তাড়ানোর মতন করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মানুষটাকেও এই সরু লাঠির বাড়ি মেরে তাড়িয়ে দেবে এমনটাই ভেবেছে ও। রতন লাঠিটাকে তুলে নেয়। তারপর সামনের প্রতিপক্ষর দিকে এগিয়ে আসে ‘তবে রে শালা! আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন!’ বলে এগিয়ে আসে। রতনকে এগিয়ে আসতে দেখে সে এইবার একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। মনে হল প্রতিপক্ষর সাথে এইবার যুদ্ধে নামবে সে। তবুও মুখে কোনও কথা বলল না।
রতনও উল্টোদিকের মানুষের প্রস্তুতি দেখে ভিতর থেকে নতুন উদ্যম পেল। ডান হাতে ধরে থাকা লাঠিটা উঁচিয়ে প্রথম প্রহার করতে গেল। আর ঠিক তখনই গ্লাভস পরা হাতে সে রতনের লাঠি ধরে রাখা হাতটা ধরে ফেলে। আর মুহূর্তে এক মোচড় দিতেই লাঠিটা হাত থেকে পড়ে গেল রতনের। ও চিৎকার করে উঠল। তবে সে চিৎকারের শব্দ হওয়ার আগেই সেই ব্যক্তি আর এক হাত দিয়ে রতনের মুখ চেপে ধরল। রতন বুঝতে পারছে না ঠিক কী হচ্ছে। এই লোকটা ওর সাথে এমন ব্যবহার করছে কেন? এইবার সেই ব্যক্তি রতনকে এক ঝটকায় রাস্তায় ফেলে দিল। রতনের এমনিতেই মদ্যপ অবস্থা। ঠিক করে দাঁড়াতে বা চলতে পারছে না। তার উপরে গায়ের জোরটাও কম কম লাগছে। সেখানে একজন এইভাবে গায়ের জোরে ওকে মাটিতে ফেলে দিতে ও বিশেষ প্রতিরোধ করতে পারেনি। হঠাৎ করে রাস্তায় আছড়ে পড়ায় হাঁটুতেও জোর লেগেছে। নিজেকে ধাতস্থ করে একটু ওঠার চেষ্টা করতে লাগল রতন। ওর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটা ওকে খেয়াল করল। আর তারপরেই রতনের কাছে এসে সজোরে একটা হাতে বাড়ি মারল রতনের ঘাড়ে। রতন একটু কোকিয়ে উঠতে গেল। কিন্তু তখনই সেই ব্যক্তি ওর মুখটা আবার চেপে ধরল। তারপর ট্রাউজারের পকেট থেকে দ্রুত বের করে নিল ধাতব অস্ত্রটা। রতন পিছন ফিরে থাকায় বুঝতে পারল না ওর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যক্তি আরেক হাতে বের করেছে ওর মৃত্যুবাণ। আর সময় নষ্ট করেনি সে। ধারালো ছুরিটা বের করেই চালিয়ে দিল রতনের গলায়। ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত বেরিয়ে এল। রতন ছটফট করতে লাগল। ওর মুখ থেকে এখন সেই হাতটা সরে গেছে। কিন্তু ওর গলা দিয়ে আর আওয়াজ বের হচ্ছে না। যুদ্ধ শেষে শত্রু নিধন করে সেই ব্যক্তি নির্দ্বিধায় সেখান থেকে উঠে চলে গেল। পিছন ফিরে একবারও দেখল না রতনের কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে থাকা শরীরটাকে। আর তারপর কোথায় যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে।
(৮)
‘নেক্সট কে আছেন? চার নম্বর স্লিপটা যার কাছে আছে তিনি চলে যাবেন।’ রিসেপশন ডেস্ক থেকে একটি সুন্দর সুসজ্জিত মেয়ে বেশ জোর গলায় কথাটা বলল সামনে বসে থাকা কতগুলো মানুষের উদ্দেশ্যে। এটা একটা ঝাঁ চকচকে আইভিএফ ক্লিনিক। ছোটখাটো নার্সিংহোম টাইপের বলা যায়। পাশাপাশি দুটো বিল্ডিং। এই বিল্ডিংয়ে পেশেন্টের ডাক্তারের সাথে ভিজিট হয় আর পাশের বিল্ডিংয়ে হয় ডেলিভারি বা অন্য এমন ট্রিটমেন্ট যার জন্য ভর্তি থাকতে হয়।
মেয়েটার কথা শুনে সামনে সারিতে বসে থাকা একটি দম্পতি উঠে এগিয়ে গেল সামনের দিকের ঘরটার দরজার সামনে। ভিতর থেকে আর এক দম্পতি দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল। আর তারা বেরিয়ে আসতেই এই দম্পতি আবার দরজা ঠেলে ভিতর ঢুকে গেল। ওরা দরজাটার ভেতরে ঢুকে যেতেই সুনেত্রার বুকটা ধক করে উঠল। হাতের আঁকড়ে থাকা টোকেনটাকে দেখে নিল। তাতে লেখা আছে নাম্বার ফাইভ। অর্থাৎ এই যে দম্পতি এক্ষুনি ভিতরে ঢুকে গেল এরা বেরোতেই সুনেত্রাদের ডাক পড়বে। সুনেত্রার খুব ভয় করছে। এখানে আসার আগে মনের মধ্যে যত সাহস ছিল সব যেন কুঁকড়ে কোথায় ভিতরে ঢুকে গেছে। এখন গোটা মন আর শরীর জুড়ে শুধু ভয় আর ভয়ের আবেশ। অভীক সুনেত্রার ডান হাতটা চেপে ধরল। ও বুঝতে পেরেছে এই মুহূর্তে সুনেত্রার মনের ভেতর ঠিক কী চলছে। ভয় অভীকেরও লাগছে। এক প্রকার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিল ও। সবকিছুকে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু সুনেত্রার এই একটা প্রচেষ্টায় ওর মনের কোণেও আবার আশার প্রদীপটা দপ করে জ্বলে উঠেছে। আর সেই জন্যই অভীকের মনেও ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। প্রায় দশ মিনিট সময় পার হয়ে গেল। এই ডাক্তার বেশ অনেকক্ষণ ধরে সব পেশেন্টকে দেখছেন। আসলে এখানে যাঁরাই এসেছেন তাঁদের সকলে একই নৌকার যাত্রী। তাই ডাক্তারের চেম্বারে এখানে শুধু শারীরিক চিকিৎসাই হয় না, মানসিক ভরসাটাও দিতে হয়। ফলে সময় লাগে।
আরও দশ মিনিট পার হতে সেই রিসেপশন ডেস্কে বসে থাকা মেয়েটির সামনে রাখা বেলটা বেজে উঠল। তৎক্ষণাৎ সে আবার বলে উঠল, ‘নেক্সট! নাম্বার ফাইভ! পাঁচ নম্বর টোকেন যার কাছে আছে এবার তিনি যাবেন।’
একটা ভারী বরফের চাঁই যেন সুনেত্রার শরীরের উপর থেকে নিচের দিকে নেমে গেল। এইবার ওর পালা। কে জানে ডাক্তার কী বলবেন! এখানে বসে থাকা সকলেরই বোধ হয় সুনেত্রার মতনই অবস্থা। সকলেরই মনের মধ্যে ভয় এবং আশা দুটোই পাশাপাশি বাস করছে। সুনেত্রা আর অভীক উঠে দাঁড়ায়। এবার এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
***
‘হ্যাঁ! বসুন। আপনাদের টোকেনটা এখানে রেখে দিন।’
সুনেত্রা এবং অভীক ভিতরে ঢুকতেই টেবিলের ওপাশে বসে থাকা ভদ্রলোক কথাটা বললেন। ইনি ডঃ তিমির কর।
টেবিলের উপর একটা ছোট্ট বাক্সের মধ্যে টোকেনটা রেখে দিল সুনেত্রা। তারপর ও আর অভীক টেবিলের এপাশের দুটো রিভলভিং চেয়ারে বসল। ওরা বসতেই ডাক্তারবাবু ওদের ফাইলটা দেখতে চাইলেন। অভীক ওর হাতে ধরে রাখা ফাইলটা ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিল। ডক্টর কর বেশ কয়েক মিনিট ধরে ফাইলটা ভালো করে দেখলেন। তার ভেতরের থাকা প্রতিটা রিপোর্ট এবং বেশ কিছু প্রেসক্রিপশন সবটাই ভালো করে চেক করলেন। তারপর ফাইলটা বন্ধ করে বললেন, ‘আপনারা জানেন নিশ্চয়ই আপনাদের সমস্যার কথা?’
সুনেত্রা আর অভীক দু’জনেই মাথা নাড়ে। ডাক্তার কর বলেন, ‘দেখুন আইভিএফ প্রসেসটা সম্পর্কে আপনাদেরও জানা উচিত। এখানে নরমাল প্রসেসে যাদের বাচ্চা হয় না অর্থাৎ নরমাল প্রসেসে যাঁরা কনসিভ করতে পারেন না তাঁরাই আইভিএফ চিকিৎসা করাতে আসেন। মেল ডোনারের থেকে স্পার্ম এবং ফিমেল ডোনারের থেকে এগ কালেক্ট করা হয় এবং সেটা আর্টিফিসিয়ালি ফার্টিলাইজ করিয়ে পরিস্থিতি বুঝে মাদার বডিতে প্রতিস্থাপন করা হয়। সেখানে একটা বিষয় খুব ইম্পর্ট্যান্ট। মাদার বডিকে বেবি ক্যারি করার জন্য উপযুক্ত হতে হবে। এখানে আপনাদের রিপোর্ট অনুযায়ী মি. বোস আপনার কোনও প্রবলেম নেই। মিসেস বোসের এগ কালেকশনেও কোনও প্রবলেম হওয়ার নয়। সেটা আগে থেকে মেডিসিন দিয়ে ট্রিটমেন্ট করে কোয়ালিটি এনহেন্স করা সম্ভব। কিন্তু…’ একটু থামলেন ভদ্রলোক। এভাবে সব সমস্যার কথা একসাথে বললে পেশেন্ট পার্টি ঘাবড়ে যায় টেনসড হয়ে পড়ে। এমনিতেই এখানে যারা আসে তারা অনেক ভরসা, অনেক আশা নিয়ে আসে। তাদের আচমকাই এত মেডিক্যাল টার্ম আর কঠিন বাস্তবের কথাগুলো একটানা বলে গেলে মুশকিল।
অভীক বলে, ‘আমার ওয়াইফের আরেকটা কিছু প্রবলেম আছে। সেটা বলছেন?’
‘হ্যাঁ! ওঁর যে প্রবলেমটা আছে তাতে ইউটেরাসের ক্যাভিটি ভীষণই ছোট। আপনারা তো জানেনই যে একটা ফেটাস বড় হয় আস্তে আস্তে মায়ের শরীরে। তাহলে তাকে ক্যারি করতে যতটা জায়গা প্রয়োজন এবং ইউটেরাসকে যতটা স্ট্রং হতে হবে। আপনার সেক্ষেত্রে… একটু সমস্যা আছে।’
‘ডক্টর! আমার কেন এই রোগ হল? এর কি কোনও ট্রিটমেন্ট নেই?’ সুনেত্রার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। ইনিও কি তবে কোনও আশা দেবেন না?
‘দেখুন! এটা কেন হলর উত্তর কিন্তু আমাদের কাছে নেই। মেডিক্যাল সায়েন্সে এটা রেয়ার ডিজিজ। অবশ্য খুব রেয়ার বলা চলে না। প্ৰায় প্রতি চার হাজার জন মহিলার মধ্যে একজনের এই রেয়ার ডিজিটা দেখা যায়। এটা জন্মগত। অর্থাৎ আপনি ইউনিকর্ণয়েট ইউটেরাস নিয়েই জন্মেছেন। পরবর্তীতে সেটা ডেভেলপ করেনি। তাতে আপনার কোনও দোষ নেই। আমি এরকম বলছি না যে কনসিভ একেবারেই করা সম্ভব নয়। এমন ক্ষেত্রেও অনেক সময় কনসিভ করা সম্ভব হয়। কিন্তু যেটা সমস্যা হয় সেটা হচ্ছে মিসক্যারেজের সম্ভাবনা থেকেই যায়। তবে হোপ ফর দ্য বেস্ট! মিরাকেল তো ঘটে। আমরা ট্রাই করে দেখি একবার আইভিএফ সফল হয় কি না। তারপর পরবর্তী ভাবনাটা ভাবা যাবে। তবে তার আগে আপনার যাবতীয় টেস্ট আমাদের ক্লিনিক থেকে করাতে হবে। কারণ এই পুরনো কোনও রিপোর্টকেই আমি সেই ভাবে ভরসা করতে পারব না। এখানে এটাই নিয়ম। সম্পূর্ণটা আমার তত্ত্বাবধানে হবে টেস্টগুলো। দেখি আগে এই সমস্যা সত্যিই আছে কি না।’
‘ডক্টর ঠিক হয়ে যাবে তো সবকিছু?’ সুনেত্রা প্রশ্ন করল।
‘ওই যে বললাম। মিরাকেল তো ঘটে। ভগবানের উপর আস্থা রাখুন। প্রে করুন।’ খসখস করে কিছু লিখলেন ডঃ কর। তারপর আবার বললেন, ‘আপনি চাইলে আজকে কিছু টেস্ট করে নিতে পারেন। আর বাকিটা কালকে করিয়ে নিতে পারেন। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা প্রসেসটা শুরু করি। আর হ্যাঁ এই আইভিএফ ট্রিটমেন্ট কিন্তু বেশ কস্টলি! সেটাও মাথায় রাখতে হবে।’
‘আমরা জানি ডক্টর। এটা খরচসাপেক্ষ। আপনি ভাববেন না।’ কথাটা বলে অভীক উঠে দাঁড়ায়। ডঃ কর ফাইলটা অভীকের দিকে এগিয়ে দেন। তারপর ফাইলটা নিয়ে ওরা ডক্টরের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসে। ওরা বেরিয়ে এসে ডাক্তারের নির্দেশমতো রিসেপশনে যায়। সেখানে রিসেপশনে থাকা মেয়েটি পাশের একটি ছেলেকে বলে ওদের পাশের বিল্ডিংয়ে নিয়ে যেতে। সেখানেই যাবতীয় টেস্ট হয়।
সুনেত্রা ও অভীক রিসেপশনের ছেলেটির সাথে যেতে শুরু করে। এই ছেলেটি পেশেন্ট অ্যাটেন্ডেন্ট। পাশের বিল্ডিংয়ে পৌঁছতেই ওরা বুঝতে পারে এটা একটা নার্সিংহোম। আর এখানে টেস্টও হয় আবার ডেলিভারিও হয়। সুনেত্রা আর অভীক নার্সিংহোমে ঢুকে ফার্স্ট ফ্লোরে উঠতেই সুনেত্রার নজর যায় করিডরের বাঁদিকে একদম শেষ প্রান্তে বন্ধ সাদা দরজাটার দিকে। তার উপরে লেখা আছে ওটি! দরজার বাইরে কয়েকজন চেয়ারে বসে আছে। একজন ভদ্রলোক পায়চারি করছেন। এই পরিবেশ দেখলেই বোঝা যায় ভিতরে কারওর ডেলিভারি হচ্ছে। আর বাইরে পায়চারি করা লোকটি নিশ্চয়ই বাবা হতে চলেছে। সুনেত্রার দৃষ্টি লক্ষ্য করে অভীকের নজরও যায় সেই দিকে। আর তখনই একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসে। বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে ওদের। একইসাথে আনন্দ আর কষ্ট হয়। সাদা দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে এলেন একজন নার্স। তার কোলে এক সদ্যোজাত! কী নিষ্পাপ মুখ। কী সুন্দর দৃশ্য। পরিবারের আনন্দ ভরা মুখগুলো এগিয়ে যাচ্ছে তার কাছে। এমন আনন্দঘন মুহূর্তের সাক্ষী কি কোনওদিন হতে পারবে অভীক আর সুনেত্রা? ওদের দু’জনেরই চটক ভাঙে সেই অ্যাটেন্ডেন্ট ছেলেটির ডাকে—’স্যার! এদিকে আসুন। আপনাদের টেস্ট এদিকে হবে।’ একদম ডানদিকের শেষ ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। তার ডাক শুনেই ওরা দু’জন সেদিকেই যায়। কিন্তু যেতে যেতে দু’জনেরই দৃষ্টি বারবার পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছিল ওই সুন্দর মুহূর্তটাকে।
(৯)
চোখের জল মুছে সার্টিফিকেটের ফাইলটা ব্যাগে ঢোকায় খুশি। তারপর চেনটা আটকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ও যতই বলুক কষ্ট তো ওর খুব হচ্ছে। মাকে ছেড়ে আজ অবধি কোনওদিন ও থাকেনি। পরিবারে তো সদস্য বলতে ওর মা আর ও। মা-ই মেয়ের জগৎ। আর মেয়ে মায়ের। ও যে ওর মাকে ছেড়ে কীভাবে শহরে থাকবে সেটা ভেবেই ওর কান্না পায়। আবার ওর মা যে ওকে ছাড়া কেমন করে সময় কাটাবে সেটা নিয়েও বেশ বুঝতে পারে না নিজের টিফিনের টাকা জমিয়ে মাকে একটা ছোট্ট টিভি কিনে দিয়েছে যাতে মায়ের সারাটা দিন ওকে ছাড়াও কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার থাকে খুশির মা সবই বুঝতে পারে খুশির এই প্রচেষ্টা যে তাকে খুশির অবর্তমানে ব্যস্ত রাখার জন্য তা সে ভালো করেই জানে আবার খুশিও সব বুঝতে পারে তার উপর মানে মায়ের যে কোনও কিছুতেই মন ভুলবে না সেটা সে ছাড়া আর কে বা ভালো জানে। সব সময় আনন্দে থাকার একটা অভিনয় করে ও দেখায়, ওর প্যাশন। ওর এতদিনের স্বপ্ন শহরে চাকরি করতে যাওয়ার—এইসব কিছু যখন সফল হচ্ছে তখন ও খুশি আছে ওর মায়ের চোখের সামনে ধরা পড়ে যায় কিন্তু এই সব নাটকের আড়ালে সত্যি কথা তো এটাই যে খুশির মন ভেতর ভেতর কাঁদে আর সেই ডুকরে ওঠা কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না আসে তাই মুখে ঝুলিয়ে রাখতে হয় এক টুকরো হাসি। যখন মা সামনে থাকে না তখন ও খুব করে কেঁদে নেয়। এই যেমন এখন ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ওর কান্নাই থামছে না। সত্যিই ভেবে পাচ্ছে না ওখানে গিয়ে মাকে ছাড়া ও কী করে থাকবে। ওর মাও ওকে ছাড়া কীভাবে যে দিন কাটাবে সেটা ভেবে পায় না।
‘না গেলেই তো পারতিস।’
কাঁধের উপর মায়ের হাতের স্পর্শ পেয়ে সজাগ হয়ে উঠল খুশি। না না, মাকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। ও যে এতক্ষণ কাঁদছিল এটা কি ওর মা বুঝে ফেলেছে? নিজেকে সামলে নিয়ে পিছন ফিরে হাসিমুখে বলে, ‘না গেলে কি হবে বলো? চাকরি তো করতে হবে! চাকরি করার জন্যই তো পড়াশোনাটা করলাম। তুমিও কত কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা শেষ করালে। আজীবন তোমাকে কী করে কষ্ট করতে দিই বলোতো? এইবার তো আমার পালা! তুমি আরাম করে থাকবে আর আমি চাকরি করে তোমার ইচ্ছা পূরণ করব!’
‘এখানেই না হয় গ্রামের স্কুলে পড়াতিস!’
‘মা এখানে গ্রামের স্কুলে পড়াতে গেলে আমাকে পরীক্ষা দিয়ে সরকারিভাবে যুক্ত হলে ঠিকঠাক মাইনে পাব। আর পরীক্ষা দিয়ে যে এখানে পাওয়া যাবে তার তো কোনও মানে নেই। দেখলে সেই অন্য কোথাও যেতে হবে। তাছাড়া এখানে যদি এমনিই চাকরি চাইতে যাই খুব বেশি মাইনে পাব না। তাতে কি তোমার-আমার চলবে সারাজীবন? তার চেয়ে যে চাকরিটা আমি পেয়েছি কলকাতায়, ওটা করলে একটু টাকাপয়সা আসবে। তাছাড়া এখানে থেকে কী করে সেটা সম্ভব বলো?’
‘আমি জানি রে তোরও খুব কষ্ট হচ্ছে। সে যতই তুই মিথ্যে অভিনয় করে যাস না কেন! মাকে ছেড়ে যেতে তোর কষ্ট হবে না এটা হতেই পারে না। আমি জানি এই গ্রামটা ছেড়ে যেতেও তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। হাজার হোক এখানেই তো তোর সব স্মৃতি! আমাদেরই কপাল! যে এইভাবে থাকতে হচ্ছে! তোকে বাইরে যেতে হচ্ছে আর আমি এখানে পড়ে থাকব একা একা। কীভাবে যে দিন কাটবে!’ খুশির মাথায় হাত রাখেন ওর মা।
‘মা আমি ওখানে একটু থাকার মতন ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে নিই তারপরে তোমাকে নিয়ে যাব চাকরিটা মোটামুটি পাকা হতেই।’
‘নারে মা! এই গ্রাম ছেড়ে আমি যেতে পারব না। এখানেই তো আমার সব চেনাজানা বল। ওখানে গিয়ে সেই ঘরের মধ্যে ঘরে বন্দি! তাছাড়া ওখানকার লোকজনের সাথে কথা বলার মতন অভিজ্ঞতাও তো আমার নেই। ভয়ে ভয়ে ভেতরে থাকতে হবে। তার চেয়ে আমার এই বাড়ি এই গ্রামই ভালো বল? খোলামেলা। সব চেনা মানুষ। তুই বরং ওখানে কিছুদিন চাকরি করে এখানে চলে আয়। তারপর কাছাকাছি কিছু একটা দেখে নিবি। বেশিদিন ওখানে থাকতে হবে না। তখন কাছেপিঠে ভালো ছেলে দেখে তোর বিয়ে দেব! আর প্রত্যেক মাসে কিন্তু এসে আমার সাথে দেখা করে যাবি।’ আঁচলের খুঁটে একবার চোখের জলটা মুছে নিল খুশির মা।
‘হ্যাঁ মা। প্রতি মাসেই আমি এসে তোমার সাথে দেখা করে যাব। কিন্তু ওসব বিয়ের কথা বলো না। এখন সেসবের সময় নয় আমার।’ চোখের জলটা আর আটকে রাখতে পারল না খুশি। যেই মা ওর প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী। তার সঙ্গে ওকে দেখা করতে হবে মাসে একবার? ভাবতেই বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেল। কিন্তু কী করবে ও? ওর মা ওকে বড় করতে অনেক কষ্ট করেছে একা হাতে সব দিক সামলেছে। এখন ওরও সময় এসেছে নিজের মাকে একটু সুখের দিন দেওয়ার। সেটা হাতছাড়া হতে দেয় কী করে?
খুশি ওর মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘খুব মন খারাপ করবে আমার কিন্তু তবুও আমাকে যেতে হচ্ছে মা! তুমি চিন্তা কোরো না তপন কাকার বুথে আমি ফোন করব ওখান থেকে। আমার কাছে তো মোবাইল নেই। প্রথম মাসে মাইনেটা পাই। তারপর আমার জন্য একটা ছোট ফোন আর তোমার জন্য একটা ছোট ফোন কিনে নেব। তাহলে তুমি আর আমি সব সময় কথা বলতে পারব কেমন!’
কিছু বলতে পারে না ওর মা। গলাটা বুজে আসছে। মেয়েকে ছেড়ে থাকার কষ্ট অন্য কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যায় না। মেয়েটা একা ওখানে কী করবে সে চিন্তাও দূর হয় না। চোখের জল মুছে বলে, ‘সব গোছানো হয়ে গেছে তো? আমি কিন্তু গুছিয়ে রেখেছিলাম তোর ব্যাগ। আবার কী এসব ওলটপালট করছিস?’
‘না মা কিচ্ছু করিনি। শুধু ফাইলটা ঢোকালাম। আর তো সবই তুমি দিয়ে দিয়েছ। হাতে বানানো নাড়ু, মুড়কি কত কিছু দিয়েছ!’
‘তা দেব না? আবার যখন সামনের মাসে আসবি তখন আবার এক মাসের এরকম ভরে দেব। হ্যাঁ রে ট্রেন কখন?’
‘এইতো এক ঘণ্টা পর। স্টেশনে গিয়ে দেখি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোব। তোমাকে আসতে হবে না মা ভ্যানস্ট্যান্ড অবধি। ওখান থেকে আবার তোমাকে একা একা ফিরতে হবে। তুমি এখানেই থাকো।’
‘সাবধানে যাস মা। মনে করে কিন্তু পৌঁছে আমাকে অবশ্যই ফোন করে দিবি। আমি বড্ড চিন্তায় থাকব।’
‘হ্যাঁ মা ফোন করব আমি। তুমি চিন্তা কোরো না।’
মাকে একটা প্রণাম করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে খুশি। ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই পিছন ফিরে একবার ওর মাকে দেখে। ওর মায়ের দু’চোখ ছাপিয়ে জল নেমেছে। দাঁড়িয়ে আছে দরজাটা ধরে। খুশির কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছে। কিছুই ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে ও যেন মায়ের থেকে অনেক দিনের জন্য দূরে চলে যাচ্ছে। এই একটা মাস যে কীভাবে কাটাবে কে জানে! কবে যে এসে আবার মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমোতে পারবে, মায়ের হাতের রান্না খেতে পারবে তাও জানে না! যখন আসবে তখন মন ভরে মায়ের কাছে থেকে যাবে। ও জানে
চাকরির শুরু সবে। এখন বেশি ছুটি ও পাবে না। তবে যতটুকুনি পাবে তাতেই মায়ের কাছে রাত জেগে হলেও মন খুলে সময় কাটিয়ে যাবে। আর তাকিয়ে থাকতে পারে না খুশি। এবার ওর চোখেও জলের ধারা নেমেছে। সামনে ফিরে এগোতে থাকে। উঠোন শেষে বেড়াটা পার হতেই খুশির মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে। মনে হলো মেয়েটা এই যে বেরোল না জানি আবার কবে বাড়ি ফিরবে। ইচ্ছা হল এক ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে বলবে ‘যেতে হবে না! লাগবে না ওসব কিছুই। যা হবে নুনে ভাতে মায়ে মেয়ে দু’জন এখানেই থেকে কাটিয়ে দেব। তুই যাস না।’
কিন্তু পারল না। এইসব কষ্টের বাইরেও একটা সত্যি আছে। তা হল মেয়েটার স্বপ্ন। মেয়েটা ছোট থেকেই পড়াশোনা করেছে। খুব কষ্ট করে মায়ের সাথে হাতে হাতে কাজ করেছে। ঘর সামলেছে। ওর মা তো এর ওর বাড়িতে টুকটাক কাজ করে সেলাই করে সংসারটাকে চালিয়েছে। সেই সময় বাড়ির যাবতীয় কাজ তো খুশিই সামলেছে। তার সাথে পড়াশোনাটাও করেছে। ও চিরকালই বলত ও বড় হয়ে চাকরি করবে। সেই যখন চাকরির সুযোগটা এল তখন কী করে ছেড়ে দেয়? এই চাকরিটা অবশ্য হঠাৎ করেই এল। ওদের গ্রামে একটি ছেলে আছে। পড়াশোনা করে একদিন বাইরে চলে গেল। কলকাতা শহরে চাকরি করে। মাঝেমধ্যে গ্রামে আসে। গ্রামের ভালো-মন্দ নিয়ে সে ভাবনাচিন্তা করে। আবার নিজের কাজে ফেরে। এই গ্রামের একটা ছেলের চাকরি ও করে দিয়েছিল। খুশির মা যখন তাকে বলেছিল খুশির পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে, সে চাকরি করতে চায় আর পড়াশোনা করতে চায় না! তখন সেই ছেলেটি বলেছিল সে-ই একটা চাকরির সুযোগ করে দেবে খুশিকে। আর কলকাতার ই একটা এনজিওতে খুশির চাকরি সে পাকা করে দেয়। বড় পরোপকারী ছেলে! খুশিকে সে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। তারপর তার সময় মতো সে কলকাতায় ফিরে গেছে নিজের কাজে। আর খুশিকে জানিয়ে গেছে কতদিনের মধ্যে তাকে চাকরিতে জয়েন করতে হবে। সেই অনুযায়ী এনজিওর তরফের অফার লেটারও সে খুশিতে দিয়ে গেছিল। কলকাতায় সে স্টেশনে খুশির জন্য অপেক্ষা করবে। ওখানে গেলেই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
সেই সব কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে খুশি আজ রওনা দিল। আগামিকাল মধ্যে তাকে জয়েন করতে হবে। তার আগে সে ওখানে পৌঁছাবে এবং এনজিওর যে হেড তার সাথে দেখা করে যাবতীয় ফরমালিটিজ পূরণ করবে।
