আজটেক সভ্যতার ইতিহাস
খ্রীষ্টায় প্রথম সহস্রাব্দে যখন গুয়াতেমালা ও ইউকাতান অঞ্চলে মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটছিলো, তখন মধ্য-মেক্সিকো অঞ্চলে আনুমানিক ৩০০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে টেওটিহুয়াকান শহরকে কেন্দ্র করে এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। বর্তমান ‘মেক্সিকো সিটি’ নগর থেকে পঁচিশ মাইল উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত ছিলো টেওটিহুয়াকান নগরটি। তারপর আনুমানিক ৯০০ খ্রীষ্টাব্দে মধ্য-মেক্সিকোতে টোলটেক সভ্যতা গড়ে ওঠে। সবশেষে মেক্সিকো অঞ্চলে আজটেক সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো।
.
টোলটেকদের কথা
৯০০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মেক্সিকো দেশের মধ্য অঞ্চলে টোলটেক জাতির এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। টোলটেকরা বড় বড় শহর নির্মাণ করেছিলো। টোলটেকদের রাজধানী বা প্রধান শহর ছিলো টোলান নগরী (বর্তমান টুলা)। মেক্সিকো সিটি নগরী থেকে ষাট মাইল উত্তর-পশ্চিম দিকে টোলান নগরীটি অবস্থিত ছিলো। টোলটেকরা বড় বড় দালান-কোঠা, মন্দির ও পিরামিড তৈরি করতো। এরা মায়াদের অনুকরণ করে লেখার কৌশল ও পঞ্জিকা তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেছিলো। টোলটেকদের রাজ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিলো।
১০০০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে নহুয়া ভাষাভাষী কতগুলো জাতির আক্রমণে টোলটেক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। এ সকল জাতির মধ্যে কলুহুয়া জাতি ছিলো বিশেষ পরাক্রমশালী। কুলহুয়াদের প্রধান শহরের নাম ছিলো কুলহুয়াকান। এ শহরটা ছিলো টেক্সকোকো হ্রদের দক্ষিণ তীরে। এ সময়ে টেক্সকোকো হ্রদের পূর্ব তীরে আরেকটা শক্তিশালী নগর রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিলো, তার নাম ছিলো টেক্সকোকো নগর। এ শহরের মানুষরাও ছিলো নহুয়া ভাষাভাষী। বর্তমান মেক্সিকো দেশের রাজধানী ‘মেক্সিকো সিটি’ নগরটি যেখানে অবস্থিত সে জায়গাতেই তখন ছিলো টেক্সকোকো হ্রদ। (আসলে এ হ্রদের প্রকৃত নাম কি তা বলা কঠিন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক একে মেক্সিকো হ্রদ বলেছেন, অন্য কোনো ঐতিহাসিক হয়তো একে বলেছেনা টেক্সকোকো হ্রদ। হ্রদটি এখন শুকিয়ে গেছে আর হ্রদের মধ্যবর্তী নগরগুলোর ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে উঠেছে বর্তমান কালের ‘মেক্সিকো সিটি’ নগরী।)
.
আজটেক সভ্যতা কাকে বলে
উপরোক্ত নহুয়া ভাষাভাষীরা মধ্য মেক্সিকো অঞ্চলে যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো তার নাম আজটেক সভ্যতা। প্রথমে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের অল্পকাল পরেই কুলহুয়া জাতির মানুষ, টেক্সকোকো রাজ্যের মানুষ, টেপানেক জাতির মানুষ ও অন্যান্যরা মধ্য মেক্সিকো উপত্যকায় মূলত একই ধরনের সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো। এ সংস্কৃতিরই নাম দেয়া হয়েছে আজটেক সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ১২০০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে এ অঞ্চলে টেনোচ্কা নামে আরেকটি নহুয়া ভাষাভাষী জাতি এসে বসবাস স্থাপন করে। টেনোচকারা টেক্সকোকো হ্রদের মাঝখানে একটা দ্বীপে বাস করতে শুরু করেছিলো। কালক্রমে, আনুমানিক ১৩২৫ খ্রীষ্টাব্দে বা তার কিছু আগে, টেনোচকারা ঐ দ্বীপ টেনোচ্টিটলান নামে একটা নগর স্থাপন করে। এ টেনোচকারাই ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সমগ্র মেক্সিকো অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। টেনোচকারা মধ্য মেক্সিকোতে দেরিতে এলেও তারা আজটেক সভ্যতাকে সফলভাবে গ্রহণ করেছিলো এবং সমগ্র মেক্সিকো অঞ্চলে তার প্রসার ঘটিয়েছিলো। তাই টেনোচকাদেরও আজটেক নামে অভিহিত করা হয়। টেনোচকাদের রাজধানী ছিলো টেনোচ্টিটলান। এ টেনোচ্টিটলান নগরের ধ্বংসাবশেষের উপরেই গড়ে উঠেছে বর্তমান মেক্সিকো দেশের রাজধানী ‘মেক্সিকো সিটি’ নগরটি। তাই টেনোচকাদের বলা চলে ‘মেক্সিকো নগরের আজটেক’।
১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে যখন স্পেনীয়রা মেক্সিকো আক্রমণ করেছিলো তখন তারা দেখতে পায় যে টেনোচ্কারাই সমগ্র মধ্য মেক্সিকো অঞ্চলে আজটেক সভ্যতার উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এ টেনোচ্কা জাতির রাজারাই ইউরোপীয়দের কাছে আজটেক রাজা নামে পরিচিত হয়েছিলো। এখনও সাধারণভাবে আজটেক রাজা বা আজটেক সম্রাট বলতে টেনোচ্কা জাতির রাজাদেরই বোঝান হয়ে থাকে, যদিও ঐ একই সময়ে মধ্য মেক্সিকো অঞ্চলে টেনোচকাদের পাশাপাশি অন্য দু একটি রাজবংশের রাজারাও (যথা, টেক্সকোকো ও টাকুবা রাজ্যের রাজারা) রাজত্ব করে গেছেন। আমরা এখানে অবশ্য আজটেক রাজা হিসেবে শুধুমাত্র টেনোচ্কা জাতির রাজাদের ইতিহাসই বর্ণনা করবো।
.
টেনোচকারা কোথা থেকে এল
টেনোচকারা (অর্থাৎ ‘মেক্সিকো শহর’ অঞ্চলের আজটেকরা) দাবি করে যে তারা আগে মেক্সিকো দেশের পশ্চিম অঞ্চলে আলান নামে একটা স্থানে বাস করতো। ১১৬৮ খ্রীষ্টাব্দে তারা এখান থেকে বের হয়ে নতুন বাসভূমির সন্ধানে পূর্ব দিকে যাত্রা করে। চলতে চলতে তারা কিছু দূর অন্তর অন্তর এক একটা স্থানে থামতো এবং সেখানে এক বছর বা দু’বছর থাকতো। তারপর আবার অগ্রসর হয়ে নতুন জায়গার সন্ধান করতো। এভাবে অগ্রসর হতে হতে টেনোচ্কারা শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর মধ্য অঞ্চলের টেক্সকোকো হ্রদের তীরে এসে পৌঁছায়। এখন যেখানে মেক্সিকো শহরটি অবস্থিত সেখানেই আগে ছিলো টেক্সকোকো হ্রদ। এ অঞ্চলে তখন টেপানেকদের আধিপত্য ছিলো। টেপানেকদের অনুমতি নিয়েই শুধু টেনোচকারা টেক্সকোকো হ্রদ অঞ্চলে আসতে পেরেছিলো।
কিছুকালের মধ্যেই টেনোচকাদের নানা রকম উৎপাতে বিরক্ত হয়ে টেপানেক, কুলহুয়া প্রভৃতি জাতিরা টেনোচকাদের আক্রমণ করে। শেষ পর্যন্ত টেনোচকাদের একটা বড় অংশ কুলহুয়াদের অধীনে বন্দী ভূমিদাস হিসেবে থাকতে বাধ্য হয়। টেনোচকাদের একটা অংশ অবশ্য পালিয়ে টেক্সকোকো হ্রদের মাঝখানের দ্বীপে চলে যায়।
কিছুকাল পরে কুলাহুয়ারা তাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বন্দী ভূমিদাস টেনোচকারা কুলহুয়াদেরও পক্ষে যুদ্ধ করার সুযোগ লাভ করে। এ যুদ্ধে টেনোচ্কারা যথেষ্ট বীরত্ব দেখিয়ে কুলহুয়াদের নেতা কক্সকক্সকে খুশি করতে সমর্থ হয়। তখন টেনোচ্কারা তাদের দলপতির সাথে কক্সকক্সের মেয়ের বিয়ে
দেয়ার জন্য তার কাছে আবেদন করে। কক্সকক্স এ প্রস্তাবে সম্মত হলে টেনোচকারা কৃতজ্ঞ চিত্তে তার মেয়েকে এনে দেবতার উদ্দেশে তাকে বলি দেয়। পরে সে রাজকন্যার গায়ের চামড়া খুলে নিয়ে একজন পুরোহিতের গায়ে পরিয়ে দেয়া হয়। এভাবে ঐ রাজকন্যাকে দেবীতে রূপান্তরিত করা হয়। পরে রাজকন্যার পিতা ঐ ধর্মীয় উৎসবে এসে সব ব্যাপার জেনে দুঃখে-ক্ষোভে বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং সমস্ত টেনোচকাদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। ভীত সন্ত্রস্ত টেনোচ্কারা প্রাণ নিয়ে হৃদের দিকে পালিয়ে যায়। এখানে আগে থেকেই টেনোচকাদের একটা দল বাস করছিলো। এভাবে টেক্সকোকো হ্রদের দ্বীপে বিচ্ছিন্ন টেনোচকাদের দুই দলের মিলন হয়। উল্লেখযোগ্য যে, শেষোক্ত দল কুলহুয়াকানদের নিকট থেকে যেটুকু সভ্যতা আয়ত্ত করেছিলো সে সভ্যতার বীজ তারা ঐ দ্বীপে বহন করে নিয়ে গিয়েছিলো। এদের দরুনই ঐ দ্বীপে পাথরের দালান-কোঠা ও মন্দির নির্মাণ সম্ভব হয়েছিলো। এরাই রাজতন্ত্র ও রাজ বংশের ধারণা ঐ দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিলো।
টেনোচকারা টেক্সকোকো হ্রদের মধ্যে দ্বীপের উপর যে নগর গড়ে তুলেছিলো তার নাম ছিলো টেনোচ্টিটলাটন। ১৩২৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যেই এ শহর যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো। ঐ সময়ে ঐ হ্রদে অন্য এক দ্বীপের উপর আরেকটি নগর গড়ে উঠেছিলো; তার নাম ছিলো লাল্টেলোকো। এ নগরের অধিবাসীরা ১২০০ খ্রীষ্টাব্দের আগে থেকেই এ দ্বীপে বাস করতো।
.
টেনোচ্কা তথা আজটেক সম্রাটদের ইতিহাস
টেনোচকারা রাজার বংশের একজন মানুষকে নিজেদের রাজা হিসেবে পাওয়ার জন্য কুলহুয়াকানদের কাছে আবেদন জানায়। কুলহুয়াকানরা তাদের কাছে একজন রাজাকে পাঠিয়েও দেয়। এ রাজার নাম আকামাপিলি। এ রাজা ১৩৭৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে টেনোচ্কাদের রাজা হিসেবে টেনোচটিটলানে রাজত্ব করেছিলেন। টেনোচ্কারা অবশ্য তখন টেপানেকদের মিত্র ছিলো এবং তাদের কর প্রদানও করতো।
আকামাপিলির মৃত্যু হলে ২য় হুইট্জিহুইট্ট্ল রাজা হন। এর পর রাজা হন হুইট্জিল্ইট-এর বৈমাত্রেয় ভাই চিমাল পোপোকা। চিমাল পোপোকা ১৪১৪ খ্রীষ্টাব্দে থেকে ১৪২৮ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ইতিমধ্যে টেপানেকরা কুলহুয়াকান, টেক্সকোকো প্রভৃতি রাজ্য ও তাদের অধীনস্থ অঞ্চলগুলো দখল করে নেয়। টেপানেকদের রাজা টেজোজোমোক ১৪১৮ খ্রীষ্টাব্দে টেক্সকোকো জয় করে নেয়। ১৪২৭ খ্রীষ্টাব্দে টেজোজোমাক মারা গেলে তার ছেলে ম্যাক্সলা টেপানেকদের রাজা হয়। টেপানেকদের এ নতুন রাজা আজটেক রাজা চিমাল পোপোকাকে হত্যা করে টেনোচ্টিট্লানকে জয় করে নেয়। ম্যাক্সলা টলাল্টেলোলকো রাজ্যকেও জয় করে নেয়।
টেনোচ্টিটলাটনের টেনোচ্কারা টেপানেকদের অধীনতা থেকে মুক্তিলাভের জন্য অধীর হয়ে উঠেছিলো। হ্রদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত ট্রাকোপান বা (টাকুবা নগরের মানুষরাও টেনোচকাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। টেক্সকোকো রাজ্যের পরাজিত মানুষরাও মুক্তিলাভের জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠে। টেক্সকোকো রাজ্যের সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী নেজাহুয়াল কয়ো তখন টেপানেকদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য দূরের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। তিনি এসে টেনোচকাদের নতুন রাজা ইটজকোটল-এর সাথে যোগ দেন। এ ভাবে ট্রাকোপান (টাকুবা)ও টেক্সকোকো রাজ্যের মানুষরা টেনোচকাদের (অর্থাৎ আজটেকদের) সাথে একজোট হয়ে টেপানেকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলো। এ তিন শক্তির আক্রমণের মুখে টেপানেকরা পরাজিত হলো। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আজটেকরা শক্তিশালী হয়ে উঠলো এবং হ্রদের তীরেও কিছু জমি অধিকার করলো। এ সময় আজটেকদের রাজা ছিলেন ইটজকোটল। তিনি ১৪২৮ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৪৪০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এখন থেকে আমরা টেনোচকাদের শুধুমাত্র আজটেক নামেই অভিহিত করবো।
ইটজকোটলই টেনোচকাদের আজটেক সভ্যতা গ্রহণ ও বিকশিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি রাজকর্মচারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে বিন্যস্ত করে শাসন- ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেন ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে পুরোহিততন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি টেনোচ্টিট্লান শহরটিকে বড় করে গড়ে তোলেন এবং বাঁধের মাধ্যমে দ্বীপের সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ সাধন করেন। ইটজকোটল ক্রমে মেক্সিকো উপত্যকায় স্বাধীন জাতিসমূহকে আজটেকদের রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজটেকদের এ সকল বিজয় অভিযানে টাকুবা ও টেক্সকোকোর রাজারাও সঙ্গী এবং ভাগীদার হিসেবে থাকতো। তবে এ তিন শক্তির জোটের মধ্যে আজটেকরাই ক্রমে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো।
ইটজকোটল-এর মৃত্যুর পর ১ম মন্টেজুমা ১৪৪০ খ্রীষ্টাব্দে আজটেকদের রাজা হন। তিনি পূর্ব দিকে পূয়েলা ও ভেরাক্রুজ পর্যন্ত আজটেক রাজ্যের বিস্তার সাধন করেছিলেন। তিনি দক্ষিণ দিকেও রাজ্যজয় করেছিলেন। তাঁর আমলে টেনোচ্টিট্লান নগরের সাংস্কৃতিক ও স্বাস্থ্যগত মানের উন্নতি সাধিত হয়েছিলো। তিনি নগরে ভাল পানি সরবরাহের জন্য দূরের চাপুটেকের ঝরনা থেকে ঐ নগর পর্যন্ত একটি পানির নালা ও একোয়েডাক্ট নির্মাণ করেন। তিনি দ্বীপনগরটির পূর্ব- সীমায় এক মস্ত বড় বাধ নির্মাণ করেন যাতে বর্ষাকালেও হ্রদের পানি রাজধানীতে প্রবেশ করতে না পারে।
পুয়েবলা অঞ্চলটিতে ধর্মীয় আচরণের অনেক জটিল বিকাশ ঘটেছিলো। আজটেকরা পুয়েবলা জয় করাতে এ সকল ধর্মমতের সংস্পর্শে আসে। তার ফলে এ অঞ্চলের নতুন দেবদেবীর নামে অনেক মন্দির আজটেকদের রাজ্যে তৈরি করা হয়। মন্টেজুমা মেক্সিকো অঞ্চলে প্রচলিত একটি নৃশংস প্রথাকে নতুন করে প্রচলন করেছিলেন। আজটেকরা দেবতার উদ্দেশে নরবলি দিতো। সাধারণত যুদ্ধবন্দীদেরই দেবতার উদ্দেশে বলি দেয়া হতো। যখন যুদ্ধ থাকতো না তখন মন্টেজুমা ‘ফুলের যুদ্ধ’ শুরু করার রীতি প্রবর্তন করলেন। এ অনুষ্ঠানে দুই দল যোদ্ধার মধ্যে লড়াই হতো শুধু যুদ্ধবন্দী সংগ্রহ করার জন্য। এ হতভাগ্য বন্দীদের দেবতার উদ্দেশে বলি দেয়া হতো।
১৪৬৯ খ্রীষ্টাব্দে ১ম মন্টেজুমার মৃত্যু হলে, তাঁর ছেলে আক্সায়াক্যাটলরাজা হন। তিনি আজটেকদের আধিপত্য পশ্চিমে ও দক্ষিণ দিকে আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। এ আজটেক সম্রাট পাশের দ্বীপ নগর, টলাটেলোকোর রাজাকে হত্যা করে এ নগরের উপর আধিপত্য বিস্তার করেন। এ নগরটি এতকাল পর্যন্ত স্বাধীন ছিলো এবং আজটেকদের সাথে সহযোগিতাও করতো। এ নগরটি সমগ্র মেক্সিকো এলাকার মধ্যে একটা ব্যবসার কেন্দ্ররূপে পরিচিত ছিলো।
আক্সায়াক্যাটল-এর আমলে আজটেকদের ধর্মীয় শিল্পকলা চরম বিকাশ লাভ করেছিলো। তাঁর সময়েই আজটেকদের বিশাল পাথরের তৈরী পঞ্জিকাটি নির্মিত হয়েছিলো। গোলাকার এ পাথরের ফলকের ওজন ছিল ২০ টনের বেশি (প্রায় সাড়ে পাঁচশ মন) এবং তার ব্যাস ছিলো ১৩ ফুট। এ পাথরের ফলকের উপর দিন মাস বছর প্রভৃতির হিসাব এবং জ্যোতির্বিদ্যা ও পঞ্জিকার অনেক হিসাব খোদাই করা হয়েছিলো।
১৪৭২ খ্রীষ্টাব্দে আক্সায়াক্যা-এর রাজত্বকালের শুরুতে, টেক্সকোকোর রাজা নেজাহুয়াল্কয়োটল মারা যান। ইনি ছিলেন প্রাচীন আমেরিকার ইতিহাসের এক স্মরণীয় ব্যক্তি। ইনি টেক্সকোকো রাজ্যকে টেপানেকদের আধিপত্য থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং আজটেকদের সাথে মিলে নিজ রাজ্যের পরিধি বাড়িয়েছিলেন। অবশ্য অনেক আগে থেকেই টেস্ককোকো রাজ্য মেক্সিকো অঞ্চলের এক বড় এলাকায় তার আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলো টেপানেকদের আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার পর টেক্সকোকো আবার ঐ সব রাজ্য থেকে কর আদায় করতে শুরু করেছিলো। নেজাহুয়াল্কয়োটল্ অনেক দালান- কোঠা, মন্দির ও সরকারী ভবন নির্মাণ করেন। তিনি ধর্মচর্চা ও শিল্পকলায়ও গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তিনি একজন বড় কবি ও বাগ্মী ছিলেন। ধর্মীয় প্রয়োজনে তিনি জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের চর্চাও করতেন। তিনি টেক্সকোকো রাজ্যে উত্তম শাসন-ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। টেনোচ্টিটলাটনের সাথে তিনি যে এতকাল পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছিলেন তাতে তাঁর প্রজ্ঞারই পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ রাজ্যলোভী আজটেকরা সর্বদাই ষড়যন্ত্র, হত্যা বা যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁর রাজ্য জয় করার জন্য উৎসুক ছিলো।
নেজাহুয়ালকয়োটল্-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নেজাহুয়ালপিলি টেক্সকোকোর রাজা হন এবং ১৫১৬ খ্রীষ্টাব্দে পর্যন্ত রাজত্ব করেন। নেজাহুয়ালপিলি ১ম মন্টেজুমার এক বোনকে বিয়ে করেছিলেন এবং পরে কোনো কারণবশত ১৪৯৮ খ্রীষ্টাব্দে এ রানীকে হত্যা করেছিলেন। এর ফলে আজটেকদের সাথে তাঁর বিরোধ দেখা দিয়েছিলো।
আজটেক সম্রাট আক্সায়াক্যাটল ১৪৭৯ খ্রীষ্টাব্দে মারা গেলে তাঁর ভাই টাইজক আজটেকদের সম্রাট হন। সম্রাট হয়েই তিনি যুদ্ধ দেবতা ও বৃষ্টির দেবতার উদ্দেশে দুটো মন্দির নতুন করে নির্মাণ করতে শুরু করেন। তিনি একটা বিশাল পাথরের পাত্র তৈরি করেছিলেন যার মধ্যে দেবতার উদ্দেশে বলি দেয়া মানুষের হৃৎপিণ্ডকে পোড়ান হতো।
১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দে টাইজক মারা গেলে তাঁর ভাই আহুইটজোটল আজটেকদের রাজা হন। তিনি সম্রাট হয়েই যুদ্ধ দেবতার মন্দির নির্মাণ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নেন। মন্দিরের উদ্বোধনের জন্য প্রচুর সংখ্যক নরবলির প্রয়োজন দেখা দেয়। আহুইটজোটল তখন নেজাহুয়ালপিলির সাহায্য নিয়ে দু বছর ধরে উত্তর অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার বন্দী ধরে নিয়ে আসেন। এ সব বন্দীদের দুই লাইন সার বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আহুইটজোটল ও নেজাহুয়ালপিলি নিজ হাতে পাথরের ছুরি দিয়ে তাদের বুক চিরে চিরে হৃৎপিণ্ড বের করেন ও সেগুলোকে দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। তারপর অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি এবং পুরোহিতরাও অনুরূপ সুযোগ লাভ করেন। এ রকম নৃশংস পদ্ধতিতে হৃৎপিণ্ড উৎপাটন করে দেবতাকে উৎসর্গ করা আজটেক ধর্মের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলো। কিন্তু একসাথে ২০ হাজার মানুষকে বলি দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ আজটেক ইতিহাসেও বেশি ঘটে নি।
১৫০৩ খ্রীষ্টাব্দে একটা বাঁধ মেরামতের কাজ পর্যবেক্ষণ করার সময়ে এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আহুইটজোটল মারা যান। তখন আক্সায়াক্যা-এর ছেলে ২য় মন্টেজুমা আজটেকদের সম্রাট হন। মন্টেজুমাও একবার এক বিদ্রোহী রাজ্য থেকে ১২ হাজার মানুষকে বন্দী করে এনে দেবতার উদ্দেশে বলি দিয়েছিলেন। এ মন্টেজুমার এক বোনকেই টেক্সকোকোর রাজা হত্যা করেছিলেন। মন্টেজুমা তাঁর বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে কৌশলে টেক্সকোকোর সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করেন। তারপর ১৫১৬ খ্রীষ্টাব্দে টেক্সকোকোর রাজা নেজাহুয়ালপিলি মারা গেলে মন্টেজুমা সে রাজ্যে নিজের পছন্দ মত একজনকে রাজা মনোনীত করেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে টেক্সকোকোর মানুষ বিদ্রোহ করে। এভাবে আজটেকদের সাথে গড়ে ওঠা টেক্সকোকোর দীর্ঘকালের মৈত্রী ও যুদ্ধজোট ভেঙ্গে যায়। ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে স্পেনীয় সেনাপতি কটেজ মেক্সিকো আক্রমণ করলে প্রথম দফায় মন্টেজুমা নিহত হন (১৫২০)। এর পর কুইটলাহুয়াক আজটেকদের রাজা হন। কিন্তু তিনি চারমাস পরেই বসন্ত রোগে মারা যান। তারপর আজটেকদের রাজা হন কুয়াউটেমক। চার বছর পর ১৫২৪ খ্রীষ্টাব্দে কটেজ-এর হাতে বন্দী হয়ে তিনি প্রাণ হারান। এভাবে স্পেনীয়দের আক্রমণে আজটেক সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়।
টেনোচটিক্লান-এর সম্রাটদের আজটেক্ তালিকা ও রাজত্বকাল
রাজা – রাজত্বকাল
১. আকামা পিলি – ১৩৭৬ খ্রীঃ-১৩৯১ খ্রীঃ
২. ২য় হুইটজিল্ হুইল – ১৩৯১- ১৪১৪ খ্রীঃ
৩. চিমাল পোপোকা – ১৪১৪-১৪২৮ খ্রীঃ
৪. ইটজ্কোটল্ – ১৪২৮-১৪৪০ খ্রীঃ
৫. ১ম মন্টেজুমা – ১৪০০-১৪৬৯ খ্রীঃ
৬. আক্সায়াক্যাটল – ১৪৬৯ – ১৪৮১ খ্রীঃ
৭. টাইজক্ – ১৪৮১-১৪৮৬ খ্রীঃ
৮. আহুইটজোটল – ১৪৮৬ – ১৫০৩ খ্রীঃ
৯. ২য় মন্টেজুমা – ১৫০৩ – ১৫২০ খ্রীঃ
১০. কুইট্লাহুয়াক্ – ১৫২০ – খ্রীঃ (৪ মাস)
১১. কুয়াউটেমক্ – ১৫২০ – ১৫২৪ খ্রীঃ
.
আজটেক অর্থনীতি
আজটেকদের জীবনযাত্রার ভিত্তি ছিলো কৃষিকাজ। ভুট্টা ছিলো তাদের প্রধান খাদ্যশস্য। আজটেকদের মধ্যে গোষ্ঠী এবং গোত্র প্রথা বজায় ছিলো। গোষ্ঠী প্রধানরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে চাষের জমি বিতরণ করে দিতেন। গোত্র প্রধানরা আবার গোত্রের অন্তর্গত বিভিন্ন পরিবারের কর্তাদের মধ্যে ন্যায্যভাবে জমি ভাগ করে দিতেন। জমির একটা অংশ সর্দার ও পুরোহিতদের জন্য, যুদ্ধের রসদের জন্য ও রাজার খাজনা দেয়ার জন্য রাখা হতো। সমাজের সব মানুষ মিলে বেগার খেটে এসব জমিতে ফসল ফলাতো। কোনো কৃষকের মৃত্যু হলে তার জমি তার ছেলেরা পেতো। কোনো কৃষক অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে অথবা জমিতে আবাদ না করলে তার জমি গোত্রের হাতে ফিরে যেতো এবং নতুন ভাবে সে জমিকে বিতরণ করা হতো।
জনসংখ্যা বেড়ে গেলে ক্রমশ জমির অভাব দেখা দেয়। আজটেকরা তখন মেক্সিকোর মধ্যভাগে অবস্থিত উপত্যকায় চলে আসে। এখানে তারা টেক্সকোকো হ্রদের তীরে এবং হ্রদের মাঝখানেও বসতি স্থাপন করে। হ্রদের মধ্যে বাস করার জন্য তারা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করতো। হ্রদের মধ্যে বেড়া দিয়ে তার ভিতরে মাটি ফেলে ফেলে দ্বীপ তৈরি করা হতো। হ্রদের উপকূলের বিস্তীর্ণ জলাভূমির মাটি দিয়ে এভাবে উর্বর দ্বীপ তৈরি করা হয়। এসব দ্বীপের জমিতে চাষ করে ভালো ফসল পাওয়া যেতো। চাষের এ পদ্ধতিকে বলা হয় চিনাম্পা। চিনাম্পা মানে হলো ‘ভাসমান বাগান’।
আজটেকদের মধ্যে হস্তশিল্প এবং ব্যবসার কিছুটা বিকাশ ঘটেছিলো। আজটেকদের কোনো কোনো শহর ও গ্রাম হয়তো এক এক ধরনের পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করেছিলো। কেউ হয়তো ভাল মাটির পাত্র তৈরী করতো, কেউ মরিচের চাষ করতো, কেউ ভাল পাথরের হাতিয়ার তৈরি করতো। এ সকল পণ্য বিক্রি বা বিনিময় করার জন্য এক এক অঞ্চলে মেলা বা বাজার বসতো। অনেক দূর দূর অঞ্চল থেকে মানুষ এসব মেলায় আসত জিনিসপত্র কেনার জন্য। টলালটেলোকো শহরে একটি স্থায়ী বাজার ছিলো। রোজ শহরে সেখানে বাজার বসতো। এ বাজারে এত সব অপূর্ব পণ্যের সমাহার ঘটতো যে স্পেনীয়রা পর্যন্ত তা দেখে মুগ্ধ ও ঈর্ষাকাতর হয়েছিলো।
আজটেকদের সমাজে মুদ্রা বা টাকা পয়সার প্রচলন ছিলো না। তারা বিনিময়ের মাধ্যমেই ব্যবসা করতো। তবে বিনিময়ের কাজে সহায়তার জন্য কয়েকটা জিনিসকে মুদ্রার বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা হতো। যথা, কাকাও-এর দানা; সোনার গুঁড়ো ভর্তি পাখির পালক এবং তামার তৈরি পাতলা ছুরি। তবে এ তিনটের মধ্যে কাকাও-এর দানাই লোকে বেশি পছন্দ করতো। দুটো জিনিস বিনিময় করতে গেল হয়তো দেখা যেত যে তাদের দামের মধ্যে সামান্য পার্থক্য হচ্ছে। তখন কাকাও-এর দানা দিয়ে ঐ পার্থক্যটুকু মিল করা হতো।
আজটেকদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান পদার্থ ছিলো জেড পাথর। তারা সোনাকে খুব মূল্যবান মনে করতো না। তাদের কাছে শুধু গয়না হিসেবেই সোনার দাম ছিলো। আজটেকদের কাছে সোনার চেয়ে রূপার দাম সম্ভবত বেশি ছিলো, কারণ রূপার খণ্ড তাদের দেশে দুষ্প্রাপ্য ছিলো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজটেকরা রূপার আকর গলিয়ে রূপা তৈরি করতে পারতো না। তাই তারা পাহাড়ের গায়ের ভিতরে লুকিয়ে থাকা রূপা বা সোনার শিরা থেকে ঐসব ধাতু সংগ্রহ করতো। আজটেকরা সোনার চেয়ে জেড পাথরকে বেশি মূল্যবান মনে করতো বলে এক পর্যায়ে খুবই বিপদগ্রস্ত হয়ে ছিলো। স্পেনীয়রা আজটেকদের রাজ্য দখল করে যখন সমস্ত মূল্যবান সম্পদ হাজির করতে বলে তখন আজটেকরা সোনা না এনে জেড পাথর, টারকয়েজ পাথর প্রভৃতি এনে হাজির করে। তাদের এ আনুগত্যকে অবাধ্যতা ভেবে কটেজ ও তার সৈন্য সামন্ত খুবই বিরক্ত হয়েছিলো। আজটেকরা অবশ্য তখনও জানতো না যে স্পেনীয়রা সোনার লোভেই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মেক্সিকোতে গিয়েছিলো।
আজটেকরা ভুট্টা ছাড়াও অনেক রকমের তরিতরকারি ও ফসলের চাষ করতো। তারা টমেটো, লাউ, মটরশুঁটি জাতীয় ফসল, কোকো, লঙ্কা মরিচ, তামাক, তুলা প্রভৃতির চাষ করতো।
আজটেকরা ম্যাগুয়ে নামে একটা গাছের চাষ করতো। এ গাছের রস থেকে তারা একরকম মদ তৈরি করে খেতো। এ মদের কিছুটা পুষ্টিগুণও ছিলো। এ গাছের ছাল থেকে সূতা এবং কাপড়, আর পাতা দিয়ে ঘরের ছাদ ও গাছের কাঁটা দিয়ে সুই তৈরি করা হতো।
আজটেকরা নলখাগড়ার ফাঁকা নলে তামাক পুরে সিগারেটের মতো করে ধূমপান করতো। তারা গাছের রস থেকে রাবার তৈরি করতো, সে রাবার দিয়ে বল তৈরি করতো। আজটেকরা বল খেলতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে।
আজটেকরা লাঙলের ব্যবহার জানতো না। তারা কোদাল বা শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ে চাষ করতো। তবে আজটেকরা পানি সেচ করার কৌশল আয়ত্ত করেছিলো। আজটেকরা চাষের কাজে দক্ষতা অর্জন করলেও পশুপালন বা পশু- শক্তিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে তারা বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিতে পারেনি। আজটেকরা মহিষ জাতীয় কোনো প্রাণীকে পোষ মানাতে শেখে নি। তারা অবশ্য কয়েক ধরনের কুকুর পুষতো। এক ধরনের কুকুরকে তারা খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করতো, তবে কুকুরকে তারা কখনও স্লেজ গাড়ি টানার কাজে ব্যবহার করেনি। টার্কি নামক মুর্গী জাতীয় প্রাণীকে তারা পোষ মানিয়েছিলো; তারা হাঁসকে পোষ মানিয়েছিল এমন প্রমাণও কিছু কিছু পাওয়া যায়।
আজটেকদের হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি ছিলো আদিম ধরনের। কাঠের খোন্তা বা শাবল ছিলো তাদের প্রধান কৃষিযন্ত্র, এ কথা আগেই বলা হয়েছে। গম পেশার জন্য তারা যে যাঁতা ব্যবহার করতো তা ছিলো আমাদের মশলা পেশার শিল নোড়ার মতো। আমরা যেটাকে শিল বা পাটা বলি আজটেকরা তাকে বলতো মেটাটে; আর আমরা যাকে পুতা বা নোড়া বলি তারা তাকে বলতো মানো। চামড়া, মাংস ও অন্যান্য জিনিস কাটার জন্য আজটেকরা পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করতো। তামা দিয়ে সুই, কুড়াল ও গয়না বানাতো। আজটেকরা মিশরীয় অথবা ব্যবিলনীয়দের মতো আকর গলিয়ে তামা বানাতে পারতো না। তারা পাহাড়ের গায়ের ভিতর যে বিশুদ্ধ তামা পেতো তাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে বিভিন্ন আকৃতির জিনিস বানাতো। তবে আজটেকরা বিশুদ্ধ তামাকে গলিয়ে তাকে ছাঁচে ঢেলেও কুড়াল প্রভৃতি বানাতে পারতো। আজটেকরা “সিরে পারডু’ বা ‘মমলুপ্তি’ পদ্ধতিতে ছাঁচে ঢেলে তামা বা সোনার গয়না, ঘণ্টা প্ৰভৃতি তৈরি করতো। ইনকাদের ইতিহাস বর্ণনাকালে এ পদ্ধতির বিবরণ দেয়া হয়েছে। অসিডিয়ান পাথর দিয়ে আজটেকরা ধারাল অস্ত্র ও হাতিয়ার বানাতে পারতো। (অসিডিয়ান আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক কাঁচ; আগ্নেয়গিরির লাভার মধ্যে এগুলো পাওয়া যায়। )
আজটেকরা চরকার ব্যবহার জানতো না। তারা কাঠিম দিয়ে সূতা কাটতো এবং আদিম ধরনের তাঁতের সাহায্যে কাপড় বুনতো। তারা রান্নাবান্না এবং খাদ্যশস্য জমা করে রাখার জন্য মাটির পাত্র ব্যবহার করতো। তারা তীর-ধনুক, বর্শা নিক্ষেপক যন্ত্র, বর্শা বা বল্লম, গদা প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করতো। আজটেকদের সংস্কৃতিতে যান্ত্রিক আবিষ্কার বিশেষ বিকাশলাভ করে নি। তবে তাদের কারিগররা সাধারণ হাতিয়ার ব্যবহার করে নানা রকম জিনিসপত্র তৈরির ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
.
আজটেকদের সমাজ ও জীবন
আজটেকরা যখন মেক্সিকোর উপত্যকাতে প্রথম এসেছিলো তখন তাদের সমাজ সংগঠন ছিলো উপজাতীয় পর্যায়ের। অর্থাৎ তাদের সমাজ গোত্র ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিলো এবং সমাজে আদিম ধরনের গণতন্ত্র প্রচলিত ছিলো। আত্মীয়- স্বজনদের কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি গোত্র হতো এবং প্রায় ২০টি গোত্র নিয়ে একটি গোষ্ঠী গঠিত হতো। প্রত্যেক গোষ্ঠীর নিজস্ব সর্দার বা দলপতি থাকতো। প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজেদের বিষয় নিজেরাই পরিচালনা করতো। তবে সমগ্র উপজাতীয় স্বার্থের বিষয় বিবেচনা করার জন্য গোষ্ঠী ও সর্দারদের নিয়ে একটা পরিষদ গঠিত হতো। এ পরিষদ সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়সমূহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একজন সর্দার এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একজন সর্দার নিয়োগ করতো। আজটেকরা যখন চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতো তখন এই ছিলো তাদের সমাজের গঠন বিন্যাস। পরে যখন আজটেকরা নগররাষ্ট্র গঠন করে এক বিরাট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তখন তাদের এ সমাজ সংগঠনই অনেক জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তথাপি সাম্রাজ্যের যুগেও টেনোচ্কা-আজটেকদের মধ্যে গোষ্ঠী জীবনের অনেক নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতি বজায় ছিলো।
আজটেকদের সমাজে মেয়েদের স্থান ছিলো পুরুষের চেয়ে নীচে, তবে মেয়েদের কতগুলো অধিকার ছিলো। মেয়েরা সম্পত্তির অধিকারী হতে পারতো এবং প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিতে পারতো। জীবনে উন্নতি করার সুযোগ অবশ্য শুধু পুরুষদেরই ছিলো। অভিজ্ঞ কৃষক, চতুর শিকারী ও সাহসী যোদ্ধা ও দক্ষ কারিগরদের সম্মান ছিলো সমাজে। আজটেক সমাজে যুবকদের সামনে কৃষিকাজ, কারিগরি ও ব্যবসা বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ ছিলো।
আজটেকদের সমাজে দাস ছিলো। যুদ্ধবন্দীদের অবশ্য সচরাচর দেবতার উদ্দেশে বলি দেয়া হতো। কিছু যুদ্ধবন্দীকে আবার দাসও বানানো হতো। অনেক গুরুতর অপরাধীকে দাস বানানো হতো। অনেক গরীব লোক ছেলেমেয়েকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতো। চুরি ডাকাতির জন্য কঠোর শাস্তি দেয়া হতো। নরহত্যা করলে এমন কি কোন দাসকে হত্যা করলেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো।
টেনোচ্কা-আজটেকদের আমলে মধ্য মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরের অধিবাসীরা ভাষা, ধর্ম, রীতিনীতি ও সংস্কৃতিতে এক গোত্রীয় হলেও তাদের মধ্যে কোনো ঐক্যের বোধ ছিলো না। টেনোচকারা অর্থাৎ মেক্সিকো নগরীর আজটেকরা মধ্য- মেক্সিকো দেশের প্রায় পুরো অঞ্চলকে অধিকার করলেও সে অঞ্চলকে আজটেকরা একটা সাম্রাজ্যে পরিণত করতে পারে নি। আজটেকরা বিজিত নগর ও রাজ্যগুলো থেকে কর আদায় করতো। কিন্তু সব রাজ্যের উপর কোনো এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা আজটেকরা আরোপ করতে পারে নি। এ কারণে আজটেক রাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যরূপে অভিহিত করা চলে না। তবে টেনোচকা-আজটেকদের আমলে মেক্সিকো অঞ্চলের সব নগর ও রাজ্য সমূহে একই ধরনের সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রকাশ দেখতে পাওয়া যেতো। এ অর্থে বলা চলে যে টেনোচ্কা-আজটেকদের রাজত্বকালে মেক্সিকো অঞ্চলে মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ একটা সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিলো।
.
আজটেকদের ধর্ম
মায়াদের মতো আজটেকরাও ছিলো সূর্যের উপাসক। আজটেকদের দেবতারা আজটেকদের মতোই রক্তপিপাসু ছিলো। আজটেকদের বিশাল রাজ্যের অন্তর্গত সব নগরেই বড় বড় পিরামিড নির্মাণ করা হতো। পিরামিডের মাথায় থাকতো সূর্যদেবের মন্দির। মন্দিরের মধ্যে পাথরের বেদী থাকতো। এ সকল বেদীতে সূর্যদেবের উদ্দেশে নরবলি দেয়া হতো। আজটেকদের নরবলির ধরন ছিলো জীবন্ত মানুষের হৃৎপিণ্ড কেটে বের করে সূর্যের উদ্দেশ নিবেদন করা। আজটেকদের একজন প্রধান দেবতা ছিলেন হুইট জিলোপিচটলি। তিনি ছিলেন যুদ্ধ ও সূর্যের দেবতা।
আজটেকদের আরেকজন দেবতা ছিলেন কোয়েটজাল কোহুয়াটল। তিনি ছিলেন বাতাস ও স্বর্গলোকের দেবতা। তাঁর জন্য কোনো নরবলির বিধান ছিলো না। তিনি ছিলেন নম্র স্বভাবের দেবতা। আজটেকদের শিল্পকলায় এ দেবতাকে পালকে ঢাকা সাপ হিসেবে আঁকা হয়েছে। এ সংযুক্ত প্রাণীটি ছিলো পৃথিবী ও আকাশের প্রতীক। পৃথিবী হলো সব মানুষের মা আর আকাশ হলো পিতা। আজটেকরা ছিলো পৃথিবী ও সূর্যের উপাসক।
মায়াদের মতো আজটেকরাও জমাট রবারের বল নিয়ে খেলতো। এ বল খেলা ছিলো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অঙ্গ।
.
আজটেকদের জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতি
কৃষিকাজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি প্রয়োজনে আজটেকরা জ্যোতিবিদ্যার চর্চা করতো। আজটেকরা একটা পঞ্জিকা প্রণয়ন করেছিলো। আজটেকরা ২০ দিনে মাস গুনতো এবং এ রকম মাসের ১৮ মাসে বছর হতো। এ বছরের শেষে ৫টা অশুভ দিন যোগ করা হতো। তাই আজটেকদের সৌর বছর ছিলো ৩৬৫ দিনে। আজটেকরা আরেকটা ধর্মীয় ‘বছর’ অনুসরণ করতো—তাতে ছিলো ২৬০ দিন। ১৩ দিনে সপ্তাহ ধরে ২০টি সপ্তাহ হিসাব করে তারা ২৬০ দিন হিসাব করতো। এ হিসাবটা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই ব্যবহার করা হতো। একটা গোল পাথরের চাকতিতে আজটেকরা তাদের দিন- তারিখের হিসাব লিখে রাখতো; তাকে বলা হয় ‘শিলা পঞ্জিকা’।
আজটেকরা বড় বড় পিরামিড ও মন্দির, ধাতুর জিনিসপত্র প্রভৃতি নিৰ্মাণ করার মতো কারিগরি জ্ঞান আয়ত্ত করেছিলো। আজটেকরা এক ধরনের লেখন পদ্ধতি আয়ত্ত করেছিলো। তারা চিত্রলিপি অর্থাৎ ছবির সাহায্যে লিখতো। এ ধরনের লেখন পদ্ধতি প্রাচীন মিশর ও ব্যবিলনে প্রচলিত ছিলো।
আজটেকদের গণনা পদ্ধতি ছিলো ২০ ভিত্তিক। তারা সংখ্যা লিখন পদ্ধতিও আয়ত্ত করেছিলো। তারা পর পর বিন্দু সাজিয়ে ১ থেকে ১৯ পর্যন্ত লিখতো। ২০ বোঝাতে তারা একটা পতাকার ছবি আঁকতো। পতাকার পর পতাকা সাজিয়ে তারা ১ কুড়ি, ২ কুড়ি প্রভৃতি লিখতো। ২০ কুড়ি বা ৪০০ বোঝাতে তারা ফার গাছের মতো একটা ছবি আঁকতো, এর অর্থ ছিলো অনেকগুলো চুল। পরবর্তী উচ্চতর একক ছিলো ৮০০০ (২০×২০×২০ বা ২০x৪০০)। একটা ঝোলা বা ব্যাগের ছবি দিয়ে ৮০০০ বোঝান হতো—এর অর্থ ছিল ব্যাগ ভর্তি কোকো দানা।
শিল্পকলা আজটেকদের জীবন থেকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন কিছু ছিলো না, শিল্পকলা ছিলো তাদের জীবনের কার্যাবলীর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আজটেকদের শিল্প-চর্চার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছিলো স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে। চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে আজটেকরা ছিলো দুর্বল। সঙ্গীতের চেয়ে নাচের ক্ষেত্রে তারা ছিলো বেশি পারদর্শী।
মন্দির, পিরামিড প্রভৃতিতে আজটেক স্থাপত্য শিল্পের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। একটা ধাপ পিরামিডের উপর মন্দিরটা নির্মিত হতো। মায়ারা যেমনভাবে ধাপ পিরামিড ও মন্দির নির্মাণ করতো আজটেকরাও সে কৌশলেই পিরামিড- মন্দির তৈরি করতো। পিরামিড ধাপ এবং মন্দিরের দেওয়ালের পাথরে নানারকম মূর্তি প্রভৃতির চিত্র খোদাই করা হতো।
আজটেকরা ভাস্কর্য শিল্পেও উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছে। আজটেকরা দেবদেবীর বড় বড় পাথরের মূর্তি নির্মাণ করতো, ছোট আকৃতির পাথরের মূর্তি প্রভৃতিও তৈরি করতো। আজটেকরা গোল পাথরের চাকতিতে নানা দিনক্ষণের হিসাব ও ঐতিহাসিক সন তারিখ লিখে রাখতো। একে বলা হয় পঞ্জিকা বা ক্যালেণ্ডার।
আজটেকরা পালক দিয়ে সুন্দর সুন্দর মাথার টুপি প্রভৃতি বানাতে পারতো। তারা পশমের কাপড়ে পালক বসিয়ে সুন্দর রঙবেরঙের কাপড় ও পোষাক বানাতে পারতো। আজটেকরা সুন্দর সুন্দর নক্সা কাটা মাটির পাত্র বানাতে পারতো। তারা কুমারের চাক ব্যবহার করতে জানতো না। পরতের পর পরত কাদামাটি বিছিয়ে তারা হাত দিয়ে সমান ও মসৃণ করে মাটির পাত্র বানাতো। আজটেকরা কাঠের কাজে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেনি। তারা অবশ্য দালানের কড়ি বরগার জন্য কাঠ ব্যবহার করতো, কাঠের ঢোলক এবং ছোট এক ধরনের চেয়ারও বানাতে পারতো। তারা মূলত পাথরের যন্ত্র ও হাতিয়ার দিয়ে কাঠের কাজ করতো।
আজটেকদের লেখন পদ্ধতি খুব উন্নত ছিল না বলে তাদের সাহিত্যের কোনো লিখিত রূপ পাওয়া যায় না। তবে কথকতা এবং লোককাহিনীর মধ্যে তাদের যে সাহিত্য বেঁচে ছিলো তা যথেষ্ট সমৃদ্ধ বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন।
