ইনকা সভ্যতার ইতিহাস
স্পেনীয় সৈনিক ফ্রান্সিসকো পিজারো যখন ১৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে ইনকা সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন তখন ইনকা সম্রাট ছিলেন আতাহুয়ালপা এবং ইনকাদের রাজধানী ছিলো কুজকো শহরে। বর্তমান পেরু রাজ্যে ছিলো কুজকো শহরের অবস্থান এবং এ শহরটি ছিলো আন্দিজ পর্বতমালার উপরে অবস্থিত। ইনকা সাম্রাজ্য তখন উত্তরে ইকুয়েডর থেকে দক্ষিণে চিলির মধ্যভাগ পর্যন্ত পুরো আন্দিজ পর্বতমালা জুড়ে বিস্তৃত ছিলো।
ইনকারা আনুমানিক ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে কুজকো উপত্যকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলো। বহুকাল পর্যন্ত তাদের আধিপত্য কুজকো শহরেই সীমাবদ্ধ ছিলো। মানকো কাপাক ছিলেন প্রথম ইনকা সম্রাট। নবম ইনকা সম্রাট পাচাকুটি ১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দে ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্তার সাধন শুরু করেন। তার অল্পকালের মধ্যেই ইনকা সাম্রাজ্য উত্তর- দক্ষিণে ২৭০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
ইনকা সম্রাটদের যে তালিকাকে ঐতিহাসিকরা মোটামুটি সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন সে তালিকাটি নীচে দেয়া হল :
১. মানকো কাপাক (আ. ১২০০ খ্রীঃ)
২. সিন্চি রোকা
৩. ল্লকে ইউপানকি
৪. মায়তা কাপাক
৫. কাপাক ইউপানকুই
৬. ইনকা রোকা
৭. ইয়াহুয়ার হুয়াকাক
৮. ভিরাকোচা ইনকা
৯. পাচাকুটি ইনকা (১৪৩৮-১৪৭১ খ্রীঃ)
১০. টোপা ইনকা (১৪৭১-১৪৯৩ খ্রীঃ)
১১. হুয়ায়না কাপাক (১৪৯৩-১৫২৫ খ্রীঃ)
১২. হুয়াসকার (১৫২৫-১৫৩২ খ্রীঃ)
১৩. আতাহুয়ালপা (১৫৩২-১৫৩৩ খ্রীঃ)
ইনকা কাহিনী অনুসারে, মানকো কাপাক তাঁর দলবল নিয়ে আনুমানিক ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হয়ে কুজকো উপত্যকায় এসে পৌঁছান। ইনকারা নিজেদের বলতো সূর্যদেবের প্রিয় জাতি। তাই কুজকো উপত্যকায় আগে থেকে যারা বাস করতো ইনকারা তাদের অত্যাচার করে তাড়িয়ে দেয়। এরপর দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইনকাদের রাজ্য কুজকো উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো।
স্পেনীয় ঐতিহাসিক গার্সিলাসো ডি লা ভেগা অবশ্য লিখেছেন যে দ্বিতীয় ইনকা সম্রাট সিচি রোকা’র আমল থেকেই ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্তার সাধনের কাজ শুরু হয় এবং পঞ্চম সম্রাট কাপাক ইউপানকুই-এর আমলে ইনকা সাম্রাজ্য দক্ষিণে টিটিকাকা হ্রদ ও তার দক্ষিণের টিয়াহুয়ানাকো শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। আধুনিক ঐতিহাসিক মীনস এ মতকে সঠিক বলে মনে করেন। তবে অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিকরা এ মতকে গ্রহণ করেন না। কারণ, অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, নবম সম্রাট পাচাকুটি যখন সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু করেন তখন তিনি কুজকো শহরের কাছাকাছি স্থান থেকেই দেশ জয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। জন রো প্রমুখ আধুনিক ঐতিহাসিকরা ষোল-সতের শতকের স্পেনীয় ঐতিহাসিক পেড্রো সারমিয়েন্টো ডি গামবোয়া এবং বারনাবে কোবো’র বিবরণকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে করেন। আমরাও এখানে জন রো’র মতকেই সঠিক বলে গ্রহণ করবো। এ মত অনুসারে, প্রথম আটজন ইনকা সম্রাটের আমলে ইনকাদের রাজনৈতিক আধিপত্য কুজকো উপত্যকার কাছাকাছি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কুজকোর চারপাশে তখন ইনকাদের স্বজাতির মানুষই বাস করতো।
মানকো কাপাক ইনকাদের প্রথম সম্রাট। তবে এ নামে সত্যিই কোনো সম্রাট ছিলেন কিনা সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মনে সন্দেহ রয়েছে। দ্বিতীয় ইনকা সম্রাট ছিলেন মানকো কাপাকের ছেলে সিনচি রোকা। তৃতীয় ইনকা সম্রাট হয়েছিলেন সিচি রোকার দ্বিতীয় পুত্র ল্লকে ইউপানকি। এঁরা দুজনেই ছিলেন নির্বিরোধী মানুষ। ব্লকে ইউপানকির ছেলে মায়তা কাপাক চতুর্থ ইনকা সম্রাট হয়েছিলেন। মায়তা কাপাক ছিলেন রণলিপ্সু সম্রাট। তবে যতদূর মনে হয়, কুজকো শহর থেকে কয়েক মাইল দূর পর্যন্ত তিনি ইনকা সাম্রাজ্যের সীমা বাড়াতে পেরেছিলেন। পরাজিত জাতিগুলোকে কর প্রদান করতে বাধ্য করা হতো।
মায়তা কাপাকের পুত্র কাপাক ইউপানকুই পঞ্চম ইনকা সম্রাট হন। তিনি কুজকো উপত্যকা থেকে বার-চৌদ্দ মাইল দূর পর্যন্ত সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। কাপাক ইউপানকুই-এর পুত্র ইনকা রোকা ষষ্ঠ ইনকা সম্রাট হয়েছিলেন। ইনকা রোকার আমলে ইনকা সাম্রাজ্য কুজকোর দক্ষিণে প্রায় কুড়ি মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। ইনকা রোকার পুত্র ইয়াহুয়ার হুয়াকাক সপ্তম ইনকা সম্রাট হয়েছিলেন। হুয়াকাক-এর পুত্র ভিরাকোচা ইনকা হয়েছিলেন অষ্টম ইনকা সম্রাট। ইনকা সম্রাটদের মধ্যে ভিরাকোচা এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন।
ভিরাকোচা ছিলেন প্রথম ইনকা সম্রাট যিনি বিদেশী জাতিসমূহের উপর স্থায়ী শাসন আরোপের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর আগেকার সম্রাটরা বিজিত রাজ্যে কোন সেনাবাহিনী বা ইনকা শাসক স্থাপন করতেন না। ভিরাকোচা কুজকোর চারপাশে প্রায় পঁচিশ মাইল পর্যন্ত তঁর সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তৃত করেন এবং পুরো এলাকাটাকে একটা অখণ্ড সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।
এ সময়ে (১৪০০ খ্রীষ্টাব্দে) পেরু ও আন্দিজ পর্বত অঞ্চলে আরও কয়েকটি শক্তিশালী রাজ্যের উদয় ঘটেছিলো। কুজকোর দক্ষিণ-পূর্বদিকে, কুজকো থেকে অনেকখানি দূরে, টিটিকাকা হ্রদ অঞ্চলে দুটো শক্তিশালী জাতি ছিলো। এরা হলঃ লুপাকা এবং কোলা। এ দুটো জাতির মধ্যে তীব্র শত্রুতা ছিলো এবং প্রত্যেকেই চেষ্টা করছিলো যাতে ইনকাদের সাহায্য নিয়ে অন্য দলকে দমন করা যায়। ইনকা সম্রাট ভিরাকোচা অবশ্য লুপাকাদের সাথে জোট বাঁধেন। এ খবর পেয়ে কোলারা তাড়াতাড়ি লুপাকাদের আক্রমণ করে। কিন্তু যুদ্ধে কোলাদের পরাজয় ঘটে। তবে এ যুদ্ধে দুই পক্ষেরই এত ক্ষতি হয়েছিলো যে ইনকারাই এদের উভয়ের তুলনায় শক্তিমান হয়ে দাঁড়ায়।
কুজকোর পশ্চিমে ছিলো কুয়েচুয়া জাতির বাস। কুয়েচুয়ারা ছিলো জাতিগতভাবে ইনকাদেরই স্বগোত্রীয়। তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতিও ছিলো ইনকাদেরই মতো। ইনকাদের সাথে কুয়েচুয়াদের সম্পর্কও ছিলো ভাল। কুয়েচুয়াদের পশ্চিমে থাকতো চানকা জাতি। ভিরাকোচার রাজত্বকালের শুরুতে চানকারা কুয়েচুয়াদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। ভিরাকোচার রাজত্বের শেষ দিকে ইনকারা কুজকো আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। চানকাদের সৈন্যবল দেখে ভয় পেয়ে ভিরাকোচা কুজকো থেকে দূরে একটা দুর্গে আশ্রয় নেন। কিন্তু ভিরাকোচার এক ছেলে পাচাকুটি ইউপানকুই কুজকো শহরে থেকেই চানকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন ও আশ্চর্যজনকভাবে জয়লাভ করেন। এর পর ভিরাকোচা আর রাজধানী কুজকোতে ফিরে আসেন নি। ভিরাকোচার ইচ্ছা ছিলো তাঁর অন্য এক ছেলেকে সম্রাট করার। কিন্তু পাচাকুটি পিতার আদেশ অমান্য করে নিজেই সিংহাসন অধিকার করেন। পাচাকুটি ইনকা ইউপানকুই হলেন নবম ইনকা সম্রাট। পাচাকুটি ১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট হয়েছিলেন। পাচাকুটির শাসন কালেই ইনকা সাম্রজ্যের দ্রুত বিস্তার ঘটে। পাচাকুটির ছেলে টোপা ইনকার মৃত্যুকালে, ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দে, ইনকা সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটেছিলো। স্পেনীয় সেনাপতি পিজারোর আক্রমণে, ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ইনকা সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। ১৪৩৮ থেকে ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ইনকা আমলকেই সচরাচর ইনকা রাজত্বের কাল বলে গণ্য করা হয়।
১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দের পর থেকে ইনকা সাম্রাজ্যের আকস্মিক ও ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ ইতিহাসের এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। পাচাকুটির বিজয় অভিযানের মধ্য দিয়ে ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্তার সাধনের কাজ শুরু হয়। পাচাকুটি প্রথমে কুজকোর চারপাশের জাতিসমূহকে ইনকা শক্তির অধীনে নিয়ে আসেন। যারা বশ্যতা স্বীকার করতে আপত্তি করে তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়। অল্পকালের মধ্যেই পাচাকুটি কুজকোর উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলো জয় করে নেন। ইনকারা সংখ্যায় খুব বেশি ছিলো না বলে পরাজিত জাতিসমূহ থেকে সৈন্যসংগ্রহ শুরু করে।
পরাজিত জাতিরা যাতে বিদ্রোহ না করতে পারে সে উদ্দেশ্যে ইনকারা এক এক অঞ্চলের সমগ্র অধিবাসীদের উৎখাত করে সাম্রাজ্যের অন্য অংশে সরিয়ে নিতো; তাদের জায়গায় এনে বসানো হতো অধিকতর বশংবদ প্রজাদের—যারা অনেকদিন ধরে ইনকা শাসনের অধীনে থাকার ফলে স্বাধীনতাস্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিলো।
পাচাকুটি এরপর টিটিকাকা হ্রদ অঞ্চলের দিকে দৃষ্টি ফেরান। সেখানে ইনকাদের পুরান প্রতিদ্বন্দ্বী লুপাকা জাতির মানুষরা বিদ্রোহের চেষ্টা করছিলো। সম্রাট পাচাকুটি টিটিকাকা হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে বসবাসকারী লুপাকা জাতিকে কঠোর হাতে দমন করেন।
পাচাকুটির বয়স বেড়ে গেলে তিনি তাঁর পুত্র টোপা ইনকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। টোপা ইনকা যুবরাজ অবস্থায়ই অনেক দেশ জয় করেন। পাচাকুটির শেষ অভিযান ছিলো টিটিকাকা হ্রদের তীরবর্তী কোলা জাতির মানুষদের বিরুদ্ধে। এরা মাঝে মাঝেই ইনকাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতো। অবশেষে পাচাকুটি তাঁর অন্য দুই পুত্রের উপর কোলাদের দমনের ভার দিয়ে নিজে কুজকো শহরে বড় বড় প্রাসাদ ও সৌধ নির্মাণের কাজে ব্যাপৃত থাকেন।
যুবরাজ টোপা ইনকা প্রথম অভিযান পরিচালনা করেন সুদূর উত্তর অঞ্চলে। তিনি পেরুর উত্তর অংশের পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে ইকুয়েডর-এর সীমানা পর্যন্ত চলে যান। তখন পেরুর উত্তর অংশে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা বা শক্তিশালী রাজ্যের অস্তিত্ব ছিলো না। তবে বর্তমান ইকুয়েডর অঞ্চলে কয়েকটি সুউচ্চ সভ্যতার উদয় ঘটেছিলো, যাদের সভ্যতার মাত্রা ছিলো প্রায় ইনকাদের সমতুল্য। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কুইটো জাতির সভ্যতা। কুইটোরা থাকতো বর্তমান ইকুয়েডর-এর রাজধানী কুইটো শহরের চারপাশের অঞ্চলে। ঐতিহাসিক লোক-কাহিনী এবং সাম্প্রতিক কালের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের সাক্ষ্য থেকে এ সকল সভ্যতার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা গেছে।
পেরুর উত্তর সীমা এবং কুইটোদের রাজ্যের মধ্যবর্তী অঞ্চলে যে কয়েকটি সুউচ্চ সভ্যতা ছিলো সেগুলোই প্রথমে ইনকাদের আয়ত্তে আসে। ইনকা বাহিনী দক্ষিণ দিক থেকে অগ্রসর হয়ে পেরুর সীমা অতিক্রম করে প্রথমেই কানারিদের দেশ দখল করে। কানারিরা প্রথমে বীরত্বের সাথে বাধা দিলেও পরে ইনকাদের অনুগত হয়ে পড়ে এবং তাদের দেশ স্থায়ীভাবে ইনকা সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। ইনকারা সমস্ত অধিকৃত দেশেই ইনকা রীতির মন্দির, দুর্গ, প্রাসাদ, রাস্তা প্রভৃতি নির্মাণ করতো। কানারিদের দেশকেও ইনকাদের নির্মাণ রীতি অনুযায়ী নতুন করে পুনর্গঠিত করা হয়।
এরপর ইনকারা আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে পানজালিও জাতির দেশের সীমান্তে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে থেকে কুইটো জাতির রাজার কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠান হয়। এ সহযোগিতার অর্থ অবশ্য ইনকাদের বশ্যতা স্বীকার করা। কিন্তু কুইটো জাতির মানুষ অন্যদের উপর আধিপত্য করাতেই অভ্যস্ত ছিলো, বশ্যতা স্বীকারে নয়। কুইটোরা ইনকাদের আধিপত্য মানতে অস্বীকার করা মাত্র এক তিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কুইটোরা পরাজিত হয়।
কুইটোদের সাথে যুদ্ধ চলাকালেই টোপা ইনকা একবার পাহাড় থেকে নীচে মান্টা ও হুয়ানকাভিলকা অঞ্চলের উপকূলে নেমে আসেন। এখানে এসে তিনি শুনতে পান যে সমুদ্রের বুকে কতগুলো দ্বীপে অনেক লোকজন ও সোনাদানা আছে; সেখানে পাল তোলা নৌকা নিয়ে বণিকরা যাওয়া-আসা করে। এক বিবরণ থেকে জানা যায় যে তিনি নাকি ভেলা ও নলখাগড়ার তৈরি নৌকার বহর সাজিয়ে অনেক সৈন্য নিয়ে ঐসব দ্বীপ জয় করেন ও প্রচুর সোনারূপা ও কালো যুদ্ধবন্দী নিয়ে ফিরে আসেন। এ কাহিনীর সত্যতা অবশ্য এখনও প্রমাণিত হয়নি, কারণ দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি কোনো দ্বীপে ঐ ধরনের সমৃদ্ধ সভ্যতা বা সংস্কৃতির অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।
কুইটো অঞ্চলের পতনের পর পেরু ও ইকুয়েডর অঞ্চলে আর একটা মাত্র স্বতন্ত্র জাতি ইনকা শাসনের বাইরে রয়ে যায়। এরা হলো সুউচ্চ সভ্যতার অধিকারী চিমু জাতি। চিম্বুরা পেরুর উত্তর ভাগে সমুদ্রের উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাস করতো। এ প্রাচীন সভ্য জাতির মানুষরা দীর্ঘকাল সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করার ফলে যুদ্ধবিদ্যা প্রায় ভুলে গিয়েছিলো। তাই ইনকাদের রণনিপুণ সৈন্যদের আক্রমণের মুখে চিমুরা সহজেই পরাজিত হয়। বিশেষত চিমুদের রাজ্য থেকে কুজকোর দিকে যে সীমান্ত ছিলো তা শক্তিশালী দুর্গ দিয়ে ঘেরা ছিলো। কিন্তু ইনকারা এক্ষেত্রে কুইটোর দিক থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছিলো বলে চিমুদের রাজ্যে তারা উত্তর দিক থেকে প্রবেশ করেছিলো। অপ্রস্তুত অবস্থায় পাশের দিক থেকে আক্রান্ত হওয়ার ফলে চিম্বুরা সহজেই পরাজিত হয়। চিমুদের সাথে ইনকাদের যুদ্ধ হয়েছিলো আনুমানিক ১৪৭০ খ্রীষ্টাব্দে।
চিমুদের পদানত করার পরে টোপা ইনকা উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন। এ উপকূল অঞ্চলে তখন সম্ভবত অনেকগুলো ছোট ছোট স্বতন্ত্র রাজ্য ছিলো। তাদের সকলের উপরে ইনকা শাসন চাপিয়ে দেয়া হয়। এ দফায় ইনকারা বর্তমান লিমা শহর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলো। এর পরে আরেক অভিযানের মাধ্যমে আরও দক্ষিণের নাজকা শহর পর্যন্ত সমগ্র উপকূল অঞ্চল ইনকা সাম্রাজ্যের অধীনে আনা হয়। এ সকল উপকূলীয় জাতিদের ইতিহাস বিশেষ জানা যায় না। তবে পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে এ অঞ্চলে অনেকগুলো নগর উঠেছিলো। পেরুর উপকূল অঞ্চলে প্রত্যেকটি উপত্যকায় এক একটি শহরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এ সকল শহর যে রাস্তা-ঘাট, বাড়ি- ঘর, পিরামিড, মন্দির শস্যাগার প্রভৃতি নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক নির্মিত হতো, শহরগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকে তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
ইতোমধ্যে পাচাকুটির শাসন আমলের তেত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। শেষদিকে তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারের ভার ছেলের হাতে দিয়ে নিজে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসন বিষয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৪৭১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করে তাঁর ছেলে টোপা ইনকা ইউপানকুইকে সিংহাসনে বসান। এভাবে, ১৪৭১ সালে টোপা ইনকা দশম ইনকা সম্রাট হন।
পাচাকুটি এবং তাঁর ছেলে টোপা ইনকা মিলে আন্দিজ পর্বত ও তার পশ্চিম ঢালের সমস্ত এলাকার ওপর ইনকা আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তখন আন্দিজ পর্বতের পূর্ব ঢালের অধিবাসীরা ইনকা সীমান্তে মাঝে মাঝে আক্রমণ শুরু করে। আন্দিজের পূর্ব পাশে ব্রাজিল ও বলিভিয়ার বনভূমিতে তখন আদিবাসী উপজাতীয় মানুষ বাস করতো। এ অঞ্চলে তখন পর্যন্ত কোনো উচ্চ সভ্যতা গড়ে ওঠে নি। এসব বনবাসী উপজাতীয়দের দমন করার জন্য তিনি বিশাল সৈন্যদল নিয়ে অভিযান শুরু করলেন।
বনে-জঙ্গলে পরিচালিত এ অভিযান শেষ হওয়ার আগেই টিটিকাকা হ্রদ অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিল। আয়মারা ভাষাভাষী কোলা এবং লুপাকা জাতি তখন ইনকা শাসনের অধীনে ছিলো। তারা তখন আগেকার শত্রুতা ভুলে অন্যান্য কয়েকটি আয়মারা-ভাষী জাতির সাথে মিলে একজোট হয়ে ইনকা শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। খবর পাওয়া মাত্র টোপা ইনকা বিদ্ৰোহ দমনের জন্য ফিরে এলেন। ইনকাদের সামরিক সংগঠন কতো শক্তিশালী ও সুনিপুণ ছিলো এ ঘটনা থেকে তার পরিচয় পাওয়া যায়। অনেক নীচের মালভূমি ও সমভূমি থেকে সৈন্যসামন্ত নিয়ে অতি দ্রুত ১২,০০০ ফুট উঁচু পর্বত অঞ্চলে ফিরে ইনকা সম্রাট কোলা এবং লুপাকাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন।
ইনকা সম্রাটের মধ্যে তখন সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভ পুরো মাত্রায় দেখা দেয়। টোপা ইনকা ইউপানকুই তখন তাঁর জানা যতো দেশ ছিলো সবগুলোকে নিজের অধীনে আনার জন্য চেষ্টা শুরু করেন। তাঁর পরবর্তী অভিযান পরিচালিত হয় পূর্ব দিকে বলিভিয়া অভিমুখে। বলিভিয়ার উঁচু পার্বত্য অঞ্চলটুকু সহজেই ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। এর পর আসে উত্তর চিলির পালা। একের পর এক অভিযান চালিয়ে চিলির মাঝামাঝি স্থান পর্যন্ত অধিকার করে নেয়। সেখানে বর্তমান কনস্টিটিউসিয়ন শহরের কাছাকাছি স্থানে ইনকা সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ইনকাদের এ দক্ষিণ সীমান্তের দক্ষিণে ছিলো উপজাতীয় আরাউকানিয়ানদের বাস।
টোপা ইনকা ততদিনে বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এবার তিনি যুদ্ধ অভিযান বন্ধ করে সাম্রাজ্যকে সুসংগঠিত করার দিকে মনোনিবেশ করেন। কুজকোতে তিনি এক মস্ত বড় দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনিই সম্ভবত সর্বপ্রথম সারা ইনকা সাম্রাজ্যের আদম শুমারীর ব্যবস্থা করেন।
সব ঐতিহাসিকদের মতেই, টোপা ইনকার প্রধান রানী ছিলেন তাঁর আপন বোন মামা ওকলো। ইনকা সম্রাটদের মধ্যে বোনকে বিয়ে করার প্রথা ছিলো বলে মনে হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে এর আগেও কোনো কোনো ইনকা সম্রাট তাঁদের বোনকেই প্রধান রানী করতেন। টোপা ইনকার পরবর্তী ইনকা সম্রাটগণ প্রত্যেকেই অবশ্য তাঁদের বোনকেই বিয়ে করে প্রধান রানী করেছিলেন।
টোপা ইনকা ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দে মারা গেলে হুয়ায়না কাপাক একাদশ ইনকা হন। কিন্তু এত বড় সাম্রাজ্য একজন মানুষের পক্ষে পরিচালনা করা কঠিন ছিলো। কারণ ইনকা সম্রাটরা নিজেদের স্বর্গীয় বলে দাবি করতেন এবং তাঁদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একটি কাজও হতে পারতো না। অথচ, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা তখন এত দ্রুত ছিলো না যে আড়াই হাজার মাইল দীর্ঘ সাম্রাজ্যের প্রতিটি স্থানের সাথে সারাক্ষণ সংযোগ রক্ষা করা যায়। এ অবস্থায় বিশাল ইনকা সাম্রাজ্যে ঘন ঘন অসন্তোষ ও বিদ্রোহ ঘটতে থাকে।
হুয়ায়না কাপাক সম্রাট হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে সাম্রাজ্যের সব এলাকায় ভ্রমণ করে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এ রীতি তাঁর পূর্ববর্তী সম্রাটরাও অনুসরণ করেছেন। এরপর হুয়ায়না কাপাক পেরুর উত্তর-পূর্ব অংশের বনাঞ্চলের উপজাতীয় অধিবাসীদের দমন করে তাদের বাসভূমিকে ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। অতঃপর তিনি কুজকোয় ফিরে এসে বিশ্রাম নেন এবং পুনরায় দক্ষিণে বলিভিয়া ও চিলির দিকে যাত্রা করেন সে অঞ্চলের অবস্থা দেখার জন্য। এসব অঞ্চলের অকর্মণ্য কর্মচারীদের তিনি চাকুরিচ্যুত করেন ও দক্ষ কর্মচারী নিয়োগ করেন। তিনি এ সকল অঞ্চলে রাস্তাঘাট ও নগর নির্মাণের বিষয়েও নির্দেশ দেন।
ইতোমধ্যে কুইটোতে এবং ইকুয়েডর-এর অন্যান্য প্রদেশে বিদ্রোহের সংবাদ এসে পৌঁছায়। হুয়ায়না কাপাক তাঁর দুই ছেলেকে সাথে নিয়ে সসৈন্যে বিদ্রোহ দমন করতে অগ্রসর হন। দুই ছেলের মধ্যে একজন হলেন আতাহুয়ালপা, যিনি পরে সম্রাট হয়েছিলেন। ইকুয়েডর অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করতে ইনকা সম্রাটকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিলো। বিদ্রোহ দমনের পর হুয়ায়না কাপাক আনকা সামিও নদী বরাবর চূড়ান্তভাবে সাম্রাজ্যের উত্তর সীমা নির্ধারণ করেন। এ সীমানা এখনও ইকুয়েডর ও কলম্বিয়া রাজ্যের সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে।
ইকুয়েডর-এর পর্বতের ওপরের অঞ্চলকে দমন ও পুর্নগঠিত করার পর ইনকা সম্রাট উপকূল অঞ্চলের উপজাতীয়দের দমন করতে অগ্রসর হন। ইকুয়েডর-এর পশ্চিম উপকূলে গুয়ায়া উপসাগরের তীরে যেসব উপজাতীয় বাস করতো হুয়ায়না কাপাক তাদের পরাস্ত করে তাদের বাসভূমিকে ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইনকা সম্রাটদের সাম্রাজ্য বিস্তার সমাপ্ত হয়। ইনকা সাম্রাজ্য তখন সর্বাধিক বিস্তৃতি লাভ করে। ইনকা সাম্রাজ্যের আয়তন সে-সময় দাঁড়ায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গমাইল। উত্তর-দক্ষিণে এর বিস্তার ছিলো ২৫০০ মাইলের বেশি (৪,০০০ কিলোমিটার)।
হুয়ায়না কাপাক ১৫২৫ খ্রীষ্টাব্দে মারা গেলে ইনকা সাম্রাজ্যের অধিকার নিয়ে তাঁর দুই ছেলের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হয়। হুয়ায়না কাপাকের প্রধান রানী ছিলেন তাঁর বোন। এ রানীর ছেলের নাম হুয়াসকার। অন্য এক রানীর ছেলের নাম ছিলো আতাহুয়ালপা। মৃত্যুর কিছুকাল আগে থেকে হুয়ায়না কাপাক কুইটোতে থাকতে শুরু করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আতাহুয়ালপাও কুইটোতে থাকতেন। এক বিবরণ অনুযায়ী হুয়ায়না কাপাক তাঁর সাম্রাজ্যকে দুই ভাগ করে হুয়াসকারকে কুজকোর সম্রাট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না। হুয়ায়না কাপাক তাঁর কোন্ ছেলেকে নিজের উত্তরাধিকারীরূপে মনোনীত করেছিলেন সে বিষয়েও নিশ্চিতরূপে কিছু জানা যায় না। তবে একথা ঠিক যে হুয়ায়না কাপাকের মৃত্যুর পরে ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুজকোর প্রধান পুরোহিত হুয়াসকারকে সম্রাটরূপে বরণ করে নেন। অন্য দিকে, ইকুয়েডর ও কুইটোর সৈন্যদল ও লোকেরা আতাহুয়ালপাকে সম্রাট বলে মেনে নেয়।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই দুই বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মধ্যে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে লড়াই শুরু হলো। হুয়াসকার সৈন্য সামন্ত নিয়ে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করলেন। আতাহুয়ালপাও সসৈন্যে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হলেন। মাঝপথে রাইও বাম্বা নামক স্থানে দুই দলের সাক্ষাৎ হলো। এ ভয়ঙ্কর যুদ্ধে দুই পক্ষের হাজার হাজার সৈন্য মারা গেল। এ যুদ্ধে আতাহুয়ালপা জয়লাভ করলেন। এর পর দুই দলের মধ্যে আরো কয়েকটি যুদ্ধ হলো। সব ক’টি যুদ্ধেই আতাহুয়ালপা জয়লাভ করলেন। এরপর আতাহুয়ালপা কুইটো থেকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কাজামারকা নামক স্থানে এসে শিবির স্থাপন করেন।
হুয়াসকার কুজকো নগরের কিছু উত্তরে শেষবারের মতো শত্রু বাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। এ যুদ্ধে হুয়াসকার পরাজিত ও বন্দী হন। এক বিবরণ অনুসারে আতাহুয়ালপা হুয়াসকারের সব স্ত্রী, পুত্র ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করেছিলেন।
.
স্পেনীয় বিজয়
আতাহুয়ালপার কাছে যখন হুয়াসকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের খবর পৌঁছে তখন প্রায় একই সাথে আরেকটা খবর এসে পৌঁছয়। খবরটা হলো : একদল সাদা মানুষ পেরুর পশ্চিম উপকূলে এসে পৌচেছে। এ সাদা মানুষরা হলো ফ্রান্সিসকো পিজারো’র দল। পিজারো ১৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে পানামা যোজক পার হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের কূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে টামবেজ নামক স্থানের নিকটে এসে তীরে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে তখন ছিলো মাত্র ১৮০ জন স্পেনীয় যোদ্ধা। এ যোদ্ধাদের মধ্যে ৬২ জন ছিলো অশ্বারোহী আর ১০৬ জন পদাতিক।
আতাহুয়ালপা ঠিক সময়েই খবর পেয়েছিলেন যে শ্বেতাঙ্গরা এসে পেরুর উপকূলে পৌঁচেছে। তবে তিনি মনে করেছিলেন যে দেবতা ভিরাকোচা বুঝি দলবল নিয়ে ফিরে এসেছেন। ইনকাদের মধ্যে এ প্রবাদ প্রচলিত ছিলো যে তাদের সৃষ্টিকর্তা দেবতা ভিরাকোচা একদা পশ্চিম সমুদ্রের দিকে চলে গিয়েছিলেন এবং অনেকদিন পরে আবার পশ্চিম সমুদ্র থেকে ফিরে আসবেন। ঘোড়ায় চড়া পিজারোর বাহিনীকে তাই আতাহুয়ালপা ভিরাকোচার দল ভেবে ভুল করেছিলেন।
পিজারোর দল যখন পেরুর উপকূল থেকে ইনকা সাম্রাজ্যের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করছিলো তখন ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালপার দূত এসে তাঁদের আমন্ত্রণ জানালো সম্রাটের সাথে দেখা করার জন্য। পিজারোর দল তখন দূতের সাথে সাথে খাড়া পর্বত বেয়ে উঠলো, আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে গিরিখাত অতিক্রম করে, দুর্ভেদ্য দুর্গের পাশ দিয়ে অগ্রসর হয়ে, সুদীর্ঘ ঝুলন্ত পুল পার হয়ে অবশেষে কাজামার্কায় এসে ইনকা সম্রাটের সামনে উপস্থিত হলো।
এর পরের ইতিহাস অত্যন্ত চমকপ্রদ। পিজারো প্রথমে কৌশলে ইনকা সম্রাটকে বন্দী করে তারপর অতি দ্রুত সমগ্র ইনকা সাম্রাজ্য জয় করে ফেললেন। মাত্র ১৮০ জন দুর্বিনীত স্পেনীয় সৈন্য কী করে বিশাল ইনকা সাম্রাজ্য অধিকার করতে পারলো সে অবিশ্বাস্য কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় প্রেসকট, হেলপ্স্ ও অন্যান্য ঐতিহাসিকদের গ্রন্থে। বিশেষত ডব্লু. এইচ. প্রেসকট (W.H. Prescott)-এর লেখা ‘হিস্ট্রি অফ দি কনকোয়েস্ট অফ পেরু’ (১৮৪৭) এবং আর্থার হেলপ্স্ (Arthur Helps ) -এর লেখা ‘দি স্প্যানিশ কনকোয়েস্ট ইন আমেরিকা’ (১৯০১) বই দুটিতে এ ঘটনার বিশদ বর্ণনা পাওয়া যাবে। পিজারোর বিজয় কাহিনীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নীচে দেয়া হলো।
পিজারো আতাহুয়ালপার সাক্ষাৎ লাভ করার আগেই ইনকা সাম্রাজ্যের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। ইনকা রাজ্যের এ দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণের জন্য সুযোগের সন্ধান করছিলেন পিজারো। ইনকা রাষ্ট্রের গঠন বিন্যাস এমনই ছিলো যে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিলো ইনকা সম্রাটের হাতে। তাই ইনকা সম্রাটকে বশে আনতে পারলেই ইনকা সাম্রাজ্যকেও করায়ত্ত করা সম্ভব হতো। পিজারো ঠিক তাই করেছিলেন। আতাহুয়ালপা তাঁর অপরিমিত ক্ষমতা সম্পর্কে এতই নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি অসতর্ক অবস্থায় পিজারোর নিকটবর্তী হওয়া মাত্র পিজারো এক আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাঁকে বন্দী করে ফেলেন। এর ফলে পুরো ইনকা সাম্রাজ্যই পিজারোর হস্তগত হয়ে গেলো। বন্দী আতাহুয়ালপা পিজারোর কথা মতো যেসব নির্দেশ দিতেন, ইনকা সাম্রাজ্যের মানুষ সে নির্দেশ পালন করতো। তাই বলা চলে যে পিজারো ইনকা সাম্রাজ্য জয় করেন নি, বরং ইনকা সাম্রাজ্যকে বন্দী করেছিলেন।
আতাহুয়ালপা ধনরত্ন প্রদান করে পিজারোর হাত থেকে মুক্তিলাভের চেষ্টা করেছিলেন। সোনার জন্য স্পেনীয়দের প্রচণ্ড লোভ আছে জেনে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে পিজারোকে ঘর ভর্তি সোনা দিয়ে দেবেন। যে ঘরে আতাহুয়ালপাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো সেটা লম্বায় ছিলো ২২ ফুট অথবা ৩৫ ফুট আর প্রস্থে ছিলো ১৭ ফুট। সে ঘরের মেঝেয় দাঁড়িয়ে আতাহুয়ালপা যত দূর হাত পৌঁছায় তত উঁচুতে একটা দাগ দিলেন। ঐ দাগ বরাবর ঘরের চার দেয়ালে একটা রেখা আঁকা হলো, মেঝে থেকে যার উচ্চতা ছিলো প্রায় ৯ ফুট। আতাহুয়ালপা বললেন, ঐ দাগ পর্যন্ত উঁচু করে সমস্ত ঘরটা সোনায় ভর্তি করে দেয়া হবে এবং আরো দুটো ঘর রূপা দিয়ে ভর্তি করে দেয়া হবে, যদি তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। পিজারো এ মুক্তিপণের বিনিময়ে আতাহুয়ালপাকে মুক্তি দিতে রাজি হলেন।
আতাহুয়ালপা তখন সাম্রাজ্যের সর্বত্র নির্দেশ পাঠালেন কাজামার্কায় সোনা রূপা পাঠানোর জন্য। আতাহুয়ালপার মনে সন্দেহ ছিলো যে পিজারো হয়তো হুয়াসকারকে ইনকা সম্রাট বানাবেন। তাই বন্দী অবস্থায় থেকেও তিনি গোপন নির্দেশ পাঠিয়ে হুয়াসকারকে হত্যা করান। এদিকে শত শত স্লামার পিঠে বোঝাই হয়ে প্রভূত পরিমাণ সোনা এসে কাজামার্কায় পৌঁছাল। কিন্তু চুক্তি অনুসারে সোনা রূপা পেয়েও পিজারো আতাহুয়ালপাকে মুক্তি দিলেন না। নানা রকম বানোয়াট অভিযোগে ইনকা সম্রাটের বিচার করে তাকে প্রকাশ্যে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয়া হলো। শেষ মুহূর্তে অবশ্য আতাহুয়ালপাকে বলা হলো যে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলে তাঁকে অনুগ্রহ করে পুড়িয়ে মারার পরিবর্তে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হবে। আতাহুয়ালপা এতে সম্মত হলে তাঁকে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হলো এবং গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হলো। এভাবে ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট শেষ ইনকা সম্রাট মারা গেলেন।
এর পরেও কিছুকাল ইনকা অভিজাত শ্রেণী স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ খ্রীষ্টাব্দে ইনকা সিংহাসনের শেষ দাবীদার টুপাক আমারু স্পেনীয়দের হাতে নিহত হন। তারপর থেকে সমগ্র ইনকা সাম্রাজ্যে স্পেনীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
.
ইনকা অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা
পনের কুড়ি হাজার বছর আগে যে শিকারী মানুষরা দক্ষিণ আমেরিকাতে গিয়েছিলো তারা পশুশিকার করেই জীবন ধারণ করতো। কিন্তু তারপর পেরু অঞ্চলের মানুষ কৃষিকাজ আয়ত্ত করেছে। ইনকা সাম্রাজ্যের আমলে পেরুর মানুষ পশুর মাংস প্রায় খেতোই না। উপকূল অঞ্চলের মানুষ অবশ্য মাছ শিকার করতো। সাধারণভাবে কেউ বনের পশু শিকার করতে পারতো না। তবে, মাঝে মাঝে সমবেতভাবে পশু শিকার করা হতো। দশ বার হাজার মানুষ মিলে সমস্ত বন ঘিরে ফেলে সব পশু ধরতো বা শিকার করতো। তার মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক পশুকে, বিশেষত স্ত্রী জাতীয় পশুদের ছেড়ে দেয়া হতো, যাতে তারা আবার বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। বাকি পশুদের হত্যা করে তাদের মাংস শুকিয়ে সব মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক একটা প্রদেশকে চার ভাগে ভাগ করা হতো এবং প্রতি চার বছর অন্তর এক একটা ভাগে শিকার করা হতো। সাধারণত হরিণ, গুয়ানাকো, ভিকুনা প্রভৃতি প্রাণী শিকার করা হতো।
ইনকা আমলে পেরুর অর্থনীতি প্রধানত কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল ছিলো। ইনকা রাজ্যের লোকেরা প্রধানত নিরামিষভোজী ছিলো। গোল আলু ছিলো ইনকাদের প্রধান খাদ্যশস্য। ইনকারা ভুট্টা, নানা ধরনের শিম, মিষ্টি আলু, টমাটো, লাউ, কাঁচা মরিচ ইত্যাদির চাষ করতো। এগুলোর মধ্যে একমাত্র লাউ ছাড়া অন্য সব তরি-তরকারি এবং খাদ্যশস্য ইউরোপ, আফ্রিকা বা এশিয়ায় অপরিচিত ছিলো। স্পেনীয়রা এবং পর্তুগীজরা এ সকল খাদ্যশস্য ও তরি- তরকারি ইউরোপ এশিয়ায় প্রচলন করেছিলো।
১৪০০০ ফুট উপরের উপত্যকায় আলু এবং অন্য কয়েকটি ফসল উৎপন্ন হতো। উঁচু পাহাড়ের উপরের মানুষ প্রধানত আলু খেয়ে প্রাণ ধারণ করতো। ১১০০০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় ভুট্টা উৎপন্ন হতো। পার্বত্য অঞ্চলের মাঝারি উচ্চতার মানুষদের জন্য ভুট্টাই ছিলো প্রধান খাদ্যশস্য। পাহাড়ের নীচের অঞ্চলের মানুষরা আলু, ভুট্টা ও অন্যান্য তরি-তরকারি খেতো। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে কেটে তাতে চাষ করা হতো।
ইনকারা লাঙলের ব্যবহার জানতো না। তবে পশু পালনের কৌশল জানতো। ল্লামা ও আলপাকাকে তারা পোষ মানিয়েছিলো। কিন্তু এসব ছোট ছোট পশু দিয়ে হাল চাষ করা সম্ভব ছিলো না। তা ছাড়া লাঙল জিনিসটাই ছিলো তাদের অজানা। ইনকারা শক্ত কাঠের কোদাল দিয়ে মাটি কোপাত, এ কোদালের নাম ছিলো টাক্লা। পুরুষরা এ কোদাল দিয়ে জমি চাষ করতো। মেয়েরা এক ধরনের গদা দিয়ে শক্ত মাটি ভেঙে চাষের কাজে সহায়তা করতো। একটা লাঠির আগায় পাথরের চাকতি বসিয়ে এ গদা তৈরি করা হতো। প্রত্যেক পরিবারকে এক ফালি লম্বাজমি দেয়া হতো। স্বামী-স্ত্রী মিলে ক্ষেতে কাজ করতো। বর্ষাকালে ফসল বোনার সময় সামাজিকভাবে আমোদ আহ্লাদ উৎসব করতো। ইনকা সাম্রাজ্য দক্ষিণ গোলার্ধে ছিলো বলে সেখানে বর্ষা হতো ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে। ভুট্টা বোনা হতো আগস্ট মাসে, আলু ডিসেম্বরে। ফসল উঠতো জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে। ফসল তোলার সময়ে নাচ-গান ও আনন্দ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। ক্ষেতে কাজ করার সময়েও ছেলে ও মেয়েরা গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতো। ফসল ওঠার পরে ভুট্টাকে ঝেড়ে শুকিয়ে ঘরে ঘরে জমা করে রাখা হতো। আর আলুকে পা দিয়ে মাড়িয়ে গুঁড়ো করে রোদে শুকিয়ে জমা করে রাখা হতো। টিটিকাকা হ্রদের ধারের লোকেরা মাছ ধরে খেতো। এরা মাছ ধরার জন্য নানা ধরনের জাল এবং কোচ বা বল্লম ব্যবহার করতো। কিন্তু তাঁরা বঁড়শি বা ছিপের ব্যবহার জানতো না। সমুদ্রের উপকূলের মানুষরাও মাছ ধরতো। এরা অবশ্য মাছ ধরার জন্য নানা ধরনের যন্ত্রপাতি ও কৌশল ব্যবহার করতো।
পেরু অঞ্চলে চাররকম উট বংশের প্রাণী ছিলো। এরা : স্লামা, আলপাকা, ভিকুনা এবং গুয়ানাকো। প্রথম দুটো প্রাণী আকারে সামান্য বড় এবং এগুলোকে পেরুর মানুষ পোষ মানাতে পেরেছিলো। ভিকুনা আর গুয়ানোকো ছিলো আকারে ছোট এবং বন্য প্রাণী। স্লামা এবং আলপাকাও অবশ্য উটের তুলনায় খুবই ছোট। ল্লামাকে ভারবাহী পশু হিসেবে ব্যবহার করা হতো। আলপাকাকে পোষা হতো তার লোমের জন্য। আলপাকার লোম সাধারণত গাঢ় বাদামী বা কালো রঙের হতো। এ লোম দিয়ে গরম কাপড় তৈরি করা হতো।
ল্লামারা পানি না খেয়ে দীর্ঘ পথ চলতে পারতো আর তারা কষ্ট সহিষ্ণু ও ছিলো। তাই ভারবাহী পশু হিসেবে ল্লামারা খুবই উপযোগী ছিলো। তবে, তারা এক বা দেড় মণের বেশি ওজন বহন করতে পারতো না। গ্লামারা ঘোড়ার মতো দ্রুত চলতে পারতো না। ইনকারা তাই মাল পরিবহণের জন্য শত শত লামার পিঠে মালপত্র চাপিয়ে তাদের সারি বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতো। প্রতি শত স্লামার জন্য প্রায় ৮ জন চালক দরকার হতো। গ্লামার দল দিনে প্রায় ১০ থেকে ১২ মাইল যেতে পারতো। ইনকা সাম্রাজ্যে দেশের সব স্লামা ও আলপাকা প্রধানত রাজার সম্পত্তি ছিলো। ইনকারা ল্লামা ও আলপাকা ছাড়াও কুকুর, গিনিপিগ এবং হাঁস পুষতো। মানুষ যখন প্রথম বেরিং প্রণালী পার হয়ে আমেরিকা মহাদেশে গিয়েছিলো তখন সাথে করে কুকুরও নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু হাঁস ও গিনিপিগকে পেরুর মানুষই প্রথম পোষ মানিয়েছিলো। সাধারণ ইনকারা প্রধানত গিনিপিগের মাংসই খেতো।
ইনকাদের রান্নার কৌশল খুব উন্নত ছিলো না। কাঠে কাঠ ঘষে আগুন জালানো হতো। একটা কাঠের গর্ত করে তাতে একটা কাঠিকে দড়ি পাকানোর মতো কৌশলে দুই হাতে ঘোরানো হতো। এ ভাবে আগুণ জালানোর কৌশল আমাজন অঞ্চলের জঙ্গলের বন্য মানুষরাও জানতো। মেক্সিকোর মানুষরা যেমন ভুট্টাকে সিদ্ধ করে তারপর সেটাকে পিষে নিতো, ইনকারা সেভাবে ভুট্টা খেতো না। ইনকারাও শুকনো ভুট্টাকে গুড়ো করে ভুট্টার আটা বানিয়ে নিতো। সাধারণত একটা পাথরের পাটার উপরে অর্ধ্ব গোলাকার পাথরের টুকরো দিয়ে ঘষে ঘষে ভুট্টা গুঁড়ো করা হতো। ইনকারা আস্ত ভুট্টাকে পুড়িয়ে বা সিদ্ধ করেও খেত। ইনকারা খামির এর ব্যবহার জানতো না। তাই তারা তন্দুর রুটি বা পাউরুটির মতো রুটি বানাতে পারতো না। ইনকারা আলুকে বরফে জমিয়ে তারপর আবার বরফ মুক্ত করে সেটাকে টিপে টিপে রস বের করে নিতো। তারপর আলুকে শুকিয়ে জমা করে রাখতো। ইনকারা মাছ এবং মাংস কেটে জমা করে রাখতো। তারা ভুট্টা প্রভৃতি শুকনো শস্যকে বাড়িতে অথবা গোলায় জমা করে রাখতো।
ইনকারা মাটির পাত্রে রান্না করতো। তারা খাওয়াদাওয়ার জন্যও মাটির পাত্রই ব্যবহার করতো। তবে লাউয়ের খোল, কাঠের পাত্র প্রভৃতির প্রচলনও ছিলো। ধনী ও অভিজাত ইনকারা সোনা-রূপার পাত্রও ব্যবহার করতো। রান্নার কাজ সাধারণত ঘরের বাইরেই করা হতো, তবে অনেক বাড়িতেই রান্নার স্থায়ী চুলা ছিলো। ইনকা রাজ্যের লোকেরা সাধারণত দিনে দুবার পেট ভরে খেতো সকালেও সন্ধ্যায়।
ইনকারা পশম ও সূতীর পোষাক পরতো। তারা তাঁতে তৈরী বা হাতে বোনা কাপড় পরতো। তবে তারা কাপড় কেটে সেলাই করে পোষাক তৈরি করার কৌশল জানতো না। তারা আস্ত কাপড়ের টুকরোকে ভাঁজ করে কোমরের নীচে পরতো। আরেকটা কাপড়কে দুভাঁজ করে গায়ে দিতো। তাতে মাথা এবং হাত বের করার জায়গা বাদ রেখে বাকি অংশ সেলাই করা হতো অথবা সোনা, রূপা বা তামার পিন দিয়ে আটকে রাখা হতো। ইনকারা স্লামার চামড়া দিয়ে তৈরী স্যান্ডেল পরতো।
ইনকা মহিলারা যে পোষাক পরতো সেটা লম্বা একখণ্ড কাপড় দিয়ে তৈরি হতো। এ কাপড়টি কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত সমস্ত শরীরটাকেই আবৃত করতো। মেয়েরাও পুরুষদের মতো চামড়ার স্যাণ্ডেল পরতো। মেয়েরা চুল কাটতো না বরং লম্বা চুল রাখতো, তাঁরা মাথার মাঝখানে সিঁথি করতো। পুরুষরা চুল কাটতো— সামনের দিকে ছোট করে, পিছনের দিকে একটু লম্বা রেখে। ইনকা মহিলারা গলায় হার পরতো। অভিজাত ইনকা পুরুষরা কানে গয়না পরতো।
.
ইনকাদের রাষ্ট্র ও সমাজ
ইনকা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এবং একমাত্র শাসক ছিলেন ইনকা সম্রাট। সূর্য-দেবের বংশধর হিসেবে ইনকা সম্রাটরা ঐশ্বরিক অধিকার লাভ করেছিলেন। ইনকা সম্রাটকেও দেবতা হিসেবেই পূজা ও মান্য করা হতো। সম্রাটের একাধিক পত্নী ও উপপত্নী থাকতো। তাই সব সম্রাটেরই বহু সংখ্যক ছেলেমেয়ে থাকতো। সম্রাটের আত্মীয়-স্বজন ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভিজাত শ্রেণী গঠিত হয়েছিলো। এ অভিজাতদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রের উঁচু পদসমূহের জন্য রাজ কর্মচারী নির্বাচন করা হতো।
সম্রাটের ছেলেই সম্রাট হতো। সাধারণত প্রধান রাণীর ছেলেদের মধ্যে যে সবচেয়ে উপযুক্ত তাকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করা হতো। একজন সম্রাট বার্ধক্যে উপনীত হলে, অথবা মৃত্যুকালে পরবর্তী উত্তরাধিকারীর নাম মনোনয়ন করতেন। প্রত্যেক সম্রাট নিজের জন্য একটা করে প্রাসাদ নির্মাণ করতেন। সম্রাটের মৃত্যুর পর ঐ প্রাসাদ তাঁর স্মৃতিসৌধরূপে গণ্য হতো। সম্রাটের মৃত্যুর পর সমস্ত সাম্রাজ্যে তাঁর জন্য শোক অনুষ্ঠান করা হতো। স্পেনীয়রা ইনকা সাম্রাজ্য অধিকার করার পর সমস্ত ইনকা সম্রাটদের দেহের মমি দেখতে পেয়েছিলো।
সম্রাটের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত পত্নী ও ভৃত্যেরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করে সম্রাটের অনুগমন করে পরলোকে যাবে এমনটাই সকলে আশা করতো। সম্রাটের মৃত্যুর পরে এরা সকলে মদ্যপান করে মস্ত এক নাচ-সভায় মাতাল হয়ে নাচতো এবং তখন তাদের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হতো।
পবিত্র সম্রাটের সামনে উচ্চপদস্থ অভিজাত রাজকর্মচারীরাই কেবল যেতে পারতো। সাধারণত সম্রাটের সাক্ষাৎ কেউ পেত না, পর্দার অন্তরালে থেকেই সম্রাট তাঁদের সাথে কথা বলতেন। দুই একজন অতি সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই সম্রাটের মুখোমুখি হতে পারতো। সম্রাট যখন সাম্রাজ্য পরিদর্শনে বের হতেন তখন লোকলস্কর ছাড়াও তাঁর পাল্কি বহন করার জন্যই কয়েকশ মানুষ থাকতো। এত লোকজন নিয়ে এবং সম্রাটের উপযুক্ত ধীরগতিতে চলার ফলে ভ্রমণকালে সম্রাটের বাহিনীর চলার গতি দিনে বারো তেরো মাইলের বেশি হতো না।
রাজপ্রাসাদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য ভৃত্য সংগ্রহ করা হতো বিভিন্ন গ্রাম থেকে। ঐসব গ্রাম থেকে খাজনা হিসেবে এ সকল লোক সংগ্রহ করা হতো। এ সকল ভৃত্য যদি কোনো অপরাধ করতো তবে তার পুরো গ্রামকেই শাস্তি ভোগ করতে হতো। যদি কোনো ভৃত্য সম্রাটের ক্ষতি সাধন করতো তবে তার গ্রামটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হতো।
সম্রাটের সিংহাসন বলতে ছিলো আট ইঞ্চি উঁচু একটা কাঠের পিঁড়ি বা জলচৌকি। এ আসনটিকে একটা উঁচু বেদীর উপর রাখা হতো। কারো কারো মতে রাজার সিংহাসনটি ছিলো সোনার তৈরী। ইনকা সম্রাটরা সোনার বাসনে আহার করতেন। কিন্তু ইনকা সম্রাটের শোয়ার জন্য কোনো খাট চৌকির ব্যবস্থা ছিলো না। মাটিতে একটা কাঁথার উপর একটা পশমের কম্বল বিছিয়ে তার উপর ইনকা সম্রাট ঘুমাতেন।
১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দের পর ইনকা রাষ্ট্র যখন একটা ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয় তখন অজস্র ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও রাজ্যকে বশীভূত ও সংগঠিত করার সমস্যা দেখা দেয়। যেসব ছোট ছোট জাতি ইনকাদের বশ্যতা স্বীকার করে তাদের রাজাকে তাদের দেশে ক্ষমতায় রেখে তাদের ছেলেদের কুজকোতে নিয়ে আসা হয় ইনকা রীতিনীতি শিক্ষা দেয়ার জন্য। রাজপুরুষদের ছেলেদের শিক্ষাদানের জন্য কুজকোতে একটা বিদ্যালয় ছিলো। এখানে চার বছর ধরে শিক্ষা দেয়া হতো। প্রথম বছরে ইনকা ভাষা, দ্বিতীয় বছরে ইনকা ইতিহাস বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হতো।
ইনকা সাম্রাজ্যের পরিধি বেড়ে গেলে আগেকার ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণী দিয়ে রাজ্য পরিচালনা আর সম্ভব ছিলো না। সম্রাট পাচাকুটি তাই কুজকোর নিকটবর্তী ইনকা ভাষাভাষী কতগুলো গোষ্ঠীকে ইনকা অভিজাত বলে স্বীকৃতি দেন। এসব অভিজাত রাজ কর্মচারী হিসেবে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নতুন দেশগুলো শাসন করতেন।
সম্রাট ও অভিজাত শ্রেণী নানারকম সুবিধা ভোগ করতেন। অভিজাতরা সম্রাটের মতো পাল্কি, পোষাক, চাকরবাকর, বিলাসদ্রব্য ব্যবহার করতে পারতেন, হারেম রাখতে পারতেন। অভিজাতরা সব রকম খাজনা থেকে রেহাই পেতেন এবং সরকারী খরচে জীবনযাপন করতেন। অভিজাতদের স্লামা ও জমি প্রদান করা হতো। পুরাহিতরাও ছিলো সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ইনকা সাম্রাজ্যে ধনী-দরিদ্রের ভেদ ছিলো, কিন্তু প্রাচীন মিশর বা ব্যবিলনের মতো সেখানে দাস শ্রেণী ছিলো না। দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর উৎপাদিত সম্পদের উপর নির্ভর করে টিকে ছিলো অভিজাত ও পুরোহিত শ্রেণী। ইনকাদের রাজ্যে দাস অবশ্য ছিলো। কিন্তু দাসশ্রেণীর শ্রমের উপর সমাজ নির্ভর করতো না। সমাজ নির্ভর করতো স্বাধীন কৃষকদের শ্রমের উপর। স্বাধীন কৃষকদের স্বাধীনতা অবশ্য প্রায় ছিলোই না। তথাপি তাদের দাস বলা চলে না।
ইনকা আমলের আগে পেরুতে উপজাতীয়দের ধরনের গোষ্ঠীই ছিলো সমাজের ভিত্তি। ক্রমশ পেরু অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্যের উদয় হলে গোষ্ঠীর উপর রাজাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইনকা সাম্রাজ্যের আমলে গোষ্ঠী বা স্থানীয় রাজার প্রতি আনুগত্যের বদলে দূর অঞ্চলের ইনকা সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের উদয় ঘটে। গোষ্ঠীর চেতনার সাথে এভাবে রাজতন্ত্রের চেতনা মিশে যায়।
ইনকা আমলে এক এক এলাকার কতগুলো গোষ্ঠীকে একত্রিত করে একটা অঞ্চল গঠন করা হতো। কয়েকটা অঞ্চল নিয়ে একটা প্রদেশ গঠন করা হতো। সমগ্র সাম্রাজ্যকে চারটি খণ্ডে ভাগ করা হয়েছিলো। কুজকোর উত্তর পশ্চিম, দক্ষিণ পশ্চিম, উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব অংশে ছিলো এ চারটি খণ্ড। প্রত্যেক খণ্ডে ছিলো অনেকগুলো করে প্রদেশ।
প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ইনকা প্রশাসক থাকতেন। সাম্রাজ্যের চারটি খণ্ডের জন্য চারজন শাসক ছিলেন। এঁরা কুজকোতে থেকে এক রাষ্ট্র পরিষদ গঠন করতেন। এ পরিষদ তার মতামত ও পরামর্শ সম্রাটকে জানাতেন। সম্রাটের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশই অবশ্য চূড়ান্ত ছিলো।
প্রাদেশিক শাসকদের অধীনে নানা স্তরের কর্মচারী ছিলো। কৃষকদের ও করদাতাদের উপর তদারকি করাই ছিলো তাদের কাজ। সবচেয়ে নীচের পর্যায়ের কর্মচারীরা প্রত্যেকে দশজন বা পঞ্চাশজন লোকের হিসেব রাখতো। তার উপরের কর্মচারী একশ জনের হিসেব রাখতো। তার উপরের জন এক হাজারজনের দায়িত্বে ছিলো। তার উপরের কর্মচারী দশ হাজার লোকের হিসেব রাখতো। এদের উপরে ছিলেন প্রাদেশিক শাসক। ইনকা সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা ধাপে ধাপে এমনভাবে বিন্যস্ত ছিলো যে সাম্রাজ্যের প্রতিটি লোকের হিসেব কর্তৃপক্ষের নখদর্পণে থাকতো। ইনকা শাসকরা দশের হিসেবে লোক গুণতো। যেমন দশ, একশ, হাজার, দশ হাজারজনের দলের হিসেব। কিপুর সাহায্যে এসব হিসেব রাখা হতো। প্রতিটি প্রদেশের প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি লোকের জন্ম, মৃত্যু ও বয়স অনুযায়ী কর্মক্ষমতার হিসেব কিপুর সুতায় গিঁট বেঁধে লিখে রাখা হতো। প্রতিটি লোকের কাছ থেকে হিসেব অনুয়ায়ী কাজ ও খাজনা আদায় করা হতো।
.
রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
পেরু অঞ্চলে ইনকাদের আগেও হয়তো রাস্তাঘাট তৈরি হতো, তবে ইনকা আমলেই এ অঞ্চলে উৎকৃষ্ট রাস্তা নির্মিত হয়েছিলো। আসিরীয়, পারসিক বা রোমানদের মতো ইনকাদেরও বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র সৈন্য, রসদ ও সংবাদ পাঠানোর জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রয়োজন হয়েছিলো। অবশ্য আসিরীয় বা রোমানদের যেমন ঘোড়ার গাড়ি বা যুদ্ধরথ ছিলো, ইনকাদের তেমন কোনো চাকাওয়ালা গাড়িই ছিলো না। তাই ইনকাদের চওড়া রাস্তা বা অত্যন্ত মজবুত পুলের প্রয়োজন ছিলো না। আবার পাহাড়ের খাড়া অঞ্চলে তারা ধাপ কেটে পথ তৈরি করতে পারতো।
ইনকা সাম্রাজ্যে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি দুটো প্রধান সড়ক ছিলো। একটা নীচের উপকূল ধরে, আরেকটা পর্বতের উপর দিয়ে। অনেকগুলো আড়াআড়ি রাস্তা এ দুটো প্রধান সড়ককে সংযুক্ত করেছিলো। আর ছোটখাট অনেক রাস্তা ইনকা সাম্রাজ্যের প্রতিটি গ্রামে গিয়ে পৌঁছেছিলো। উপকূল অঞ্চলের মহাসড়কটি টামবেজ থেকে শুরু হয়ে উপকূল ধরে আরেকুইপা পর্যন্ত গিয়েছিলো এবং শেষ পর্যন্ত সম্ভবত চিলি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিলো। তবে আরেকুইপা থেকে চিলি পর্যন্ত রাস্তাটা খুব বেশি ব্যবহার করা হতো না। পর্বতের উপর দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়েছিল সেটা ছিল আরও দীর্ঘ। এ মহাসড়কটি শুরু হয়েছিলো কলম্বিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত থেকে এবং দক্ষিণে এটা চলে গিয়েছিলো কুজকো পর্যন্ত। কুজকো থেকে এটা আরো দক্ষিণে চলে যায়। টিটিকাকা হ্রদের কাছে এসে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হয়। টিটিকাকার দক্ষিণ থেকে রাস্তাটা দক্ষিণ পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমান আর্জেন্টিনার অন্তর্গত টুকুমান-এ গিয়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে একটা রাস্তা চলে যায় চিলির উপকূলের কোকুইম্বো নামক স্থানে এবং সেখানে থেকে আরো দক্ষিণে সান্টিয়াগোতে। আরেকটা রাস্তা টুকুমান থেকে আর্জেন্টিনার মেনডোজা পর্যন্ত চলে যায়। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা আড়াআড়ি রাস্তা উপকূলীয় নগর টামবেজকে পর্বতের উপরের রাস্তার সাথে যুক্ত করেছিলো। অন্যান্য মহাসড়ক কুজকোর সাথে আরেকুইপা, নাজকা প্রভৃতি স্থানের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছিলো।
পাহাড়ের উপর দিয়ে যেসব রাস্তা তৈরি হয়েছিলো সেগুলো নির্মাণ করতে যথেষ্ট পরিমাণ কারিগরি নৈপুণ্যের প্রয়োজন হয়েছিলো। রাস্তাগুলো যথাসম্ভব সরলরেখা বরাবর তৈরি করা হতো; কিন্তু পর্বতের ঢাল অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই আঁকাবাঁকা রাস্তা তৈরি করতে হয়েছিলো। আবার পথ যেখানে খাড়া নেমে গেছে সেখানে পাথরের গায়ে সিঁড়ির মতো ধাপ কেটেও পথ নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তাগুলো ছিলো প্রায় ৩ ফুট চওড়া এবং পাথর দিয়ে বাঁধানো। জলাভূমির উপর দিয়ে পথ গেলে সেখানে বাঁধ তৈরি করে বাঁধের উপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, নদীর উপর পুল নির্মাণ করা হয়েছে এবং পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।
উপকূল অঞ্চলের রাস্তা অবশ্য সোজা ও চওড়া হতো। এসব রাস্তা সাধারণত ১২ থেকে ১৫ ফুট চওড়া হতো। মরুভূমি দিয়ে যেসব রাস্তা গিয়েছিলো সেখানে রাস্তার দু পাশে সারিবদ্ধ থাম পুঁতে পথ নির্দেশ করা হতো। গ্রাম বা শহরের মধ্য দিয়ে রাস্তা গেলে পথের দু পাশে দেওয়াল তুলে দেয়া হতো।
ইনকাদের মহাসড়কের পাশে কিছু দূর অন্তর একটা করে বিশ্রামঘর থাকতো। সরকারী প্রয়োজনে যাঁরা এ পথ দিয়ে যেতেন তাঁরা এ সকল ঘরে বিশ্রাম নিতেন। সাধারণত একদিনের ভ্রমণের দূরত্বে এ সকল বিশ্রামঘর নির্মাণ করা হতো। এ ছাড়া রাস্তার উপর যেসব শহর ছিলো তাতে সম্রাটের জন্য ‘রাজকীয় বিশ্রামঘর’ নির্মাণ করা হতো। সম্রাট যদি কখনও এ পথ দিয়ে যেতেন তাহলেই শুধু এসব রাজকীয় বিশ্রামঘর ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সম্রাট কোন শুভদিনে আসবেন তার প্রতীক্ষায় এ সকল রাজকীয় বিশ্রামঘরকে সর্বক্ষণ নিখুঁতভাবে প্রস্তুত রাখা হতো। সব রকম বিশ্রামঘরেই সর্বদা খাদ্যদ্রব্য ও আসবাবপত্র মজুত রাখা হতো।
নদী পার হওয়ার জন্য নানা ধরনের পুল তৈরি করা হতো। ছোট নদীর উপর দিয়ে লম্বা লম্বা কাঠের গুঁড়ি বা পাথর পেতে পুল তৈরি করা হতো। নদীর মধ্য দিয়ে পাথরের থাম নির্মাণ করা হতো, কাঠের বা পাথরের পাটাতনগুলো এসব থামের উপর ভর দিয়ে থাকতো। বড় বড় নদীর উপর দিয়ে তৈরি হতো ভাসমান পুল। ছোট ছোট নৌকা বা ভেলার উপর ভর দিয়ে এ সমস্ত পুল দাঁড়িয়ে থাকতো। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিলো ঝুলন্ত পুল। ঝুলন্ত পুল নির্মাণের জন্য খড় বা লতার তৈরি মোটা মোটা ৬টা দড়ি টানা দেয়া হতো নদীর উপর দিয়ে 1 চারটে দড়ি নীচে বিছানো হতো হেঁটে পার হওয়ার জন্য। দুটো দড়ি টানা দেয়া হতো হাতল হিসেবে।
এ মোটা দড়িগুলো ছিলো প্রায় ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের। এ দড়িগুলো তৈরি করা হতো খড়, গাছের ছাল, লতা এবং নরম শাখা-প্রশাখা দিয়ে। যে চারটে দড়ি দিয়ে পুলের মেঝে তৈরি হতো তাদের উপর আড়াআড়িভাবে কাঠের লাঠি বা ডাল স্থাপন করা হতো এবং মাটি দিয়ে লেপে দেয়া হতো। হাতলের দড়ির সাথে পুলের মেঝেকে ছোট ছোট দড়ি দিয়ে যুক্ত করা হতো। এ ধরনের পুল দিয়ে পঁচিশ ত্রিশজন মানুষ একসাথে পার হতে পারতো, গ্লামার দলও যেতে পারতো। এ পুলগুলো বাতাসে অনবরত দুলত ঠিকই, কিন্তু নিরাপদও ছিলো। পুলের কাছাকাছি এলাকার লোকদের উপর দায়িত্ব ছিলো প্রতি বছর পুলগুলোকে মেরামত করা। এ পুলগুলো ২০০ ফুট বা তার বেশি লম্বাও হতো।
পেরুতে বা ইনকা রাজ্যে চাকাওয়ালা গাড়ি ছিলো না। মালপত্র সাধারণত মানুষের বা ল্লামার পিঠে করে বহন করা হতো। সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে চলতো। ধনী ও অভিজাত মানুষরা পাল্কি চেপে চলাফেরা করতেন। সম্রাটের পাল্কি ছিল সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ। সম্রাট যখন সাম্রাজ্য পরিদর্শনে বের হতেন তখন তাঁর পাল্কি বহন করতো সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় অভিজাত ও সামন্তরা।
ইনকা রাজ্যের রাস্তা দিয়ে সচরাচর সৈন্যদল, রাজকর্মচারী এবং মালবাহী স্লামার দল যাতায়াত করতো। তা ছাড়াও খবর বা হাল্কা জিনিসপত্র পাঠানোর জন্য এক ধরনের ডাক ব্যবস্থা দিনরাত কাজ করতো। প্রায় এক মাইল অন্তর অন্তর রাস্তার দুই পাশে এক জোড়া ঘর তৈরি করা ছিলো। এগুলো ছিল ডাকঘর। প্রত্যেক ঘরে দু’জন করে লোক দিনরাত উপস্থিত থাকতো। এদের একজন সারাক্ষণ রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতো। যখনই দূর থেকে একজন ডাক হরকরাকে আসতে দেখা যেত তখনই ঘরে অপেক্ষমাণ লোকটি ছুটে বের হয়ে গিয়ে ছুটন্ত হরকরার সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে তার কাছ থেকে মৌখিক খবর বা কিপু প্রভৃতি সংগ্রহ করতো। তারপর সে খবর নিয়ে খুব জোরে দৌড়ে গিয়ে পরবর্তী ডাকঘরের লোকের হাতে তুলে দিতো। যে হরকরা সংবাদ নিয়ে এসেছিলো তাকে বিশ্রাম করার সুযোগ দিয়ে ডাকঘরে অন্য একজন লোককে পরবর্তী খবর বহন করার জন্য বসিয়ে রাখা হতো। এ কাজের জন্য যুবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়োগ করা হতো। এক এক এলাকার যুবকরা পালাক্রমে ১৫ দিনের জন্য বেগার খেটে এ দায়িত্ব পালন করতো।
এ ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে অতি দ্রুত গতিতে সংবাদ প্রেরণ করা সম্ভব হয়েছিলো। লিমা থেকে কুজকো পর্যন্ত প্রায় ৪২০ মাইল দূরত্বে সংবাদ নিয়ে যেতে সময় লাগতো মাত্র তিনদিন। এ ছাড়া প্রয়োজন বোধে ইনকারা মশালের আগুন বা ধোঁয়ার সাহায্যে সংকেতের মাধ্যমে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সংবাদ প্রেরণ করতো।
জলপথে চলাচলের জন্য ইনকারা নৌকা ব্যবহার করতো। উপকূল অঞ্চলে এবং টিটিকাকা হ্রদে এসব নৌকায় চড়ে জেলেরা মাছ ধরতো। নলখাগড়া দিয়ে তৈরী এসব নৌকাকে বলা হতো ‘বালসা’। সাধারণত একজন মানুষ এ নৌকায় চড়তে পারতো। পেরু ও ইকুয়েডর-এর উপকূল অঞ্চলে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো সেখানে বনভূমি গড়ে উঠেছিলো। এ অঞ্চলে কাঠের গুঁড়ি জোড়া দিয়ে নৌকা তৈরী করা হতো। এ রকম নৌকায় পঞ্চাশজন মানুষ চড়তে পারতো। এসব কাঠের তৈরি নৌকায় পাল থাকতো, বৈঠাও ব্যবহার করা হতো। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে প্রাচীনকালে এ ধরনের নৌকায় করে পেরু অঞ্চলের মানুষ ইন্দোনেশিয়া বা এশিয়া পর্যন্ত যাওয়া-আসা করতো।
.
ইনকাদের ধর্ম
ইনকারা সূর্যের পূজা করতো। ইনকা সম্রাটরা নিজেদের সূর্যের সন্তান বলে দাবী করতেন। ইনকারা চাঁদকেও দেবী বলে গণ্য করতেন। চাঁদ ছিলো সূর্যের পত্নী। ইনকারা আরো অনেক জিনিসকে পবিত্র ও ও পূজনীয় বলে মনে করতো। ইনকাদের ভাষায় এদের বলা হতো ‘হুয়াকা’। পাহাড়, ঝরনা, পাথরের স্তূপ, বড় বড় মন্দির সব কিছুকেই হুয়াকারূপে গণ্য করা হতো।
ইনকারা ‘ভিরাকোচা’ নামে এক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো। তাঁর আকৃতি ছিলো মানুষের মতোই। মন্দিরে মন্দিরে তাঁর প্রতিমূর্তি রাখা হতো। ভিরাকোচার উপাসনা প্রধানত উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের মধ্যেই সীমিত ছিলো বলে পণ্ডিতরা ধারণা করেন। ইনকাদের মধ্যে একটা কাহিনী প্রচলিত ছিলো যে ভিরাকোচা নানা অঞ্চলে ঘুরেফিরে লোকের মধ্যে ধর্ম প্রচার করার পর ইকুয়েডর- এর উপকূল থেকে যাত্রা করে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ-এর উপর দিয়ে হেঁটে পশ্চিমদিকে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। তাই পিজারো যখন পেরুর পশ্চিম উপকূলে এসে ওঠেন তখন ইনকারা ভেবেছিল যে ভিরাকোচা আবার ফিরে এসেছেন।
ইনকাদের সমাজে পুরোহিত শ্রেণীও ধাপে ধাপে বিন্যস্ত ছিলো। সর্বোচ্চ স্থানে ছিলেন মহাপুরোহিত। তাঁকে বলা হতো ‘ভিলাক উমু’। তিনি রাজধানী কুজকোতেই থাকতেন। সাধারণত রাজার কোনো ভাই বা চাচাই মহাপুরোহিত হতেন। তাঁর নীচে যে সমস্ত উচ্চপদস্থ পুরোহিত থাকতেন তাঁরাও সম্রাটের আত্মীয়স্বজন থেকেই নির্বাচিত হতেন। সবচেয়ে নীচের স্তরের পুরোহিতদের অবশ্য সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও নেয়া হতো।
ইনকাদের রাজ্যে সব শহরেই সূর্যদেবের মন্দির ছিলো। এসব মন্দিরের ভিতরে অবশ্য পূজা হতো না। পূজা-উৎসব হতো মন্দিরের বাইরের চত্বরে। শুধু পুরোহিতরাই মন্দিরে প্রবেশ করতো। মন্দির থেকে পূজার উপকরণ বের করে এনে খোলা চত্বরে পূজা অনুষ্ঠান করা হতো। ইনকা রাজ্যের সবচেয়ে বড় সূর্য- মন্দির ছিল কুজকো শহরে। সব মন্দিরেই অনেকগুলো দালান থাকতো। তাতে পুরোহিত ও মন্দিরের কর্মচারীরা থাকতো। মন্দির সংলগ্ন একটা আলাদা বাড়িতে সন্ন্যাসিনী বা পবিত্র মহিলারা থাকতেন। এখানে দু’শ্রেণীর মহিলা থাকতেন। এক শ্রেণীর মহিলাদের বলা হতো ‘সূর্য কুমারী’ বা ‘মানাকুনা’। এঁরা ছিলেন চিরকুমারী সন্ন্যাসিনী। আরেক শ্রেণীর মহিলাদের বলা হতো ‘নির্বাচিত মহিলা’ বা ‘আকলাকুনা’ এঁদেরকে সম্রাট বা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ দ্বিতীয় পত্নী হিসেবে গ্রহণ করতেন।
ইনকা রাজ্যে নরবলির তেমন প্রচলন ছিলো না। তবে বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে নরবলি দেয়া হতো। প্রত্যেক দিন সকালে সূর্য উঠলে ভাল ভাল খাদ্য সূর্যের উদ্দেশে উৎসর্গ করে আগুনে ফেলে দেয়া হতো। পরে বেলা হলে একটা লাল রঙের লামাকে সূর্যের উদ্দেশে বলি দেয়া হতো।
কুজকোর মন্দিরের সামনের বিশাল চত্বরে বছরের নানা সময়ে বড় বড় ধর্মীয় উৎসবও অনুষ্ঠান হতো। প্রতি মাসে কুজকোতে অন্তত একটা বড় রকমের বার্ষিক অনুষ্ঠান হতোই। এ সকল অনুষ্ঠানের অনেকগুলোই শস্য রোপণ, ফসল কাটা প্রভৃতি ঘটনার সাথে যুক্ত থাকতো। এ সকল অনুষ্ঠানে ও উৎসবে ল্লামা বলি দেয়া হতো, নাচ, গান, মদ পান এবং খাওয়াদাওয়াও হতো। কোনো কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে উপবাস পালন করা হতো।
ইনকারা দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করতো। ইনকা ধর্মে খ্রীষ্টধর্মের মতো পাপ স্বীকার বা কনফেশনের রেওয়াজ ছিলো। পাপ স্বীকারের পর পুরোহিতদের দেয়া শাস্তি ভোগ করতে হতো। তারপর নদীতে স্নান করে পাপ ধুয়ে ফেলা হতো। খ্রীষ্টধর্মের সাথে এ সকল প্রথার মিল দেখে স্পেনীয় পাদ্রীরা খুবই অবাক হয়েছিলেন।
.
ইনকা সংস্কৃতির পরিচয়
জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা, হস্তশিল্প
ইনকাদের সভ্যতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, শাসন ব্যবস্থা, কারিগরিবিদ্যা প্রভৃতিতে উৎকর্ষের পরিচয় থাকলেও, তাদের সভ্যতা সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখার বিকাশের মাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্য ছিলো না। যেমন এত বিশাল ও সুসংগঠিত ইনকা সাম্রাজ্যে লেখন পদ্ধতির প্রচলন ছিলো না। ইনকারা কোনোভাবেই লিখতে পারতো না, চিত্রলিপি দিয়েও না। তবে ইনকারা ‘কিপু’ নামে এক ধরনের সুতার গোছা দিয়ে কথা ও সংখ্যার হিসেব রাখতে পারতো।
একটা লম্বা সুতাকে টানটান করে ধরা হতো। তার থেকে সারি সারি সুতা ঝুলিয়ে দেয়া হতো। এ ঝুলন্ত সুতাগুলো নানা রকম রঙের হতো। এ ঝুলন্ত সুতাগুলোতে একটু নীচে নীচে গিঁট বাঁধা থাকতো। এ সুতার গোছাকে বলা হতো কিপু। এক এক রঙের সুতা এক একটা সংখ্যা বোঝাতো, আবার গিঁটগুলোর অবস্থান দেখেও সংখ্যা ধোঝা যেতো। এসব কিপু দিয়ে সাম্রাজ্যের কোথায় কত ফসল আছে, কোথায় কি সম্পদ আছে তার হিসেব রাখা হতো। আবার এক ধরনের কিপু কথা মনে রাখার জন্যও ব্যবহৃত হতো। যেমন, একটা খবর মুখে বলে কিপু তৈরি করে বুঝিয়ে দেয়া হলো। সংবাদবাহক কিপু নিয়ে অনেক দূরে কোনো রাজকর্মচারীর কাছে চলে গেলেন। সেখানে কিপু দেখে দেখে কথাগুলো মনে করে বললেন। বিশাল ইনকা সাম্রাজ্য এভাবে কিপুর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো। মিশর ব্যবিলনের যে কোনো সাম্রাজ্যে এ রকম ব্যবস্থা অকল্পনীয় ছিলো।
ইনকাদের জোতির্বিদ্যা বিষয়ক জ্ঞান মায়া, আজটেক বা ব্যবিলনীয়, মিশরীয়দের তুলনায় ছিল নগণ্য। ইনকারা বছরের দৈর্ঘ্য ঠিকমত মাপতে পারতো কিনা সন্দেহ।
ওজন ও পরিমাপের ক্ষেত্রেও ইনকারা খুব বেশি উন্নতির পরিচয় দিতে পারে নি। ইনকারা দৈর্ঘ্য (দূরত্ব) এবং ক্ষেত্রফল মাপার জন্য একটা শব্দই ব্যবহার করতো—টোপো। ১ টোপো ছিল ৪.৫ মাইল লম্বা। আর ১ টোপো পরিমাণ জমি ছিলো প্রায় তিন বিঘার সমান। পণ্ডিতদের মতে, ইনকাদের নাকি ওজন মাপার কোনো বাটখারা বা একক ছিলো না, তরল পদার্থ মাপার কোনো এককও নাকি তাদের ছিলো না। তবে ঝুড়ি ভর্তি করে শস্য মাপার একটা পদ্ধতির প্রচলন ছিলো বলে জানা যায়।
ইনকাদের সমাজে গীত ও বাদ্যের চর্চা হতো। তাদের বাদ্যযন্ত্র ছিলো বাঁশি ও ঢোলক জাতীয়। ইনকাদের বাদ্যযন্ত্র তৈরি হতো কাঠ, নলখাগড়া, হাড়, শামুকের খোল ও ধাতু দিয়ে। ইনকা রাজ্যে বা প্রাচীন আমেরিকা মহাদেশের কোনো স্থানেই তাদের বাদ্যযন্ত্র ছিলোই না বলা চলে। ইনকাদের দেশে যেসব বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিলো তা হলো : ঢোলক, বাঁশি, ঘণ্টা, ট্রাম্পেট্। আমাদের বাঁশের বাঁশির মতো ফুটোওয়ালা বাঁশিও তাদের ছিলো। ইনকাদের দেশে প্যান্ পাইপ নামে এক ধরনের বাদ্য যন্ত্র ছিলো। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, প্রাচীন চীনের অনুরূপ এক বাদ্যযন্ত্রের সাথে এর ঘনিষ্ঠ মিল ছিলো।
ইনকাদের সাহিত্য খুব উঁচু মানের ছিলো। ইনকাদের সমাজে লেখার প্রচলন ছিলো না। তাই এ সাহিত্য শুধু মুখে মুখে প্রচলিত ও প্রচারিত হতো। মনে রাখার সুবিধার জন্য এ সাহিত্যকে ছন্দোবদ্ধ কবিতার আকারে প্রকাশ করা হতো। এ ভাবে ইতিহাস ও পৌরাণিক উপাখ্যান কবিতা ও লোকগাথার আকারে সংরক্ষিত হয়েছিলো। এ ছাড়া ছিলো ধর্মীয় প্রার্থনা ও সঙ্গীত এবং লোকায়ত কবিতা ও গান।
ইনকারা দালান কোঠা তৈরি করতো পাথর দিয়ে। বিশেষত কুজকো, মাচুপিচু ও অন্যান্য শহরে রাজপ্রাসাদ, মন্দির, দুর্গ প্রভৃতি তৈরি করা হতো পাথর দিয়ে। পাথরের টুকরো সাজিয়ে দেওয়াল তোলা হতো। পাথরের ফাঁকগুলো ভরে দেয়া হতো মসৃণ মাটি দিয়ে। পাথরগুলো সুন্দরভাবে খাঁজে খাঁজে বসিয়ে এমন সুদৃঢ় দেওয়াল তৈরি করা হতো যে সে সব প্রাসাদ বা দুর্গ বহু শত বছরেও এতটুকু দুর্বল হতো না। এ সকল দালান কোঠার দেওয়াল পাথরের তৈরি হলেও তাদের ছাদ তৈরি হতো ঘাস প্রভৃতির আচ্ছাদন দিয়ে। তবে ইনকা রাজত্বের শেষদিকে টিটিকাকা হ্রদ অঞ্চলে ও উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে পাথরের টুকরো দিয়ে ছাদ তৈরির কৌশল প্রবর্তিত হয়েছিলো। অবশ্য, কুজকো অঞ্চলে এরকম নির্মাণ কৌশল কখনও প্রচলিত হয়নি।
পেরুর দালানগুলো সাধারণত একতলা বাড়ি হতো, তবে দোতলা এবং তিনতলা বাড়িও সেখানে ছিলো। তবে এ ইনকা আমলের আগে থেকেই উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে এ রকম দোতলা বা তিনতলা দালানের প্রচলন ছিলো।
ইনকা আমলের মন্দিরগুলো মেক্সিকো অঞ্চলের মতো ধাপ পিরামিডের উপর নির্মিত হতো না। তবে উত্তরে অঞ্চলে ইনকাদের আগের আমলে কয়েকটি পিরামিড মন্দির তৈরি হয়েছিলো। উত্তর অঞ্চলের উপকূলে অবশ্য ইনকা আমলের অনেককাল আগে কাঁচা ইটের পিরামিড তৈরি হয়েছিলো। বর্তমান ট্রজিলো শহরের কাছে মোচে নামক স্থানে ইনকাদের আগে অনেক পিরামিড নির্মিত হয়েছিলো। এ পিরামিডগুলোর মাথায় মন্দির তৈরি হতো। এ সকল পিরামিড বেশির ভাগই ছিলো উপকূল অঞ্চলে।
ইনকারা পিরামিড বানাতো না তবে তারা বড় বড় প্রাসাদ, মন্দির প্রভৃতি তৈরি করতো। ইনকারা প্রধানত পাথরের বাড়ি তৈরি করতো।
ইনকাদের সভ্যতায় পাথরের ভাস্কর্য একেবারে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিলো। ইনকাদের প্রাসাদ, দুর্গ প্রভৃতি স্থাপত্যকর্মে অলঙ্করণের চিহ্নও বিশেষ পাওয়া যায় না। ইনকাদের শিল্পকর্মের প্রকাশ ঘটেছে মাটির পাত্রে, সুতী ও পশমী কাপড় ও ধাতুর তৈরী জিনিসপত্রে। ইনকারা উৎকৃষ্ট মানের ও সুন্দর রঙ্গীন নক্সা আঁকা সুতা ও পশমের কাপড় তৈরি করতো।
ইনকারা মাটির পাত্র তৈরি করে তার গায়ে নানা রকম রঙ্গীন নক্সা ও ছবি আঁকতো। ইনকারা কুমারের চাক ব্যবহার করতে জানতো না। তারা খালি হাতে মাটির পাত্র বানাতো। একটা কৌশল ছিলো বেতের ধামা তৈরির পদ্ধতিতে মাটির পাত্র তৈরি করা। প্রথমে মাটি গুলে তাকে লম্বা দড়ির আকার দেয়া হতো। তারপর তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক পরতের উপর আরেক পরত করে সাজানো হতো, যেমন করে বেতের ধামা তৈরি করা হয়। পরে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে পাত্রের ভিতর ও বাইরের দিককে সমান করে লেপে দেয়া হতো। ধাতুর কাজে ইনকারা মায়া বা আজটেকদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। ইনকারা সোনা, রূপা, তামার গয়না ও জিনিসপত্র তৈরি করতো। ইনকারা তামার সাথে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জও তৈরি করতো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্রাচীন মিশর ও ব্যবিলনে ব্রোঞ্জের প্রচলন ছিলো। ইনকারা ধাতু গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে সোনা, রূপা, তামা ও ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র ও গয়না তৈরি করতো। তারা ‘সিরে পার্তু’ বা ‘মোম লুপ্তি’ পদ্ধতিতে ছাঁচে ঢালাই করতো। প্রথমে মোম দিয়ে একটা গয়না বা মূর্তি তৈরি করা হতো। সেটাকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো। মাটিটা শুকিয়ে গেলে তাকে আগুনে গরম করা হতো। মাটিটা গরম হলে ভিতরের মোম গলে যেতো এবং একটা ফুটো দিয়ে মোমটা বেরিয়ে আসতো। তখন মাটির ভিতরটা ফাঁপা হয়ে গেল। এখন সোনা, রুপা বা তামা গলিয়ে ফুটো দিয়ে ঐ মাটির ভিতরে ঢুকিয়ে দিলে এ গলিত ধাতু আগেকার মোমের মূর্তি বা গয়নার আকৃতি পাবে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘মোম লুপ্তি’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতি মেক্সিকোর আজটেকরাও ব্যবহার করতো। এ পদ্ধতি প্রাচীন মিশরে প্রচলিত ছিলো। এ পদ্ধতিতে ধাতুর জিনিস ঢালাই করার পদ্ধতি আমেরিকা মহাদেশে স্বতন্ত্রভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিলো না কোনো ভাবে তারা এ বিদ্যা মিশর বা এশিয়া থেকে পেয়েছিলো সে বিষয়ে পণ্ডিতরা একমত হতে পারেন নি।
***
