Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ১ – সৌরভ চক্রবর্তী

মৃত কৈটভ ১.১

(১)

“জঙ্গলে বিষ আছে বাবু, এই জঙ্গলের খুব ভিতরে যেতে নেই।”

খাঁটো ধুতি পরা লোকটা বারবার বোঝাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু যাদের প্রাণে মুক্তিযুদ্ধের আগুনের পরশ জ্বলছে তারা এসব শুনবে কেন?

“কিছু হবে না। আমাদের পাশের দেশে যে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে তার থেকে কম কিছুই হবে এই জঙ্গলের বিষ। আমাদের যেতে দাও। আর শোনো আমরা যে এসেছিলাম তা কাউকে বলবে না। এই নাও বকশিস।”

একটা রূপোর বাটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে চারজনের দলটা জঙ্গলের পথে পা বাড়ালো। এই জঙ্গল ভারতের অন্তর্ভুক্ত।

সীমানা পেরিয়ে অনেকটা গেলে বাংলাদেশ। অন্তত একদিনের হাঁটা পথ তো বটেই।

উপজাতি অধ্যুষিত জায়গা বলে এদিকে গা ঢাকা দিলে ধরা পড়ার ভয়টা তুলনামূলকভাবে কম।

তাই এই জায়গার সন্ধান পেলে কিছু মুক্তিযোদ্ধা এদিকেই যাতায়াত করতে পারবে।

এপারের কিছু বাঙালি যুবকের মাথায় ওপারের জন্য মমত্ববোধ জেগে উঠেছে। উঠবে না-ই বা কেন!

এই কিছু বছর আগেও এক দেশ ছিল। ভাগাভাগির পর বাড়ির এক অংশ এপারে এক অংশ ওপারে হয়ে গেল।

তাতে নাড়ীর টান কমবে কেন? তাই সেরকম কিছু যুবক আজ চলেছে ওপারের পথে। এই পথের হদিশ মুক্তিযোদ্ধাদের দিতে চলেছে ওরা।

খবরটা ওপারে দিতে পারলে ধরা পড়ার ভয়টা কিছুদিনের জন্য অন্তত কেটে যাবে, কাজও এগোবে মসৃণ গতিতে। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা এখন অগ্নিগর্ভ।

উত্তর-পূর্ব ভারত তুলনামূলক শান্তই বলা চলে।

রূপোর বাটি হাতে নিয়েও উপজাতি লোকটা আর-একবার ভাঙা বাংলায় চেষ্টা করে, “আপনেরা না গেলেই ভালো করতেন?”

যুবকদের মধ্যে যে দলনায়ক সে এবার এগিয়ে আসে। লোকটার কাঁধে হাত রেখে বলে, “তুমি শুধু কাউকে বলবে না যে আমরা এদিকে এসেছিলাম। বাকি আমরা সামলে নেবো।”

চোখ তুলে একটা বাঁকা চাহুনি দেয় লোকটা, “কিন্তু বাবু, লোকে তো জানবেই।”

এবার উপস্থিত সবাই চোখে চোখে কথা বলে নেয়। লোকটা কি সবাইকে জানাবার মতলব করছে নাকি! রূপোর বাসন নেবার পরেও!

“কে জানাবে লোকেদের?”

দলনায়ক বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে। লোকটা এবার একটু দমে গেল।

তারপর রহস্য করে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল, “সে আপনারাই জানাবেন। দেবতার জঙ্গলে ঢুকছেন যখন দেবতাই দেখবে আপনাদের। শুধু সাবধানে থাকবেন। কারণ জঙ্গলে বিষ আছে। আমরা কেউ গ্রামের সীমানা থেকে জঙ্গলের এক কিলোমিটার ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকিনি কোনোদিন। আর যারাই গেছে তারা আর সুস্থ হয়ে ফেরেনি বা মরেই ফিরেছে।”

কথাগুলোর মধ্যে কোথাও পুলিশের নাম নেই শুনেই স্বস্তি পেল সকলে। দলনায়ক তরুণ এবং যুক্তিবাদী।

মুচকি হেসে উপজাতি লোকটার পিঠে হাত বুলিয়ে বাকি তিনজনকে নিয়ে জঙ্গলের পথে পা দিল। পূর্ণিমার রাত। চারদিকে আলো ঝলমল করছে।

উপজাতি লোকটা দেখল চারজন যুবক জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করছে। তাদের একজন সুন্দর শব্দ করে শিস দিচ্ছে।

হয়তো কোনো মনোহর গানের কলি গাইছে এভাবে! সবার পিঠেই বেশ বড় বড় চামড়ার ব্যাগ। সবাই ধুতি আর পায়জামা পরে আছে।

ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল ওরা। ওদের আর দেখতে পেল না উপজাতি লোকটা।

গ্রামে ফিরে গেল সে।

গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা মন্দির ছিল। এত রাতেও একটা বড় মোমবাতি জ্বলছে সেখানে। তবে একটা অস্থির হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

বেশিক্ষণ টিকে থাকবে না এই মোমবাতি। অচিরেই নিভে যাবে। ইতিমধ্যে কাঁপছে আলো। তাই মন্দিরের বিগ্রহের চেহারা আর দেখা যাচ্ছে না।

উপজাতি লোকটা রূপোর বাটিটা পাশে রেখে হাঁটু গেড়ে নমস্কার করল দেবতাকে।

প্রণাম সেরে উঠে আনমনে বলল, “অনেক চেষ্টা করেছিলাম। আটকাতে পারলাম না। ভোগ গ্রহণ করুন।”

আর তখুনি হাওয়ার বেগ বাড়ল। মোমবাতিটা এক ঝটকায় নিভে গেল। লোকটা তারপর কী করল আর দেখা গেল না।

মন্দিরের ভিতরে বট-অশ্বত্থ গাছের জ্যামিতিক অন্ধকারে চাঁদের ঝলমলে আলো এদিকটায় আর পৌঁছয় না।

জঙ্গলের ভিতরে হাঁটছে চার যুবক। মাথার উপরে পরিচ্ছন্ন মেঘ হাওয়ার দাপটে চাঁদের নীচে আসা যাওয়া করছে।

তাতে পথ চলার সামান্যও অসুবিধে হচ্ছে না। এদিকে সমান্তরাল উদ্ভিদশ্রেণীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাওয়ার দাপটও একটা সময় অব্দি সেরকম কোনো সমস্যা তৈরি করল না।

কিন্তু যত তারা ভিতরে প্রবেশ করল তত হাওয়ার দাপট বাড়তে থাকল। জঙ্গলের পাখিরাও আর নির্বিঘ্নে থাকল না। শুরু করল চেঁচামেচি।

“কী রে ঝড় আসবে নাকি অমল?”

দলনায়ক অমল হাঁটা না থামিয়ে বলল, “আসলে আসবে। ভিজবো বৃষ্টিতে।”

অন্যজন বলল, “সে না হয় ভিজলাম। কিন্তু জঙ্গল তো আর কিছুটা গেলেই ঘন হয়ে আসবে। চাঁদের আলো অব্দি পৌঁছাবে না সেখানে। তখন ঝড়ের মধ্যে পড়লে তো কিছু করা যাবে না।”

অমল বক্তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সাধারণ অবস্থায় বৃষ্টি বা ঝড় না এলে কী করতিস?”

“তাই তো পূর্ণিমা বাছাই করে বেরোলাম যাতে কিছু অন্তত দেখা যায়।”

অমল বক্তার এই উত্তরে কিঞ্চিৎ হেসে উঠল, তারপর বলল, “বীর বাহাদুরেরা শোনো, তোমাদের এত চিন্তার কিছু নেই। একটা টর্চ জোগাড় করেছিলাম। কেনার টাকা ছিল না আর কেউ এমনিতে দিতেও চাইছিল না। চক্রবর্তীদের বাড়ি থেকে চুরি করে নিয়েছি। আপাতত সেটা জঙ্গলে ঢুকলে জ্বালাবো।”

“অমলদা, এইটা তুমি আগে বলবে না?”

একজন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। বাকিরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। জোরে হাঁটতে হাঁটতে হাঁফ ধরে গেছিল সবার। সবাই দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে গেল।

অমল পকেট থেকে একটা আধ-খাওয়া বিড়ি বের করল। দেশলাই জ্বালাতেই জঙ্গলটা ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল।

সবাই সেই আলোয় জঙ্গলের চেহারা দেখে এই প্রথমবারের মতো ভয় পেল। দেশলাই কাঠিটাকে চারদিকে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল অমল।

কিন্তু সম্পূর্ণ জঙ্গল দেখার জন্য এটুকু আলো যথেষ্ট নয়। দলের মধ্যে একজন এবার বেশ শুকনো গলায় বলল, “অমলদা, টর্চটা জ্বালাও না।”

দেশলাই কাঠি ততক্ষণে নিভে গেছে। চাঁদের আলো পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু নিজের স্নিগ্ধ আলোতে চাঁদ যেন এই জঙ্গলের বীভৎসতা আড়াল করার চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে।

এই যুবকদের ভুলিয়ে জঙ্গলের ভিতরে ঢোকানোই যেন তার উদ্দেশ্য।

অমল তার ঠোঁটে সদ্য জ্বালানো বিড়িটায় টান দিল। আগুনের বলয় তেজিয়ান হল ঠোঁটের কাছে।

তারপর চামড়ার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল একটা টর্চ। সামনে তাক করে জ্বালাবার চেষ্টা করল।

কিন্তু টর্চ জ্বলে উঠল না। বারকয়েক টর্চের সামনে পেছনে থাপ্পড় মারল অমল। তাতেও কাজ হল না।

আর তখনই প্রথমবার শোনা গেল শব্দটা। তিনজন আগেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, শুধু অমল টর্চটাকে জ্বালাবার বৃথা চেষ্টা করছিল। সেও এবার কান খাড়া করে স্থির হয়ে গেল।

“এটা কীসের শব্দ অমলদা।”

চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট যে, সে প্রশ্নটা করল।

“শশশ…”

মুখে শব্দ না করার ইঙ্গিত করল অমল। মিনিট পাঁচেক কেটে গেল এভাবেই। আর কোনো শব্দ নেই।

সবাই নিজের অস্তিত্বটাকেও যথাসম্ভব চেপে জঙ্গলের ঘাসে শুয়ে পড়েছিল। পাঁচ মিনিট কেটে গেলে অমলই প্রথম উঠে দাঁড়ালো।

টর্চের বোতামটায় এবার চাপ দিতেই সেটা জ্বলে উঠল। এবার ধীরে ধীরে বাকিরাও উঠে দাঁড়াল।

ঘন জঙ্গল ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই। গ্রাম থেকে জঙ্গলের প্রথম কিলোমিটারের গণ্ডি শেষ হয়ে গেছে।

চাঁদের আলো আর এখানে পৌঁছাতে পারবে না। দেখে মনে হয় জঙ্গলের দেবতা চাঁদকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতিটুকু অব্দি দেননি। পিছনে ফিরে তাকালো অমল।

একটা অংশের পর আর চাঁদের আলো এগোতে পারেনি।

দলের একজন শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল, “অমলদা, আজ বরং আমরা ফিরে যাই।”

অমল বজ্রকঠিন গলায় বলল, “শুধু তুই কেন বাকিরা চাইলেও ফিরে যেতে পারিস। কিন্তু আমি আজ ফিরবো না। চারদিকে আমাদের বয়সী ছেলেরা কীভাবে রাইফেল বেয়োনেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে। আর আমি কিনা এই অন্ধকার জঙ্গলকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবো।”

অন্য একজন অমলকে বোঝাবার চেষ্টা করল, “অমল ওখানে বিপদটা কী হবে আমরা জানি। গুলি খাবো মরে যাবো। কিন্তু এখানে সামনে কী আছে তার কোনো ঠিক নেই। টর্চের আলো একবার জ্বলছে একবার জ্বলছে না। হঠাৎ নিভে গিয়ে আর আদৌ জ্বলবে কিনা তার কোনো ঠিক নেই। আমরা বরং দিনের বেলা চুপিচুপি ঢুকে পড়বো এই জঙ্গলে।”

অমল রেগে যায়, “কী আবোল তাবোল বলছিস। সামনে কী আছে তার ঠিক নেই এটার মানে কী? সামনে কি দত্যি দানো আছে নাকি? আর তাছাড়া দিনের বেলায়…”

কথাটা শেষ করতে পারে না অমল। সেই পুরোনো শব্দটা আবার হল, সজোরে হল। কোনো গর্জন নয়, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অথচ তীব্র হুঙ্কার।

“এ আবার কোন প্রাণী? কোন প্রাণী এভাবে ডাকে!”

একজন জিজ্ঞেস করল। কারো কাছে কোনো উত্তর ছিল না। অমলের কপালেও এবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।

“না না, অমলদা তুমি থাকতে হলে থাকো, এগোতে হলে এগোও। আমরাও বাংলাদেশকে সাহায্য করতে চাই। বেঁচে থাকলে সাহায্যটা করতেও পারবো। এভাবে বেঘোরে মারা যাবার অর্থ নেই। তুমি থাকলে থাকো, আমি চলে যাচ্ছি।”

অন্য একজনও এতে সায় দিল, “অমল, তুইও যাস না। ফিরে চল আমাদের সঙ্গে। কাল দুপুরের দিকে আবার আসবো আমরা। জেদ করিস না।”

অমলের পিঠে হাত রেখে বুঝিয়ে কথাগুলো বলল তার বন্ধু। কিন্তু অমলের মাথায় রোখ চেপেছিল।

সে ঝটকা মেরে সেই হাত নামিয়ে দিল, “ফিরে যা তোরা কাপুরুষের মতো। আমি একাই এগোচ্ছি।”

টর্চ হাতে অমল এগিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। বাকিরা দেখল একটা টর্চের আলো ধীরে ধীরে গহীন অরণ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।

বাকি তিনজন ফেরার পথ ধরল। বাকি পথটুকু সেই পাশবিক হুঙ্কারটা বারকয়েক তারা শুনতে পেল।

পা চালিয়ে যত দ্রুত সম্ভব জঙ্গলের পথ শেষ করল তারা।

জঙ্গল থেকে প্রায় যখন গ্রামে পৌঁছে গেছে ঠিক তখন শেষবারের মতো সেই হুঙ্কার শুনতে পেল তারা আর সেইসঙ্গে আরও একটা চিৎকার কানে এল তাদের।

অমল গগনভেদী এক চিৎকার করে সম্ভবত চিরকালের জন্য শান্ত হয়ে গেল। জঙ্গলের ভিতর থেকে আর কোনো শব্দ ভেসে এল না।

পরদিন বেলা বারোটায় আগের রাতের তিনজন দেখা করল। ত্রিপুরাতেও চারদিক থমথমে। বাংলাদেশের আঁচ প্রায় সরাসরি লেগেছে এই রাজ্যে।

একটা শুনশান মাঠের এক কোনায় তিনজন গাছের ছায়ার নীচে বসে আছে। “রাজেশ, আমাদের মনে হয় একবার ফিরে গিয়ে দেখা উচিত।”

রাজেশ মাথা নাড়ল। অমলের পর সেই এখন তেমাথা দলের নেতা। বলল, “সুখেন যাবি?”

সুখেন সবার ছোটো। সে উৎসাহ দেখাল, “অমলদার খবর নিতে যাওয়া দরকার। অভিকদাও যখন বলছে চলো সবাই মিলে যাই।”

রাজেশ মৃদু হেসে বলে, “সে যাওয়ারই যদি হতো তোরা সকালে সেটা ভাবলি না কেন! তাহলে আর ফিরে আসতাম না আমরা। ওখানে যেতেও লাগবে ঘণ্টা দু’য়েক সময়। বাসগুলো ওই জঙ্গলের দিকে এমনিতেই কম যায়। তার উপর এই যুদ্ধের সময়।”

অভিক বলল, “সকালে আমাদের কারো মাথা কাজ করছিল না সম্ভবত।

আচ্ছা, ওই হুঙ্কারটা কোন প্রাণীর? সেটা ভেবেছিস তোরা?”

এবার স্পষ্ট ভয়ে ছায়া নামল সবার মুখে। সুখেন বলল, “প্রাণী নাকি কে জানে! অমলদার ওই বুক ফাটানো চিৎকারটা আমি শেষ রাতে ঘুমের মধ্যেও যেন শুনতে পাচ্ছিলাম।”

থমথমে মুখ নিয়ে রাজেশ বলল, “আমরা ভাবতেই শিওরে উঠছি। অমলটা যদি সেই প্রাণীর সামনে পড়ে থাকে… নাহ আর ভাবতে পারছি না।”

অভিক বলল, নাহ, চলো যাই একবার। ওইরকম ভয়ানক জঙ্গল দিয়ে আসা যাওয়া করার প্রয়োজন নেই মুক্তি যোদ্ধাদের।

কিন্তু অমলকে খুঁজতে যেতেই হবে।”

সবাই এক বাক্যে সায় দিল। শুধু রাজেশ একবার বলল, “কীভাবে যে অমলটা এই জঙ্গলের হদিশ পেল কে জানে। ওই গ্রামে বাপের জন্মে কখনো যাইনি। গ্রামটাও বড্ড অদ্ভুত!”

আধঘণ্টার মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলগামী একটা বাসে উঠে পড়ল তিনজনে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিনটে বেজে গেল।

গ্রামটা মূলত একটা পাহাড়ি টিলার উপরে অবস্থিত। এখানকার লোকজন মূলত উপজাতি গোষ্ঠীর।

গ্রামে ঢোকার মুখে তারা দেখল জনাকয়েক যুবক চাষবাসের জন্য টিলার উপরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। বারকয়েক রাজেশদের দিকে ফিরে তাকাল তারা।

রাজেশরাও তাদের দিকে তাকাল। তারপর গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করল।

এই এলাকা এমনিতেই থমথমে থাকে। কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই থমথমে হয়ে আছে। খুব বড় এলাকা জুড়ে নয় এই গ্রাম।

কিন্তু মোটের উপর আশেপাশে যে আর কোনো গ্রামাঞ্চল নেই তা রাজেশ-সুখেনরা বাসে করে আসার পথেই বুঝে গেছে।

অমল থাকলে ভালো হতো। এই অঞ্চলটা সে আরও ভালো করে চিনতো। ওরা গ্রামের ভিতরে এগিয়ে গেল।

কিছু দূর হাঁটার পর একটা জটলা দেখা গেল। তিনজনে এগিয়ে গেল সেই জটলার দিকে।

জটলার কাছাকাছি গিয়ে যে দৃশ্য দেখল তাতে তারা চমকে উঠল। যে জায়গাটায় জটলা করা হয়েছে সেটা মূলত এই গ্রামের শ্মশান।

মৃতদেহ পোড়াবার জন্যই যে এই জায়গাটা ব্যবহার করা হয় তাতে সন্দেহ নেই। সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে দু’টো চিতা।

এই অঞ্চলের উপজাতিদের অনেকেই হিন্দু মতে শেষ কৃত্য সম্পন্ন করে। তাই চিতা দেখাটা বিশেষ কোনো ঘটনা নয়।

কিন্তু যারা চিতার কাছাকাছি রয়েছে, অর্থাৎ যারা ডোম তাদের পোশাক একদমই আলাদা। কালো রঙের প্লাস্টিকের পোশাক পরে আছে দু-জন ডোম।

মুখ চোখ অব্দি রুমাল দিয়ে ঢাকা। শুধু তাদেরই নয়, উপস্থিত সকলেরই মুখ ঢাকা রুমাল বা গামছা দিয়ে।

কোনো কোনো চাষী খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মুখ, নাক, চোখে রুমাল দেওয়া। এই দৃশ্য স্বভাবতই খুব অদ্ভুত।

একজন মহিলা অদূরে গাছের নীচে বসে কান্নাকাটি করছে। তাকে অন্যরা সান্ত্বনা দিচ্ছে। সম্ভবত ওর প্রিয়জন কেউ মারা গেছে।

ঠিক এই সময় রাজেশ কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করল।

এমনিতেই হতবাক হয়ে গিয়েছিল ওরা, এই স্পর্শে সে চমকে পিছন ফিরল। একজন গ্রামবাসী দাঁড়িয়ে আছে।

তিনটে গামছা ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নাক, মুখ ঢেকে নিন।”

সবাই গামছা দিয়ে নাক মুখ ঢেকে নিল ভালো করে। অভিক জিজ্ঞেস করল, “সবাই মুখ ঢেকে অন্ত্যেষ্টি দেখছে কেন?”

গ্রামবাসী এবার হাতের ইশারায় তাদের ডাকল। তারা তার পিছু পিছু রওনা দিল।

কিছু দূর একটা গাছ তলায় গিয়ে মুখ থেকে গামছা সরালো সেই গ্রামবাসী। এবার রাজেশ তাকে চিনতে পারল।

এই লোকটাই তো গতকাল তাদের সাহায্য করেছিল।

“না করেছিলাম বাবু, না করেছিলাম। জঙ্গলে যেতে বারণ করেছিলাম আপনাদের।”

কেউ কোনো কথা বলল না। লোকটা নিজের খুঁতির কোঁচা একটু তুলে ধীর স্থির ভাবে বলল, “এই যে দেখছেন দু’টো লাশ, এর জন্য দায়ী আপনারা। নেহাত আমি মুখে কুলুপ এঁটে আছি তাই কেউ জানবে না। তবে আপনাদের কাছে অনুরোধ, এই গ্রামের দিকে আর আসবেন না।”

রাজেশ আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু, আমরা তো ফিরে এসেছিলাম।”

লোকটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বলল, “তাতে কী? আপনার বন্ধু তো আর ফেরেনি।”

সুখেন বলল, “হ্যাঁ, অমলদার জন্যেই তো আজ আমরা আবার এলাম। ওকে নিয়ে ফিরবো।”

লোকটা এবার কোনো উত্তর দিল না।

অভিক জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী বলতে পারেন আমাদের বন্ধু কোথায়?”

লোকটা এবার খুব ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

রাজেশও সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় সে?”

এবার লোকটা আঙুল দিয়ে দেখাল। তিনজনেই তার আঙুলের দিক অনুসরণ করে আঁতকে উঠল। কী দেখাচ্ছে লোকটা!

চিতার দিকে আঙুল দেখাচ্ছে সে।

রাজেশ এবার এগিয়ে গেল, “কী আবোল তাবোল বলছেন! আমাদের বন্ধু কি চিতায় জ্বলছে নাকি!”

লোকটা এতটুকু উত্তেজিত হল না। শান্তভাবে বলল, “হ্যাঁ। আপনাদের বন্ধুই চিতায় জ্বলছে।”

রাজেশ, অভিক, সুখেনের অবস্থা আর তখন কহতব্য নয়। শোক নাকি রাগ, কীসের বহিঃপ্রকাশ হবে বোঝা যাচ্ছে না।

অভিক লোকটাকে মাটি থেকে টেনে দাঁড় করালো। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল অমলদার? আর

জঙ্গলে কাল কোন প্রাণীর হুঙ্কার শুনেছিলাম আমরা?”

লোকটা এবারেও শান্তভাবেই অভিকের বজ্র আঁটুনি থেকে নিজেকে মুক্ত করল। তারপর বলল, “বারণ করেছিলাম। বারবার বারণ করেছিলাম।”

কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না দেখে রাজেশ জিজ্ঞেস করল, “যদি কিছু হয়েও থাকে, লাশটা আমাদের হাতে তুলে দিলেন না কেন আপনারা?” এবারেও লোকটা হেঁয়ালি করল, “কারণ জঙ্গলে বিষ আছে। সে বিষ ছড়ালে কেউ বাঁচব না আমরা। তাই তো লাশ পোড়াতে গিয়েও ওরা প্লাস্টিকের পোশাক পরে নিয়েছে। আমরা নাক মুখ ঢেকে দূর থেকে দেখছি।”

কোনো প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া গেল না। শুধু লোকটা বলে চলেছে, “ফিরে যান আপনারা। আর কখনো ফিরবেন না আমাদের গ্রামে।”

সুখেন শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করল, “দু-টো চিতার অন্যটা কার? গাছতলায় সেই মহিলাই বা কে?”

লোকটা এবার আর শান্ত রইল না। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল তাদের দিকে। তারপর বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন না আপনারা। এই মুহূর্তে চলে যান নইলে আমি সবাইকে ডেকে আপনাদের পরিচয় এবং কাল রাতের ঘটনা জানাতে বাধ্য হব।”

কথাটা শেষ করেই গটগট করে বেরিয়ে গেল লোকটা। শ্মশানের ভিড়ে গিয়ে গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

রাজেশ অভিকদের চোখে জল। অমলকে শেষ দেখাও আর দেখতে পেল না তারা।

শুধু একরাশ দুঃখ, শোক আর এক অজানা রহস্য নিয়ে শহরের দিকে ফিরে এল ওরা।

আর কখনো ওরা সেই গ্রামের পথে পা বাড়ায়নি।

ওরা যখন শহরে ফেরার বাসে উঠছে তখন তাদের পিছনে এক ঝাঁক প্রশ্নের উত্তর নিয়ে দু-টো চিতা দাউ দাউ করে জ্বলছে।