Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ১ – সৌরভ চক্রবর্তী

মৃত কৈটভ ১.২

(২)

দিল্লি এয়ারপোর্টে বসে রামানুজ চারদিকে তাকাচ্ছে। সিকিউরিটিতে ঢোকা ইস্তক কেমন ঝিমুনি আসছিল। এক কাপ গরম কফি খাওয়ার পর সেটা অনেকটাই কেটেছে। ভোরবেলায় ফ্লাইট থাকলে এই ঝিমুনিটা আসে তার।

এখন এক কোণে একটা বিন ব্যাগে বসে আশেপাশের ব্যস্ততার দিকে তাকিয়ে আছে। এ দৃষ্টি শূন্য নয়। শুধু চারদিকের লোকজন কী করছে, কীভাবে করছে এইসব অভিজ্ঞ চোখের ক্যামেরায় বন্দি করে নিচ্ছে সে। কখন কী কাজে লেগে যায় কে জানে!

এবারের যাত্রাটা ক্যানসেল করে দেবে ভেবেছিল। কিন্তু ভবি ভোলার নয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের বিশেষ সুপারিশ এল যে রামানুজকেই যেতে হবে। সরেজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপযুক্ত মনে হলে তবেই অনুমতি দেওয়া হবে। প্রোজেক্টটা কলকাতায় হলে তবুও ঠিক ছিল। ঘরের ছেলের ঘরে ফেরা হয়ে যেত। কিন্তু ত্রিপুরায় প্রোজেক্ট শুনে রামানুজ প্রথমেই আপত্তি জানিয়েছিল। সে সরাসরি তার ঊর্ধ্বতনকে বলেছিল, “স্যর, আপনি অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিন। আমি ত্রিপুরায় কখনো যাইনি আর যাওয়ার ইচ্ছেটাও নেই। দিল্লিতে সবে স্যাটল করলাম। সামনে বিয়ে। আর এখন আপনি আমাকে আবার অন্য কোথাও পাঠাবার কথা বলছেন?”

ঊর্ধ্বতন রাজীব ত্রিবেদী হেসেছিলেন। বললেন, “তা বিয়েটা আরও আগে করলে না কেন? আর কলকাতার ছেলে একবার নর্থ ইস্টে যাবে না তা হয় নাকি।”

“কিন্তু আমি কেন স্যর? আরও তো অনেকে আছে?”

“সবাই সবকিছুর যোগ্য হয় না। তোমার মতো ক-জন ফরেস্ট অফিসার এত কম সময়ে জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে এসি লাগানো দশ তলা কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের অফিসে পা দুলিয়ে স্যালারি নিচ্ছে? তুমি পেরেছ কারণ তুমি যোগ্য। সারা জীবন জঙ্গলে পড়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু জঙ্গলের চাকরি তো, মাঝেসাঝে জঙ্গল আমাদের টানবেই। আমি পঞ্চাশ বছর বয়সেও একটা প্রোজেক্ট কমপ্লিট করে এসেছি। তোমার সবে পঁয়ত্রিশ। যাও যাও, ত্রিপুরায় সত্তর শতাংশ লোক বাংলায় কথা বলে। তোমার ভালো লাগবে রাজ্যটা। আর তাছাড়া, যে জঙ্গলটায় নিয়ে এত কথা, সেটাতে আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে দিয়ে ভরসা পাচ্ছি না।”

এবার ভ্রু কোঁচকায় রামানুজ। বলে, “জঙ্গল নিয়ে এত কথা মানে? কীসের জঙ্গল?”

ত্রিবেদী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বড় অফিস ঘরটায় পায়চারি করতে করতে বললেন, “খুব রহস্যঘন এই জঙ্গল। ওখানে একটা ট্রাইব থাকে। জঙ্গলের ভিতরে নয়, জঙ্গলের বাইরের একটা গ্রামে। অদ্ভুত গ্রাম। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মূল শহর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকতেই ওরা ভালোবাসে। জঙ্গলেও কাউকে ঢুকতে দেয় না। বিভিন্ন কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে সেই জঙ্গলে। দেখো, ত্রিপুরা হচ্ছে রবার চাষ প্রধান একটা রাজ্য। এখন এত বড় অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত একটা জঙ্গল যদি রাজ্য সরকার রবার চাষের জন্য পেয়ে যায় সেক্ষেত্রে ওদিকটায় আরও উন্নতি হবে। চাকরি সংস্থান হবে। কিন্তু এই পার্মিশান শুধু রাজ্য সরকার দিলেই তো হবে না, কেন্দ্রীয় মন্ত্রকেরও একটা ইনপুট এতে থাকবে। সেই ইনপুটটা তুমি আমাদের সরবরাহ করবে। সেই হিসেবে বাজেট করা হবে, লাইসেন্সিং হবে। কিন্তু তারও আগে দেখতে হবে সেই জঙ্গলে হাতি-ঘোড়া আছেটা কী যে কাউকে সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না ওরা। স্থানীয় অফিসারেরা সাহসও দেখায় না। যারা ভিতরে গেছে তাদের কোনোদিন খুঁজে অব্দি পাওয়া যায়নি। দেখো রামানুজ, আমি তোমাকে ভয় দেখাচ্ছি না। আমি তোমার কাজের পদ্ধতি জানি, তাই আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তোমাকেই এই কাজে নিয়োগ করতে চাই।”

ত্রিবেদী নিজের চেয়ারে বসলেন। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। তিনি জানেন রামানুজকে এই প্রোজেক্টে ইন্টারেস্ট নিতে বাধ্য করার মতো লেকচারটা তিনি দিয়ে ফেলেছেন। এবার রামানুজের উত্তর শুনতে তিনি উদগ্রীব। রামানুজ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে পেয়ালায় রাখা কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, “ঠিক আছে। ডিসেম্বরে ওদিকটাতেও খুব ঠান্ডা পড়ে শুনেছি। কিছু নতুন সোয়েটার কিনে আনি।”

স্যালুট করে রামানুজ বেরিয়ে গেল। ত্রিবেদী সাহেব হাসলেন। ওষুধ ধরেছে ভালোই।

এখন ত্রিপুরায় যাবার ফ্লাইটের অপেক্ষা করছে রামানুজ। দিল্লি থেকে কলকাতা, সেখান থেকে আধ ঘণ্টা পর আবার উড়ান। সরাসরি আগরতলা বিমানবন্দরে নামবে সে।

ফ্লাইটের ঘোষণা হতেই ফ্লাইটের দিকে পা বাড়ায় রামানুজ। সে এখনও জানে না যে কতটা রোমাঞ্চকর হতে চলেছে তার এই যাত্রা।

বেলা দু-টোর মধ্যে দুই বিমানবন্দরের সমস্ত কাজ সেরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পাঠানো গাড়িতে উঠে পড়ল রামানুজ। সরকারের তরফে মিঃ দাসকে নিযুক্ত করা হয়েছিল রামানুজের সমস্ত যত্ন-আত্তির জন্য। মিঃ দাসই বিমানবন্দরে তাকে নিতে এসেছিলেন। দাসের হাতে সুন্দর ফুলের তোড়া। ফোন নম্বর আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই ওরা একে অপরকে চিনতে পারল। দাসবাবু কান থেকে মোবাইল রেখে সসম্মানে এগিয়ে এলেন, “আসুন স্যর আসুন…”

রামানুজ হাসিমুখে ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে চশমা নামাল। চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এয়ারপোর্টটা দারুণ!” দাসবাবু ত্রিপুরার মানুষ। সগর্বে বললেন, “বছরখানেক হল এটা তৈরি হয়েছে। নর্থ ইস্টের বেস্ট এয়ারপোর্ট স্যর।” রামানুজ চারদিকের বাগান, বিমানবন্দরের ভিতরে বাঁশ বেতের অসাধারণ কারুকার্য দেখে মুগ্ধ। এতক্ষণের ধকল এই নয়নাভিরাম বাগান দেখলে পলকের মধ্যে কেটে যায়।

আরেকবার সেই দৃশ্য মোবাইলে বন্দি করে গাড়িতে উঠে বসল সে।

“কোথায় যাব এখন?”

“স্যর বাংলোতে।”

“ওই উপজাতি গ্রামটার কাছেই?”

“হ্যাঁ স্যর। গ্রাম থেকে গাড়িতে মিনিট দুয়েকের রাস্তা।”

“আর এখান থেকে যেতে কতক্ষণ লাগবে?”

“ঘণ্টাখানেক তো লাগবেই। দেড় ঘণ্টাও লাগতে পারে।”

“আপনি কি আমার সঙ্গেই থাকবেন?”

“স্যর আমি আপনার সঙ্গেই আছি। বাংলোর একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার। তবে মাঝে মাঝে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এলে আমি শহরে যাব। তাছাড়া আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী আমি।”

রামানুজ ত্রিপুরায় এসে বাংলায় কথা বলতে পেরে বেশ খুশি হয়েছে। দিল্লিতে গিয়ে বাংলায় কথা একপ্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছে তার। শুধু হাঞ্জি আর হাঞ্জি!

“এখানে কি সবাই আপনার মতো বাংলাতেই কথা বলে?”

“হ্যাঁ স্যর। তবে আপনার বাংলা আর আমাদের কথ্য ভাষার বাংলায় অনেকটা তফাত আছে। স্থানীয়রা আমরা এই বাংলাটাকে বলি খাস বাংলা, ঢাকার বাংলার সঙ্গে মিল রয়েছে এই ভাষার। তবে মূল পার্থক্য যেটা সেটা হল অ্যাক্সেন্টে। আমরা যখন কলকাতার বাংলা বলি একটা টান থেকে যায়। হ্যাঁ, যারা অ্যাক্সেন্টে খুব ভালো তাদের ক্ষেত্রে বোঝা যায় না ঠিকই, তবে এই আমার মতো যাদের অ্যাক্সেন্ট এখানকার তাদের শুদ্ধ বাংলায় খাস বাংলা টানটা আপনি ঠিক ধরে ফেলবেন।”

রামানুজ হাসল। বলল, “তা বটে। একটু কীরকমভাবে যেন বলছেন আপনি। তবু আমার ভালো লাগছে যে আপনারা এখানে বাংলায় কথা বলেন। হিন্দিতে কথা বলতে হবে না।”

দাসবাবুও এবার হাসলেন। হেসে বললেন, “ও স্যর হিন্দি এখন সব জায়গায় কারণে অকারণে বলে বাঙালিরা। কলকাতায় এবার গিয়েও তাই দেখলাম আর আমাদের ত্রিপুরাতেও এখন এই উপদ্রব শুরু হয়েছে।”

“উপদ্রব?”

দাসবাবু এবার একটু লজ্জাই পেলেন বোধহয়। রামানুজই আবার বলল, “আসলে বাঙালি তো, বাঙালিদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে ভালো লাগে। কোনো ভাষাই উপদ্রব নয়, তবে মাতৃভাষার প্রতি সহজাত টানটা তো থাকবেই।”

“তা তো ঠিকই স্যর।”

রামানুজ বাকি রাস্তায় কিছুক্ষণ গান শুনল। মাঝে একবার জিজ্ঞেস করল, “শুনেছি গ্রামটা অদ্ভুত, আপনার কী মত দাসবাবু?”

এই প্রথম রামানুজ লক্ষ্য করল হাসিখুশি দাসবাবুর মুখের রদবদল। একটা কালো ছায়া নেমে এল মুখের মধ্যে। বললেন, “গ্রাম, গ্রামের মানুষজন সবাই অদ্ভুত। মেরে কেটে হাজার লোকের বাস এই গ্রামে। মূল শহরের সঙ্গে তফাত মাত্র দেড় ঘণ্টা। অথচ আজকের দিনেও কেউ মূল শহরে এসে চাকরি বাকরি করে না। জুম চাষই মূল জীবিকা। উপজাতি সম্প্রদায় ভুক্ত ওরা। এই রাজ্যের বহু মানুষ উপজাতি। এটা আলাদা কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু ওই গ্রামের উপজাতিরা সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওদের রুচি সংস্কার সমস্তটাই অতীব তীব্র। এই ট্রাইবটা শুধু এই গ্রামেই রয়েছে, এর বাইরে আর কোথাও নেই। এত কুসংস্কারাচ্ছন্ন আর ভীতু গ্রামবাসী আমি জীবনেও দেখিনি।”

“ভীতু?”

“হ্যাঁ, জঙ্গলকে ওরা ভয় পায়। ভয় পায় ওদের দেবতাকে।”

“কে ওদের দেবতা?”

“জানা নেই। ওরা দেবতার মূর্তি দেখতে দেয় না।”

“কী? কী দেবতা তবে কী করে বুঝব! কত যে গোপন কুসংস্কার বয়ে

চলছে আদিবাসীরা!”

দাসবাবু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। ড্রাইভারকে দাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী অজিত, কী হল?”

“লোকজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।”

রামানুজ সঙ্গে সঙ্গে কথা থামিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। কথার মাঝে দাসবাবু লক্ষ্যই করেনি যে সেই গ্রামের কাছে এসে পড়েছে ওরা। দাসবাবু একবার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “আমরা প্রায় এসে গেছি স্যর। ওরা ওই অদ্ভুত গ্রামেরই বাসিন্দা। কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসার ওদের জঙ্গলের ভাগ্য নির্ধারণ করতে আসছে এটা ওরা জানে। তাই হয়তো…”

রামানুজ এসব ঘটনা আগেও দেখেছে। তার কাছে এসব নতুন কিছু না। সে গাড়ির লক খুলে ফেলল। তা দেখে দাসবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “আরে স্যর করছেন কী? ওরা ক্ষেপে আছে। আপনি গাড়ি থেকে বেরোবেন না।”

রামানুজ খুব শান্তভাবে তাকে হাত দেখিয়ে নিজে গাড়ির দরজাটা খুলে ফেলল। বাইরে বেরিয়ে এল সে।

শার্ট আর জিন্স পরা সরকারি ফরেস্ট অফিসারকে প্রথমবার দেখল এই গ্রামের অধিবাসীরা। তার জন্যই এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল তারা। তারা শুনেছে এই অফিসারের কলমের উপরেই নাকি নির্ভর করছে তাদের জঙ্গলের ভবিষ্যৎ। এত সহজে যে তারাও তাদের আরাধ্য অরণ্যদেবকে দিয়ে দেবে না, তা বোঝাতেই এই রাস্তা ঘেরাও।

রামানুজ গাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনে। বাধ্য হয়ে দাসবাবু আর ড্রাইভার অজিতও গাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। রামানুজ এগিয়ে যেতে একজন গ্রামবাসী এগিয়ে এল। মাথায় উপজাতি টুপি, তাতে ময়ূরের পালক গোঁজা রয়েছে। দেহ নিরাভরণ, কটিদেশে সাদা ধুতি। গলায় বিভিন্ন রঙিন পুঁতির মালা।

“ওয়েলকাম ওয়েলকাম।”

রামানুজের চোখ ছোটো হল এই অভ্যর্থনায়। কিন্তু প্রথা মাফিক সে হাত জোর করে নমস্কার করল। লোকটাই সম্ভবত এই গ্রামের মোড়ল। মুখে চোখে উপজাতিদের সহজাত সৌন্দর্যের বদলে তার বলিরেখায় বীভৎসতাই প্রকট।

“আপনারা কি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন?”

লোকটা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, “হ্যাঁ স্যর, আপনার জন্যই আমরা জমায়েত হয়েছি। আমরা দেখতে চাইছিলাম আমাদের জঙ্গল, জঙ্গলের দেবতা আর আমাদের ভবিষ্যৎ কার হাতে নির্ভর করছে।”

এবারে লোকটা কেটে কেটে কথাগুলো বলল। রামানুজ তার পিছনে ফুঁসে-ওঠা জনতার ভিড় দেখে নিল। তারপর বলল, “অকারণেই ব্যস্ত হচ্ছেন আপনারা। আমি সময় মতো নিজেই দর্শন দেব। রাস্তায় অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে ঘরে ঢুকে কথা বলে আসব। এখন রাস্তাটা ছাড়ুন।”

লোকটা রামানুজের এরকম ডাকাবুকো উত্তর আশা করেনি। সে ভেবেছিল রামানুজ ভয় পাবে ভিড় দেখে। সে এবার অন্য রাস্তা নিল। “আমাদের তো সরিয়ে দেবেন। দেবতাকে তো সরাতে পারবেন না। জঙ্গল নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখালে দেবতার ভোগে পরিণত হতে হয়।”

রামানুজ এবার গলা ছেড়ে হেসে উঠল, যেন লোকটা খুব হাসির কথা বলেছে। তারপর হাসতে হাসতেই গাড়ির দিকে ফিরে গেল। দাসবাবুকে বলল, “চাবিটা দিন তো। আপনারা পিছনে বসুন। আমি এগোই।”

দাসবাবু আমতা আমতা করছিলেন। রামানুজ এবার একটা ধমক দিল। “কই চাবি দিন।”

অজিতকে ইশারা করতে সে চাবিটা এগিয়ে দেয়। রামানুজ গাড়িতে উঠে বসে। দাসবাবু আর অজিত পিছনে উঠে পড়ে। রামানুজ গাড়ি স্টার্ট করে। শান্ত পাহাড়ী রাস্তায় ইঞ্জিনের বিকট শব্দ হয়। তারপর গাড়িটাকে ব্যাক গিয়ারে নিয়ে একটু পিছনে যায় সে। গ্রামের মোড়ল স্থানীয় লোকটা ভ্রু কুঁচকে সমস্ত দেখছিল। বাকি গ্রামবাসীদের মধ্যেও ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। ওরা নিজেরা রাস্তা প্রায় আগলে দাঁড়িয়ে আছে। খেলনা গাড়িও গলার রাস্তা নেই।

রামানুজ ইঞ্জিন চালু রেখেই গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উচ্চ কণ্ঠে চিৎকার করে। “অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশ ফোর্সকে খবর দিয়ে দিচ্ছি। যারা আমার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবেন তারা যদি কেউ চাপা পড়েন বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে অসুবিধা হবে না।”

কথাটা শেষ করে আর দেরি করল না সে। গাড়ি সোজা চালিয়ে দিল। গ্রামবাসীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মোড়ল একজন ফরেস্ট অফিসারের এহেন আচরণ আশা করেনি। গাড়ি এগিয়ে আসছে দ্রুত গতিতে। রাগে ক্ষোভে মোড়ল চোখ বন্ধ করে তড়িদগতিতে চোখ খুলল। নির্দেশ দিল, “রাস্তা ছেড়ে দাও।”

গ্রামবাসীদের কেউ কেউ রুখে দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু মোড়লের কথার উপর আর কথা চলে না। জায়গা ছেড়ে দিল ওরা। রামানুজের গাড়ি দ্রুতবেগে তাদের পেরিয়ে চলে গেল বাংলোর দিকে।

মোড়ল রাস্তার উপর থুতু ফেলে নিজের ক্ষোভ মেটালেন।

এদিকে দাসবাবুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রামানুজ কাচের মধ্যে এটা দেখে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কী দাসবাবু, এতেই ঘেমে নেয়ে গেলেন?”

দাসবাবু কষ্টে হাসলেন।

“এসেই যা খেল দেখালেন! না এবার আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে এই গ্রামবাসীদের খেল এবারেই খতম।”

“অতি আত্মবিশ্বাসী হবেন না। ওরা ঠিক ছোবল মারবে আমাকে। যাই হোক আর কতটুকু?”

“এই তো এসেই গেছি।”

দাসবাবুর দেখানো একটা ডানহাতের মোড়ে মিনিট খানেক এগিয়ে গাড়ি থামল।

ছিমছাম সরকারি বাংলো। গাড়ি ভিতরে ঢুকতেই দু-জন লোক এগিয়ে এল। একজন বাঙালি পুরুষ, পঞ্চাশের ওপারে বয়স। দাসবাবু বললেন, “ইনি হচ্ছেন রাধামাধব। দারুণ রান্না করেন।”

রামানুজের চোখ ছিল অন্য লোকটার উপর। লোক না বলে যুবক বলাই ভালো। দাসবাবু বললেন, “এ হচ্ছে কাঞ্চন। এই গ্রামের প্রথম অধিবাসী যে গ্রামের জুম চাষের বাইরে কিছু করার কথা ভেবেছে। এই বাংলোর কেয়ার টেকার সে।”

রামানুজ কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দাসবাবুর দিকে তাকাল। দাসবাবু কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেন বিষয়টা। “এই স্যরের লাগেজগুলো স্যরের রুমে দিয়ে আয়।” কাঞ্চনকে নির্দেশ দিয়ে রামানুজের কাছে এলেন তিনি। বললেন, “গ্রামবাসীদের মধ্যে থাকলেও ওদের মতো নয় সে। এখানের খবর ওখানে পাচার করবে না। বিশ্বস্ত ছেলে।”

রামানুজ তখনকার মতো সম্মতি দিল মাথা নেড়ে। তারপর একটা সিগরেট জ্বালিয়ে বাংলোর চারদিক ঘুরে দেখতে লাগল। পিছনে দাসবাবু সমস্ত কাজকর্ম সমাধা করতে লাগলেন।

রামানুজ দেখল বাংলোটা আসলে একটা উঁচু ঢিপি কেটে তৈরি করা হয়েছে। মূল রাস্তা থেকে তাই অনেকটা উঁচুতে রয়েছে এই বাংলো। যেখানে গ্রামবাসীরা পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল সেই জায়গাটাও এই উঁচু বাংলো থেকে কিছুটা দেখা যায়। গাছপালার ফাঁকে অবস্থানটা বোঝা যায়।

রামানুজ লক্ষ্য করল কিছু গ্রামবাসী তার বাংলোর আশেপাশে ধীর পায়ে এসে তার দিকে লক্ষ্য রাখছে।

“দাসবাবু, ও দাসবাবু।”

দাসবাবু উপর থেকে নেমে এলেন। “বলুন স্যর।”

“আমার যন্ত্রটা একটু দিন তো।”

দাসবাবু অদ্ভুতভাবে তাকালেন তার দিকে।

“কই দিন।”

দাসবাবু দৌড়ে বাংলোর উপর তলায় উঠে গেলেন। তারপর নিয়ে এলেন যন্ত্রটা। রামানুজ সেটা হাতে নিলো। রামানুজের সার্ভিস রিভলভার।

তারপর আকাশের দিকে উঁচু করে ফায়ার করল। গাছের ডালে যত পাখি ছিল সব ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে গেল।

আর দৌর লাগাল বাংলোয় চোখ-রাখা কতিপয় গ্রামবাসী।

“ওই দেখুন।”

দাসবাবুকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাল রামানুজ। আর সেই গুড়গুড়িয়ে গ্রামবাসীদের দৌড় দেখে তার কী হাসি। দাসবাবুও একসময় হেসে দিলেন।

“স্যর আপনি পারেন বটে। নিন এখন চলুন, লাঞ্চটা করে নিন। রাধামাধবের হাতের রান্না খেলে ভুলবেন না কোনোদিন।”

“চলুন চলুন।”

বাংলোর দিকে মুখ করে ফেরাতেই কাঞ্চনকে দেখতে পেল তারা। অদ্ভুত চোখে তাদের দেখছে সে।

মূলত কাঞ্চনের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে রামানুজের রিভলভারের দিকে।

দাসবাবু অস্বস্তি কাটাতে বললেন, “দাঁড়িয়ে আছিস কেন? খাবারের ব্যবস্থা কর জলদি। স্যর খাবেন এখন।”

সেদিনে আর কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটল না। হঠাৎ ঝুপ করে সন্ধে নেমে গেল।

সম্পূর্ণ পাহারি অঞ্চল কুয়াশার চাদরে ঢেকে এক সময় হারিয়ে গেল।