মৃত কৈটভ ১.৭
(৭)
আগের রাতেই ঠিক হয়েছিল আজ যেহেতু গ্রামে কোনো কাজ নেই এবং রবিবার পড়েছে তাই আজকে রামানুজকে উদয়পুরের মাতাবাড়ি দর্শন করাতে নিয়ে যাওয়া হবে। শীতের দিনে বিশেষত এই ডিসেম্বরের শেষ দিকটায় ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরে ভিড়টা বাড়তে থাকে। ত্রিপুরায় এই দিনে শীতের দিনে সদলবলে পিকনিকে বেরিয়ে যাবার একটা রেওয়াজ আছে। সিপাহিজলা অভয়ারণ্য থেকে শুরু করে নীরমহল, রুদ্রসাগর, বিভিন্ন ইকো টুরিজম পার্কগুলোতে গ্যাস সিলিন্ডার, শাকসবজি, মুরগি-পাঁঠা সমস্ত কিছু নিয়ে হাজির হয় পিকনিক পার্টিগুলো। সারা রাস্তা লাউড মাইকে গান বাজাতে বাজাতে ওরা এগিয়ে চলে। সে এক দেখার বিষয়। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে মোটামুটি সাজো সাজো রবে এসব পালন করা হতো। এখন উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তরা বাইরে ঘুরতে চলে যায়। নিম্ন মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র স্তরের মানুষেরা এখনও ত্রিপুরার এই ট্র্যাডিশান বয়ে নিয়ে চলেছে। হ্যাঁ, ব্যতিক্রম তো আছেই, কিন্তু সত্যি এটাই যে ত্রিপুরা ধীরে ধীরে কলকাতা হয়ে যাচ্ছে।
সকাল সকাল বড় এক্স ইউভি গাড়িতে সকলে রওনা দিলেন মাতাবাড়ির উদ্দেশে। রামানুজ বসল সামনে, অজিত চালাচ্ছিলেন গাড়ি। সিনহা, দাসবাবু বসলেন মাঝে। রাধামাধব আর কাঞ্চন শেষে।
সুন্দর একটা গান বাজছিল। কিন্তু রামানুজের আবার ইতিহাস জানার ক্ষিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। সে গানটা বন্ধ করে অজিতকে বলল, “অজিতদা, আজকে পৃথিবী বিখ্যাত ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরে যাচ্ছি। যেতে যেতে আগরতলার ইতিহাস কিছু শুনবো না, তা হয়?
অজিত দাঁত দিয়ে জিভ কাটল। বলল, “স্যর, গাড়ি চালাতে চালাতে
বলতে পারব না ইতিহাস। সিপাহীজলা পেরোলেই আঁকা বাঁকা রাস্তা শুরু হয়ে যাবে।”
সিনহা লুফে নিল কথাটা। বললেন, “একদম ঠিক কথা। গাড়ি আমি চালাচ্ছি। তুমি পিছনে এসে বসো আর গল্প শুরু করো। সেদিন তো একেবারে জমিয়ে দিয়েছিলে হে।”
অজিত কোনোমতেই বড়বাবুকে গাড়ি চালাতে দেবে না। এদিকে রামানুজসহ সকলেই আগরতলার ইতিহাস শুনতে চায়।
শেষে অজিত সংখ্যাধিক্যের চাপে পড়ে মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে স্টিয়ারিং ছেড়ে পিছনে এসে বসলেন। সিনহা গাড়ি চালাতে লাগলেন।
রামানুজ তাড়া দিল, “আর দেরি করো না। দু-ঘণ্টার রাস্তা এমনিই কেটে যাবে।”
অজিত শুরু করলেন, “আমার শহর আগরতলার বয়স বেশি নয়। আজ থেকে মাত্র ১৮৫ বছর আগে, ১৮৩৮ সালে এর গোড়াপত্তন করেন কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য। তখন পুরাতন আগরতলা এবং নতুন হাবেলি থেকে একযোগে রাজ কার্য চলতো। বীরচন্দ্র মাণিক্যের রাজত্বের শেষভাগে পুরাতন আগরতলা থেকে পাকাপাকিভাবে রাজধানী আগরতলায় স্থানান্তরিত হয়। মোগরা রোড যেটা বর্তমানে হরিগঙ্গা বসাক রোড নামে পরিচিত, আরও ভালোভাবে বললে যেটার উপর দিয়ে আমরা এখন যাব সেটা ছাড়া বড় রাস্তা তেমন ছিল না তখন। তাও এই রাস্তাটা ছিল কাঁচা রাস্তা। বীরচন্দ্রের সময়েই ১৮৭১ সালে আগরতলা পুরসভার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৫৭ সালে স্থাপিত হয় প্রথম ডাকঘর। ১৮৮৯ সালে রদ হয় সতীদাহ প্রথা। তার আগে ১৮৭৮ সালে বন্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথা।
রাধাকিশোর মাণিক্যের সময় থেকেই মূলত রাস্তাঘাট, পয়ঃপ্রণালী, স্কুলবাড়ি, হাসপাতালসহ একটা পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো গড়ে উঠতে থাকে। তাঁর সময়েই রবীন্দ্রনাথ প্রথম আগরতলায় আসেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুসহ বহু প্রতিভাকে তিনি আর্থিকভাবে সাহায্য প্রদান করেন। সে সময়ই
তৈরি হয়েছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হাসপাতাল যা এইমাত্র আমরা পেরিয়ে এলাম। যদিও বাড়িটি তৈরি হয়েছিল প্রশাসনিক কাজের জন্য।
কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ার স্মৃতিসৌধ নির্মাণে দেশিয় রাজ্য ত্রিপুরার কাছে অর্থ সাহায্য দাবি করা হয়। সেই অর্থ না পাঠিয়ে অফিস বাড়িটি ভিক্টোরিয়ার নামে হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয় ১৯০৪ সালে।
এই যে উমাকান্ত অ্যাকাডেমি দেখছেন, আমি এই বিদ্যালয়ের ছাত্র। মাঝে এর নাম ছিল আগরতলা হাই স্কুল। একদম শুরুতে এর নাম ছিল নতুন হাবেলি বঙ্গ বিদ্যালয়। মহারানি তুলসীবতি বিদ্যালয়ের ছিল আগরতলা বালিকা বিদ্যালয় এবং বিজয়কুমার বিদ্যালয়ের নাম ছিল কৃষ্ণনগর পাঠশালা।
সেই সময়েই রাস্তার পাশে বাঁশের ডগায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সময় কেরোসিনের হ্যারিকেনের বদলে গ্যাসের আলোর ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৪৫ সালে বীরবিক্রমের সময় ‘আগরতলা ইলেকট্রিক্সাপ্লাই কোম্পানি’ শহরে জেনারেটরের সাহায্যে শহরে আলোর ব্যবস্থা করে।
বীরেন্দ্রকিশোরের সময় সর্বোচ্চ আপিল আদালত গঠিত হয়। খনিজ অনুসন্ধানে বার্মা অয়েল কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এই সময়েই গড়ে উঠে চল্লিশটির মতো চা-বাগান। হাওড়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ১৯১৮ সালে প্রথম বটতলায় হাওড়ার উপর লোহার সেতু কারমাইকেল ব্রিজ দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয় আগরতলা-বিশালগড় সড়ককে।
তখন লোকসংখ্যা ছিল মাত্র সাত হাজার।
ত্রিপুরার শেষ রাজা বীরবিক্রমের সময়েই রাজ্যে একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার লক্ষ্যে কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জীবদ্দশায় তিনি তা দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার নামাঙ্কিত এম বি বি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাঙ্গণ।
তিনি দ্বিতীয়বার ইউরোপ ঘুরে এসে রাজপথ সোজা এবং প্রশস্ত করার কাজে হাত দেন। তখনই তৈরি হয় আগরতলার বিখ্যাত থামওয়ালা বারান্দা ফুটপাথ। একইসঙ্গে তৈরি করেছিলেন গোলবাজার, যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
বর্তমানে সেটি বিশাল এক বাজার এলাকা।
এক্ষেত্রে বলা যায়, উত্তর গেট থেকে রাজবাড়ির দিকে আসতে রাস্তার দু-ধারে এখনও থামওয়ালা বারান্দা দেখা যায়। এখানেই থাকত রাজাদের ঘোড়া। ঘোড়ার ঘাস খাওয়ার জন্য ছিল গেটের পিছনে ময়দান যা আগরতলায় আস্তাবল ময়দান নামে পরিচিত। এই কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীও সেখানেই এসে ভাষণ দিয়ে গেছেন। বর্তমানে নাম স্বামী বিবেকানন্দ ময়দান।
আমার বাড়ি যেখানে, আগরতলার অন্যতম বাসিন্দা এলাকা রামনগর, সেটা একসময় ছিল ধানক্ষেত। বীরবিক্রমের সময় সমান্তরালভাবে এখানে রাস্তা নির্মাণ করে বসতি গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৫৪ সালে এখানে এক থেকে নয় নম্বর রাস্তা নির্মিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়ে উঠে আগরতলা বিমানবন্দর। সেই সিঙ্গারবিল বিমানবন্দর থেকে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত হল মাত্র দু-বছর আগে।
উত্তর পূর্ব ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সুন্দর বিমানবন্দর বর্তমানে আগরতলায় অবস্থিত। ঝাঁ চকচকে বিমানবন্দরে উৎকৃষ্ট মানের বাঁশ বেতের কাজ দেখার মতো।
রাধাকিশোরের সময় আগরতলাকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে আখাউড়া খাল, কালাপানিয়া খাল কাটা হয়। সঙ্গে তৈরি হয় আখাউড়া রাস্তাসহ অন্যান্য রাস্তা। এই আখাউড়া খাল দিয়েই ছিপ নৌকা আগরতলায় আসত বর্তমান বাংলাদেশ থেকে। ১৯২৪ সালে আখাউড়া রাস্তা ইটের মোরামে মুড়ে দেওয়া হয়।
রাধাকিশোরের সময়েই সেন্ট্রাল রোড, মোগরা রোড ইটের মোরামে আচ্ছাদিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথম আখাউড়া সড়কে পিচ ঢালাই হয়। ১৯৩৭-৩৮ সালে ফায়ার সার্ভিস চৌমুহনী থেকে কারমাইকেল সেতু পর্যন্ত রোনাল্ডসে রোড ইটের মোরামে মুড়ে দেওয়া হয়।
এই কারমাইকেল সেতুর জায়গাতেই বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় হাওড়া সেতু বা সুভাষ সেতু। এই হল আমার শহর আগরতলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।”
এইটুকু বলে অজিত থামলেন। ততক্ষণে বিশ্রামগঞ্জ পেরিয়ে গেছে গাড়ি। বাকি রাস্তাটা পথ ঘাট পাহারি আঁকা বাঁকা দেখতে দেখতে কেটে গেল।
উদয়পুরে মাতাবাড়িতে গাড়ি এসে থামল। গাড়ি পার্ক করার সুব্যবস্থা আছে এই মন্দিরে।
গাড়ি পার্ক করে সকলে চলে এল উত্তম পেড়া ভাণ্ডারে। দাসবাবুর পরিচিত দোকান। এখানে আসার আগেই সমস্ত কিছু বলে রাখা ছিল।
ঢুকতেই উত্তমবাবু সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, “আপনারা হাত মুখ ধুয়ে জুতো জোড়া এখানে রেখে মন্দিরে চলে যান। আরেকটু পর মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে। তার আগে মায়ের দর্শন করে নিন। আপনাদের ভোগের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।”
রামানুজেরা কেউ আর সময় নষ্ট করল না। মাতাবাড়ির পেড়া জগত বিখ্যাত। উত্তমবাবুর দোকানও পুরোনো। সেই সাবেকি ব্যপারটা লক্ষ করা যাচ্ছে।
এই দোকানের পেড়াসহ অন্যান্য পূজাসামগ্রী নিয়ে সকলে ছুটল মন্দিরে। কল্যাণ সাগর থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে সোজা বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। গরমের দিনে খালি পায়ে পা রাখা দায় হয়। শীতের দিনে সে সমস্যা নেই। আজকেও প্রচুর মানুষের ভিড় মন্দিরে।
সকলে সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছল মন্দির প্রাঙ্গণে। টকটকে মিষ্টি লাল রঙের মন্দির। বিশাল জায়গা জুড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ। অন্তত তিন বিঘা তো হবেই। তার বাইরেও রয়েছে জায়গা যেখানে সংস্কার চলছে। মায়ের সামনে পৌঁছাতে লাইন ধরতে হল।
লাইন ঘুরে মিনিট পনেরোর মধ্যেই মায়ের একদম সামনে পৌঁছল রামানুজ। পুরোহিতকে ভোগের মালসাটা এগিয়ে দিয়ে প্রণাম করল। মায়ের মুখ দর্শন করল। সুন্দর লাল শাড়িতে সজ্জিতা ত্রিপুরাসুন্দরী মা। একইসঙ্গে প্রায় একইরকম দেখতে মায়ের দুই রূপ বর্তমান।
পাঁচ ফুট লম্বা কালো পাথরের বিগ্রহটি ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর, ঠিক নীচে দুই ফুট লম্বা চণ্ডী মূর্তি। চণ্ডী মূর্তিটিকে সকলে ভক্তি ভরে ডাকে ছোট মা। কথিত আছে, এটা শক্তি পীঠের অন্যতম। এখানেই দেবী পার্বতীর ডান পা পড়েছিল।
সম্পূর্ণ মন্দিরটিকে কল্পনা করা হয়েছে একটা কচ্ছপের পিঠে অবস্থিত। সেই হিসেবে এই পীঠস্থানকে কূর্মপীঠও বলা হয়। কূর্ম অর্থাৎ কচ্ছপ।
কল্যাণ সাগরের জলে প্রচুর মাছের সঙ্গে বয়ষ্ক কিছু কচ্ছপেরও দেখা পাওয়া যায়।
দেবীকে প্রণাম করে রামানুজরা চলে গেল মন্দির প্রাঙ্গণের শেষভাগে। সেখানে শিবমন্দির রয়েছে। সেখানেও প্রণাম করে, চরণামৃত নিয়ে সকলে সিঁড়ি বেয়ে নামল কল্যাণ সাগরের কাছে। নামে সাগর হলেও আদতে বিশাল বড় পুকুর।
পুকুরের পাড় বাঁধানো। সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে দর্শনার্থীরা বসে আছে। কল্যাণ সাগরের মূল আকর্ষণ হল মাছ আর কচ্ছপ। বহু মানুষ মাছকে খাবার দেবার জন্য বিস্কুট, মুড়ি ইত্যাদি নিয়ে ঘুরছে। মাছগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা।
রামানুজ কিছু মুড়ি কিনে এগিয়ে গেল। একদম নীচের সিঁড়তে পৌঁছে দেখল সিনহা আর দাসবাবুও চলে এসেছেন।
দাসবাবু বললেন, “মাছগুলোকে দেখুন। কী সুন্দর মুড়ি আর বিস্কুট খাচ্ছে।”
সিনহা মজা করে বললেন, “ওদের খেতে দেখে আমারও খিদে পেয়ে গেল। চলুন এখানে ভালো পরোটা সবজির পাওয়া যায়। গিয়ে খেয়ে আসি।”
রামানুজ বলল, “আরে আগে কচ্ছপের দেখা মিলুক।”
কাঞ্চন কখন এসে যোগ দিয়েছে বোঝা গেল না। বলল, “আরে দাদা, কচ্ছপের দেখা পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার। ওরা এত কাছে এখন আর আসে না। আমরা ছোট থাকতে অনেক কচ্ছপ ছিল। তখন দেখা যেত। আর তাছাড়া তুমি জানো, যেদিন এই কচ্ছপগুলো মারা যায় সেদিন ও সিঁড়ি বেয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়।”
কাঞ্চনের এই কথায় রামানুজ বিস্মিত হল। বলল, “কী!! সত্যি! দাসবাবু আর সিনহা একত্রে মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, “একশো শতাংশ খাঁটি সত্যি।”
কাঞ্চনও সঙ্গে সম্মতিতে মাথা নাড়ল। রামানুজের মুখ হা হয়ে গেল। পদ্মনাভ মন্দিরে ববিতা কুমিরের কথা সে শুনেছিল। কুমিরটা নাকি নিরামিষভোজী ছিল। প্রসাদ খেয়ে দিন কাটাতো। পুকুরের মাছ খেত না। থাকতো মন্দির সংলগ্ন পুকুরে।
সম্প্রতি পঁচাত্তর বছর পূর্ণ করে মারা গেছে সেই কুমির। সনাতন মতে দাহ করা হয়েছে ববিতা কুমিরের। এখানে ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরেও যে এই প্রথা বহু যুগ আগে থেকে চলে আসছে রামানুজ জানতোই না।
আর এসব যখন সে ভাবছে তখনই কাঞ্চন লাফিয়ে উঠল, “দাদা, ওই তো কচ্ছপ। ওই দেখুন। তাড়াতাড়ি দেখুন।”
এত জোরে লাফিয়ে উঠল কাঞ্চন যে বাকিরাও লাফিয়ে উঠল ওর চিৎকার শুনে। কাঞ্চনের আঙুল বরাবর তাকাতেই দেখা গেল কুর্মদেবকে। তিনি এগিয়ে আসছেন এদিকেই।
ধীরে ধীরে নিজের ভারী শরীর নিয়ে কচ্ছপটি এগিয়ে এল পুকুরের পাড়ে। সকল দর্শনার্থী প্রায় হুমড়িই খেয়ে পড়বার জোগাড়। রামানুজদের ভাগ্য ভালো তিনি একেবারে তাদের সামনে এসেই মাথা তুলে তাকালেন। জলের বাইরে মাথা আসতেই অনেকগুলো হাত এগিয়ে এল। কচ্ছপের মাথায় ছুয়ে সকলে। প্রণাম করলেন। উদয়পুর মাতাবাড়ির চেনা দৃশ্য। রামানুজও দেখাদেখি তাই করল। দলের বাকিরাও তাই।
সবার মন আনন্দে ভরে উঠল।
আর ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝে সকলে তাঁকে দেখতে পেল। তিনি সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে সকলের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলেন। সবচেয়ে বেশি অবাক হল কাঞ্চন। তার বাবা, গ্রাম প্রধান হেমন্তাই দাঁড়িয়ে আছেন কল্যাণ সাগরের সিঁড়ির উপর।
কল্যাণ সাগরের সিঁড়ির এক কোণে বসে সকলে। রামানুজ হাঁটাহাঁটি করছে নীচের একটা সিঁড়িতে।
রাধামাধব আর কাঞ্চন সকলের জন্য গরম পরোটা আর চা এনে দিয়েছে পাশের একটা মিষ্টির দোকান থেকে।
হেমন্তাই চুপ করে বসে আছেন সকলের মাঝখানে। হেমন্তাই-ই সবার আগে বললেন, “আপনারা বিশ্বাস করুন, আজ গ্রামের প্রধান আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। আজ এক পিতা এসেছে নিজের সন্তানের টানে। আমি বারকয়েক আপনাদের বাংলোর আশেপাশেও ঘোরাঘুরি করেছি রাতের দিকে। কিন্তু প্রহরী থাকায় ভিতরে ঢোকার সাহস আমার হয়নি।”
সিনহা চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলেন, “ঠিক আছে। চা খেতে খেতে বলুন।”
কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিলেন হেমন্তাই। তারপর বললেন, “দেখুন কীরকম নিজেকে কম্বলে মুড়ে এসেছি। গ্রামের কেউ যেন জানতে না পারে আমার এই আসার ব্যাপারে। ওদের বলে এসেছি সাধনার জন্য গুপ্তস্থানে
যাচ্ছি। নইলে ওরা কেউ আর আমাকে বিশ্বাস করবে না। আমাকে আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন।
আমার ছেলেটাকে আমি নিজে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছি। কিন্তু ওর গায়ে কাউকেই হাত দিতে দিইনি। সেদিন আমার ছাওয়ালটা যে কেন আবার গ্রামে ফিরে এসেছিল।”
বলেই চোখের কোণাটা মুছলেন এক পিতা। কাঞ্চন পাশেই দাঁড়িয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল না তার ঠিক কি করা উচিৎ।
হেমন্তাই মিনিটখানেক পরে আবার বললেন, “আপনারা পরশু গ্রামে যাবেন। সেদিন হেমন্তাই হিসেবেই আপনাদের স্বাগত জানাব আমি। কিন্তু আমার ধারণা হয়েছে গ্রামবাসী আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলতে পারে। তাই আজ এক পিতা হিসেবে আপনাদের কিছু কাহিনি বলব। বিশ্বাস অবিশ্বাস আপনাদের হাতে। কিন্তু আমি যা বলব তা খাঁটি সত্য কথা।”
রামানুজ এবার হাঁটা থামিয়ে হেমন্তাইয়ের সোজাসুজি এসে বসল। কথা না বাড়িয়ে সোজা বলল, “বেশ। সোজা কাহিনিটা আমাদের বলুন। আর সময় নষ্ট করা যাবে না।”
রামানুজকে এভাবে মুখোমুখি বসতে দেখে হেমন্তাই কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও সামলে নিলেন। শুরু করলেন তার কাহিনি-
“এই গ্রামে কী আছে বা কী নেই তা জানার আগে জানতে হবে অন্য এক কাহিনি। আশাকরি আপনারা সকলেই বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার, নরসিংহ অবতারের কাহিনি জানেন। তবুও আমি আপনাদের কাহিনিটা একবার রোমন্থন করাচ্ছি। নরসিংহ অবতারের উল্লেখ একাধিক পুরাণে পাওয়া যায়। নরসিংহ অবতারের বর্ণনা রয়েছে ভাগবত পুরাণ (সপ্তম স্কন্দ), অগ্নিপুরাণ (৪।২-৩), ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ (২।৫।৩-২৯), বায়ুপুরাণ (৬৭। ৬১-৬৬), হরিবংশ (৪১ এবং ৩।৪১-৪৭), ব্রহ্মাপুরাণ (২১৩।৪৪-৭৯), বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ (১।৫৪), কূর্মপুরাণ (১।১৫।১৮-৭২), মৎস্যপুরাণ (১৬১-১৬৩), পদ্মাপুরাণ (উত্তরখণ্ড, ৫।৪২), শিবপুরাণ (২।৪। ৪৩ ও ৩।১০-১২), লিঙ্গপুরাণ (১।৯৫-৯৬), স্কন্দপুরাণ ৭ (২।১৮।৬০-১৩০) ও বিষ্ণুপুরাণ (১।১৬-২০) গ্রন্থে। মহাভারত-এও (৩।২৭২।৫৬-৬০) নৃসিংহ অবতারের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া একটি প্রাচীন বৈষ্ণব তাপনী উপনিষদ (নরসিংহ তাপনী উপনিষদ) তার নামে উল্লিখিত হয়েছে।
এর মধ্যে ভাগবত পুরাণে বর্ণিত ঘটনাটাই জগত বিখ্যাত। সেখানে বর্ণিত আছে যে, নৃসিংহের পূর্ববর্তী অবতার বরাহ হিরণ্যাক্ষ নামে এক রাক্ষসকে বধ করেন। হিরণ্যাক্ষের ভাই হিরণ্যকশিপু এই কারণে প্রবল বিষ্ণুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। দাদার হত্যার প্রতিশোধ মানসে তিনি বিষ্ণুকে হত্যা করার পথ খুঁজতে থাকেন।
তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এই জাতীয় প্রবল ক্ষমতা প্রদানে সক্ষম। তিনি বহু বছর ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করেন। ব্রহ্মাও হিরণ্যকশিপুর তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। তিনি হিরণ্যকশিপুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাকে বর দিতে চান।
হিরণ্যকশিপু বলেন: হে প্রভু, হে শ্রেষ্ঠ বরদাতা, আপনি যদি আমাকে সত্যই বর দিতে চান, তবে এমন বর দিন যে বরে আপনার সৃষ্ট কোনো জীবের হস্তে আমার মৃত্যু ঘটবে না।
আমাকে এমন বর দিন যে বরে আমার বাসস্থানের অন্দরে বা বাহিরে আমার মৃত্যু ঘটবে না;
দিবসে বা রাত্রিতে, ভূমিতে বা আকাশে আমার মৃত্যু হবে না।
আমাকে এমন বর দিন যে বরে শস্ত্রাঘাতে, মনুষ্য বা পশুর হাতে আমার মৃত্যু হবে না।
আমাকে এমন বর দিন যে বরে কোনো জীবিত বা মৃত সত্তার হাতে আমার মৃত্যু হবে না;
কোনো উপদেবতা, দৈত্য বা পাতালের মহানাগ আমাকে হত্যা করতে পারবে না; যুদ্ধক্ষেত্রে আপনাকে কেউই হত্যা করতে পারে না;
তাই আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমাকেও বর দিন যাতে আমারও কোনো প্রতিযোগী না থাকে।
এমন বর দিন যাতে সকল জীবসত্তা ও প্রভুত্বকারী দেবতার উপর আমার একাধিপত্য স্থাপিত হয় এবং আমাকে সেই পদমর্যাদার উপযুক্ত সকল গৌরব প্রদান করুন। এছাড়া আমাকে
তপস্যা ও যোগসাধনার প্রাপ্তব্য সকল সিদ্ধিই প্রদান করুন, যা কোনোদিনও আমাকে ত্যাগ করবে না।
হিরণ্যকশিপু যখন মন্দার পর্বতে তপস্যা করছিলেন, তখন ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবগণ তার প্রাসাদ আক্রমণ করেন। দেবর্ষি নারদ হিরণ্যকশিপুর স্ত্রী কায়াদুকে রক্ষা করেন। দেবর্ষি দেবগণের নিকট কায়াদুকে ‘পাপহীনা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
নারদ কায়াদুকে নিজ আশ্রমে নিয়ে যান। সেখানে কায়াদু প্রহ্লাদ নামে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। নারদ প্রহ্লাদকে শিক্ষিত করে তোলেন। নারদের প্রভাবে প্রহ্লাদ হয়ে ওঠেন পরম বিষ্ণুভক্ত। এতে তার পিতা হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।
ক্রমে প্রহ্লাদের বিষ্ণুভক্তিতে হিরণ্যকশিপু এতটাই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হন যে তিনি নিজ পুত্রকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যতবারই তিনি বালক প্রহ্লাদকে বধ করতে যান, ততবারই বিষ্ণুর মায়াবলে প্রহ্লাদের প্রাণ রক্ষা পায়।
হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে বলেন তাকে ত্রিভুবনের অধিপতি রূপে স্বীকার করে নিতে। প্রহ্লাদ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন একমাত্র বিষ্ণুই এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ প্রভু। ক্রুদ্ধ হিরণ্যকশিপু তখন একটি স্তম্ভ দেখিয়ে প্রহ্লাদকে জিজ্ঞাসা করেন যে ‘তার বিষ্ণু’ সেখানেও আছেন কিনা: ‘ওরে হতভাগা প্রহ্লাদ, তুই সব সময়ই আমার থেকেও মহৎ এক পরম সত্তার কথা বলিস। এমন এক সত্তা যা সর্বত্র অধিষ্ঠিত, যা সকলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং যা সর্বত্রব্যাপী। কিন্তু সে কোথায়? সে যদি সর্বত্র থাকে তবে আমার সম্মুখের এই স্তম্ভটিতে কেন নেই?’
প্রহ্লাদ উত্তর দিলেন, তিনি ‘এই স্তম্ভে’ ছিলেন, আছেন ও থাকবেন।
উপাখ্যানের অন্য একটি পাঠান্তর অনুযায়ী, প্রহ্লাদ বলেছিলেন, তিনি এই স্তম্ভে আছেন, এমনকি ক্ষুদ্রতম যষ্টিটিতেও আছেন।
হিরণ্যকশিপু ক্রোধ সংবরণ করতে না-পেরে গদার আঘাতে স্তম্ভটি ভেঙে ফেলেন। তখনই সেই ভগ্ন স্তম্ভ থেকে প্রহ্লাদের সাহায্যার্থে নৃসিংহের মূর্তিতে আবির্ভূত হন বিষ্ণু।
ব্রহ্মার বর যাতে বিফল না হয়, অথচ হিরণ্যকশিপুকেও হত্যা করা যায়, সেই কারণেই বিষ্ণু নরসিংহের বেশ ধারণ করেন: হিরণ্যকশিপু দেবতা, মানব বা পশুর মধ্য নন, তাই নৃসিংহ পরিপূর্ণ দেবতা, মানব বা পশু নন;
হিরণ্যকশিপুকে দিবসে বা রাত্রিতে বধ করা যাবে না, তাই নৃসিংহ দিন ও রাত্রির সন্ধিস্থল গোধূলি সময়ে তাকে বধ করেন;
হিরণ্যকশিপু ভূমিতে বা আকাশে কোনো শস্ত্রাঘাতে বধ্য নন, তাই নৃসিংহ তাকে নিজ জঙ্ঘার উপর স্থাপন করে নখরাঘাতে হত্যা করেন;
হিরণ্যকশিপু নিজ গৃহ বা গৃহের বাইরে বধ্য ছিলেন না, তাই নৃসিংহ তাকে বধ করেন তারই গৃহদ্বারে।
ভাগবত পুরাণ-এ আরও বলা হয়েছে: হিরণ্যকশিপুকে বধ করার পর সকল দেবতাই নৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণে ব্যর্থ হন। বিফল হন স্বয়ং শিবও।
সকল দেবগণ তখন তার পত্নী লক্ষ্মীকে ডাকেন; কিন্তু লক্ষ্মীও স্বামীর ক্রোধ নিবারণে অক্ষম হন। তখন ব্রহ্মার অনুরোধে প্রহ্লাদ এগিয়ে আসেন।
ভক্ত প্রহ্লাদের স্তবগানে অবশেষে নৃসিংহদেব শান্ত হন। নৃসিংহদেব প্রহ্লাদকে কোলে লইয়া গা চাটিতে লাগিলেন।
প্রত্যাবর্তনের পূর্বে নৃসিংহদেব প্রহ্লাদকে রাজা করে দেন।
এতটুকু অব্দি কাহিনি আমাদের প্রায় সকলে জানি। এখানেই ভাগবত পুরাণে নৃসিংহদেবের ইতি। কিন্তু শিব পুরাণ শুরু ঠিক এখান থেকেই।
শিবপুরাণে নৃসিংহ উপাখ্যানের একটি শৈব পাঠান্তর বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথাগত কাহিনিটির থেকে একটু ভিন্ন।
সেখানে বলা হচ্ছে যে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়েও তিনি শান্ত হলেন না। তিনি পৃথিবীতে সংহার কার্য চালাতেই লাগলেন।
সমগ্র বিশ্বে তখন ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম অবস্থা। সমস্ত দেবতারা তখন মহাকাল শিবের দ্বারস্থ হল।
প্রথমে শিব তার রৌদ্র রূপ বীরভদ্রকে প্রেরণ করলেন নরসিংহকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বীরভদ্রের অনুরোধ উপরোধেও কিছু হল না।
এমনকি বীরভদ্র যুদ্ধে ব্যর্থ হলেন। বীরভদ্র ব্যর্থ হলে শিবের কাছে আর কোনো উপান্তর ছিল না।
তিনি তার সর্ব বৃহৎ এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করলেন। এবার শরভ রূপকে যদি
আমি আপনাকে বোঝাতে চাই আমাকে কিছু শাস্ত্রোল্লেখ করতে হবে। এই কাহিনির সঙ্গে যেহেতু এই সমস্তের সরাসরি যোগাযোগ আছে তাই আপনাদের সেই বিবরণ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
শরভেশ্বর মহাদেব বা সিংহয় মূর্তি সম্পর্কে যদি প্রাথমিক পরিচয় দিতে হয় বলতে হয় যে, শরভ বা শরভেশ্বর নামটির সঙ্গে বাংলার মানুষ অতোটাও পরিচিত নন যতটা তারা নৃসিংহদেব এই নামটির সঙ্গে পরিচিত।
পরমেশ্বর শিবের ১৯টি প্রধান স্বরূপের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি স্বরূপ হল “শরভেশ্বর। শ্রীবিষ্ণুর অবতার ভগবান নৃসিংসদেবের দর্প চূর্ণ করতে এবং তার রোষানল থেকে জগতকে ত্রাণ করতে সাক্ষাৎ বীরভদ্র এই শরভেশ্বর মূর্তি ধারণ করেন। একই দেহে পক্ষী এবং সিংহের অপরূপ মেল বন্ধনের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ হলেন শরভেশ্বর মহাদেব। এর শাস্ত্রগত ভিত্তি হল, শিবমহাপুরাণ, লিঙ্গমহাপুরাণ, শরভ উপনিষদ সহ বিভিন্ন শৈবাগম যেমন কামিকাগম, কারণাগম, সূক্ষ্মাগম, বাতুলশুদ্ধাগম এবং বিভিন্ন শাক্ত তন্ত্র যেমন “আকাশভৈরব কল্প, পক্ষিরাজ কল্প ইত্যাদি, কালিকা উপপুরাণ এমন কি পদ্মপুরাণেও শরভেশ্বরের সহস্রনামের উল্লেখ মেলে।
যদিও বর্তমানে পদ্মপুরাণ থেকে নামগুলোকে লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। উপরিউক্ত শ্রুতি, স্মৃতি, আগম এসব শাস্ত্রগুলিতে শরভেশ্বর কর্তৃক নৃসিংহদেবের দর্পচূর্ণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অন্য অপর কোনো কাল্পনিক চরিত্রের কোনোরূপ উল্লেখ এসব মান্য শাস্ত্রে পাওয়া যায় না।
তাঁহার স্বরূপ বা লীলামূর্তি সম্পর্কে শ্রীশিব উবাচ্ হল,
কদা লোকহিতাথায় লীলয়াকাশভৈরবম্।
ত্রিধাবিভজ্য চাত্মানং রক্ষতে সর্বদাখিলম্।।২।।
আকাশভৈরবং পূর্বং দ্বিতীয়ং চ আশুগারুড়ম্।
শরভং তু তৃতীয়ং স্যাদ্রপত্রয় মিহোচ্যতে।।৩।।
তস্য তাতীয় রূপস্য ত্রিধা রূপং বিশেষতঃ।
শরভং সালুবং চৈব পক্ষিরাজং তৃতীয়কম্।।৪।।
এর উল্লেখ রয়েছে আকাশভৈরব কল্পতন্ত্রের তৃতীয় অধ্যায়ে। এর অর্থ- পরমেশ্বর শিব পরমেশ্বরীকে বললেন, আকাশ ভৈরব সাক্ষাৎ সদাশিব স্বরূপ।
আকাশ ভৈরব নামক কল্পে পরমেশ্বর আকাশভৈরব লোক কল্যানের নিমিত্তে এবং অখিল বিশ্বচরাচরের রক্ষার নিমিত্তে নিজেকে (আত্মস্বরূপকে) তিনটি স্বরূপে বিভাজিত করেন অর্থাৎ নিজেই তিনটি স্বরূপ ধারণ করেন।
সেই স্বরূপগুলির নাম হল, আকাশভৈরব, আশুগারুড় এবং শরভ বা শরভেশ্বর।
এর মধ্যে তৃতীয় স্বরূপ শরভেশ্বর পুনরায় লীলা প্রদর্শনের নিমিত্তে নিজেকে তিনটি স্বরূপে বিভাজিত করেন, শরভ, সালুব এবং পক্ষিরাজ।
সুতরাং শরভ এবং আকাশভৈরবের মধ্যে তত্ত্বগতভাবে কোনো পার্থক্যই নেই। তাই মূলস্বরূপ শরভকেই সাধারণত আকাশভৈরব বলে আখ্যায়িত করা হয়।
সালুব, পক্ষিরাজ এবং শরভ যে আসলেই এক ও অভিন্ন তার প্রমাণ শৈব আগম উত্তর কারণাগমেই মেলে-
ঈশ্বর উবাচ্ :-
সিংহচর্মধরং ভীমং শত্রুসংহারকারণম্।
সাল্বপক্ষিপ্ররাজাখ্যং এবং সংহারতাণ্ডবম্।।৮।।
এর উল্লেখ রয়েছে উত্তর কারণাগমে, ৭৩ নং পটল। উত্তর কামিকাগমোক্ত শরভের ধ্যান ও বর্ণনায় বলা হয়েছে ঈশ্বর উবাচ্ :-
পক্ষাকারং সুবর্ণাভং পক্ষদ্বয় সমন্বিতম্।।১।।
ঊর্ধ্বপক্ষ সামাযুক্তং রক্তনেত্র ত্রয়ান্বিতাম্।।২।।
সুতীক্ষ্ণ নখরসংযুক্তৈঃ ঊর্ধ্বস্থৈর্বেদপাদকৈঃ।
দিব্যলাঙ্গল সংযুক্তং সুবিকীর্ণ জটান্বিতম্।।৩।।
কন্ধরোধ্বং নরাকারং দিব্যমৌলি সমাযুতম্।
সিংহাস্যং ভীমদংষ্ট্রং চ ভীমবিক্রম সংযুক্তম্।।৪।।
হরন্তং নরসিংহং তু জগৎসংহরণোদ্ধতম্।
কৃতাঞ্জলি পুটোপেতং নিশ্চেটিত মহাতনুম্।।৫।।
নম্রদেহং তদুর্ধ্বাস্যং বিষ্ণু পদ্মদলেক্ষণম্।
পাদাভ্যাং অম্বরস্থাভ্যাং কুক্ষিস্থাভ্যাং চ তস্য তু।।৬।।
গগণাভিমুখং দেবং কারয়েচ্ছরভেশ্বরম্।।৭।।
উত্তর কামিকাগমের ৬০ নং পটলে এর উল্লেখ রয়েছে। উত্তর কামিকাগম ছাড়াও উত্তর কারণাগমোক্ত ধ্যানেও শরভেশ্বরকে চতুষ্পদী বলা হয়েছে।
সেখানে ঈশ্বর উবাচ্ হল,
মৃগাদি চ চতুষ্পাদং দ্বিপাদং ভূমিসংস্থিতম্।।৫।।
উত্তর কারণাগমের ৭৩ নং পটলে রয়েছে এর উল্লেখ। সঙ্গে তিনি হস্তে ধারণ করছেন ডমরু, পরশু, ত্রিশূল, খড়গ, খেটক, তীর, শার্ঙ্গ এবং ভিণ্ডিপাল।
এই সম্পর্কিত ঈশ্বর উবাচ্ হল-
ডমরু পরশুশ্চৈব ত্রিশূলং খড়গখেটকম্।।৬।।
শরং শার্ঙ্গং ভিণ্ডিপালং পার্শ্বয়োশ্চ প্রকল্পয়েৎ।।৭।।
এটাও উত্তর কারণাগমের ৭৩ নং পটলে উল্লিখিত রয়েছে। লিঙ্গমহাপুরাণোক্ত ধ্যানেও তাঁকে চতুষ্পদী এবং সহস্রবাহু বলা হয়েছে –
মহাবাহুঃ চ চতুষ্পাদ্ বহ্নিসংভবঃ।।৬৮।।
সহস্রবাহুর্জটিলশ্চৎচন্দ্রার্ধকৃতশেখর।। ৬৬।।
(লিঙ্গমহাপুরাণ/পূর্বভাগ/৯৬/৬৮)
আবার পক্ষীরাজ তন্ত্রে পক্ষীরাজ স্বরূপধারী শরভের বর্ণনায় তাকে অষ্টপদী, সহস্রবাহু, দুইটি মস্তক, প্রতিটি মস্তক ত্রিনেত্র বিশিষ্ট, উত্থিত দ্বি-পুচ্ছ, দুটি ডানা এইরূপ ভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।
অষ্টাঙ্ঘ্রিশ্চ সহস্রবাহুরনিলচ্ছায়া শিরো যুগ্মভৃৎ,
ত্র্যক্ষোতিজবো দ্বিপুচ্ছ উদিতঃ সাক্ষাৎ নৃসিংহপদা।
ওঁ-নম অষ্টপদায় সহস্রবাহবে দ্বিশিরসে ত্রিনেত্রায় দ্বিপক্ষায় অগ্নিবর্ণায়
মৃগবিহঙ্গমরূপায় বীর শরভেশ্বরায় হুং ফট্।
(পক্ষিরাজ তন্ত্র)
শ্রীতত্ত্ব নিধি অনুযায়ী, শরভেশ্বর মহাদেব হলেন আবার অষ্টপদ এবং ৩২টি হস্ত বিশিষ্ট-
মহামেরুসমাকারম্ অষ্টপাদংরবিপ্রভম্।
দ্বাত্রিংশৎ বাহু সংযুক্তং সূর্যসোমাগ্নিলোচনম্।।১ ।।
(শ্রীতত্ত্বনিধি/৭৮ পৃষ্ঠা)
তামিল শৈবশাস্ত্র ‘Sivaparakramam’ অনুযায়ীও শরভেশ্বর অষ্টপদ সংযুক্ত।
(শিবপরাক্রমম/৩০ নং মূর্তি)
সুতরাং মীমাংসা এটাই দাঁড়ায় যে অষ্টপদী ও চতুষ্পদী শরভের মধ্যে কোনো ভেদ নেই।
তিনি যখন পক্ষিরাজ কল্পে পক্ষীরাজ স্বরূপ ধারণ করেন তখন তিনি অষ্টপদী এবং শরভ কল্পে তিনি চতুষ্পদী।
প্রকৃতপক্ষে আকাশ ভৈরব কল্পের অন্তর্ভুক্ত দুটি কল্প হল- শরভ কল্প এবং পক্ষীরাজ কল্প। আচ্ছা এবার শরভের শক্তি সম্পর্কে বলি।
উত্তর কারণ আগমোক্ত শরভেশ্বরের ধ্যানে ঈশ্বর উবাচে বলা হয়েছে –
জিহ্বা বড়বাগ্নিস্যাৎকালী দুর্গা দ্বিপক্ষকৌ।।৩।।
এটা আছে উত্তর-কারণাগমের ৭৩ নং পটলে। অর্থাৎ দুর্গা এবং কালী
সাক্ষাৎ শরভেশ্বরের দুইটি ডানা অর্থাৎ দুই ডানার শক্তি। এই মতানুসারে তাঁর দুই শক্তি দুই ডানায় সংস্থিতা দুর্গা এবং কালী।
তন্ত্রান্তরে দুর্গাকে শূলিনীদেবী এবং কালীকে ভদ্রকালী বলা হয়ে থাকে। শরভেশ্বরের চারপাশের আটটি মূর্তিশ্বর রয়েছেন।
শৈবাগম উত্তর কামিকাগমের ৬০ নং পটলের ১১-১২ নং শ্লোকে শরভেশ্বরের চারপাশের আটটি মূর্তিশ্বরের উল্লেখ মেলে তাঁদের নাম- “বজ্রদেহ, খাদক, বিয়োজক, মারণ, দীর্ঘহস্ত, তীক্ষ্ণদংষ্ট্র, জটাধর এবং বলিপ্রিয়।
আগমোক্ত শরভ মূর্তি প্রতিষ্ঠা বলুন বা শরভ অর্চনা বলুন অষ্টদল পদ্মের আটটি দলে এই আটজন মূর্তিশ্বর নিজ নিজ বীজ উচ্চারণ দ্বারা ন্যাস করতে হয় এবং আটটি ঘট স্থাপন করতে হয়।
এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ গুরুগম্য এবং আগমোক্ত শৈব পরম্পরাগত। পক্ষীরাজ তন্ত্রোক্ত শরভের গায়ত্রী-
ওঁ-ম পক্ষীরাজায় বিদ্মহে শরভেশ্বরায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।।
এছাড়াও আকাশ ভৈরব কল্পোক্ত শরভ মন্ত্র হল,
খেং খাং খং ফট্ প্রাণগ্রহাসি প্রাণগ্রহাসি হুং ফট্ সর্ব শত্রু সংহারণায় শরভ-সালুবায়-পক্ষিরাজায় হুং ফট্ স্বাহা।
কামিকাগমোক্ত শরভের মন্ত্র। ঈশ্বর উবাচ্ বা শ্লোক হল-
অষ্টবর্গ আদিমং বীজং চতুর্দশং বিভূষিতম্।
ষষ্ঠস্বর সমোপেতং বিন্দুনাদ সমন্বিতম্।।৮।।
শারভং বীজমিত্যাহুঃ শরভেশ্বর ইত্যপি।
ততো হরিহরস্তবেবং চতুর্থন্তং পদদ্বয়ম্।।৯।।
আদৌ প্রণব সংযুক্তং নমস্কারান্ত সংযুতম্।।১০।।
(উত্তর কামিকাগম/৬০ নং পটল)
অর্থাৎ উত্তর কামিকাগমোক্ত শরভেশ্বরের মূল মন্ত্র এরূপ হবে-
ওঁ-ম শোঁ উঁ শরভেশ্বরায় হরিহরায় নমঃ।।”
এতটুকু বলে থামলেন হেমন্তাই। সকলে এক নাগাড়ে তার বলা কাহিনি ও শ্লোক শুনে যাচ্ছে এক মনে।
কেউ কেউ একটু অধৈর্যও হয়ে পড়ছে। দাসবাবু হেমন্তাইকে থামতে দেখে বলেই ফেললেন, “আচ্ছা কাহিনি বলছেন ঠিক আছে। কিন্তু শ্লোক বলছেন কেন?”
হেমন্তাই দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন। বললেন, “শরভাবতার প্রসঙ্গ মুখে নিলে তার সম্পূর্ণ মন্ত্র উচ্চারণের আদেশ রয়েছে আমার গুরুর। তাই আমি শুধুমাত্র কাহিনি আপনাদের বলতে পারবো না।”
রামানুজ বলল, “ঠিক আছে। বলতে থাকুন। আমি শুধু সাগ্রহে অপেক্ষা করছি কখন আপনাদের গ্রামের সঙ্গে বা জঙ্গলের সঙ্গে এই কাহিনির মিল খুঁজে পাবো। যদি না পাই, আজ রাতে আপনাকে শ্রীঘরে পাঠাবার ব্যবস্থা আমি নিজে করবো।”
হেমন্তাইয়ের মুখের বলিরেখাগুলো এই শীতের দিনে আরও গভীর হয়ে আছে। অদ্ভুত এক উপজাতি পুরুষ লাগছে তাকে।
তিনি বললেন, “আমাকে সম্পূর্ণ কাহিনি শেষ করতে দিন। এরপর আপনাদের যা ইচ্ছে হয় আমি তাই করবো।”
সিনহা বললেন, “বলতে থাকুন বাকি কাহিনি।”
হেমন্তাই আবার শুরু করলেন, “এই ভয়ানক শরভাবতারের সঙ্গে ভগবান নরসিংহের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয় এবং নরসিংহকে পরাজিত করেন শরভ। তারপর দুই দেবতাই নিজের নিজের রূপে ফিরে আসেন এবং পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করতে থাকে। এই যে কাহিনি আমি আপনাকে বললাম সেটা শৈবদের মধ্যে প্রচলিত। এই কাহিনি বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীর মানুষদের খুব পীড়া দিল। ওদের মনে হল, বিষ্ণুর উপর শিবের কর্তৃত্ব ফলাও করার জন্যেই এই কাহিনির সৃষ্টি। ফলে ওরা এই কাহিনিটিকে আরও দীর্ঘায়িত করল। এবার কাহিনির পরবর্তী অংশ বলার মাঝে আমি
পুরাণের বিভিন্ন মতগুলোও আপনাদের বলবো। তাতে আমার কাহিনিটি যে নিছক কাহিনি নয়, বরং এর পৌরাণিক প্রমাণাদি বিদ্যমান তা আপনারা বুঝতে পারবেন।
বৈষ্ণবদের মতে ভগবান নরসিংহদেবের শ্রেষ্ঠত্ব শ্রুতি, স্মৃতি, তন্ত্র সর্বত্রেই বর্ণিত। শ্রীনৃসিংহদেব হলেন পরমব্রহ্মে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার।
নৃসিংহতাপনী শ্রুতিতে ও বিভিন্ন মহাপুরাণ ও উপপুরাণে তাকে অপরাজেয়, অবিনশ্বর ঈশ্বর বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
ফলত, বৈষ্ণবদের মতে শিবপুরাণ ও লিঙ্গপুরাণে ভগবান নৃসিংহদেবের পরাজয় নিয়ে যে কথা আছে, তা সত্য হতে পারে না এবং স্বয়ং শিবও তা পদ্মপুরাণে মাতা পার্বতীর নিকট ব্যক্ত করেছেন।
বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ শিবজী মহারাজ কেন ভগবান শ্রীহরির নৃসিংহ অবতার নিয়ে এরূপ মোহনবাক্য প্রয়োগ করেছেন তার বিশ্লেষণ রয়েছে।
প্রথমে চলুন আমরা প্রামাণ্য শাস্ত্রসমূহ হতে জেনে নি, বাস্তবে কি ঘটেছিল-
শ্রীব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণে বর্ণিত আছে, হিরণ্যকশিপুকে বধের পর ভগবান নৃসিংহদেবের ক্রোধ কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না।
তখন ব্রহ্মাদি দেবতারা ভীত হয়ে বৈষ্ণবশিরোমণি শিবের নিকট গিয়ে নৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণের ব্যবস্থা করতে বলেন।
তখন মহাদেব নিজের দেহ সম্ভূত এক অতিকায় জীবের সৃজন করলেন, যা ‘শরভ’ নামে পরিচিত।
শিবের এ শরভাবতার নৃসিংহদেবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসলে শ্রীনৃসিংহদেব তা দেখে পূর্বাপেক্ষা অধিক ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন এবং তিনি শরভের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেন, যে রূপটি গান্ডাবেরুন্ডা অথবা গন্দবেরুন্দা নামে বন্দনীয়।
গন্দবেরুন্দা অবতার আসলে দু-মুখো ঈগলের অবতার। দু-টো ভয়ানক ঈগলের মাথা দু-দিকে রয়েছে, বাকি শরীর মানুষের মতোই।
কোনো মূর্তিতে তাঁর ঠোঁটে বিষধর সাপ আবার কোনো ছবিতে তাঁর ময়ূরপুচ্ছ রয়েছে। ভগবান গন্দবেরুন্দা নৃসিংহদেব শরভাবতারের সঙ্গে ১৮ দিন পর্যন্ত
অবিরাম যুদ্ধ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি শরভাবতারকে হিরণ্যকশিপুর মতো কোলে শুইয়ে ধরে তাঁর ব্রজতীক্ষ্ণ নখের দ্বারা শরভের বক্ষ চিড়ে শরভকে হত্যা করেন।
শরভাবতার যখন ব্যর্থ হলেন তখন দেবতাদের অনুরোধে মহাভয়ংকরী শ্রীনৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণ করেন ভক্তশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ মহারাজ। এবার এই হচ্ছে বৈষ্ণবদের মতামত।
বিষ্ণুপুরাণেও এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও শ্রীব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণে বলা আছে,
তো যুধ্যমানৌ তু তদা চিরেণ বলবত্তরৌ।
ন শমং জন্মতুর্দেবৌ নৃসিংহশরভাকৃতী।।৬৯।।
ততঃ ক্রুদ্ধো মহাকায়ো নৃসিংহো ভীমনিঃস্বনঃ।
সহস্রকরজৈস্ত্রস্তস্য গাত্রাণি পীডযন্।।৭০।।
ততঃ স্ফুরচ্ছটাচোটো রুদ্রং শরভরূপিণম্।
ব্যদারযন্নখৈস্তীক্ষ্ণৈহিরণ্যকশিপুং যথা।।৭১।।
(ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, ক্ষেত্রমাহাত্ম্যখণ্ডম, অধ্যায় ৮, শ্লোক ৬৯-৭১; তেলেগু সংস্করণ)
এই শ্লোকের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘অতঃপর দুই পরাক্রমশালী শক্তি অর্থাৎ নৃসিংহ ও শরভের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দীর্ঘকাল অর্থাৎ ১৮ দিন টানা চলতে থাকে এবং বিধ্বংসী এ যুদ্ধে কেউই কিছুতে শান্ত হচ্ছিলেন না।
অতঃপর ভগবান নৃসিংহদেব তার মহাবিকট মহাক্রোধী রূপ অর্থাৎ গান্ডাবেরুন্ডা নৃসিংহরূপ ধারণ করলেন এবং তাঁর সহস্র হাতে রুদ্রের এই শরভাবতারকে ধরে তাঁর তীক্ষ্ণ ও মারাত্মক নখ দিয়ে শরভের বক্ষটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন, ঠিক যেভাবে তিনি হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেছিলেন।’
শ্রীনৃসিংহদেবের প্রলয়ংকারী রূপ যে শরভের চেয়েও ভয়ংকর তা শ্রীপদ্মপুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে-
দংষ্ট্রাসু সিংহশাদুলাঃ শরভাশ্চ মহোরগাঃ।
কণ্ঠে চ দৃশ্যতে মেরুঃ স্কন্ধেম্বপি মহাদ্রয়ঃ।।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ২৩৮, শ্লোক ১০৪)
এই শ্লোকের বঙ্গানুবাদ হল, ভগবান নৃসিংহদেবের দাঁতগুলো সিংহ, বাঘ এমনকি শরভ ও মহাসর্প সমূহের উৎপত্তিস্থল অর্থাৎ অত্যন্ত ভয়ংকর, নৃসিংহদেবের বজ্রকণ্ঠ এদের চেয়েও ভয়ানক, মেরুপর্বতের মতো সুদৃঢ়, ভগবানের স্কন্ধও বিশাল পর্বতের মতো।
শিবাবতার বিধ্বংসী শ্রীনৃসিংহদেবকে পদ্মপুরাণে তাই ‘বীরভদ্রজিৎ’ নৃসিংহরূপে বন্দনা করা হয়েছে এভাবে-
জগদেকস্বরূপায় নৃসিংহায় নমোহস্ত তে।
ভালে দধার যো দেবো নৃসিংহো বীরভদ্রজিৎ।।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ১৭৪, শ্লোক ৮৫)
অর্থাৎ যে বীরভদ্রজিৎ নৃসিংহ দেব ললাটে সুতপ্ত দ্বাদশ সূর্যবিম্ব ধারণ করেন, সে জগদেকস্বরূপ নৃসিংহদেবকে নমস্কার করি।
তাহলে এবার একটা প্রশ্নের জন্ম হয়। পরমবৈষ্ণব শিব কেন শিবপুরাণ ও লিঙ্গপুরাণে নিজ আরাধ্যদেব শ্রীহরির বিরুদ্ধে এরূপ মোহনবাক্য প্রয়োগ করে বিভ্রাট সৃষ্টি করলেন?
এই উত্তরও স্বয়ং শিব নিজেই পার্বতীকে বলেছেন। পদ্মপুরাণে যোগেশ্বর শিব মাতা পার্বতীকে বলেছেন, তিনি নিজের ইচ্ছাতে এরূপ করেননি, তিনি শ্রীহরির নির্দেশে অসুরমোহনার্থে তামসিক পুরাণসমূহে নিজেকে শ্রীহরির চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য এসকল মোহন বাক্য বলেছেন, যাতে জগতের আসুরিক লোকেরা বিষ্ণুভক্তির পথ থেকে সরে গিয়ে বেদবিরুদ্ধ পন্থাকে আশ্রয় করে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
অসুরেরা বিষ্ণুভক্তির ছল করে তপস্যা দ্বারা শক্তি লাভ করে সে শক্তি দিয়ে দেবলোকাদি দখল করার উপক্রম হলে দেবতারা শ্রীহরির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন।
সে সময় শ্রীহরি শিবকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন জগতে শিবপুরাণ, লিঙ্গপুরাণাদি তামসিক পুরাণ, তামসিক স্মৃতি ও পাশুপত শাস্ত্র প্রচার করেন এবং শৈব ও মহাশৈব নামক বেদবিরুদ্ধ পাষন্ড সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন।
শিবের এ প্রচারণায় তখন যারা প্রকৃতই অসুর, বিষ্ণুভক্তির ছল করছে, তারা বিষ্ণুবিমুখ হয়ে যাবে এবং তাদের পতন ঘটানো দেবতাদের পক্ষে সহজ হবে।
পুরাণানি চ শাস্ত্রাণি ত্বয়া সত্ত্বেন বৃংহিতাঃ।
কপালচৰ্ম্মভস্মাস্থিচিহ্নাসমরসর্ব্বশঃ। ৩০।
ত্বমেব ধৃতবান্ লোকান্ মোহয়ম্ব জগত্রয়ে।
তথা পাশুপতং শাস্ত্রং ত্বমেব কুরু সংস্কৃতঃ। ৩১।
কঙ্কালশৈবপাষণ্ডমহাশৈবাদিভেদতঃ।
অলক্ষ্যঞ্চ মত সম্যগ্বেদবাহ্যং নরাধমাঃ। ৩২।
ভস্মাস্থিধারিণঃ সর্ব্বে ভবিষ্যন্তি হচেতসঃ।
ত্বাং পরত্বেন বক্ষ্যন্তি সর্ব্বশাস্ত্রেষু তামসাঃ। ৩৩।
তেষাং মতমধিষ্ঠায় সর্ব্বে দৈত্যাঃ সনাতনাঃ।
ভবেয়ুস্তে মদ্বিমুখাঃ ক্ষণাদেব ন সংশয়ঃ। ৩৪।
অহপ্যবতারেযু ত্বাঞ্চ রুদ্র মহাবল।
তামসানাং মোহনার্থং পূজয়ামি যুগেযুগে।
মতমেতদবষ্টভ্য পতস্ত্যেব ন সংশয়ঃ। ৩৫।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ২৩৫, শ্লোক ৩০-৩৫, শ্রীহরি উবাচ)
অর্থাৎ শ্রীহরি শিবকে বললেন, হে শিব! তুমি সংকোচ পরিত্যাগ করে জগতে তামসিক পুরাণ ও অন্যান্য তামসশাস্ত্রের প্রচার করো। তুমি কপাল, চৰ্ম্ম, ভস্ম ও অস্থি চিহ্ন ধারণ করে ত্রিজগতের অখিল লোককে মোহিত কর। তুমি পাশুপাত্ শাস্ত্র প্রণয়ন করে তা প্রচার কর। তুমি কঙ্কাল, শৈব, পাষণ্ড ও মহাশৈব প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত করে বেদবিরুদ্ধ মত অলক্ষ্যে প্রবর্তিত কর। এইরূপ করলে সকলে ভস্মাস্থিধারণ করে অধম হবে ও জ্ঞানহীন হয়ে যাবে। তখন তারা তামসিক হয়ে তোমাকেই সকল শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ বলে কীর্ত্তন করবে। যারা বিষ্ণুভক্তির ছল করে ত্রিলোকে উৎপাত সৃষ্টি করে সে সকল সনাতন দানবগণ এ বেদবিরুদ্ধ মত গ্রহণ করে ক্ষণকাল মধ্যে নিঃসংশয় বিষ্ণুবিমুখ হয়ে যাবে। হে মহাবল রুদ্র! আমিও যুগে যুগে অবতার পরিগ্রহ করে তামসিক লোকদের মোহিত করার জন্য তোমার পূজা করব। তা দেখে দানবেরাও সেই মতের অনুবর্তী হইয়া নিঃসংশয় পতিত হইবে।
এটুকু বর্ণনার পর মহাদেব তার দ্বারা প্রচারিত তামসিক পুরাণসমূহের নাম বর্ণনা করেছেন এবং স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তামসিক পুরাণ অনুসারীগণ নিশ্চিতভাবে নরকপ্রাপ্ত হন।
মাৎস্যং কৌস্মং তথা লৈঙ্গং শৈবং স্কান্দং তথৈব চ।
অগ্নেয়ঞ্চ যড়েতানি তামসানি নিবোধ মে।১৮।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ২৩৬, শ্লোক ১৮, শিব উক্তি)
অর্থাৎ শিব বললেন, মৎস্যপুরাণ, কুৰ্ম্মপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, শিবপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ- এই ছয়খানি পুরাণ তামসিক পুরাণ।
সাত্ত্বিকা মোক্ষদাঃ প্রোক্তা রাজসাঃ সর্ব্বদা শুভাঃ।
তথৈব তামসা দেবি নিরয়প্রাপ্তিহেতবঃ।।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ২৩৬, শ্লোক ২১-২২, শিব উক্তি)
অর্থাৎ শিব পার্বতীকে বললেন, হে দেবী! পদ্মপুরাণাদি সাত্ত্বিক পুরাণসমূহ মোক্ষ প্রদান করে। ব্রহ্মান্ডপুরাণাদি রাজসিক পুরাণ সর্ব্বদা শুভ এবং শিবপুরাণ, লিঙ্গপুরাণাদি তামসিক পুরাণগুলো নিশ্চিতভাবে নরক প্রাপ্তির কারণ বলে নির্দিষ্ট।
উপরোক্ত শাস্ত্রসিদ্ধান্ত ও বৈষ্ণবপ্রবর শিবের বাক্যানুসারে স্পষ্ট দৃশ্যত যে, বাস্তবে শরভাবতার কর্তৃক নৃসিংহদেবের পরাজয়ের যে কাহিনি তা নিছকই ছল বাক্য, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
বাস্তবে শ্রীনৃসিংহদেবই সবচেয়ে প্রলয়ংকরী রূপ “শ্রী গান্ডাবেরুন্ডা-নৃসিংহরূপ ধারণ করে শিবের শরভাবতারকে নাশ করেন। যারা তামসিক লিঙ্গ-শিবপুরাণের অসুরমোহন বাক্যে মোহিত হয়ে অপসিদ্ধান্তকে গ্রহণ করে অপপ্রচার করেন, তারা নিশ্চিতভাবে শ্রীহরির নিন্দাবশত নরকগামী হবেন।
হেমন্তাই আবার থামলেন। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “খুব বড় বক্তব্য
কিন্তু। এতগুলো পুরাণকে তামসিক বলছেন আপনি?”
“আমি বলছি না। বৈষ্ণবরা বলছেন। আর এই যুক্তিগুলোও বিভিন্নভাবে খণ্ডন করা যায়। কিন্তু সেসব আলোচনা আমাদের কাহিনির পক্ষে প্রয়োজনীয় নয়। বৈষ্ণবদের এই যুক্তি অবশ্যই শৈবরা খণ্ডন করবেন, এটাই তো রীতি। কিন্তু এই যে গন্দবেরুন্দার কথাটা উঠে এল এটা অব্দি আপনাদের বয়ে নিয়ে আনতেই এই সম্পূর্ণ কাহিনি এবং পুরাণের শ্লোকের সাহায্য নিলাম আমি।
হেমন্তাই এবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। রামানুজ বলল, “হুম, বুঝলাম। কিন্তু এখনও আমি আপনাদের গ্রামের সঙ্গে এই কাহিনির কোনো যোগাযোগ খুঁজে পেলাম না।”
হেমন্তাই হাসলেন। রামানুজ এবার একটু বিরক্ত হল, “আমি কি হাস্যকর কোনো কথা বলেছি?”
হেমন্তাই হাত দিয়ে ইশারায় বোঝালেন যে তিনি সে কারণে হাসছেন না।
তারপর বোমা ফাটিয়ে বললেন, “আসলে আমাদের গ্রামে গন্দবেরুন্দার পুজো করা হয় মন্দিরে। ওই যে সেদিন আপনি বিগ্রহ দেখতে চেয়েছিলেন, সেই বিগ্রহটা গন্দবেরুন্দা দেবতার বিগ্রহ।”
এবার সকলে বুঝতে পারলেন এত বড় কাহিনির সারবত্তা। কে এই দেবতা, কোথা থেকে এসেছেন তা স্পষ্ট হল সকলের কাছে। সকলের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। রামানুজ এবার অত্যন্ত গুরুত্ব দিল বিষয়টাতে। বলল, “এবার বাকিটা বলুন। আমরা শুনছি।”
হেমন্তাইয়ের মনে হল তিনি এতক্ষণে শ্রোতাদের আগ্রহ আদায় করতে পেরেছেন।
তিনি এবার কাহিনির চাকা দ্রুতগতিতে ঘোরালেন, “এবার আমাদের আরাধ্য দেবতা গন্দবেরুন্দা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই কাহিনিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁদের মতে গন্দবেরুন্দা দেবতাও একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর খোলস ত্যাগ করতে হত। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তার সঙ্গে মহাসর্পের মিল পাওয়া যায়। এরকমই একবার তিনি তাঁর একটা
খোলস ত্যাগ করেছিলেন আমাদের জঙ্গলে। তিনি তো চলে গেলেন, কিন্তু তার খোলস রয়ে গেল। সে যেন তেন খোলস নয়, সে এক অলৌকিক খোলস। আর সবচেয়ে বড় কথা সে খোলস নির্জীবও নয়। হ্যাঁ সে খোলসে প্রাণ আছে।”
উপস্থিত সবাই এই কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল। কী বলছে এসব হেমন্তাই? হেমন্তাই থামলেন না। বলতে লাগলেন,
“সেই খোলস যখন প্রথম আবিষ্কৃত হল, শুনেছি তখন সবাই প্রথমে ভয় পেয়েছিল। কারণ সেই খোলস তখনও নড়ছে, কাঁপছে। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই সেই কাঁপন বন্ধ হল। স্থির হয়ে গেল সেই খোলস। কিন্তু স্থির হলে কী হবে, সেই খোলসের শরীর থেকে বেরিয়ে আসছিল অদ্ভুত দ্যুতি। বেনিয়াসহকলায় রামধনু রঙের আলো ঠিকরে বেরুচ্ছিল সেই খোলসের গা থেকে। আপনারা ভাবুন, একটি বৃহদাকার খোলস, যার আকৃতি অর্ধেক মানুষের মতো বাকি অর্ধেকে দুই মাথাওয়ালা ঈগল, সেই খোলসের সামনে আমার পূর্বপুরুষদের অবস্থা ঠিক কী হয়েছিল। তবুও যখন সেই খোলসের নড়াচড়া বন্ধ হল তখন ওরা কিছুটা সাহসে ভর করে এগিয়ে গেল তাঁর কাছে। কেউ কেউ সাহস নিয়ে ছুঁয়েও ফেলল তাঁকে। এ যেন জীব হয়ে ঈশ্বর ছোঁয়ার অনুভূতি। বহু মানুষ একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দেখল গন্দবেরুন্দা নরসিংহ দেবকে। স্থির হল এই জঙ্গলেই তৈরি হবে মন্দির। সেই মতো বিশাল এক মন্দির তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেল। কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়েছিল এবং এক বছরের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল সেই মন্দির। সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল তার খোলসের অবয়বকে। তিনি মূর্তির মতো বসে আছেন সেই মন্দিরে, আজকেও তার খোলস সেখানেই আছে।”
হেমন্তাইয়ের গলা শুকিয়ে গেছে কথা বলতে বলতে। তিনি দাসবাবুর হাতে থাকা জলের বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে জল পান করলেন।
সকলে এতই বিঘ্নিত এই কাহিনি শুনে যে কারো মুখে কোনো কথা আসছে
না। সবাই যেন আরও শুনতে চাইছে। হেমন্তাই বলতে লাগলেন,
“এই এক বছরে এই ভীষণ রুদ্রমূর্তি একবারের জন্যেও নড়াচড়া করেনি। হ্যাঁ, তবে যত সময় এগিয়েছিল তত তার দেহের আলোর ছটা তীব্র হচ্ছিল। এমনকি তার গা বেয়ে সেই রামধনুরঙের জেলি পদার্থের মতো একটা বস্তু গড়িয়ে পড়ছিল। মানুষ এসব দেখে অবাক হলেও দেবতার দেহে কত কিছুই তো হতে পারে, সে নিয়ে সম্যক জ্ঞান যেহেতু তাদের ছিল না তারা এ নিয়ে নির্বিকার ছিল। ভক্তিভাবটাই বেশি কাজ করেছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, যাতে আর একেবারে নির্বিকার থাকা যায়নি। যে সমস্ত মানুষ গন্দবেরুন্দা দেবতার খোলসে হাত দিয়েছিলেন বা কাজ চলাকালীন যাদের শরীরে সেই রঙিন পদার্থ লেগেছিল তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করলেন। একটা বছর তাদের দেহ স্বাভাবিক থাকলেও যে এক বছর অতিক্রান্ত হল, তারা ধীরে ধীরে হিংস্র হয়ে উঠতে শুরু করল। তাদের চোখের মণি কালো থেকে ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যাচ্ছিলো। বহু মানুষ সাক্ষী ছিলেন যে তাদের পিঠের মেরুদণ্ড শব্দ করে দেহের ভিতরে ভেঙে যাচ্ছিল। আর অবাক করার বিষয় তারপরেও তাদের মৃত্যু ঘটছিল না। তারা মানুষকে আক্রমণ করে মানে মূলত এরা মানুষের ঘাড়ে কামড়াতে শুরু করে। এরকম কয়েকটা ঘটনা ঘটার পরেই গ্রামবাসীরা সেই মানুষদের হত্যা করতে শুরু করে। আমাদের গায়ে যে উপজাতি হিংস্র রক্ত আছে তাতে আমাদের পূর্বপুরুষদের অবদান অনস্বীকার্য। ওরা শিকারে পটু হত। তাই তীর-ধনুক থেকে শুরু করে তরোয়াল, বর্ষা এসব চালনায় ওরা সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এমনকি আজকের দিনেও আমাদের একাংশ এসব বিদ্যায় পারদর্শী। তাই আমাদের পূর্বপুরুষেরা এরকম হিংস্র অদ্ভুত প্রাণীদের হত্যা করতে শুরু করে। এভাবে প্রথম বছর অতিক্রান্ত হয়।
দ্বিতীয় বছরে ততদিনে মন্দিরে পূজা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছরেও দেখা গেল যারা মূর্তির অবিরত সংস্পর্শে থেকেছে তারা
একইরকমভাবে হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গত বছর যাদের উপর এরকম প্রাণীরা আক্রমণ করেছিল, তারাও একইভাবে এই বিষের শিকার হয়ে হিংস্র প্রাণীতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
এরকম বেশ কয়েক বছর চলার পর গ্রামবাসী বুঝতে পারল আসল সমস্যা গন্দবেরুন্দা দেবের মূর্তি নিসৃত অলৌকিক তরল পদার্থটি। এই পদার্থের সংস্পর্শে এলেই এরকম ঘটছে। কিন্তু ততদিনে তিনি আমাদের আরাধ্যে পরিণত হয়েছেন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই যে তরল পদার্থ নিসৃত হচ্ছে, তা সেবন করলে বহু মারণ রোগ সেরে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে এক বছর পর সকলেই হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হচ্ছিলেন ঠিকই কিন্তু শুরুর দিনে এর ঔষধি গুণাগুণকে উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ সে পদার্থের কিছু ভালো গুণাগুণও যে আছে তা নিয়ে প্রায় সকলেই নিশ্চিত ছিল। কিন্তু যেহেতু কোনোপ্রকার বিশুদ্ধিকরণ ছাড়া সরাসরি এই পদার্থ আমরা সেবন করছিলাম তাই ভালোর পাশাপাশি খারাপ গুণগুলিও আমাদের দেহে প্রবেশ করে আমাদের মনুষ্যত্ব হরণ করছিল।
এবার ধীরে ধীরে আমার পূর্বপুরুষরা একটা সিস্টেম তৈরি করল। এই সিস্টেম তৈরি করতে গিয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হল। কিন্তু তবুও যেহেতু গ্রামবাসী গন্দবেরুন্দাকে ত্যাগ করতে রাজি ছিলেন না তাই সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, বলিদান সহ্য করেও তারা এই কাজে ব্রতী হয়ে রইলেন। আমাদের গ্রামের উন্নতি অবনতি সমস্তই এই দেবতাকে আঁকড়ে ধরে। আমাদের আবাসন প্রতিষ্ঠিত হল। ধীরে ধীরে আমরা বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানলাভ করা শুরু করলাম। আমাদের পূর্ব পুরুষদের বলিদান কাজে লাগল। কারণ আমরা একটা ক্রিয়ার অভিমুখ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলাম। আমরা বুঝে গেলাম দেবতার তমোগুণ থেকে আমরা আমাদের কীভাবে রক্ষা করতে পারি।”
রামানুজ এবার বলেই ফেলল, “ক্রিয়া প্রসঙ্গে বলুন। বাকিটা বুঝেছি।”
হেমন্তাই বিচলিত না হয়ে বললেন, “আমরা এই জঙ্গলে একটি
পরীক্ষাগার তৈরি করেছি আর তৈরি করেছি একটি কারাগার।”
সকলের ভ্রু কুঁচকে গেল এই কথা শুনে। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল সবাই।
হেমন্তাই বলে চললেন, “আমরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম দেবতার খোলস প্রতি বারো বছরে একবার জেগে উঠে। বাকি সময় তিনি ধ্যান মূর্তির মতো তার নির্দিষ্ট আসনে মন্দিরে উপবিষ্ট থাকেন। এই বারো বছর ধরে তার দেহ নিঃসৃত রামধনু পদার্থের উপর আমরা নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাই। আমাদের বারোজন যুবক, যাদের ছোটবেলা থেকে তৈরি করা হয় শুধুমাত্র এই কাজের জন্য, তারা নিজের জীবন বাজি রেখে এই সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে থাকে। এবার আপনাদের বলি আমাদের সিস্টেমটা ঠিক কী। আমরা প্রতি বারো বছর অন্তর বারোজনকে জঙ্গলের পরীক্ষাগারে পাঠাই। আমরা জানি যে একজন মানুষ সেই রঙিন জেলি বা তরলপদার্থের সংস্পর্শে এলে হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হবে।
কিন্তু আমরা এটাও দেখেছি যে একজন মানুষ এই পদার্থের সংস্পর্শে আসার পর তার মধ্যে রোগ সংক্রামিত হতে এক বছর সময় লাগে। তাই একটা নির্দিষ্ট বছরে শুধুমাত্র একেকজন ছাত্রই দেবতার খোলস এবং পদার্থের সংস্পর্শে থাকে। ও এক বছর সে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়। বাকি এগারোজন তখন অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং ওই নির্দিষ্ট ছাত্রটি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে বা ওর সংস্পর্শে আসে না।
দ্বিতীয় বছর যখন শুরু হয় ততক্ষণে আগের বছরের ছাত্রটির মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে প্রথম কারাগারে বন্দি করে ফেলা হয়। এবার দ্বিতীয় ছাত্র পরীক্ষা নিরীক্ষার পথে পা বাড়ায় এবং দেবতার দেহ নিঃসৃত পদার্থের সংস্পর্শে আসে। প্রথম ছাত্রটি নিজের উপর ছাড়া আর কারো উপর কোনো পরীক্ষা করার সুযোগ সেভাবে পায়নি। সে শুধু পদার্থটির উপরেই বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ছাত্র কারাগারে বন্দি জানোয়ারটির উপর কিছু পরীক্ষা করার সুযোগ পায়। সে চেষ্টা চালায় কোনোভাবে এরকম কোনো ওষুধের সৃষ্টি করার,
যে ওষুধে এই রোগমুক্তি ঘটতে পারে। এভাবেই তৃতীয় বছর নতুন ছাত্র তার জায়গা নেয় এবং দ্বিতীয় ছাত্রটি ততক্ষণে সংক্রামিত হয়ে কারাগারে বন্দি হয়ে পড়েছে।
এভাবেই চলতে থাকে। বারো নম্বর বছরটা সবচেয়ে ভয়ানক। কারণ সে বছর একমাত্র মানব সেখানে জীবিত থাকে তার উপর অনেক কাজের চাপ থাকে। বাকি এগারোজন ততক্ষণে পরিণত হয়েছে এগারোটা শয়তানে। যে সবচেয়ে পুরোনো অর্থাৎ প্রথম ছাত্র তার শক্তি সর্বাধিক। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়ে একাদশ ছাত্রের শক্তি। আর ওদের সামলে রাখাটাই আসল কাজ। ওদের সময়ানুযায়ী খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে দেবতার দেহ থেকে পদার্থ সংগ্রহ করা, সমস্ত কিছু লিপিবদ্ধ করা সকল কাজ তাকেই করতে হয়।
তারপর যখন বারো বছর পূর্ণ হয় সেরকম এক অমাবস্যা তিথিতে সে বুঝতে পারে যে আর বেশি সময় বাকি নেই। সেও পরিণত হতে চলেছে জানোয়ারে। সে তখন ধীরে ধীরে কারাগারের সমস্ত দরজা খুলে দেয়। একে একে সমস্ত শয়তান বেরিয়ে আসে কারাগার থেকে। ততক্ষণে গ্রামে আমরা হেমন্তাইয়া ক্রিয়া শুরু করে দিই। তাতে আমরা এই দেবতার দেহের নির্যাস ব্যবহার করে তৈরি করি এক মহৌষধি। এই মহৌষধির আবিষ্কার করেছিল আজ থেকে প্রায় দুশো পঞ্চাশ বছর আগেকার ছাত্রদের দলটা। তার আগে তাদের গ্রামমুখী করা আরও কঠিন ছিল। এই মহৌষধির গুণে ওরা অন্যদিকে না গিয়ে সোজা আমাদের গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। একসময় ওরা এসে পৌঁছায় গ্রামে। গ্রামবাসী তখন জড়ো হয়ে থাকে গ্রামের মাঝখানে। একসঙ্গে এত মানুষ দেখে ওদের মুখে জল আসে। একেকটা শয়তানের বাচ্চা তখন চেষ্টা করে আমাদের হামলা করার। কিন্তু তার আগেই আমাদের আবাসনের সেরা অস্ত্রবিদেরা তৈরি হয়ে থাকে। তীর ধনুক, বর্ষা, তরোয়াল সহযোগে ওরা মোকাবিলা করে ওই শয়তানদের। প্রত্যেকটা হত্যা করে ওরা। নিজেরাও অনেকে শহীদ হয়ে যায়। শেষে প্রত্যেকটা লাশকে আমাদের ডোম ভাইয়েরা প্লাস্টিকের পরিধান পরে জ্বালিয়ে দেয়। প্লাস্টিক পরার কারণ
যাতে কোনোভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। ততক্ষণে ভোর হয়ে আসে। দেবতার খোলসের জেগে উঠতে অল্প সময় বাকি থাকে। দেবতার যদি পূর্ণ জাগরণ ঘটে তবে অনর্থ হয়ে যাবে। তাঁকে শান্ত করার উপায় বের করেছিল আমাদের একেবারে প্রথম দলের যুবকেরা অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষেরাই। আমি শোধন পূর্বক নতুন বারোজনকে জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা করে দিই। তারা সেখানে পৌঁছে সমস্ত ক্রিয়াদি সম্পন্ন করে এবং নতুন পর্যায়টিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পূর্বতন ছাত্ররা তাদের গবেষণার ফলাফল সেখানে এক সুরক্ষিত কক্ষে রেখে আসে। তার উপর ভিত্তি করে চলতে থাকে নতুন গবেষণা। আবার দলের প্রথমজন দেবতার সংস্পর্শে আসে এবং এই চক্র চলতে থাকে। আর এভাবেই আমরা আমাদের গ্রামকে এবং সমগ্র মানবজাতিকে বিনষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে আসছি। অনাদি-অনন্তকাল ধরে চলে আসছে এই পরম্পরা।
এই জঙ্গল যদি একবার উন্মুক্ত হয়ে যায় সমগ্র মানবজাতি কিছু বছরের মধ্যেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। শুধু বেঁচে থাকবে আর সমগ্র পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে এই প্রাণীগুলো। একে অপরকে খেয়ে ফেলতেও এদের কোনো দ্বিধা নেই।”
হেমন্তাইয়ের চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তিনি এই শয়তানদের প্রকৃতি বোঝাতে গিয়ে হাঁপাচ্ছেন রীতিমতো। কাঞ্চন তাকে ধরে সিঁড়ির উপর বসিয়ে দিল।
“বাবা, আরেকটু জল খাও।”
রামানুজের মুখ থেকে বেরুলো, “জম্বি!”
সকলেই ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। সিনহা বললেন, “আশ্চর্য কাহিনি! মাথা বিশ্বাস করতে চাইছে না, অথচ মন বলছে বিশ্বাস করতে।”
দাসবাবু বললেন, “এই ত্রিপুরাতে জম্বি আছে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
অজিত বললেন, “যদি তাই হয়, এই জঙ্গলকে এভাবেই ফেলে রাখা উচিত?”
রামানুজ কাঞ্চনের দিকে তাকাল। সে সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করল কাঞ্চনের উপর। কাঞ্চন এই দৃষ্টির অর্থ বোঝে। সে মাথা নেড়ে বলল, “বাবা মিথ্যে কথা বলছে না। আমার এই কাহিনি বিবৃত করার যোগ্যতা নেই। তাই আমি তোমাকে বলিনি। কিন্তু বলেছিলাম একদিন না একদিন জানতে পারবে। আসলে গ্রামবাসীর বাইরে এই কাহিনি আমরা কাউকে বলি না। কিন্তু তুমি যা শুরু করেছিলে তাতে আমার বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন তুমি এই কাহিনি জানতে পারবেই।”
রামানুজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাঞ্চনের এই বক্তব্য যে মিথ্যে নয় তা সে বুঝতে পারছে।
হেমন্তাইকে সে বিশ্বাস করে না, কিন্তু কাঞ্চনকে সে বিশ্বাস করে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বড় করে শ্বাস নিল সে।
তারপর একটা সিগরেট ধরাল।
হেমন্তাইকে প্রশ্ন করল, “জঙ্গলের কারাগারে খাবার দাবার কে পৌঁছে দেয়। যুবকেরা নিশ্চয়ই ফল-মূল খেয়ে বেঁচে থাকে না।”
হেমন্তাই উত্তরে বলে, “তা কেন! আমাদের আবাসনের একটা বিশেষ দল সবসময় ওদের সঙ্গে যোগাযোগে থাকে। যেহেতু আদিকাল থেকে এই চক্র চলে এসেছে তাই সাম্প্রতিককালে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হলেও আমরা ছাত্রদের সেটা ব্যবহারের সুযোগ দিইনি। কারণ আমরা ভয় পাই যে এই বিধি যদি একটুও পালটানো হয় হয়তো কিছু অনিষ্ট হতে পারে। আবাসনের একটা দল সবসময় সেখানে খাদ্য সরবরাহ করে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই সরবরাহ করা হয় ওদের জন্য। প্রথম কয়েক বছর যেহেতু একজন বা দু-জন মাত্র এই দেবতার সঙ্গে সংস্পর্শে থাকে তাই বাকিরা ওখানে চাষ বাসও করে কেউ কেউ। ফলে ওখানেও কিছু ফল-শাক সবজি পাওয়া যায়। তবে শেষের দিকে যখন লোকবল কমে যায়, তখন বেশিরভাগ খাদ্য গ্রাম থেকেই সরবরাহ করা হয়। ওদের যেহেতু শুদ্ধিকরণ করা হয়, তাই ওদের কাছে যে কেউ খাদ্য বা যেকোনো প্রয়োজনীয় বস্তু নিয়ে যেতে পারে না। তাই বিশেষ একটি দল এই কাজে নিযুক্ত থাকে। আর আমাদের সমস্ত বিশিষ্ট দলের প্রশিক্ষণ আমাদের
আবাসনেই দেওয়া হয়।”
রামানুজ আবার জিজ্ঞেস করে, ওরা যদি অন্য কোনো কারণে অসুস্থ বোধ করে বা মাঝপথে যদি কোনো কারণে মারা যায়!”
হেমন্তাই আবার উত্তর দেয়, “এরকম কতবার হয়েছে। সাধারণক্ষেত্রে ছোট খাটো অসুখ বিসুখে ওরা নিজেরাই চিকিৎসা করতে পারে কারণ ওদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয়। খুব গুরুতর কিছু হলে গ্রাম থেকে ডাক্তার যায় বা শহর থেকেও আসে। আমাদের কিছু নির্দিষ্ট মানুষ আছে শহরে। ওদের পরিচয় সবসময় গোপন থাকে। ওদের মাথায় কালো কাপড় পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জঙ্গলের পরীক্ষাগারে।”
রামানুজ মাথা নাড়ে, “সবটা উত্তর আপনি দেননি।”
হেমন্তাই হেসে বলে, “দিচ্ছি স্যর দিচ্ছি। যদি কেউ অন্য কোনো কারণে মারা যায়, যেমন জঙ্গলে কোনো অনুপ্রবেশকারী ঢুকল। পাহারার যে বা যারা ছিল তাদের একজন বা একাধিক ছাত্র কোনো আততায়ী আক্রমণে নিহত হলেন। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে আততায়ীরাও আর বেঁচে নেই। কারণ তাদেরও নির্মভাবে হত্যা করবে তারা। পুরো জঙ্গলে নজর রাখা হয় রাতে। এরকম ঘটনা ঘটেছিল। বেশি না, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন পূর্ববঙ্গে যাবার জন্য কিছু যুবক এই পথেই ঢুকেছিল। আচ্ছা এখানে একটা কথা বলি, আমাদের জঙ্গলে একটা আলাদা রক্ষা কবচ আছে। এটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। আমরা বানাইনি। এটা দেবতার দান। তাই এই জঙ্গলের ভিতরে বাইরের কেউ যদি প্রবেশ করে এবং তার কাছে যদি দেবতার নির্যাসে তৈরি এক প্রকার বায়ুগন্ধী বটিকা না থাকে, তবে সেই কবচ নিজে থেকে এক্টিভেট হয়ে যায়। সে যে কী জিনিস তা আপনাকে বলতে পারবো না, এতে আমার বারণ আছে। এমনকি কাঞ্চন বা সাধারণ গ্রামবাসী অব্দি জানে না সেটা কী। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলতে পারি বেশিরভাগ মানুষ ওখানেই আটকে যায়। আর এগোয় না। ওই যে কিছু যুবকের কথা বলছি যারা বাংলাদেশে বা তৎকালীন পূর্ব পাকস্তানে ঢুকবে বলে এদিকে এসেছিল
তাদের মধ্যে সবাই ওই রক্ষাকবচের সম্মুখীন হবার আগেই পালিয়ে এসেছিল।
শুধু একজন টিকে গিয়েছিল এবং কোনোপ্রকারে রক্ষাকবচ ডিঙিয়ে এগিয়েও গিয়েছিল কিছুটা।
ওখানে আমাদের এক দলের বারোজনের একজনের সঙ্গে তার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সে মারা যায় এবং আমাদের দলের একজন শহীদ হয়।
দুর্ভাগ্যবশত সে ছিল পরীক্ষাগারে কর্মরত ছাত্রটি। ফলে দু-জনকেই পরদিন চিতায় জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
ডোম ভাইয়েরা প্লাস্টিকের পোশাক পরে সে কার্য সমাধা করে। তড়িঘড়ি আবাসনের গুরুদেব, যিনি সমগ্র আবাসনের দায়িত্বে আছেন, তিনি একজন সমতুল্য ছাত্রকে তৎকালীন হেমন্তাই দ্বারা শোধন করে জঙ্গলে পাঠালেন।
শহীদ হওয়া ছাত্রের দেবতার সংস্পর্শে থাকার মেয়াদ আর একদিন বাকি ছিল তাই আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম।
নইলে সম্পূর্ণ চক্রটিতে নেমে আসতে পারত কালো অন্ধকার।
রামানুজ আর কোনো প্রশ্ন করল না। কল্যাণ সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকল।
সিনহা এবার বেশ কড়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “রক্ষা কবচটি সম্পর্কে আমাদের বলুন।”
হেমন্তাই তাকে হাত জোড় করে বললেন, “স্যর আমি কিন্তু আসামী নই। আমি নিজে থেকে দৌড়ে এসে সমস্তটা আপনাদের জানিয়েছি। যদি বলতে পারতাম আমি নিশ্চয়ই আপনাদের বলে সাহায্য করতাম। ভুলবেন না, আমি এখনও গ্রামের হেমন্তাই। আর যতক্ষণ না আমি ক্রিয়া সম্পন্ন করব আর কেউ হেমন্তাই হতে পারবে না বা আমি চাইলেও কাউকে সমস্ত ক্রিয়াদি বুঝিয়ে দিতে পারব না। হ্যাঁ, আমি যখন আর হেমন্তাই থাকব না আমি নিশ্চয়ই আপনাদের এ ব্যপারে বলতে পারব। আমি আপনাদের এই কথা বললে যদি আমার শক্তি হ্রাস হয়, আর আমি পরবর্তী ছাত্রের দলকে স্বসম্মানে শোধন করে জঙ্গলে না পাঠাতে পারি, তবে আমি আমার গ্রামের কাউকে মুখ দেখাতে পারবো না। নিজের নিজেকে হত্যা করব সেক্ষেত্রে। অন্যায় অনুরোধ বা আদেশ আমাকে করবেন না।”
সিনহা সাহেব ক্ষুণ্ণ হলেও ব্যপারটার গুরুত্ব বুঝতে পারলেম। নিরস্ত্র হলেন তিনি।
আর তখনই রামানুজের মাথায় প্রশ্নটা এল, “হেমন্তাই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা কী?”
“মাপ করবেন, সেটাও আমি বলতে পারবো না। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলতে পারি যে একজন হেমন্তাই তার আত্মীকরণ প্রক্রিয়ার কারণে সংক্রামিত হবার পরেও প্রায় পাঁচ বছর অব্দি সুস্থভাবে বাঁচতে পারে। আর এই কার্য একজন নারী ছাড়া সম্ভব হয় না। আবাসনে বারোজন নরের সমান একজন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই নারীই পরবর্তী হেমন্তাই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।”
“যে কেউ কি হেমন্তাই হতে পারেন?”
দাসবাবু এবার জিজ্ঞেস করলেন। হেমন্তাই এবারেও সপ্রতিভ উত্তর দিলেন, “যিনি তার শরীরে হেমন্তাই হবার শক্তি ধারণ করতে পারেন। তিনিই হতে পারেন। সেটা যে কেউ হতে পারে।”
রামানুজ হেমন্তাইয়ের কথা শেষ হওয়া মাত্র এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “অনেক বড় উপকার করলেন। আপনাকে ভুল ভেবেছিলাম। দুঃখিত!”
হেমন্তাই রামানুজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা দু-হাতে চেপে ধরল। বলল, “শুধু আমার ছেলেটার জন্য আজ এসব করলাম। শুধু ওকে একটু দেখে রাখবেন আপনারা। গ্রামবাসীরা ওকে পেলে মেরে ফেলবে।”
হেমন্তাইয়ের চোখে জলের ফোঁটা রামানুজের হাতেও অল্প পড়ল। হেমন্তাই দ্রুত নিজেকে সংবরণ করলেন।
রামানুজ অপর হাত দিয়ে তার হাত ধরে একটা ভরসার ঝাঁকুনি দিল।
রামানুজ শেষবারের মতো একটা কথা জিজ্ঞেস করল তাঁকে, “আপনারা সকলে বিখ্যাত চন্দ্র বংশীয় তাই না! নাহলে উপজাতি হয়েও হিন্দু দেবদেবীর পুজো আর কেউ করে বলে শুনিনি আমি।”
হেমন্তাই শুকনো হাসলেন। উত্তর দিলেন না। তারপর তিনি কাঞ্চনের
মাথায় হাত রেখে আদর করে এবং বাকি সবাইকে হাত জোড় করে প্রণাম করে সামনে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন।
দাসবাবু বললেন, “চলুন, ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের ভোগ নেওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
সিনহা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “অর্ধেক রহস্যের সমাধান তো এখানে আসামাত্রই হয়ে গেল। জয় ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের জয়।”
বাকিরাও ধ্বনী তুলল, “জয় মা, জয় মা।”
রামানুজ শুধু ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারছিল যে এতদিনে এবার যুদ্ধ শুরু হবে।
