Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ২ – সৌরভ চক্রবর্তী

ব্রহ্মপদার্থ – ১

(১)

মুহূর্মুহূ ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে মন্দির প্রাঙ্গন থেকে। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এই ঘণ্টাধ্বনি জানান দিচ্ছে যে সময় এগিয়ে এসেছে। পাহারা আরও কড়া হওয়া চাই।

শহরে বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শহরবাসী অন্ধকারে বসে অপেক্ষা করছে। সকলের কানে পৌঁছে যাচ্ছে ঘণ্টাধ্বনি। ছোটো শহর, তাই শব্দ পৌঁছোতে কোনো বাধা পাচ্ছে না। শহরের যান চলাচল আজ ব্যহত। বেশ রাত হয়েছে। ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করে আজ আর কেউই রাস্তায় নামবে না। আর তাছাড়া দৈবদুর্বিপাকে পড়ার ভয়ও আছে সকলের মনে।

মন্দিরের বাইরের সমস্ত অংশ সিআরপিএফ দখল নিয়ে ফেলেছে। একটা পিঁপড়েও জওয়ানদের অনুমতি ছাড়া মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রশাসন এই বিশেষ দিনটিতে কোনো প্রকার গাফিলতি বরদাস্ত করে না। তাই আজ সকলেই তটস্থ। ক্রমাগত টহলদারি চলছে।

মন্দিরের পুরোহিত আর পাণ্ডারা গর্ভগৃহের বাইরে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রধান কারিগর এখন কার্যালয় কক্ষে প্রবেশ

করেছেন। তাঁর আসার জন্যই সকলে অপেক্ষা করছেন। গর্ভগৃহে এখন কেউ নেই। বিগ্রহ সেখানে একা।

মন্দিরের দায়িত্বে যিনি রয়েছেন তিনি এবার কার্যালয় কক্ষের দিকে রওনা দিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন মহারাজ রয়েছেন। কার্যালয় কক্ষে যাবার পথে ওঁরা পূর্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করলেন সোনাকুয়া অঞ্চল। উত্তরদিকের প্রবেশপথ থেকে হস্তীদ্বারের কাছে এই সোনাকুয়া অবস্থিত। স্নানযাত্রার দিন এই কুয়া ব্যবহার করা হয়। পাহারা অটুট আছে এই অঞ্চলে। মন্দিরের দক্ষিণদিকে রয়েছে কল্পবট। মন্দিরের দক্ষিণদিকে রয়েছে এই বট। সেখানেও পাহারা নিশ্ছিদ্র।

বাইশপাহাচ অর্থাৎ বাইরের ও ভেতরের প্রাচীর পর্যন্ত যে বাইশটি সিঁড়ির ধাপ রয়েছে তার প্রতি ধাপে একজন সি আর পি এফ জওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। ওইদিক দিয়ে কারও আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মহারাজ ওইদিকে একবার দূর থেকে দৃকপাত করে এগিয়ে গেলেন। মুক্তিমণ্ডপের ষোলো স্তম্ভ পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন মুখশালার দিকে। এদিকে প্রধান মন্দিরের থেকে সরলরেখায় এসে পাশে রয়েছে একটি সভাঘর। এর চারটি দ্বার রয়েছে। কালঘাট দ্বার থেকে পথ গিয়েছে মন্দিরের গর্ভগৃহের দিকে। দক্ষিণদ্বার মন্দিরের বাইরে যাবার পথ। উত্তরদ্বার দিয়ে এলে পৌঁছোনো যাবে রত্নভাণ্ডারে। এই সমস্ত স্থানে পর্যাপ্ত পান্ডা বিদ্যমান।

প্রধান মহারাজ আশ্বস্ত হলেন। নাটমন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। গর্ভগৃহের সামনে এটি একটি সুপ্রশস্ত গৃহ, লম্বায় একুশ মিটার চওড়ায় সতেরো মিটার। সেখানে রয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তি। তিনি সেখান থেকে বিগ্রহ দর্শন করছেন। সেখান থেকে পাশ কাটিয়ে ভোগ মন্দিরের দিকে এগোলেন সবাই। সেখানেই এক অস্থায়ী কার্যালয় বানানো হয়েছে এই বিশেষ দিনের জন্য।

কক্ষের বাইরে এসে প্রধান মহারাজ বাকিদের বাইরে অপেক্ষা করার ইঙ্গিত দিলেন। নিজে প্রবেশ করলেন কার্যালয়ে। ভেতরে গিয়ে দেখলেন প্রধান কারিগর একটি বেতের চেয়ারে বসে আছেন। মুখ তাঁর গম্ভীর। প্রধান মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? আপনাকে এত গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন?”

প্রধান মহারাজ যে ঘরে এসেছেন তা প্রধান কারিগর দেখেননি। তাই সশব্দে নড়েচড়ে বসলেন, “কে…কে?” তারপর প্রধান মহারাজজি-কে দেখে ধাতস্থ হলেন। বললেন, “ও, আপনি?”

প্রধান মহারাজজি বললেন, “আর নাহলে কে ঢুকবে বলুন? আজ তো একটা পিঁপড়েকেও বোধহয় অনুমতিপত্র নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু আপনার হয়েছেটা কী?”

এই প্রশ্নে প্রধান কারিগরকে বিহ্বল দেখায়। তিনি মুখে বলেন, “এবার বিশেষ। আর তো বিগ্রহের এত কাছে আসা হবে না। এত বছরের কত স্মৃতি যে মাথায় ভেসে বেড়াচ্ছে! কোন্টা ছেড়ে কোন্টা বলি! মহারাজ ইন্দ্রদুম্নের পরিবারের অংশ হিসেবে সেই কোন্ ছোটোবেলা থেকে এই দিনটা দেখে চলেছি। কতবার যে বিগ্রহ পরিবর্তনের দিন এল আর গেল। কালে কালে আমি নিজেও দু-বার বিগ্রহ তৈরি করে ফেললাম দারুব্রহ্ম দিয়ে। আজকেও যখন বিগ্রহ তৈরি শেষ করে দারুব্রহ্মের টুকরোগুলো সরিয়ে রাখছিলাম, মনে হচ্ছিল এই বিচ্ছেদ যেন অনাদি অনন্তকালের জন্য হচ্ছে। কবে বুড়ো হয়ে গেলাম বুঝতেই পারলাম না, জগন্নাথ এখনও সেই আমার ছোটোবেলার মতো উজ্জ্বল শতামবর্ণে চিরনবীন হয়ে আছেন। জয় জগন্নাথ।”

প্রধান কারিগর দুই হাত জোড় করে জগন্নাথের উদ্দেশে প্রণাম করলেন। প্রধান মহারাজজি বুঝতে পারলেন যে তিনি বিহ্বল হয়ে আছেন। স্মিত হেসে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “আবেগ, দাদা আপনাকে এখন আবেগ দিয়েছেন। এই আবেগ যাত্রার আনন্দ নিন। আর সেই সঙ্গে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা বাকি আছে সেই কাজের জন্য তৈরি হয়ে পড়ুন। এই নিন।”

প্রধান কারিগর দেখলেন মহারাজজি তাঁর দিকে এক জোড়া দস্তানা এগিয়ে দিচ্ছেন। তিনি যখন আবেগী হয়ে কথা বলছিলেন তখন প্রধান মহারাজজি মোমের আলো সম্বল করে বিশেষভাবে রক্ষিত বাক্স থেকে এই দস্তানা বের করছিলেন। প্রধান কারিগর বৃদ্ধ হয়েছেন, এখন আর আগের মতো সবদিকে লক্ষ রাখতে পারেন না। দস্তানা জোড়া হাতে নিয়ে বললেন, “দেখুন তো মহারাজজি, এই দস্তানার জন্যই এতক্ষণ বসেছিলাম। অথচ আপনি আসার পর দস্তানা চেয়ে নেওয়ার কথা মনেই ছিল না।”

প্রধান মহারাজ স্মিত হাসলেন। হাত দিয়ে কার্যালয়ের বাইরে বেরোবার ইঙ্গিত করলেন। কারিগর উঠে দাঁড়ালেন। বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। বাইরে এসে দেখলেন মন্দিরের বহু পাণ্ডা, মহারাজ কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। সমস্ত মন্দির প্রাঙ্গনে জ্বলছে মোম। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মোমশোভিত এই মন্দির প্রাঙ্গন। ঠিক যেন জোনাকিরা আগুনরঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে সমস্ত শ্রীক্ষেত্র। অল্প অল্প বাতাস বইছে। তাতে মোমবাতির শিখাগুলো ঈষৎ কৌণিকভাবে কাঁপছে। কিন্তু নিভে যাচ্ছে না।

প্রধান কারিগর তাঁর কাঁধে হাতের ছোঁয়া পেলেন। ফিরে দেখলেন প্রধান মহারাজজি এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

“চলুন। আপনি সামনে চলুন আমরা পেছনে আপনাকে অনুসরণ করছি।” কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে পান্ডা ও মহারাজ সকলে মিলে দুই ভাগে ভাগ হয়ে দু-টি সমান্তরাল শ্রেণি তৈরি করল। মাঝখান দিয়ে যে পথ রচিত হল, তা ধরে এগিয়ে গেলেন প্রধান কারিগর, তাঁর পেছনে প্রধান মহারাজ। যাবার পথে ধীরে ধীরে নিজের দু-হাতে দুটো দস্তানা পরে নিলেন কারিগর। এবারেই সেই ব্রাহ্ম মুহূর্ত উপস্থিত। এই ত্রিভুবনে একমাত্র তিনিই আবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে চলেছেন। অতিদুর্লভ পদার্থটির স্পর্শ পাবার জন্য বিধাতা আবার তাঁকেই চয়ন করেছেন। হয়তো শেষবারের মতো, তবুও এই স্পর্শ তিনি আজীবন বয়ে নিয়ে চলবেন।

ধীরে ধীরে সকলে এসে উপস্থিত হল প্রধান মন্দিরের সামনে। তারপরেই গর্ভগৃহ শুরু। প্রধান মহারাজজি এগিয়ে এলেন কারিগরের কাছে, “এবার আপনার এগিয়ে যাবার পালা। আমরা বাইরে অপেক্ষা করব।”

প্রধান কারিগর মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “আমি ভেতরে গিয়ে একবার শঙ্খ ফুৎকার দেব। পরের কিছু মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত মোমবাতি আপনারা নিভিয়ে ফেলবেন। নইলে বিপদ হতে পারে।”

প্রধান মহারাজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর হাত পাতলেন। পাশ থেকে একজন পাণ্ডা একটা থালা নিয়ে এগিয়ে এলেন। থালার উপরে লাল মখমলের উপর একটি কালো কাপড় ও তুলো রাখা ছিল। প্রধান মহারাজ সেগুলো দুই হাতে তুলে নিলেন। তারপর প্রধান কারিগরের মাথায় পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কারিগরের দুই চোখে প্রথমে তুলো দিলেন। তারপর কালো কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন তাঁর চোখ। মুখে জিগ্যেস করলেন, “কিছু দেখা যাচ্ছে না তো?”

প্রধান কারিগর সবাইকে অবাক করে উল্লাসে ফেটে পড়লেন। তারপর বললেন, “সব দেখতে পাচ্ছি মহারাজজি। মনের চোখ দিয়ে সব দেখতে পাচ্ছি। ওই দৃষ্টিতেই এবার বাকি কার্য সমাপন করব।”

প্রথমে একটু অবাক হলেও পূর্ণাঙ্গ উত্তর শেষে মহারাজজির মুখেও হাসি ফুটল। বাকিরাও আমোদ পেলেন। প্রধান মহারাজজি চিৎকার করে বলে উঠলেন, “জয় জগন্নাথ।”

আকাশ-পাতাল বিদীর্ণ করে সকলে সমবেত কণ্ঠে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল,

“জয় জগন্নাথ।”

“জয় জগন্নাথ।”

“জয় জগন্নাথ।”

শহরের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল এই জয়ধ্বনি। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলেন মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। বয়স্করা নিজ নিজ ঘরে জগন্নাথের মূর্তির সামনে গিয়ে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে ভগবানের নাম সংকীর্তন করতে লাগলেন।

জয়ধ্বনির মাঝে চোখে কাপড় দিয়ে গর্ভগৃহের দিকে এগিয়ে গেলেন প্রধান কারিগর। শ্রীবিগ্রহ কত পা দূরে অবস্থিত সে মাপ তিনি বিলক্ষণ জানেন। বাইরে থেকে সকলে দেখল প্রধান কারিগর অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছেন। মাপ মতো পা ফেলে ঠিক শ্রীবিগ্রহের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন তিনি।

এখন আর গর্ভগৃহে কেউ নেই। শুধু প্রধান কারিগর আর শ্রীবিগ্রহ। বাঁ-দিকে শ্রীবলদেব, মাঝে সুভদ্রা দেবী এবং তাঁর ডানদিকে শ্রীজগন্নাথদেব। নতুন মূর্তিগুলো ইতিমধ্যে যথাস্থানে বসিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এখন শুধু প্রাণ প্রতিষ্ঠার পালা। কঠিনতম কাজ, অথচ কী মধুর এই উপলব্ধি!

আজ নবকলেবরের দিন। জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীকে বিগত কিছুদিন ধরে দিন রাত পরিশ্রম করে সুন্দর করে তৈরি করেছেন তিনি। দারু খোদাই করে নতুন শ্রীবিগ্রহ তৈরি করা হয়ে গেছে। পুরোনো বিগ্রহগুলো পাশেই রাখা আছে এখনও। আজকের পর পুরোনো বিগ্রহগুলোর স্থান হবে মন্দিরের পশ্চিমভাগে বাইরের ও ভেতরের প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে, কোইলা বৈকুণ্ঠে। বছরের পর বছর পুরোনো বিগ্রহগুলো এই কোইলা বৈকুণ্ঠেই মাটিতে প্রোথিত করার প্রথা চলে আসছে। আজকেও তাই হবে।

প্রধান কারিগর নতুন শ্রীবিগ্রহের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। চর্মচক্ষে অন্ধকার দেখছেন তিনি। কিন্তু মানসচক্ষে তিনি দেখছেন একটা প্রস্ফুটিত আলোক বলয়। সেই বলয়ের ঠিক মাঝখান থেকে উদয় হচ্ছেন জগন্নাথদেব, সুভদ্রা ও বলদেব। ধীরে ধীরে দেবতারা এগিয়ে আসছেন তাঁর দিকে। এই দৃশ্য কল্পনা করে তাঁর চোখ ভিজে উঠল। কালো কাপড় চোখের জল শুষে নিল নিমেষে। শুধু চোখের কোণায় একটু চটচটে ঠান্ডা হাওয়ার ধাক্কা খেলেন তিনি। এক লহমার ভগ্নাংশে এসেই অনুভূতিও বিলুপ্ত হল।

আর দেরি করা উচিৎ হবে না। তিনি তিন কদম বাঁ-দিকে সরে এসে ঘণ্টাধ্বনি করলেন। আর এই ঘণ্টাধ্বনি শোনা মাত্র বাইরে সকলে তৎপর হয়ে উঠল। মন্দির প্রাঙ্গনে লাগানো সমস্ত মোমবাতির আলো নেভাতে শুরু করল সকলে। একটি মোমবাতিও জ্বালিয়ে রাখা চলবে না। বিশেষ হাত চালিত যন্ত্রের মাধ্যমে মন্দিরের উপরের দিকে লাগানো মোমবাতির আলোও নিভিয়ে দিতে সবাই তৎপর হল।

বাইরে যখন এসব চলছে তখন গর্ভগৃহে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রধান কারিগর। এমতাবস্থায় কিছুসময় কাটল। তারপর তিনি ডানদিকে ঘুরলেন। নির্দিষ্ট ব্যবধানে পা ফেলে পনেরো পা এগোলেন। হাত বাড়াতেই পুরোনো বিগ্রহের গায়ে হাত ঠেকল তাঁর। ইনি বলদেব। আরও সাত পা ডানদিকে ঘুরতেই শ্রী জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ পেলেন তিনি। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বসে পড়লেন গর্ভগৃহের মেঝেতে। ঠিক এখানেই হিসেব মতো থাকার কথা হাতুড়ি আর বাটালি। মেঝেতে বসে বাঁ-দিকে খুঁজতেই কারিগর খুঁজে পেলেন নিজের হাতুড়ি-বাটালি। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। ওখানেই রাখা পাটাতনের কয়েক ধাপ উপরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর জগন্নাথদেবের বুকের বাঁ-দিকে হাত দিয়ে খুঁজতে লাগলেন। জগন্নাথদেবের হৃদয় প্রকোষ্ঠ খুঁজে পেতে কষ্ট হল না। গোল মতো প্রকোষ্ঠ শক্তভাবে জোড়া দেওয়া হয়েছে দারুব্রহ্মের কাঠামো দিয়ে। কারিগর সেই জায়গায় বাটালি বসিয়ে হাতুড়ির এক ঘা দিতেই সেই বজ্র আঁটুনি অনেকটাই ঢিলে হয়ে এল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গর্ভগৃহে ফুটে উঠল এক সূচিসূক্ষ্ম নীল আলো। জগন্নাথদেবের

বুকের বাঁ-দিকের প্রকোষ্ঠ থেকে এই আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। কারিগর আবার আঘাত করলেন। জোড়া অংশ আরও ঢিলে হল, আলোর প্রকাশ আরও তীব্র হল। কারিগর যত দ্রুত জোড়া অংশটি ভেদ করতে লাগলেন প্রকোষ্ঠ ততই উন্মুক্ত হতে থাকল, আর গর্ভগৃহ ততই নীল আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকল।

একসময় দারু ব্রহ্মের গোলাকার তাপ্পি খুলে গেল। কারিগর হাতুড়ির এই শেষ আঘাতের পর কেঁপে উঠলেন। সম্পূর্ণ গর্ভগৃহ অদ্ভুত এক আলোয় ভাসমান। অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো।

প্রধান কারিগর কাঁপা কাঁপা হাতে হাতুড়ি বাটালি নামিয়ে রাখলেন। তারপর দস্তানা পরা হাত ঢুকিয়ে দিলেন জগন্নাথ দেবের হৃদয় প্রকোষ্ঠে। বেশ কিছুটা গভীরে হাত দেওয়ার পর বস্তুটি তাঁর আঙুলে ঠেকল। কারিগর সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত বের করে আনলেন। বস্তুটি রয়ে গেল জগন্নাথদেবের বুকের ভেতরেই। কারিগর নিজের নার্ভ ধরে রাখতে পারছেন না। নিজেকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করলেন তিনি। বার দুয়েক অন্ধকারের এদিকে-ওদিকে হাঁটলেন। এই অবস্থাতেও মাথা কাজ করছে তাঁর। গুনে গুনে পা ফেলে পায়চারি করলেন যাতে বিগ্রহের কাছে সঠিক জায়গায় ফিরতে অসুবিধে না হয়। নিজেকে বোঝালেন যে এই কাজ সেই বাল্যকাল থেকে দেখে এসেছেন তিনি, তার পক্ষে এই কাজ করা এতটাও দুরূহ নয়। জগন্নাথের হৃদয়ে হাত দেওয়ার ফলস্বরূপ নিজের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে তাঁর। কর্ণপটহের মাধ্যমে সেই শব্দ এসে সম্পূর্ণ অন্তঃকরণে ধ্বনিত হচ্ছে তাঁর।

ধীরে ধীরে নিজেকে সংযত করলেন তিনি। আবার এগিয়ে গেলেন পুরোনো বিগ্রহের দিকে। এবার যথাসম্ভব মনোযোগ দিয়ে হাত ঢোকালেন জগন্নাথদেবের হৃদয় প্রকোষ্ঠে। হাত গভীরে প্রবেশ করাতেই আবার হাতে ঠেকল বস্তুটি, যা থেকে নীল রশ্মি ক্রমাগত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। প্রধান কারিগর খুব সাবধানে বস্তুটিকে বের করে আনলেন। তিনি বস্তুটিকে দু-হাতে ধরে আছেন। দস্তানার ভেতরে তাঁর আঙুলগুলো অনুভব করছে এক অদ্ভুত শক্তি। বস্তুটি মুহুর্মুহু কাঁপছে। সংকোচিত হচ্ছে আবার যেন প্রসারিত হচ্ছে।

সম্পূর্ণ গর্ভগৃহ এখন আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। নীল আলো যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসে ধুইয়ে দিচ্ছে এই ধরা। আর ঠিক এই সময়েই গর্ভগৃহের বাইরের অংশ ঢাকা পড়েছে নিশ্চিদ্র অন্ধকারে। একটি আলোর উৎসেও এখন প্রাণ নেই। অথচ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পান্ডা আর মহারাজ দেখতে পাচ্ছেন রুদ্ধ গর্ভগৃহ থেকে একটি অদ্ভুত নীল আলোক রশ্মি ঠিকরে বেরোচ্ছে।

প্রধান মহারাজ এই দৃশ্য দেখা মাত্র দুই হাত উপর তুলে উল্লাসে ফেটে পড়লেন, “জয় জগন্নাথ।” সঙ্গে সঙ্গে রোল উঠল। “জয় জগন্নাথ। জয় জগন্নাথ।”

বাইরে অপেক্ষারত একদল পাণ্ডা খোল-করতাল বাজাতে শুরু করলেন। মুহূর্তের মধ্যে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল। একদল মহারাজ ঘণ্টাধ্বনি করতে লাগলেন। শহরে সেই শব্দ পৌঁছোতে দেরি হল না। সকলে মিলে একত্রে জয়ধ্বনি করতে লাগলেন, “জয় জগন্নাথ-জয় বলদেব-জয় সুভদ্রা।”

এসবের মধ্যেই পা মেপে মেপে প্রধান কারিগর এগোতে লাগলেন নতুন শ্রীবিগ্রহের দিকে। নতুন শ্রীবিগ্রহের সামনে লোহার শক্ত মই লাগানো রয়েছে। প্রধান কারিগর এগিয়ে গেলেন সেই মইয়ের দিকে।

কথিত আছে কলিযুগে দেব ও রাক্ষস একই দেহে অবস্থান করে। প্রধান কারিগরের মনের অদম্য কৌতূহল রাক্ষসরূপে আক্রমণ করল। সমস্ত অবচেতন জুড়ে তাঁর মনে হতে লাগল এই তো শেষ। আর তো সুযোগ আসবে না। আজ সারাদিন তিনি যে কারণে বিহ্বল ছিলেন ঠিক সেই কারণেই এখন তাঁর মনে দূরভিসন্ধিমূলক বিচার আসতে লাগল। তার মনে হল এই বস্তুটি এখনই তাঁর দর্শন করা প্রয়োজন। এই পৃথিবীর কেউ কখনও এই বস্তু দেখেনি। বলা হয় এই বস্তুতেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তি। এই বস্তুকে ঘিরেই পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে কত শত কিংবদন্তি।

আজ সেই বস্তুটি শেষবারের মতো তাঁর হাতে। আর তো কখনও এই সুযোগ আসবে না। আজ বরং এই বস্তু দর্শনে জীবন ধন্য হোক। তাতে যদি চোখ ঝলসে যায় তো যাক।

এসব ভাবতে ভাবতেই প্রধান কারিগরের মুখে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি। এ হাসি লোভের, এ হাসি ক্রুরতার, এ হাসি পাপের। প্রধান কারিগরের হাতে তখন কাঁপছে সেই বস্তুটি। বারবার সংকোচিত প্রসারিত হচ্ছে। উৎপন্ন হচ্ছে শক্তি।

প্রধান কারিগর বস্তুটিকে এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে নিজের চোখের উপর রাখা কাপড়টি ধরল। এক হ্যাঁচকা টান দিলেই খুলে যাবে পর্দা। দেখা যাবে সমস্ত দৃশ্য। কেউ জানতেও পারবে না।

নিজের মাথার পেছনে রাখা গিঁটটিতে হাত দিলেন প্রধান কারিগর। আর তখনই বাইরে প্রধান মহারাজজি জয়ধ্বনি দিলেন, “জয় শ্রী কৃষ্ণ।”

শহর জুড়ে যেন এই জয়ধ্বনি ফিরে এল। গমগম করে উঠল আকাশ বাতাস। পাতাল অবধি পৌঁছে গেল শ্রী কৃষ্ণের নামের ধ্বনি।

প্রধান কারিগরের সংবিৎ ফিরল। একই দেহের মধ্যে রাক্ষসভাবের উপর দেবভাবের বিস্তার শুরু হল। কারিগরের মাথা ঝুঁকে গেল। তিনি এ কী অনর্থ করতে চলেছিলেন!

আর কালবিলম্ব না করে তিনি মই ধরে উঠে পড়লেন। ডানদিকে হাসিমুখে বিরাজমান শ্রী জগন্নাথ দেব। তাঁর হৃদয় প্রকোষ্ঠে বস্তুটিকে স্থাপন করা হল। গর্ভগৃহের ভেতর থেকে ঘণ্টাধ্বনি করলেন প্রধান কারিগর। বাইরে প্রধান মহারাজ এই ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন। শঙ্খধ্বনি শুরু হল। মহারাজ আর পাণ্ডারা নৃত্য করতে থাকলেন।

নবকলেবর শুরু হল। কিংবদন্তি অনুযায়ী শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় যা এখনও নষ্ট হয়ে যায়নি, তা প্রতি বারো বছর অন্তর নতুন জগন্নাথদেবের বিগ্রহে

প্রোথিত হল। কালের পর কাল এই প্রথা চলে আসছে। শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় এই পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী যন্ত্র, যা এখনও রক্ষিত আছে জগন্নাথের মূর্তির ভেতরে। এটাই সেই ব্রহ্মপদার্থ যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অসীম শক্তি।

প্রধান কারিগর জগন্নাথদেবের হৃদয় প্রকোষ্ঠ দারুব্রহ্মের গোলাকার চাকতি দিয়ে বন্ধ করলেন। আগামী বারো বছর এই শ্রীবিগ্রহই পূজিত হবে জগন্নাথ পুরী ধামে। জয় জগন্নাথ।