Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ২ – সৌরভ চক্রবর্তী

ব্রহ্মপদার্থ – ১২

(১২)

একটা ভগ্নাবশেষের মধ্যে এসে হাজির হয়েছে সবাই। এখানে একটা পরীক্ষাগার ছিল এতটুকু বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর বেশি কিছুই না। সমস্ত বৈজ্ঞানিক পুঁথি, জারে সংরক্ষিত ভিনগ্রহী জীবদের দেহ, প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন আবিষ্কার কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে নিয়ে চলে গেছে। পড়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরো, উপড়ে ফেলা পার্টিশন, মেঝেতে থইথই করছে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ।

ঠাকুরদা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। তাঁর নাতিদের মধ্যে যারা বাধা দিতে এসেছিল তাদের গতিও যে খুব একটা ভালো হয়নি তা বোঝা গেল লিফটের মাধ্যমে উপরে এসে।

সবাই যখন পরীক্ষাগারের ভাঙচুর এবং তথ্য চুরিকেই শেষ পরিণতি ভেবে ফেলেছিলেন ঠিক তখনই সবাই উপরে উঠে এসে যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে তাদের আত্মায় কম্পন ধরল। ইহজীবনে তারা এই দৃশ্য ভুলতে পারবেন না।

যেসব নাতিরা বাধা দিতে এসেছিল অধিকাংশদের কৈটভ আর কৈটভ বাহিনী মেরে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। ঠাকুরদার মনোহর উদ্যানের প্রতিটি গাছে গিজগিজ করছে ঝুলন্ত লাশ। প্রত্যেকের পরনে সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবি। এ এক ভয়ংকর দৃশ্য।

ঠাকুরদা শোকে পাথর হয়ে মাটিতে বসে আছেন। তার মাথা কোলে নিয়ে রেখেছেন গুরুদেব। রামানুজসহ সমস্ত আওময়াত ফোর্স কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আছে।

কী করা উচিৎ, কী বলা উচিৎ কারো মাথায় কিছুই আসছে না। ঘটনাটা এতটাই আচমকা ঘটেছে যে স্বাভাবিকভাবেই মাথা কাজ করছে না।

আর ঠিক তখনই শব্দটা হল। সকলেই শব্দের উৎসের দিকে তাকাল।

আবার কেউ আসছে সময়-যানের মাধ্যমে।

সময়-যানটা সিনহা সাহেব যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঠিক সেখানেই এসে অবতরণ করল। তার থেকে বেরিয়ে এল কৈটভ।

তার গেরুয়া পোশাকে লেগে আছে চাপ চাপ রক্ত। তার রূপ এখন চণ্ডালের মতো।

সে এসে কাউকে কোনো সুযোগ না দিয়ে সোজা রামানুজের দিকে তাকাল।

এই হিমশীতল দৃষ্টিতে রামানুজ অবধি কয়েক মুহূর্তের জন্য ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।

“তুই কী করে এসেছিস আমার অতীতে?”

রামানুজ এবার বুঝল কৈটভের ক্রোধের কারণ। সে শুধু বলল, “যা করেছি ঠিক করেছি।”

কৈটভ এবার পুরো চণ্ডাল হয়ে গেল। সে তীব্র গতিতে এগিয়ে গেল রামানুজের দিকে। সিনহা সেটা দেখে কৈটভকে বাধা দিতে গেলেন।

কৈটভ এক মুহূর্ত সময় নিল না। সিনহার মাথা-সহ মেরুদণ্ডটা ছিঁড়ে ফেলল। উপস্থিত সবাই বুঝে উঠার আগেই ঘটনাটা ঘটল।

সিনহা শব্দ করার সুযোগ অবধি পেলেন না। রামানুজ মাটিতে বসে পড়ল এই ঘটনা দেখে। সঙ্গে সঙ্গে একটা বোতাম টিপল কৈটভ।

সঙ্গে সঙ্গে সে স্বচ্ছ বস্তুতে পরিণত হল। ফোর্স ফায়ার করতে উদ্যত হয়েছিল। এক আধজন ফায়ার শুরু করেছিল।

ঠাকুরদা চিৎকার করে বললেন, “কেউ গুলি চালিও না। সে ট্রান্সপেরোমিটার ব্যবহার করেছে। গুলি কৈটভের গায়ে লাগবে না। গুলি এসে আমাদের গায়ে লাগবে।”

রামানুজের গলা ভেসে গিয়েছিল। সে কোনোক্রমে চিৎকার করে বলল, “স্টপ ফায়ারিং। স্টপ ফায়ারিং।”

দু-একটা গুলি যে বেরিয়েছিল তার একটা গিয়ে লাগল কাঞ্চনের গায়ে। কৈটভ ততক্ষণে রামানুজের মুখোমুখি চলে এসেছে।

মাটিতে বসে পড়া রামানুজের সামনে হিংস্র বিকৃত মুখ নিয়ে এগিয়ে সে বলল, “২০১১ সালে শিক্ষার্থী কৈটভকে গলা কেটে মারা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে আমার মা-বাবাকে বিয়ের আগের দিন বাড়ি থেকে ডেকে এনে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছে। আমি তোমার সমস্ত কিছু কেড়ে নেব রামানুজ। এই যুদ্ধটা আমার লোভের যুদ্ধ ছিল। আজ থেকে এই কাহিনি আমার প্রতিশোধেরও।”

কথাটা শেষ করেই কৈটভ আবার সময়-যানকে আহ্বান দিল। রামানুজ দেখতে পেল কৈটভের চোখে জল।

সেই জল তার মুখে লেগে থাকা রক্তের দাগের সঙ্গে মিশে গাল বেয়ে নামছে। রামানুজ এই প্রথমবার ভেতর থেকে কেঁপে গেল।

কৈটভ যা বলছে সেই সিদ্ধান্ত সে নেয়নি। শিক্ষার্থী কৈটভ বা কৈটভের মা-বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা তার ছিল না। কৈটভ ভুল বুঝেছে।

সে কিছু বলার আগেই কৈটভ সময়-যানে চড়ে বসল। তাঁর চোখে মৃত্যুশোক আর প্রতিশোধ স্পষ্ট। কৈটভকে নিয়ে সময়-যান অদৃশ্য হল।

অফিসার সিনহার দুই টুকরো দু-দিকে ফেলে রেখে চলে গেল কৈটভ। গাছে ঝুলছে কতকগুলো লাশ। চারদিকে এক মৃত্যু উপত্যকা।

রামানুজ এই মৃত্যু উপত্যকায় বসে আছে। কেউ মারা গেছে, কেউ মরতে বসেছে, কেউ হারিয়ে ফেলেছে এক জীবনের সমস্ত রসদ, কেউ হারিয়েছে জীবনের মূল্যবান জিনিস।

রামানুজ জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে। রামানুজ শুধু লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

এবারে আর শুধু জঙ্গল নয়, মৃতকৈটভের অভিযান পৌঁছে গেছে পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে। ব্রহ্মপদার্থ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বস্তু। সেই বস্তুর সন্ধান যতটা জটিল তার থেকে বেশি জটিল এই যাত্রাপথ। রামানুজের সামনে এবার কঠিন প্রতিপক্ষ। কৈটভের সঙ্গে কর্কট এসে জুটেছে। কে এই কর্কট? কেন সে এতোটাই ভয়ঙ্কর? আর গন্দবেরুন্দা দেবতাই বা কোথায়? আবার কি দেবতা জেগে উঠবেন? নাকি এবার শয়তানের জেগে উঠার পালা? উত্তর খুঁজেছেন লেখক সৌরভ চক্রবর্তী, আপনারাও এই রহস্যাবৃত যাত্রাপথের সঙ্গী হয়ে পড়ুন।

***