ব্রহ্মপদার্থ – ২
(২)
বেশ কয়েকটা ঈগল আকাশে উড়ছে। জঙ্গল এইদিকটায় অত্যন্ত ঘন। গাছের উঁচু উঁচু মাথাগুলো ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে সূর্যালোক প্রায় ঢুকতেই দেয় না। হেমন্তাইয়ের জঙ্গলের সীমানা থেকে এই জঙ্গল প্রায় একশো কিলোমটার গভীরে। এইদিকে ত্রিপুরার রাজ্যবাসী দূরের কথা, ফরেস্ট অফিসারদের কেউই আসেন না। ক্বচিৎ যদিও-বা কেউ আসেন, এত গভীরে প্রবেশ করেন না।
একটা ছোটো কুটির দেখা যাচ্ছে। বেতের বেড়া দিয়ে বানানো ছোটো কুঁড়ে ঘর। মাটির দাওয়া, টিনের চাল।
কুটিরের ভেতরে একজন বসে আছেন। টেবিলে বসে তিনি কিছু একটা কাজ করছেন। তাঁর হাতে চৌকো মতো একটা বস্তু। অতি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ব্যাটারির মাধ্যমে তিনি সেই বস্তুটিতে শক্তি উৎপন্ন করার চেষ্টা করছেন। কুঁড়ে ঘরটির ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে টেস্ট টিউব, বকনল। চারদিকে জারের মধ্যে টগবগ করে ফুটছে বিভিন্ন তরল। একটা ছোটোখাটো ল্যাবরেটরি বানানো হয়েছে এই কুঁড়ে ঘরের ভেতরে।
লোকটি প্রায় বড়ো সিলিন্ডারের আয়তনের ব্যাটারির সাহায্যে চৌকো বস্তুটিকে দিনভর চার্জ করলেন। চার্জ হওয়ার সময়টায় তিনি দাওয়ায় রাখা খাটিয়াতে শুয়ে রইলেন। সূর্য অস্ত যাবার পর তিনি উঠলেন। কুঁড়ে ঘরের ভেতর থেকে তড়িৎ বিচ্ছুরণের শব্দ আসছে। তিনি উঠে গেলেন যন্ত্রটার কাছে। লাল রঙের বিচ্ছুরণ দেখা যাচ্ছে। এই সন্ধেবেলাতেও একটা সুন্দর লাল আভায় ঘরটা ভরে উঠেছে। এতই বেশি চার্জ হয়ে গেছে যে বস্তুটা লাফাচ্ছে। লোকটি তড়িঘড়ি গিয়ে চার্জ বন্ধ করলেন। তিনি বাক্সের মধ্যে রাখা এক জোড়া দস্তানা পরে নিলেন। তারপর সেই বস্তুটি হাতে তুলে নিলেন। দীর্ঘ এক বছর ধরে তিনি এই বস্তুটি তৈরির চেষ্টা করেছেন। বারবার ব্যর্থ হবার পর আজ বোধহয় সেই দিন। যেদিন শক্তি উৎপাদক স্বনিয়ন্ত্রিত এই যন্ত্র কাজ করা শুরু করবে।
বস্তুটিকে হাতে নিয়ে খলখলিয়ে হেসে উঠলেন তিনি। এ হাসি আমাদের পূর্ব পরিচিত। কৈটভ হাসছে।
জঙ্গলের ভেতরে কৈটভের এই হাসি হারিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ওখানে উপস্থিত যে কারও মনে ভয়ের সঞ্চার করতে এই হাসি যথেষ্ট।
“দেবতার অকাল বোধন হবে।”
বলেই আর প্রস্থ হাসি। তারপর নিজের দুই হাতে বস্তুটিকে ধরে কুঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে কৈটভ। সোজা হাঁটতে থাকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। সন্ধে হয়ে এলেও চাঁদ এখনও পুরোপুরি উঠেনি। আর অল্প সময়ের অপেক্ষা। আজ পূর্ণিমা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা আলোর দুধ সাদা ধারায় ধুয়ে যাবে জঙ্গল। কৈটভ হাঁটতে থাকে। জঙ্গলের আরও ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকে সে।
জঙ্গলের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে লাল আলোর আভা। দূর থেকে পুরো জঙ্গলটাকে লাল লাগছে।
কৈটভ হাঁটতে হাঁটতে যেখানে এসে থামল সেখানে এক বিশাল গুহা। পাশে ঝরনার জল অবিরাম নীচে পড়ছে। পাহাড়ি অঞ্চল ত্রিপুরায় এরকম বেশ কিছু গুহা রয়েছে। বেশিরভাগ গুহাই আবিষ্কৃত হয়নি। যেগুলো হয়েছে সেগুলো টুরিস্টদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে প্রচুর পাহাড়ি গুহা। এ সেরকমই এক গুহা। তবে বাকি গুহাদের থেকে এই গুহার উচ্চতা অনেকটাই বেশি। হয়তো এই কারণেই কৈটভ এই জায়গাটা বাছাই করেছে।
সেখানে পৌঁছে কৈটভ একটা বেদির মতো জায়গায় লাল আলো বিচ্ছুরণকারী বস্তুটা রাখল। তারপর গুহাদ্বারের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে মাটিতে পড়ে থাকা দুটো চকমকি পাথর তুলে নিল। বারকয়েক পাথর দুটোতে ঘষামাজা করতেই আগুন জ্বলে উঠল। কৈটভ গুহার গায়ে লাগানো একটা মশাল তুলে নিল। পাথরঘষা আগুন দিয়ে মশাল জ্বালাল সে। তারপর পাহাড়ের গায়ে লাগানো আরও খান দশেক মশাল পরপর জ্বালিয়ে ফেলল সে। তাতে অন্ধকার একেবারেই দূর হল। এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব। গুহার ভেতরের অংশও এখন দেখা যাচ্ছে।
একটি লাল মখমলের চাদর দিয়ে ঢাকা রয়েছে এক বিশাল এক স্তম্ভ। ভেতরে কী আছে তা বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কৈটভ এগিয়ে গেল ঢাকা বস্তুটির দিকে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বস্তুটির দিকে। তারপর মশালটা গুহার গায়ে রেখে প্রণাম করল বস্তুটিকে। তারপর হ্যাঁচকা টানে লাল মখমলের চাদরটাকে টেনে ফেলে দিল। চাদর সরে যেতেই দেখা গেল গন্দবেরুন্দা দেবের মূর্তি বা খোলসটাকে। গ্রামবাসীদের আরাধ্য দেবতার খোলস নিয়েই পালিয়েছিল সে। দেবতার গা বেয়ে পড়ছে চটচটে পদার্থ। কৈটভের পায়ের নীচে থকথক করছে পদার্থটা।
কৈটভ আবার মশালটা তুলে নিয়েছে। এ দৃশ্য সুখের নয়। এক বিরাটাকার দৈব খোলস মূর্তির সামনে অতি ক্ষুদ্র এক হিংস্র মানব। নিজের লোভ চরিতার্থ করতে এই ক্ষমতালিপ্স মানব এক দেবতার কাছে এসেছে বরদানের অভিলাষে। কিন্তু এখনও অনেক সাধনা বাকি।
“গন্দবেরুন্দার জয় হোক।”
কৈটভের কণ্ঠে গমগম করে উঠল গুহামুখ।
“হে আরাধ্য, আমি আরও এগারো বছর অপেক্ষা করে থাকতে পারব না। আপনার জাগ্রত হবার কাল আরও এগারো বছর পর আসবে। আর ততদিন অপেক্ষা করে থাকলেও আপনি আমার ইচ্ছে পূরণ করবেন না। আমার ইচ্ছে এই পৃথিবীকে শুধু নয়, এই পৃথিবীর বাইরেও মানবজাতির অধিকার স্থাপন করা। আর এর জন্য আমাকে অতিমানব হতে হবে। আমার চাই দৈবিক শক্তি। এই শক্তি তখনই সম্ভব যখন আমি নিজে আপনাকে চালনা করতে পারব।
কথাটা বলে দম নিল কৈটভ। তার গলার শিরা-উপশিরা ফুলে উঠেছে। শ্বাস পড়ছে জোরে জোরে। একটা অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ হয়ে আছে চারদিকে। ঝিঁ পোকাগুলো অবধি ডাকছে না।
আর তখনই কৈটভ তার চিরকালীন এক পেশে হাসিটা হাসল। গুহাবিদীর্ণ করে যেন সে শব্দ জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল।
“হে আরাধ্য, এই প্রথম কোনো ভক্ত তার আরাধ্যের জায়গা নিতে চাইছে। শিষ্য হয়ে গুরুহত্যার পাপ আমি আগেই করেছি। হেমন্তাই আর জীবিত নন। যে চক্রে আপনার আরাধনা করা হত সেই চক্রটিকে আমি ইতিমধ্যে ধ্বংস করেছি। সুতরাং এখন আর আপনার বারো বছরের অপেক্ষার কোনো কারণ নেই। না আছে গ্রামবাসী-সহ সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতা। আমি আপনাকে সমস্ত কর্তব্য থেকে মুক্তি দিতে চাই।
আবার থামল কৈটভ। তার কথাগুলো গুহার গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসছে।
কৈটভ আবার চিৎকার করে উঠে, “আপনি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। তাই আপনার চেয়ে শক্তিমান কেউ নেই। আপনার ত্যাগ করা খোলসে তাই দৈবগুণ বর্তমান। কিন্তু যেহেতু আপনি পরিত্যক্ত খোলস তাই আপনি স্বয়ং বিষ্ণু নন। তাই আপনাকে যদি আমি বিজ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে চালনা করতে পারি তবে আপনার সমস্ত শক্তিতে শুধু আমার অধিকার থাকবে। এই বিধ্বংসী শক্তিগুলোর সাহায্যে আমি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড জয় করতে পারব। কিন্তু তার আগে আপনাকে জাগ্রত করতে হবে। দেবতাকে জাগ্রত করতে পারার মতো শক্তি আমি তৈরি করেছি। আপনাকে জাগ্রত করার জন্য চাই অসম্ভব শক্তিশালী এক যন্ত্র যার দ্বারা শক্তি বিচ্ছুরণে আপনি জেগে উঠবেন। সেই যন্ত্রের প্রোগ্রামিং করেছি আমি। যাতে আপনি জেগে উঠলে শুধুমাত্র অধিকার স্থাপন করা। আর এর জন্য আমাকে অতিমানব হতে হবে। আমার চাই দৈবিক শক্তি। এই শক্তি তখনই সম্ভব যখন আমি নিজে আপনাকে চালনা করতে পারব।
কথাটা বলে দম নিল কৈটভ। তার গলার শিরা-উপশিরা ফুলে উঠেছে। শ্বাস পড়ছে জোরে জোরে। একটা অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ হয়ে আছে চারদিকে। ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো অবধি ডাকছে না।
আর তখনই কৈটভ তার চিরকালীন এক পেশে হাসিটা হাসল। গুহাবিদীর্ণ করে যেন সে শব্দ জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল।
“হে আরাধ্য, এই প্রথম কোনো ভক্ত তার আরাধ্যের জায়গা নিতে চাইছে। শিষ্য হয়ে গুরুহত্যার পাপ আমি আগেই করেছি। হেমন্তাই আর জীবিত নন। যে চক্রে আপনার আরাধনা করা হত সেই চক্রটিকে আমি ইতিমধ্যে ধ্বংস করেছি। সুতরাং এখন আর আপনার বারো বছরের অপেক্ষার কোনো কারণ নেই। না আছে গ্রামবাসী-সহ সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতা। আমি আপনাকে সমস্ত কর্তব্য থেকে মুক্তি দিতে চাই।
আবার থামল কৈটভ। তার কথাগুলো গুহার গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসছে।
কৈটভ আবার চিৎকার করে উঠে, “আপনি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। তাই আপনার চেয়ে শক্তিমান কেউ নেই। আপনার ত্যাগ করা খোলসে তাই দৈবগুণ বর্তমান। কিন্তু যেহেতু আপনি পরিত্যক্ত খোলস তাই আপনি স্বয়ং বিষ্ণু নন। তাই আপনাকে যদি আমি বিজ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে চালনা করতে পারি তবে আপনার সমস্ত শক্তিতে শুধু আমার অধিকার থাকবে। এই বিধ্বংসী শক্তিগুলোর সাহায্যে আমি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড জয় করতে পারব। কিন্তু তার আগে আপনাকে জাগ্রত করতে হবে। দেবতাকে জাগ্রত করতে পারার মতো শক্তি আমি তৈরি করেছি। আপনাকে জাগ্রত করার জন্য চাই অসম্ভব শক্তিশালী এক যন্ত্র যার দ্বারা শক্তি বিচ্ছুরণে আপনি জেগে উঠবেন। সেই যন্ত্রের প্রোগ্রামিং করেছি আমি। যাতে আপনি জেগে উঠলে শুধুমাত্র আমার আদেশ মান্য করতে পারেন। হ্যাঁ আদেশ। আজ থেকে আমি আপনাকে আমার আরাধ্য হিসেবে মানছি না। আমার শেষ প্রণাম গ্রহণ করুন। এবার আমি আপনাকে যন্ত্রে পরিণত করব।”
কথাটা শেষ করা মাত্র কৈটভ মশালটা গুহার গায়ে আটকে দিল। নিজের সবসময়ের পরিধেয় অঙ্গবস্ত্রটি খুলে ফেলল। তারপর হাজির হল গন্দবেরুন্দা দেবের খোলসের সামনে।
গুহার পাথুরে মেঝেতে গড় হয়ে সে প্রণাম করল। তারপর অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করল। তারপর তীব্র স্বরে, “জয় গন্দবেরুন্দা” বলে উঠে পড়ল। উঠে নগ্নবেশে গুহামুখের বাইরে চলে এল। ওখানে বেদির উপরে রাখা আছে লাল আলো বিচ্ছুরণকারী বস্তুটি।
কৈটভ চারিদিকে তাকাল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশে বজ্র বিদ্যুতের খেলা। পূর্ণিমার চাঁদ তার স্নিগ্ধ আলোয় ভরিয়ে তুলেছে জঙ্গলমহলকে। এর সঙ্গে বস্তুটির লাল আলো মিশে চারদিক আলতা রঙা দেখাচ্ছে।
এরই মাঝে এক নগ্ন উপজাতি পুরুষ তার নগ্ন সুঠাম দেহ নিয়ে প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার অভিলাষ পূরণের আশায়। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। দেখতে দেখতে বৃষ্টিটা তেড়ে এল। দমকা হাওয়া ছুটল। বজ্র বিদ্যুতের মুহুর্মুহু ধ্বনিতে কানের পর্দা ফেটে পড়ার উপক্রম হল। কৈটভ ততক্ষণ অবধি দাঁড়িয়ে শুধু দেখল বস্তুটাকে। বস্তুটাও জলে ভিজছে। কিন্তু তাতে এর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ উপায়ে তৈরি এই বস্তু জলের সংস্পর্শে এলেও কিছু হয় না।
কৈটভের শরীর দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে। টাক মাথা বেয়ে গায়ে নামছে জলের ধারা। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে দস্তানাটা হাতে পরে নেয় সে। বস্তুটিকে হাতে তুলে নেয়। বজ্র বিদ্যুতের আলোয় দেখা গেল একটা চৌকো মতো যন্ত্র। বেশ কিছু দুর্বোধ্য ডিজিট দেখা যাচ্ছে তাতে। অবিরত শক্তি উৎক্ষেপণ করছে আর সঙ্গে সঙ্গে আলো বিচ্ছুরণ করছে। যন্ত্রটা কাঁপছে। যেন সংকুচিত প্রসারিত হচ্ছে এই যন্ত্র।
কৈটভ একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। এবার সে যা করতে চলেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে কী ঘটবে তা সে জানে না। শুধুমাত্র নিজের পড়াশোনার উপর বিশ্বাস রেখে সে পরবর্তী কাজটি করতে চলেছে।
কৈটভ এবার প্রক্রিয়াটি শুরু করে। একটা নির্দিষ্ট সরলরেখায় দাঁড়ায় সে, যে সরলরেখায় গন্দবেরুন্দার খোলস মূর্তি আর সে একই রেখায় থাকে। চারদিকে মশালগুলো থাকে তার সমান্তরালে। গুহামুখের বাইরে আকাশের দিকে যন্ত্রটি তুলে ধরে সে। যন্ত্রের মধ্যে থাকা ছোটো একটি বোতামে চাপ দিতেই যন্ত্রটি এবার কাঁপতে শুরু করে। এতক্ষণ ধরে যে যন্ত্রটি সাধারণ অবস্থাতেই শক্তি উৎপন্ন করছিল সেটি বোতামে চাপ পড়তেই আরও দ্রুত কাজ করতে শুরু করে। প্রথমেই গুহার গায়ে লাগানো মশালের আগুন নিজের দিকে টেনে নিতে থাকে এই যন্ত্র। সমস্ত মশাল থেকে আগুনকে একপ্রকার শুষে নেয় এই যন্ত্র। চুম্বক যেমন লোহাকে টেনে নেয় ঠিক তেমনি মশাল থেকে আগুন রেখার আকারে ধাবিত হতে থাকে যন্ত্রের দিকে। এ এক দৃশ্য বটে। সবগুলো মশাল নিভে গেল বটে, কিন্তু যন্ত্রটি আগুনের শক্তি শুষে নিয়ে হয়ে উঠল আরও ভয়ংকর। আগের চেয়ে অনেক বেশি লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতে থাকল এই যন্ত্র।
কৈটভ কোনোক্রমে আঁকড়ে ধরে থাকল এই যন্ত্রটি। চারদিকে ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে। গুহামুখে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু কৈটভ দাঁড়িয়ে থাকল। মশালের আগুনের পর তার লক্ষ্য আরও বড়ো শক্তি। বজ্র বিদ্যুতের শক্তি।
কৈটভ তার সমস্ত উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে শুধুমাত্র দুটো বুড়ো আঙুলের উপর ভর করে উঁচিয়ে ধরল যন্ত্রটিকে। ঠিক তখনই ইন্দ্রের বজ্রসম শাখাপ্রশাখা বিশিষ্ট একটি বাজ পড়ল। যন্ত্র তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে টেনে নিল এই বিদ্যুৎ। লোহার মতো বিদ্যুতও যেন এই যন্ত্র চুম্বকের টানে তার দিকে ধাবিত হল।
কৈটভ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বজ্রাসনে বসে পড়ল পাথুরে জমিতে। আর তখনই সে যন্ত্রে লাগানো একটি হাতলে চাপ দিল। এবার দেখা গেল আরও অদ্ভুত এক দৃশ্য।
এতক্ষণ যন্ত্র শুধু শক্তি আহরণ করছিল। তার নিজের মধ্যে জমা করছিল। এবার হাতলের চাপে যন্ত্রের অন্য অংশটি খুলে গেল। সেই অংশ থেকে একটি লাল রঙের অতি শক্তিশালী রশ্মি নির্গত হল। এই শক্তিশালী রশ্মিটি সরাসরি গিয়ে পড়ল গন্দবেরুন্দা দেবতা খোলসের উপর।
নিরবচ্ছিন্নভাবে আকাশ থেকে বজ্র-বিদ্যুতের শক্তি নিতে থাকল সেই যন্ত্র। আর ততোধিক বেগে সেই শক্তি পাঠাতে লাগল গন্দবেরুন্দা দেবতার গায়ে। সূর্যের আলো যেমন আতস কাচের মাধ্যমে কাগজের উপর নিরবচ্ছিন্নভাবে ফেললে কাগজ জ্বলে উঠে, ঠিক সেভাবেই এই আলো খোলসের উপর পড়ার পর মূর্তিটির গায়ে এক গোলাকার আলোক বলয়ের সৃষ্টি হল। কৈটভ শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও সে উঁচিয়ে ধরে আছে যন্ত্রটিকে। যন্ত্রও তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে গন্দবেরুন্দার মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে তাকে জাগিয়ে তুলতে। একমাত্র শক্তি সঞ্চারের মাধ্যমেই গন্দবেরুন্দার মূর্তিকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব। আর জগতে নতুন শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস দুটোই অসম্ভব। আর এই অসম্ভবকেই সম্ভব করার চেষ্টায় মেতেছে কৈটভ। প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজেই তার আনন্দ।
এভাবে প্রায় আধ ঘণ্টার যুদ্ধ চলল। গন্দবেরুন্দার গায়ে শক্তি সঞ্চারিত হতে শুরু করল। স্থির স্থিতধি গন্দবেরুন্দা দেবের আঙুলের সঞ্চালন সে লক্ষ করল। তার চোখ মুখ আনন্দে ভরে উঠল। সে দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে কাজটি করার চেষ্টা করতে থাকল। প্রায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও সে যন্ত্রটিকে উঁচিয়ে ধরে রাখল। বাইরে সাদা রঙের বজ্র বিদ্যুতের যন্ত্রে আগমনের স্রোত আর যন্ত্র থেকে লাল রঙের শক্তি স্রোতের নির্গমন ঘটতেই লাগল। শক্তির সঞ্চারণে ধীরে ধীরে গন্দবেরুন্দার মূর্তিতেও সঞ্চালন সৃষ্টি হতে লাগল। যখন সমস্তই ঘটছিল কৈটভের অভিপ্রায় অনুসারে ঠিক তখনই তাল কাটল।
কৈটভের হাতের মধ্যেই বিস্ফারিত হল যন্ত্রটি। কৈটভ এক ধাক্কায় উড়ে গিয়ে পড়ল গুহার গায়ে। গুহার গায়ে ধাক্কা খেয়ে সটান মাটিতে। যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে গেল। আগুন জ্বলছে যন্ত্রটির গায়ে। অন্ধকারে ঢাকা পড়ল গুহামুখ। সমস্ত আলোক স্রোত নষ্ট হয়ে গেল। সর্বোপরি গন্দবেরুন্দা আবার স্থির হয়ে গেলেন।
কৈটভের পরীক্ষা আবার ব্যর্থ হল। কৈটভ যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকল। এ যন্ত্রণা দৈহিক নয়, মানসিক। এতদিন ধরে করা পরীক্ষার ফসল এই শক্তিশালী যন্ত্রটি ব্যর্থ হল। এ যে কী ব্যথা! একমাত্র লোভী কৈটভই তা জানে।
বাইরে বৃষ্টি শিথিল হয়ে এসেছে। তবে এখনও মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। যন্ত্রটিতে লাগা আগুন ঝিমিয়ে পড়ে একসময় নিভে গেছে। শুধু কৈটভ এখনও নগ্ন অবস্থায় পাথুরে মেঝেতে পড়ে আছে। এই হারে সে ভেঙে পড়েছে। মৃত কৈটভের মতো শক্তিশালী নির্যাস যার মাধ্যমে দুনিয়ার উপর নিজের আধিপত্য কায়েম করা সম্ভব, সেই মৃত কৈটভের আবিষ্কর্তা মেঝেতে পড়ে ব্যর্থতায় ধুঁকছে। জীবনের চেয়ে বড়ো খেলোয়ার কেউ নেই। আজকের রাজা কাল ফকির।
তবে জীবনের এটাও এক ধর্ম যে সে আবার সুযোগ দেয়। উঠে দাঁড়াবার সুযোগ কৈটভের কাছে হেঁটে এল।
কৈটভ মেঝেতে পড়ে আবিষ্কার করল কেউ একজন গুহামুখের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে অস্পষ্ট তাকাল সেদিকে। তখনই একটা বড়ো বাজ পড়ল। সেই আলোয় কৈটভ দেখল একজন ধুতি পরা মানুষ গুহামুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কে?
আবার বাজ পড়ল। এবারে সে আরও স্পষ্ট করে দেখল লোকটা পাঞ্জাবিও পরেছে। মাথায় ছাতা।
“উঠে পড়ুন। আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”
কৈটভের ভ্রু কুঁচকে গেল। কে এসেছে তাকে নিয়ে যেতে? আর এই জঙ্গলের খোঁজ ওরা পেলই-বা কীভাবে। কৈটভ আর দেরি করল না। সে বুঝে গেছে যে তাকে বন্দি করে নিতে পাঠানো হয়েছে।
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সে উঠে দাঁড়াল। আর নিঃশব্দে অন্ধকারের মধ্যে আক্রমণ করল। শূন্যের মধ্যে লাফ দিয়ে কৈটভ এগিয়ে গেল তাকে মারতে।
যিনি এসেছিলেন তিনি যেন এরকম কিছুর জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। মাথা থেকে ছাতা না সরিয়ে শুধু এক কদম পেছনে গিয়ে তাইকুন্ডুর এক প্যাঁচে কৈটভকে ধরাশায়ী করলেন। মুখে বললেন,
“আপনি খামোখাই এসব করছেন। আমি আপনার শত্রু নই। আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। এতে আপনার ইচ্ছেও পূরণ হবে আর আমাদের অভিষ্টও। আপনি আসুন।”
কৈটভ বুঝতে পারল যে সে এখন ক্লান্ত। দেহ-মন অবসন্ন। এই লোকের সঙ্গে লড়াই করার মতো অবস্থা তার নেই। সে শুধু জিগ্যেস করল, “আপনি কে? আপনাদের অভীষ্ট কী?”
“আমি একটি গোপন সংঘের সদস্য। আমাদের অভীষ্ট কী সে বিষয়ে বিশদে আমাদের অধিকর্তা আপনাকে জানাবেন। আপাতত বলতে পারি আপনাকে আমাদের চাই।”
“চাই বললেই যেতে হবে নাকি? কী সংঘ, কে অধিকর্তা কিছুই জানি না।”
“সব বললেও আপনি এখন বুঝবেন না। তার চেয়ে চলুন আমার সঙ্গে। ওখানে গিয়েই সব বুঝবেন। এই জঙ্গলে এতটুকু এসে যখন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তখন বুঝতেই পারছেন যে এলেবেলে কেউ নই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। নইলে বারবার এরকম অ্যাক্সিডেন্ট ঘটতে থাকবে।
আমাদের কাছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আছে।”
এবার কৈটভ ভ্রু কোঁচকায়। এটা সত্যি যে এখানে যে-কেউ এসে পৌঁছোতে পারবে না। এই লোক যখন এসেছে এবং তার উপর নজর রেখে চলেছে তবে ওর পেছনে বড়ো কোনো শক্তি নিশ্চয়ই আছে। কৈটভ উঠে দাঁড়ায়।
মানুষটা ছাতা হাতে মাথায় দিয়েই এগিয়ে আসে। কৈটভের দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দেয়।
“এই নাও ধুতি আর পাঞ্জাবি। আমাদের সংঘে আমরা সবাই ধুতি আর পাঞ্জাবি পরি। পরে নাও।
কৈটভ অবাক চোখে পরিধেয় বস্ত্র পরে নিল। সুঠাম গড়নের লোকটার সঙ্গে সে গুহামুখ থেকে অজানা এক পথের দিকে রওনা দিল।
