Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ২ – সৌরভ চক্রবর্তী

ব্রহ্মপদার্থ – ৩

(৩)

গাড়ি শহর আগরতলার বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। সেই ছোটোবেলায় কৈটভ মূল শহরে এসেছিল। বিগত এতগুলো বছরে আমূল পালটে গেছে শহর আগরতলা। আগরতলায় যে এত বড়ো উড়াল পুল হয়ে গেছে সে ধারণাই তার ছিল না। কালো স্করপিও গাড়িটার জানালার কাচ নামিয়ে সে প্রাণভরে শহরটাকে দেখছে। ছোটো ছোটো টিনের বাড়িওয়ালা শহরটায় কবে এত বড়ো বড়ো বিল্ডিং তৈরি হয়েছে?

কৈটভের এই বালকসুলভ দৃষ্টি দেখে লোকটা জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছ এমন করে?”

কৈটভ চোখে সারল্য নিয়ে বলল, “দেখছি এই শহরটাকে। ছোটোবেলায় আশ্রমে দীক্ষালাভ শুরুর আগে এসেছিলাম। তখন এই শহরে আসাটাকে আমরা গ্রামবাসীরা বলতাম টাউনে যাব। সেই টাউন নিয়ে কত ছোটো ছোটো স্বপ্ন আমাদের শিশু মনে জায়গা করে নিত। ভালো খাবার, ভালো খেলনা, ঘোরাঘুরির জায়গা।”

লোকটা কৈটভের উত্তরে হাসল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, “আর আজ এই সুন্দর শহরটাকে দেখে কী মনে হচ্ছে?”

কৈটভ এবার তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “মনে হচ্ছে, এই সুন্দর শহরটাকে কবজা করতে না জানি কত আনন্দ পাব। তাই না!”

লোকটা কৈটভের চোখের এই দৃষ্টিতে ঘাবড়ে গেল। এই যুবক যে সাধারণ কোনো যুবক নয় তার চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আর কোনো কথা বাড়াল না লোকটা।

গাড়ি উদ্দিষ্ট পথে চলতে লাগল।

রাস্তায় একবার কৈটভ জিজ্ঞেস করেছিল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

লোকটা উত্তর দিয়েছিল, “সঠিক জায়গার নাম বলা বারণ। এটুকু জেনে রাখো যে ত্রিপুরাতেই আছি।”

গাড়ি বহু ঘণ্টার জার্নির পর একসময় এসে থামল। ইশারায় কৈটভকে গাড়ি থেকে নামতে বলল লোকটা। নিজেও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। তারপর ড্রাইভারকে বলল, “চলে যা আস্তানায়।”

তারপর কৈটভকে বলল, “চলো আমাদের ডেরায়।”

কৈটভ জিজ্ঞেস করল, “এই আস্তানা আর ডেরা জায়গা দুটো একই, তাই না?”

লোকটা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

কৈটভ জিজ্ঞেস করল, “তাহলে গাড়ি আলাদাভাবে যাচ্ছে কেন?”

লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি বেশি প্রশ্ন করো। আলাদা যাচ্ছে কারণ আমাদের আস্তানায় গাড়ি রাখা যেতে পারে তা কেউ জানে না। অন্য রাস্তায় ঘুরপথে ঢোকার জায়গা আছে। সেখান দিয়েই যাবে গাড়ি। আমরা যাব পদব্রজে অর্থাৎ…”

প্রশ্নটা কৈটভের জন্য রেখে দিল লোকটা। কৈটভ বুঝে গেল উত্তর। বলল, “হেঁটে। বেশ চলুন।”

হাঁটতে লাগল দুজনে। কৈটভ চারদিক তাকিয়ে দেখল এ এক অজ পাড়া গাঁ। ত্রিপুরার মানচিত্রে এখানের নাম না থাকারই কথা। কিছু পাহাড়ি বাচ্চা কাদায় খেলছে। নালায় বসে কিছু পাহাড়ি মানুষ ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। একটা টং দোকান আছে। সেখানে কয়েকটা চিপসের প্যাকেট ঝুলছে। দোকানের কোনো নাম নেই। না আছে সাইন বোর্ড। জায়গাটার নাম জানার উপায় নেই। এদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয় ঠিকই, কিন্তু এরা মনে হয়

না বাংলা বা ককবরক কোনো ভাষাই জানে। এদের ভাষা কৈটভ বুঝবে না। আর তাছাড়া এই মুশকো লোকটার সামনে এসব করাও যাবে না। সুতরাং চুপচাপ হাঁটা ছাড়া গতি নেই। কৈটভ ভেতরে ভেতরে গজগজ করতে করতে হাঁটতে থাকল।

গ্রামের লোকজন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে তাদের দিকে। তাকাবেই না কেন? গ্রামবাসী পরে আছে ছেঁড়া গামছা, নেংটি আর এই দুজন পরে আছে সুন্দর ধুতি-পাঞ্জাবি। কৈটভের নিজেই উশখুশ করছে এই পোশাকে।

সন্ধে হয়ে এসেছে। প্রায় একটা গোটা দিন গাড়িতে কেটেছে। খাওয়া বলতে দুপুরে এক জায়গায় নেমে একটা পাইস হোটেলের মোটা চালের ভাত। বেশ খিদে পেয়ে গেছে কৈটভের। এদিকে পথ শেষ হচ্ছে না।

“আর কতদূর?” একটা এঁদো গলির মধ্যে ঢুকে জিজ্ঞেস করল কৈটভ।

উত্তরে লোকটা পেছনে না ফিরে বলল, “এই তো এসে গেছি।” বলেই ডানহাতি একটা ভাঙা বাড়ির দরজার শেকল খুলে ঢুকে পড়ল।

কৈটভও তার দেখাদেখি ঢুকে পড়ল ভেতরে। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কৈটভ ঢুকতেই ভেতর থেকে দরজাটা কেউ আটকে দিল। কৈটভ বিপদের আভাস পাওয়া মাত্র কাউকে মারার জন্য উদ্যত হতেই লোকটার গলা পাওয়া গেল, “কিচ্ছু হয়নি। সামনে এগিয়ে চলো। আমরা লো-প্রোফাইল বজায় রাখার জন্য এরকম দরজা বানিয়ে রেখেছি। এই এঁদো গলির বাসিন্দা নেংটি ইঁদুরগুলো অবধি ভাবতে পারবে না এর ভেতরে কী আছে।”

চড়া আলোর একটা টর্চ জ্বালতেই সামনের পথ দেখা গেল। একটা বড়ো টানেলের অংশ এটা। টানেলের বাইরে কিছু ফাঁকা জায়গা। তাতে অল্প কিছু ভাঙা আসবাব আর একটা খাটিয়া। এইসবই মানুষকে বোকা বানানোর জন্য রাখা আছে। কৈটভ দেখে প্রথমে বুঝতেই পারল না যে এটা কারও বাড়ি নয়। সে এখন নিশ্চিত বুঝতে পারছে যে এইরকম এঁদো গলির বাকি ঘরের তরে নিশ্চয়ই এরকম আসবাব আর খাটিয়া আছে। সেভাবেই এই নকল ঘরটা ডিজাইন করা হয়েছে।

“এগোতে থাকো।”

মুশকো লোকটার কথায় কৈটভ হাঁটার গতি বাড়ায়। আরও মিনিট পাঁচেক অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটতে হল। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হাঁটাকালীন বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছে। কৈটভ নাক চেপে হাঁটতে লাগল। অন্যদিকে লোকটার ভ্রুক্ষেপ নেই।

“এই গন্ধ তোমরা রোজ আসা-যাওয়ার পথে কীভাবে সহ্য করো?”

লোকটা হমগম করে হেসে উঠল। “অভ্যেস হয়ে গেছে। পা চালাও।”

শেষ পর্যন্ত আলোর উৎস দেখা গেল। টানেলের বাইরে বেরোতেই কৈটভের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। টানেল থেকে বেরোনো মাত্র ধুতি পরিহিত একজন লোক টানেলের মুখ চাকতি দিয়ে বন্ধ করে দিল।

“এত আলো কেন? তোমাদের আজ দীপাবলি নাকি?”

“চুপ করো। মুষ্টিযুদ্ধ হবে।”

কৈটভের প্রশ্নে লোকটা জেরবার হয়ে যাচ্ছে।

কৈটভ দেখতে পেল টানেল থেকে বেরোবার পর একটা বিস্তীর্ণ হলঘরের সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে। নামেই হলঘর। আসলে একটা ছোটোখাটো ময়দান। কিন্তু উপরের অংশে লোহার ছাদ রয়েছে। চারদিক আলোয় আলোময়। কৈটভ এগিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করল। হলঘরের মাঝখানে একটা গোলাকার পরিখা কাটা আছে। তার মাঝখানে কুস্তি করার আখড়া। দুজন পালোয়ান ধুতি পরে দু-দিকে দাঁড়িয়ে আছে। কৈটভের চোখ চারদিকে ঘুরছে। সে খুঁজে চলেছে এই সমস্ত আয়োজনের হোতা-কে। এই কুস্তি নিশ্চয়ই সে উপভোগ করতে এসেছে। কিন্তু অনেক খুঁজেও সে আখড়ার লড়াইরত দুজন আর রেফারির বাইরে আর কাউকে খুঁজে পেল না।

কুস্তি বেশ জমে উঠেছে। দুজনেই দুজনকে রামধোলাই দিচ্ছে। সুন্দর সুন্দর মারপ্যাঁচে অভাবনীয় কুস্তি। আজকাল এসব আর দেখা যায় না। শারীরবিদ্যার এক অসাধারণ অঙ্গ এই ফ্রি-স্টাইল কুস্তি। ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবেও একে বহু প্রদেশে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কৈটভ এটুকু বুঝতে পারছিল যে এরা যারাই হোক না কেন, এরা ভারতীয় সংস্কৃতির খুবই কদর করে।

একসময় কুস্তি শেষ হল। রেফারি একজনকে জয়ী ঘোষণা করলেন। কুস্তিগিররা আখাড়ার ডানদিকে উপরে কাউকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেল। কৈটভ সেদিকে তাকিয়ে দেখল ওখানে কেউ নেই। আগেও ছিল না। তাহলে তারা কাকে নমস্কার করল?

কৈটভ আবার প্রশ্ন করতে উদ্যত হল। কিন্তু তার আগেই ষণ্ডা লোকটা তাকে বলল, “চলো। ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা করার সময় হয়েছে।”

“ঠাকুরদা? কার ঠাকুরদা?”

“আমাদের সবার। চলো চলো।”

ডানহাতি একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল লোকটা। কৈটভও আর দেরি না করে তাই করল। চারদিকে আলোর রোশনাই। কাচ দিয়ে ইন্টেরিয়র করা হয়েছে এই ঘরটায়। আলোর প্রতিফলনে চারদিকে শুধু আলো আর আলো। ষণ্ডা লোকটা এসে বাঁ-দিকে ফিরে প্রণাম করল। কৈটভ আশ্চর্য হয়ে গেল। বাঁ-দিকে কেউ নেই। শুধু একটা কাচের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে যেখানে কাচের মধ্যে কৈটভ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে। কাকে প্রণাম করছে লোকটা? কৈটভকেও ইশারায় প্রণাম করতে বলল সে। মুখে এক রাশ বিস্ময় নিয়ে কৈটভ আদেশের পালন করল।

আর ঠিক তখনই কম্পনটা অনুভব করল সে। মেঝে অল্প কাঁপছে আর কাচের দেওয়ালটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছে। সে দেখল মুশকো লোকটা মৃদু হাসছে। কৈটভ দেখল ধীরে ধীরে সমস্ত কাচের দেওয়ালটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঠিক যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কাচের দেওয়াল। আর ঠিক তখনই দেওয়ালের পেছনে থাকা সোফাটা দৃশ্যমান হল। সোফার উপর বসে আছেন একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক। পরনে সেই একই সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। গলায় মোটা সোনার চেইন। বাঁ-হাতের পাশে বসে আছে একটা হিংস্র চিতা বাঘ। আর সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কৈটভের এতক্ষণের সঙ্গী লোকটার মতো সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি পরা সুঠাম গড়নের আরও ছয়জন মানুষ। প্রত্যেকেরই চোখে কালো চশমা, গলায় মোটা সোনার চেইন। সকলেই তাকিয়ে আছে কৈটভের দিকে। স্পষ্টতই সোফায় বসা মানুষটাই এই দলের সর্দার। কৈটভের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে লোকটা।

“ওয়েলকাম কৈটভ। আমাদের সংঘে তোমাকে স্বাগত।”

কৈটভ এই অভিবাদনে সাড়া দিল। কিন্তু কিছু বলল না।

“আমি ঠাকুরদা। ওরা আমাকে তাই বলে ডাকে। এরা আমার সাগরেদ। কিন্তু মজার কথা জানো, ওদের ঠাকুরদার ঠাকুরদা আমি। বয়স অন্তত সেরকমই। কিন্তু আমি তোমার মতোই বিজ্ঞান চর্চা করি। আমাদেরও একটা পরীক্ষাগার আছে। তাতে আয়ুষ্কাল বাড়াবার বা বলতে পারো বয়সকে ধরে রাখার একটা ওষধি বানিয়েছিলাম। নাম এজিলেস। বয়স কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তাহলে নিজের সঙ্গে আমার মিল পেলে তো? আমিও তোমার মতো নানান জিনিস আবিষ্কার করতে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি মানুষের উপর আধিপত্য কায়েম করতে। ঠিক তোমারই মতো।”

কৈটভ মন দিয়ে শুনছিল। কিন্তু কোনো কথা সে বলছিল না। ঠাকুরদা লোকটাকে আরও বোঝা দরকার। মনে হচ্ছে অনেক বড়ো খেলোয়াড়।

ঠাকুরদা বলতে লাগল, “দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরদার মতো আমার কাছেও একটা ঝুলি আছে। তাতে গপ্পো না, আছে মজার মজার শক্তিশালী আবিষ্কার। এই যেমন হাইডমিরর। ছোটো এক টুকরো কাচ, ওই দেখো নীচে পড়ে আছে। তাতে বিশেষ উপায়ে তৈরি তরলের কয়েক ফোঁটা ফেললেই তা একটা দেওয়ালে পরিণত হয়।

দেওয়ালের পেছনে থেকে সব দেখা যায়। এই যেমন কুস্তিটা আমি দেখলাম। কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে পেল না। তুমিও এদিকে বারকয়েক তাকালে। কিন্তু বোকা বনে গেলে। আবার তারতম্য অনুযায়ী কয়েক ফোঁটা বিশেষ তরল ফেললেই আবার ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে মোটা কাচে পরিণত হয়। কি মজা তাই না! আমার এরকম নানাবিধ আবিষ্কার আছে। আমার সংঘের নিরাপত্তার তাগিদে এইসব আবিষ্কার করে রেখেছি।”

কৈটভ এবার বিরক্ত হল। সে জিজ্ঞেস করল, “আমার আপনার আবিষ্কারে কোনো আগ্রহ নেই। আমাকে এত দূর ডেকে এনেছেন কেন?”

কৈটভের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুনে খলখলিয়ে হেসে উঠলেন ঠাকুরদা। যেন কৈটভ নয়, একটা ছোটো বাচ্চা প্রশ্ন করেছে।

“শোনো হে, তোমার যেটায় আগ্রহ আছে সে বিষয়েই কথা বলব। কিন্তু তার আগে আমিও যে কম কিছু নই তা তোমার বোঝা উচিৎ।”

কৈটভ এবার হাত তুলে ঠাকুরদাকে থামায়, “যা সব জিনিস দেখিয়েছেন তাতে আপনিও যে কম কিছু নন তা বেশ ভালোই বুঝেছি। সমস্যা হল আমার কাছে এত সময় অবশিষ্ট নেই। তাই আমাদের দুজনের কাজের কথা শুরু হলে বেশি আনন্দিত হব।

“তোমার সম্পর্কে যা শুনেছিলাম তাহলে সবই সত্য। তোমার পৌরুষবোধের এরকমই একটা সংজ্ঞা পেয়েছিলাম। যাচাই করা হয়ে গেল।”

“অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু, এখন আসল কথা বলার সময়। সেটা বলুন।”

কৈটভের কথা শুনে ঠাকুরদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর স্থিতধীর হয়ে বললেন, “তুমি যেরকম এই ব্রহ্মাণ্ডে কবজা করতে চাও, সেটা আমিও চাই। সেটা করার লক্ষ্যে আমিও অনেক পরিশ্রম করেছি। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। তোমার ব্যাপারে জানতে পারলাম বছরখানেক আগে। তারপর থেকে তোমার অগোচরে তোমার উপর আমার লোকের নজর ছিল। গত এক বছরে বারবার চেষ্টা করেও গন্দবেরুন্দাকে জাগাতে পারলে না তুমি। ব্যর্থ হলে। ভেবেছিলাম এবারের পরীক্ষায় হয়তো উতরে যাবে। কিন্তু দেখলাম এতেও এল সেই একই ব্যর্থতা। তাই আর সময় নষ্ট করা সমীচীন বোধ করিনি।”

ঠাকুরদা কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তার পিছু পিছু চিতা বাঘটাও হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে। ঠাকুরদার ছয় জন সাগরেদ এখনও ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে সোফার পেছনেই। ঠাকুরদা এগিয়ে এসে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে জানালেন,

“এতদিন ধরে গড়ে তোলা আমার এই গোপন ডেরার নাম- মিথ সংঘ।”

“মিথ সংঘ?”

“হ্যাঁ কৈটভ। মিথ সংঘ। আমার এই সংঘ আছে এটা কেবল একটা প্রবাদ। কেউ আসলে এই সংঘের ব্যপারে কিছুই জানে না। যারা আমার অনিচ্ছায় জানে তারা বেঁচে নেই। তুমি আমার ইচ্ছাতে জানতে পেরেছ – তুমি অবশ্যই সৌভাগ্যবান।”

কৈটভ বেশ আশ্চর্য হয়।

“কেউ জানে না আপনাদের সম্পর্কে?”

“তোমার তো বোঝা উচিৎ কৈটভ। তোমার গ্রামেও এরকম অনেক কিছু ছিল বা আছে যা অফিসার রামানুজ আসার আগে কেউ জানত না। তা সেরকম গুপ্ত সংঘ আমাদের থাকতে নেই?”

“হুম! নিশ্চয়ই। আমি আপনার যুক্তি বুঝতে পারছি। শুধু যেটা বুঝতে পারছি না তা হল আপনার উদ্দেশ্য। এগুলো আপনি আমাকে বলছেন কেন? মিথ সংঘের কাজ কী? কেন তার আমাকে প্রয়োজন?”

কৈটভের প্রশ্নে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন ঠাকুরদা। তারপর তার দিকে এগোতে এগোতে বলেন, “মিথ সংঘের কাজ বিজ্ঞানের অগ্রগতি করা। তবে সেটা উন্নত সমাজের লক্ষ্যে নয়, নিজেদের জন্য। আমরা চাই এই পৃথিবীর দখল নিতে। তাই আমাদের পরিশ্রম করে নানাবিধ আবিষ্কার করে চলেছি। আমাদের পরীক্ষাগারে রয়েছে বিভিন্ন উপাদান। কিন্তু তারপরেও আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে আমাদের দেরি হচ্ছে। তোমার মতো ভাগ্যবান

আমরা নই। তোমার কাছে গন্দবেরুন্দা দেবের খোলস মূর্তি রয়েছে। তার থেকে প্রাপ্ত নির্যাসকে কাজে লাগিয়ে তুমি এবং তোমার গ্রামবাসী বছরের পর বছর নানাবিধ আবিষ্কার করেছ। তোমরা বৃষ্টি নামাতে পারো। বহু বছরের সাধনায় সেই আবিষ্কারও আমরা করতে পেরেছি। তোমরা প্রকৃতির বহু স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দিতে পারো। আজকের দিনে মিথ সংঘও সেটা পারে। কিন্তু আমাদের কাছে একটা জিনিস নেই। মানুষকে নিজের দাসে পরিণত করার অস্ত্র নেই। সাম্প্রতিক সময়ে তুমি সেটাও আবিষ্কার করে ফেলেছ।”

কৈটভ ঠাকুরদার মুখের কথা কেড়ে নিল, “মৃত কৈটভ।”

ঠাকুরদার চোখ চকচক করে উঠল। বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ। মৃত কৈটভ। সেটা আমার কাছে নেই। সেটা পেয়ে গেলে বা সেটার আবিষ্কর্তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলে এই পৃথিবীকে আমাদের কবজা করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।”

“দাঁড়ান দাঁড়ান এক মিনিট। আর মৃত কৈটভ আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করব কেন? মানবসভ্যতার উপর আমি একা যেখানে আধিপত্য করতে পারি সেখানে সুগ্রীব দোসরের অর্থাৎ এই মিথ সংঘের আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে?”

কৈটভ বেশ ব্যঙ্গ করে কথাগুলো বলল। ঠাকুরদাও কথাটা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “আছে বৎস আছে। কারণ তুমি তো এখন শুধু মানবসভ্যতার উপর নিজের আধিপত্য কায়েম করতে ইচ্ছুক নও। তোমার চাই এই ব্রহ্মাণ্ড। আর তাই তুমি গন্দবেরুন্দা দেবকে জাগ্রত করতে চাও। সময়ের আগে জাগ্রত করতে চাও। আর শুধু তাই নয়, এরকমভাবে জাগ্রত করতে চাও যেন তিনি তোমার বশবর্তী হয়ে থাকেন। শুনতে হাস্যকর লাগে না যে, ভক্ত আরাধ্যকে চালিত করবে!”

কথাটা বলে হেসে উঠলেন ঠাকুরদা। তারপর আবার যোগ করলেন, “সে হাসি পেলে পাক, কিন্তু রিপুর তাড়নায় তুমি তোমার ইচ্ছে প্রসারিত করেছ।

তাতে তোমার দিক থেকে ভুল নেই। কিন্তু এটাও সত্য যে তুমি বারবার গন্দবেরুন্দাকে জাগ্রত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছ। আমরা বিগত এক বছর তোমার সমস্ত কাজের উপর লক্ষ রেখেছি। আমাদের সাহায্য ছাড়াই তুমি এই কাজ করতে প্রায় সফল হয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু এবারেও যখন দেখলাম শেষ পর্যন্ত তুমি ব্যর্থ হয়েছ, ভাবলাম ধরা দেই। তাই নাতিদের একজনকে পাঠিয়েছিলাম তোমাকে নিয়ে আসার জন্য।”

কৈটভ আর থাকতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, “আপনি কীভাবে সাহায্য করবেন আমাকে?”

ঠাকুরদা কৈটভের ঘাড়ে ভরসার হাত রাখলেন, “জ্ঞান। হুম, জ্ঞান দিয়ে সাহায্য করব। প্রয়োজনে লোকবল দিয়ে সাহায্য করব। আরও প্রয়োজনে মিথ সংঘের আবিষ্কারগুলো দিয়ে সাহায্য করব। আর এত সবের বদলে আমাদের মৃত কৈটভ চাই। মৃত কৈটভ আমাদের, এই ব্রহ্মাণ্ড তোমার।

কৈটভ দেখল ঠাকুরদার পেছনে যারা ছিল তারা এবার ঘরের চারদিকে অবিন্যস্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। প্রত্যেকেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী আর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে চলাফেরা করছে তারা। কেউ আক্রমণে উদ্যত নয় কিন্তু প্রত্যেকের চোখের তারায় কৈটভ। কৈটভ খানিক বিব্রত বোধ করছিল। তখনই ঠাকুরদা আবার বললেন, “ভয় পেয়ো না। আমার নাতিগুলো একটু রগচটা। ওদের চেহারাটাই এরকম। তোমাকে চোখ দেখাচ্ছে ভেবো না।”

কৈটভ বুঝল এটা ঠাকুরদা অ্যান্ড কোম্পানির স্টাইল। সে বলল, “শুধু মৃত কৈটভ দিতে রাজি হলেই আপনারা আমায় সাহায্য করবেন নাকি আরও কিছু চাই।”

ঠাকুরদা এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “আরে এত কিছু আগে ভেবে হয়! আগে বন্ধুত্বটা তো শুরু হোক।”

কৈটভ বুঝল এই জল অনেক দূর অবধি গড়াবে। সে বলল, “আমাকে আমার অভীষ্ট পূরণে কীভাবে সাহায্য করবেন? বিস্তারিতভাবে বলুন।”

ঠাকুরদা হাত তুললেন। ওঁর নাতিরা কৈটভের চারদিকে শকুনের মতো উড়া বন্ধ করল।

“চলো আমার সঙ্গে।”

কৈটভের হাত ধরে এক প্রকার টেনে নিয়ে চললেন ঠাকুরদা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একের পর এক ঘর তাঁরা হেঁটে চললেন। কৈটভের হাত এখনও ঠাকুরদার হাতেই।

একসময় একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন ঠাকুরদা। কৈটভ দেখল ঘরটা ছোটো। বাইরে একটা চৌকো মতো জায়গা আছে। নির্মীয়মান বড়ো বড়ো বিল্ডিংয়ে লিফটের জন্য যে জায়গা রাখা থাকে এ অনেকটা এরকমই। ঠাকুরদা ওই চৌকো জায়গাটির কাছে গিয়ে পকেট থেকে একটা ছোটো কলম বের করলেন। তারপর ওই কলমে চাপ দিতেই কৈটভ দেখতে পেল সেই চৌকো জায়গায় আলোর ঝলকানি। ধীরে ধীরে সেখানে একটা লিফট তৈরি হয়ে গেল।

“চলো এর ভেতরে।”

কৈটভকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন ঠাকুরদা।

“এটা কী করে করলেন।”

“এই যন্ত্রটির মাধ্যমে। খুব শক্তিশালী যন্ত্র। মানুষের মাথা যে বস্তুর ছবি কল্পনা করে তা নিউরো ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে এই যন্ত্র তৈরি করে দিতে সক্ষম। বহু বছরের অধ্যবসায়ের ফসল এই যন্ত্র। এর নাম ইমেজিনিয়াস। এটা আমার কাছেই থাকে।”

“এটা অদ্ভুত! আমি এরকম কিছু ভাবতেই পারি না। মানে আমি কোনো বস্তুর কথা ভাবব আর ইমেজিনিয়াস সেটা তৈরি করে দেবে! ভাবতেই পারছি না।”

কৈটভ নিজের মুগ্ধতা ব্যক্ত করল। ঠাকুরদা বললেন, “হ্যাঁ। তবে এটা শুধুমাত্র যন্ত্র আর খাদ্যের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। আর তোমাকে বললাম তো

তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো। আমাদের সমস্ত আবিষ্কারের সুফল তুমি ভোগ করতে পারবে।”

লিফট পাতাল লোকের দিকে চলছে। এক সময় লিফট থামল।

“চলো। পরীক্ষাগারে যাই।”

ঠাকুরদা কৈটভকে নিয়ে নামলেন। আরও কিছুটা পথ হেঁটে ওঁরা পৌঁছালেন পরীক্ষাগারে। কৈটভ নিজে পরীক্ষাগার দেখেছে, কাজও করেছে। সেখানে মূলত গন্দবেরুন্দা দেবের নির্যাস দিয়ে বিভিন্ন পদার্থ তৈরির কাজ হয়। কিন্তু এই পরীক্ষাগার একেবারেই আলাদা। এরকম পরীক্ষাগার সে কখনও দেখেনি। এ যেন এক আশ্চর্য দুনিয়া। চারদিকে বিভিন্ন বড়ো বড়ো মেশিনের মধ্যে বিক্রিয়া চলছে। নিজে নিজেই পরিমাণ মতো পদার্থ একে অপরের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিমেশিনের সঙ্গে রয়েছে বিজ্ঞানীরা। ঠাকুরদাকে যখন যে বিজ্ঞানী দেখছে বুকে হাত দিচ্ছে। তাঁকে অভিবাদন করার এ এক বিশেষ উপায়।

কৈটভ দেখল সাধারণ যন্ত্রাদি দিয়েও বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা চালাচ্ছে। বিভিন্ন জার থেকেই ভকভক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কোথাও সাদা কোথাও রঙিন ধোঁয়া। আর রয়েছে মানুষের চেয়েও বড়ো বড়ো জার। কৈটভ এগিয়ে গেল সেইসব জারের দিকে। ফর্মালিন জাতীয় পদার্থের মধ্যে ভেসে আছে বিভিন্ন প্রাণী। প্রাণীগুলোকে দেখতে অদ্ভুত। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর কৈটভ ঠাকুরদার দিকে তাকাল। এই স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতেই কাজ হল। ঠাকুরদা হেসে বললেন,

“এবার বুঝলে তো, আমাদের সীমানা পৃথিবী নয়। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে বিস্তৃত। এই প্রাণীগুলো পৃথিবীর নয়। একেকটা একেকটা গ্রহের। আমরা এদের উপর পরীক্ষা চালাচ্ছি।”

“এরা কি জীবিত?”

ঠাকুরদা শুধু হাসলেন। এর অর্থ যে হ্যাঁ-সূচক তা যে কেউ বলে দিতে পারে।

মিথ সংঘকে নিয়ে কৈটভ ধীরে ধীরে নিঃসংশয় হয়ে যাচ্ছে। এরা যে সত্যি তাকে সাহায্য করার উপযুক্ত তাতে কোনো দ্বিধা নেই। তবু জেনে নেওয়া দরকার এদের প্ল্যান অব অ্যাকশন কী?

“বলছি বলছি। আগে চলো ভেতরের ঘরে।”

ঠাকুরদা যেন কৈটভের মনের প্রশ্নটা শুনে ফেললেন। এও কি কোনো যন্ত্রের কারসাজি? এখানে কোনো কিছুই অসম্ভব ঠেকছে না কৈটভের কাছে।

“হ্যাঁ এটাও যন্ত্রের কারসাজি। এই পরীক্ষাগারে বহু রকম আবিষ্কার আছে যা আমরা চাই না কোনোদিন কোনো ভুল মানুষের হাতে পড়ুক। অনেকেই ভেক ধরে এই পরীক্ষাগারে ঢুকতে পারে। তাদের মনের কথা কখনও গোপন থাকবে না। পুরো পরীক্ষাগারে একটা ছাতার আকারে নিউরোট্রান্সমিটার লাগানো আছে যার প্রধান কাজ কে কি ভাবছে তা আমাকে জানানো। তাই একগামে কোথায় কী হচ্ছে তা আমি সর্বক্ষণ জানতে পারি। এই দেখো আমার কানে একটা যন্ত্র লাগানো আছে। ইয়ার বাডের মতো। কিন্তু এর ক্ষমতা অসীম। এ সেই সব মনের কথা আমাকে বলতে থাকে। সারাদিন লাগানো থাকে। সব শুনতে পাই।”

“আপনার অস্বস্তি হয় না? সারাদিন কানে এসব কথা বাজছে!”

“এই পরীক্ষাগারটা কোনোভাবে অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে এটা ভাবলে বেশি অস্বস্তি হয়। তাই এইটুকু অস্বস্তি মানিয়ে নিয়েছি।”

কথা বলতে বলতে ওরা এসে হাজির হয়েছে একটা ঘরে। নিজের জন্য বরাদ্দ রাজকীয় সোফাটিতে ঠাকুরদা এলিয়ে বসলেন। কৈটভ বসল তার সামনে। সোফায় বসেই ঠাকুরদা বোম ফেললেন, “শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় চুরি করতে হবে। ব্রহ্ম পদার্থ।”

কৈটভ আশ্রমে থাকাকালীন শ্রীকৃষ্ণ নিয়ে ভালোই পড়াশোনা করেছে।

হিন্দুদের দেবতা কৃষ্ণ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান তার আছে। কিন্তু এই দেবতার হৃদয় চুরি করতে হবে মানে? ঠাকুরদা এসব কী বলছেন?

“মানে? কী বলছেন এসব?”

কৈটভ হতভম্ব। ঠাকুরদা মুচকি হাসছেন।

“শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় রয়েছে জগন্নাথদেবের শ্রীবিগ্রহের মধ্যে। তোমাদের যেরকম প্রতি বারো বছর অন্তর ক্রিয়াদি পালন করতে হয়, গন্দবেরুন্দা দেবতা প্রতি বারো বছরে একবার জেগে ওঠেন, ঠিক তেমনি জগন্নাথদেব-সহ বলদেব ও সুভদ্রা-র শ্রীবিগ্রহ প্রতি বারো বছরে একবার পরিবর্তন করা হয়। ব্রহ্ম পদার্থ এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী যন্ত্র। এই শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস কোনোটাই সম্ভব নয়। তথাপি এই ব্রহ্ম পদার্থ শক্তির সৃষ্টি করতে পারে। এই শক্তির মাধ্যমে ধ্বংস ও সৃষ্টি উভয়ই সম্ভব। যিনি এই ব্রহ্ম পদার্থ পরিচালনা করবেন তার উপর নির্ভরশীল এর ব্যবহার।”

কৈটভ ঠাকুরদা-কে মাঝপথে থমকে দিল, “কিন্তু শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় এত হাজার হাজার বছর পরেও কীভাবে সুরক্ষিত রয়েছে?”

“এ প্রশ্ন তোমায় মানায় না। গন্দবেরুন্দা দেবের খোলস যদি থাকতে পারে শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় কেন নয়। সাধারণের মতো ভাবলে আমাদের চলবে না। আচ্ছা কৈটভ তুমি ভেবে দেখো তো, ওই সময় বিজ্ঞান কতটা উন্নত হলে এই হৃদয় আজ অবধি অক্ষত থাকে। এটাকে হৃদয় না ভেবে আমরা বিজ্ঞানীরা উন্নত পেস-মেকার ভাবতে পারি। তিনি শ্রী কৃষ্ণ ছিলেন। তাঁর মতো বিজ্ঞানী ওই সময় কোথায়? আজকেও আমরা শক্তি উৎপন্ন করতে পারিনি। তুমি নিজে বারবার ব্যর্থ হয়েছ। তবেই ভেবে দেখো।”

ঠাকুরদার কথা কৈটভ মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। ঠাকুরদা বলতে লাগলেন, “এর পেছনে অনেক গল্প আছে। সেটা আরেকদিন বলা যাবে। আপাতত এটুকু বুঝতে হবে যে গন্দবেরুন্দা দেবতাকে জাগ্রত করতে হলে আমাদের ওই ব্রহ্মপদার্থ চাই। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে রয়েছে এই ব্রহ্মপদার্থ।”

“চলুন, যাই সেখানে। ছিনিয়ে নিয়ে আসি সেই বহু মূল্য ব্রহ্মপদার্থ।”

কৈটভের বালখিল্য কথাবার্তায় ঠাকুরদা হাসলেন।

“না, এত সহজ নয়। জগন্নাথ পুরী ভারতবর্ষের অন্যতম সুরক্ষিত জায়গা। আর তাছাড়া হিন্দু ছাড়া কেউ সেখানে প্রবেশ অবধি করতে পারে না। তাই তোমার প্রবেশ সেখানে সম্ভব নয়।”

“আমায় কে আটকাবে?”

কৈটভ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল।

ঠাকুরদা তাকে বোঝায়, “দেখো এইসব জায়গাতে বুদ্ধির ব্যবহার করতে হয়। শক্তির ব্যবহারে সব কাজ হয় না। তুমি যেতে পারবে না। কিন্তু তোমার বাহিনীর কি-বা জাতপাত? ওরা তো মানুষই নয়। জম্বি। ওরা তো যেতেই পারে। তাই না! তবে ওদের নিয়ে গেলেও যে কতটা সম্ভব হবে সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এখন তুমি এসেছ, তোমার সঙ্গে বসে একটা পরিকল্পনা করব।”

“এত পরিকল্পনা কেন? কে আছে যে আপনাকে আর আমাকে আটকাতে পারে?”

ঠাকুরদা উঠে দাঁড়ালেন। “মিথ সংঘের কথা কেউ জানে না। কিন্তু একজন জানেন।”

কৈটভও উঠে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, “কে জানেন?”

ঠাকুরদা কৈটভের দিকে সরাসরি তাকালেন। তারপর বললেন, “তোমার গুরুদেব। তিনি সব জানেন। তাঁর থেকে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।”