Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ২ – সৌরভ চক্রবর্তী

ব্রহ্মপদার্থ – ৫

(৫)

পরদিন মধ্যাহ্নভোজের পরে রামানুজ কোয়ার্টার থেকে বেরোয়। একা একাই হাঁটতে থাকে কোয়ার্টারের দিকে। গ্রামে পৌঁছে সোজা আশ্রমের দিকে রওনা দেয়।

আশ্রম আজকাল প্রায় ফাঁকা। দুর্গা বাচ্চাদের বাঁচিয়েছিল। দুর্গাই এখন বড়ো উদ্যানটিতে বাচ্চাদের শারীরচর্চা করাচ্ছে। এছাড়া কিছু শিষ্য রয়েছে। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে। রামানুজ অফিস ঘরের দিকে এগোয়।

রামানুজ অফিস ঘরে ঢোকামাত্র গুরুদেব কেঁপে উঠলেন, “কে…কে?”

“আমি রামানুজ গুরুদেব।”

“ওহ তুমি এসেছ? তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”

“আপনাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।”

“চলো, বসে আর কাজ নেই। বাইরে হাঁটতে হাঁটতে বলি। এমনিতেই শীতের দিনে একটু রোদের আঁচ গায়ে লাগলে ভালো লাগবে।”

রামানুজ বুঝল গুরুদেব নিজের মতো করেই তাকে বলবে। আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করা নিরর্থক। গুরুদেব অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। পেছনে রামানুজও তার অনুসরণ করল।

হাঁটতে হাঁটতে গুরুদেব আশ্রমের বাইরে চলে এলেন। তারপর আপন মনেই বলতে শুরু করলেন,

“বিজ্ঞানের প্রতি একটা উৎসাহ খুব ছোটো বেলা থেকেই ছিল। এই গ্রামের অংশ হওয়ায় গন্দবেরুন্দার নির্যাস নিয়ে কাজ অনেক ছোটোবেলা থেকেই আমি শুরু করে দিয়েছিলাম। আমার আগে যারা এই আশ্রম সামলেছেন তারা আরও তেজস্বী মানুষ ছিলেন। তাদের তত্বাবধানেই আমি বড়ো হতে থাকি। ওই সময় আমার সহপাঠী ছিল কর্কট। সে অসম্ভব প্রতিভাধর ছিল। আমাকে আর কর্কটকে নিয়ে আশ্রমের তৎকালীন গুরুদেব খুব আশাবাদী ছিলেন। আমরা নির্যাস নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা করতাম। গুরুদেব নিরীক্ষণ করতেন। গত বছর যে তোমাদের জঙ্গল অভিযানের সময় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ করে বৃষ্টি নামানো হয়েছিল, সেই আবিষ্কার আমি আর কর্কট মিলেই করেছিলাম। প্রায় আশি-নব্বই বছর আগেকার কথা তো হবেই।

রামানুজ চমকে উঠে বলল, “কী? নব্বই বছর? আপনার বয়স কত গুরুদেব?”

গুরুদেব ভাবলেশহীনভাবেই বললেন, “বয়স মনে নেই। কর্কটই প্রথম বয়স নিয়ন্ত্রক একটি মিশ্রণ তৈরি করেছিল। সেটাই আমরা এখনও ব্যবহার করি। আমাকে আরও বেশ কিছুটা সময় এটা ব্যবহার করতে হবে। সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রাম। আমিও যদি না-থাকি…”

গুরুদেব আপন মনেই কিছুক্ষণ বিড় বিড় করলেন। তারপর বললেন, “যাই হোক। আসল কথা হল এই কর্কট অতীব বুদ্ধিমান একজন বিজ্ঞানী। ওর একটাই দোষ ছিল। সে ছিল স্বার্থপর এবং বিধ্বংসী। সে একবার গন্দবেরুন্দার নির্যাস দিয়ে সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর কিছু বানাবার চেষ্টা করে। গুরুদেবের চোখে পড়ামাত্র তিনি তাকে অপমান করে গ্রাম থেকে বের করে দেন। তারপর থেকে আজ অবধি কেউ তাকে দেখিনি। কিন্তু আমি সেই সময় তার সঙ্গে এমন এক আবিষ্কার করেছিলাম যা প্রায় কেউই জানে না। অথচ সেটাই ছিল এই শতাব্দীর অন্যতম সেরা আবিষ্কার।”

গুরুদেব থামলেন। রামানুজের এই থেমে থেমে বলাটা পছন্দ হচ্ছিল না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অন্য কিছু করারও থাকে না। ধৈর্য ধরতেই হয়। গুরুদেব আরও কয়েক কদম চলার পর বললেন, “আমরা সময়ের গতির উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পেরেছিলাম।”

রামানুজ থমকে গেল। তার ভ্রু যুগল কুঁচকে গেল। সময়ের গতির উপর

নিয়ন্ত্রণ? গুরুদেব কী বলছেন এসব? মুখ থেকে অস্ফুট প্রশ্নবাণ বেরোল, “মানে?”

গুরুদেব নিরুত্তাপ। তিনি হেঁটেই চলেছেন।

“মানে তোমাদের ইংরেজি ভাষায় যাকে টাইম ট্রাভেল বলে, সেই টাইম ট্রাভেল করার উপায় বের করেছিলাম আমরা।”

“এ তো অসম্ভব? যতটুকু জানি আদতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব নয়।”

গুরুদেব এই প্রথমবার যেন ক্ষুব্ধ হলেন, “কে বলেছে অসম্ভব? সায়েন্টিফিকভাবে টাইম ট্রাভেল সম্ভব। শুধু তোমরা বহির্বিশ্বের কেউ সেটা করে দেখাতে পারোনি। আমরা পেরেছিলাম।”

রামানুজ বুঝল এখন শুধু শোনার সময়, প্রশ্ন করার নয়। গুরুদেবের মানসিক স্থিতি এই মুহূর্তে ভালো নয়। সে হাত তুলে বলল, “বেশ বেশ। আমরা করতে পারিনি। কর্কট আর আপনি পেরেছিলেন। কিন্তু কীভাবে আপনারা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন?”

গুরুদেব ধাতস্থ হয়ে গেছেন ইতিমধ্যে। আবার হাঁটতে থাকলেন। রামানুজ দেখল গুরুদেবের দেহটা বেশ কুঁজো হয়ে গেছে। এরকম তিনি আগে ছিলেন না। খুব মানসিক চাপ যাচ্ছে নিশ্চয়ই।

গুরুদেব বললেন, “মোটামুটি দু-তিনভাবে টাইম ডাইলেশন সম্ভব যার মাধ্যমে টাইম ট্রাভেল করার পরিস্থিতি উৎপন্ন হতে পারে। প্রথমত আলোর গতিবেগের সমান গতিবেগ বা বেশি গতিবেগে যদি আমরা ছুটতে পারি অথবা সেরকম গতিসম্পন্ন কোনো যানে আমরা চড়ে বসি তবে আমরা ভবিষ্যতের পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারব। উদাহরণ হিসেবে আমরা একটি ঘড়িকে যদি মাটিতে রাখি এবং একটি ঘড়িকে উচ্চগতিসম্পন্ন বিমানে বসিয়ে দিই তাহলে আকাশে কিছুদিন ভ্রমণ করার পর যখন বিমান মাটিতে নামবে তখন দুটো ঘড়ির মধ্যে কিছু ন্যানো সেকেন্ডের পার্থক্য থাকবে। ওটাই টাইম ট্রাভেল। আমরা এখনও এত দ্রুত গতিসম্পন্ন জেট বিমান বানাতে পারিনি যা আলোর গতিবেগ অর্থাৎ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটারের সমান বা বেশি গতিসম্পন্ন হবে।”

“দ্বিতীয় উপায়?” রামানুজ জিজ্ঞেস করল।

“আইনস্টাইন বলেছিলেন যে টাইম গ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ বলের উপর নির্ভর করে। এই যে আমি তুমি মাটির সঙ্গে আটকে আছি বা লাফ দিলে নীচেই নেমে আসি এসবই মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব। এগুলো বাচ্চারাও জানে। বিস্তারিত বলছি না।”

“হ্যাঁ গুরুদেব এগুলো জানি। আপনি আসল ঘটনাটাই বলুন।”

“আইনস্টাইন টাইমকে একটা জালের মতো কল্পনা করতে বলেছেন। স্পেস টাইম ফেব্রিক বলা হয় এই জালকে। এবার এই জালের উপর যদি পৃথিবী আর বৃহস্পতি দুটো গ্রহকে রাখা হয় তাহলে পৃথিবীর চেয়ে বৃহস্পতি জালের অধিক গভীরে চলে যাবে। কারণ পৃথিবীর চেয়ে বৃহস্পতি অনেক বড়ো গ্রহ। তার ভর ও ভার দুটোই পৃথিবীর চেয়ে বেশি। এই একই কারণে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের চেয়ে বৃহস্পতি গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ বল অনেক বেশি কারণ সে জালিকার অনেক গভীরে চলে যাচ্ছে। এবার এই গভীরে যাবার ফলে গ্রহের চারদিকে একটা কার্ভ বা বক্ররেখার সৃষ্টি হয়। এই কার্ভ বা বক্ররেখা গ্রহ নক্ষত্র প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা। কারও বেশি কারও ক্ষেত্রে কম। এবার আইনস্টাইন বলেছিলেন যার বক্ররেখা যত বেশি অর্থাৎ যার মাধ্যাকর্ষণ বল যত বেশি তার তত কাছে এলে সময়ের গতি তত ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে যে মানুষ সময় কাটাচ্ছে সেই মানুষ যদি বৃহস্পতিতে গিয়ে সময় কাটায় এবং কিছু বছর পরে পৃথিবীতে ফিরে আসে তবে দেখবে পৃথিবীতে কিছু বছর নয়, কয়েকশো বছর কেটে গেছে। এভাবেও ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেল করা সম্ভব।”

“গুরুদেব আরেকটু সহজ ভাষায় বলুন।”

রামানুজ আরেকটু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে। গুরুদেব বুঝিয়ে বললেন,

“গোদা বাংলা ভাষায় যদি আমরা কোনো স্থানের গ্র্যাভিটি কমাতে বা বাড়াতে পারি তাহলে টাইম ট্রাভেল সম্ভব। তবে এর মাধ্যমে শুধুমাত্র

ভবিষ্যতে যাওয়া যায়। পেছনে যাওয়া যায় না।”

“ইন্টারেস্টিং। আর পেছনে কীভাবে সম্ভব?”

“পেছনে যাওয়টাই সবচেয়ে কঠিন। এই পেছনে যাবার কঠিন কাজটাই করেছিল কর্কট। তাই আমি তাকে আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবি। কারণ আমি শুধুমাত্র ভবিষ্যতে যাবার প্রক্রিয়া বের করেছিলাম।”

“তার মানে পেছনে যাওয়াও সম্ভব!”

রামানুজ অবাক হওয়ার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।

“হ্যাঁ সম্ভব। মেমোরিগুলোকেও দেখা সম্ভব। তবে প্রথম উপায়ে তা শুধুমাত্র একটা আলোর ঝলক মাত্র ও কিছু দৃশ্যমাত্র। শোনো, আমরা জানি আকাশে যে তারা আমরা দেখি তাতে দূরত্ব মাপা হয় আলোকবর্ষের মাধ্যমে। অর্থাৎ কোনো নক্ষত্র থেকে আলো আমাদের চোখে আসতে কত আলোকবর্ষ সময় নিল তাই হচ্ছে সেই নক্ষত্রের সঙ্গে দূরত্ব। তাহলে যদি ধরি আলো পৌঁছোতে পঞ্চাশ আলোকবর্ষ সময় নিয়েছে, তবে সেই আলো আজ থেকে পঞ্চাশ আলোকবর্ষ আগের আলো। অর্থাৎ আমরা যে ছবি দেখছি তা এত বছর পুরোনো। এখন সময় পালটে গেছে। সেই আলো আবার পঞ্চাশ আলোকবর্ষ পরে আসবে। অর্থাৎ আকাশে যেসব আলো আমরা দেখতে পাই সেই সময় ওই গ্রহ ও নক্ষত্রগুলো ইতিমধ্যে কাটিয়ে ফেলেছে। বর্তমানের আলো বা ছবি আমাদের কাছে কোনোদিনই পৌঁছায় না। কিন্তু এই আলো বা ছবি একটা ঝলক মাত্র। আমরা চাই অতীতে পৌঁছে সেখানে সময় কাটাতে। সেটা কী করে সম্ভব?”

গুরুদেবের প্রশ্নে রামানুজও বলে, “হ্যাঁ, সেটাই তো। সেটা কী করে সম্ভব?”

“সম্ভব। একটু আগে যে সময় জালিকার কথা তোমাকে বললাম, যদি কোনো প্রক্রিয়ায় সেই সময় জালিকার মধ্যে ওই গ্রহের মাধ্যমে এত প্রেসার উৎপন্ন করা যায় যে সেই সময় জালিকা ছিঁড়ে যাবে এবং গ্রহ এপার থেকে

ওপারে চলে যাবে তবেই অতীতে যাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে ছিঁড়ে যাওয়া অংশে ওয়ার্ম হোল সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সময়ের গতিপথের এদিক থেকে ওইদিকে যাওয়া সম্ভব।”

“মাই গুডনেস!”

গুরুদেবের ব্যাখ্যা শুনে রামানুজ প্রায় মাথায় হাত দিয়ে ফেলল।

“কিন্তু সব ভালো কিছুরই একটা শেষ থাকে। আমার আর কর্কটের বন্ধুত্বেরও একটা শেষ ছিল। তার লোভ তাকে আমাদের সকলের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। এরকমই একদিন জানতে পারি যে, সে পালিয়েছে। যাবার সময় সে তার আবিষ্কারটি নিয়েও পালায়।”

গুরুদেব এবার হাঁটা থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। রামানুজের দিকে তাকালেন।

রামানুজ বলল, “তাহলে সেই অমূল্য আবিষ্কার আর নেই? চুরি হয়ে গিয়েছে?”

গুরুদেব মাথা ঝাঁকালেন, “অর্ধেক আছে। ভবিষ্যতে যাবার যন্ত্র আমার কাছে ছিল। সেটা রয়ে গেছে। কর্কট অতীতে যাবার যন্ত্র নিয়ে পালিয়েছিল।”

রামানুজ যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। জিজ্ঞেস করল, “কর্কট কোথায় আমাকে বলুন। জীবিত থাকলে আপনার সামনে উপস্থিত করছি।”

গুরুদেব এবার হাসলেন, “মিথ সংঘ। কর্কট বলে আর কেউ ওকে চেনে না। ভীষণ শক্তিশালী এক সংঘ তৈরি করেছে সে। তার পরীক্ষাগারে এহেন যন্ত্রপাতি কিছু বাদ নেই যা এখানে আছে। সব ধীরে ধীরে আবার নিজস্ব প্রক্রিয়াও তৈরি করেছে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের দিকেই তার ঝোঁক ছিল বেশি। সেসব নিয়েই কাজ করেছে আজীবন। কোনোদিন আমাদের গ্রামের দিকে তাকায়নি। আমরাও কোনোদিন ওর দিকে তাকাইনি। আমরা গন্দবেরুন্দাকে নিয়ে খুশি ছিলাম। আমাদের চক্র সামলাচ্ছিলাম আর মানবসভ্যতার রক্ষা করছিলাম। গোল বাঁধলো গন্দবেরুন্দাদেব চুরি হবার পর থেকে।”

“হ্যাঁ সেটা তো আমি থাকাকালীনই হয়েছিল।”

“হুম। আমাদের এত বছরের আরাধ্য দেবতা চুরি হয়ে গেল। হেমন্তাই-কে গলা কেটে হত্যা করা হল। আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লাম।”

“আচ্ছা আপনারা দেবতাকে আর খুঁজলেন না কেন? সেই ইচ্ছেটাও কিন্তু আমি দেখিনি। আগেরবার যতদিন ত্রিপুরায় ছিলাম দেখলাম আপনারা একদম চুপচাপ।”

রামানুজ প্রশ্নটা না করে পারল না।

“কী বলছ এসব? আমাদের কি আমাদের আরাধ্যের চিন্তা নেই? কেন খোঁজার ইচ্ছে থাকবে না। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ আমাদের লোকবল একেবারে শেষ। একটা গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু টিকে আছে আমার আশ্রম, কিছু স্বেচ্ছাসেবক আর কিছু বাচ্চা। এটা লড়াইয়ের সময় ছিল না, ছিল সামলে উঠার কাল। আমি সেই চেষ্টাই করেছিলাম। এখনও তাই করে চলেছি।”

রামানুজ বুঝিতে পারল এটা খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। এটাকে খুঁচিয়ে লাভ নেই। সে বলল, “আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না বর্তমানে আমরা কোন সমস্যায় পড়েছি যে আমাকে আপনি দিল্লি থেকে ডেকে পাঠিয়েছেন।”

রামানুজের কনুই স্পর্শ করে গুরুদেব বললেন, “চলো বেদিটায় বসি। বসে বলছি সমস্ত ঘটনা।”

ওরা বসল। গুরুদেব হাত নেড়ে বললেন, “এত বছরে প্রথমবার কর্কট আমার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করল। আজ থেকে দু-সপ্তাহ আগের কথা। আমি তখন ধ্যানে মগ্ন। আচমকাই একটা শব্দ হল। দেখলাম আমার সামনে যে ঘরের ফাঁকা অংশটি আছে তা আলোয় ভরে উঠছে। শূন্যের মধ্যে রচিত হচ্ছে একটা আলোকিত দরজা। ধীরে ধীরে সেই দরজা স্পষ্ট হল। আর দেখলাম সেই আলোক বলয়ে বেষ্টিত দরজার ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে কর্কট। সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো চশমা। একেবারেই পালটে গেছে। কিন্তু আমি তো এক দেখাতেই চিনতে পেরেছি। আর দেখেই বুঝতে

পেরছিলাম ওর আগমন কোনো ভালো বার্তা বয়ে আনবে না। সে হাসিমুখে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। শ্বেতবস্ত্রে আমি বসেছিলাম, সামনে সাদা আলোর ছটা, তার ভেতরে সাদা পরিধেয়তে কর্কট। ঘরটা আলোয় আলোয় ভরে উঠল। আমি শুধু তাকিয়ে থাকলাম। কোনো কথা বললাম না। কর্কটই প্রথম জিজ্ঞেস করেছিল, “কেমন আছো?”

বলেছিলাম, “কেন এসেছ?”

সে বিচ্ছিরি হেসেছিল। তারপর বলল, “এত বছর পর বন্ধু ফিরে এসেছে তোমার তো খুশি হবার কথা। তা না হয়ে…”

আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে কেটে কেটে উচ্চারণ করলাম, “ব-ন্ধু!”

সে গম্ভীর হয়ে গেল। তাচ্ছিল্য তার কোনোকালেই পছন্দ নয়। সে সরাসরি কাজের কথায় চলে এল। বরাবর তার এরকমই অভ্যেস।

সে বলল, “তোমাদের বারো বছরের চক্র যে নষ্ট করেছে তার নাম কৈটভ। জানো বোধহয়। সে-ই তোমাদের দেবতাকে চুরি করেছিল। মারাত্মক বুদ্ধিমান যুবক। খুব উচ্চাকাঙ্খী, ঠিক আমারই মতো। মনে মায়া দয়া নেই। সে মৃতকৈটভ বলে এক সঞ্জীবনী আবিষ্কার করেছে। ভাবতে পারো, নিজের নামেই নাম রেখেছে- কতটা ঔদ্ধত্য। সে এবার আরও বড়ো ছক কষেছে। আর কী বলো তো, তার পাশে এবার আমি আছি। যে মানবসভ্যতা বাঁচাতে সারাটা জীবন দিয়ে দিলে এবার সেটাই ধ্বংস করব আমরা।”

আমি কর্কটের কথা শুনে একাধারে স্তম্ভিত এবং অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। বলেছিলাম, “তোমরা কী করতে চলেছ?”

সে সজোরে হেসে বলেছিল, “সেটা এখন বলব এটা ভাবলে কী করে? তবে আজ কিন্তু আমি শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। অন্য কেউ হলে আমার নাতিদের পাঠাতাম, তোমার জন্য আমি নিজেই এসেছি। শত হোক বন্ধু বলে

কথা!”

বলে আবার বিচ্ছিরি হাসল।

“সময় যন্ত্রটা ব্যবহার করব ভাবছি। চাইলে একাও করতে পারি। কিন্তু তাতে মজা নেই। দুজনে মিলে করি চলো। পৃথিবী এক অন্য মজা পাবে।”

আমি ক্ষিপ্র হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, “অসম্ভব। তুমি চুরি করেছিলে আশ্রমের জিনিস। সেটা ফেরত দাও।”

“আচ্ছা। তাই নাকি! আমার নিজের আবিষ্কার আশ্রমের হয়ে গেল? চোর আমি না তোমার আশ্রম!”

আমার হাতের কাছে ছিল ভস্ম করে দেওয়ার নির্যাস। আমি কালবিলম্ব না করে সেই নির্যাস ছুড়ে দিয়েছিলাম সেই আলোক বলয়ের দিকে। সাধারণত এই নির্যাস যা কিছুর গায়ে লাগে তাকে মুহূর্তের ভগ্নাংশে ছাইয়ে পরিণত করে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে এতে কর্কটের কিছুই হল না। বরং মেঝের যেখানে পড়ল সে অংশ ছাই ভস্মে পরিণত হল।”

কর্কট বিকট শব্দে হেসে উঠল।

“ইলিউশন বোঝো গুরুদেব, আমি আসলে তোমার সামনে নেই। দাঁড়িয়ে আছি আমার পরীক্ষাগারে।”

আমি দমে গেলাম। কর্কট বলতে লাগল, “তোমার উত্তর তো মোটামুটি পেয়েই গেছি। তবে আর কী? এত বছর পর একটা যুদ্ধ হয়েই যাক। না না, যুদ্ধে আমারও ইচ্ছে নেই। বরং একটা খেলা খেলি চলো। ব্রহ্মপদার্থের নাম শুনেছ?”

আমি আঁতকে উঠলাম। মাথা নেড়ে জানালাম যে আমি জানি ব্রহ্মপদার্থ কী বস্তু।

সে বলল, “সেটা চুরি হতে চলেছে। আর আমি বর্তমান সময়ে এটা চুরি করব না। এবারকার খেলাটা তোমার বুদ্ধির জোরের উপর নির্ভর করবে। আজ আসি। আবার আসব। ততক্ষণে যদি মত পালটাও জানিও। তাহলে তোমার পক্ষেও মঙ্গল, আর তোমার এই যতটুকু বেঁচে আছে

ওইটুকুনি গ্রামের পক্ষেও মঙ্গল।”

আমি মরিয়া চেষ্টা করলাম, “কী করবে তোমরা ব্রহ্মপদার্থ দিয়ে? তোমাদের কী পরিকল্পনা?”

কর্কট হেসে বলল, “আমি করলে তো ভয়টা কম ছিল, করবে কৈটভ। তার কোনো ভরসা নেই।”

আমার মুখ শুকিয়ে গেল। যে পিশাচ নিজের গ্রাম ধ্বংস করে নিজের ঘোষণা দিতে পারে তার হাতে ব্রহ্মপদার্থ পড়লে কী হবে তা আমি ভাবতেও পারছিলাম না। চিৎকার করে উঠলাম, “কর্কট, এটা তুমি হতে দিতে পারো না। এতদিন আমরা যেভাবে একে অপরের পথে আসিনি সেভাবেই থাকবে তুমি।”

কর্কট এবার তাচ্ছিল্যের হাসিটা আমায় ফিরিয়ে দিল, “কর্কট মরে গেছে বহুকাল আগে। আজকাল আমাকে সবাই ঠাকুরদা ডাকে। চলি গুরুদেব। আবার আসব।”

গুরুদেব সমস্তটা বলে থামলেন। বিধ্বস্ত লাগছিল তাঁকে। রামানুজ চুপচাপ বসে রইল তার সামনে।

গুরুদেব একটু ধাতস্থ হলে সে জিজ্ঞেস করল, “ব্রহ্মপদার্থটা কী?”

গুরুদেব উত্তর দেবার আগেই একটা শব্দ হল। রামানুজ তড়িৎবেগে গুরুদেবকে ধরে বেদি থেকে মাটিতে ঝাঁপ দিল। শব্দটা আবার হল। দুজনেই ধুলোমাখা শরীরে মাথা তুলে দেখলেন যেখানে তাঁরা বসে ছিলেন ঠিক দুজনের মাথার ইঞ্চি ছয়েক উপরে দুটো তির বট গাছটায় বিঁধে আছে। তিরের গা বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে কোনো পদার্থ। গুরুদেব বললেন, “বিষ।”

রামানুজ আরও অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করে উঠে দাঁড়াল। কুয়াশা এখন প্রায় নেই। তবুও কাউকে দেখা গেল না। রাস্তার দিক থেকেই সম্ভবত এসেছে এই তির। কিন্তু রাস্তার ওধারেও জঙ্গল। তাই কেউ মেরে এতক্ষণে নিশ্চয়ই

পালিয়ে গিয়েছে। রামানুজ তিরটাকে অনেকক্ষণ ধরে জরিপ করে বলল, “আমাদের মারতে নয়, বরং একটু ভয় দেখাতেই এই পরিকল্পনা। তিরে বিষ লাগানো হয় বহুদিন আগে। এই দুটো তিরে বিষ লাগানো হয়েছে সদ্য।”

গুরুদেবকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে দুর্গা এসে পড়েছিল। রামানুজ দেখল তার জন্য খাবার নিয়ে আসছে কাঞ্চনও।

“গুরুদেব আপনি ঠিক আছেন তো? কী হয়েছিল?”

গুরুদেব উঠে দাঁড়িয়েছেন।

“ঠিক আছি। ওই দেখো।”

দুর্গাকে তির দেখালেন তিনি।

“রামানুজদা, অনেকটা সময় হয়ে গেল। তাই তোমার খাবারটা ভাবলাম দিয়ে যাই।”

কাঞ্চন এসে দাঁড়িয়েছে রামানুজের পাশে। রামানুজ তাকে জিজ্ঞেস করল, “রাস্তায় কাউকে দেখলি? এই তিরগুলো মেরে পালিয়েছে।”

কাঞ্চন মাথা নেড়ে বলল, “না কাউকে দেখিনি তো।”

“হুম। আচ্ছা গুরুদেব চলুন, আরও কিছু কথা আছে। কাঞ্চন, এখন খাব না। ফিরে খাচ্ছি। তুই যা।”

রামানুজ গুরুদেবকে নিয়ে আশ্রমের দিকে এগিয়ে গেল।

কাঞ্চন একবার দেখল দুর্গা দাঁড়িয়ে আছে। গুরুদেবের সঙ্গে ফিরে যায়নি। রামানুজ আর গুরুদেব ওদের ফেলে ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে গেছে। দুর্গা তার দিকে বারকয়েক তাকাচ্ছে। কাঞ্চন আর সময় নষ্ট করল না। রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল।

দুর্গা কাঞ্চনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল। একবার ভাবল কাঞ্চনকে ডাকবে। মনে মনে বারকয়েক ডেকেও নিল। কিন্তু কাঞ্চনের সঙ্গে সে যা করেছে আজীবন, তাতে সে কাঞ্চনকে ডাকার সাহসটাই পেল না। কাঞ্চন ধীরে ধীরে বড়ো রাস্তায় উঠে হারিয়ে গেল। দুর্গা দাঁড়িয়ে রইল গ্রামের মাঝখানে। হঠাৎ করেই দুর্গার নিজেকে খুব একা মনে হতে লাগল। গুরুদেবও এই সংকটের মুহূর্তে রামানুজের সাহায্যের কথা ভাবছেন। যে বীরাঙ্গনা হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে সে তার ছোটোবেলার বন্ধুকে ছেড়েছিল, যৌবনের সুখ ছেড়েছিল, আজ ক্রমশ সেই বীরাঙ্গনা হবার ইচ্ছেটাই তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

গ্রামের মাঝে একা দাঁড়িয়ে রইল দুর্গা।