Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

হলাহল বিষভাণ্ড – ২

।। ২।।

গুরুদেব কর্কটকে নিয়ে গ্রামে ফিরেছেন কিছুদিন হয়েছে। কর্কট এখনও স্বাভাবিক হননি। নিজের বানানো সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য তাঁর একটি ভুলে শেষ হয়ে গিয়েছে। এই ধাক্কাটা তিনি সইতে পারছেন না। আশ্রমেই থাকেন সারাদিন। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেন না। তাঁর কয়েকজন নাতি সেদিন বেঁচে গিয়েছিল। তারা আশেপাশে থাকে ঠিকই, কিন্তু তাদের সঙ্গেও কোনো কথা বলেন না কর্কট। গুরুদেব বারকয়েক চেষ্টা করেছিলেন।

“কী হবে আর এসব ভেবে? তোর শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

কর্কট উত্তর দেন না। চুপ করে বসে থাকেন। গুরুদেব আবার চেষ্টা করেন, “আমারও তো সব গেছে। ঘুরে দাঁড়াতে তো হবেই। কিছু কি আর করার আছে?”

কর্কট শুধু একবার বলেছিলেন, “কৈটভকে বিশ্বাস করার মতো ভুলটা করলাম কীভাবে? প্রায়শ্চিত্ত কীভাবে করব? আমার কতগুলো সন্তানকে মেরে ফেলল। নাতিগুলো আমার সন্তানের চেয়েও অধিক প্রিয়।”

গুরুদেব বললেন, “আবার মিথ সংঘ তৈরি কর।”

কর্কট ওরফে ঠাকুরদা মাথা নাড়লেন, “আর হবে না। মিথ সংঘ শেষ।”

গুরুদেব শেষ চেষ্টা করলেন, “তাহলে কৈটভকে এভাবেই ছেড়ে দিবি?”

কর্কটের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল কথাটা শুনে।

“ওর সর্বনাশের রাস্তা আমিই বানাব। আমার নাতিদের দিব্যি, কৈটভের কফিনে পেরেক মারা শুরু করব আমিই। শেষ পেরেকগুলো তোরা মারিস। বিশ্বাসঘাতক!”

গুরুদেব আর কথা বাড়ালেন না। চলে গেলেন নিজের কক্ষে। রাগে দুঃখে গজগজ করতে থাকলেন কর্কট। রামানুজ ত্রিপুরা ছেড়ে অন্য জায়গায় যায়নি। আপাতত রয়ে গেল এদিকেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে সম্পূর্ণ কেস হিস্টোরি পাঠাবার পর সকলেরই মনে হল আপাতত কিছুদিন সে এদিকে থাকলেই ভালো। দেশের জন্য রামানুজের এই পোস্টিং-ই বহাল থাকল।

সিনহা সাহেবের দাহকার্য সামরিক রীতিনীতি মেনে পালন করা হয়েছিল। গান স্যালুট দিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে সিনহা সাহেবের। রামানুজকে সিনহা সাহেব সবসময় এক আলাদা নজরে দেখেছেন। একটা দারুণ বন্ধুত্ব ছিল তাঁদের মধ্যে। সিনহা সাহেবের শেষ পরিণতি রামানুজের চোখের সামনে ঘটেছিল। সেই দৃশ্য মনে পড়লে রামানুজের চোখে জল আসে। সে এখনও সিনহা সাহেবের মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। প্রতিশোধের আগুনে সে-ও পুড়ছে।

আজকাল মাঝে মাঝে গভীর ঘুম থেকে চকিতে লাফ দিয়ে ওঠে রামানুজ। তার সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে থাকে। বারবার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিনহা সাহেবের শেষ পরিণতি। মাথা থেকে মেরুদণ্ড অবধি উপড়ে ফেলেছিল কৈটভ। উফ কী ভয়ানক পরিণতি! সিনহা সাহেব শেষ মুহূর্তে কিছুই হয়তো টের পাননি। চকিতে মৃত্যুবাণ এসেছিল। সিনহার ডিউটিরত অবস্থায় এরকম পরিণতি এবং গ্রামের সমস্ত ব্যাপার জানার পর থেকে প্রশাসন গ্রামের দিকে ফাঁড়ি বসিয়েছে। প্রতিনিয়ত টহল চলতে থাকে। রামানুজ নিজে কোয়ার্টারেই বেশিরভাগ সময় কাটায়। তার ওপর শুধু এদিককার ই দায়িত্ব। সে এই গ্রাম নিয়ে সদা মগ্ন

গুরুদেব আর রামানুজ মাঝে মাঝে বসেন। কথা হয় নানান জিনিস নিয়ে। রামানুজের মন যখন একেবারেই বসে না তখন গুরুদেবের আশ্রমে চলে যায়। সেখানে গুরুদেবের সঙ্গে গোপন কক্ষে নানান বিষয়ে আলোচনা চলে। গুরুদেব রামানুজকে জিজ্ঞেস করেন, “কর্কট তো আইনের চোখে দোষী নয়। তার ওপর চার্জশিট ফাইল হবার কোনো সম্ভাবনা আছে কি?”

রামানুজ মাথা নাড়ে।

“কর্কট তো সিনহাকে মেরে ফেলার জন্য নিজের আবিষ্কারগুলো করেনি। সেটা অপব্যবহার করেছে কৈটভ। আর তাছাড়া বাকি জিনিস তো চুরি করেছে সে। তাই যা দোষ সবটাই আইন অনুযায়ী কৈটভের। আবিষ্কারকের দোষ নেই। কিন্তু আমি যদি তলিয়ে দেখি তাহলে সেও সমান দোষী।”

গুরুদেব হাত তুলে বারণ করেন, “আপাতত আর এসব প্রসঙ্গ তুলো না। এমনিতেই মন-মরা হয়ে পড়ে থাকে সারাক্ষণ। এসব শুনলে হয়তো নিজের জীবনটাই ত্যাগ করে ফেলবে।”

রামানুজ অন্য প্রসঙ্গে বলে, “অতীতের গুরুদেব অর্থাৎ আপনি এবং হেমন্তাই এরকম বিবেকবুদ্ধিহীন দুটো সিদ্ধান্ত নিলেন কীভাবে? বর্তমানে কৈটভ যেমনই হোক তাতে কৈটভের মা-বাবা এমনকি অতীতের কৈটভেরও তো কোনো দোষ নেই। তাহলে তাদের শাস্তি দেওয়া হল কেন? এরকম বিবেচনাহীন সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারে কেউ?”

গুরুদেব মাথা নাড়েন, “না রামানুজ পারে, পারে। এরকম সিদ্ধান্তও নিতে পারে দুইজনে।”

রামানুজ ভ্রু কুঁচকায়।

“কেন নিতে পারে এরকম হত্যার সিদ্ধান্ত? ওরা কারা যে গ্রামের মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে?”

গুরুদেব বললেন, “আমিও তখন খুব আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম। সে না হয় অতীতের গুরুদেব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু লোকটা তো আমিই ছিলাম। ফলে তার সিদ্ধান্তের দায় আমি একেবারে এড়িয়ে যেতে পারি না। যে দুটো সময়ে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে সেটা ছিল এক অগ্নিগর্ভ সময়। সেই সময় দেবতা গন্দবেরুন্দাকে নিয়ে বেশ কিছু খবর বেরিয়ে পড়েছিল সভ্য সমাজে। ডামাডোলের বাজারে বহু মানুষ ভারত থেকে বাংলাদেশে যাবার পথে এই অরণ্যেই মারা গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কখনো-কখনো আমাদের গ্রামের বাছাই করা কিশোরগুলোও থাকত। তারা গ্রামের একেবারে অভ্যন্তরে কাউকে যেতে দিত না। ভেঙেই বলি। ওদের মেরেই ফেলা হত। বিষ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে মারা হত তাদের। তাই আমরা তখন ব্যতিব্যস্ত থাকতাম। আর একটা ব্যাপার হল আমরা পৃথিবীকে বাঁচানোর তাগিদে এতই বেশি মত্ত ছিলাম যে সেই স্বার্থে যে-কাউকে মেরে ফেলার পক্ষেই আমাদের রায় থাকত। আর তখন এরকমই এক সময় যে, টালমাটাল পরিস্থিতি থাকত সবসময়। কেউ বিশেষ খোঁজখবরও নিত না। এই পরিস্থিতি পরবর্তীকালে পালটায়। তো যে সময়ে ওর মা-বাবাকে মারা হয়েছিল সেই সময়ের সাপেক্ষে বিচার করলে, গুরুদেব বা হেমন্তাই-এর এরকম সিদ্ধান্তই নেওয়ার কথা। যেখানেই বিপদ দেখবে তাকে শেষ করে দাও। সেই বিবেচনাতেই নিশ্চয় এই কাজটা সংঘটিত হয়েছিল।”

রামানুজ মাথা ঝাঁকায়, “আমরা প্রায় গুটিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু এই হত্যাগুলো এখন কৈটভের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আগে শুধুমাত্র কৈটভের ব্রহ্মাণ্ড জয়ের স্বপ্ন ছিল। সেটা রুখে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রতিশোধ খুব মারাত্মক জিনিস। এবার এই কাহিনির অন্ত কোথায় আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”

গুরুদেব বললেন, “হ্যাঁ আমিও ক-দিন ধরে তাই ভাবছি। তার ওপর কর্কটের আবিষ্কৃত সমস্ত কিছু সে নিয়ে পালিয়েছে। শত্রুকে হারানো সবসময় সম্ভবপর হয় না। বিশেষত যখন আমাদের শক্তি বাড়ছে না। অথচ শত্রুর শক্তি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।”

রামানুজ উঠে দাঁড়ায়, “তা বলে বসেও তো থাকা যায় না। ভেবেছিলাম ব্ৰহ্ম-পদার্থটা অন্তত তার হাত থেকে বাঁচানো গেছে। কিন্তু ঠাকুরদার টাইম ট্র্যাকার সে গুড়েও বালি দিয়েছে। কেন যে লোকটা কৈটভকে এত বিশ্বাস করল? এরকম বিচক্ষণ লোক কীভাবে এরকম একটা ভুল করতে পারে।”

গুরুদেব মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “লোভ আমাদের দিয়ে সমস্ত কিছু করাতে পারে। তাই সবই সম্ভব। আজকে যে, কর্কট নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না তা একেবারেই স্বাভাবিক। সে নিজের থেকে এরকম কিছু নিজেই আশা করে না। শুধুমাত্র মৃতকৈটভ পাওয়ার আশায় সে এগুলো করেছিল। সে বুঝতে পারেনি কৈটভের মতো শয়তান কারও আপন হয় না। কৈটভ শুধু তার বন্ধুদের ব্যবহার করতেই জানে। সে এই দুঃখ সেদিন বুঝবে যেদিন কেউ বন্ধু হয়ে এসে তাকে ব্যবহার করে চলে যাবে।”

রামানুজ এবার হাসল, “এ কোনোদিনই সম্ভব নয়।”

গুরুদেব হাসেন, “কিছুই বলা যায় না। পৃথিবীটা ছোটো, কিন্তু জীবনটা নয়। কখন কী ঘটে যায় কেউ জানে না!”

রামানুজ এসবের মাঝে হঠাৎ বলল, “গন্দবেরুন্দা দেবতার পূণ্য খোলসটি কৈটভ তার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। সেটা ঠাকুরদার হেফাজতে ছিল। আমি সেই খোলসটি আনিয়ে সুরক্ষিত জায়গায় রেখেছি। পরবর্তীকালে যদি কৈটভ এই খোলস পেয়ে যায় তবে গন্দবেরুন্দাকে বশ করবে। এরপর পৃথিবীর ধ্বংস শুধু কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা মাত্র। আমরা কেউ কিচ্ছু করতে পারব না।”

গুরুদেব রামানুজের পিঠ চাপড়ে দিলেন, “খুব ভালো কাজ করেছ।” তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন, “একদা যে দেবতাকে এত আগলে আড়ালে রেখেছিলাম তাঁকে এখন এই রাজ্যের সবাই চেনে। সবই হয়েছে লোভী-কৈটভের জন্য। এই কৈটভকে শেষ করাটা জরুরি। শয়তানটা সমস্ত কিছু নষ্ট করে দিল। আমাদের গ্রামের শান্তি, সমৃদ্ধি, আচার-আচরণ এসব তো কেউই জানত না আগে। এখন সবাই জানে। কিছুই আর গোপন নেই। কিছু হলেই খবরের কাগজের লোক এসে নানান প্রশ্ন করে। আমি এসব পাশ কাটিয়ে চলি। পছন্দ করি না এগুলো। কিন্তু সব তথ্য ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।”

রামানুজ কিছুই বলে না। সে এখন পরের যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক কঠিন যুদ্ধ সামনে। সেদিন আর কথা এগোয় না। রামানুজ ফিরে আসে। ফিরে আসার আগে গুরুদেব তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আচ্ছা শুধু কি কৈটভ প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসছে? তুমি-আমি? আমরা ফুঁসছি না?”

রামানুজের চোখে এই প্রথমবার আগুন দেখলেন গুরুদেব। সে বলল, “কৈটভের সঙ্গে পরবর্তী সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছি। দেখি মানুষ বড়ো নাকি শয়তান?”

গুরুদেব সেদিন ভয় পেয়েছিলেন এই রামানুজকে দেখে। আরও কিছুদিন কেটে যায়। গুরুদেব কর্কটকে নিজের মতো করে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু কর্কটের মধ্যে আর আগের তেজ কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। তিনি শুধু দিনযাপনের জন্যই দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর নাতিদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়াও ধীরে ধীরে কমিয়ে দিয়েছেন। একবার গুরুদেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার আশ্রমেই তো পরীক্ষাগার তৈরি করে আবার কাজ করতে পারিস।”

কর্কট উত্তরে বলেছিল, “অনেক হয়েছে। এবার বিশ্রাম।”

গুরুদেব বলেছিলেন, “তোর নাতিগুলো তো পরীক্ষাগারে সময় কাটাতে পারবে।”

কর্কট নির্লিপ্তভাবে বলেছিল, “হুট করে একদিন কৈটভ এসে এদেরও মেরে দিয়ে চলে যাবে। মায়া না-বাড়ানোই ভালো।”

গুরুদেব সেদিনও হাল ছেড়েছিলেন। কিন্তু অবস্থা দ্রুত পালটে গেল।

*****

গ্রামের এক কোনায় একটা ঝিল আছে। এই সেই ঝিল যার কাছে কাঞ্চনকে হেনস্থা হতে হয়েছিল। আজকাল সেই ঝিলের পাড়েই দজনে সময় কাটায়।

“জানো আজকাল খুব ভয় করে।”

দুর্গা কাঞ্চনকে বলে। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করে, “তোমার কীসের ভয়? তুমি তো সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী। আশ্রমের শ্রেষ্ঠা তুমি।”

দুর্গা মাথা নাড়ে।

“তাতে কী হল? কোনো অনর্থ কি আটাকাতে পারলাম? কিছুই পারলাম না। কৈটভের সামনে আমরা কিছুই না।”

কাঞ্চন দুর্গার হাতটা শক্ত করে ধরে

“এবার আর যা-ই হোক একে-অপরকে ছাড়ব না আমরা।”

দুর্গাও আর সইতে পারে না। সোজা কাঞ্চনের বুকে মাথা গুঁজে আঁকড়ে ধরে তাকে

“আমার আর ভালো লাগছে না। চলো-না পালিয়ে যাই।”

কাঞ্চন বোঝায়, “ধুর পাগলি! পালাব কেন? রামানুজদা আছেন, গুরুদেব আছেন। আমাদের ভয় কী?”

দুর্গা আজ কিছুই মানতে চাইছে না, “থাকুক সবাই। শুধু আমি আর তুমি পালাব। এই গ্রাম ছেড়ে বহু দূরে।”

কাঞ্চন আরও শক্ত করে বুকে ঠেস দিয়ে ধরে দুর্গাকে, “কী হয়েছে গো তোমার? এরকম উতলা হয়ে আছ কেন?”

দুর্গা বলে, “সিনহা সাহেবের পরিণতিটা আমাকে ভাবায়। সবাই তো উপস্থিত ছিল সেখানে, কেউ বাঁচাতে পারল তাঁকে? আর ধরো কোনো কারণে আবার হেমন্তাই চয়নের প্রক্রিয়ার ডাক দিল। তখন?”

কাঞ্চন এটা বুঝতে পারে না। জিজ্ঞেস করে, “হেমন্তাই চয়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের কী?”

দুর্গা বলে, “তুমি জানো না এসব। পরবর্তী হেমন্তাই যদি কেউ হয় সেটা হবে তুমি। কারণ আগের হেমন্তাই যদি নিজের কার্যকাল সম্পূর্ণ করার আগে মারা যায় তবে তার রক্ত যার শরীরে বইছে তাকেই হেমন্তাই নির্বাচিত করার একটি প্রথা আছে।”

কাঞ্চন অবাক হয়, “তাই নাকি? আমি তো শুনিনি এসব। বাবা কখনও বলেনি আমাকে।”

দুর্গা অভিমান ভরে বলে, “তুমি জানবে কীভাবে? আশ্রমে থেকেছ কখনও যে নিয়ম-নীতি কিছু জানবে! ছাড়ো।”

কাঞ্চন মুখ বেঁকায়। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা তারপর?” দুর্গা তার বুকে লুকিয়েই বলে, “সে প্রথা খুবই জটিল। আমি তোমায় বলতেও পারব না। আমার শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে এটা।”

কাঞ্চন হেসে বলে, “আমাকেও বলতে পারবে না?”

দুর্গা বলে, “না পারব না। শিক্ষানীতির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারব না।”

কাঞ্চন শব্দ করে হেসে উঠল। দুর্গার তাতে পিত্তি জ্বলে গেল যেন। “এরকম বিচ্ছিরিভাবে হাসছ কেন?”

কাঞ্চন হাসতে হাসতেই বলল, “আশ্রমের নিয়ম ভেঙে পালাতে চাইছ। আবার এদিকে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধাচারণ করবে না বলছ। কী বলি বলো তো! তাই হাসছি।”

দুর্গা এবার কপট রাগ দেখায়, “তুমি একটা বাজে লোক।”

কথাটা বলেই বুক ছেড়ে চলে যেতে চায়। কাঞ্চন জোর করে তাকে আগলে রাখতে চায়। হ্যাঁচকা টানে বুকে টেনে নেয়। ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দেয়। এই প্রথমবার দুর্গা আর কাঞ্চন একে অপরের অধরের স্বাদ পায়। ঝিলে বাঁধা নৌকাটা সুন্দর টলটলে জলে ভেসে আছে। কারও কোথাও যাবার তাড়া নেই শুধু সূর্যের তাড়া আছে। তিনি চারদিক রাঙিয়ে অস্ত যাচ্ছেন।