হলাহল বিষভাণ্ড – ৫
।। ৫ ।।
আশ্রমের এক নিরালা কক্ষে রামানুজ বসে আছে কর্কট আর বিবস্বানকে নিয়ে। আলোচনা চলছে পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কৈটভ কীভাবে কলিপুরুষের মতো ভয়ানক রাক্ষসে পরিণত হবে? এই বুদ্ধি তাকে কে দিয়েছে? যতটুকু জানি এরকম কোনো উদ্দেশ্য তো তার ছিল না।”
কর্কট জানালেন, “এই বুদ্ধি তাকে বৃশ্চিক দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে আমার কাছে হলাহল বা কালকূট সম্পর্কে জেনেছিল।” রামানুজ প্রশ্ন করল, “হলাহল মানে যা সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল?” কর্কট বললেন, “হ্যাঁ। সেই হলাহল।”
তিনি আরও যোগ করলেন, “হলাহল অথবা কালকূট, যার আক্ষরিক অর্থ কালো বর্ণের বস্তু তার একটা অন্য নামও আছে। সময়ের ধাঁধাও বলা হয় এই হলাহল বিষকে। হলাহল হিন্দুপুরাণ মতে একপ্রকার ভয়ংকর জীবন ধ্বংসকারী বিষ বা গরল। হিন্দুপুরাণ অনুসারে পারষ্পরিক আলোচনার পরে দেবতা ও অসুরেরা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড করে এবং নাগরাজ বাসুকীকে মন্থনরজ্জু করে সঞ্জীবনী অমৃত লাভের আশায় সমুদ্র মন্থন শুরু করেছিল। ফলে চৌদ্দো প্রকারের বিভিন্ন রত্ন সমুদ্রমন্থন থেকে আহরিত হয় এবং সেগুলো মন্থনকারী দুইপক্ষ দেবতা ও অসুরদের মধ্যে বণ্টিত হয়। কিন্তু অমৃত লাভের আগেই সমুদ্রমন্থন থেকে হলাহল উত্থিত হয়। হলাহলের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় দেবতা ও অসুর উভয় পক্ষই আহত হয়ে পড়ে। যেহেতু কেউ বিষের প্রতিক্রিয়া সহ্য করতে সমর্থ নয়, তাই তারা প্রথমে দেব ব্রহ্মার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। ব্রহ্মা জানালেন যে এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ব্রহ্মা তাদেরকে পরামর্শ দিলেন, তারা যেন দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তখন উভয় পক্ষ কৈলাস পর্বতে গিয়ে ভগবান শিবকে হলাহল বা কালকূট বিষ থেকে সৃষ্টিকে বাঁচানোর সহায়তা নিবেদন করে। শিব সমস্ত বিষ পান করতে চাইলেন। কথা মতো সেই হলাহল তিনি পানও করেন। সেই সময় তাঁর পত্নী দেবী পার্বতী তাঁর স্বামী শিবের গলায় জড়িয়ে ধরলেন যাতে হলাহল শিবের সারা শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে। এর ফলে দেবী পার্বতীর আর এক নাম হয় বিষকণ্ঠ যার অর্থ যিনি গরলকে শিবের গলায় আটকে রাখেন। এই বিষের ফলে শিবের কণ্ঠ নীল বর্ণ ধারণ করে, এতে শিবের এক নাম হয় নীলকণ্ঠ।”
এটুকু কাহিনি সবার জানা। যেটুকু তুলনামূলক অজ্ঞাত তা হল, “এবার মহাদেব এই হলাহল পান করার পর পানপাত্র অর্থাৎ যে ভাণ্ডটা সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল তাতে কয়েক ফোঁটা বিষ থেকে গেল। সমুদ্র মন্থনের কোনো কিছুই ফেলনা নয়। সেই কয়েক ফোঁটা বিষ লুকিয়ে ফেলা হল। সেই বিষ থেকেই কলি যুগে সৃষ্টি হবে কলিপুরুষের। সেই হলাহল বিষভাণ্ড লুকিয়ে রাখা আছে এক দুর্গম স্থানে। সেই গোপনীয় স্থানের ঠিকানা শুধু সময়ের কাছেই আছে। সময়চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করেই একমাত্র তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এসব নিয়ে বৃশ্চিকের সঙ্গে কোনো এক সময় আলোচনা হয়েছিল আমার। সম্ভবত সময়চক্রযান আবিষ্কারের সময়েই। কারণ হলাহলের সঙ্গে সময়ের চক্রের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। যা-ই হোক মোদ্দা কথা এখন ওরা হলাহল বিষভাণ্ড খুঁজতে বেরোবে।”
কর্কট সমস্ত কথা বলে থামলেন। রামানুজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিবস্বান নির্বিকার।
“একটা একটা ধাপ করে ভাবি। প্রথম ধাপ বলুন।”
রামানুজের প্রশ্নে কৰ্কট বললেন, “আমাদের প্রথম ধাপ হল উদ্ভবলিঙ্গ। উদ্ভবলিঙ্গে যেতে হবে আমাদের। এটা একটা তীর্থস্থান। ইন্দ্রজালের জন্য উৎকৃষ্ট এই স্থান। সেখানে এক অজ্ঞাত গুহামুখের ভেতর থাকেন পবন কুমার। ঐন্দ্রজালিক পবন কুমার। আমার সঙ্গে বহুকাল আগের পরিচয়। আমি যে বস্তু-বিজ্ঞানকে ব্যবহার করতে শিখেছিলাম সেই একই জিনিস আমার থেকেও ভালো করায়ত্ত করেছিলেন পবন কুমার। প্রায় সত্তর বছর আগে পরিচয় হয়েছিল। তখন আমি সময়চক্রযান বানাচ্ছি। চারদিক থেকে জ্ঞান সংগ্রহ করছি। এরকমই এক সময় অরণ্যে দেখা পেয়েছিলাম তাঁর। আমার অসম্পূর্ণ ছবি এঁকে আমাকে একই জায়গায় বন্দি করে দিয়েছিলেন পাঁচ দিনের জন্য।”
রামানুজ আর বিবস্বান একে অপরের দিকে তাকাল, “মানে? বুঝতে পারলাম না ঠাকুরদা।”
বিবস্বানই প্রথম প্রশ্নটা করেছিল।
কর্কট বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল, “পবন কুমারের অদ্ভুত ক্ষমতা। সে যদি কারও অসম্পূর্ণ ছবি আঁকে তবে যে স্থানে ছবি আঁকা হচ্ছে সেই স্থান ছেড়ে সেই ব্যক্তির আর কোথাও যাওয়া হবে না। যদিও-বা গেলে, যতক্ষণ জেগে আছ ততক্ষণই সেই জায়গা থেকে দূরে আছ। একবার ঘুমিয়ে পড়লে সেই আগের জায়গাতেই ঘুম থেকে উঠবে। মানে বারবার সেই ব্যক্তি ঘুম থেকে উঠবে একই জায়গাতে, একই সময়ে। তার মৃত্যু হবে না ঠিকই কিন্তু এক দীর্ঘ অভিশাপের জীবন বয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর পবন কুমার যদি কোনো মৃতদেহের অসম্পূর্ণ ছবি এঁকে ফেলে তবে তো আর কথাই নেই। সেই আত্মা তো সময়চক্রে বাঁধা পড়বেই, তার পরবর্তী প্রজন্মও ওই একই জীবনচক্রে বাঁধা পড়ে যাবে। ধরো যদি কেউ চল্লিশ বছরে মারা গেল এবং সেই মৃতদেহের অসম্পূর্ণ ছবি পবন কুমার আঁকল তখন সেই ব্যক্তির পরবর্তী সমস্ত জেনারেশান প্রথম ব্যক্তির মতোই জীবন চক্র অতিবাহিত করবে এবং ঠিক চল্লিশ বছরে মারা যাবে। এ এক দুর্ভেদ্য চক্র।”
রামানুজ হতবাক হয়ে গেল। কর্কট এসব কী বলছেন?
বিবস্বান বলল, “অদ্ভুত ক্ষমতা! আমি ভাবতেই পারছি না।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “এ লোক আমাদের সাহায্য করবে?”
কর্কট বলল, “এক কালে আমিও তাঁকে সাহায্য করেছিলাম।”
বিবস্বান জিজ্ঞেস করল, “কীরকম সাহায্য ঠাকুরদা?”
কর্কট মুচকি হেসে বলল, “সে পরে বলা যাবে’খন। আপাতত উদ্ভবলিঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। সেটাও যত দ্রুত সম্ভব।”
তারপর বিবস্বানের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে নাতি, আমাকে একটা অস্থায়ী গবেষণাগার বানিয়ে দিতে পারবি?”
বিবস্বানের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল। সে বলল, “মিরর যন্ত্রটা আমার কাছে আছে। আমাদের গবেষণাগারের সম্পূর্ণ মিরর ইমেজ বানিয়ে দিতে পারব। তবে আমার কাছে মিরর নেগেটিভ রয়েছে। ফলে শুধু নতুন আবিষ্কার করতেই ব্যবহার করতে পারবেন। পুরোনো আবিষ্কার চোখের সামনে পড়ে থাকলেও ধরতে পারবেন না। মিরর পজিটিভ রয়েছে বৃশ্চিকের কাছে।”
ঠাকুরদা আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেন, “সাব্বাস। দরকার নেই মিরর পজিটিভের। এটা দিয়েই কাজ হবে। এটাই তো চাই আমি। বাইরে বানিয়ে দে গবেষণাগারটা। দেখিস আমি যখন ভেতরে থাকব তখন অন্য কেউ যেন না-ঢুকতে পারে।”
বিবস্বান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল। ঠাকুরদা রামানুজকে বললেন, “আর তুমি যথা শীঘ্র যাত্রার ব্যবস্থা করো। গবেষণাগারে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না।”
যেমন কথা তেমন কাজ। রামানুজ যাত্রার তোড়জোড় শুরু করল। কর্কট মনোনিবেশ করলেন পরীক্ষাগারে।
* * * * *
খাদানে ফিরে এসেছে কৈটভ আর বৃশ্চিক। গুরুদেবকে শেকল দিয়ে বেঁধে একটা গরাদের মধ্যে পুরে রাখা হয়েছে। হাঁটু মুড়ে বসে শেকলে ঝুলছেন বৃদ্ধ গুরুদেব। চারদিকে কিছু জংলি কুকুর ঘোরাফেরা করছে। কৈটভ-বাহিনী পাহারা দিচ্ছে নিরন্তর। বৃশ্চিক মিরর পজিটিভের মাধ্যমে একটা আপৎকালীন গবেষণাগার বানিয়ে রেখেছে। সেখানে সে দীর্ঘসময় ধরে কিছু একটা কাজ করে চলেছে। এমন সময় উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত করে কৈটভ গবেষণাগারে প্রবেশ করল। তারপর বলল, “এর কি খুব প্রয়োজন আছে?”
বৃশ্চিক বলল, “আমি জানি না এটার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। আমি শুধু জানি আমার থিয়োরি বলছে এটা করে ফেলা দরকার। রাবণের দশ মাথা ছিল, কৈটভের অন্তত দুটো শরীর থাকুক।”
কৈটভ কথা বাড়ায় না। তার দেহের মাপে তৈরি কাচের জারের একটাতে সে প্রবেশ করে। বৃশ্চিক জিজ্ঞেস করল, “খাওয়া-দাওয়া করে ঢুকছ তো? সময় লাগবে অনেকটা।”
কৈটভ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, “কয় ঘণ্টা?”
বৃশ্চিক হেসে উত্তর দেয়, “সাত দিন।”
কৈটভের আর কিছু বলার থাকে না। সে শুধু বলে, “তাহলে এখন খাওয়া-না-খাওয়া সমার্থক।”
বৃশ্চিক হাসল। তারপর কাচের জারের মুখ বন্ধ করে দিল। তারপর নিজের কাজে মন দিল। গবেষণাগারের ভেতরে চারদিকে ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেল। অদ্ভুত একটা শব্দ বেরোতে লাগল যন্ত্রগুলোর থেকে ঠিক যেন গোঙানির শব্দ। বৃশ্চিকের এসব অনাহুত শব্দের অভ্যেস আছে। সে আপন মনে নিজের বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি করেই চলল। একইসঙ্গে খাদানে বৃশ্চিক এবং আশ্রমে কর্কট নিজেদের গবেষণা চালাতে থাকে। নতুন কী জিনিস সৃষ্টি হবে এবার এটাই দেখার।
