Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

হলাহল বিষভাণ্ড – ৬

।। ৬ ।।

ঠাকুরদা দু-দিনের মাথায় রামানুজকে খবর পাঠালেন। বিবস্বান এসে রামানুজকে বলল, “ঠাকুরদা জানালেন যে আগামীকাল রওয়ানা হবেন। আপনি তৈরি আছেন কিনা জানতে চাইলেন।”

রামানুজ লাঞ্চ সেরে উঠে রোদে পিঠ ঠেকিয়ে বসে সমুদ্র মন্থন সম্পর্কিত একটি বই পড়ছিল। বিবস্বানের কথা শুনে বলল, “আমি সেই পরশু থেকেই তৈরি আছি। আমাদের সঙ্গে কাঞ্চন, দুর্গা আর দাসবাবু যাবেন। ওঁরা এই যাত্রায় আমাকে বরাবর সাহায্য করে এসেছেন।”

বিবস্বান বলল, “বেশ তো। মজবুত টিম নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।”

বিবস্বান বেরিয়ে গেল।

কাঞ্চন দুর্গার জন্য কোয়ার্টার থেকে রাধামাধবদার রান্না করা নিরামিষ খাবার পৌঁছে দিতে গিয়েছিল। দুর্গা খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এবারে যেতেই হবে?”

কাঞ্চন হতাশ হল এই প্রশ্ন শুনে, “আচ্ছা, কী চাইছ বলো তো? গুরুদেবকে কৈটভ ছল করে নিয়ে চলে গেছে। এখনও তোমার মনে এসব প্রশ্ন!”

দুর্গা হতাশার হাসি হেসে বলে, “সংসার করার স্বপ্ন দেখলে সব সম্ভব। মেয়েরা নিজের সংসারের জন্য কতটা স্বার্থপর হতে পারে তুমি জানোই না।”

কাঞ্চন বলে উঠে, “আমাকে জানতেও হবে না। এখন যুদ্ধের সময়। আর এই যুদ্ধে সে-ও আছে যার সঙ্গে তুমি সংসার করতে চাইছ। তাই এই যুদ্ধ তোমাকেও লড়তে হবে। নিজের শক্তিগুলোর কথা মনে করো।”

দুর্গা খাবারটা কাঁসার থালায় ঢেলে খেতে খেতে বলল, “হয়েছে। সেসব কিছুই ভুলিনি। শুধু মনটা একটু নরম হয়ে আছে। মনের নরম মাটিতে দিবাস্বপ্নের আর মনখারাপের ফলন ভালো হয়। তাই হচ্ছে।” কাঞ্চন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “কী কঠিন কঠিন কথা বলছ আজকাল!”

দুর্গা হেসে উত্তর দেয়, “ভালোবাসায় লোক ওরকমই বলে মশাই। তোমাকে সেসব শুনতে হবে না। তুমি কর্কট, বৃশ্চিক, বিবস্বানদের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার করো।”

কাঞ্চন দুর্গার মাথায় বিলি কেটে বেরিয়ে পড়ে। অনেক গোছগাছ বাকি। কাল বেরিয়ে পড়তে হবে।

কর্কটের কাজ শেষ হয়েছে। তিনি সদ্য আবিষ্কৃত তরলটি দেখছিলেন। গাঢ় সবুজ বর্ণের তরল। তিনি ভালো করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিরীক্ষণ করলেন এই তরল পদার্থকে। এখনও যে বিজ্ঞানী কর্কট ফুরিয়ে যাননি, এর প্রমাণ এই তরল। তাঁর আত্মবিশ্বাস যেন কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে। কৈটভের প্রতি প্রতিশোধের আগুনে তপ্ত হয়েছেন এক বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক।

রামানুজ আর বিবস্বান তাঁর গবেষণাগারে প্রবেশ করল। কর্কট দুজনকে দেখে খুশি হলেন।

“একটা মস্ত কাজ সেরে ফেলা গেল।”

কর্কট তাঁর হাতে থাকা তরল দু-জনকে দেখালেন। দু-জন দু-জনের মুখের দিকে তাকাল।

“ঠাকুরদা, এটা কী পদার্থ?”

বিবস্বান প্রশ্ন করে। কর্কট উত্তরে জানান, “এটা পথপ্রদর্শক। একদিনে মাত্র একবার ব্যবহার করা যাবে। কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা সে যতই গোপন হোক-না কেন পৌঁছাতে চাইলে এই তরল মাটিতে ভেঙে ফেলতে হবে। তারপর যা হবার হবে।”

রামানুজ উচ্ছ্বসিত হল, “তাহলে তো হলাহল বিষভাণ্ড খুঁজে বের করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।”

কর্কট হাসলেন শুধু। এ হাসির গুরুত্ব অনেক। কোনো মন্তব্য তিনি করলেন না।

রামানুজের ভ্রু কুঁচকে গেল, “ভুল বললাম কিছু?”

“না। প্রস্তুত হও।”

এ প্রস্তুতি যে কীসের তা একমাত্র কর্কট জানেন। পরদিন উদ্ভবলিঙ্গের যাত্রা শুরু হল।

রামানুজ, কর্কট, বিবস্বান, কাঞ্চন, দুর্গা আর দাসবাবু। এই গোটা টিম উদ্ভবলিঙ্গ তীর্থে পৌঁছালে সেদিন রাতের বেলায়। তারপর শুরু হল জঙ্গলের পথ। এই সফর লম্বা ও ক্লান্তিকর।

গহীন অরণ্যের ভেতরে সবাই হেঁটে চলেছে। সবার সঙ্গে টর্চ রয়েছে। সেই টর্চের আলোতেও যেন অরণ্যের অন্ধকার কাটছে না। মাঝেমাঝেই ভেসে আসছে বিভিন্ন জীবজন্তুর ডাক। বুকের রক্ত হিম করে দেওয়া এক-একটা ডাকে সকলেই কেঁপে উঠছে। কিন্তু যাত্ৰা অব্যাহত রয়েছে। ভোর রাতের দিকে এক বিশেষ গুহামুখের সামনে এসে থমকাল সকলে। কর্কট টর্চের আলো ফেলল এক জায়গায়। এক উপদেবতার মূর্তি দেখা যাচ্ছে। উপদেবতার চার হাত।

কর্কট বললেন, “ইনি পবন কুমারের উপাস্য। ইনিই এই গহীন অরণ্যের মালিক।”

রামানুজ-সহ সকলে সেই উপদেবতার মূর্তি দেখল। ভয়ানক সে মূর্তি। ভয় পেল সকলে। কাঞ্চন বলল, “চলুন, সবাই এগোই। কী বীভৎস এই মূর্তি! একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা যায় না।”

যাত্রা অব্যাহত থাকল। আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর আরও একটি গুহামুখ দেখা গেল। কর্কট বললেন, “আমার পেছনে এসো তোমরা। আর কোনো অবস্থাতেই কেউ ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করবে না। মনে রাখবে এখানে যাই ঘটবে তা আমার সঙ্গে ঘটবে। আমি তোমাদের কিচ্ছুটি হতে দেব না। ভয় তখন পাবে যখন আমার মৃত্যু হবে। তার আগে ভয় পাবার কিছু নেই।”

সবাই এই নির্দেশে মাথা নাড়ল। রামানুজ এই এলাকার প্রশাসনের সঙ্গে ইতিমধ্যে একবার কথা বলে রেখেছে। এই ব্যাপারে কেউ আলাদাভাবে নাক না গলালেও কোনো প্রয়োজনে যে ফোর্স পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। রামানুজ তাই ততটা ভয় পাচ্ছে না। যদিও এই ব্যাপারে সে দলের কাউকে কিছু জানায়নি। কর্কট ধীরে ধীরে গুহামুখের ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁর পেছনে রামানুজ, বিবস্বান, দুর্গা, দাসবাবু আর শেষে কাঞ্চন

বেশ কিছুটা পথ ভেতরে ঢোকার পর হঠাৎ এক ঝাঁক পাখি উড়ে এল। ছোটো ছোটো পাখি। কিন্তু তাতেই দিগবিদিকে ছড়িয়ে পড়লেন সকলে। পাখির ঝাপটায় এক-আধজন গেলেন পড়ে। পাখির ঝাঁক বেরিয়ে গেল গুহামুখ থেকে। কর্কট বললেন, “কী হল দুর্গা? এতেই ভয় পেলে?”

দুর্গা হাত পা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “না না। ভয় পাব কেন? ওই একটু পা হড়কে…”

সকলেই দুর্গার কথায় হেসে ফেললেন। আরও বেশ কিছুটা পথ এগোবার পর আর টর্চের দরকার পড়ল না। মশাল জ্বলছে সমস্ত গুহামুখ জুড়ে। বেশ কিছু প্রকাণ্ড সুড়ঙ্গ এসে মিলিত হয়েছে এই গুহামুখের অভ্যন্তরে। এই সেই জায়গা যেখানে উদ্ভবলিঙ্গের রিপু-উত্থান পর্ব সংঘটিত হয়েছিল। এক বীভৎস ব্যুহ এই জটিল পথ। কর্কট সবাইকে সাবধান করলেন, “আমি, রামানুজ আর বিবস্বান শুধু ভেতরে যাব। বাকিরা আপাতত এখানেই থাকুন।”

সেই মতো তিনজন রয়ে গেলেন। বাকি তিনজন এগিয়ে গেলেন। কর্কট নির্দেশ দিলেন, “পথের মধ্যে কোনো জিনিসে স্পর্শ করবে না। সবটাই মায়া। কোনোটাই প্রকৃত বস্তু নয়। কোনো প্রাণী ভয় দেখালেও ভয় পেয়ে নিজের পথ ত্যাগ করবে না। সোজা গন্তব্যে হেঁটে চলবে।”

কথাটা শেষ করার আগেই দুটো ভয়ানক শেয়ালের আবির্ভাব হল। প্রাণী দুটো দাঁত খিঁচিয়ে তিনজনকেই পথে বাধা দিচ্ছে। প্রাণীগুলোর গা থেকে বিদঘুটে জান্তব গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।

“সোজা হাঁটো। কোনো প্রতিক্রয়া দেবে না।”

কর্কটের অমোঘ বাণী শোনা গেল। রামানুজ আর বিবস্বান সেই মতো হাঁটার চেষ্টা করছে। রামানুজ দেখেও যেন দেখল না। হাঁটতে থাকল। কর্কটও তাই। বিবস্বানের একটু ভয় করছিল। এত জ্যান্ত দুটো প্রাণী মায়াজাল কীভাবে হতে পারে? আর একটু এগোলেই তো কামড়ে দেবে। কর্কট বিবস্বানের মনের কথা ধরে নিলেন মাইন্ড-রিডিংয়ের মাধ্যমে, “বিবস্বান। এ সবই মায়া। তুমি হেঁটে চলো। ভয় নেই, আমি তো আছি।”

বিবস্বান ঠাকুরদার আদেশ পালন করল। ধীরে ধীরে শেয়াল দুটোকে পেরিয়ে এগিয়ে গেল তারা। আর কয়েক পা এগোতেই শোনা গেল এক অদৃশ্য ফোঁস ফোঁস শব্দ। এবার শুধু বিবস্বান নয়, রামানুজ আর কর্কটের অবস্থাও একইরকম হল। ভয়কে দেখা গেলে সে একরকম, কিন্তু ভয়কে যখন দেখা যায় না শুধু শোনা যায়, তখন সে ভয় মারাত্মক। অতর্কিতে এসে প্রাণবায়ু শুষে নিতে পারে সেই ভয়। তিনজনের গায়েই বরফশীতল কোনো সরীসৃপের স্পর্শ অনুভূত হল। শিউরে উঠল সকলেই। কর্কট অবধি দর দর করে ঘামছেন। তবু মনের জোরে কাঁপা কাঁপা গলায় কর্কট বলে চলেছেন, “এগিয়ে চলো। কিছু হবে না। এগিয়ে চলো।”

ফোঁস… ফোঁস… ফোঁস।

“এগিয়ে চলো। কিছু হবে না। এগিয়ে চলো।”

ফোঁস ফোঁস… ফোঁস।

পায়ের কাছে যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে সেই সরীসৃপ। দম বন্ধ হয়ে আসছে সকলের। তবু থামা চলবে না। থামলেই এই মায়াবী সরীসৃপ জ্যান্ত হয়ে উঠতে পারে।

“থেমো না কেউ। হাঁটতে হবে আমাদের।”

কর্কট বারবার সাবধানবাণী শোনাচ্ছেন। একসময় শব্দ বন্ধ হল। ঠান্ডা স্পর্শ আর গায়ে অনুভূত হচ্ছে না। আর তখনই ধীরে ধীরে সামনে সৃষ্টি হতে থাকল এক অপূর্ব আলোক বলয়। কর্কট নির্দেশ দিলেন, “থামো সবাই। দাঁড়াও।”

আলোক বলয় বড়ো হতে লাগল। একটা গোল আবর্তিকায় আলোর বিচ্ছুরণের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল এক কান্তিময় পুরুষকে। বয়সের ভার অনেক, কিন্তু তা তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই। কর্কটের মুখে হাসি ফুটল। কর্কট সম্বোধন করলেন, “বন্ধু।”

আলোক বর্তিকা থেকেও সম্ভাষণ ভেসে এল, “এসো বন্ধু।”

কর্কট এগিয়ে গেলেন। পেছনে রামানুজ আর বিবস্বান। পবন কুমারের মঙ্গোলীয় চেহারা, শ্বেত শুভ্র দাঁড়ি গোঁফে ঢাকা মুখ। অপূর্ব এক দ্যুতি ঠিকরে পড়ছে তাঁর সারা শরীর থেকে।

“বহু বছর পর বন্ধুর কথা মনে পড়ল! কোনো বিশেষ প্রয়োজন?” পবন কুমার সরাসরি কথা বলতে ভালোবাসেন। কর্কট পবন কুমারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। পবন কুমার তাঁকে এবং বাকিদের বসার জন্য ইশারা করলেন। পবনের সঙ্গে তাঁর একজন শিষ্যগোছের এক সাধক বসেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনায় চুপচাপ নজর রাখার কাজ করছিলেন। কোনো কথাবার্তায় তিনি অংশগ্রহণ করলেন না।

“হ্যাঁ, গুরুতর প্রয়োজন বন্ধু। আজ আপনি একটা সাহায্য না-করলে আমাদের এত বছরের সাধনা বিফল হয়ে যাবে।”

কর্কটের কথায় মাথা নাড়লেন পবনকুমার। তারপর বললেন, “সাধনা বিফল হতে দেওয়া যাবে না। বলো কী চাও।”

কর্কট আমতা আমতা করে বললেন, “আপনার সাহায্যে সময়চক্র ফিরে পেতে চাই। আমার তৈরি সময়চক্রযান…”

পবন কুমার বাকি কথা কর্কটকে বলতেও দিলেন না, “সব জানি। কৈটভ নিয়ে পালিয়েছে, তাই তো?”

কর্কট বললেন, “সবই তো জেনে বসে আছেন। আপনি ত্রিকালজ্ঞ। এবার কিছু একটা উপায় দিন। কর্ম আমরাই করব, কিন্তু আপনার সাহায্য ছাড়া এই যুদ্ধে জয় সম্ভব নয়।”

পবন কুমার জোরে জোরে হাসলেন, “আমি একটা আস্ত শয়তান। আমার থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করার সাহায্য চাইছ তোমরা? এই অনাসৃষ্টি মাথায় এল কী করে?”

এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং কর্কটের কাছেও ছিল না। সবাই চুপ করে আছে দেখে রামানুজ বলল, “ক্ষমা করবেন। আমি আপনার সম্পর্কে খুব একটা অবহিত নই। তবু এটুকু বুঝে গেছি আপনি অসীম শক্তিধর এক সাধক। এই বিশ্বে যারা অসীম শক্তিশালী তারা ভগবান নাকি শয়তান তাতে বিশেষ কিছু এসে যায় না। এই ব্রহ্মাণ্ড থাকলে তাঁরাও থাকবেন। তাই ব্রহ্মাণ্ডের রক্ষার্থে এক গভীর দায়িত্বশীলতা তাঁদের ওপর বর্তায়। আপনি সেটার জন্যই আমাদের সাহায্য করুন। কারণ কৈটভ যদি কলিপুরুষে পরিণত হয় তবে শুধু আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব তা কিন্তু নয়। আমরা সবাই যদি এক জোট হয়ে লড়তে পারি…”

পবন কুমার হাত তুলে থামিয়ে দিলেন রামানুজকে, “ব্যস হয়েছে, হয়েছে। সঠিক উত্তর হয়ে গেছে। এবার বলো আমার থেকে কী চাইছ তোমরা?”

কর্কট এবার আশাবাদী হলেন। বললেন, “আমার কাছে আর সময়চক্রযান নেই। কিন্তু হলাহল বিষভাণ্ড খুঁজতে গেলে সময়চক্রযানের একান্ত প্রয়োজন। আর আপনি হলেন সময়ের অধীশ্বর। আমরা কীভাবে এই লড়াই লড়তে পারি তার ব্যবস্থা করে দিন।”

কর্কট এবার পবন কুমারের সামনে হাতজোড় করলেন।

“মুখে বন্ধু বলে সামনে হাতজোড় করতে নেই।”

কর্কট পবন কুমারের গমগমে কণ্ঠ শোনামাত্র জোড়হাত খুলে নিলেন। পবন কুমার আবার বললেন, “আমি নিজে সময়চক্র ঘোরাতে পারি। কিন্তু যার অধিকার নেই তাকে যদি সময়চক্র ব্যবহার করতে দিই তাহলে সেক্ষেত্রে একটা শর্ত আছে। সেই শর্ত পূরণ হলে তবেই সকলে সেই সময়চক্র ব্যবহার করতে পারবে।”

কর্কট উজ্জ্বল দৃষ্টিতে বললেন, “আমরা সব শর্তে রাজি।”

পবন কুমার হেসে বললেন, “চঞ্চল হয়ো না। আগে শোনো সবাই। সময়চক্র ব্যবহারের অনধিকারী হয়ে সেটা ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই একটা বলিদান দিতে হবে।”

রামানুজ ভ্রু কোঁচকায়, “কীরকম বলিদান?”

পবন নির্মভাবে বললেন, “আত্মাহুতি। নিজের প্রাণের বলিদান। যে -কোনো একজন নিজের প্রাণ দান করলে তবেই সাতদিনের জন্য সময়চক্র ব্যবহারের অধিকারী হওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, হলাহল বিষভাণ্ড খুঁজতে যে যে জায়গায় যেতে হবে সেই জায়গায় সঠিকভাবে অবতরণের ব্যবস্থাও আমি করে দিতে পারি। এতে কৈটভের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করতে তোমাদের সুবিধে হবে।”

কর্কট এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন না আর। সোজা উঠে দাঁড়ালেন। “আমি আমার বলিদান দিতে রাজি। শুধু কৈটভের সর্বনাশ চাই।”

বিবস্বানের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।

“অসম্ভব গুরুদেব। অসম্ভব। আমি থাকতে আপনি কেন বলিদান দেবেন? আমি দেব।”

কর্কট বিবস্বানের দিকে তাকালেন। রক্ত নেমেছে তাঁর চোখে। বিবস্বান ঠাকুরদার এই দৃষ্টিকে ভয় পেল। কর্কট বললেন, “মিথ সংঘ ভেঙে গেছে। তিলে তিলে তৈরি করেছিলাম আমি। আমার নাতিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে কৈটভ। এই কৈটভকে বিশ্বাস করার ভুল করেছিলাম আমি। আর বলিদান দিবি তুই? তুই কে? তুই বলিদান দেবার অধিকারী নোস।”

বিবস্বান আর কথা বাড়াবার সাহস পায় না। রামানুজ বিবস্বানকে ইশারায় বসতে বলল। কর্কট সোজা পবন কুমারকে বললেন, “বন্ধু, আপনি ব্যবস্থা করুন। আমি প্রস্তুত।”

রামানুজ অনেক কিছু ভেবে একবার শেষ চেষ্টা করেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে আর কেউ নেই যিনি কৈটভকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আটকে রাখতে পারে বা যুদ্ধে মোকাবিলা করতে পারে। কৈটভের সঙ্গে যুদ্ধ মানে তো শুধু শারীরিক যুদ্ধ নয়। নানারকম অস্ত্রের ব্যবহার সে করে। সেগুলোর বেশিরভাগ আপনার গবেষণাগার থেকেই চুরি করা। সেগুলোকে নিরস্ত্র কীভাবে করতে হয় আপনার চেয়ে ভালো কে জানে? আর তাছাড়া হলাহল বিষভাণ্ড কোথায়, সেখানে গিয়ে কীভাবে কী করতে হবে তাও আমরা জানি না। সেক্ষেত্রে আপনি নিজের বলিদান দিয়ে দেওয়া মানে আমাদের দলটাকে দুর্বল করে দেওয়া নয়?”

রামানুজের প্রশ্নের উত্তরে তার দিকে একটা ছোটো বাক্স এগিয়ে দিলেন কর্কট। এতই ছোটো যে আকারে এক সেন্টিমিটারের চেয়ে বড়ো হবে না। রামানুজ সেই বাক্স অত্যন্ত যত্ন সহকারে নিজের হাতে নিল।

“এটা কী ঠাকুরদা?”

রামানুজের প্রশ্নে কৰ্কট বললেন, “সঠিক সময়ে তোমার হাত কেটে এতে রক্ত ফেলবে। বাক্সটি বড়ো হয়ে যাবে। এর ভেতরে তিনটে টেস্ট-টিউব আছে। মোট তিনবার ব্যবহার করা যাবে। এর ভেতরে যিনি আছেন তিনি তোমাদের আমার থেকেও বেশি ভালোভাবে সাহায্য করতে পারবেন। কাজেই আমি না-থাকলেও তোমাদের হেরে যাবার সম্ভাবনা নেই। তবে মনে রেখো মাত্র তিনবার।”

রামানুজ বাক্সটিকে নিজের পকেটে চালান করল। তারপর কর্কট বিবস্বানকে বললেন, “এই নাও সদ্য নির্মিত তরল। কোনো গোপন ঠিকানাই এর কাছে গোপন নয়। তবে সে যথাস্থানের আশেপাশেই পৌঁছাবে। তারপর যা বঁধাবিপত্তি আছে তার মোকাবিলা তোমাদেরই করতে হবে।”

বিবস্বান টেস্ট-টিউবটি হাতে নিল। পবন কুমার সব দেখছিলেন। বললেন, “কর্কট, তুমি একজন অত্যন্ত গুণী বিজ্ঞানী। আমি তাই আমার স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে শেষবারের জন্য জিজ্ঞেস করছি তুমি কি আপনার বলিদান দিতে প্রস্তুত?”

শান্ত ধীর স্থির কণ্ঠে কর্কট উত্তর দিলেন, “একেবারেই প্রস্তুত। শুধু শেষ একটি কর্ম করতে চাই।”

পবন কুমার আশ্বস্ত করলেন, “বেশ। সম্পন্ন করো।”

কর্কট নিজের ঝোলা থেকে একটি শঙ্খ বের করলেন। রামানুজের দিকে সেই শঙ্খ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আদতে এটিও একটি বাক্স। এই বাক্স আমার অশ্রু জলে সিক্ত হলে খোলার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শোকে আমি পাথর বনে গেছি। আমার চোখে আর জল নেই। তাই বাক্সটিকে আমি শঙ্খে পরিণত করলাম। পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত জটিল হবে তখন এই বাক্সের ভেতর স্থিত পদার্থটি সমস্যার সমাধান করবে। সৃষ্টির বিনাশ রুখতে এই বাক্সের পদার্থের প্রয়োগ সাময়িকভাবে অব্যর্থ।”

রামানুজ শঙ্খটি গ্রহণ করল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “যদি আপনার চোখের জলেই বাক্সটি খোলা যায় তাহলে আমরা যথাসময়ে এই বাক্স খুলব কী করে?”

কর্কট বললেন, “সেই পরিস্থিতিতে এই শঙ্খে ফুৎকার দেবে। যদি শঙ্খের কম্পাঙ্কের সঙ্গে পরিবেশের কম্পাঙ্ক মিলে যায় তবে এই শঙ্খ প্রথমে বাক্সে পরিণত হবে। তারপর ধীরে ধীরে সেই বাক্স গলে যাবে। আর তোমরা তোমাদের কাঙ্খিত বস্তুটি পাবে।”

বিবস্বান জিজ্ঞেস করল, “বুঝতে পেরেছি। কিন্তু ঠাকুরদা কোনো বিশেষ অনুভূতি কি আছে যা আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করলে বুঝতে পারব যে এটাই সঠিক সময় শঙ্খে ফুৎকার দেবার?”

কর্কট খুশি হলেন, “এই না-হলে বিজ্ঞানী বিবস্বান তাই না! তাপমাত্রা। তাপমাত্রার ওপর খেয়াল রেখো। সেই সময় উচ্চ তাপমাত্রা থাকবে। এই শঙ্খের কম্পাঙ্ক অত্যধিক হবে। সেই কম্পাঙ্ক তখনই নিঃস্বরিত হওয়া সম্ভব যখন তাপমাত্রা বেশি থাকবে।”

বিবস্বান মাথা নাড়ল। সে বুঝে গেছে যা বোঝার। পবন কুমার উঠে দাঁড়ালেন।

“আশা করি শেষ কার্য সম্পন্ন হয়েছে।”

কর্কট সম্মতি জানালেন, “হ্যাঁ।”

পবন কুমার বললেন, “আসুন আমার সঙ্গে। বাকিরা এখানেই থাকো।”

বিবস্বানের চোখে ইতিমধ্যে জল। ঠাকুরদাকে সে আর দেখতে পাবে না, ঠাকুরদা চিরতরে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে এ যেন সে মেনে নিতে পারছে না। বিবস্বান উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল তার ঠাকুরদাকে। কর্কট মায়ার বাঁধনে আর বাঁধতে চান না। তবু বিবস্বানের এই কান্নায় তাঁর মন নরম হচ্ছিল। তাকে শান্ত করার জন্য তিনি বললেন, “জন্মালে মরিতে তো হবেই। বাঁচলাম তো বহু বহু কাল ধরে। এবার যখন সৃষ্টিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে নেমেই পড়েছি তাহলে সৃষ্টির নিয়মটাকেও মানতে হবে। আজ থেকে মিথ সংঘের দায়িত্ব তোর ওপর থাকল বিবস্বান। সামলে রাখিস।”

বিবস্বানের মাথায় স্নেহাশীষ দিলেন কর্কট। তারপর রামানুজের উদ্দেশে বললেন, “কৈটভের কফিনে প্রথম পেরেক আমি মারছি। শেষটা তুমি মারবে। কথা দাও।”

রামানুজ ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে এক মুহূর্ত নষ্ট না-করে কথা দিল, “কৈটভের মৃত্যু আমার হাতেই হবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”

কর্কট সবসময়েই কর্কট। এই শেষ সময়েও তিনি বললেন, “হ্যাঁ, হয় ওকে মেরে দেবে। না-হয় নিজে মরে যাবে। এর মাঝের কোনো রাস্তা নেবে না। তাতে সাফল্য এলেও আসতে পারে।”

রামানুজ কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু ইশারায় সম্মতি দিল। কর্কট আর দেরি করলেন না। পবন কুমার তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

বিবস্বান-কে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করতে লাগল রামানুজ। কিন্তু বিবস্বান ডুকরে কাঁদছে। রামানুজের পিঠে মাথা রেখে কাঁদছে সে। ততক্ষণে পবন কুমার কর্কটকে নিয়ে চলে এলেন এক অন্ধকার কক্ষে। কর্কট চারিদিকে তাকালেন। কিছুই নেই। অনন্ত অন্ধকার। ধীরে ধীরে সেখানে আকাশের তারার মতো ছোটো ছোটো আলোক বিন্দুর সৃষ্টি হতে লাগল। ধীরে ধীরে এক অনন্তআকাশ গঙ্গার সৃষ্টি হল সেই অন্ধকার কক্ষে। এখন আর সেটা কক্ষ নয়। এ যেন মহাব্রহ্মাণ্ডের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ।

পবন কুমারের কণ্ঠে ভেসে এল নির্দেশ, “কর্কট, আপনি নিজ পরিধেয় ত্যাগ করুন। তারপর সোজা হাঁটতে থাকুন। হাঁটতে হাঁটতেই আপনি ধীরে ধীরে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবেন। কোনো ব্যথা, কোনো ব্যধি, কোনো শোক, কোনো মোহ, কোনো লোভ, কোনো ঈর্ষা, কোনো ক্রোধ, কোনো মায়া আপনাকে যেন আন্দোলিত না-করে। এগিয়ে যান আপনার মুক্তির পথে।”

কর্কট নিজের পরিধেয় ত্যাগ করলেন। সারাজীবন যে শ্বেত শুভ্র বস্ত্রের প্রতি আকুতি কাজ করেছে তাঁর, তা এক নিমেষে পরিত্যাগ করলেন। কোনো মায়ায় বাধা গেল না। তারপর জোড়হাত তুলে একবার বললেন, “জয় জগন্নাথ!”

তারপর মহানন্দে এগিয়ে গেলেন আকাশগঙ্গার দিকে। পবন কুমার তাঁর দুই হাত সামনে এগিয়ে রাখলেন ভিক্ষার আশায়। তিনি দেখলেন, ধীরে ধীরে কর্কটের শরীর এক অদ্ভুত আলোকরশ্মিতে পরিপূর্ণ হচ্ছে। তিনি যত এগিয়ে চলেছেন ততই তাঁর দেহ থেকে ঐশ্বরিক কান্তি ঠিকরে বেরোচ্ছে। ধীরে ধীরে আলো এত তীব্রতর হল যে পবন কুমার অবধি চোখ ঢাকতে বাধ্য হলেন। কর্কট বিলীন হয়ে গেলেন মহাশূন্যে।

পরিবর্তে পবন কুমার তাঁর হাতে এক শীতল স্পর্শ পেলেন। চোখ খুলে তিনি দেখলেন তাঁর দুই হাতে রয়েছে একটা আশ্চর্য সুন্দর কাচের বোতল। তার ভেতরে টলটল করছে একটা তরল। এই তরলই যে সময়চক্রযানের ধারক ও বাহক তা তিনি জানেন। তিনি রামানুজদের কাছে ফেরার রাস্তা ধরলেন। পবন কুমারকে ফিরতে দেখে রামানুজ আর বিবস্বান উঠে দাঁড়াল। পবন কুমারের সামনে নিজে থেকেই হাতজোড় হয়ে যায়। সেভাবেই দাঁড়াল দু-জনে। বিবস্বান কিছুটা সংযত হয়েছে ততক্ষণে। তার চোখে-মুখে আত্মীয় হারাবার ক্লান্তি।

পবন কুমার এসে বিবস্বানের হাতে দিলেন তার ঠাকুরদার শেষ পরিধেয় বস্ত্রাদি। রামানুজের হাতে তুলে দিলেন প্রাপ্ত তরল। তারপর পবন কুমার বললেন, “এই তরল পদার্থ থেকে কয়েক ফোঁটা তরল যে-কোনো ফুলের ওপর ছিটিয়ে দেবে। সেই ফুল সময়চক্রযানে পরিণত হবে। তাতে প্রবেশ করে উচ্চারণ করবে,

‘পরিস্ফুটায়বর্ধনম সময় অতিশত’

তারপর বলবে সেই স্থান, কাল বা পাত্রের নাম যেখানে তোমরা যেতে চাইছ। সময়চক্রযান তোমাদের সেখানে পৌঁছে দেবে।”

রামানুজ পবন কুমারকে প্রণাম করলেন।

“এই যুদ্ধে কখনও যদি আপনাকে অবতীর্ণ হবার আহ্বান করি, আসবেন?”

পবন কুমার হাসলেন, “কালের গর্ভে এর উত্তর আছে। আমার কাছে আপাতত এর উত্তর নেই। তোমরা এখন এসো। আমার গুরুবন্দনার

সময় হয়ে এসেছে। আমার আরাধ্য দেবতা আসার আগে তোমরা চলে যাও এই গুহামুখ থেকে।”

ইতিমধ্যে এক অদ্ভুত তীব্র গর্জনের শব্দ শোনা যাচ্ছে সুড়ঙ্গের ভেতরে। পবন কুমার তাড়া দিলেন, “আর দেরি কোরো না তোমরা পালাও। আমার গুরুদেব আসছেন।”

রামানুজ আর দেরি করল না। বিবস্বানকে নিয়ে গুহামুখের দিকে ছুটল। বিবস্বান কর্কটের পোশাক আগলে শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। তবু এখন শোক করার সময় নেই। দুজনেই ছুটছে। ফেরার পথে তারা দেখল এক বিশালাকার মৃত সাপের লেজ পড়ে আছে গুহামুখে। ঠিক একইভাবে দুটো শেয়ালের মৃতদেহও দেখতে পাওয়া গেল। পবন কুমারের মায়া একেবারেই বাস্তবের মতো। মায়া শেষে মায়াসঞ্জাত প্রাণী অদৃশ্য হয় না। মরে যায়। গর্জন বাড়তে থাকল। এগিয়ে আসতে থাকল সেই শব্দ। ধীরে ধীরে শব্দব্রহ্মে পরিণত হচ্ছে এই গর্জন। গুহামুখের মাঝামাঝি দেখা গেল দুর্গা, কাঞ্চন আর দাসবাবুকে।

“দৌড়ে চলো সবাই গুহামুখের দিকে। পালাও পালাও।”

রামানুজ চিৎকার করল। বিবস্বান নিজেলে সামলে নিয়েছে। সে বলল, “মশালের আলো এখানেই শেষ। টর্চ জ্বালাও সবাই।”

টর্চ জ্বলে উঠল। গর্জনটা যেন এখন একেবারেই কাছে এসে গেছে। সকলেই ভয় পাচ্ছে এই শব্দে। এ কী প্রাণী, কী বস্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু এর হাতে পড়লে যে এই জীবন আর থাকবে না তা স্পষ্ট। দূর থেকে পবন কুমারে আওয়াজ ভেসে এল, “গুরুদেব ওদের ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন ওদের গুরুদেব।”

সেই গর্জনের সঙ্গে যখন পায়ের শব্দ যোগ হল তখন সকলে দরদর করে ঘামছে আর দৌড়োচ্ছে। ওই তো দেখা যাচ্ছে গুহামুখ শুরুর প্রান্ত। ভোর হয়ে গেছে। বাইরে আলো দেখা যাচ্ছে। সবাই নিজের সেরাটা দিল। কারণ পায়ের শব্দ একেবারে কানের কাছে। পেছন ফিরে দেখার মতো অবস্থায় কেউ নেই। অতিকায় কিছু একটা ধাওয়া করে এগিয়ে আসছে।

একটা আঁচড় এসে লাগল রামানুজের গায়ে। সে তাতে টাল রাখতে না-পেরে পড়ে গেল। ততক্ষণে বাকিরা একে একে বাইরে বেরিয়ে গেল। রামানুজ গেল আটকে। বাইরের পৃথিবীতে এসে ছিটকে পড়ল সকলে। কিন্তু রামানুজ বাইরে না-আসায় কাঞ্চন পাগলের মতো হয়ে গেল। সে চিৎকার করতে লাগল, “রামানুজদা। রামানুজদা।”

বাইরে থেকে গুহামুখের অভ্যন্তরে কিছুই দেখা যায় না। রামানুজ কাঞ্চনের ডাক শুনছে। কিন্তু তাকে যেন বোবা ধরেছে। যে দেখল এক বিশালাকার কিছু একটা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে জরিপ করে নিচ্ছে ভালোভাবে। তার গন্ধ শুঁকছে। রামানুজের মনে হল সংজ্ঞা হারাবে সে। দূর থেকে পবন কুমারের ধ্বনি ভেসে আসছে, “ওদের একজনের আত্মাহুতি নিয়েছি আমি। ওদের ছেড়ে দিন গুরুদেব।”

রামানুজ সংজ্ঞা হারাবার শেষ মুহূর্তে দেখল সেই অদ্ভুত দর্শন প্রাণী ধীরে ধীরে পেছন ফিরে চলে যাচ্ছে। আর ঠিক তখনই রামানুজের চোখে পড়ল সেই প্রাণীর চারটি হাত। ইনি কে? পবন কুমারের সঙ্গে এর সম্পর্ক-ই বা কী? ইনিই কি পবন কুমারের আরাধ্য? তারপর আর কিছু মনে নেই রামানুজের। সে সংজ্ঞা হারাল। রামানুজের সংজ্ঞা ফিরল কাঞ্চনের কোলে। কাঞ্চন গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। জল ছিটিয়ে রামানুজের চোখ-মুখ-মাথা ধুইয়ে দিয়েছে সে।

“দাদা বাইরে চলো। বিপদ কেটে গেছে।”

রামানুজ ধীরে ধীরে নিজের শরীরটাকে টানতে টানতে বের করল বাইরে। সেখানে সবাই উৎকণ্ঠায় পাগল হয়ে যাচ্ছিল। সকলেই ঘিরে ধরল তাকে।

“ভেতরে কী ছিল?” বিবস্বান জিজ্ঞেস করল।

রামানুজ মাথা নাড়ল, “জানি না ঠিক।”

কাঞ্চন শুধু জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছ তো দাদা?”

রামানুজ তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “একদম ঠিক আছি। তুই যখন সঙ্গে আছিস ঠিক না-থেকে পারব আমি।”

দুর্গা এসে কাঞ্চনকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছ?”

কাঞ্চন দুর্গাকে জড়য়ে ধরল, “আছি, আছি। ঠিক আছি। এত ভেবো না।”

কিন্তু রামানুজ নিজেও জানে না সে ঠিক আছে কিনা। তার পিঠ থেকে রক্ত পড়ছে। দাসবাবু দেখালেন সবাইকে, “এটা কী?”

সকলে মিলে রামানুজের পিঠের দিকে এসে জড়ো হল। ছেঁড়া জামা লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি। আর সেখানে দেখা যাচ্ছে এক গভীর আঁচড়ের দাগ।

উপদেবতার আঁচড়।