Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

হলাহল বিষভাণ্ড – ৭

।। ৭।।

গুরুদেব শেকলে জড়িয়ে আছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর চোখ আর কান সদা জাগ্রত। তিনি দেখছেন যে বৃশ্চিক কৈটভের উপর নিয়ে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। কৈটভের মতো লোক যখন বিনা বাক্যব্যয়ে তার ওপর এসব পরীক্ষা করতে দিচ্ছে তখন যে কিছু ভয়ানক হতে চলেছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আজ সাতনম্বর দিন। সাতদিন ধরে কৈটভশূন্য এই খাদানপুরী। গুরুদেবকে বেঁধে রাখা হলেও সময়ে সময়ে খাদ্যবস্তু ও প্রাত্যহিক কাজের জন্য বন্ধন মুক্ত করা হচ্ছে। বৃশ্চিক নিজেই এসে গুরুদেবকে বন্ধন মুক্ত করে। কৈটভ-বাহিনীকে বৃশ্চিক নিজেই খুব একটা পছন্দ করে না। তাই এইসব সে নিজেই করে। এমনকি হিংস্র কৈটভ-বাহিনীর থেকে বাঁচার জন্য নিজেই একটা গোলকের ভেতরে সারাদিন অবস্থান করে।

গুরুদেবকে যখন মুক্ত করে তখন তার আবিষ্কৃত কিছু পাশ গুরুদেবের আশেপাশে অটোম্যাটিকভাবে ঘুরতে থাকে। বাধা ধরা কাজের বাইরে কোনো কিছু করতে চাইলেই গুরুদেবকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে সেই পাশ। গুরুদেব একদিন সেই চেষ্টা করেছিলেন বটে। তারপর যখন বুঝলেন এসব করে কোনো লাভ নেই, তারপর থেকে খাদ্য গ্রহণ এবং প্রাত্যহিক কাজের বাইরে আর কিছু করেন না। যথাসময়ে আবার শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েন তিনি। তবে এরই মাঝে একদিন বৃশ্চিককে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কৈটভের ওপর তুমি কী পরীক্ষা করছ?”

বৃশ্চিক তখন বসে বসে ঝিমোচ্ছিল। কথা বলার লোক পেয়ে তারও ভালোই লাগল, “সেটা বলছি। তার আগে এটা বলুন তো আপনাকে কেন ধরে নিয়ে এসেছি?”

গুরুদেব অনেক ভেবে বললেন, “আমি জানি না।

আসলে প্রশ্নের উত্তরে এরকম প্রশ্ন গুরুদেব আশাই করেননি বৃশ্চিককে মাঝে মাঝে তার পাগল মনে হয়। বৃশ্চিক বিচ্ছিরি হাসল। তারপর বলল, “আগে তো নিজের ব্যাপারটা বুঝবেন। তারপর তো বাকিদের কথা ভাববেন। আর শুনুন আমি একটু পাগলই। না-হলে কৈটভের সঙ্গে কেউ পার্টনারশিপ করে।”

গুরুদেব স্নিগ্ধ হেসে বললেন, “আমরা গুরু তো। আমরা আগে সবার কথা ভাবি। সে তুমি বুঝবে না। বলো কৈটভের ব্যাপারটা বলো।”

বৃশ্চিক বলল, “বেশ। আমিও আগে আপনারটাই আপনাকে শোনাব। তারপর কৈটভ।”

“তাই হোক।”

“আপনার একটা অসম্ভব শক্তি রয়েছে। সেটা আপনি শুধুমাত্র গোপন কক্ষে ওই বারোজন শিক্ষার্থীর সঙ্গেই ভাগ করে নেন।”

বৃশ্চিকের কথায় গুরুদেবের কপালে ভাঁজ পড়ে। সেটা দেখে বৃশ্চিক মুচকি হেসে বলল, “একদম ঠিক ধরেছেন। ওই বারোজনকে আপনি চাইলে আবার বাঁচিয়ে দিতে পারেন যাদের ওপর গন্দবেরুন্দার শরীর নিঃসৃত নির্যাস ইতিমধ্যে তার অপগুণ বিস্তার করেছে। মস্তক ছেদনের পরেও চাইলে আপনি তাদের বাঁচাতে পারেন। কিন্তু আজ অবধি আপনি কখনোই কাউকে বাঁচিয়ে তোলেননি। কারণ আপনি সেই গোপন কক্ষেই জানিয়ে দেন যে যদি আপনার মনে হয় কোনো শিক্ষার্থীর বেঁচে থাকা এই সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন তবেই আপনি এই সিদ্ধান্ত নেবেন। এখন অবধি সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। এবার কৈটভ হচ্ছে ওই বারোজন শিক্ষার্থীদেরই একজন যে দীর্ঘায়ু হয়েছে তার নিজ গুণে। তবে এবার আমরা যে অভিযানটি করছি তাতে কৈটভের প্রাণনাশেরও সম্ভাবনা আছে।”

গুরুদেব কৌতূহলী হলেন, “কী অভিযান?”

বৃশ্চিক মুচকি হেসে বলল, “হলাহল বিষভাণ্ডের অভিযান, যা সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল। মহাদেব সেই বিষ পান করার পর পানপাত্রে যে কয়েক ফোঁটা বিষ রাখা ছিল তা গোপন এক ডেরায় রাখা আছে। এই বিষ দিয়েই সৃষ্টি হবে কলিযুগের অসুর কলিপুরুষের। সেই বিষ আমি সময়ের আগে খুঁজে বের করব। কৈটভকেই পরিণত করব কলি পুরুষে।”

গুরুদেব চমকে উঠলেন এসব কথায়, “আমি হাতজোড় করছি, এরকম অনর্থ তোমরা কোরো না। সৃষ্টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। স্থিতি-লয় বিনষ্ট হবে।”

বৃশ্চিক এই কথায় মজা পেল, “আগে নিজের হাত বন্ধন থেকে মুক্ত করে তবেই না জোড় করবেন!”

গুরুদেব এই কথাটাকে উড়িয়ে বলেন, “এরকম কোরো না তোমরা।”

বৃশ্চিক বলে, “এরকম করতে তো হবেই। আর এতে আপনি আমাদের সাহায্যও করবেন।”

গুরুদেব বুঝতে পারেন না এই কথার অর্থ। গুরুদেবকে বিহ্বল দেখে বৃশ্চিক বুঝিয়ে বলে, “হলাহল খুবই মারাত্মক বিষ। সেই বিষের প্রভাবে যদি কৈটভের কিছু হয় সেক্ষেত্রে আপনি তাকে বাঁচিয়ে তুলবেন।”

গুরুদেব চিৎকার করে উঠলেন, “এ অসম্ভব! আমি কখনোই এরকম গর্হিত কাজ করব না। এতদিন ধরে এই শক্তি বাঁচিয়ে রেখেছি কি কৈটভের মতো পাষণ্ডের জীবন রক্ষা করার জন্য?”

বৃশ্চিক কথাটা শুনেও শুনল না, “আপনি সবই করবেন। যদি ভালোভাবে আমাদের কথায় না-করেন তবে আপনার শরীরকে কাবু করে আমি সমস্ত কিছু করিয়ে নেব। আপনাকে বেশি ভাবতে হবে না।”

গুরুদেব মিনতি করলেন, “কেন সমস্ত কিছু ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছ তোমরা?”

বৃশ্চিক উত্তরে বলে, “কারণ এরপর আবার নতুন সৃষ্টি হবে। এটাই নিয়ম।”

গুরুদেব রেগে গেলেন, “সেই সৃষ্টি পরমপিতা করবেন। তোমাদের মতো শয়তানেরা নয়।”

বৃশ্চিক নিজের গবেষণাগারের দিকে যেতে যেতে বলে, “এই যুগ যে শয়তানের যুগ! দেখছেন না কীভাবে চারিদিক শয়তানে ভরে যাচ্ছে। আর শয়তানেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই যা করার শয়তানেরাই করবে। কেন মিছিমিছি আপনার পরমপিতাকে কষ্ট দেওয়া! আপনি বরং এখন বিশ্রাম নিন। সময়ে ডেকে নেব।”

বৃশ্চিক গবেষণাগারে ঢুকে দেখল কৈটভকে জারে ঢোকাবার পর ৬ দিন ২৩ ঘণ্টা ৫০ মিনিট কেটে গেছে। আর দশ মিনিটের মধ্যেই এই পরীক্ষা শেষ হবে। কী হতে চলেছে তা ভেবেই বৃশ্চিকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর মাত্র দশ মিনিট। সময় যেন কাটতে চাইছে না। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বৃশ্চিক। এরই মধ্যে গুরুদেবের চিৎকার ভেসে এল, “হলাহলের বিষ ধারণ করার উপযুক্ত শরীর কৈটভের কাছে আছে কি?”

কর্কট এখন তার পরীক্ষার ফলাফলের কথা ভাবছে। এসব প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, “আমার হিসেব বলছে কৈটভ সক্ষম। যদি সক্ষম না-হয় তাহলে আপনি তাকে বাঁচিয়ে তুলবেন। সহজ সমাধান।”

গুরুদেব নাছোড়বান্দা, “তাতেও কি অভিষ্ট লাভ হবে?”

বৃশ্চিক অধৈর্য হয়ে বলে উঠে, “এই দেখুন। ঠাকুরদার তৈরি যন্ত্র। এটা তখনই সবুজ সংকেত দেখাবে যখন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী কেউ আশেপাশে থাকবে। কৈটভ পাশে আসার পর থেকেই এই যন্ত্র সবুজ সংকেত দিচ্ছে। তাই আমি নিশ্চিত কৈটভ হলাহল গ্রহণ করার অধিকারী।”

গুরুদেব বুঝলেন যে বৃশ্চিক আটঘাট বেধেই যুদ্ধে নেমেছে। অনুনয় বিনয় করে নিরস্ত্র করা মুশকিল। অন্য পথ ভাবতে হবে। এদিকে আর এক মিনিট বাকি বৃশ্চিকের পরীক্ষার ফলাফল বের হতে। শেষ মিনিটে এসে ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেল বৃশ্চিকের পক্ষে। এটাই হতে চলেছে বৃশ্চিকের গুরুত্বপূর্ণ এক আবিষ্কার। কর্কটকে ছাড়াও সে একমেবাদ্বিতীয়ম্। আর দশ সেকেন্ড মাত্র। তিন দুই এক……

গবেষণাগার পূর্ণ হতে থাকল ধোয়াঁতে। সেই ধোঁয়া কাটিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল বৃশ্চিক। সে কাচের জারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পরপর দুটো কাচের জার ছিল। একটা সুইচে চাপ দিতেই ধোঁয়া অনেকটা কমে এল। সাকশানের মাধ্যমে ধোঁয়া টেনে নিল মেশিন। তারপর কাচের জারের দিকে তাকিয়ে বৃশ্চিক আনন্দে লাফিয়ে উঠল।

“ইউরেকা… ইউরেকা।”

গুরুদেব বাইরে থেকে শুনল বৃশ্চিকের হর্ষোল্লাস। পর পর দুটো জারে বসে আছে দু-দুটো কৈটভ। দু-জনেই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আসল কৈটভকে কাচের জার থেকে মুক্ত করল বৃশ্চিক।

“শরীর ঠিক আছে তো?”

কৈটভকে চনমনে লাগছে। সে বলল, “হ্যাঁ। ঠিক যেন আবার মাতৃগর্ভ থেকে বেরোলাম।”

বৃশ্চিক জিজ্ঞেস করল, “খিদে পেলে অসুবিধে হয়নি তো।”

কৈটভ বলল, “বললাম-না একেবারে মাতৃগর্ভ। তোমার লাগানো পাইপ দিয়ে প্রতিনিয়ত খাবার পেয়েছি। প্লাসেন্টার মতো কাজ করেছে এই পাইপ। খাবার মুখ দিয়ে খেতে পারিনি ঠিকই। কিন্তু শরীরে অপুষ্টি হয়নি।”

বৃশ্চিক বলল, “যাক, তাহলে আমি সফল। এবার দেখা যাক আমার আবিষ্কার কেমন হয়েছে।”

কৈটভ বলল, “হ্যাঁ দ্যাখো, দ্যাখো। এমনিতে বাইরে থেকে দেখতে তো আমার মতোই লাগছে।”

বৃশ্চিক খোলার আগে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সাধারণ ক্লোনের মতো লাগছে না। আসল কৈটভ-ই লাগছে। শেষে এক লহমায় জার থেকে মুক্ত করল নকল কৈটভ-কে। আসল কৈটভ ঘুরে ফিরে এই কৈটভ-কে দেখতে লাগল। তারপর একসময় তারিফের সুরে বলল, “হুবহু এক। হুবহু। তুমি চমৎকার একটা কাজ করেছ।”

বৃশ্চিক হাসে।

“কৈটভ আমাকে খুশি হয়ে তুমি সম্বোধন করছে। আমি এতেই আমার কাজের পরিণাম উপলব্ধি করতে পারছি।”

কৈটভ হাসল।

“আচ্ছা আমার বদলে এই কি তোমার সঙ্গে যাবে? এ পারবে আমার মতো চিন্তাভাবনা এমনকি যুদ্ধ অবধি করতে?”

বৃশ্চিক ক্লোন-কৈটভের গা থেকে জল মুছতে মুছতে বলে, “সব পারবে। আমি আগে চেক করে নেব। তোমার যদি নব্বই শতাংশও করে দেয় তাহলেও অনেক। কারণ আমি যতদূর বুঝি সেখানে একটা প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকছেই। তাই প্রথমে যাবে এই ক্লোন কৈটভ। তারপর যাবে তুমি। এরপরেও কিছু হলে গুরুদেব তো রইল তোমাকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য।”

বৃশ্চিকের প্ল্যানটা ভালো মনে হল কৈটভের। “বেশ। তাহলে তুমি একে পরীক্ষা করে দ্যাখো। আমি একটু বিশ্রাম নিই বরং।”

কৈটভ চলে গেল। বৃশ্চিক ক্লোন-কৈটভকে ট্রেইন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারপর কেটে গেল আরও দু-দিন। ক্লোন-কৈটভ একেবারে তৈরি হয়ে গেল। কৈটভ সেদিন সকালবেলায় পরীক্ষা করতে এল তার ক্লোন-কে। গুরুদেব শৃঙ্খলিত অবস্থায় দেখছিল দূর থেকে। দুইদিকে দুই কৈটভ দাঁড়িয়ে। গুরুদেব যা বোঝার বুঝে গেছেন। আশঙ্কায় অনিদ্রায় গুরুদেব ক্রমশ কাহিল হয়ে পড়ছেন। প্রতিপক্ষ দিন দিন এত ভয়ংকর হয়ে উঠছে যে মোকাবিলা শুধু কঠিন নয, অবাস্তব হয়ে যাচ্ছে।

শুরুতে আসল কৈটভ তার শারীরিক দক্ষতার পরিচয় পেতে তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ শুরু করল। মল্লযুদ্ধে কৈটভের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু আজ সে তার ক্লোনের সঙ্গে পেরে উঠল না। সে যতই মারপ্যাঁচ দিক না কেন তার ক্লোনের কাছে সমস্ত মার প্যাঁচেরই জবাব ছিল। একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু তার ক্লোন ক্লান্ত হল না। তারপর কৈটভ নিল তার অস্ত্র পরীক্ষা। তলোয়ার, তির-ধনুক, লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র সমস্ত পরীক্ষাতেই ক্লোন-কৈটভ আসল-কৈটভের মতোই ভালো ফলাফল করল। শেষে কৈটভ তাকে দিল মোক্ষম এক পরীক্ষা। সে ক্লোনকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি মৃতকৈটভ-কে আপগ্রেড করতে পারবে?”

“পারব।”

“বেশ। তবে মৃতকৈটভ-এর এক অংশকে এরকমভাবে আপগ্রেড করো যেন কোনো গোপন ডেরায় আমরা পৌঁছে যেতে পারি অনায়াসে।”

“অবশ্যই। আমাকে বারো ঘণ্টা সময় দিন।”

“মাত্র বারো ঘণ্টা?”

“হ্যাঁ।”

“বারো ঘণ্টায় কীভাবে করবে? তুমি তো মৃতকৈটভ-এর ফর্মেশন জানো না।”

“আপনি যা যা জানেন ততটুকু অবধি আমিও জানি। মৃতকৈটভ থেকে এই পদার্থ তৈরি করতে আমার সাধারণ হিসেবে বারো ঘণ্টার বেশি লাগা উচিত নয়।”

“বেশ। শুরু করো। এখন বাজে বারোটা। আমি ঠিক রাত বারোটায় দেখতে আসব।”

পরের বারো ঘণ্টা ক্লোন-কৈটভ লেগে রইল গবেষণাগারে। বৃশ্চিক আশেপাশে রইল তত্ত্বাবধান করার জন্য। রাত বারোটায় যতক্ষণে কৈটভ পরিদর্শনে এল ততক্ষণে ক্লোন-কৈটভ বানিয়ে ফেলেছে উদ্দিষ্ট পদার্থ।

“হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, এই নিন।”

আসল-কৈটভ বৃশ্চিকের দিকে তাকাল। বৃশ্চিক হাত নেড়ে বলল, “আমি শুধু তত্ত্বাবধায়কের কাজে ছিলাম। সে যা করেছে নিজে করেছে।”

কৈটভ দেখল সত্যিই আবিষ্কার তৈরি। পরখ করার জন্য সে তরলের প্রয়োগ করল নিজের ওপরে।

“যে জায়গায় আমার অতীতের দেহ মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে সেই জায়গায় যেতে চাই।”

সঙ্গে সঙ্গে তরলের প্রতিক্রিয়ায় সে পৌঁছে গেল সেই জায়গায়। এত ভালো কিছুর মধ্যে কৈটভ এই জায়গায় আসা চয়ন করল। কারণ সে তার মনের ভেতর জমে থাকা রাগ-কে ঠান্ডা হতে দিতে চায় না। এই ক্লোন যে তার ঠিক অবিকল প্রতিমূর্তি তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না। সে আবার ফিরে এল খাদানের ভেতরে গবেষণাগারে।

“আমার পরীক্ষায় ক্লোন-কৈটভ পাশ করল।”

কৈটভের এই কথা বৃশ্চিককে আপ্লুত করে ফেলল। কৈটভ সেদিকে দৃকপাত না-করে বলল, “তাহলে প্ল্যান-টা কী দাঁড়াচ্ছে?”

বৃশ্চিক গদগদ হয়ে বলল, “কিছুই প্ল্যান নেই। শুধু তোমার বদলে তোমার এই ক্লোন এই অভিযানে যাবে। শত্রুপক্ষ যদি কিছু করার কথা ভাবে অথবা সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও আমরা যদি আক্রান্ত হই তাহলে তোমার কিছু হচ্ছে না। হবে ক্লোন-কৈটভের।”

কৈটভ ক্লোনের সামনেই এরকম কথায় অস্বস্তিতে পড়ে। বৃশ্চিক সেটা বুঝে বলে, “ক্লোনের মধ্যে এসব আবেগ থাকে না। চিন্তা নেই।”

“বেশ তবে আমিও এই যাত্রায় থাকব। সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে থাকব আমি।”

“ভ্যানিশিং-এর ব্যবহার করবে, তাই তো?”

বৃশ্চিকের প্রশ্নে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় কৈটভ। যাবার সময় বৃশ্চিকের কাঁধে হাত রেখে সাবাশি দিয়ে কৈটভ বলে, “দারুণ এক কৈটভ বানিয়েছ। আমি আমার সামর্থ্যের পঞ্চাশ ভাগ ব্যবহার করেছিলাম যুদ্ধে। আমার পঞ্চাশ ভাগও বহু সমর্থ যোদ্ধার একশো ভাগের সমান। তোমার ক্লোন পরীক্ষায় পাশ করেছিল। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক স্বভাব তোমার অনবদ্য সৃষ্টি। প্রোগ্রাম যেভাবেই করে থাকো -না কেন এ ঠিক রোবট নয়। আমার ধারণা এর মধ্যে আবেগ রয়েছে। নইলে আমি যখন উপস্থিত হয়েছিলাম কবরে, সেও তখন ভ্যানিশিং ব্যবহার করে আমার সঙ্গে উপস্থিত হত না। তুমি হয়তো লক্ষ করোনি। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যেই সে ফিরে এসেছিল। আমি তার উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম কবরের কাছে। মারাত্মক এক আবিষ্কার করেছ।”

বৃশ্চিক একইসঙ্গে আশ্চর্য ও অভিভূত দুই-ই হয়ে যায়। কৈটভ কথা শেষ করে গবেষণাগার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

* * * * *

কাকতালীয়ভাবে দুই শিবিরেরই সময়চক্রযানে যাত্রা শুরুর সময় ঠিক হয় পরদিন সকাল সাতটায়। রামানুজ বর্তমানে সেই ভোরবেলায় পবন কুমারের গুহামুখের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে মাত্র কোনোক্রমে গুহামুখ থেকে বেরিয়েছে। তার পিঠে উপদেবতার আঁচড়ের গভীর ক্ষত চিহ্ন।