Accessibility Tools

মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

হলাহল বিষভাণ্ড – ৯

।। ৯।।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলছে। হস্তিনাপুর-ইন্দ্রপ্রস্থ উভয়ের অবস্থাই তথৈবচ। প্রজাদের ঘরে অন্ন বাড়ন্ত। কান পাতলে বিধবাদের ঘর থেকে কান্নার রোল শোনা যায়। পানীয় জলের সংকটও দেখা দিচ্ছে ধীরে ধীরে। রাজারা যুদ্ধ করছে আর স্ত্রী-শিশুদের দুর্ভোগ চলছে। কিন্তু একটা যুগ সংশোধনের জন্য, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এই দুর্ভোগেরও দরকার ছিল। তাই সকলে মেনে নিয়েছে দুর্ভোগ। রামানুজরা পথে হাঁটছিলেন। কিন্তু মানুষজন ধীরে ধীরে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে উৎসুক হয়ে পড়ছিলেন। নেহাত বেশিরভাগ শক্ত সমর্থ পুরুষশ্রেনি যুদ্ধে থাকায় কেউ তাদের কাছে এগিয়ে আসে না। দাসবাবু বললেন, “আমাদের বোধহয় বেশিক্ষণ এভাবে দিবালোকে হাঁটা উচিত হবে না।”

রামানুজ বলল, “যুদ্ধক্ষেত্র সমন্তপঞ্চকে। তার আশেপাশে কোনো গোপন ডেরায় আপাতত মাথা গোঁজার জায়গা পেলে ভালো হয়। সেখান থেকেই যুদ্ধে নজর রাখা যাবে। সন্ধের পর যখন যুদ্ধ শেষ হবে তখন যুদ্ধভূমিতে গিয়ে অস্ত্রের ভাঙা অংশ কুড়িয়ে আনা যাবে।”

বিবস্বান নির্দেশ অনুযায়ী কর্কট প্রদত্ত তরল মাটিতে নিক্ষেপ করল। সমন্তপঞ্চকের খুব কাছেই এক পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছাল সকলে। সেখানেই ঘাঁটি গাড়ল তারা। গাছের ছায়ায় তাদের কেউ দেখতেই পাবে না। অথচ ওপর থেকে যুদ্ধভূমি স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও এতই দূরে অবস্থিত যে সেখান থেকে আলাদা করে কাউকে স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই। কুরুক্ষেত্রে এখন যুদ্ধ চলছে। মহারথীরা ধুন্ধুমার যুদ্ধ করে চলেছেন। ভীষ্ম ইতিমধ্যে শরসজ্জায় শায়িত। আজ জয়দ্রথের অন্তিম দিন। আজ জয়দ্রথকে হত্যা না-করতে পারলে আগুনে নিজের আত্মাহুতি দেবেন অর্জুন। আগেরদিন অভিমন্যুকে চক্রব্যূহে হত্যা করতে সাহায্য করায় অর্জুন আজ পুত্রশোকের প্রতিশোধ নেবেন।

রামানুজ দেখল, ঠিকই সময়ের অনেক আগে আজ সূর্য দেবতা অস্ত চলে গেলেন। রামানুজ বলল, “ভালো করে দ্যাখো সবাই, সূর্য ঢেকে আছে সুদর্শন চক্রে।” সবাই তাকাল। স্পষ্ট বোঝা না-গেলেও আবছায়ায় বোঝা যাচ্ছিল কিছু একটার উপস্থিতি। অনেকটা সূর্যগ্রহণের মতো। রামানুজ বলল, “এক্ষুনি জয়দ্রথ বেরোবে। ভাববে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে। আর তখনই তাকে বধ করবেন অর্জুন।”

বিবস্বান বলল, “সবই শ্রী কৃষ্ণের মায়া। দুই পক্ষ থেকে নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছেন।”

রামানুজ হাসল বহুক্ষণ পর।

“ঠিক বলেছ। জয় শ্রী কৃষ্ণ। সবই তার লীলা।”

বিবস্বান বলল, “সবাই একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন। মধ্যরাতে বেরোতে হবে।”

রামানুজ বলল, “সবার যেতে হবে না। আমি একাই যাব।”

প্রথমে আপত্তি করলেও পরে সকলে রাজি হল। রামানুজ কাঞ্চনকে ডেকে বলল, “দুর্গা কি কোনো জামাকাপড় সঙ্গে এনেছে?”

কাঞ্চন জিজ্ঞেস করে, “জানি না।”

রামানুজ বলে, “সাধারণত মেয়েরা অনেক কিছুই সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। সে শপিং মল হোক কী দুর্ধর্ষ অভিযান? জিজ্ঞেস কর। আর পেয়ে গেলে আমাকে একটা শাড়ি দিস।”

কাঞ্চন বলে, “শাড়ি? কী করবে শাড়ি দিয়ে?”

রামানুজ চোখ টিপে বলে, “কাজ আছে। দিস।”

কাঞ্চন মাথা নেড়ে চলে যায়। আর ঠিক তখনই আবার সূর্য দেব-কে দেখা যায়। এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন জয়দ্রথকে অর্জুন বধ করবেন। রামানুজের ভেবেই গায়ে কাঁটা দেয়।

“যদি বাইনোকুলারটা সঙ্গে থাকত ভালো হত। কী হে বিজ্ঞানী বিবস্বান। আছে নাকি কোনো উপায়?”

বিবস্বান কাঁধ ঝাঁকায়। “সব আবিষ্কার কৈটভের কাছে। নইলে হয়তো বাইনোকুলারের ব্যবস্থা না-হোক এই দৃশ্য লাইভ আরও কাছ থেকে দেখার ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম।”

সবাই বিশ্রাম করতে আশেপাশে চলে গেল। একা রামানুজ দূর থেকে জয়দ্রথ বধ দেখার চেষ্টা করতে থাকল। মহাভারতে তার সেই ছোটো থেকে আগ্রহ। আজ জীবন যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সামনে থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে তখন তার থেকে বেশি খুশি হয়তো এই দলের কেউ নয়।

রামানুজ মধ্যরাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে আর ভাবতে থাকে, যে মহাভারতের কাহিনি সবসময় বইতে পড়েছে, আজ সবাই সেই মহাভারতের সময়ে চলে এসেছে। ঢিল ছোড়া দূরত্বে চলছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। সমস্ত মহারথী তো বটেই, স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণও উপস্থিত রয়েছেন সেখানে। মাঝে মাঝে এসব স্বপ্ন মনে হয়। তারপর আবার যখন সে চিন্তা করে যে বাস্তবিক জীবনে তার সঙ্গে যা ঘটছে তাও কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম কোথায়? কল্পনাতে যা যা সম্ভব তার প্রতিটা ঘটছে এই কাহিনিতে। হয়তো ভবিষ্যতে কোনোদিন অন্য কেউ অন্য কোনো সময়যানে চড়ে এসে রামানুজের কাহিনি দেখবে। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুম নামে চোখে। ঘুম যখন ভাঙে তখন মধ্যরাত। কাঞ্চন এসে ডাকছে তাকে।

“রামানুজদা ওঠো। ওঠো রামানুজদা।”

লাফ দিয়ে ওঠে পড়ে রামানুজ।

“চারদিকে নিদারুণ শব্দ হচ্ছে, আর তুমি ঘুমাচ্ছ?”

ঘুম চোখে চারদিকে তাকায় রামানুজ। কুরুক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই কুরুক্ষেত্র লেগে গেছে। বিভিন্নরকম অস্ত্রের প্রয়োগ চলছে এই মধ্যরাতে। এই সময় রাক্ষসদের শক্তি সর্বাধিক। এত দূর থেকেও রামানুজ ঘটোৎকচ-কে দেখতে পেল। এমনিতেই এই যুগে সকলের উচ্চতা তাদের সকলের থেকে বেশি। তার মধ্যে ঘটোৎকচ যেন সুবিশাল এক পাহাড়। এত বিশালাকার যে কেউ হতে পারে তা ঘটোৎকচ-কে না-দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না। রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কতটা সময় ধরে চলছে এই যুদ্ধ?”

কাঞ্চন বলল, “ঘণ্টা দুয়েক তো হবেই।”

রামানুজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

“তাহলে আর বেশি সময় লাগবে না। একাঘ্নি বাণ প্রয়োগের সময় হয়ে এসেছে। আমার জন্য শাড়ি এনেছিস?”

কাঞ্চন বলল, “তোমার অনুমান একেবারে সঠিক না-হলেও দুর্গার কাছে আপাতত নিজেকে আচ্ছাদিত করার মতো অল্প বস্ত্র আছে। সে পাহাড়ের পেছনের দিকে চলে গেছে। তুমি ফিরে এসে শাড়িটা খুলে দিয়ো। ওকে ফেরত দিতে হবে।”

রামানুজ বলল, “আমি যথাশীঘ্র ফিরে আসব।”

পরের আধঘণ্টায় রামানুজ তৈরি হয়ে নিল। আর তারপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যুদ্ধভূমির দিকে নামতে লাগল। নামার সময়েই সে শব্দটা পেল। ঘটোৎকচকে ইতিমধ্যে একাঘ্নি বাণ মেরেছেন কর্ণ। তার আর্তনাদে গোটা পৃথিবী কাঁপছে। সে আর্তনাদ করতে করতে কৌরবদের এক অক্ষৌহিণী সেনার ওপর আছড়ে পড়ল। ভূমিকম্প হল যেন। এতটাই কম্পিত হল ভূমি যে রামানুজ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পড়ে গেল নীচে। তাতে যাত্রাপথ ছোটো হল বটে কিন্তু সারা শরীরে প্রচুর আঘাত পেল রামানুজ।

উঠে দাঁড়াল রামানুজ। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবু ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল যুদ্ধভূমির দিকে। প্রায় আধ ঘণ্টা অবিরাম হাঁটার পর সে পৌঁছাল যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধক্ষেত্রে তখন ভীম বিলাপ করছেন তাঁর পুত্রের মাথা কোলে নিয়ে। চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভীমের আর্তনাদ। এত সামনে থেকে মহারথীদের দেখে কিছু সময়ের জন্য রামানুজ ভাবাবেগের বশবর্তী হল বটে কিন্তু পরক্ষণেই সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। এভাবে কাটল আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক সময়। ভীম চলে গেলেন। নারী ও শিশুরা যুদ্ধক্ষেত্রে আসবেন নিজের প্রিয় মানুষদের শেষবারের মতো দেখার জন্য। কারও স্বামী, কার পুত্র, কারও পিতা আজ যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। রামানুজ এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ধীরে ধীরে নারীরা আসতে শুরু করলেন যুদ্ধভূমিতে। সংখ্যায় খুবই কম। তবু আসছেন তাঁরা। সব যুগেই যুগের থেকে এগিয়ে কিছু নারী থাকেন। তাঁরাই এসেছেন। বাকিরা মনে করেন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ। সেটা পুরুষদের জায়গা।

সুযোগের উপযুক্ত ব্যবহার করে শাড়ি পরিহিত রামানুজ মিশে গেল অন্যান্য নারীদের ভিড়ে। ভীমপুত্র ঘটোৎকচকে শেষ দেখা দেখতে আসবেন অনেকেই। শেষ প্রণাম করবেন বহু মানুষ। রামানুজ সেই ভিড়েই মিশে গেল। তবে আজ নগরের সবাইকে শেষ দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ দৈত্যাকৃতি রাক্ষস আগে কখনও দেখেনি। তাই ভিড় বাড়ল। সেই ভিড়ের সুযোগে রামানুজ পৌঁছালেন ঘটোৎকচের দেহের পাশে। এত বড়ো রাক্ষস-কে কাছ থেকে দেখা এক অভিজ্ঞতা বটে! একাঘ্নি বাণের একাংশ তখনও বিঁধে আছে ঘটোৎকচের বুকে। রামানুজ নীচে খুঁজতে লাগলেন। ভীম মৃতদেহ কোলে নিয়ে কেঁদেছিলেন। তাই অস্ত্রের ভাঙা টুকরো নীচে পড়ে থাকার কথা। ভালো করে দেখতেই বাণশলাকার ক্ষুদ্র অংশ দেখতে পেল রামানুজ। ঘটোৎকচের কোমরের পাশে পড়ে আছে। প্রণাম করার সময় সেই অংশ হাতে নিলেন রামানুজ। এত উত্তপ্ত ছিল সেই বস্তু যে হাত পুড়ে গেল রামানুজের। সে শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখল টুকরোটা। তারপর একসময় ভিড়ের মধ্যেই হারিয়ে গেল।

ফেরার আগে সকল মহারথীদের শেষবারের মতো চোখ ভরে দেখল রামানুজ। সকলেই আছেন। শুধু শ্রী কৃষ্ণ-কে দেখতে পেল না। আজ যে তিনিও ঘটোৎকচের সঙ্গে আরও একবার নিহত হয়েছেন। তিনিই তো বারবার নিহত হচ্ছেন। এক ও অভিন্ন শ্রী কৃষ্ণ। ফেরার পথে চারদিকে ভালো করে তাকাল রামানুজ। কুরুক্ষেত্রের ময়দান যেন এক মৃত্যুপুরী। চারদিকে শুধু রক্তবন্যা বয়ে গেছে। থিকথিক করছে লাশ। দাহ কার্য চলছে। কিন্তু এত লাশের দাহ সম্ভব হচ্ছে না একত্রে। কুরুক্ষেত্রের এই দৃশ্য সম্পর্কে কোথাও কোনো উল্লেখ নেই। রথী-মহারথীরা কাল অবধি যাঁরা নিজের বাহুবলে মত্ত ছিলেন তাঁরা আজ নেহাত মৃত মাংসপিণ্ড হয়ে পড়ে আছেন ভূতলে। এ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। রামানুজ পাহাড়ের পথ ধরল।

*****

ত্রেতা যুগে যখন কৈটভের যুগচক্রযান পৌঁছাল তখন সেখানে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। যুদ্ধক্ষেত্রের চারদিকে জঙ্গল থাকায় সেখানে আশ্রয় নিল বৃশ্চিক আর কৈটভ। গুরুদেব তাদের সঙ্গেই ছিলেন। এটা সেই সময় যখন রাবণের তিন পুত্র ত্রিশিরা, নরান্তক, দেবান্তক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত। বানরসেনার সঙ্গে রাক্ষস সেনার যুযুধান যুদ্ধ চলছে। কখনও বানরসেনা তছনছ করছে রাবণের বিশাল সেনাবাহিনীকে আর কখনও রাক্ষসবাহিনী নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করছে বানরসেনার ওপর। বিভীষণ রামের দিকে থাকায় রাবণ পক্ষের কোনো কোনো মোক্ষম চাল আগে থেকেই শ্রী রাম জানতে পেরে যাচ্ছেন। সেই অনুযায়ী যুদ্ধের সময় সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হচ্ছে শ্রী রামের সেনার

যুদ্ধক্ষেত্রে একদিকে শ্রী হনুমান প্রবল পরাক্রমে ত্রিশিরার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। অপর প্রান্তে বালি পুত্র অঙ্গদ যুদ্ধ করছেন নরান্তক ও দেবান্তকের সঙ্গে। দূর থেকে কৈটভ-সহ অন্যান্যরা এই যুদ্ধ দেখছে। বৃশ্চিক তাদের সামনে একটা থকথকে অথচ স্বচ্ছ তরলের স্তর তৈরি করছে। এই থকথকে তরলের স্তর আতস কাচের মতো ব্যবহার করছে তারা। এই তরলের এপার থেকে অন্য পারের বস্তুর দিকে তাকালে অনেক দূরের বস্তুকেও অতি সন্নিকটে মনে হয়। ফলে এত দূর থেকেও যুদ্ধ এবং যোদ্ধাদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সকলে। শুধু তাই নয় তরলে স্পর্শ করলে ওই বিশেষ জায়গায় কী কথাবার্তা হচ্ছে তাও শোনা যায় স্পষ্টভাবে। গুরুদেব শ্রী হনুমান-কে সাক্ষাৎ দর্শন করতে পেরে ভক্তিভরে প্রণাম নিবেদন করলেন। তা দেখে অদৃশ্য কৈটভ ফিক করে হাসল। কৈটভের ধারণা সে হনুমান-কেও গদাযুদ্ধে হারাতে পারবে। হনুমানের সঙ্গে ত্রিশিরা যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এরকমই এক সময়ে হনুমান তার গদার আঘাতে ত্রিশিরার মস্তক ছেদন করলেন। প্রায় একই সময়ে অঙ্গদ হত্যা করলেন নরান্তক ও দেবান্তক-কে। রাক্ষস সেনা বানরসেনার পরাক্রম দেখে ভয় পেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। আর ঠিক এই মোক্ষম সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আবির্ভাব ঘটল এক বিকটাকৃতি রাক্ষসের।

“সমরক্ষেত্রে অতিকায় উপস্থিত হয়েছেন”, গুরুদেব বিড়বিড় করলেন। অতিকায় যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোমাত্র রাক্ষস সেনা যেন হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অতিকায় বিশাল বানরসেনা বিনাশ করলেন। তা দেখে দ্বিগুণ উদ্যমে রাক্ষস সেনা বানরসেনার ওপর প্রহার করতে লাগল।

বৃশ্চিক জিজ্ঞেস করল, “অতিকায়ের বুকে ওটা কী জ্বলজ্বল করছে?”

ক্লোন-কৈটভ তো বটেই এমনকি প্রকৃত-কৈটভও এর উত্তর দিতে পারল না। গুরুদেব উত্তরে বললেন, “ওটা ব্রহ্মকবচ। স্বয়ং ব্রহ্মা অতিকায়ের কঠিন তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে এই কবচ দান করেছিলেন। কোনো দিব্য অস্ত্রের মাধ্যমেই এই ব্রহ্মকবচ ভেদ করা যাবে না। সুতরাং আপাতত যারা যুদ্ধভূমিতে আছে তাদের কেউই অতিকায়কে হারাতে পারবেন না।”

আদতে ঘটলও তাই। অঙ্গদ বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত মাত্র! ছিটকে পড়লেন অঙ্গদ। বানরসেনাদের পারলে মুখে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন অতিকায়। এতটাই বিক্রমে তিনি তছনছ করছেন প্রতিপক্ষ-কে। উপায়ান্তর না-দেখে স্বয়ং হনুমান এসে দাঁড়ালেন অতিকায়ের সামনে। বানরসেনা ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত। হনুমানের রক্ষণে সাময়িক আশ্রয় নিল তারা।

“রাস্তা ছাড়ো। নইলে তোমার বিনাশ নিশ্চিত।”

অতিকায়ের সাবধান বাণীকে তাচ্ছিল্য করলেন হনুমান।

“আগে আমার গদার প্রহার থেকে বাঁচো।”

হনুমানের গদার প্রহারে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন অতিকায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভীম-বিক্রমে এগিয়ে এলেন। শুরু হল ধুন্ধুমার। আর এক যুদ্ধ। দুইদিকেই দুই পরম বিক্রমশালী যোদ্ধা। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়। যুদ্ধক্ষেত্র যেন কিছু সময়ের জন্য থেমে গেল। কোনোপক্ষের সৈন্যরাই আর যুদ্ধ করছেন না। শুধুমাত্র হনুমান আর অতিকায়ের যুদ্ধ চলছে। অতিকায় যে এত শক্তিমান হবেন তা হনুমান আশা করেননি। রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছে তাঁর আঘাত সামলাতে।

দূর থেকে বিভীষণ দেখছিলেন এই যুদ্ধ। তিনি লক্ষ্মণ-কে বললেন, “আপনি শ্রী রামকে বলুন এক্ষুনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে।”

সুদর্শন লক্ষ্মণ এগিয়ে এলেন গুহামুখের ভেতর থেকে। তারপর শ্রী রামের নামে শপথ করে বললেন, “আমি লড়াই করব। এই তুচ্ছ রাক্ষসের জন্য আমিই যথেষ্ট।”

শ্রী রাম তখন গুহামুখের ভেতরে ছিলেন। তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। কৈটভ-সহ সকলে চেষ্টা করল স্বচ্ছ থকথকে তরলের অভ্যন্তরে শ্রী রামকে দেখার। কিন্তু তিনি গুহামুখের অনেকটা ভেতরে রয়েছেন। তাঁকে দেখা গেল না। শুধু তাঁর আশীর্বাণী শোনা গেল। গমগমে কণ্ঠস্বরে শ্রী রাম তাঁর অনুজকে বললেন, “বিজয়ী ভব!”

লক্ষ্মণ এগিয়ে এলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। তখনও হনুমান ও অতিকায়ের যুদ্ধ চলছে। কেউ ক্লান্ত হননি। বরং নতুন উদ্যমে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন দুজনে।

লক্ষ্মণ চিৎকার করলেন, “সাহস থাকলে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করো অতিকায়।”

কথাটা বলা মাত্র একটি অগ্নি বাণ নিক্ষেপ করলেন লক্ষ্মণ। সেই অগ্নি বাণ সোজা গিয়ে আঘাত করল অতিকায়ের বুকে। অতিকায় কয়েক কদম ছিটকে পড়লেন। কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষতি হল না। ব্রহ্মকবচ তাঁকে রক্ষা করল। লক্ষ্মণ-কে সমরভূমিতে এসে অতিকায়কে যুদ্ধে আহ্বান করতে দেখে হনুমান পিছিয়ে এলেন। তাঁর সঙ্গে অতিকায়ের দ্বৈরথ অপূর্ণ থেকে গেল। অতিকায় উঠে দাঁড়িয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, “তুমি কে? রাম?”

লক্ষ্মণ মাথা নাড়লেন, “মূর্খ! আমি যদি শ্রী রাম হতাম তাহলে তাঁর বাণের আঘাতের পর তুই এই প্রশ্নটা করার জন্য বেঁচে থাকতিস না। আমি শ্রী রামের অনুজ—লক্ষ্মণ।”

অতিকায় শব্দ করে হাসলেন, “তুই কেন এসেছিস? রাম নিজে এল না কেন? ভয় পাচ্ছে নাকি?”

লক্ষ্মণও স্মিত হাস্যে বললেন, “ভয়! তোর মতো ক্ষুদ্র এক রাক্ষস-কে মারতে শ্রী রাম আসবেন-ই বা কেন? তাই আমি এসেছি। আমিই তোর জন্যে যথেষ্ট।”

অতিকায় বললেন, “তাই নাকি? তবে এটা সামলা।”

কথাটা বলামাত্র নিজের ধনুকে এক সর্প-বাণ চালনা করলেন অতিকায়। লক্ষ্মণও তৎক্ষণাৎ এক দিব্য গড়ুর-বাণ চালনা করে অতিকায়ের বাণকে নিরস্ত্র করলেন। কিন্তু অতিকায় এতই ক্ষিপ্র যোদ্ধা যে ততক্ষণে আরও দুধরনের অগ্নি বাণ নিক্ষেপ করেছেন। লক্ষ্মণ কোনোক্রমে সেই সব বাণের প্রতিকার করলেন। অতিকায় আক্ষরিক অর্থেই রাবণের পুত্র। রাবণের মতোই যুদ্ধে মহাবলশালী অতিকায়। লক্ষ্মণের সঙ্গে ক্রমাগত নানাবিধ পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতে থাকেন অতিকায়। লক্ষ্মণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন অতিকায়কে সামলাতে গিয়ে।

এরকমই এক সময়ে কৈটভ বলল, “অন্য কেউ না। ক্লোন-কৈটভ যাবে সমরভূমিতে। আমি দেখতে চাই কীভাবে সে অস্ত্রের টুকরো নিয়ে ফেরে। আমি ক্লোনের পরীক্ষা নিতে চাই।”

বৃশ্চিক তাতে সম্মত হল। ক্লোন-কৈটভ-কে সে এই নির্দেশ জানিয়ে দিল। ইতিমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে একটা কাণ্ড ঘটিয়েছেন অতিকায়। তাঁর ভাই মেঘনাদের মতো অতিকায়ও মেঘের আড়ালে যুদ্ধ করতে পারেন। বর্তমানে তিনি যুদ্ধভূমি ছেড়ে মেঘের আড়ালে আস্তানা গেড়েছেন। লক্ষ্মণ তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি আন্দাজে তির ছুড়ছেন যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। এদিকে অতিকায়ের সমস্ত বাণ লক্ষ্মণের রক্ষণ বিদীর্ণ করছে। এমতাবস্থায় লক্ষ্মণ উপায়ান্তর না-পেয়ে দেবতাদের আহ্বান করলেন। এই বিকেল বেলায় যখন সূর্য লাল আভা ছড়াচ্ছে এরকম সময়ে চারদিক বিদীর্ণ করে এক অদ্ভুত রশ্মি উদয় হল। আর সেখানে আকাশবাণী হল।

“শ্রীমান লক্ষ্মণ, আপনার কোনো দিব্য বাণ অতিকায়ের কবচ-কে বিদীর্ণ করতে সক্ষম নয়। তাই আপনি যত চেষ্টাই করুন-না কেন বা যত সক্ষম যোদ্ধা-ই আপনি হন-না কেন কোনোভাবেই এই প্রক্রিয়ায় আপনার পক্ষে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়।”

লক্ষ্মণ ইতিমধ্যে হাতজোড় করেছেন। তিনি বললেন, “তাহলে কীভাবে এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারি দয়া করে আমাকে বলুন।”

আকাশবাণী শোনা গেল আবার।

“সময় উপস্থিত এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রটি প্রয়োগ করার।”

লক্ষ্মণের চিবুক টানটান হল। তিনি বুঝলেন এখন কোন্ অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। আকাশবাণী বন্ধ হল। লক্ষ্মণ হনুমান-কে নির্দেশ দিলেন, “আমাকে কাঁধে নিয়ে অতিকায়ের সমান উচ্চতায় চলো।”

হনুমান তৎক্ষণাৎ লক্ষ্মণকে কাঁধে করে মেঘের সমান উচ্চতায় পাড়ি দিলেন। অতিকায় তখনও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন।

“আহ্বান কর, যে-কোনো দিব্যাস্ত্র আহ্বান কর। আমার ব্রহ্মকবচ সমস্ত দিব্যাস্ত্রকে নাস্তানাবুদ করে দেবে।”

লক্ষ্মণ এবার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন অতিকায়কে। লক্ষ্মণ তাঁর ধনুকে আহ্বান করলেন সেই ভয়ংকর অস্ত্র। চারদিক এক অদ্ভুত তেজিয়ান আলোকরশ্মিতে পরিপূর্ণ হতে লাগল। লক্ষ্মণ মন্ত্রোচ্চারণ করছেন এবং আকাশে তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর দিব্যাস্ত্র। বৃশ্চিক বিড় বিড় করে অমোঘ উচ্চারণে বলল, “ব্রহ্মাস্ত্র।”

অতিকায় অবধি অবাক হয়ে দেখছেন। লক্ষ্মণ ব্রহ্মাস্ত্রকে আহ্বান করলেন নিজের ধনুকে। তারপর সেই অস্ত্রকে নিক্ষেপ করলেন অতিকায়ের দিকে। অতিকায় শুরুতে বুঝতে না-পারলেও ব্রহ্মাস্ত্র যত তাঁর দিকে এগিয়ে আসল ততই তিনি বুঝতে পারলেন যে এবার আর হয়তো বাঁচা সম্ভব নয়। ব্রহ্মকবচ ভেদ করে ব্রহ্মাস্ত্র আঘাত করল অতিকায়ের বুকে। আর্তনাদ করে উঠলেন অতিকায়। মেঘের আড়াল থেকে সোজা ভূতলে পতিত হলেন তিনি। ব্রহ্মাস্ত্রের উত্তাপে ছটফট করতে করতে অতিকায় মৃত্যুবরণ করলেন।

বৃশ্চিক এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না-করে ক্লোন-কৈটভ-কে বলল, “যাও। এক্ষুনি গিয়ে ব্রহ্মাস্ত্র-র অংশ সংগ্রহ করে আনো।”

কিন্তু কোথায় ক্লোন-কৈটভ। সেখানে কেউ নেই। বৃশ্চিক আশ্চর্য হয়ে গেল। বৃশ্চিকের এই অবস্থা দেখে গুরুদেব মুচকি হাসছেন

অদৃশ্য অবস্থায় থাকা প্রকৃত-কৈটভ জানাল, “সে তোমার নির্দেশের অনেক আগেই মিশে গেছে যুদ্ধভূমিতে।”

বৃশ্চিক অবাক হল, “আমি সত্যি তাকে যেতে দেখিনি।”

কৈটভ বলল, “দেখবে কীভাবে? আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার বিদ্যায়।” বৃশ্চিক ভ্রু কোঁচকায়। কৈটভ বলে, “তাকে যতটা মৃতকৈটভ দিয়েছিলাম তার নির্যাস দিয়ে সে শুধু যত্রতত্র গমনের জন্য তরল বানায়নি। সে রূপ বদলাবার মায়াতরলও বানিয়ে ফেলেছে। এ এক অদ্ভুত ক্লোন বানিয়েছ তুমি বৃশ্চিক। সে এখন বানরের বেশে বানরসেনাতে মিশে গেছে।”

বৃশ্চিক অবাক হয়ে গেল। সত্যি যদি এরকম হয়ে থাকে তবে সত্যি এই ক্লোন আবিষ্কার আশাতীতভাবে সফল। বানর-রূপী কৈটভ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রহ্মাস্ত্রের টুকরো নিয়ে হাজির হল। বৃশ্চিক ব্রহ্মাস্ত্রের টুকরো দেখে যতটা-না আশ্চর্য হল তার থেকে বেশি আশ্চর্য হল ক্লোনের রূপবদল দেখে। কিন্তু বৃশ্চিক আশ্চর্য হলে কী হবে? পরের মুহূর্তেই এক ভয়ংকর বিপদে পড়ল তারা সবাই।

সবার চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও হনুমানের চোখকে কৈটভ ফাঁকি দিতে পারেনি। শ্রী হনুমান কৌতূহলী হয়ে এদিকে এসে হাজির হলেন। ক্লোন-কৈটভ নিজের আসল রূপে ফিরতেই হনুমানের আওয়াজ পাওয়া গেল, “তোমরা কারা?”

সবাই মুখ ফিরিয়ে দেখলেন যে স্বয়ং হনুমান উপস্থিত।

বৃশ্চিক কালবিলম্ব না করে যুগচক্রযান আহ্বান করলেন। হনুমান এই ধরনের মানুষ আগে দেখেননি। তাই কিছুক্ষণ শুধু নিরীক্ষণ করছিলেন। যুগচক্রযান উপস্থিত হলে’পর তিনি সচকিত হলেন। কিন্তু ততক্ষণে যুগচক্রযান বৃশ্চিকের তৎপরতায় সবাইকে তার গর্ভে নিয়ে অদৃশ্য হতে শুরু করেছে। শ্রী হনুমান এটা উপলব্ধি করা মাত্র গদার আঘাত হানার চেষ্টা করলেন যুগচক্রযানে। মুহূর্তের ভগ্নাংশে সে আঘাত যুগচক্রযানে লাগল না। যুগচক্রযান সবাইকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সকলে। কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর প্রথম মুখ খুলল বৃশ্চিক, “দ্বাপরে যে-কেউ প্রথমে ঘটোৎকচের একাঘ্নি সংগ্রহ করে তারপর অঞ্জলিক আনতে যাবে। আমরা আগে কর্ণ বধ পর্বে যাব। সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে দ্বিতীয় অস্ত্রের অংশ পেতে হয়তো সুবিধে হবে।”

কৈটভ এই নির্দেশ আগেই দিয়ে রেখেছিল। বৃশ্চিক নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছে। ওরা দ্বাপরের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।

*****

পাহাড়ে যখন রামানুজ ফিরে এল তখন ভোর প্রায় হয়ে এসেছে। বিবস্বান রামানুজকে দেখামাত্র এগিয়ে এল, “আপনি তো আমাদের আবিষ্কৃত তরল ব্যবহার করেই ওখানে পৌঁছাতে পারতেন। আপনি তো ভীষণ রকমভাবে আহত হয়ে পড়েছেন দেখছি।”

রামানুজ বলল, “রণক্ষেত্রে কোন্ জায়গাটা লুকিয়ে থাকার জন্য সঠিক তা আমরা কেউ জানি না। তাই এগারো নম্বর চাকার ওপরেই ভরসা রেখেছিলাম। জীবন ইতিমধ্যে সহজ। আর না-হয় সহজতর না-ই বা করলাম।”

বিবস্বান হার মেনে বলল, “বেশ বেশ। এবার বলুন আমাদের কাঙ্খিত একাঘ্নি বাণের অংশ কোথায়?”

রামানুজ তার শাড়ির আঁচলের ভেতর থেকে বার করল শলাকার ভাঙা অংশ।

“সাবধানে। হাতে ধরলে হাত পুড়ে যায় এত গরম। আমি রীতিমতো ছ্যাঁকা খেয়েছি।”

বিবস্বান গলায় আজকাল একটা গামছা ব্যবহার করে। সেই গামছা দিয়ে জাপটে একাঘ্নি বাণের অংশটি ধরল। সকলে এগিয়ে এল দেখতে। রামানুজ পাথরের ধারে পেছনে চলে গেল। শাড়ি পরিবর্তন করে নিজের পোশাক পরল। তারপর সেই শাড়ি কাঞ্চনকে দিল। কাঞ্চন প্রস্তরখণ্ডের পেছনে গিয়ে দুর্গাকে সেই শাড়ি দেওয়ার পর সে পরিশীলিতভাবে নিজের শাড়ি পরে সকলের সামনে এল। বিবস্বান যত্ন করে রাখল অস্ত্রের ভাঙা অংশ। তারপর বলল, “অঞ্জলিকের অংশ আমি আনতে যাব। আপনি রেস্ট নেবেন।”

রামানুজ আর কথা বাড়ায় না। রাজি হয়ে গেল। এমনিতেও শরীর আর দিচ্ছে না।

কাঞ্চন বলল, “দু-দিন এখানে না-কাটিয়ে আমরা এই যুগের মধ্যেই সময়চক্রযান ব্যবহার করে দু-দিন পরে অর্থাৎ কর্ণ বধের দিনে চলে যেতে পারি। তাতে আমাদের সময় নষ্ট হবে না।”

দাসবাবু বললেন, “অতি উত্তম প্রস্তাব।”

বাকিরাও এই প্রস্তাবে সায় দিলেন। সেই মুহূর্তেই সময়চক্রযানকে আহ্বান করা হল। দাসবাবু নিজের পকেটে ফুল রেখেছিলেন। সেই ফুলের মাধ্যমেই সময়চক্রযানকে আহ্বান করা হল। তাতে চড়ে সপ্তদশ দিনের যুদ্ধের অন্তিম প্রহরে এসে পৌঁছালেন সবাই। স্থান নির্বাচনের সময়, একই স্থান বারবার নির্বাচন করার উপায় না-থাকায় এবার যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি এক অঞ্চলে এসে অবতীর্ণ হলেন সবাই। দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ধ্বসে গেছে। সারথি শল্য কর্ণের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছেন। পরশুরামের অভিশাপ অনুযায়ী কর্ণের দিব্যাস্ত্র আহ্বান মন্ত্র স্মরণে নেই। শেষ সময়ে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তবু হার মানতে রাজি নন তিনি।

কর্ণ বারবার অনুরোধ করছেন যেন সে শ্রী কৃষ্ণের প্ররোচনায় যুদ্ধ-গর্হিত কাজ করে অস্ত্রহীনের প্রাণ না নেয়। অর্জুন সে প্রস্তাবে রাজিও হন। শল্য কর্ণকে সাহায্য করবেন না জানিয়ে দিয়েছেন। তিনিও রাজা। তাঁর ওপর শুধু কর্ণের সারথি হবার আদেশ আরোপিত হয়েছে। রথের চাকা তোলা তাঁর কাজ নয়। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন শল্য। অগত্যা কর্ণ একাই চেষ্টা করছেন।

শ্রী কৃষ্ণ-কে বারবার কর্ণ প্রশ্ন করছেন, “হে মাধব, সারা জীবন আমি কিচ্ছু পাইনি। এই যুদ্ধক্ষেত্রে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার মতো সামর্থ্য আমার কাছে আছে। আপনি নিজে ঈশ্বর। ঈশ্বর হয়ে একজন কর্মঠ মানুষ-কে এরকম অচলাবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেবার ইচ্ছে আপনার কীভাবে হয়?”

শ্রী কৃষ্ণ কর্ণের প্রশ্ন শুনলেন। স্মিত হাস্যে বললেন, “সেদিন কী প্রয়োজন ছিল কর্ণ আপনার, যেদিন ভরা সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ হচ্ছিল আর আপনি তাঁকে বেশ্যার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কোন্ হৃতগৌরব অর্জন করতে আপনি সেই অন্যায় করেছিলেন? শুধু কি তাই? দুর্যোধনের একটার পর একটা অন্যায় কাজে আপনি তাঁর সঙ্গী হয়েছেন।”

কর্ণ শেষ চেষ্টা করেন, “একমাত্র দুর্যোধনই আমার পাশে ছিলেন। তিনি আমার বন্ধু। মিত্রধর্ম পালন কি অন্যায়?”

শ্রী কৃষ্ণ তাঁকে বোঝালেন, “বন্ধুধর্ম পালন অন্যায় নয়। তবে বন্ধু যদি অজ্ঞানী হয় আর আপনার কাছে জ্ঞান থাকে তাহলে বন্ধুকে অন্যায়ের রাস্তা পরিত্যাগ করার কথা জানানোই একমাত্র মিত্রধর্ম। আপনি সেটা করেননি। প্রকৃত সারাংশ এটাই যে এই মহা প্রলয়ংকরী ধ্বংস যুদ্ধের জন্য শকুনি বা দুর্যোধন দায়ী নন। দায়ী তিন মহারথী। পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণ এবং আপনি নিজে। আপনাদের কাছে জ্ঞান ছিল, আপনারা নিজে ধার্মিক ছিলেন। অথচ কোনো-না-কোনো তুচ্ছ কারণে অধর্মের সঙ্গ দিলেন। আপনি কি এখনও বুঝতে পারছেন না কর্ণ যে আপনি কত মস্ত যোদ্ধা হলে আপনি আমাকে, শ্রী হনুমান-কে এবং অর্জুনকে একসঙ্গে বাণের আঘাতে পিছিয়ে দিতে পারেন। এই যুদ্ধ শুরুর বহু আগে থেকেই আপনি একজন মহারথী। নইলে কি সৃষ্টির রচয়িতা হিসেবে এই মুহূর্তের কল্পনা যেদিন থেকে করেছি সেদিন থেকে আপনাকে হারাবার ছক আমাকে কষতে হয়? আপনি মহাযোদ্ধা কর্ণ, মহাযোদ্ধা। শুধু একটা ভুল কাজ আপনি করে ফেলেছেন। ধর্মকে জানা সত্ত্বেও, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, আপনি অধর্মকে চয়ন করেছেন।”

কর্ণ চুপ করে শুনলেন শ্রী কৃষ্ণের এক-একটা কথা। শ্রী কৃষ্ণ-কে তিনি নিজেও মান্য করেন। তিনি যে এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে কোনো ছল করছেন না তা তিনি জানেন। কর্ণের মনে শুধু শেষ একটা প্রশ্নই এল। এই প্রশ্নটাই আজ থেকে বহু বহু বছর ধরে তিনি সযত্নে পালন করেছিলেন নিজের মনের গহীনে। এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজেই তিনি অধর্মকে নিজের সঙ্গ দিয়েছিলেন। সেই এক ও একমেবাদ্বিতীয়ম্ প্রশ্নটি কর্ণ করলেন, “মাধব, আজ যখন এই সমরে আমার মৃত্যু হবে অর্জুনের হাতে, তখন এই বিশ্ব সংসার আমার থেকে অর্জুন-কে অধিক বলশালী ভাববে। আমার এত সামর্থ্যের কি কোনো মূল্যায়ন কোনোদিন হবে না মাধব?”

শ্রী কৃষ্ণ বললেন, “তোমাকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে হত্যার জন্য অর্জুন-কে কেউ কোনোদিন প্রশংসিত করবে না। ইতিহাস হোক বা পুরাণ সমস্ত জায়গায় লেখা থাকবে মহারথী কর্ণের গাথা। কর্ণ কত বড়ো মহারথী ছিলেন যে তাঁর হত্যালীলার রচনা করতে বিধাতাকে তাঁর দিব্যাস্ত্রের মন্ত্র বিস্মরণ ঘটাতে হয়েছিল, সারথি অবধি তাঁর সঙ্গ দেয়নি, মেদিনী গ্রাস করেছিল তার রথ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আপনার হাতে যতক্ষণ অস্ত্র ছিল আপনি ছিলেন অবধ্য। আজ আমাকে ছলের সাহায্যে অস্ত্রহীন কর্ণকে মারতে হচ্ছে। আপনার কবচ, কুণ্ডল সমস্ত কিছু ছলের মাধ্যমে আপনার থেকে কেড়ে নিয়েছি আমরা। আর কী প্রমাণ চাই যে আপনি মহারথী ছিলেন। অর্জুন অপবাদ পাবেন আপনার মৃত্যুতে। আপনি পাবেন বীরগাথা। এর চেয়ে অধিক যোগ্যতা আর কীসে আছে রাধেয়। গ্রহণ করুন। মৃত্যু গ্রহণ করুন। শুধু আপনি নন, আপনার মৃত্যুতে আমিও আঘাত পাব। কিন্তু উপায় নেই। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আপনার মৃত্যু প্রয়োজন।”

কৃষ্ণ থামলেন। কর্ণের নিজেরও চোখে জল। তবে তা আর মৃত্যুর অমোঘ চিন্তায় না। আনন্দাশ্রু।

“আপনি অর্জুনকে বাণ চালনা করতে বলুন। আমি এই জন্মে আমার যা করা উচিত আমি তাই করছি। রথের চাকা তোলার চেষ্টা করছি। যদি রথের চাকা আমি তুলে ফেলি তাহলে আমি আবার যুদ্ধ করব। তার আগে দয়া করে অর্জুনকে বলুন আমাকে বধ করতে।”

কথা শেষ করে মাধবকে প্রণাম করলেন কর্ণ। তারপর আবার রথের চাকা তোলার চেষ্টা করতে থাকলেন। শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “এই মাহেন্দ্রক্ষণ পরম সৃষ্টিকর্তা তোমার জন্য তৈরি করেছে। তোমাকে এই মুহূর্তে কর্ণবধ করতে হবে। সৃষ্টির বিরুদ্ধে তোমাকে সেদিনও যেতে দিইনি যখন তুমি অগ্নিস্নানে ব্রতী হয়েছিলে, আজকেও আমি যা বলছি তাই তোমাকে করতে হবে। কর্ণবধ সত্য প্রতিষ্ঠার একটা সিঁড়ি মাত্র। কর্ণবধ সম্পূর্ণ করো অর্জুন।”

অর্জুনের অগত্যা আর কিছু করার উপায় থাকল না। তিনি বিষণ্ণ মনে গাণ্ডিবে অঞ্জলিক অস্ত্রকে আহ্বান করলেন। কর্ণ নিজে সে দৃশ্য দেখলেন দূর থেকে। স্মিত হাসি লেগে রয়েছে তাঁর মুখমণ্ডলে। এক অদ্ভুত অপার্থিব আভা আস্তে আস্তে ঘিরে ধরছে তাঁকে। বুঝতে পারছেন তাঁর এই যাত্রার সমাপ্তি আসন্ন। তবু নিজের কাজ থেকে সরে এলেন না তিনি। রথের চাকাটাকে প্রাণপণে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। কর্মবিমুখ মৃত্যু তিনি চাইছেন না। অর্জুনের গাণ্ডিবে আবির্ভূত হয়েছে অঞ্জলিক অস্ত্র। অর্জুন অস্ত্রকে প্রণাম করে ছুঁড়ে দিলেন কর্ণের দিকে। অঞ্জলিক সোজা গিয়ে বিঁধল কর্ণের গলায়। মস্তক ছিন্ন হল কর্ণের।

রামানুজ কষ্টে চোখ বন্ধ করলেন। কর্ণ কৌরবদের পক্ষে থেকেও বহু মানুষের মনে তাঁর জন্য করুণানুভূতির সৃষ্টি করেছিলেন। সেখানে এই দৃশ্য চোখের সামনে ঘটা যে কী বেদনাদায়ক রামানুজ-সহ বাকিরাও বুঝতে পারছে। দুর্গার চোখে জল। কিন্তু কাজ তো থেমে থাকতে পারে না। বিবস্বানের প্রতি ইঙ্গিত করলেন রামানুজ।

“মাতা কুন্তি সমরক্ষেত্রে চলে আসবেন। কর্ণের ভূপতিত মস্তক এই কিছুটা সময়েই একা পড়ে থাকবে। তারপর লোকে লোকারণ্য হবে এই স্থান। বিষাদে পূর্ণ হবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাতাস। তুমি এগিয়ে যাও বিবস্বান। শ্রী কৃষ্ণ ইতিমধ্যে অর্জুনের রথ অন্য প্রান্তে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু অচিরেই ফিরবে সকলে। সময় বড়ো কম।”

বিবস্বান আর দেরি করল না। এগিয়ে গেল কর্ণের ভূ-পতিত মস্তকের দিকে। এদিকে এখন কেউ নেই। সূর্যাস্ত হয়েছে। অর্জুনকে নিয়ে শ্রী কৃষ্ণ ফিরে গেছেন মূল যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। কর্ণের মস্তক কোলে তুলে নিল বিবস্বান। সাধারণ মানুষের থেকে সেটা আকারে অনেক বড়ো। অঞ্জলিক ছোঁয়ার আগে নিজের হাতে একটা তরল ঢেলে নিল সে। ফলে হাতে উত্তাপ লাগবে না। তারপর শলাকার একভাগ ভেঙে নিজের হাতে নিয়ে নিল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটনাটা ঘটল। যুগচক্রযান প্রকট হল কুরুক্ষেত্রে। কৈটভদের যুগচক্রযান।

কৈটভ সোজা এসে হাজির হল বিবস্বানের সামনে। উপস্থিত কেউ জানে না এ ক্লোন-কৈটভ। বিবস্বান হতবাক। রামানুজ-সহ সকলেই ভয় পেয়ে গেল এই ঘটনার আকস্মিকতায়। কৈটভদের উপস্থিতি এরকম সময়ে কেউ আশা করেনি। রামানুজ ভেবেছিল অন্তত এই দুটো অস্ত্রের অংশ নিরুপদ্রবে পাওয়া যাবে। বিবস্বান অঞ্জলিক অস্ত্রের টুকরো আগলে নিয়ে ছিটকে কয়েক হাত দূরে সরে এল। কৈটভের পেছন পেছন হাজির হল বৃশ্চিক। গুরুদেবকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। তাঁর মুখেও লাগানো আছে একরকমের কড়া যা স্বয়ংক্রিয়। যে মুহূর্তে গুরুদেবের কথা বলা প্রয়োজন বলে অদৃশ্য-কৈটভ মনে করবে ঠিক তখনই এই মুখবন্ধনী খুলে যাবে। ক্লোন-কৈটভ কথা না-বাড়িয়ে বিবস্বানের দিকে হাত বাড়াল। রামানুজের দল ভয় পেল। ভয় পেল বিবস্বান। বৃশ্চিকের হাসি হাসি মুখ দেখেই মনে হচ্ছে এবার আর রামানুজের পক্ষে শেষ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বিবস্বান অঞ্জলিক আর একাঘ্নির অংশ দিতে দেরি করছে। ক্লোন-কৈটভ শান্তভাবে বলল, “তুমি নিজে থেকে দেবে, না তোমার থেকে আমি কেড়ে নেব।” বিবস্বান ঢোক গিলল। রামানুজ চিৎকার করল, “বিবস্বান পালাও। অথবা অদৃশ্য হয়ে পড়ো।”

কৈটভ বিবস্বানের একেবারে কাছে চলে এসেছে। বিবস্বান একবার করুণ চোখে তাকাল রামানুজের দিকে। রামানুজ এগোবার চেষ্টা করল। কাঞ্চন তাকে আটকাল। ওদের সামনে যাওয়া মানে যে সাক্ষাৎ মৃত্যু তা সবাই জানে।

রামানুজ বলল, “কাঞ্চন আমাকে যেতে দে। ওই দেখ গুরুদেবের কী অবস্থা করেছে শয়তানগুলো। আর তাছাড়া এত কষ্ট করে আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করেছি।”

কাঞ্চন বলল, “ওখানে যাওয়া মানেই মৃত্যু। ওখানে এই মুহূর্তে তোমাকে যেতে দিতে পারি না দাদা।”

রামানুজ হাল ছেড়ে দেয়। সে শুধু বিবস্বানের দিকে তাকিয়ে আছে। বিবস্বান এই পরিস্থিতিতে কী করবে তা রামানুজ দেখতে চায়। বিবস্বান কি পারবে? বিবস্বানও তাকিয়ে আছে রামানুজের দিকে। চোখে চোখেই কথা হচ্ছে যেন। বিবস্বান বলছে, “বন্ধু পারলাম না আমরা হেরে গেলাম।”

রামানুজ হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিবস্বানের এই দৃষ্টির অর্থ সে বুঝতে পারছে। ঠিক এমনি সময়ে বিবস্বানের চোখের দৃষ্টি পালটে গেল। চকচক করে উঠল তার দুই চোখ। সে একটা বরফশীতল হাসি হাসল রামানুজের দিকে তাকিয়ে। রামানুজ কিছু বুঝে উঠার আগেই বিবস্বান তার পকেট থেকে বার করল একাঘ্নির শলাকা। তারপর যা ঘটল তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বিবস্বান তার দুই হাত এগিয়ে দিল কৈটভের দিকে। কৈটভ তাকে হাসিমুখে বুকে টেনে নিল। দাসবাবুর মুখ থেকে ছিটকে বেরোল, “বিশ্বাসঘাতক! ছিঃ।”

তাতে বিবস্বানের কিছু আসে যায় না। বৃশ্চিক এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। “কতদিন পর ক্যাপ্টেন, কত দিন পর!”

রামানুজ শুধু তাকিয়ে আছে এই দৃশ্যের দিকে। দুর্গার অবাক হওয়া চোখ দুটো বেয়ে জল নেমেছে। কাঞ্চন জ্বলছে প্রতিশোধের আগুনে। বারবার, বারবার এই বিশ্বাসঘাতকতাকে মানতে পারছে না সে। ভাগ্য যে কতবার পরীক্ষা নেবে কে জানে!

বিবস্বান রামানুজের দিকে ফিরে বলল, “রামানুজ বড়ো বড়ো খেলায় এরকম ছোটো ছোটো রাজনীতির খেলা চলে। ডোন্ট মাইন্ড।”

রামানুজ উত্তর দেয় না। বিবস্বান এরপর বৃশ্চিককে বলে, “কোথায় ব্রহ্মাস্ত্রের অংশ? জুড়তে হবে তো। ওদের সঙ্গে পরে কথাবার্তা আলাপ পরিচয় করা যাবে। ওদের বিশ্বাস আপাতত কোমায় আছে। সারতে সময় লাগবে।”

বৃশ্চিক তার হাতে ব্রহ্মাস্ত্রের অংশ দিল। সূর্যাস্তের পরেও চারদিক এক অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্যে ভরে উঠল। ভাঙা অস্ত্রের অংশগুলো কাছাকাছি আসার পর যেন এই গোধূলি লগ্নকেও দিনের আলোতে পূর্ণ করছে। বিবস্বান তার হাতে তিন মহা শক্রিমান অস্ত্রের অংশ নিয়ে জোড়া লাগাতে গেল। কিন্তু বৃশ্চিক বাধ সাধল।

“এই তিনটি অস্ত্র জুড়লে যে প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন হবে তা তুমি সহ্য করতে পারবে না। আমার মতে কৈটভ এই কাজ করতে সমর্থ হবে।”

বিবস্বান বলল, “বেশ। তাহলে সে-ই করুক।”

বিবস্বান ক্লোন-কৈটভের দিকে এগিয়ে দিল অস্ত্রগুলোর ভাঙা অংশ। তিনটি অস্ত্রের অংশ নিজেদের সংস্পর্শে এলে একটি ফুলের আকৃতি ধারণ করবে।

প্রকৃত-কৈটভ অদৃশ্য হয়ে সমস্ত কিছুর ওপর নজর রেখেছে। ক্লোন-কৈটভ অস্ত্রের অংশগুলো হাতে নিল। তারপর মহা-উৎসাহে সেগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে এল। প্রথমে অঞ্জলিক আর ব্রহ্মাস্ত্র জুড়ে গেল। তাতেই অস্ত্রগুলো জ্বলজ্বল করে উঠল। ভূমিতে কম্পন অনুভূত হল। হাওয়ার গতিবেগ বেড়ে গেল। আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হল। এবার একাঘ্নি জুড়ে যাবার অপেক্ষা। কৈটভ-সহ সকলেই অপেক্ষা করছে সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তের জন্য। তিনটি অস্ত্র জুড়ে যাবে আর ওরা উপস্থিত হবে হলাহল বিষভাণ্ডের কাছে।

ক্লোন-কৈটভ একাঘ্নি বাণ বাকি দুই অস্ত্রের জোড়া অংশের কাছে রাখল। সকলেই অপেক্ষা করতে থাকল। কেউ জানে না এই তিন অস্ত্র জোড়া লাগলে’পরে চারদিকে ঠিক কী কী পরিবর্তন হবে। সবাই অপেক্ষা করতে লাগল। কেউ উৎসাহের সঙ্গে। কেউ-বা ভয়ের সঙ্গে। কেউ বিশ্বাসঘাতকতার বোঝা নিয়ে হতাশার সঙ্গে। কিন্তু অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পরেও একায়ি জুড়ল না। এমন সময় একটা হাসির শব্দ সবার কানে এল। সকলে ফিরে তাকাল। রামানুজ হাসছে। এই হাসির অর্থ কেউ অনুধাবন করতে পারল না। কাঞ্চন ভাবল রামানুজদা হয়তো শোকে পাগল হয়ে গেছে। সে দৌড়ে তার কাছে গেল।

“রামানুজদা, রামানুজদা। হাসছ কেন? আমরা তো হেরে গেলাম।”

রামানুজ হাসি থামিয়ে বলল, “আমরা হেরে গেলাম! তাই তো! আমরা হেরে গেছি বিবস্বান।”

শুধু বিবস্বান এই হাসির অর্থ বুঝতে পারল। তার মুখ থেকে ছিটকে বেরোল, “তুই মহাপাতক!”

রামানুজের হাসি এতে কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সে হাসতে হাসতেই বলল, “তুই কি ভেবেছিলি আমি তোর মনোবাঞ্ছা বুঝতে পারিনি? আমি বহু আগেই তোকে চিনে ফেলেছিলাম। কর্কটের সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছিলাম যে কর্কটের পর তুই-ই হলি এই মিথ সংঘের সর্বেসর্বা। তারপর বৃশ্চিক। কর্কটের নির্লিপ্ত অবস্থাকে ভালোই কাজে লাগাতে চেয়েছিলি। কিন্তু আমরা হলাম গোয়েন্দা জাত, পুলিশের জাত। আমাদের মতো পাতাললোকের বাসিন্দা আর দুটি নেই। সবেতেই সন্দেহ করি। কর্কট পরবর্তীকালে এত অ্যাক্টিভ হয়ে যাবেন তা তো তুই কল্পনাও করতে পারিসনি। কর্কট আমাকে সব বলে গেছিলেন।”

বিবস্বানের মুখ ক্রোধে রাঙা হয়ে গেছে, “তাহলে এতদিন আমাকে সঙ্গে রেখেছিলিস কেন? মেরে ফেলতে পারতিস।”

রামানুজের হাসি যেন আর থামে না, “উঁচু লেভেলের রাজনীতি গণ্ডমুর্খরা বুঝবে না। ছেড়ে দে। আর বাই দ্য ওয়ে, তোর হাতে যেটা আছে সেটা একটা সাধারণ শলাকা। কুরুক্ষেত্র থেকেই সংগ্রহ করে তোর হাতে দিয়েছিলাম। আসল একাঘ্নি আমার শাড়িতেই জড়ানো ছিল। এই দ্যাখ আসল একাঘ্নি।”

রামানুজ একাঘ্নি বার করতেই বাকি দুই অস্ত্রের জোড়া অংশটিতে কম্পন শুরু হল। সকলে সেই কম্পন দেখলেন। বোঝা গেল রামানুজের কাছেই আছে আসল একাঘ্নি

কৈটভ হাসল, “ব্যস! খুব তির মারা হয়ে গেছে। এবার দিয়ে দাও একাঘ্নি। আশাকরি আমি শান্তভাবে বললেই কাজ হবে।”

রামানুজ এবার কড়াভাবে বলল, “শান্তভাবে কেন আমার মুখোমুখি এসে ভিক্ষে চাইলেও দেব না।”

বিবস্বান বলল, “আমাদের কাছে দুটো রয়েছে। একটা অস্ত্র দিয়ে তুই কী করবি?”

রামানুজ সহজ সরল অফার দিল, “সকলে মিলেই হলাহলের কাছে যাই বরং। ছোটোবেলা থেকে হলাহল বিষভাণ্ড দেখার খুব ইচ্ছে আমার।”

বিবস্বান বুঝল কথায় চিঁড়ে ভিজবে না। কৈটভও এগিয়ে যেতে লাগল তাদের দিকে। ঠিক তখনই শব্দটা হল। সকলে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে দেখল দু-দিক থেকে দুই দল সেনা এদিকেই এগিয়ে আসছে। আর তাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কিছু একটা বলাবলি করছে নিজেদের মধ্যে। সকলেরই উত্তেজিত অঙ্গভঙ্গি। সম্ভবত কুরু ও পাণ্ডবদের সেনা কুরুক্ষেত্রে অযাচিত অনুপ্রবেশ দেখে তাদের বন্দি করতে আসছে। মহারথী অশ্বত্থামা কৌরবদের পক্ষ থেকে আর নকুল-সহদেব পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে এদিকেই ধেয়ে আসছেন মনে হচ্ছে।

রামানুজ চিৎকার করল, “আমার কথা মেনে নাও। চলো আমরা হলাহলের কাছে পৌঁছোই আগে। তারপর নিজেদের শত্রুতা সেখানে মিটিয়ে নেব। কিন্তু এই দ্বাপরে কুরু-পাণ্ডবসেনা আমাদের বন্দি করে ফেললে আর কিছুই করা যাবে না। ওদের সঙ্গে লড়াইয়ে আমি বা তুই কেন, কৈটভ অবধি পারবে না। দিব্যাস্ত্রের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই। এই যুগের মানুষের আকার-আয়তন আমাদের চেয়ে অনেক বড়ো। খুব সহজেই আমরা পরাজিত হব। আমার কথা মেনে নাও সবাই।”

ক্লোন-কৈটভ এতে রাজি হল না, “অসম্ভব। হলাহলের কাছে শুধু আমরা যাব।”

কিন্তু আসল-কৈটভ বৃশ্চিকের কানের কাছে এসে বলল, “এই প্রস্তাব মেনে নাও। ওখানে ওদের মেরে ফেলব। আপাতত এখানে থাকাটা উচিৎ হবে না। সৈন্য খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।”

আর দেরি না-করে বৃশ্চিক প্রকৃত-কৈটভের ইচ্ছে বিবস্বানকে কানে কানে জানাল। উপায়ান্তর না-দেখে বিবস্বানও রাজি হল।

“আয় রামানুজ। কৈটভপক্ষ আর রামানুজপক্ষ ইতিহাসে প্রথমবার একত্রে একটা কাজ করুক অন্তত।”

রামানুজ খুশি হল। তার দলের সবাইকে কাছে ডাকল। সবাই কুরুক্ষেত্রের আঙিনায় কাছাকাছি চলে এল। রামানুজ তার হাত বাড়িয়ে দিল। বিবস্বান তার কাছে এগিয়ে এল। বিবস্বান সকলের দিকে একবার তাকিয়ে দুই অস্ত্রের জোড়া অংশটি রামানুজের হাতে তুলে দিল। রামানুজ কালবিলম্ব না-করে অস্ত্রের অংশগুলোকে ভূমিতে রাখল। তারপর তাতে একাঘ্নির অংশ যোগ করল। প্রায় তৎক্ষণাৎ এক সুবিশাল আলোক বলয় সৃষ্ট হল। সেই আলোক বলয়ে কুরু-পাণ্ডবদের সেনার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তাঁরা চোখ ঢাকলেন। ভূমি নিজের সর্বশক্তিতে কম্পিত হল এবং এক প্রকাণ্ড ঘূর্ণিঝড় উঠল। কুরু-পাণ্ডবদের সেনা সেই ঝড়ে অবিন্যস্ত হয়ে গেল। শুধু রামানুজবাহিনী আর কৈটভ বাহিনীকে রক্ষা করল আলোক বলয়। ধীরে ধীরে সেই আলোক বর্তিকা বড়ো হতে থাকল। আর দেখতে দেখতেই রামানুজ, ক্লোন-কৈটভ, বৃশ্চিক, বিবস্বান, গুরুদেব, দুর্গা, দাসবাবু আর কাঞ্চনকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল এই আলোক বলয়। সঙ্গে অদৃশ্য অবস্থায় থাকা আসল-কৈটভ।

সমন্তপঞ্চকের চারদিকে ধুলো উড়তে থাকল। সৈন্যরা কাউকে খুঁজে পেলেন না। বাকি মহারথীরাও ধীরে ধীরে পৌঁছালেন সেই স্থানে। এক অদ্ভুত চরিত্রের কিছু মানুষকে দেখা গিয়েছে বলে শোনা গেল। কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারল না। শুধুমাত্র শ্রী কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন সময় আর যুগের নিয়ম ভেঙেছে কলিযুগের কিছু মানুষ। কর্ণ এখানেই দেহ রেখেছেন। কর্ণ-কে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এক বিশাল জনঅরণ্যের সৃষ্টি হল।