Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

আট – জুয়াড়ির পরামর্শ

বিকেলটা ডোনাল্ড উইলসন অপারেশন নিয়ে রিপোর্ট লিখতেই গেল। সিগারেট ধ্বংস করে আর এলিহু উইলসন অপারেশন নিয়ে ভেবে রাতের খাওয়া অবধি সময়টা কাটালাম। খেতে বসেই শুনলাম, আমাকে কেউ ফোনে চাইছে। লবিতে দাঁড়ানো বুথগুলোর একটায় ঢুকে ফোন ধরলাম। ডিনা ব্র্যান্ডের অলস কণ্ঠ ভেসে এল।

‘ম্যাক্স আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আজ আসতে পারবেন?’

‘আপনার বাড়িতে?’

‘হ্যাঁ।’

আমি সম্মতি জানালাম। ডিনার সারলাম। পাঁচতলায় নিজের ঘরে গিয়ে আলো জ্বালালাম।

একটা গুলি আমার নাক ছুঁয়ে দরজায় গর্ত করল।

আরও গুলি এল। দরজার পাল্লা, ফ্রেম, এমনকী দেওয়ালেও গর্ত হল বেশ কয়েকটা। তবে ততক্ষণে আমি আর আমার নাক জানলা থেকে দূরে ঘরের এক কোণে সরে গেছিলাম।

খেয়াল ছিল, রাস্তার ওপারে একটা চারতলা বাড়ি আছে। তার ছাদটা আমার জানালার লেভেল থেকে সামান্য ওপরে। ছাদটা অন্ধকার, অথচ আমার ঘরে আলো জ্বলছে। এই অবস্থায় উঁকি দিলে আর দেখতে হবে না। আমি হাতের কাছে একটা গিডিয়ন বাইবেল পেয়ে সেটাই আলোর দিকে ছুড়ে দিলাম। কাচ ভেঙে আলো নিভে গেল। ঘর অন্ধকার হল।

গুলিবৃষ্টি থেমে গেছিল। আমি হাঁটু মুড়ে জানলার এক কোণ দিয়ে ছাদটা দেখার চেষ্টা করলাম। মুশকিল হল, ছাদটা ঘেরা ছিল। ফলে তার পেছনে কে বা কারা রয়েছে সেটা দেখতে পেলাম না। দশ মিনিট ওই অবস্থায় থেকে গলায় গিঁট পড়ার জোগাড় হল। অবশেষে ফোনে হোটেলের রিসেপসনিস্টকে বললাম, হোটেলের নিজস্ব ডিটেকটিভকে পাঠাতে।

হোটেল ডিটেকটিভের নাম কিভার। মোটাসোটা মানুষ। সাদা গোঁফ, নীচু কপাল, মাথায় একটা বেশ কয়েক সাইজ ছোটো টুপি পরা। ব্যাপারটা শুনে আর দেখে সে এতই উত্তেজিত হল যে আমি হোটেল ম্যানেজারকেই ডাকতে বাধ্য হলাম। সে-ভদ্রলোক ভীষণ নিরাসক্তভাবে সব শুনলেন। তারপর আমরা একটা নতুন বাতি লাগিয়ে আলো জ্বালালাম। আলো-জ্বলা ঘরে মোট দশটা গুলির গর্ত দেখতে পেলাম।

তাদের মতো তদন্ত করে পুলিশ জানাল, কে বা কারা গুলি চালিয়েছিল সেটা তারা বুঝতে পারছে না। নুনান ফোন করল। ভারপ্রাপ্ত সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলার পর ফোনটা আমার কাছে এল।

‘আমি এইমাত্র গুলি চালানোর কথাটা শুনলাম।’ নুনান বলল, ‘কে এটা করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’

‘অনুমান করতে পারছি না।’ মিথ্যেই বললাম।

‘আপনার কিছু হয়নি তো?’

‘না।’

‘বেশ বেশ।’ সোৎসাহে বলল নুনান, ‘আর এটা যে-ই করে থাকুক, তাকে আমরা ধরবই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ভালো কথা, আপনার সঙ্গে জনাদুয়েক পুলিশ দিয়ে দেব নাকি? মানে সাবধানের মার নেই তো।’

‘ধন্যবাদ, তবে লাগবে না।’

‘আরে, মন খুলে বলুন। চাইলেই পাবেন।’ ওপাশ থেকে বেশ জোর দেওয়া হল।

‘মন থেকেই বলছি। লাগবে না, তবে ধন্যবাদ।’

আমার কাছ থেকে নুনান প্রতিশ্রুতি আদায় করল যে সুযোগ পেলেই আমি ওকে ফোন করব। পার্সনভিলের পুলিশ বিভাগ আমার সেবায় তৎপর, আমার কিছু হলে ওর সর্বনাশ হবে ইত্যাদি অনেক কিছু শুনে তবে নিষ্কৃতি পাওয়া গেল।

পুলিশ গেল। সহজে নাগাল পাওয়া যায় না এমন একটা ঘরে যেতে বাধ্য হলাম। তারপর পোশাক বদলে হারিকেন স্ট্রিটে হুইস্পারের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়লাম।

ডিনা ব্র্যান্ড দরজা খুলল। আজ ওর মুখে রুজ ঠিকঠাক অবস্থাতেই ছিল, তবে ওর বাদামি চুল একটু ছাঁটলে আরও ভালো দেখাত। কমলা-রঙা সিল্কের ড্রেসেও দেখলাম দাগ-টাগ লেগে আছে।

‘এখনও বেঁচে আছেন তাহলে।’ মেয়েটা বলল, ‘অবশ্য আমি আর এই নিয়ে কী বলব? আসুন। ভেতরে আসুন।’

আমরা ডিনা’র বসার ঘরে গেলাম। সেখানে ড্যান রল্্ফ আর ম্যাক্স থ্যালার তাস খেলছিল। রল্্ফ আমার দিকে নড করল। থ্যালার উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ঝাঁকিয়ে ফিসফিস করল, ‘শুনলাম আপনি পয়জনভিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন!’

‘আমাকে দোষ দেবেন না। আমার ক্লায়েন্ট চান জায়গাটা সাফসুতরো হোক।’

‘চান নয়। চাইতেন।’ থ্যালার আমাকে শুধরে দিল, ‘আপনি কাজটা ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?’

আমি একটা ভাষণ দিলাম।

‘পয়জনভিল আমার সঙ্গে মোটেই সভ্যভব্য আচরণ করেনি। এবার আমার পালা। আপনাদের পুরোনো বেরাদরি আবার ফিরে এসেছে, বুঝতেই পারছি। আপনারা চান, আমি সব ছেড়ে সানফ্রানসিস্কো ফিরে যাই। একটা সময় আমিও তাই চাইতাম। কিন্তু আপনারা, বিশেষত আপনাদের ওই মোটা পুলিশ চিফ, সেটা হতে দিল না। দু-দিনে নুনান আমাকে দু’বার মারার চেষ্টা করেছে। এটা আমার পক্ষে হজম করা অসম্ভব। তাই আমি মাঠে নামব। ফসল পেকে একেবারে টসটস করছে পয়জনভিলে। আমাকে কাটতে হবে শুধু। এই কাজটা আমি পারি, আমার ভালোও লাগে। তাই আমি এটা করব।’

‘যতক্ষণ আপনি টিকে আছেন, ততক্ষণ।’ জুয়াড়ি আমাকে শুধরে দিল।

‘তা বটে।’ আমি মেনে নিলাম, ‘তবে আজ সকালেই কাগজে পড়লাম, এক ভদ্রলোক বিছানায় শুয়ে চকোলেট এক্লেয়ার খেতে গিয়ে দম আটকে মারা গেছেন। মৃত্যু এভাবেও হতে পারে, তাই না?’

‘তা পারে। তবে…’ আরামকেদারায় নিজের বড়োসড়ো শরীরটা এলিয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে দেশলাই কাঠিটা এক কোণে ছুড়ে ডিনা ব্র্যান্ড বলে উঠল, ‘ওই খবরটা আজকের কাগজে ছিল না।’

রলফ তাসগুলো গুছিয়ে, উদ্দেশ্যহীনভাবে শাফল করছিল। বার বার। থ্যালার আমার দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, ‘উইলসন আপনাকে দশ হাজার ডলার দিতে চাইছে। আপনি এই শর্তেও ব্যাপারটা ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?’

‘আমার স্বভাব খুব খারাপ। আমাকে কেউ মারার চেষ্টা করলে আমার মাথাও খারাপ হয়ে যায়।’

‘এইরকম মনোভাব নিয়ে চললে একটা ছ-ফুট লম্বা কাঠের বাক্স ছাড়া আপনার কপালে কিছু জুটবে না, বলে দিলাম। আমি আপনার পক্ষে। আপনি নুনানের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে ফাঁসার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। সেজন্যই বলছি, এই কেস ছেড়ে দিন। ফিরে যান।’

‘আমিও আপনার পক্ষে।’ বলি আমি, ‘সেজন্যই আপনাকে বলছি, ওদের সঙ্গ ছাড়ুন। ওরা একবার আপনাকে পেছন থেকে ছুরি মারতে চেষ্টা করেছে। যখন টানাটানি হবে, তখন ওরা আবার আপনার পেছনে লাগবে। যখন সুযোগ আছে, ওদের ছেড়ে নিজের পথ দেখুন।’

‘নাহ্‌!’ থ্যালার বলল, ‘আমি দিব্যি আছি। তা ছাড়া আমি নিজের দেখভাল করতে পারি।’

‘হয়তো। তবে আপনিও জানেন, এত সুখ কারোই খুব বেশিদিন কপালে সয় না। আপনি এই দশচক্রের যথেষ্ট ফায়দা তুলে নিয়েছেন। এবার সরে যাওয়া উচিত আপনার।’

নিজের ছোট্ট মাথাটা দুলিয়ে থ্যালার বলল, ‘আমি জানি, আপনি সলিড লোক। তবে এই শিবিরে ফাটল ধরানোর ক্ষমতা আপনার নেই। এ একেবারে বজ্রআঁটুনি। যদি একবারও মনে হত, আপনি পারবেন এদের ভাঙতে, আমি আপনার সঙ্গে থাকতাম। নুনানের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক, আপনি বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু আপনি পারবেন না। এসব ছাড়ুন, ভালো কথা বলছি।’

‘মাফ করবেন। এলিহু উইলসনের দশ হাজার ডলারের শেষ পয়সাটা খরচ হওয়া অবধি আমি এসব ছাড়তে পারব না।’

‘কী? আমি তোমাকে বলিনি, লোকটার মাথা যুক্তিবুদ্ধি ঢোকার পক্ষে একটু বেশিই নিরেট!’ হাই তুলে বলল ডিনা ব্র্যান্ড, ‘ড্যান, গলা ভেজানোর মতো কিছু কি আছে বাড়িতে?’

ড্যান রল্্ফ উঠে পানীয়ের সন্ধানে গেল। থ্যালার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘যা ভালো বোঝেন করুন। ভালো কথা, কালকের বক্সিং ম্যাচ দেখতে যাচ্ছেন তো?’

আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম। রল্্ফ জিন আর আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে এল। পয়জনভিল বনাম আমি নয়, বরং কালকের বক্সিং ম্যাচ নিয়েই কথা হল। দু’পাত্তর চড়ানোর পর থ্যালার আমাকে ম্যাচ নিয়ে পরামর্শও দিল। ও বলল, বাজি ধরার সময় এটা খেয়াল রাখা উচিত যে ইকি বুশকে ষষ্ঠ রাউন্ডেই নক-আউট করে দেবে কিড কুপার। বাকি দু-জনের হাবভাব দেখে বুঝলাম, এটা সত্যিই সৎ পরামর্শ।

এগারোটার একটু পর বেরিয়ে হোটেলে ফিরলাম। সেই সময়টুকুতে আর কিছু ঘটেনি।