Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

এক – ধূসর আর লাল

হিকি ডিউয়ি-র মুখে আমি প্রথমবার ‘পয়জনভিল’ কথাটা শুনি। হিকি ‘পোত্তেক’ কথাই ‘পোশকার’ করে বলে। ভেবেছিলাম পার্সনভিল শহরের নামটা শুধু ওর মুখেই ওরকম হয়েছে। পরে, যাঁরা ‘র’ উচ্চারণ করতে পারেন তেমন কয়েকজনের মুখেও শুনে আমি ভেবেছিলাম, শহরটার এহেন নামকরণ নেহাত বদরসিকতা। কিন্তু বছরকয়েক পর আমি নিজেই পার্সনভিলে গিয়ে নতুন নামের সার্থকতা বুঝি।

ওখানে নেমে স্টেশনের ফোন থেকেই ‘হেরাল্ড’-এর দফতরে ডোনাল্ড উইলসনকে চাইলাম। তিনি অন্য প্রান্তে এলে আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘এসে গেছি।’

‘আপনি আজ রাতে, এই ধরুন দশটা নাগাদ, আমার বাড়িতে আসতে পারবেন?’ ভদ্রলোকের গলাটা বেশ লাগছিল ফোনে। মার্জিত, স্পষ্ট, নীচু। ‘২১০১ মাউন্টেন বুলেভার্ড। একটা ব্রডওয়ে কার ধরে লরেল অ্যাভিনিউ। সেখান থেকে পশ্চিমদিকে দুটো ব্লক। ব্যস।’

আমি রাজি হলাম। গ্রেট ওয়েস্টার্ন হোটেলে চেক-ইন করে, ব্যাগ রেখে, শহরটা দেখতে বেরোলাম।

শহরটা বাজে দেখতে। বেশিরভাগ বাড়ি একসময় হয়তো জেল্লাদার ছিল, কিন্তু দক্ষিণ দিকের গাদাগাদা কারখানার হলুদ ধোঁয়া আর লোহা-মেশানো ধুলো সেগুলোকে কুচ্ছিত করে ফেলেছে। এর সঙ্গে যোগ করা যাক খনির কাজের জন্য খুঁড়ে দফারফা করে দেওয়া দু-পাশের দুটো পাহাড়, আর মাথার ওপর একটা ময়লাটে আকাশ। সব মিলিয়ে মেজাজ খারাপ করে দেওয়ার পক্ষে আদর্শ জায়গা।

প্রথম যে পুলিশটিকে দেখলাম, তার একমুখ দাঁড়িগোফ। দ্বিতীয়জনের নোংরা ইউনিফর্মের বেশ ক’টা বোতাম নেই। তৃতীয়জন ব্রডওয়ে আর ইউনিয়ন স্ট্রিটের ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে ট্র্যাফিক সামলাতে গিয়েও ঠোঁটে চুরুট গুঁজে রেখেছিল। এরপর আমি আর আইনরক্ষকদের ‘অবস্থা’ বোঝার চেষ্টা করিনি।

সাড়ে ন-টায় ডোনাল্ড উইলসনের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। ওঁর দেওয়া নির্দেশমাফিক, ছিমছাম লনে ঘেরা একটা বাড়িতে যখন পৌঁছোলাম তখন রাত দশটা। একটি কাজের মেয়ে দরজা খুলল। আমার প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি জানাল, ডোনাল্ড উইলসন বাড়িতে নেই। আমি যখন মেয়েটিকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে, তখনই এক মহিলা ঢুকলেন। তন্বী, স্বর্ণকেশী, অনূর্ধ্ব-ত্রিশ। আমার দিকে তাকিয়ে হাসার সময়েও মহিলার নীল চোখ দুটো পাথুরেই রয়ে গেল। আমি আবার বললাম, কেন এসেছি।

‘আমার স্বামী এখন বাড়িতে নেই।’ মহিলার উচ্চারণে ‘স’-গুলো একটু পিছল হয়ে বেরোচ্ছিল, ‘তবে উনি আপনাকে যখন এই সময়েই আসতে বলেছেন, তাহলে শিগগিরি এসে পড়বেন।’

আমাকে দোতলায়, রাস্তার দিকে মুখ করা একটা ঘরে বসানো হল। উলটোদিকের একটা চেয়ারে বসে মহিলা শুরু করলেন আমার আসার কারণ জানতে চেয়ে তাঁর খোঁড়াখুঁড়ি।

‘আপনি কি পার্সনভিলেই থাকেন?’

‘আজ্ঞে না। সানফ্রানসিস্কো।’

‘এর আগেও নিশ্চয় এসেছেন এখানে?’

‘না। এই প্রথম।’

‘তাই নাকি? তা কেমন লাগছে আমাদের শহরটা?’

‘আমি এখনও সেভাবে দেখে উঠতে পারিনি।’ ভদ্রতার খাতিরে কথায় জল মেশাতে হল। ‘আসলে, আমি আজ বিকেলেই এসে পৌঁছেছি।’

‘আপনার ভালো লাগবে না শহরটা।’ মহিলার চোখ দুটো এক লহমার জন্য জ্বলে উঠল, ‘তবে খনি এলাকার সব শহরই বোধ হয় এরকম হয়। আপনিও কি খনির সঙ্গে যুক্ত?’

‘আজ্ঞে না।’

‘এটা ডোনাল্ড ঠিক করেনি, জানেন।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন মহিলা, ‘এমন একটা সময়ে আপনাকে ডেকে পাঠিয়ে এইভাবে বসিয়ে রাখা…’

‘এমনটা হতেই পারে।’

‘আপনার আসার কারণটা কি ব্যাবসা-সংক্রান্ত?’

আমি চুপ করে রইলাম। মহিলা কাশি আর হাসির মাঝামাঝি একটা আওয়াজ করে বললেন, ‘আমি কিন্তু সবাইকে এভাবে জেরা করি না। আসলে আপনি কিছুই বলছেন না বলেই আমার কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে। আচ্ছা, আপনি ডোনাল্ডকে বিশেষ কিছু সাপ্লাই-টাপ্লাই…?’

আমি মুচকি হেসে চুপ করে রইলাম। মহিলা যা খুশি ভাবতে পারেন।

নীচ থেকে ফোনের আওয়াজ ভেসে এল। মিসেস উইলসন সবুজ স্লিপার-পরা পা-জোড়া চুল্লির দিকে বাড়িয়ে ভান করলেন, যেন তিনি আওয়াজটা শুনতেই পাননি। তবে তিনি ‘আমাকে এবার…’ বলে আবার কথা শুরু করেই থামতে বাধ্য হলেন, কারণ কাজের মেয়েটি দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল।

মেয়েটি বলল, মিসেস উইলসনের জন্য ফোন এসেছে। নীচে না গিয়ে, বরং ঘরের বাইরে একটা এক্সটেনশন থেকেই মহিলা ফোনটা রিসিভ করায় অন্তত একপক্ষের কথা শুনতে আমার কোনো সমস্যা হল না।

‘হ্যালো… আমি মিসেস উইলসন বলছি… হ্যাঁ… মাফ করবেন, কিন্তু আপনার কথা শোনাই যাচ্ছে না। একটু জোরে বলবেন?… হ্যাঁ… হ্যাঁ? কী?… কে বলছেন?… হ্যালো! হ্যালো!’

খটাস্‌ করে ফোনটা নামিয়ে রাখার, আর তারপর দ্রুত হেঁটে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করলাম, যতক্ষণ না সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার আওয়াজটা পাই। সেটা পেতেই আমি জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। পর্দার একটা কোণ সরাতেই লরেল অ্যাভিনিউ, আর সেদিকে মুখ করে থাকা এবাড়ির ছোট্ট গ্যারেজটা দেখতে পেলাম। একটা গাঢ় রঙা কোট আর টুপি পরে মিসেস উইলসন হনহনিয়ে গ্যারেজে ঢুকলেন। তারপর একটা ছোটো ব্যুইক গাড়ি চালিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। আমি চেয়ারে বসে আবার শুরু করলাম শবরীর প্রতীক্ষা।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট পেরোল। ঠিক এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে বাইরে গাড়ির ব্রেকের ‘ক্যাঁচ’ আওয়াজটা শুনলাম। দু-মিনিট পর মিসেস উইলসন ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পরনে কোট বা টুপি ছিল না। মুখটা ছিল ফ্যাকাসে, আর চোখজোড়া নীলের বদলে কালোই ঠেকছিল।

‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত।’ হোঁচট খাওয়ার মতো করে কথাটা বললেন মহিলা, ‘আমি বেকার আপনাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করালাম। আমার স্বামী আজ রাতে বাড়ি ফিরবেন না।’

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘‘হেরাল্ড’-এর অফিসেই আমি ডোনাল্ড উইলসনের সঙ্গে দেখা করব।’ বেশিক্ষণ তাকাইনি, তবু বেরোনোর সময় মনে হল, মিসেস উইলসনের স্লিপারে বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলের কাছটা কালচে আর ভেজা দেখাচ্ছিল।

রক্ত লাগলে যেমন দেখায়।

ফেরার পথে আমার হোটেলের তিনটে ব্লক উত্তরেই ব্রডওয়ে কার থেকে নামতে হল। সিটি হলের ‘পুলিশ বিভাগ’ সাইনবোর্ড লাগানো দরজার বাইরে জনা চল্লিশ লোকের ভিড়টা কেন গজিয়েছে, সেটা জানার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। ভিড়ের চেহারা দেখে বুঝলাম, উপস্থিত জনতার বেশিরভাগই খনি বা কারখানার শ্রমিক। তারা ছাড়া ওই ভিড়ে ছিল ঘোলাটে চোখের ক-জন ভদ্রলোক, তেমনই চোখের ক-টি ভদ্রমহিলা, আর নিশিপদ্মের কারবারি কয়েকটি মেয়ে।

ওই ভিড়ের বাইরের দিকে একটি মানুষের গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। লোকটির বয়স ত্রিশের বেশি হবে না। চওড়া চেহারার ওপর বসানো মুখটা থলথলে নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত। কিন্তু লোকটার ঠোঁট, মুখের ভাব, গায়ের দোমড়ানো পোশাক, সবই ছাইরঙা। মনে হচ্ছিল, লোকটার জীবনে একমাত্র রঙিন জিনিস বোধ হয় ওর লাল টাই-টা।

‘এত ভিড় কীসের?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

লোকটা ছাই ছাই, অথচ ধারালো চোখে আমার আপাদমস্তক দেখল। তারপর অনেক ভেবে বলল, ‘ডন উইলসন পরলোকের পথে যাত্রা করেছেন। তবে তাঁর গায়ে গুলির গর্তগুলো দেখতে তাঁর সহযাত্রীদের কেমন লাগবে, বলা কঠিন।’

‘গুলি কে করল?’

ঘাড় চুলকে লোকটা বলল, ‘এমন কেউ, যার কাছে বন্দুক ছিল।’

মাথা গরম হল। অন্য কেউ হলে পালটা খোঁচানো যেত, কিন্তু লাল টাই-টা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছিল। আমি লোকটাকে বললাম, ‘রক্ষে করুন। এইরকম উত্তর না দিয়ে একটু স্পষ্ট করে, ঠিক কী হয়েছিল সেটা বলতে কি খুব অসুবিধে হচ্ছে?’

‘কিছুক্ষণ আগেই ‘‘মর্নিং’’ ও ‘‘ইভনিং হেরাল্ড’’ পত্রিকার প্রকাশক শ্রীডোনাল্ড উইলসনকে হারিকেন স্ট্রিটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। শ্রীউইলসন মৃত। হত্যাকারী অজ্ঞাত।’ সুর করে কথাগুলো বলে লোকটা জানতে চাইল, ‘এবার ঠিক আছে?’

‘ইয়্যাকদম!’ আমি টাই-টার দিকে আঙুল তুলে বললাম, ‘এটা কি ফ্যাশন, না বিশেষ কোনো কারণে পরা?’

‘আমি বিল কুইন্ট।’

‘তাই নাকি?’ আমার খেয়াল হল, গোটা দেশেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অ্যাসোশিয়েশনের অন্যতম মাথা এই লোকটা। ‘আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল।’

খুঁজেপেতে একটা লাল কার্ড বের করলাম। কার্ডটা হেনরি এফ নিল নামক এক সক্ষম নাবিক তথা শ্রমিক সংগঠনের মূল্যবান সদস্য-র। কুইন্ট সেটা খুঁটিয়ে পড়ল, আমাকে খুঁটিয়ে দেখল, তারপর গলায় কিলো কিলো সন্দেহ মিশিয়ে বলল, ‘আপনি তো নাবিক? তা এখানে কেন?’

‘আমি নাবিক? এটা আপনার মনে হল কেন?’

‘এই কার্ডে তো তাই লেখা আছে।’

‘আমি আপনাকে এখনই একটা কার্ড দিতে পারি যেটা বলবে যে আমি কাঠের কারবারি। যদি চান তাহলে কালকেই আমি একটা কার্ড দিয়ে প্রমাণ করব, আমি লোহা গলাই।’

‘ওই কার্ড শুধু আমি ইসু করি।’ আপত্তি জানাল কুইন্ট। ‘আপনার মতলবটা কী?’

‘এখানে কোথাও একটু বসা যায় না?’

একটা রেস্তরাঁর ওপরে বারে, মোটামুটি নিভৃত একটা কোণ দখল করা গেল। পরবর্তী দু-ঘণ্টা হুইস্কি আর কথায় কাটল। কুইন্টের মতে ওইভাবে ‘দু-নম্বরি’ কার্ড দিয়ে নিজেকে কোথাও ফিট করানোর চেষ্টা অন্যায়, এবং ও এটা অন্যদের বলবেই। তাতে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আমার কৌতূহল ছিল পার্সনভিলের হাল-হকিকত নিয়ে। কুইন্টের কাছ থেকে যা জানলাম তা মোটামুটি এরকম।

চল্লিশ বছর ধরে পার্সনভিলের একচ্ছত্র অধিপতি হলেন এলিহু উইলসন। সদ্যপ্রয়াত ডোনাল্ড উইলসনের বাবা এই মানুষটি পার্সনভিল মাইনিং কর্পোরেশন, ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, মর্নিং ও ইভনিং হেরাল্ড এবং এই শহরের প্রায় সবকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসার হয় মালিক, নয় নিয়ন্ত্রক। রাজনৈতিক মহলেও বিপুল প্রভাব থাকায় শহর নয়, রাজ্যটাই চলে এলিহু উইলসনের অঙ্গুলিহেলনে।

যুদ্ধের সময় শ্রমিক সংগঠনের রবরবা ছিল প্রচুর। তাদের থেকে কাজ আদায় করানোর জন্য এলিহু যেসব চুক্তি-টুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষের পর টানাটানি শুরু হতেই তিনি সেগুলো বাতিল করেন। শ্রমিকরা যাতে পড়ে পড়ে মার না খেয়ে প্রতিবাদ করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য কুইন্টকে পাঠানো হয় এই শহরে। কুইন্ট চেয়েছিল, শ্রমিকরা কাজ কমিয়ে দিয়ে সাবোতাজ করুক। কিন্তু স্থানীয় নেতারা চেয়েছিলেন ইতিহাস গড়তে। তঁারা স্ট্রাইক করেন। আট মাস ধরে চলা ওই স্ট্রাইক ভেঙে নিজের মতো ব্যবস্থা কায়েম করতে সফল হন এলিহু। তবে তার জন্য এলিহুকে চড়া দাম দিতে হয়।

‘কীরকম?’ জানতে চেয়েছিলাম আমি।

‘ইতিহাসের শিক্ষাটা মাথায় রাখেননি এলিহু উইলসন।’ কুইন্ট গ্লাসের তরল গলায় ঢেলে মুখ কুঁচকে বুঝিয়েছিল, ‘যেসব গুন্ডা আর মস্তানকে দিয়ে যথেচ্ছাচার চালিয়ে এই স্ট্রাইক ভাঙা হয়েছিল, তারা ততদিনে রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বা নেওয়াতে গেলে তারা এলিহু সম্বন্ধে এমন অনেক কিছু জিনিস সামনে আনতে পারে যা এলিহু-র পক্ষে মারাত্মক হবে। তাই তাদের দাবি মেনে বেশ কয়েকটা ব্যাবসায় নিজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বাধ্য হন এলিহু।

শহরে সোমরসের জোগান দেওয়ার ব্যাবসা এখন পিট দ্য ফিন-এর হাতে। পার্কার স্ট্রিটের একটা লোন শপের মাধ্যমে গোটা শহর জুড়ে তেজারতি কারবার, আর বেইল বন্ডের ব্যাবসার আড়ালে চোরাই মালের বাঁটোয়ারা করে লিউ ইয়ার্ড। পুলিশ চিফ নুনানের সঙ্গে লিউয়ের বন্ধুত্বর কথা সবাই জানে। আর আছে ম্যাক্স থ্যালার। জুয়াড়ি, গলায় কিছু একটা সমস্যার জন্য ফিসফিসিয়ে কথা বলে বলে লোকে ওকে হুইস্পার বলেই পরিচয় দেয়। ওরও ‘‘বন্ধুবান্ধব’’-এর অভাব নেই। এই তিনজন আর নুনান এলিহু-কে শহরটা চালাতে ‘‘সাহায্য’’ করে। এদিকে ওই ‘‘সাহায্য’’ না নিয়েও এলিহুর উপায় নেই।’

আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু একটা জিনিস খচখচ করছিল। কুইন্ট-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজ যে মারা গেল, মানে ডোনাল্ড উইলসন, সে এই খেলায় কোন ভূমিকায় ছিল?’

‘বোড়ে।’

‘মানে? কার বোড়ে?’

‘ডন উইলসন মাত্র কিছুদিন হল দেশে ফিরেছিল।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল কুইন্ট। ‘ওকে, আর ওর ফরাসি বউকে প্যারি থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল এলিহু। তারপর ডনকে ও কাগজের দায়িত্ব দিয়েছিল। আদর্শবাদী, সৎ ছেলেটাকে এটা বোঝাতে নিশ্চয় খুব একটা কষ্ট হয়নি যে শহরে দুর্নীতি আর নোংরামির রাজত্ব চলছে। ব্যস! বাবা-র পাতা ফাঁদে সুন্দরভাবে পা দিয়ে সে ছেলে ‘‘স্বচ্ছ শহর অভিযান’’ শুরু করে দেয়। এলিহু চেয়েছিল, এভাবেই শহরের অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটা জনমত তৈরি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাহলে সাপও মরত, লাঠিও ভাঙত না। কিন্তু পিট, লিউ, হুইস্পার, নুনান… এরা এসব কদ্দিন হজম করবে?’

‘বুঝলাম। তবে,’ জঘন্য হুইস্কির গুঁতোয় ভারী হয়ে আসা মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘ব্যাপারটা এত সহজ নয়। এর মধ্যে আরও কিছু আছে। কিছু একটা গোলমাল…!’

‘এই শহরের ব্যাপার, আর তাতে গোলমাল থাকবে না?’ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কুইন্ট।

কুইন্ট যেখানে থাকে সেই মাইনার্স হোটেল ফরেস্ট স্ট্রিটে, গ্রেট ওয়েস্টার্ন-এর দু-ব্লক পরে। আমরা একসঙ্গেই ফিরছিলাম। আমার হোটেলের সামনে একটা ওজনদার চেহারার লোককে দেখেই বুঝলাম, এ পুলিশের সাদা পোশাকের লোক না হয়ে যায় না। রাস্তার ধারে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে স্টাটজ্‌ ট্যুরিং কারে বসা একজনের সঙ্গে কথা বলছিল লোকটা।

‘গাড়িতে হুইস্পার বসে আছে।’ চাপা স্বরে বলল কুইন্ট।

আমি থ্যালারকে পাশ থেকেই যথাসম্ভব ভালোভাবে দেখে নিলাম। কমবয়সি, ছোটোখাটো, চাপা রঙের ধারালো চেহারার লোকটাকে দেখে আমার মুখ থেকে বেরিয়েই গেল, ‘ছোকরাকে বেশ কিউট দেখতে কিন্তু!’

‘হুঁ।’ নির্বিকার গলায় বলল কুইন্ট। ‘ডায়নামাইটও ওর’ম দেখতে হয়।’