Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

এগারো – মালমশলা

‘নাড়াচাড়া করে কী ওঠে তাই দেখাই যদি আপনার ধাত হয়,’ নিজের ফাঁকা গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে, ঠোঁট ভিজিয়ে আমাকে বলল ডিনা, ‘তাহলে আমি আপনাকে একটা ভালো হাতার সন্ধান দিতে পারি।’

‘দিন।’

‘নুনানের ভাই টিম বেশ কিছুদিন আগে মক লেকের ধারে আত্মহত্যা করেছিল। শুনেছেন?’

‘না।’

‘আপনি যে কী খবর রাখেন…! যাকগে। ও আত্মহত্যা করেনি। ওকে ম্যাক্স খুন করেছিল।’

‘তাই নাকি?’

‘আরে, আপনার হলটা কী? আমি জেনুইন খবর দিচ্ছি, আর আপনি ঝিমোচ্ছেন! টিমের বড়োভাই নয়, একেবারে বাবা-র মতো ছিল নুনান। আপনি ওর কাছে প্রমাণ নিয়ে যান। তারপর ও থ্যালারের পেছনে এইসা লাগবে যে আর কাউকে কিছু করতে হবে না।’

‘প্রমাণ আছে?’

‘টিম মারা যাওয়ার আগে দু-জন লোক ওর কাছে পৌঁছেছিল। টিম তাদের বলেছিল, এর জন্য দায়ী ম্যাক্স। দু’জনই শহরে আছে, তবে একজনের মেয়াদ আর খুব বেশিদিন নয়। হবে এতে?’

মেয়েটাকে দেখে মনে হল, ও সত্যি কথাই বলছে। তবে মেয়েদের ব্যাপার…

‘একটু গুছিয়ে বলুন তো।’ আমি বললাম, ‘বেশ বিস্তারিতভাবে, যাকে বলে।’

‘আপনি কখনো মক লেক গেছেন? ওটা আমাদের গরমের ছুটি কাটানোর জায়গা। ক্যানিয়ন রোড ধরে ত্রিশ কিলোমিটার গেলে জায়গাটা পাবেন। বাজে জায়গা, তবে গরমকালে বেশ ঠান্ডা থাকে। তাই ভালোই ভিড় হয় ওখানে। গত বছরের ঘটনা, অগাস্টের শেষ উইকেন্ড। হলি নামে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আমি তখন ওখানেই ছিলাম। হলি এই ঘটনার কিছুই জানে না, তা ছাড়া এখন ও ইংল্যান্ডে ফিরে গেছে। তাই ওকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।

ম্যাক্স ওখানে গেছিল ওর এক বান্ধবীকে নিয়ে। মির্টল জেনিসন। এখন বেচারি কিডনি ফেলিয়োর হয়ে হাসপাতালে ভরতি, মরতেই বসেছে বলা যায়। মেয়েটা ভালো দেখতে ছিল। কয়েক পাত্তর চড়ালে ওর গলাও চড়ে যেত। ওটুকু বাদ দিলে মেয়েটাকে আমার বেশ ভালো লাগত। টিম তো ওর ওপর একেবারে ফিদা হয়ে গেছিল। তবে মেয়েটা একনিষ্ঠ ছিল। থ্যালার ছাড়া ওর আর অন্য কোনোদিকে নজর ছিল না।

সমস্যা হল, টিম ওর পিছু ছাড়ছিল না। ও ভেবেছিল সুপুরুষ বলে মেয়েরা ধপাধপ ওর পায়ে পড়বে। আসলে যে ওর ভাই পুলিশ চিফ বলেই ওকে লোকজন পাত্তা দেয়, সেটা ওর মাথায় ছিল না। মির্টল যেখানে যেত, কিছুক্ষণের মধ্যেই ও সেখানে উদয় হত। ম্যাক্স জানত না। মির্টল ওকে কিছু বলেনি। পুলিশ চিফের ভাইয়ের সঙ্গে ম্যাক্স ঝামেলা করুক, এটা মেয়েটা চায়নি।

সেই শনিবার টিম যথারীতি মক লেকে হাজির হল। আমি আর হলি একটা বড়ো গ্রুপের সঙ্গে আড্ডা মারছিলাম। মির্টল এসে আমাকে একটা চিরকুট দেখাল। টিম ওকে সেই সন্ধ্যায় লেকের ধারে একটা ছোটো লজে আসতে বলেছিল। এও বলেছিল যে মির্টল না এলে টিম আত্মহত্যা করবে। আমরা দু-জনেই এই নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করলাম। আমি মির্টলকে যেতে বারণ করলাম। কিন্তু ততক্ষণে জিন ওর মাথায় চড়ে গেছে। ‘‘ছোকরাকে দু’কথা শুনিয়ে আসি।’’ এটাই বলেছিল মির্টল।

সেই রাতে হোটেলে নাচগান ভালোই জমেছিল। ম্যাক্স কিছুক্ষণের জন্য ছিল, তারপর আমি আর ওকে দেখিনি। রাটগার্স নামের এক উকিলের সঙ্গে নাচছিল মির্টল। একটু পরে ও পাশের একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বেরোবার আগে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপেছিল বলে বুঝেছিলাম, ও টিমকে দু-কথা শোনাতে যাচ্ছে। ও সবে বেরিয়েছে, তখনই গুলির শব্দটা হয়। আমি ছাড়া আর কেউ খেয়াল করেনি। আমিও খেয়াল করতাম না। নেহাত মির্টল আর টিমের মধ্যে কী হয় সেই ভেবে চিন্তা হচ্ছিল বলে…

একটু পর হলিকে বললাম, ‘‘মির্টলকে একটা কথা বলে আসি।’’ একাই বেরোলাম হোটেল থেকে। ওর থেকে খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট পেছনে ছিলাম আমি। একটু দূরে একটা লজের সামনে আলো আর লোকের ভিড় দেখে সেদিকে এগোলাম। তারপর… গলা শুকিয়ে গেছে!’

আমি জিন ঢাললাম। ডিনা বরফ আর অন্যান্য জিনিসের জোগাড়যন্ত্র করল। গ্লাস হাতে নিয়ে ও আবার বলতে শুরু করল।

‘টিম, নুনান মাটিতে পড়ে ছিল। কপালে হওয়া ক্ষত, আর পাশে পড়ে থাকা বন্দুকটাও দেখেছিলাম। মোটামুটি ডজনখানেক লোক ছিল তখন ওখানে। হোটেলের লোক, আরও কিছু অতিথি। নুনানের একজন ডিটেকটিভও ওখানে ছিল… কী যেন নাম… ম্যাকসোয়েন! যাইহোক, মির্টল আমাকে একটা নিরিবিলি কোণে টেনে নিয়ে গেল। তারপর নীচু গলায় বলল, ‘ম্যাক্স ওকে মেরেছে! আমি এখন কী করব?’

আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছিল?’ মির্টল বলল, ও বেশ কিছুটা দূর থেকেই বন্দুকের ঝলকটা দেখেছিল। প্রথমে ওর মনে হয়েছিল, টিম বোধ হয় সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা করল। ও ছুটে গিয়ে দেখল, টিম তখনও বেঁচে আছে, তবে মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মির্টল ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে শুনেছিল টিম বলছে, ‘‘আমাকে মারল কেন? আমাকে বললেই তো আমি মেয়েটাকে…!’’

মির্টলের ভয় হয়। ও ভাবে, ম্যাক্সই টিমকে মেরেছে। তাও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ও জিজ্ঞেস করে, ‘‘কে গুলি করেছে তোমায়?’’ টিমের তখন শেষ অবস্থা। ‘‘ম্যাক্স!’’ এটুকু কোনোক্রমে বলেই ও চোখ বোজে।

আমার মাথা খাচ্ছিল মেয়েটা ‘‘আমি কী করব?’’ বলে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, আর কেউ টিমের কথা শুনেছে কি না। ও বলল ওই ডিটেকটিভ শুনেছে নাকি। মির্টল যখন টিমের মাথাটা মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করছিল, তখনই ম্যাকসোয়েন সেখানে ছুটে এসেছিল। টিমের মতো একটা বজ্জাতকে মারার জন্য ম্যাক্সের কিছু হোক, এটা আমি চাইছিলাম না। না, তখনও ওর সঙ্গে আমার … সেরকম কিছু হয়নি। তবে ওকে আমার ভালো লাগত। আর নুনান ভাইয়েদের আমি দু-চোখে দেখতে পারতাম না!

আমি ম্যাকসোয়েনকে চিনতাম। ওর বউ আমার বন্ধু ছিল। লোকটা জেনুইন ছিল, কিন্তু চাকরিতে ঢোকার পরেই বাকিদের মতো হয়ে গেল। ওর বউ যদ্দিন পেরেছিল, ওসব বরদাস্ত করেছিল। তারপর ওকে ছেড়ে দিয়েছিল। মির্টলকে আমি বললাম, ম্যাকসোয়েন কিছু টাকা পেলেই অনেক কিছু ভুলে যায়। টিমের লেখা সেই নোট তখনও মির্টলের কাছেই ছিল। ম্যাক্স চেষ্টা করলেই এই ব্যাপারটা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে।

বিস্তর খুঁজেও ম্যাক্স কোথায় আছে, সেটা আমি বের করতে পারলাম না। বিফল হয়ে ফিরে দেখি মির্টল নার্ভাস হয়ে একেবারে কাঁপছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘আবার কী হল?’’ মির্টল বলল, ও চায় না ম্যাক্স জানুক যে ও খুনির পরিচয় পেয়ে গেছে। মির্টল ভয় পাচ্ছিল। ম্যাক্স আর ওর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেলে যদি ম্যাক্স আর ওর নীরবতার ওপর ভরসা না করে? যদি ওকে পাকাপাকিভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়? আমি ব্যাপারটা বুঝলাম। আমারও সেইরকম একটা আশঙ্কা ছিল।

মির্টল চুপচাপ ম্যাকসোয়েনের সঙ্গে বোঝাপড়া করল। দু-শো ডলার, আর ওর এক পুরোনো আশিকের দেওয়া একটা হিরের আংটি, এতেই বিক্রি হয়ে গেল ম্যাকসোয়েন। টিমের লেখাটা কাজে লাগিয়ে ও ঘটনাটা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। নুনান এত সহজে ব্যাপারটা মেনে নেয়নি। ও ম্যাক্সকে সন্দেহ করেছিল, কিন্তু ম্যাক্সের মোক্ষম অ্যালিবাই ছিল। শেষ অবধি নুনান ওকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তবে ম্যাকসোয়েনকে ও ছাড়েনি। এটা-সেটায় ফাঁসিয়ে ও ম্যাকসোয়েনের চাকরি খায়।

এর পরেই ম্যাক্স আর মির্টলের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ঝগড়া নয়, ভুল বোঝাবুঝি নয়, স্রেফ ছাড়াছাড়ি। আমার মনে হয়, ম্যাক্সের কাছে ও আর নিজেকে নিরাপদ মনে করছিল না। তবে ম্যাক্স কিছু আন্দাজ করেছে বলে আমার অন্তত মনে হয়নি।

আপনাকে তো আগেই বললাম, মেয়েটার মেয়াদ আর খুব বেশি নয়। ও সাংঘাতিক অসুস্থ। তাই এখন সত্যিটা বলতে ওর আর ভয় হবে না। ম্যাকসোয়েনও এই শহরেই আছে কোথাও। প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা থাকলেই ওর স্মৃতিশক্তি আবার সতেজ হয়ে উঠতে পারে। ওরা যদি মুখ খোলে, তাহলে নুনান কতটা খুশি হবে বুঝতেই পারছেন!’

‘এমন কি হতে পারে, যে এটা আসলে আত্মহত্যাই ছিল?’ আমি একটু কিন্তু কিন্তু করলাম, ‘হয়তো একেবারে শেষ মুহূর্তে ওর মনে হয়, এই সুযোগে ম্যাক্সকে যদি ফাঁসানো যায়!’

‘টিম আত্মহত্যা করার লোক ছিল না।’

‘যদি মির্টল ওকে গুলি করে থাকে?’

‘নুনান এই দিকটাও খতিয়ে দেখেছিল। টিমের কপালে বারুদের দাগ থেকে বোঝা গেছিল, খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল। কিন্তু গুলি চলার সময় মির্টল ওখান থেকে অনেকটা দূরে ছিল, লোকে দেখেছে।’

‘ম্যাক্সের অ্যালিবাই ছিল?’

‘একেবারে পাকাপোক্ত। ও নাকি তখন হোটেলের আরেকপ্রান্তে চারজন লোকের সঙ্গে বসে শান্তিতে ড্রিঙ্ক করছিল। ওই ঘরে আর যারা ছিল তাদের কিছু মনে নেই। কিন্তু ওই চারজন, কেউ ওদের জিজ্ঞেস করার আগে থেকেই বলেছিল, ম্যাক্স নাকি ওদের সঙ্গেই ছিল সারাক্ষণ।’

ডিনার চোখগুলো সরু হয়ে গেল। আমার দিকে ঝুঁকে ও বলল, ‘চারজনের মধ্যে একজন হল পিক মারি। ব্রডওয়েতে ও একটা পুল রুম চালায়। ওর সঙ্গে ম্যাক্সের এখন আর বনিবনা নেই। দেখুন না, ওর সঙ্গে কথা বললে এখন যদি ওর স্মৃতিটা একটু ‘‘অন্যরকম’’ হয়ে বেরোয়।’

‘এই ম্যাকসোয়েন… ওর নাম কি বব?’ আমি জানতে চাইলাম, ‘পা একটু বেঁকা? লম্বা ছুঁচোলো চোয়াল?’

‘হ্যাঁ। আপনি ওকে চেনেন নাকি?’

‘যৎসামান্য। এখন কী করে লোকটা?’

‘বিশেষ কিছুই না। ছুটকোছাটকা কাজ করে। তা আমার এই খবরাখবর কেমন লাগল? এই দিয়ে কাজের কাজ কিছু হবে?’

‘হতে পারে। দেখি চেষ্টা করে।’

‘তাহলে আমি কত পাচ্ছি?’

মেয়েটার লোভী চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও হাসলাম। বললাম, ‘এত তাড়া কীসের? আগে দেখি, এই টোপ দিয়ে রুই-কাতলা কিছু তোলা যায় কি না। তারপর না হয় খরচাপাতির কথা ভাবা যাবে।’

আমাকে হাড়কিপটে, ওয়ান-পাইস-ফাদার-মাদার ইত্যাদি নানারকম সম্বোধনে ভূষিত করে মেয়েটা আবার জিন ঢালতে উদ্যোগী হল। আমার তেষ্টা মিটে গেছিল। ঘড়ির কাঁটা পাঁচ ছুঁইছুঁই দেখে উঠতেও চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমাদের দু-জনেরই খিদে পেয়ে গেছিল। খাবার জোগাড় করে, কফি খেয়ে, আরও বেশ কিছু সিগারেট উড়িয়ে ওখান থেকে বেরোতে বেরোতে ছ-টা বেজে গেল।

হোটেলে নিজের ঘরে ফিরে বাথটাব ঠান্ডা জলে ভরলাম। তারপর তাতে বসে পড়লাম। প্রায় শক লাগল, তবে সেটা আমার দরকার ছিল। এই বয়সে ঘুমের অভাব জিন দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। কিন্তু মাথাটা তাতে ঠিকমতো চলে না। বেশ কিছুক্ষণ পর উঠলাম। সাজগোজ করলাম। টেবিলে বসে একটা স্বীকারোক্তি গোছের দস্তাবেজ বানালাম। তাতে লেখা ছিল:

‘মারা যাওয়ার ঠিক আগে টিম নুনান আমাকে বলেছিল, ম্যাক্স থ্যালার তাকে গুলি করেছে। ডিটেকটিভ বব ম্যাকসোয়েনও সেটা শুনেছিলেন। আমি ডিটেকটিভ ম্যাকসোয়েনকে ২০০ ডলার নগদ আর একটা হিরের আংটি দিয়েছিলাম, যার দাম হাজার ডলারের কাছাকাছি। শর্ত ছিল, উনি ঘটনাটা আত্মহত্যা বলে চালাবেন।’

কাগজটা পকেটে ভরে নীচে গেলাম। ব্রেকফাস্ট করলাম, তবে তাতে খাবারের বদলে কফিই ছিল বেশি। তারপর হাসপাতালে গেলাম।

রোগীদের সঙ্গে দেখা করার সময় বিকেলে। তবে কন্টিনেন্টাল ডিটেকটিভ এজেন্সির পরিচয়পত্র দেখিয়ে, আর ‘এক ঘণ্টা দেরি হলেও হাজারখানেক মানুষ মারা যেতে পারে’ জাতীয় কিছু বলে আমি মির্টল জেনিসনের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি জোগাড় করলাম।

চারতলায় একটা ওয়ার্ডে মেয়েটা একা শুয়ে ছিল। বাকি চারটে খাট ফাঁকাই ছিল। মেয়েটার বয়স পঁচিশ বা পঞ্চান্ন, যা খুশি হতে পারে। ফোলা, দাগধরা মুখটা চাদরের বাইরে বেরিয়ে ছিল। নিষ্প্রাণ হলদেটে চুলের দুটো বেণি তার দু-পাশে পড়ে ছিল। নার্স বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি কাগজটা বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে বললাম, ‘দয়া করে এই কাগজে একটা সই করবেন, মিস জেনিসন?’

ফোলা মুখের মধ্যে থেকে কুতকুতে চোখজোড়া প্রথমে আমাকে, তারপর কাগজটা দেখল। তারপর তেমনই ফোলা, থলথলে একটা হাত চাদর থেকে বেরিয়ে এসে কাগজটা নিল। তারপর প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে মেয়েটা আমার লেখা ওই ক-টা শব্দ পড়ল। অবশেষে কাগজটা চাদরের ওপর ফেলে দিল মেয়েটা। সরু, বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘এসব কোত্থেকে পেলেন?’

‘ডিনা ব্র্যান্ড আমাকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন।’

‘ও ম্যাক্সকে ছেড়েছে?’ মেয়েটার গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট হল।

‘এটা নিশ্চিতভাবে বলা একটু শক্ত।’ ডাহা মিথ্যে বললাম, ‘আমার ধারণা, উনি এটা নিজের কাছে রাখতে চাইছেন… যদি ভবিষ্যতে কখনো লাগে, সেইজন্য।’

‘মেয়েটা নিজের গলাই কাটছে। যাকগে! একটা পেনসিল দিন তো।’

আমি নিজের কলমটাই দিলাম। তারপর কাগজটা আমার নোটবুকের ওপর ধরে রাখলাম। মেয়েটা কাগজের নীচের দিকে খসখস করে সইটা করামাত্র সেটা নিয়ে কালিটা শুকোতে ব্যস্ত হলাম। মেয়েটা বলল, ‘ডিনা যদি এটা নিজের সিকিউরিটি হিসেবে রাখতে চায়, রাখুক। আমার কী? আমি শেষ।’

নাক কুঁচকে মেয়েটা হঠাৎ চাদরটা সরিয়ে দিল। একটা সস্তা নাইটগাউনের মধ্যে ফোলা, বেঢপ, বীভৎস শরীরটা দেখে আমিও একটু থমকালাম।

‘কী? বলেছিলাম না, আমি শেষ!’

আমি চাদরটা আবার যত্ন করে জায়গামতো পেতে দিলাম। তারপর বললাম, ‘ধন্যবাদ, মিস জেনিসন।’

‘ঠিকাছে-ঠিকাছে!’ ফোলা চিবুকটা কেঁপে উঠল সামান্য, ‘দুঃখ শুধু এটাই যে মরার আগে আমি এত বাজে দেখতে হয়ে গেলাম!’