Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

চার – হারিকেন স্ট্রিট

বাড়িটা ধূসর রঙের। কলিং বেল বাজাতে যে লোকটা দরজা খুলল সে শীর্ণকায়, ক্লান্ত মুখের রংও বাড়ির সঙ্গে মানানসই। লোকটার দু-গালে ঈষৎ লালচে ছাপ দেখলাম, নির্ঘাত সোমরসের অবদান। বুঝলাম, আমি শ্রীল শ্রীযুক্ত ড্যান রলফের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

‘আমি মিস ব্র্যান্ডের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

‘কী নাম বলব?’ লোকটার গলা শুনে বুঝলাম লোকটা শিক্ষিত এবং অসুস্থ।

‘নাম শুনলে উনি চিনবেন না। আমি উইলসনের মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

লোকটা ক্লান্ত চোখে আমাকে কিছুক্ষণ দেখল, তারপর বলল, ‘কী কথা?’

‘আমি কন্টিনেন্টাল ডিটেকটিভ এজেন্সি-র সানফ্রানসিস্কো অফিস থেকে আসছি। আমরা এই খুনের ব্যাপারটা নিয়ে ইন্টারেস্টেড।’

‘চমৎকার।’ লোকটার গলায় ব্যঙ্গ চাপা রইল না। ‘আসুন।’

একতলার বসার ঘরে একটি মেয়ে টেবিলে ফিনানশিয়াল সার্ভিস বুলেটিন, স্টক আর বন্ড বাজারের হাল-হকিকত, এমনকী একটা রেসিং চার্ট ছড়িয়ে বসে ছিল। ঘরটা অগোছালো, অত্যধিক আসবাবে ঠাসা, যাদের একটাও ঘরের সঙ্গে মানানসই বলে মনে হচ্ছিল না।

‘ডিনা।’ লোকটা আমার প্রতি মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করল, ‘ইনি সান ফ্রানসিস্কো থেকে এসেছেন। কন্টিনেন্টাল ডিটেকটিভ এজেন্সির তরফে ইনি মিস্টার ডোনাল্ড উইলসনের মৃত্যুর ব্যাপারে তদন্ত করছেন।’

মেয়েটি উঠে দাঁড়াল, তারপর কাগজপত্র ফেলে-ছড়িয়ে, আমার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল।

মেয়েটির বয়স বছর পঁচিশেক হবে, তবে অভিজ্ঞার আঁচড় ইতিমধ্যেই তার ঠোঁট আর চোখের কাছে দাগ ফেলতে শুরু করেছে। উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি, চওড়া কাঁধ, ভরাট বুক, মানানসই কোমর, মজবুত গড়নের পা। বড়ো বড়ো চোখের রং এমনিতে নীল হলেও এখন তাতে একটা রক্তাভা দেখলাম। রুক্ষ বাদামি চুলগুলো ট্রিম করা দরকার। মহিলার পোশাকের রংটা বিদঘুটে টাইপের বেগুনি, তারও আবার একদিকের বেশ ক-টা স্ট্র্যাপ হয় লাগানো হয়নি, নয় খুলে গেছে। বাঁ পা-র স্টকিং এক জায়গায় ছেঁড়া। তবে মহিলার হাতটা নরম আর উষ্ণ।

তাহলে এই হল ডিনা ব্র্যান্ড, পয়জনভিলের মক্ষীরানি তথা সেরা বিষ।

‘ওর বাবা আপনাকে পাঠিয়েছেন, তাই না?’ চপ্পল, কফির কাপ, এসব সরিয়ে আমার বসার জায়গা করে দিল মেয়েটি। গলার স্বর নরম, আদুরে। আমাকে সত্যিটাই বলতে হল।

‘ডোনাল্ড উইলসন আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি ওঁর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখনই উনি খুন হন।’

‘ড্যান!’ নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে রলফ-কে ডাকল ডিনা। লোকটা ঘরে ঢুকে ওই টেবিলেরই পাশে একটা চেয়ারে বসে আমার দিকে, নেহাত নিরাসক্তভাবে, তাকিয়ে রইল।

ভ্রূ কুঁচকে আমাকে বলল ডিনা, ‘তার মানে, ডোনাল্ড জানত যে কেউ ওকে মারতে চাইছে?’

‘জানি না। ঠিক কেন উনি আমাকে এখানে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেটা উনি বলে যাননি। হয়তো উনি ‘‘স্বচ্ছ শহর অভিযান’’-এ আমার সাহায্য চেয়েছিলেন।’

‘কিন্তু আপনি…’

‘এভাবে হবে না।’ আমি আপত্তি জানালাম, ‘আমাদের কাজের সবচেয়ে আনন্দের জায়গাই হল অন্যকে প্রশ্ন করা। সেই কাজটাই যদি আপনি কেড়ে নেন তাহলে আমি কী করব?’

‘আসলে,’ মেয়েটি এক চিলতে হাসি ফোটাল মুখে, ‘ব্যাপারটা আমার বোঝা দরকার।’

‘আমারও। সেজন্যই আমি জানতে চাই, আপনি ডোনাল্ডকে দিয়ে চেকটা সার্টিফাই করিয়েছিলেন কেন?’

নিতান্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ড্যান রলফ চেয়ারে নড়েচড়ে বসল। ওর হাতজোড়া টেবিলের নীচে চলে গেল দেখলাম।

‘আপনি ব্যাপারটা জেনে ফেলেছেন এর মধ্যেই?’ প্রশ্নটা করার ফাঁকে পা ক্রস করাতে গিয়ে ডিনা স্টকিঙের ছেঁড়া দিকটা লক্ষ করল। ‘কোনো মানে হয়! নতুন স্টকিং যদি এভাবে ছেঁড়ে…! এখন এটা কীভাবে ঢাকা যায়?’

‘ঢাকা যাবে না।’ আমি নিরাসক্ত গলায় বলি, ‘ছেঁড়া জায়গাটা নয়, চেকের কথা বলছি। ওটা নুনানের হাতে রয়েছে।’

ডিনা রলফের দিকে তাকাল। দেখলাম, সম্মতি দিয়ে মাথা ঝাঁকানো হল।

‘আপনি যদি আমার চাহিদাটা বোঝেন,’ মহিলার গলায় একটা ধারালো ভাব এবার ফুটে উঠল, ‘তাহলে আমিও আপনার চাহিদাটা বুঝব।’

‘শুনি।’

‘টাকা।’ ব্যাখ্যা করল ডিনা। ‘যত বেশি হয়, তত ভালো।’

‘টাকা বাঁচানো,’ আমি প্রবাদ-প্রবচনের আশ্রয় নিলাম, ‘মানেই টাকা কামানো। আমি আপনার টাকা, আর মনের শান্তি, দুটোই বাঁচাতে পারি।’

‘তাতে আমার কোনো লাভ হবে না।’

‘পুলিশ আপনাকে এখনও চেকের ব্যাপারে জেরা করেনি?’

মাথা নেড়ে ‘না’ বলা হল। আমি বললাম, ‘নুনান হুইস্পারের সঙ্গে আপনার ঘাড়েও ব্যাপারটা চাপাবার তাল করছে।’

‘ভয় দেখাবেন না।’ তোতলানোর ভঙ্গি করল ডিনা। ‘আমি কিন্তু নেহাত শিশু।’

‘নুনান জানে, থ্যালার এই চেকের কথাটা জানত। ও এটাও জানে যে উইলসন এখানে থাকার সময় থ্যালার এই বাড়িতে না ঢুকলেও উইলসন গুলি খাওয়ার সময় কাছেই ছিল। ও এও জানে যে থ্যালার, আর একজন মহিলাকে উইলসনের মৃতদেহর ওপর ঝুঁকে দেখতে দেখা গেছিল।’

ডিনা টেবিল থেকে একটা পেনসিল তুলে নিজের গালের ওপর আঁকিবুঁকি কাটল। রলফ-এর চোখজোড়া জ্বলজ্বলে হয়ে আমার ওপর ফোকাস করল। সামনে ঝুঁকে, কিন্তু হাত তখনও টেবিলের নীচেই রেখে রলফ বলল, ‘এগুলোর প্রত্যেকটাই থ্যালারের মাথাব্যথা। মিস ব্র্যান্ডের নয়।’

‘থ্যালার আর মিস ব্র্যান্ড ঠিক ‘‘দূরের’’ মানুষ নন।’ আমি বললাম, ‘উইলসন এখানে পাঁচ হাজার ডলারের একটা চেক সঙ্গে নিয়ে এলেন, তারপর ফেরার পথে খুন হলেন। এতে মিস ব্র্যান্ডের চেকটা ক্যাশ করাতে অসুবিধে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু উইলসন চেকটা সার্টিফাই করে দিয়েছিলেন। কেন? উনি কি জানতেন, কী হতে চলেছে?’

‘আপনি আমাকে কতটা বোকা ভাবেন?’ রেগে উঠল ডিনা। ‘আমার যদি উইলসনকে মারার ইচ্ছে থাকত, আমি ওকে এমন কোথাও মারতাম যেখানে কেউ কিছু দেখতে পাবে না। অন্তত আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় যাতে ও না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতাম আমি।’

‘আমি আপনাকে অতটা মোটামাথা ভাবছি না।’ আমি বললাম। ‘আমি শুধু বলছি, মোটাসোটা পুলিশ অফিসারটি এই খুনের দায় আপনার ঘাড়ে চাপাতে চলেছে।’

‘আর আপনি কী চাইছেন?’

‘সত্যিটা জানতে।’ আমি বললাম। ‘কে ডোনাল্ড উইলসনকে মারতে পারত, বা চাইত, সেটা নয়। আমি জানতে চাইছি, খুনটা কে করেছিল।’

‘আমি আপনাকে হয়তো একটু সাহায্য করতে পারব। তবে,’ ডিনার মুখে অলস হাসিটা ফিরে এল, ‘আমারও কিছু চাই।’

‘নিরাপত্তা।’

‘ওতে চিঁড়ে ভিজবে না।’ মাথা নেড়ে আপত্তি জানাল ডিনা, ‘আমার কিছু টাকা চাই। আপনি নিজেও নিশ্চয় এই পুরো ব্যাপারটা থেকে লাভবান হবেন। আমাকে তার একটা অংশ দিলেই চলবে।’

‘হবে না।’ আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘ধরে নিন, আপনি সমাজসেবা করছেন। বা, আরও ভালো হয় যদি ভাবেন, আমি বিল কুইন্ট।’

ড্যান রলফের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল। সেই অবস্থাতেই ও চেয়ার ছেড়ে উঠে আমার দিকে এগোচ্ছিল, কিন্তু ডিনাকে হাসতে দেখে ও বসে পড়ল।

‘আপনি ভাবছেন বিলের থেকে আমি কিছু পাইনি?’ আমার হাঁটুটা আলতো করে ছুয়ে বলল ডিনা, ‘আপনি যদি সময় থাকতেই জেনে যান, একটা কোম্পানিতে কবে থেকে স্ট্রাইক হতে চলেছে, আর কবে থেকে সেই স্ট্রাইক উঠে যাবে, আপনি শেয়ার মার্কেট থেকে যথেষ্ট কামাতে পারেন। বিল কুইন্টের থেকে আমার যা পাওয়ার, আমি পেয়েছিলাম।’

‘আপনার স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে।’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম।

‘এটা টাকার ব্যাপার নয়। এটা আমার একটা নীতি বলতে পারেন। আমার কাছে কিছু আছে, যেটা আপনার কাজে লাগবে। তাহলে আপনি তার দাম দেবেন না কেন?’

আমাকে কিঞ্চিৎ কারণবারি পান করালে পার্সটা আলগা করতে পারি ভেবেই এরপর ডিনা আর রলফ আমার জন্য তরলের যথাযোগ্য বন্দোবস্ত করল। জিনের বোতলটা যখন শেষ হল, তখন রাত সোয়া একটা। বোধ হয় চল্লিশতম বার ডিনা আমাকে বলল, ‘এই টাকাটা তো আপনাকে নিজের পকেট থেকে দিতে হবে না। তাহলে আমাকে কিছু দিতে আপনার আপত্তি কোথায়?’

‘এটা টাকার ব্যাপার নয়।’ আমি ছোটো করে ঝেড়ে দিলাম, ‘এটা আমারও একটা নীতি বলতে পারেন।’

আমার দিকে মুখ ভেংচে গ্লাসটা টেবিলে রাখতে গেল ডিনা। তরলের প্রভাব, বা অন্যমনস্কতা। গ্লাসটা টেবিল থেকে ইঞ্চি আষ্টেক দূরে থাকা অবস্থাতেই ছাড়ার ফলে সেটা নীচে পড়ল, আর চুরমার হল। আমি এই সুযোগে নিজের শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করলাম।

‘আপনি যদি কিছু নাও বলেন, তাহলেও খুব একটা অসুবিধা হবে না। আমি বোধ হয় ম্যানেজ করে নিতে পারব।’

‘বাহ্‌!’ ডিনার গলায় ব্যঙ্গ স্পষ্ট হল। ‘তাহলে তো ভালোই হবে। তবে এটা মাথায় রাখলে ভালো করবেন, উইলসনকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখেছি কিন্তু আমিই। তাই সাক্ষী হিসেবে আমার গুরুত্ব…’

‘ভুল।’ আমি মুখের ওপর বললাম। ‘ডোনাল্ড উইলসনের স্ত্রী তাঁকে বেরিয়ে আসতে, গুলি খেতে, এবং পড়ে যেতে দেখেছিলেন।’

‘উইলসনের স্ত্রী!’

‘হ্যাঁ। মহিলা এই রাস্তার ওপর, একটু দূরেই, একটা গাড়িতে বসেছিলেন তখন।’

‘মহিলা কীভাবে জানলেন, ও এই বাড়িতে আছে?’

‘তাঁর বক্তব্য, থ্যালার তাঁকে ফোন করে বলে যে তাঁর স্বামী চেকটা নিয়ে এই ঠিকানায় এসেছেন।’

‘আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছেন।’ ডিনা বলল, ‘ম্যাক্সের পক্ষে এটা জানাই সম্ভব ছিল না।’

‘মিসেস উইলসন নুনানকে যা বলেছেন, আমি সেটাই আপনাকে বলছি।’

ডিনা এতক্ষণ যে লেবুর চিলতেটা চিবোচ্ছিল সেটা থু-থু করে ফেলে দিল। আঙুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো আরও এলোমেলো করে, মুখটা মুছে, ও যখন আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল, তখন ওর চোখ জোড়া ধকধক করছিল।

‘ঠিক আছে, মিস্টার সবজান্তা। আমি আপনার নিয়মেই খেলব। তবে ভাববেন না যে এগুলো আপনি বিনামূল্যে জানতে পারছেন। আমি যা পাওয়ার, তা আদায় করেই ছাড়ব। বুঝলেন?’

‘বুঝলাম।’

‘বেশ। বলুন, কী জানতে চান?’

‘ডোনাল্ড উইলসন আপনাকে পাঁচ হাজার ডলার কেন দিয়েছিল?’

‘ও আমার সঙ্গে ফুর্তি করতে চেয়েছিল।’ বলে মেয়েটা এত হাসল, যে আমার আশঙ্কা হল, ও বোধ হয় মাতাল হয়ে গেছে। তবে পরের কথাগুলো স্থির, ঠান্ডা গলাতেই বেরোল। ‘ডোনাল্ড কেচ্ছা খুঁজছিল। ‘‘স্বচ্ছ শহর অভিযান’’-এর জন্য ও কিছু রাঘববোয়ালকে ফাঁসাতে চাইছিল। আমার কাছে তেমন কিছু… জিনিসপত্র ছিল। তাই আমি ওর সঙ্গে একটা ডিল করার চেষ্টা করি। এক পলকের একটু দেখাতেই ডোনাল্ড বোঝে, আমি মিথ্যে বলছি না।

আপনার মতো কিপটে না হলেও ডোনাল্ডের থেকে পাঁচ হাজার ডলার আদায় করতে আমার কালঘাম ছুটে গেছিল। অবশেষে গতকাল আমি ওকে ফোন করে বললাম, আমি আরেকজন ক্রেতা পেয়েছি যে ওগুলোর জন্য মোটা টাকা দিতে চায়। কথাটা মিথ্যে, কিন্তু তাতেই কাজ হল। ডোনাল্ড আর দর কষাকষি না করে পাঁচ হাজার ডলার দিতেই রাজি হল। তবে আমিও গোঁ ধরেছিলাম, হয় নগদ, নইলে সার্টিফায়েড চেক, এ ছাড়া কিচ্ছু নেব না আমি।’

‘রাত দশটাতেই কেন আসতে বললেন ওঁকে?’

‘কেন বলব না? দশটা খুব ভালো সময়। বেশ শান্তির সময়।’

‘নগদ বা সার্টিফায়েড চেক কেন চেয়েছিলেন?’

বিস্তর ভ্যানতাড়া, মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে প্রচুর জ্ঞান এবং ডিনা যে তার ঊর্ধ্বে তার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি পেরিয়ে উত্তরটা পাওয়া গেল।

‘কারণ এমনি চেক হলে ডোনাল্ড উইলসন সেটার পেমেন্ট ঠেকাতই ঠেকাত।’

‘কেন? আপনি ওকে ভুলভাল জিনিস দিচ্ছিলেন বুঝি?’

‘মোটেই না! আমি ওকে একদম সলিড জিনিস দিচ্ছিলাম। তবে ও সেটা ব্যবহার করতে পারত না। করলে, ওর বাবাকেই যে জেল খাটতে হত!’

মেয়েটার সঙ্গে আমিও হাসলাম, তবে আমার আসল লক্ষ্য ছিল মাথাটা স্টেডি রাখা। তাই বললাম, ‘এলিহু উইলসন ছাড়া আর কে কে ফাঁসত ওই জিনিসে?’

‘সব্বাই!’ হাত-পা ছুড়ে বলল ডিনা। ‘ম্যাক্স, লিউ ইয়ার্ড, পিট দ্য ফিন, নুনান, এলিহু উইলসন, পঞ্চপাণ্ডবের সবকটা ফেঁসে যেত ওতে।’

‘আপনি কী করতে চাইছিলেন, সেটা ম্যাক্স থ্যালার জানত?’

‘পাগল নাকি! সুদ্ধু ডোনাল্ড জানত।’

‘আর এখন কে কে জানে?’

‘ধুস! আমার আর এসবে কোনো আগ্রহ নেই। ওটা ডোনাল্ডকে নিয়ে করা আমার স্পেশাল ঠাট্টা ছিল। ফুরিয়ে গেছে। ব্যস।’

‘আপনি কী ভেবেছেন? ওই ‘‘জিনিস’’-এ যাদের নাম ছিল, তারাও এটাকে ঠাট্টা বলে ভাবছে বুঝি? নুনান এই ব্যাপারটা আপনার আর থ্যালারের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। এর থেকে এটা স্পষ্ট যে ডোনাল্ড উইলসনের পকেটে ও জিনিসটা পেয়েছে। তার আগে অবধি ওরা ভাবছিল, এলিহু উইলসন নিজের ছেলেকে দিয়ে ওদের টাইট করানোর চেষ্টা করছে, তাই না?’

‘আজ্ঞে।’ মেয়েটা বলল, ‘আমিও তেমন ভাবছিলাম।’

‘ভুল ভাবছিলেন। তবে আর এসবে কিছু যায়-আসে না। যদি নুনান বোঝে, এই জিনিস আপনি ডোনাল্ডকে বেচেছিলেন, ও ভাবতেই পারে যে আপনি আর আপনার বন্ধু, মানে থ্যালার এলিহুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।’

‘উহু। ও সহজেই বুঝবে, জিনিসটায় এলিহুর ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি।’

‘জিনিসটা কী ছিল?’

‘তিন বছর আগে সিটি হল নতুন করে বানানো হয়েছিল। ওটা থেকে শহরের কোনো লাভ হয়নি, তবে এরা পাঁচজনেই মালামাল হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি কামিয়েছিল, আর জিনিসটা সামনে এলে সবচেয়ে বেশি করে ফাঁসবে এলিহু উইলসন।’

‘তাতে কারো কিচ্ছু যাবে আসবে না। গ্যারান্টি দিচ্ছি, নুনান আর তার বন্ধুরা ভাববে, এলিহু নিজেকে বাঁচানোর একটা রাস্তা করে নিয়েই আপনাকে আর ম্যাক্সকে দিয়ে এই দু-নম্বরিটা করাচ্ছে।’

‘কে কী ভাবল তাতে আমার কিস্সু আসে যায় না!’ গোঁয়ারের মতো বলল মেয়েটা। ‘আমি জানি, ওটা ঠাট্টা ছিল।’

‘অসাধারণ!’ আমিও বিরক্তিটা চেপে রাখতে পারলাম না। ‘আপনি একদম খোলা মনে ফাঁসিতে ঝুলবেন, এ আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি। ভালো কথা, খুনের পর থেকে কি থ্যালারের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?’

‘না। তবে আপনি যদি ভেবে থাকেন এই বাড়ির কাছাকাছি ছিল বলেই খুনটা থ্যালার করেছে, তাহলে আপনিও ভুল ভাবছেন।’

‘কেন?’

‘অনেক কারণ আছে। প্রথমত, এসব কাজ থ্যালার নিজে করবে না। কাউকে দিয়ে করাবে। আর সেইসময় নিজের জন্য এমন একখানা অ্যালিবাই খাড়া করবে যেটা কেউ ভাঙতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, ম্যাক্স নিজে একটা .৩৮ ক্যারি করে। ও যদি কাউকে পাঠায় তাহলে সে কমপক্ষে ওই ক্যালিবারের, নয়তো তার বেশির পিস্তল ব্যবহার করবে। .৩২ কে ব্যবহার করে?’

‘তাহলে খুনটা কে করল?’

‘আমি যা জানি সব আপনাকে বলেছি।’ সোফায় এলিয়ে পড়ল ডিনা। ‘সত্যি বলতে কী, আমি আপনাকে বড্ড বেশিই বলে ফেলেছি।’

‘না।’ আমি উঠে দাঁড়ালাম। ‘আপনি ঠিক যতটুকু দরকার, আমাকে ঠিক ততটুকুই বলেছেন।’

‘তার মানে আপনি জানেন, কে খুনটা করেছে?’

‘জানি। তবে তাকে ধরার আগে আমাকে কয়েকটা জিনিস আরেকটু ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে।’

‘কে? কে??’ উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। মাতলামির লেশমাত্র ছিল না ওর আচরণে। আমার কোটের হাতা ধরে জানতে চাইল, ‘কে খুন করেছে? আমাকে বলুন, প্লিজ।’

‘এখনও না।’

‘বেশ।’ মেয়েটার নাকের পাটা ফুলে উঠল। ‘তাহলে উত্তরটা নিজের কাছেই রাখুন, আর বোঝার চেষ্টা করুন, আমি আপনাকে যা বলেছি তার কতটুকু সত্যি, আর কতটুকু মিথ্যে।’

‘যতটুকু সত্যি বলেছেন তার জন্য, আর এই সোমরসের জন্য ধন্যবাদ।’ আমিও গলা একদম স্থির রেখে বললাম। ‘যদি থ্যালার সত্যিই আপনার ‘‘কেউ’’ হয়, তাহলে তাকে দয়া করে জানিয়ে দেবেন, চিফ নুনান তাকে গুছিয়ে ফাঁসাচ্ছে।’